উপন্যাস
FREE SHIPPING IN INDIA
উপন্যাস
ধনমান আর ধনরাজকে জড়াজড়ি হয়ে কাঁদতে দেখে ঘ্রাঘনখ বাঁহাতের একটা আঙুল দিয়ে নারকেলটার মাঝখানে একটু আলতো চাপ দিল, আর সঙ্গে সঙ্গে ঠিক সিনেমা শোর একটু আগে যেমন টিকিটের কাউন্টার খুলে যায়, তেমনি নারকেলের পেটের কাছে নিখুঁত একটি চৌকোনা ফুটো বেরিয়ে পড়ে। নারকেলের পেটের সেই ফুটোর মধ্য থেকে ধনমান আর ধনরাজের মায়ের গলায় কে যেন করুণ কণ্ঠে ডেকে উঠল, “ধানু-রাজু, বাড়ি আয়, বাড়ি আয়, বাড়ি আয়!”
নলিনাক্ষ ভট্টাচার্য
তিন কুড়ি দশ বছর আগের কাহিনি।
গোক্ষুর গ্রামে এক গুড়ের ব্যবসায়ী ছিল, নাম ধনবান মহাজন। ধনবান গুড়ের ব্যাবসা করে বেশ বড়োলোক হয়েছে। ধনবানের দুই ছেলে—ধনমান আর ধনরাজ। দুজনই ডানপিটে ষণ্ডামার্কা, কদম ছাঁট চুল আর ক্রিকেট খেলায় ওরা এত ওস্তাদ যে দূর থেকে ব্যাট-বল-স্ট্যাম্প-সহ ওদের দেখলে গ্রামের ছেলেরা দূরে সরে যেত, কারণ ধনবানের ছেলেরা যেখানে-সেখানে স্ট্যাম্প পুঁতে খেলা শুরু করে দিত। আশেপাশের গ্রামের দু-চারটে ছেলেকে ধরে ওরা মাথায় গাঁট্টা মেরে, কান মুচড়ে ওদের সঙ্গে খেলতে বাধ্য করত। ধনবানের এক ছেলে ব্যাট করত, আর এক ছেলে বল করত, গ্রামের ছেলেরা শুধু ফিল্ডার। কিন্তু ওদের খেলার এমনই অদ্ভুত নিয়ম যে ধনবানের যে ছেলে আউট হত, সে-ই এসে বল করত আর অন্য ছেলে যেত ব্যাট করতে। ফিল্ডাররা রৌদ্রে দাঁড়িয়ে থাকত শুধু পুকুরে বা বাগানে বল পড়লে কুড়িয়ে আনার জন্য। ক্যাচ ধরলে চাঁটি, বাউন্ডারি আটকালে গাঁট্টা আর স্টাম্প আউট করলে চিমটি— এই ছিল গ্রামের ছেলেদের একমাত্র প্রাপ্য। এই জন্যই ধনবানের ছেলেদের সঙ্গে এখন আর গ্রামের ছেলেরা কেউ ক্রিকেট খেলতে আসে না। শুধু দূরে দাঁড়িয়ে ওদের খেলা দেখে। কিন্তু তাতে ধনরাজের ছেলেদের ক্রিকেট খেলার উৎসাহে এতটুকু ভাটা পড়ে না।
গ্রামের মধ্যে বল আটকানোর জন্য ফিল্ডার না পাওয়ায় এক বিকেলে ধনমান আর ধনরাজ গ্রামের বাইরে যে গভীর জঙ্গল, তার পাশের মাঠে খেলা শুরু করল। বল পেটালে গাছে ঠোক্কর খেয়ে বেশিরভাগ বলই ফিরে আসে, কাজেই ফিল্ডারের দরকার হবে না— এই বুদ্ধি করেছিল ধনবানের ছেলেরা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ধনরাজের বলে ধনমান এমন এক ছক্কা হাঁকাল যে একটা শিরিষ গাছের মগডালের ভিতর দিয়ে বল কোথায় গিয়ে পড়ল, কেউ দেখতে পেল না। ধনমান আর ধনরাজ এবার ছুটল গভীর বনে বল কুড়িয়ে আনতে। তখন সন্ধ্যা হয়ে এসেছে।
ওই জঙ্গলের মধ্যে একটা শ্যাওড়া গাছে বাস করত অতি নিরীহ দুই ভূত। একজনের নাম পেতো, আর একজনের নাম মেটো। একজন শুধু পচা পাতা খেয়ে থাকত, আর একজন খেতো কেঁচো খোঁড়া মাটি। সেই জন্যই ওদের ওই নাম। কিন্তু দুজনেই বেজায় ভিতু। ধনমান আর ধনরাজ যখন বল খোঁজাখুঁজি করে পাচ্ছে না, তখন ওদের দুঃখে পেতো আর মেটো নাকি সুরে গাছের ডালে বসে এমন জোর কান্না শুরু করে দিল যে সারাদিন খাবারের জন্য উড়ে উড়ে ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরে যেসব পাখি হাত-পা ছড়িয়ে ঘুমোচ্ছিল, তারা ঘুম ভেঙে রাগে বিরক্তিতে পেতো আর মেটোর চোদ্দপুরুষকে গালাগাল শুরু করল।
ভূতের কান্না আর পাখির ডাক সব মিলেমিশে জঙ্গলের মধ্যে এতরকমের শব্দ হয় যে ধনমান আর ধনরাজ ভয় পেয়ে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করে দেয়।
