নিবন্ধ
FREE SHIPPING IN INDIA
নিবন্ধ
প্রাচীন মিশর, রোমান সাম্রাজ্য, চিন ও ভারতীয় উপমহাদেশে গজদন্ত ছিল রাজকীয় বিলাসের এক অন্যতম উপাদান। ঔপনিবেশিক যুগে ইউরোপীয় শক্তিগুলি আফ্রিকা ও এশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ গজদন্ত সংগ্রহ শুরু করে। উনিশ শতকে পিয়ানোর কি, বিলিয়ার্ড বল ও সাজসজ্জার সামগ্রীর জন্য গজদন্তের চাহিদা হঠাৎ করেই বেড়ে যায়। বিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদদের মতে, এই সময়েই আফ্রিকার বহু অঞ্চলে হাতির সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে যায়।
ড. উৎপল অধিকারী
গজদন্ত বা হাতির দাঁত হল মানুষের ইতিহাসে একাধারে যেমন শিল্প, বিলাস ও ক্ষমতার প্রতীক; অন্যদিকে তেমনই এক ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের কারণও বটে। হাজার হাজার বছর ধরে গজদন্ত দিয়ে তৈরি হয় অলংকার, মূর্তি, বাদ্যযন্ত্র, দাবার ঘুঁটি কিংবা ধর্মীয় উপকরণ ইত্যাদি। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে আজ এ-কথা স্পষ্ট, যে এই তথাকথিত ‘সাদা সোনা’ আসলে একটি জীববৈচিত্র্য বিধ্বংসী বাণিজ্যের মূল চালিকাশক্তি। গজদন্তের ব্যাবসা ও চোরাচালান গজকুলের অস্তিত্বকে চরম সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
গজদন্ত মূলত হাতির দীর্ঘায়িত ইনসাইজর দাঁত বা কৃন্তক দাঁত, যা ডেন্টিন নামক ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ পদার্থ দিয়ে গঠিত। এর ভেতরে থাকে স্নায়ু ও রক্তনালি, অর্থাৎ গজদন্ত হাতির কোনও অপ্রয়োজনীয় অংশ নয়। এটি হাতির শরীরের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। এই দাঁত ব্যবহৃত হয় মাটি খুঁড়ে জল ও লবণ জাতীয় পদার্থ বের করা এবং গাছের ছাল ছাড়াতে। এছাড়াও আত্মরক্ষা ও সামাজিক প্রতিযোগিতায় নিজেদের টিকিয়ে রাখার জন্যও এই দাঁত খুবই কার্যকরী। তাই গজদন্ত কেটে নেওয়া মানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে হাতির মৃত্যু।
প্রাচীন মিশর, রোমান সাম্রাজ্য, চিন ও ভারতীয় উপমহাদেশে গজদন্ত ছিল রাজকীয় বিলাসের এক অন্যতম উপাদান। ঔপনিবেশিক যুগে ইউরোপীয় শক্তিগুলি আফ্রিকা ও এশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ গজদন্ত সংগ্রহ শুরু করে। উনিশ শতকে পিয়ানোর কি, বিলিয়ার্ড বল ও সাজসজ্জার সামগ্রীর জন্য গজদন্তের চাহিদা হঠাৎ করেই বেড়ে যায়। বিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদদের মতে, এই সময়েই আফ্রিকার বহু অঞ্চলে হাতির সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে যায়।
বর্তমানে গজদন্তের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আইনত নিষিদ্ধ হলেও অবৈধ চোরাচালান এখনও সক্রিয়। এটি এখন একটি ট্রান্সন্যাশনাল অর্গানাইজড ক্রাইম। এই দাঁতের চোরাচালানের ধাপগুলি সাধারণত হল: সংরক্ষিত বনাঞ্চলে হাতি শিকার, গজদন্ত কেটে স্থানীয় মধ্যস্থতাকারীর হাতে বিক্রি, সীমান্ত পেরিয়ে বন্দর বা বিমানবন্দরে পাচার করা, ভুয়ো নথি ও কন্টেনারে লুকিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ করা ইত্যাদি। এই চক্রে সাধারণত জড়িত থাকে অস্ত্রপাচারকারী, মাদকচক্র ও অনেক সময় কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসনিক অংশও।
আফ্রিকান হাতির দাঁত আকারে বড়ো ও ভারী হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে এর কদর সবচেয়ে বেশি। এশীয় হাতির ক্ষেত্রে পুরুষ হাতিরাই সাধারণত গজদন্তযুক্ত, ফলে শিকার সরাসরি প্রজননক্ষম পুরুষদের সংখ্যা কমিয়ে দেয়। এর ফলে জিনগত বৈচিত্র্য হ্রাস পায়, সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়ে ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্ব সংকট হয়ে পড়ে ইত্যাদি।
