অনুবাদ
FREE SHIPPING IN INDIA
অনুবাদ
রাজর্ষি গুপ্ত
[মূল কাহিনি: The Wolves of Cernogratz; লেখক: Saki (Hector Hugh Munro)]
“পুরোনো দুর্গ বা প্রাসাদ-টাসাদের সঙ্গে তো অনেক সময়ই অনেক কিংবদন্তি বা লোককথা জড়িয়ে থাকে। এই দুর্গের সঙ্গে তেমন কিছু আছে নাকি?”
প্রশ্নটা করল কনরাড তার দিদিকে। কনরাড হামবুর্গ শহরের বেশ অবস্থাপন্ন একজন ব্যবসায়ী। ওদের পরিবার খুব পুরোনো ব্যবসায়ী পরিবার। মাটিতে পা দিয়ে চলার জন্য রীতিমতো খ্যাতি আছে তাদের। এমন কাঠখোট্টা বংশে কনরাডের মতো কবিপ্রকৃতির কল্পনাপ্রবণ ছেলের যে কী করে আবির্ভাব হল তা কে জানে।
ব্যারনেস গ্র্যুবেল কাঁধ উঁচোনোর ভঙ্গি করে বললেন, “এসব চত্বরে কি আর কিংবদন্তির অভাব পড়েছে? গালগল্প বানাতে সময়ও লাগে না, পয়সাও খরচ হয় না। হ্যাঁ, এই দুর্গ নিয়েও একটা গল্প শোনা যায় বটে। শোনা যায় যে এই দুর্গে কারোর মৃত্যু হলে নাকি গ্রামের সব কুকুর আর পাশের পাহাড়ি বনের সব জন্তুজানোয়ার-পাখপাখালি সারা রাত্তির ধরে কাঁদতে থাকে। বাবা রে! গানের বহর শুনে তো মনে হয় না সারা রাত্তির শুনে মন একেবারে ফুরফুরে হয়ে যাবে, তাই না?”
উত্তরে হামবুর্গের বণিকপ্রবর বলল, “অদ্ভুত তো! বিচিত্র। রোমান্টিক।”
ভাইয়ের জ্বলজ্বলে চোখকে পাত্তাও না দিয়ে ব্যারনেস নিঃস্পৃহ গলায় বললেন, “এসব মিথ্যে গালগল্প। এ-দুর্গ কিনে ইস্তক আমরা এমন কিছু দেখিনি। এই তো গত বসন্তকালে আমার শাশুড়ি এ-বাড়িতেই মারা গেলেন। কই, তখন তো গ্রামের একটা কুকুরও কাঁদেনি! তবে হ্যাঁ, বাড়ির সঙ্গে এসব গালগল্প-কিংবদন্তি জুড়ে থাকার একটা সুবিধে আছে। পয়সাকড়ি না ঢেলেও বেশ একটা আভিজাত্যের হাওয়া-বাতাসের মধ্যে থাকা যায়।”
“গল্পটা আপনি যেমন বললেন তেমনটা একেবারেই নয়।”
কথাগুলো ভেসে এল পাকাচুলো বুড়ি গভর্নেস অ্যামেলির দিক থেকে। সে-বুড়ির টেবিলের একধারে চুপটি করে বসে থাকার কথা। কেউ যতক্ষণ না তার সঙ্গে কথা না বলছে, ততক্ষণ তার টুঁ শব্দটিও করার কথা নয়। এইটেই হচ্ছে বড়োলোক বাড়ির রেওয়াজ। কিন্তু তার জায়গায় এ-বুড়ি শুধু নিজে থেকে কথাই বলে না, খোদ মনিবানীর কথার ভুল ধরে! সবার চক্ষু চড়কগাছ হয়ে গিয়ে সবাই কেঠো মুখে বসে রইল। বুড়ি অ্যামালির ওপর যেন আজ কথা বলার ভূত ভর করেছে। কোনোকিছুর তোয়াক্কা না করে উলটনো কলশির মতো গবগবিয়ে কথা বলেই যেতে থাকল সে।