সেটা ছিল কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশী। চারপাশে অন্ধকার নেমে আসছে দ্রুত। জঙ্গলের মধ্যে পেতো আর মেটোর কান্না থামলে, পাখপাখালি চুপ হয়ে ঘুমিয়ে পড়লে সেখানে এসে হাজির হল একজন কাপালিকের চ্যালা। ওই গভীর জঙ্গলের মধ্যে এক কাপালিকের আস্তানা ছিল, মন্দির ছিল ছিন্নমস্তার। কাপালিক তাঁর চ্যালাকে পাঠিয়েছিলেন গোক্ষুর গ্রাম থেকে নরবলির জন্য কোনও ছেলেকে ধরে আনতে। ঘ্রাঘনখ নামের ওই কাপালিকের চ্যালার ডানহাতে একটি মন্ত্রপূত ডাব নারকেল আর বাঁহাতে একটা লন্ঠন। ধনমান আর ধনরাজকে জড়াজড়ি হয়ে কাঁদতে দেখে ঘ্রাঘনখ বাঁহাতের একটা আঙুল দিয়ে নারকেলটার মাঝখানে একটু আলতো চাপ দিল, আর সঙ্গে সঙ্গে ঠিক সিনেমা শোর একটু আগে যেমন টিকিটের কাউন্টার খুলে যায়, তেমনি নারকেলের পেটের কাছে নিখুঁত একটি চৌকোনা ফুটো বেরিয়ে পড়ে। নারকেলের পেটের সেই ফুটোর মধ্য থেকে ধনমান আর ধনরাজের মায়ের গলায় কে যেন করুণ কণ্ঠে ডেকে উঠল, “ধানু-রাজু, বাড়ি আয়, বাড়ি আয়, বাড়ি আয়!”
ধনমান আর ধনরাজকে ওই নামেই তো ডাকে ওদের মা। তাই নারকেলের মধ্য থেকে মায়ের গলা শুনে ওরা চোখ মুছে ফিরে তাকায়। ঘ্রাঘনখ এবার আঙুল দিয়ে নারকেলের খোলা জানালাটায় চাপ দিলে টিকিটের কাউন্টার বন্ধ হয়ে যাবার মতো নারকেলের সেই চার কোনা ফুটোটা বন্ধ হয়ে যায়। ঘ্রাঘনখ মৃদু হেসে গভীর জঙ্গলের মধ্যে এগিয়ে যায়। মেছো ভূতে পাওয়া জেলেদের মতো ধানু-রাজুও মোহাচ্ছন্ন হয়ে নিঃশব্দে ঢুলু ঢুলু চোখে ঘ্রাঘনখকে অনুসরণ করে।
জঙ্গলের পরে জঙ্গল, তারপর আরও জঙ্গল। অনেক দূর যাবার পর জঙ্গলের মধ্যে একটা ভাঙা পোড়ো বাড়ি আর মন্দির দেখা যায়। বাড়ির পেছনে একটা লোহার গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ঘ্রাঘনখ পুকুরে কলশি ডুবিয়ে ভরলে যেরকম ভারী গবগব শব্দ হয়, সেরকম গলায় বলল,
“তি অতি অন্ত কুত্রাপি
জেগে ওঠ বিপ্র
খোলো দ্বার খিপ্র
শিকার মিলেছে বনে অদ্যাপি।”
সঙ্গে সঙ্গে ভীমের মতো বিশাল কালো কুচকুচে তেলতেলে চেহারার একটা লোক খালি গায়ে পৈতে দিয়ে পিঠের ঘাম চাঁছতে চাঁছতে এসে দরজা খুলে দিয়ে একপাশে সরে দাঁড়াল। তারপর ধানু-রাজুর দিকে তাকিয়ে খুশি মুখে বলল, “জোড়া পাঁঠা! বাঁচা গেল, সামনের অমাবস্যেতে এবার আর কচু-ঘেচু বলি দিয়ে রামদার ধার নষ্ট করতে হবে না আমাকে।”
এই বলে দু-হাতে ধনমান ও ধনরাজের হাত খপ করে ধরে সেই পোড়ো বাড়ির মধ্যে নিয়ে গিয়ে ঢুকল সে। ওই বিশালদেহী ব্রাহ্মণের নাম ক্রমার্ক। সেও কাপালিকের একজন চ্যালা।
ধানু-রাজু সব দেখেশুনেও কাপালিকের মন্ত্রে এমন বশ হয়েছিল, যে টুঁ শব্দটি করতে পারল না। ক্রমার্ক ওদের দুজনকে নিয়ে মেঝের নীচের একটা কুঠুরিতে ঢুকিয়ে তালা বন্ধ করে দিল।
দুই