কিন্তু বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত, যে গজদন্তের কোনও চিকিৎসাগত মূল্য নেই। তবুও চাহিদা রয়ে গেছে মূলত ঐতিহ্যগত শিল্পকর্মে, স্ট্যাটাস সিম্বল হিসেবে এবং লোকবিশ্বাস ও কুসংস্কারে। বিশেষত কিছু দেশে এখনও গজদন্তকে সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়, যা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
১৯৭৫ সালে এই গজদন্ত বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় সাইটস (কনভেনশন অন ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ইন এনডেনজারড স্পিসিস)। এর অধীনে আন্তর্জাতিক এই বাণিজ্য প্রায় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বহু দেশ তাদের মজুত হাতির দাঁত ধ্বংস করেছে। তবুও সমস্যা থেকে গেছে, কারণ কালোবাজারে এই দাঁতের দাম অত্যন্ত বেশি।
হাতিকে বলা হয় কিস্টোন স্পিসিস। বিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা গেছে, হাতি বনাঞ্চলে পথ তৈরি করে, যা অন্য প্রাণীদের চলাচলে সাহায্য করে; বীজ ছড়িয়ে বন সৃষ্টি ও গাছের বংশবিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। এছাড়াও মজার ব্যাপার হল, এরা জলাশয় তৈরি করে বহু প্রজাতির জীবন রক্ষা করে। অতএব হাতি নিধন মানে শুধু একটি প্রজাতির ক্ষতি নয়, বরং পুরো বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য ধ্বংস হওয়া।
আধুনিক বিজ্ঞান চোরাচালানের বিরুদ্ধে নানান নতুন অস্ত্র তৈরি করেছে। যেমন, DNA ফরেনসিকের মাধ্যমে হাতির দাঁত কোন অঞ্চল থেকে এসেছে তা শনাক্ত করা যায়। এছাড়াও, আইসোটোপ অ্যানালাইসিসের মাধ্যমে খাদ্য ও পরিবেশের সূত্র ধরে তাদের উৎস নির্ধারণ করা হচ্ছে। স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং ও এ.আই. প্রযুক্তির মাধ্যমে হাতির গতিবিধির ওপর নজরদারি চালানো হয়। এই প্রযুক্তি আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে চোরাচালান চক্র ভাঙতে খুবই সাহায্য করে।
তাই আজ শুধু আইন বা বিজ্ঞান দিয়ে নয়, বরং মানুষের নীতি-আদর্শ ও বিবেকের সাহায্যে এই হাতি নিধনযজ্ঞ বন্ধ করতে হবে। একটি অলংকার বা শৌখিন সামগ্রীর জন্য একটি বুদ্ধিমান, সামাজিক ও অনুভূতিসম্পন্ন প্রাণীকে হত্যা করা কি সভ্যতার পরিচয়?
বিজ্ঞান আজ তৈরি করেছে সিন্থেটিক আইভরি যা সহজলভ্য। তাই গজদন্ত ব্যবহারের কোনও যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। এছাড়াও গজদন্তের ব্যাবসা ও চোরাচালান হল মানুষের লোভের এক নগ্ন উদাহরণ, যার মূল্য দিচ্ছে প্রকৃতি। বিজ্ঞান, আইন ও সচেতনতার সমন্বয়ই এই অপরাধ রোধ করতে পারে। হাতিকে বাঁচানো মানে শুধু একটি প্রাণীকে বাঁচানো নয়; এটি আমাদের বন, জলবায়ু ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করার শপথও। তাই সবাইকে গলা মিলিয়ে বলতে হবে, গজদন্ত নয়, বরং জীবনই হোক আমাদের মূল্যবান সম্পদ।
লেখকের অন্যান্য লেখা
শুভাঞ্জন ব্যানার্জী ▪ প্রবাহনীল দাস
লিও তলস্তয় ▪ নলিনাক্ষ ভট্টাচার্য
তাপস মৌলিক ▪ অংশু পাণিগ্রাহী ▪ বাণীব্রত গোস্বামী ▪অরিন্দম ঘোষ ▪ রঞ্জন দাশগুপ্ত ▪ সিদ্ধার্থ দাশগুপ্ত ▪শাশ্বত কর ▪ রাজীব রায় গোস্বামী ▪ সায়নদীপা পলমল ▪ প্রদীপ কুমার দাস
বদ্রীনাথ পাল ▪ তাপস বাগ ▪ বসন্ত পরামানিক ▪ গোবিন্দ মোদক ▪ সুব্রত দাস ▪ অর্ণব ভট্টাচার্য ▪ সুজাতা চ্যাটার্জী ▪ মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় দাস ▪ মধুমিতা ভট্টাচার্য ▪ ড. রমলা মুখার্জী ▪ সনৎকুমার ব্যানার্জী ▪ বিদ্যুৎ মিশ্র ▪ রাজর্ষি মণ্ডল ▪ রূপালী মুখোপাধ্যায় ▪ শক্তিপদ পণ্ডিত ▪ শম্ভু সরকার ▪ সুব্রত চৌধুরী
অদিতি ভট্টাচার্য ▪ দীপঙ্কর চৌধুরী ▪ মৌসুমী রায় ▪ সবিতা রায় বিশ্বাস ▪ সহেলী রায় ▪ কিশোর ঘোষাল
অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায় ▪ অরিন্দম দেবনাথ ▪ কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায় ▪ দীপক দাস ▪ ড. উৎপল অধিকারী ▪ চন্দ্রানী মজুমদার
সায়ন্তনী পলমল ঘোষ ▪ সোমা দে ▪ শংকর লাল সরকার ▪ সন্দীপন সাহা
অলংকরণ
মায়াসখা নন্দী ▪ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ▪ একপর্ণিকা ক্রিয়েটিভস