“এ-বাড়িতে যে-কেউ মরলেই জন্তুজানোয়ারের কান্না শোনা যায় না। এ-দুর্গ যে চেরনোগ্রাৎস বংশের ভিটে ছিল। সেই চেরনোগ্রাৎস বংশের রক্তের কেউ যখন এই বাড়িতে মারা যায় তবে তার মৃত্যুর সময়ে আশেপাশের বনজঙ্গলে যত নেকড়ে আছে সব বনের ধারে বেরিয়ে আসে। এসে এই দুর্গের দিকে মুখ করে দল বেঁধে কাঁদতে থাকে। এ-চত্বরে বেশি তো নেকড়ের বাসা নেই। কিন্তু আমাদের পশুরক্ষকরা বলে যে ওইরকম কেউ মরতে বসার সময়ে নাকি পালে পালে নেকড়ে ঠিক কোথা থেকে যেন হাজির হয়ে যায়। জঙ্গলের আধো-অন্ধকারে গা মিশিয়ে, দুর্গের ছায়ার মধ্যে ছুটোছুটি করে তারা কাঁদতে থাকে। প্রবল আক্রোশে গর্জন করতে থাকে। তাদের চিৎকারে আকাশ যেন ফেটে যায়। তখন ভয় পেয়ে—নেকড়ের গন্ধ পেয়ে, না মৃত্যুর গন্ধ পেয়ে কী জানি—গাঁয়ের কুকুরগুলোও চেঁচিয়ে কাঁদতে শুরু করে। আর যখন মরতে বসা মানুষটার প্রাণপাখি দেহ ছেড়ে উড়ে যায়, ঠিক তখন এ-বাড়ির বাগানে একটা না একটা গাছ মড়মড় করে ভেঙে পড়ে। একেবারে শিকড়সুদ্ধু উপড়ে যায়—সে ঝড়-ঝঞ্ঝা থাকুক ছাই না থাকুক। কিন্তু এ সবই হবে যদি চেরনোগ্রাৎস বংশের কেউ তাদের এই পৈতৃক ভিটেয় মরতে বসে তবেই। বাইরের লোক কেউ এ-বাড়িতে এসে মরতে বসলে জংলি নেকড়েদের ফিরে তাকাতে ভারি বয়েই গেছে।”
শেষ কথাগুলো বলার সময় বুড়ির নাকের পাটা ফুলে উঠে বেঁটে শরীরটা টানটান হয়ে গেল। তার গলায় তাচ্ছিল্যের সুর আর চাপা রইল না। ঝলমলে পোশাক পরা ব্যারনেস চোখ সরু করে বুড়িকে মাপছিলেন। বুড়ি তো এমনিতে বেশ ভালোমানুষের মতোই থাকে। আজ তার হঠাৎ এত সাহস হয় কী করে যে তাঁর মুখের ওপর এমন উদ্ধত সুরে কথা বলে? এমন ভালো একটা ডিনারের মেজাজটাই মাটি করতে বসেছে বুড়ি। তীক্ষ্ণ স্বরে তিনি বললেন, “তোমার তো পুরোনো বংশের ইতিহাস নিয়ে আগ্রহ থাকার কথা ছিল না, ফ্রয়লাইন শ্মিট। তোমাকে চাকরিতে বহাল করার সময় তেমন কিছু তো তুমি বলোনি। ফন চেরনোগ্রাৎসদের ব্যাপারে তুমি এতকিছু জানলে কী করে?”
এই খোঁচা-মারা প্রশ্নের যে উত্তর অ্যামালির কাছ থেকে এল তা যেমন অপ্রত্যাশিত, তেমনই অভাবনীয়। মাথা উঁচু করে সে বলল, “আমার চেয়ে ভালো এই বংশের ইতিহাস আর কে জানবে? আমিও যে একজন ফন চেরনোগ্রাৎস।”
টেবিলের চারদিক থেকে সমস্বরে সবাই চেঁচিয়ে উঠল, “তুমি ফন চেরনোগ্রাৎস?”