ধানু-রাজু যে জঙ্গলের পাশের মাঠে খেলতে গেছে, তা জানত গাঁয়ের ছেলেরা। কারণ, ওরা দূরে দাঁড়িয়ে খেলা দেখছিল। ওদের ব্যাট-বল ছিল না, কিন্তু খেলার শখ ছিল। তাই দূর থেকেই ধানু-রাজুর খেলা দেখত ওরা। রাজুর বলে ধানু ছক্কা হাঁকালে ওরা যে বনে ঢুকল বল খুঁজতে, তাও দেখেছে ওরা। ধানু-রাজু যখন সন্ধ্যা হয়ে যাবার পরেও জঙ্গল থেকে ফিরল না, তখন ওরা ধরে নিল ওদের দুই ভাইকে চিতাবাঘে ধরে খেয়েছে। কারণ, জঙ্গলে যে চিতাবাঘ আছে, সে-খবর ওরা জানত। এতদিনে ধানু-রাজুর অত্যাচার থেকে মুক্তি পেয়ে ওরা খুশিমনে ব্যাট আর স্ট্যাম্পগুলো তুলে নিয়ে ধনবান মহাজনের বাড়িতে গিয়ে বাড়ির চাকরের হাতে ব্যাট আর স্ট্যাম্প ধরিয়ে দিয়ে মহানন্দে জানিয়ে দিল ধানু-রাজু জঙ্গলে ঢুকেছিল বল কুড়োতে, কিন্তু ওখান থেকে আর ফিরে আসেনি।
চাকরের মুখে দুঃসংবাদ শুনে ধনবান গাঁয়ের চল্লিশ-পঞ্চাশ জন সমর্থ লোক জোগাড় করে লাঠিসোটা, হ্যাজাক, লন্ঠন নিয়ে ছুটল জঙ্গলের দিকে। জঙ্গলে ঢুকে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল গাঁয়ের লোকেরা। ওরা লাল রঙের ক্রিকেট বলটা খুঁজে পেল, কিন্তু আঁতিপাতি করে দু-ঘণ্টা ধরে খোঁজাখুঁজি করেও ধানু-রাজুকে দেখতে পেল না।
ধনবানের কাছে মুখে দুঃখপ্রকাশ করে দীর্ঘশ্বাস ফেললেও গাঁয়ের লোকরা ধানু-রাজুর অন্তর্ধানে খুশিই হল, কারণ ওই ছেলে দুটো ছিল আপদ বিশেষ। ওদের হাতে ইস্কুলের মাস্টাররা হত নাজেহাল, গ্রামের মানুষদের বাগানে আম-কাঁঠাল-পেয়ারা-কুল পাকার আগেই ছিঁড়ে নিত ওরা। আর গাঁয়ের অনেক ছেলে ওদের ক্রিকেট খেলায় ফিল্ডিং দেবার ভয়ে ইস্কুল ফেরত সুড়সুড় করে ঘরে ফিরে বই নিয়ে বসত, খেলতে বেরোতে পারত না। ঘুড়ি আর লাটিমের দোকানে ধনবানের ডানপিটে ছেলেরা যেভাবে উৎপাত শুরু করে দিয়েছিল, তাতে দোকানিরা গ্রাম থেকে দোকানই তুলে দেবে ভাবছিল। এমনকি গোরু-ছাগলও ওদের কাছে আসতে দেখলে খুঁটোসুদ্ধ তুলে নিয়ে দৌড়ত। আর বেড়াল-কুকুর ধনবানের ছেলেদের ভয়ে লেজ খাড়া করতে সাহস পেত না, কেননা লেজ খাড়া দেখলেই ওরা বেজায় রেগে গিয়ে ঢিল-পাটকেল ছুড়তে শুরু করত এইসব নিরীহ পশুদের ওপর।
এইরকম ডানপিটে ছেলে দুটো জঙ্গলে ঢুকে শেষ পর্যন্ত হাওয়া হয়ে গেল, বিশ্বাস করতে মন চাইল না অনেকেরই। ধনবান মনে মনে ভাবল, হতভাগা দুটো যাবে আর কোথায়, সামনের সপ্তাহে হাফ-টার্মিনাল পরীক্ষাটা যাতে না দিতে হয় সেই মতলবে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে নিশ্চয়ই পাশের গ্রাম খেতুড়িতে মামাবাড়িতে গিয়ে উঠেছে। মামারা দু-দিন পরে ঠেঙিয়ে বিদেয় করলে বাছাধনরা আবার সুড়সুড় করে এসে নিজের গোয়ালে উঠবে। যাক, দু-দিন অন্তত গায়ের সবার হাড়ে বাতাস লাগুক।
কিন্তু দুই দিন, দুই রাত কেটে গেল, ধনবানের দুই ডানপিটে ছেলের কোনও দেখা নেই। খেতুড়ি আর আশেপাশের অন্য গাঁয়ে যেখানে যত ধনবানের আত্মীয়স্বজন আছে সবার বাড়িতে লোক গেল, দশ গাঁয়ের হাটে, মাঠে, বাজারে, চণ্ডীতলায় ঢ্যাঁড়া পেটানো হল, কিন্তু ধানুপরাজুর কোনও সন্ধানই পাওয়া গেল না। তখন শোকে দুঃখে ধনবানের গিন্নি শয্যা নিল। গ্রামের লোক পরামর্শ দিল, খাপুর গাঁয়ে এক ওস্তাদ ওঝা আছে যে বাটি চালান দিয়ে হারিয়ে যাওয়া গোরু-ছাগল, মানুষ থেকে চুরি করা ঘটিবাটি সব ফিরিয়ে আনতে পারে।