কথাটা যে কারোরই হজম হয়নি, তা বোঝাই যাচ্ছিল।
অ্যামালি ধীর গলায় বলল, “আমাদের অবস্থা খুবই পড়ে গিয়েছিল। একটা সময় আমি বাচ্চাদের পড়ানোর কাজ নিতে বাধ্য হয়েছিলাম তাই। ফন চেরনোগ্রাৎসের মতো এত বড়ো বংশের মেয়ে হয়ে আমি পেটের দায়ে কাজ খুঁজছি, এ-কথা জানাজানি হলে আমার বংশের মুখ পুড়ত। তাই আমি নিজের নাম পালটে ফেলেছিলাম। আমি এ-বাড়িতে কোনোদিন থাকিনি বটে, কিন্তু আমার দাদু যৌবন পর্যন্ত এই দুর্গেই কাটিয়েছিলেন। আমার বাবাও এই দুর্গ নিয়ে অনেক গল্প বলতেন আমায়—যা যা তিনি জানতেন। তাঁর থেকেই আমি আমাদের বংশ আর এই দুর্গের ইতিহাসের সবটুকু জেনেছি।”
তারপর একটু থেমে সে আবার বলল, “মানুষের যখন নিজের শিকড়ের স্মৃতি আর ইতিহাসটুকু ছাড়া আর কিছুই পড়ে থাকে না, তখন সে তাকেই যখের ধনের মতো আগলে নিয়ে বসে থাকে। নিত্যদিন সেগুলো মনের তাক থেকে পেড়ে নেড়েচেড়ে দ্যাখে, আবার ধুলো ঝেড়ে তাকে তুলে রেখে দেয়। আপনাদের কাছে কাজ নেওয়ার সময় আমি কি আর জানতাম যে আপনাদের দৌলতে আমার নিজের পৈতৃক ভিটেতেই আবার পা রাখতে পারব? অন্য কোথাও না গিয়ে এখানেই এসেছি, এ আমার পরম ভাগ্য।”
কিছুক্ষণ কারোর মুখে আর কথা সরল না। তারপর ব্যারনেস অন্য একটা বিষয়ে—পারিবারিক ইতিহাসের মতো অস্বস্তিকর সেটা নয়—আলাপ-আলোচনা করতে শুরু করলে হাওয়া খানিক হালকা হল। বেশ কিছুক্ষণ পরে অ্যামালি নিজের কাজের জন্য ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। এইবার সকলের মুখে কথার খই ফুটতে লাগল। বলা বাহুল্য, নিন্দা আর অবিশ্বাসের গন্ধই তাতে বেশি। ব্যারন গ্র্যুবেল চোখ গোল গোল করে প্রায় খ্যাঁকখেঁকিয়ে উঠলেন।— “আস্পর্ধাটা দ্যাখো খালি ওর! আমাদেরই ডিনার টেবিলে বসে আমাদেরই তুশ্চু করে দিয়ে গেল! মানে একরকম এটাই বলে গেল যে আমরা এ-বাড়িতে কেউই নই। অথচ এ বাড়িখানা আমাদেরই! রীতিমতো নগদ দামে কেনা বাড়ি। আমি ওই মহিলার কথা একবর্ণও বিশ্বাস করি না। ফন চেরনোগ্রাৎস না ঘোড়ার ডিম, ওই পাঁচপেঁচি মহিলার পদবি ‘শ্মিট’ ছাড়া কিছু হতেই পারে না। ফন চেরনোগ্রাৎস বংশের নামে চালু এই গল্পটা হয়তো ও এখানে এসে কোনও চাষাভুষোর কাছ থেকে শুনেছে। তারপর সেটার ওপরই রঙ চড়িয়ে নিজের বংশের ইতিহাস বলে চালিয়ে দিচ্ছে।”
“এসব আর কিছুই না,” ব্যারনেস তাঁর স্বামীর তালে তাল মিলিয়ে বললেন, “একটু পাত্তা পাওয়ার ফিকির। যাতে আমাদের চোখে ওর একটু সম্মান বাড়ে, আমরা যাতে একটু ওকে নিয়ে আহা-উহু করি, এই আর কী। ও তো জানে যে ওর বয়স হচ্ছে, আর বেশিদিন ও কাজকর্ম করতে পারবে না। তখন যাতে বুড়ো বয়সের সমবেদনা আর এত বড়ো বংশের নাম ভাঙিয়ে আমাদের ঘাড়ে বসে খেতে পারে, তারই মতলব।” একটু থেমে দম নিয়ে ব্যারনেস নাক কুঁচকে আবার বললেন, “হুঁহ্! ওর দাদু ন কি এ-বাড়িতে থাকত!”