একদিন বিকেলের দিকে ধনবান মহাজন দশ মাইল দূরে খাপুর গ্রামে গিয়ে সেই ওঝার শরণাপন্ন হল। ওঝার নাম ঝাড়নতাড়ন। কোন এককালে তার একটা পদবি ছিল, সেটা ফুসমন্তর না ফোকলাদার তা কেউ ঠিক করে বলতে পারে না, তবে গাঁয়ের তিন মাথাওয়ালা বুড়োরা মা ওলাইচণ্ডীর কিরে কেটে বলে, তাদের ছেলেবেলা যে-বছর বড়ো খরার পরে ছোটো বন্যা, তারপর মা শীতলার দয়া হয়েছিল, সে-বছর এক চাষির বউ পুকুরঘাটে ভর সন্ধেয় খোলাচুলে জল আনতে গেলে বেম্মদত্যি ঘাড়ে চেপেছিল। ঝাড়নতাড়ন হলুদ পোড়া, লংকা পোড়া শুঁকিয়ে, পোড়া শোল মাছ খাইয়ে, বিশ কলশি জল ঢেলে, বাঁশের ছিপছিপে কঞ্চি দিয়ে চাষিবউকে মাত্র বিশ ঘা দিতেই বেম্মদত্যি চাষিবউয়ের মুখ থেকে ‘বাবা গো, মা গো, মলুম গো, গেলুম গো’ বলিয়ে চাষিবউয়ের ঘাড় থেকে নেমে দুটো তালগাছের মাথার পিণ্ডি চটকে চিরকালের মতো গাঁ ছাড়ার সময় ঝাড়নতাড়নের পিতৃপুরুষের দেওয়া ফুসমন্তর বা ফোকলাদার পদবিটাও সঙ্গে নিয়ে যায়। গাঁয়ের লোক বা ঝাড়নতাড়ন অনেক চেষ্টা, পুজোপাঠ, ঝাড়ফুঁক করেও পদবিটা কিছুতেই আর মনে আনতে পারে না। ঝড়নতাড়নের এমনই কপাল খারাপ যে তার তিনকুলে তো দূরে থাক, দশ কুলে কেউ নেই যে কারও কাছ থেকে সে বংশের পদবিটা গিয়ে ধার করে আনতে পারে। মনের দুঃখে ঝাড়নতাড়ন নিজের ছেলেকে শেষ পর্যন্ত একটা ঝুটমুট পদবি দিয়ে পিতৃপুরুষের ব্যাবসায় লাগাবে, এই কষ্ট সহ্য করতে পারবে না বলে আর বিয়ে-থা করলই না। সেই থেকে সময় পেলেই সে তার দাওয়ায় বসে গাঁজা টানবার ফাঁকে হারানো পদবির জন্য ‘ওঙা ওঙা’ বলে একটু কেঁদে নেয়।
ধনবান যখন ঝাড়নতাড়নের বাড়িতে পৌঁছল, তখন বেলা তিন প্রহর। কিছুক্ষণ আগেই নলচিপা গাঁয়ে বাটি চালান দিয়ে এক গোরুচোরের গলায় রক্ত উঠিয়ে ঝাড়নতাড়ন বাড়ি এসে ডোবার জলে চান-টান করে, মাঝ-সিতে করে, তার কাঁধ সমান চুলে বেণী বেঁধে, এক ফুট উঁচু জলচৌকিতে গ্যাঁট হয়ে বসে, ছয় ইঞ্চি উঁচু আমড়াগাছের পিঁড়িতে থালা রেখে নারকেলের দুধ দিয়ে রাঁধা সজনের ডাঁটা দেওয়া গুগলির ঝোল মেখে গবাগব ভাত খাচ্ছিল। ধনবান ঝাড়নতাড়নের গবাগব, হপাহপ, সোতসোত, কোতকোত ভাত খাওয়া দেখে উঠোনে এড়েন্ডা ঝোপের পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে বার দু-এক গলা খাঁকারি দিল। কিন্তু ঝাড়নতাড়নের খাওয়ার হুমাহুম, গুমাগুম শব্দের মাঝখানে ধনবানের গলা খাঁকারি গোরুর হাম্বার মাঝখানে পোকা ধরতে না পারা টিকটিকির মনের দুঃখে তিনবার টিক টিক টিক করার শামিল।
খাওয়া হলে ঝাড়নতাড়ন হাতের কনুই অবধি চেটে পরিষ্কার করে মাথা তুলে ধনবানকে একপলক দেখে ডোবায় হাত-মুখ ধুতে যাবার পথে বলল, “কোন গাঁ?”
ধনবান বলল, “গোক্ষুর।”
“অ, গোক্ষুর।”
হাত-মুখ ধুয়ে একটা নারকেল পাতা মাটি থেকে কুড়িয়ে পাতা ছেঁটে কাঠি বের করে দাঁত খোঁচাতে খোঁচাতে দাওয়ায় এসে গাঁজার কলকেতে আগুন দিয়ে সুখটান দুঃখটান, তারপর জোরে কষে একটান মেরে ঝাড়নতাড়ন তার দ্বিতীয় প্রশ্নটি করল, “কী ক্যাস?”
গতবছর জাগুলিয়া গাঁয়ে কাছারির বড়ো মুহুরির ছোটো ছেলের পেট থেকে গুবরে পোকার মতো তিনটে পোকাকে নাভির থেকে উড়িয়ে দিয়ে পেটের ছিঁচকেলে ব্যথাটা কমাবার সময়ই সে জেনে নিয়েছে ‘কেস’ কাকে বলে। ধনবান ‘কেস’ বুঝিয়ে দিলে ঝাড়নতাড়ন আর একবার গাঁজার কলকেয় টান দিয়ে খক্কর খক্কর খক করে কেশে চোখটাকে কলকে ফুলের মতো লাল করে বিড়বিড় করে বলতে লাগল, “পাঁচদিনের বাসি জল পনেরো কলশ।”
ধনবান বলল, “হবে।”
ঝাড়নতাড়ন বুড়ো আঙুলে কলকে খুঁচিয়ে আগুন ডগডগে করে ধমক দিয়ে বলল, “হবে বোলোনি, বলো ‘আজ্ঞে, পেরস্তুত।’ ওঝাকে সম্মান করতি হয় তাও শেখোনি?”