ব্যারনেসের নিজেরও দাদুর সংখ্যার কিছু কমতি ছিল না, কিন্তু তিনি কখনও তাঁদের নিয়ে এমন ভুলভাল গালগল্প বানানো তো দূরের কথা, তাঁদের নিয়ে অহংকারও করতেন না। এইটা ছিল তাঁর একটা বিশেষ অহংকারের জায়গা।
ব্যারন খিকখিক করে হেসে বললেন, “তবে ওর দাদুর এ-দুর্গে থাকার কথাটা একেবারে মিথ্যে নাও হতে পারে। হয়তো ফন চেরনোগ্রাৎসদের চাকরবাকর গোছের কিছু একটা ছিল সে।”
কনরাড কিছু বলল না। সে নিশ্চিত যে অ্যামালি যখন স্মৃতি আগলে রাখার কথা বলছিল তখন সে বৃদ্ধার চোখে জল টলমল করতে দেখেছে। অবশ্য এ-কথা বললে কেউ বিশ্বাস করবে না, কারণ সবাই জানে যে সে একটু বেশিমাত্রাতেই কল্পনাপ্রবণ।
ব্যারনেস বললেন, “থাকতে হবে না ওকে আর আমাদের সঙ্গে। নিউ ইয়ারের এই পর্বটা মিটে যাক। তার আগে পর্যন্ত ওকে ছাড়া আমার চলবে না—বাড়িতে এত কাজ। কিন্তু তার পরই ওকে আমি জবাব দিয়ে দেব।”
***
কিন্তু শেষ পর্যন্ত অ্যামালিকে ছাড়াই ব্যারনেসকে কাজ চালাতে হল। কারণ আর কিছুই নয়, ক্রিসমাসের পরই জাঁকিয়ে ঠান্ডা পড়ল, আর সেই ঠান্ডা বুড়িকে এমন কুপোকাত করে ফেলল যে সে আর বিছানা ছেড়ে উঠতেই পারল না।
আর দু-দিন পরেই বছর শেষ হবে। ঠান্ডায় হাড় জমে যাচ্ছে সবার। সন্ধ্যায় ফায়ারপ্লেস ঘিরে বসে আড্ডা মারছিল সবাই। ব্যারনেস রেগেমেগে বললেন, “কী ধরনের বদমাইশি এগুলো? কতকাল যে ও-বুড়ি আমাদের সঙ্গে আছে তার নেই ঠিক—অ্যাদ্দিনে তো কই, একটিবারের জন্যও শরীর খারাপ হতে দেখলাম না। মানে দিনের পর দিন বিছানায় পড়ে থাকার মতো অসুস্থ হতে তো কোনোদিন দেখিনি। আর যেই কিনা আমার বাড়ি-ভরতি অতিথি, আমার হাতে হাতে দু-একটা কাজ করে দেওয়ার জন্য একটা লোকের নিতান্ত দরকার, অমনি ঠান্ডা লেগে ওনার প্রাণপাখি একেবারে বেরিয়ে যাওয়ার জোগাড় হল! আমি কিছু বুঝি না, তাই না? এ সব ওর ঢং!”
ব্যাংকারের স্ত্রী নরম সুরে বললেন, “সত্যি বাপু, এ তো রীতিমতো অসভ্যতা! তবে কিনা এ-বছর শীতটা পড়েছেও বড্ড বেশি। আমাদেরই হাত-পা বরফ হয়ে যাচ্ছে, বুড়ো মানুষদের তো একেবারে মরার জোগাড়।”
“তা বটে।” গম্ভীর চালে মাথা দুলিয়ে ব্যারনেস বললেন, “ওর বয়স যথেষ্টই হয়েছে। আমারই ভুল আসলে। ওকে কিছুদিন আগে নোটিস দিয়ে দিলে আমাকে আর এই ঝামেলায় পড়তে হত না। তখন ও যেখানে খুশি গিয়ে জ্বর বাধালেও আমাকে দেখতে যেতে হত না। এখন দ্যাখো, সবটা এসে পড়ল আমারই ঘাড়ে। কী রে, ওয়্যাপি? কী হল, অমন করছিস কেন?”
ব্যারনেসের হঠাৎ উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠলেন। কারণ আর কিছুই না, তাঁর আদরের পোষা ল্যাপডগটি সোফার শুয়ে আদর খেতে খেতে আচমকা লাফিয়ে মাটিতে নেমে পড়েছে। চকিতে সে ঢুকে গেল সোফার তলায়। বেচারি ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে থরথর করে কাঁপছে। তার লম্বা লোমগুলো খাড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে, চোখে উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি। পরক্ষণেই উঠোনে রাত-পাহারার কুকুরগুলো একসঙ্গে গর্জন করে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে গ্রামের দিক থেকে ভেসে এল একাধিক কুকুরের গর্জন, খ্যাঁকরানি আর কান্নার আওয়াজ। ঘরের সবাই চমকে উঠলেন।
ব্যারন বলে উঠলেন, “হলটা কী? কুকুরগুলো হঠাৎ এরকম ক্ষেপে গেল কেন?”
তাঁর মুখ থেকে কথাটা খসেছে কি খসেনি, কুকুরগুলোর ‘ক্ষেপে যাওয়ার’ কারণ জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল সবার কাছে। কারণ, পাহাড় জঙ্গলের দিক থেকে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে ভেসে এসেছে একটা আওয়াজ। তাকে কি আর্তনাদ বলা যায়? বিলাপ? কান্না? তাতে যে মিশে রয়েছে রাগ, দুঃখ, বেদনা। ঘরের সবাই হতচকিত হয়ে বসে রইল। কী যেন এক অদ্ভুত আতঙ্কে, এক অজানা অলৌকিকের প্রত্যাশায় সবার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে। এই আওয়াজের উৎস কী তা সবাই জানে—অন্তত সবাই আন্দাজ করতে পারছে—কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারছে না, এতটাই অবিশ্বাস্য সে কথা। কেউই বিশ্বাস করতে পারছে না যে এই বিলাপ উঠে আসছে পৃথিবীর কোনও প্রাণীর গলা চিরে। প্রায় অপার্থিব সেই হাহাকার সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো উঠছে, নামছে, প্রায় মিলিয়ে যাচ্ছে, আবার জোরালো হয়ে উঠছে। এই যেন তা চলে গেল দূরে, পরক্ষণেই আবার হিমশীতল অন্ধকারের বুক চিরে ছুটে এসে কানে আছড়ে পড়ল বাজের মতো। আওয়াজটা এবার আর দূরে নেই। দুর্গের ঠিক বাইরে, প্রাচীরের পায়ের কাছে কেঁদে কেঁদে উঠছে সেই অপার্থিব, পাশবিক কণ্ঠ। বিষধোঁয়ার কুণ্ডলীর মতো ছেয়ে ফেলছে গোটা দুর্গ।
ব্যারন অস্ফুট স্বরে বলে উঠলেন, “নেকড়ে!”
অবিশ্বাস আর ভয় জড়াজড়ি করে প্রায় আটকে দিয়েছে ব্যারনের গলা। তাঁর কথার উত্তরেই যেন গোটা পাহাড়-জঙ্গল দুর্গের বাইরে কেঁদে কেঁদে ঘুরতে থাকা নেকড়েটার সঙ্গে সুর মিলিয়ে কেঁদে উঠল। একটা পাশবিক কণ্ঠের হাহাকার একশোটা কণ্ঠ হয়ে সবার কানে তালা লাগিয়ে দিল যেন।
কনরাড কেমন যেন ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছিল। কোনোমতে সে বলল, “শুধু নেকড়ে নয়। শয়ে-শয়ে নেকড়ে। নেকড়ের পাল নেমে এসেছে আজ। আশ্চর্য!”