থতমত খেয়ে ধনবান বলল, “আজ্ঞে পেরস্তুত।”
ঝাড়নতাড়ন মাটিতে কলকে উপুড় করে রেখে এবার চোখ বুজে বড়ো বড়ো নখওলা হাত দুটো বেড়ালের থাবার মতো গুটিয়ে এনে হাওয়ার মধ্যে খামচাখামচি করতে লাগল। আর সেই সঙ্গে হড়বড়ো করে বেণী দুলিয়ে তার ‘ক্যাস’-এর জন্য প্রয়োজনীয় সাজসরঞ্জামের ফিরিস্তি দিতে লাগল, “তিনপো কঞ্জুসের ভিটের মাটি।”
“আইজ্ঞে পেরস্তুত।”
“এক ছটাক রাই সরষে।”
“আইজ্ঞে পেরস্তুত।”
“নিজের ক্ষেতের শুকনো লংকা এক কুড়ি।”
“আইজ্ঞে পে… পরের ক্ষেতের হলে চলবে না?”
“চলবে, চার কুড়ি লাগবে।”
“আইজ্ঞে পেরস্তুত।”
“নেংটি ইঁদুর তিনখান।”
“আইজ্ঞে ধাড়ি হলে চলবে না?”
“চলবে, এক গণ্ডা লাগবে।”
“বাঁশের কোড়ল।”
“আইজ্ঞে পের…”
“ফাটা কুড়োল।”
“আইজ্ঞে পে…”
ঝাড়নতাড়ন ক্রমশই এত তাড়াতাড়ি ফিরিস্তি দিচ্ছিল আর হাওয়ায় খামচাখামচি করছিল যে ভয়ে ধনবানের গলা ভালো খুলছিল না, তাই গুনিনকে পুরোপুরি সম্মান দেবার সময় পাচ্ছিল না ও।
“শটির পালো।”
“আইজ্ঞে…”
“মোমের আলো।”
“আইগ…”
“বেতের ঝুড়ি।”
“আই…”
“চিঁড়ে-মুড়ি।”
“আ…”
“দু-কাঠা ধান।”
“ও…”
“ছ’বিড়ে পান।”
ধনবান হাঁপিয়ে গেছে দেখে ঝাড়নতাড়ন সদয় হয়ে বলল, “ব্যস, হয়ে এসেছে। আর মাত্র দুটো জিনিস লাগবে। তোমার যা অবস্থা, একবার সম্মান জানালেই চলবে।” এই বলে ঝাড়নতাড়ন গড়গড় করে বলে গেল, “সিঁদুর, চোনা, গোবর/ তেল, ঘি আর মোহর।”
ঢোঁক গিলে ধনবান অনেক কষ্টে বলল, “আইজ্ঞে পের… পের… পেরস্তুত।”
ঝাড়নতাড়ন তার শেষ নির্দেশ জানাল, “কাল দেরব্য সামগ্রী জোগাড় যন্তর করে রাতের খাওয়া দিনে সেরে পিদিম জ্বালিয়ে জঙ্গলের বাইরের মাঠে ঈশান কোণে রাত এক পহর হলে অপেক্ষা কোরো। আমি আসব।”
“পেরস্তুত।”
ঝাড়নতাড়ন ধমক দিয়ে বলল, “পেরস্তুত-টেরস্তুত নয়। বলো, ‘আইজ্ঞে, আপনের পিরতিক্ষায় বসি থাকব। ওঝার সঙ্গে কথা বলতে শেখোনি দেখছি।”
কাঁচুমাঁচু মুখে ধনবান বলল, “আইজ্ঞে, নিজগুণে ক্ষমা করবেন।”
ওঝা খুব খুশি হয়ে বলল, “নিশ্চয়ই করব। কিছু ভেবো না, আমার মন্তরের এমন তেজ, দশ হাত মাটির নীচ থেকে তোমার ছেইলেরা বাপ বাপ বলে বেইরিয়ে আসবে। হ্যাঁ, এবার বাড়িমুখো হও। সারাদিন অনেক ধকল গেছে, এবার একটু জিরাম করে নিই।”
ঝাড়নতাড়ন ‘গড়গড় হু-উ-উস’ বলে ঢেকুর আর হাই মিলিয়ে একটা বিদঘুটে শব্দ করতে ধনবান উঠে দাঁড়াল।
তিন
পরদিন রাত এক প্রহরে ঝাড়নতাড়ন জঙ্গলের কিনারায় একটা হেতাল গাছের নীচে উটকো হয়ে বসে ‘দেরব্য সামগ্রী’ সাজিয়ে পুজো করতে বসল। একটু আগেই সে পুকুরে নেমে গায়ে খানিকটা পচা দুর্গন্ধময় পাঁক মেখে শুদ্ধ হয়ে নিয়েছে। নেংটি ইঁদুর তিনটে হেতালের ডালে ঝুলিয়ে দিয়ে, কঞ্জুসের ভিটের মাটিতে পনেরো কলশি জল বসিয়ে, শুকনো লংকা, রাই সরষে মোমের আলোতে পুড়িয়ে, ইঁদুরের লেজে ধুয়ো দিয়ে, ফাটা কুড়োলের ওপর বাঁশের কোড়ল আর শটির পালো বেঁটে, তেল-সিঁদুর মিশিয়ে ধনবানের কপালে একটা কচ্ছপের আর নিজের কপালে গোখরো সাপের ছবি এঁকে নিয়ে, দক্ষিণার টাকাটি ট্যাঁকে গুঁজে, গোরুর চোনায় আচমন সেরে ঝাড়নতাড়ন শেষ পর্যন্ত উঠে দাঁড়াল। আধপোড়া তিনটে নেংটি ইঁদুরের লেজ বাঁহাতের তিন আঙুলে জড়িয়ে আংটির মতো করে বেঁধে নিয়ে নানারকম হিজিবিজি লেখাজোখা, ছবি আঁকা ছোট্ট একটা পেতলের বাটি ডানহাতের তালুতে রেখে ঝাড়নতাড়ন ধনবান আর তার বউকে বলল, “নাও, তোমরা এবার গুনে গুনে পঞ্চাশ পা পিছনে সরে যাও, এমন জোরে বাটি চালান দেব যে বাটির হাওয়া লেগে মাথা ঘুরে পড়ে যাবে। জেনে-শুইনে বিপদ ডাকার কী দরকার, অ্যাঁ?”