ব্যারনেসের বুক কেঁপে উঠেছিল এক অজানা আশঙ্কায়। তাঁর মনের মধ্যে যে ভাব খেলা করছিল তাকে কাঁটাছেঁড়া করা যায় না, আর তা করার মতো মনের অবস্থাও ছিল না তাঁর। কোনও কথা না বলে অতিথিদের ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। তারপর অদম্য কৌতূহলের টানে ভূতগ্রস্তের মতো ছুটে চললেন সেই ঘরের দিকে যেখানে জ্বরের ঘোরে প্রায় বেহুঁশ হয়ে পড়ে আছে তাঁদের বুড়ি গভর্নেস।
ঘরে পা দিয়েই আঁতকে উঠলেন ব্যারনেস। খাটে নির্জীব হয়ে পড়ে আছে অ্যামালি। ছোটোখাটো শরীরটা যেন কুঁকড়ে আরও ছোটো হয়ে গিয়েছে। আর তার মাথার কাছে জানালাটা হাট করে খোলা। হাঁ হাঁ করে উঠে ব্যারনেস জানালাটা বন্ধ করে দিতে গেলেন, এমন সময় খাটের ওপরের লেপ-কম্বলের স্তূপের নীচ থেকে ভেসে এল বৃদ্ধা গভর্নেসের গলা।— “জানালাটা খোলাই থাক।”
অ্যামালির কণ্ঠস্বর দুর্বল, কাঁপা কাঁপা। কিন্তু সেই কণ্ঠস্বরের মধ্যেও যে অপরিসীম কর্তৃত্ব আর বনেদিয়ানা ফুটে বেরোচ্ছে, তা ব্যারনেসের কান এড়াল না। প্রচণ্ড অবাক হয়ে গেলেন তিনি। এমন ভঙ্গিতে, এমন মেজাজ নিয়ে তো কখনও এই অকিঞ্চিৎকর বৃদ্ধাকে কথা বলতে শোনেননি তিনি। কেউই শোনেনি। প্রায় আর্তনাদ করে উঠলেন তিনি।— “জানালা বন্ধ করব না? কী বলছ তুমি, অ্যামালি? জানালা খোলা রাখলে যে তুমি মরে যাবে!”
ধীর, গম্ভীর স্বরে অ্যামালি বলল, “মরতে তো আমি বসেছিই বুঝতে পারছেন না? তাই তো ওরা এসেছে। কত বনেদি বংশ আমাদের… এই দুর্গে আমাদের বংশের কেউ মৃত্যুর পথে পা বাড়ালে ওরা আসে। গান গেয়ে তাকে মৃত্যুপুরীতে স্বাগত জানায়। আমাকেও ওরা সেই গান শোনাতে এসেছে। আর আমি সেই গান শুনব না? জানালা বন্ধ করে রাখব?”
নেকড়েদের চিৎকার আরও তীব্র হয়ে উঠল। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যেন বেড়ে উঠল শনশনিয়ে বয়ে চলা হাওয়ার দাপট। দুর্গের প্রকাণ্ড আদ্যিকালের দরজা-জানালাগুলো যেন সেই চিৎকার আর হাওয়ার দাপটেই ঝনঝনিয়ে উঠতে থাকল।
অতিকষ্টে টেনেহিঁচড়ে প্রায় অবশ শরীরটাকে একটু তুলে বালিশে পিঠ দিয়ে আধশোওয়া হয়ে বসল বৃদ্ধা গভর্নেস। এতেই যেন প্রাণশক্তি আরও অনেকটা বেরিয়ে গেল তার। হাঁপাতে হাঁপাতে ফিসফিস করে গর্বিত গলায় সে বলল, “চেরনোগ্রাৎস বংশের আমিই শেষ বংশধর। আজ আমি আমার নিজের পূর্বপুরুষের ভিটেতে মরছি, নিজের বাড়ির ছাদের তলায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করছি। এ যে কী আনন্দ তা আপনি বুঝবেন না। কেউ বুঝবে না। চলে যান, আপনি চলে যান, আমি আর একা নই। ওরা আমাকে নিতে এসেছে।”
ব্যারনেস বৈঠকখানায় ফিরে গিয়ে অতিথিদের বললেন, “বুড়ি বোধ হয় আর বাঁচবে না। একজন ডাক্তার ডাকতে পারলে মন্দ হত না, কিন্তু এই রাতে ডাক্তার আসবেই-বা কী করে? উফ্, বাবা রে বাবা! এই নেকড়েগুলো তো চিৎকার করে করে মাথা খেয়ে ফেলল! মরার সময় এমন গান শুনতে কার ভালো লাগে বাপু? আমাকে তো লাখ টাকা দিলেও মরার সময় কানের কাছে এই চেঁচামেচি শুনতে পারব না আমি!”
“লাখ কেন, কোটি টাকা দিলেও এই মৃত্যুসংগীত কেনা যায় না, দিদি।”
কনরাডের মুখ থেকে কথাটা খসেছে কি খসেনি, বাগানের দিক থেকে কানফাটানো একটা আওয়াজ ভেসে এল। একটা বিরাট কোনও জিনিস যেন মড়মড় করে ভেঙে পড়ল। বিস্ময়ে হতচকিত ব্যারন বলে উঠলেন, “ও কী হল? গাছ পড়ল বুঝি?”
কিছুক্ষণ সবাই চুপ। নেকড়ের পালের চিৎকার আর উত্তাল হাওয়ার শনশনানি ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই।
নিস্তব্ধতা কাটালেন ব্যাংকারের স্ত্রী। দেঁতো হাসি হেসে বললেন, “এবারে শীতটা সত্যিই বড্ড বাড়াবাড়ি রকমের বেশি পড়েছে। আস্ত গাছ পর্যন্ত উপড়ে পড়ছে ঠান্ডার চোটে! ভাবা যায়, অ্যাঁ? নেকড়েগুলোও ঠান্ডার দাপটেই আর পাহাড়ি গুহায় থাকতে না পেরে নীচে নেমে এসেছে। এমন শীত বহুবছর পর পড়ল, কী বলেন?”
ব্যারনেস গম্ভীর মুখে ভুরু কুঁচকে ঘন ঘন ওপর-নীচে মাথা নেড়ে সায় দিলেন।
অতিরিক্ত ঠান্ডা লেগেই যে বৃদ্ধা গভর্নেস হার্ট ফেল করে মারা গেল—ডাক্তারবদ্যি-ওষুধবিষুধ কোনোকিছুতেই তার কিছু করতে পারত না—সে-বিষয়েও কারোর কোনও সন্দেহ ছিল না। তবে কয়েকদিন পরে সংবাদপত্রের শোকসংবাদ বিভাগে যে নোটিসখানা বেরোল, সেটা কনরাড দেখবে বলে আশা করেনি। তাতে লেখা ছিল—
‘গত ২৯ ডিসেম্বর চেরনোগ্রাৎস দুর্গে অ্যামালি ফন চেরনোগ্রাৎস পরলোকগমন করেছেন। তাঁদের দীর্ঘদিনের পরম বন্ধুর মৃত্যুতে ব্যারন ও ব্যারনেস গ্র্যুবেল যারপরনাই মর্মাহত হয়েছেন এবং তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করে শোকপ্রকাশ করছেন।’