ধনবান আর ওর বউ সভয়ে পিছনে সরে গেলে মাথার বেণী দুলিয়ে, নাক ফুলিয়ে, কপাল কুঁচকে, চিবুক উঁচিয়ে ঝাড়নতাড়ন এবার তার বাটি চালাবার ভয়াবহ মন্ত্র পড়ল—
“অং বং চং ঘিরি ঘিরি ঘ্যাং,
খটখটাং ঘিঙ্কি ঘিঙ্কি,
খুশকু খুশকু মাছি চ্যাং ব্যাং,
ভূতপ্রেত দানো ভিঙ্কি পিঙ্কি।”
তারপর গুরুর নাম নিয়ে ঝাড়নতাড়ন হাওয়ায় বাটি ছাড়ল।—
“বাটির আগে পোটকা গোঁসাই, পিছে ঝাড়নতাড়ন,
বাটি ছুটবে হাওয়ার আগে, শুনবে নাকো বারণ।
বোম্মা বিষ্ণুর দাঁতকপাটি, শিবের ছেঁড়ে জটা,
দাস্ত লেগে হাজার ভূতে মরে যে চটপটা।
গাড়ু হাতে বেম্মোদত্তি মাঠের পানে ছোটে,
শাকচুন্নি ডিগবাজি খায় দু-হাত চেপে পেটে।
যা বাটি ধরে আন ধনবানের ছা,
ঘড়া ঘড়া মোহর নিয়ে তবে ছাড়বি গাঁ।”
ঘড়া ঘড়া মোহরের লোভে ঝাড়নতাড়নের বাটি ছুটল ধনবানের ছা’দের ধরে আনবার জন্য। তখন জঙ্গলের মধ্যে শ্যাওড়া গাছের মগডালে পেতোভূত আর মেটোভূত সারাদিন পচা পাতা আর কেঁচো মাটি খেয়ে ঝিমুচ্ছিল। ঝাড়নতাড়নের মন্ত্রপূত বাটি তাদের সুমুখ দিয়ে সাঁ করে বেরিয়ে যেতে বাটির হাওয়া লেগে দুজনে ঝুনো নারকেলের মতো ঢিপ করে মাটিতে পড়ে ‘বাঁবা রে গেঁছি রে, পেঁতো রে মেঁটো রে’ বলে পেট চেপে ধরে গড়াগড়ি খেতে লাগল।
চার
ওদিকে জঙ্গলের ও-পারে যে জঙ্গল, তার পরে যে জঙ্গল, সেই জঙ্গলে যে পোড়ো বাড়ি, সেই পোড়ো বাড়ির মধ্যে বসে যে লম্বা দাড়ি, বিশালদেহী কাপালিক তাঁর ডান কনুইয়ের নীচে চুলকোতে শুরু করলে চোখ বুজে ধ্যানযোগে ঠিক বুঝতে পারলেন, উত্তরদিক থেকে ঘণ্টায় তিরিশ মাইল বেগে বাটি আসছে ছেলে দুটোকে পাকড়াও করতে। কাপালিক অমনি উঠে দাঁড়িয়ে ঢবঢবে ভরাট গলায় বললেন, “নিকষান্তরান্তরেন যাবদ্ভিঃ। কে এই দুর্বিনীত অর্বাচীন হঠকারী মানব যে বনস্থলীর বায়ু কুপিত করার স্পর্ধা দেখায়?” এই বলে তিনি হাঁক দিলেন, “ঘ্রাঘনখ! নিকৃষ্ট করোটি আর পূজার সামগ্রী অত্র আনয়ন করো।”
ঘোড়ার মতো লম্বা চোয়াল, বড়ো বড়ো নখ, প্যাঁকাটির মতো শরীর আর গড়ের মাঠের মতো বিশাল টাক নিয়ে ঘ্রাঘনখ গোমড়া মুখে একটা তামার পাত্র কাপালিকের সামনে এনে হাজির করল, যার ওপর রাখা ছিল একটা চড়ুইয়ের মাথার খুলি। থালায় আরও সাজানো ছিল খুব ছোটো একটি ঘণ্টা, একটা লাল জবাফুল, একটা শুকনো রক্তচন্দনের বড়ি, দু-গাছ দুব্বো, একটা বেলপাতা, খুদে কোশাকুশি, হোমিওপ্যাথি শিশিতে এক ড্রাম ছাগরক্ত, আরও দু-চারটে টুকিটাকি পুজোর সামগ্রী। ঘ্রাঘনখের প্রশস্ত টাকের ওপর চড়ুইয়ের খুলিটা বসিয়ে দিয়ে খুদে কোশায় হোমিওপ্যাথির শিশি থেকে ছাগরক্ত ঢেলে, বাঁহাতে টুং টুং করে খুদে ঘণ্টা নেড়ে, ডানহাতে দুব্বো, ফুল, বেলপাতা, চন্দন আর কুশি দিয়ে ছাগরক্ত ছিটিয়ে বম বম শব্দে তিরিশ সেকেন্ডে মিনিপুজো সারলেন কাপালিক। তারপর মন্ত্রপূত চড়াইয়ের খুলিকে স্পর্শ করে কাপালিক ছোট্ট পুজোর পরে একটি ছোট্ট মন্ত্র পড়লেন—
“ঘ্রিং হ্রীং ফট
ধাও চটপট
শুষ্কং শুষ্কং তিড়িং তিড়িং
ফেরাও বাটি তড়িং ঘড়িং।”
মন্ত্রের জোরে চড়ুইয়ের খুলি ঘ্রাঘনখের টাক থেকে হাওয়ায় উঠল ঠিক যেমন হাওয়াই আড্ডাতে উড়োজাহাজ ওঠে, তারপর খোলা জানালা দিয়ে সেই চড়ুইয়ের খুলি সাঁ করে পঞ্চাশ মাইল বেগে ছুটে গিয়ে ঝাড়নতাড়নের বাটিকে মাঝপথে ঠং করে এমন একখানা ধাক্কা মারল যে বাটি পঁচিশ মাইল বেগে উলটোদিকে ছুটল।
বাটি তার টাক ছাড়তেই ঘ্রাঘনখ যে ফিক করে একটু হাসল, সেটা দেখার মতো।
একটু আগে ঝাড়নতাড়নের বাটির হাওয়ায় শ্যাওড়া গাছ থেকে মাটিতে পড়ে গড়াগড়ি খেয়ে পেতো ভূত আর মেটো ভূত সবে সুস্থির হয়ে উঠে বসেছে, এমন সময় দেখল, ওদের মাথার ওপর দিয়ে গোঁ গোঁ শব্দে ডানাভাঙা চিলের মতো ঝাড়নতাড়নের বাটি ফিরে যাচ্ছে গাঁয়ের দিকে। তাই দেখে পেতো মেটোকে বলল, “এঁবার দুঁই ওঁস্তাদের লঁড়াই শুঁরু হঁল।”
মেটো কাব্যি করে বলল, “কীঁ হঁয় কী হঁয় রঁণে জঁয় পঁরাজঁয়।”
তারপর তারা দুইজনে হাত-পা ছড়িয়ে শলাপরামর্শ করতে বসল এই দুই ওস্তাদের লড়াইয়ের মাঝখানে পড়ে বেঘোরে প্রাণ যাবার আগে এই জঙ্গল ছেড়ে অন্য কোনও জঙ্গলে গিয়ে আস্তানা গাড়বে কি না।
ওদিকে বাটি চালান দিয়ে ঝাড়নতাড়ন সবে তার ঝুলির মধ্য থেকে গাঁজার কলকেটি বের করে ধনবান আর তার সাঙ্গপাঙ্গদের হাঁক দিয়েছে, “ওহে, মুড়ি-চিঁড়ে বাটিতে সাজিয়ে রাখো। তোমার ব্যাটারা ক’দিন না খেয়ে আছে কে জানে। এসেই তো খেতে চাইবে, তখন এট্টা কিছু খাতি দিতি হবে, তখন…”
মুখের কথা শেষ হবার আগেই চড়ুইয়ের খুলির ঠোক্কর খেয়ে ঝাড়নতাড়নের বাটি ফিরে এসে তারই তলপেটে এমন জোরে গুঁতো মারল যে ঝাড়নতাড়ন একেবারে সাজানো পনেরো কলশি জলের ওপরে হুমড়ি খেয়ে পড়ে জলে কাদায় লটরপটর হয়ে উঠে বসে হাতজোড় করে মাথায় ঠেকিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে, “ক্ষ্যামা করবেন পোটকা গোঁসাই, আর কখনও এমনটি হবেনি। পিত্যেক শনিবার আপনার থানে ফুল-জল দিয়ে, পিদিম জ্বেলে তবে অন্ন গেরহন করব।”
তারপর উঠে ফিরে দাঁড়িয়ে ধনবান এবং তার লোকজনদের বলল, “দেখলে তো তোমরা আমার গুরু পোটকা গোঁসাই বাটি ফির্যে দেছেন। গত শনিবার ওনার থানে ফুল-জল দিয়ে পিদিম জ্বালাতে ভুলে গেছলাম, তাই না গোঁসাই এমন শিসখা দিলেন। এই না হলে গুরু। কথায় বলে না, গুরুর মার দুনিয়ার বার! আর কী, এখন আর কিছু করা যাবে না, এবার তোমরা সব ঘরে গিয়ে ঘুমোও। কাল শনিবার গুরু গোঁসাইর থানে পিদিম দিয়ে দোষ কাটিয়ে পরশু এসে বাটি চালান দেব। তখন দেখবে বাটির তেজ।”
এই বলে ঝাড়নতাড়ন গাঁজার কলকে ট্যাঁকে গুঁজে, ধনবানের ছেলেদের খাওয়ার জন্য আনানো বড়ো এক ধামা চিঁড়ে-মুড়ি, কলা, মিষ্টি মাথায় তুলে কারও কিছু বলার আগেই বড়ো বড়ো পা ফেলে অন্ধকারে মিশে গেল।
ঝাড়নতাড়ন সেই যে পোটকা গোঁসাইর থানে পিদিম দিতে গেল, আর গোক্ষুর গাঁয়ে ফিরে এল না। সব শুনে ধনবানের গিন্নি শোকে দুঃখে অন্নজল ত্যাগ করল।