শুভাঞ্জন ব্যানার্জী ▪ প্রবাহনীল দাস
লিও তলস্তয় ▪ নলিনাক্ষ ভট্টাচার্য
তাপস মৌলিক ▪ অংশু পাণিগ্রাহী ▪ বাণীব্রত গোস্বামী ▪অরিন্দম ঘোষ ▪ রঞ্জন দাশগুপ্ত ▪ সিদ্ধার্থ দাশগুপ্ত ▪শাশ্বত কর ▪ রাজীব রায় গোস্বামী ▪ সায়নদীপা পলমল ▪ প্রদীপ কুমার দাস
বদ্রীনাথ পাল ▪ তাপস বাগ ▪ বসন্ত পরামানিক ▪ গোবিন্দ মোদক ▪ সুব্রত দাস ▪ অর্ণব ভট্টাচার্য ▪ সুজাতা চ্যাটার্জী ▪ মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় দাস ▪ মধুমিতা ভট্টাচার্য ▪ ড. রমলা মুখার্জী ▪ সনৎকুমার ব্যানার্জী ▪ বিদ্যুৎ মিশ্র ▪ রাজর্ষি মণ্ডল ▪ রূপালী মুখোপাধ্যায় ▪ শক্তিপদ পণ্ডিত ▪ শম্ভু সরকার ▪ সুব্রত চৌধুরী
অদিতি ভট্টাচার্য ▪ দীপঙ্কর চৌধুরী ▪ মৌসুমী রায় ▪ সবিতা রায় বিশ্বাস ▪ সহেলী রায় ▪ কিশোর ঘোষাল
অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায় ▪ অরিন্দম দেবনাথ ▪ কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায় ▪ দীপক দাস ▪ ড. উৎপল অধিকারী ▪ চন্দ্রানী মজুমদার
সায়ন্তনী পলমল ঘোষ ▪ সোমা দে ▪ শংকর লাল সরকার ▪ সন্দীপন সাহা
অলংকরণ
মায়াসখা নন্দী ▪ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ▪ একপর্ণিকা ক্রিয়েটিভস
শিবশঙ্কর ভট্টাচার্য ▪️ অংশু পাণিগ্রাহী ▪️ রম্যাণী গোস্বামী ▪️ অরিন্দম দেবনাথ ▪️ সুব্রত দাস ▪️ বাণীব্রত গোস্বামী ▪️ এণাক্ষী কয়াল মণ্ডল ▪️ কিশোর ঘোষাল ▪️ মঞ্জুশ্রী ভাদুড়ি ▪️ সায়ন্তনী পলমল ঘোষ ▪️ সংঘমিত্রা রায়
হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় ▪️ অমিত চট্টোপাধ্যায় ▪️ অর্ণব ভট্টাচার্য ▪️ বদ্রীনাথ পাল ▪️ স্বপনকুমার বিজলী ▪️ বসন্ত পরামাণিক ▪️ মলয় সরকার ▪️ মানস চক্রবর্তী ▪️ মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় দাস ▪️ নীলেশ নন্দী ▪️ পারমিতা বন্দ্যোপাধ্যায় ▪️ রানা জামান ▪️ রূপসা ব্যানার্জী ▪️ সজল বন্দ্যোপাধ্যায় ▪️ শক্তিপদ পণ্ডিত ▪️ সৌমেন দাস ▪️ সুজাতা চ্যাটার্জী ▪️ সুমিত্রা পাল ▪️ তাপস বাগ ▪️ আলমগীর কবির ▪️ রমিত চট্টোপাধ্যায়
বুমা ব্যানার্জী দাস ▪️ মেঘনা নাথ ▪️ শাশ্বত কর ▪️ সুমন সেন ▪️ রণিত ভৌমিক
অরিন্দম ঘোষ ▪️ অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায় ▪️ রাখি পুরকায়স্থ
কেয়া চ্যাটার্জী ▪️ দীপক দাস ▪️ ড. উৎপল অধিকারী ▪️ সুদীপ ঘোষাল
প্রচ্ছদ ও অলংকরণ
বিশ্বদীপ পাল ▪️ অঙ্কিতা নন্দী ▪️ সুজাতা চ্যাটার্জী ▪️ বুমা ব্যানার্জী দাস ▪️ পুণ্ডরীক গুপ্ত ▪️ স্রবন্তী চট্টোপাধ্যায় ▪️ প্রবাহনীল দাস ▪️ সায়ন্তনী পলমল ঘোষ ▪️ সুমন দাস ▪️ সপ্তর্ষি চ্যাটার্জী