পাঁচ
জঙ্গলের পর জঙ্গল, তার পরে জঙ্গল, তার পরে আরও জঙ্গল। সেই জঙ্গলের মধ্যে ভাঙা, ইট-খসা ভূতুড়ে বাড়ির মেঝের নীচে একটা ছোট্ট ঘরে ধনমান আর ধনরাজ বন্দি। তাদের খাওয়াদাওয়া দেয় ঘ্রাঘনখ দেয়ালের গায়ে একটা ছোটো ফোকরের মধ্য দিয়ে। সকালে দই-চিঁড়ে-আম-কলা, দুপুরে পোলাও, রাত্রে পায়েস। ধানু-রাজু পাঠশালার নাছোড়বান্দা নামতাবাজ মাস্টার চিন্তামণি চক্কোত্তির হাত থেকে ছাড়া পেয়ে আর দই, খই, আম, কলা, পোলাও, পায়েস খেয়ে এত খুশি যে ওদের লুকিয়ে গুড় খাওয়ার জন্য আর পড়াশুনা না করার জন্য কানমলা দেয় যে বাপ, খেতে বসে ভাত ছোড়াছুড়ি করলে বকে যে সেই মা— ওদের সব্বাইকে একরকম ভুলেই যায়।
সন্ধ্যার দিকে বিশালদেহী, লাল রঙের কাপড় পরা কাপালিক তাঁর লম্বা দাড়িতে চিরুনি বোলাতে বোলাতে ওদের কামরায় ঢোকেন, সঙ্গে মোমবাতি হাতে বিশাল ভুঁড়ির ওপর পৈতে ঝুলিয়ে ঢোকে সেই ক্রমার্ক, যে প্রথম রাত্রে ওদের জন্য দরজা খুলে দিয়েছিল। একটা তিন পায়া উঁচু টুলে কাপালিক এসে বসেন। তারপর মিষ্টি হেসে ধানু-রাজুকে ডেকে বলেন, “দ্বিপ্রাহরিক আহারে কোনও ক্লেশ অনুভব হয়নি তো তোমাদের?”
ক্রমার্ক কাপালিকের দোভাষীর কাজ করে— “দুপুরে খেতে কোনও অসুবিধে হয়নি তো?”
ধানু-রাজু মাথা নেড়ে জানায় তাদের কোনও অসুবিধে হয়নি, শুধু লালচে সৈন্ধব নুনের জায়গায় সাদা নুন পেলেই তাঁরা খুশি হয়। কাপালিক দাড়ি আঁচড়াতে আঁচড়াতে বলেন, “এই প্রস্তাব বর্তমান অবস্থায় গ্রহণীয় নয়।”
ধানু-রাজু কারণ জানতে চাইলে কাপালিক গম্ভীরভাবে জবাব দেন, “নসিভ্যামভস।”
এত সাধারণ প্রশ্নের এত গম্ভীর উত্তর পেয়ে ধানু-রাজু চুপ হয়ে যায়।
কাপালিক এবার পৈতেওয়ালা পেটমোটা লোকটাকে বলেন, “ক্রমার্ক, বালকদের দাঁড় করিয়ে উত্তমরূপে পর্যবেক্ষণ করো।”
ক্রমার্ক দুজনকে পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে দিয়ে কাছে গিয়ে হাতের আঙুল থেকে শুরু করে পায়ের নখ পর্যন্ত খুঁটিয়ে, টিপে-টুপে দেখে নিয়ে বলে, “গুরুদেব, বালকদ্বয় অক্ষত, পূর্ণাঙ্গ ও ত্রুটিহীন।”
কাপালিক খুশি হয়ে বলেন, “অতি উত্তম, অতি উত্তম।”
কাপালিক তাদের শরীরের এত যত্ন নিচ্ছেন দেখে ধানু-রাজু বেশ বিরক্ত হয়ে ক্রমার্ককে বলে, “রোজ রোজ দেখার এত কী আছে বাপু বুঝি না। আমরা কি কুকুরছানা বেড়ালছানা যে রোজ একবার করে কতটা মোটা হলাম, ক’টা দাঁত-নখ উঠল দেখতে হবে?”
ক্রমার্ক একবার কাপালিকের দিকে তাকাতেই কাপালিক হেসে বলেন, “ভো ক্রিকেটপ্রিয় বালকাঃ, চর্মাবৃত কাষ্ঠগোলক ক্ষেপণে পারঙ্গম কিংবা উইকেটাগ্রে প্রথম যষ্টিধারী হবার প্রশিক্ষণে অভিষেকের পূর্বে নানাবিধ সংযম অতি আবশ্যক। নিরামিষ আহার, মিতভাষণ, সুস্থ, অক্ষত দেহ ধারণ, ক্ষুদ্র অর্গলবদ্ধ প্রায়ান্ধকার কক্ষে জীবন যাপন এবং পরিমিত মাংসপেশি চালন।”
যে রাতে ক্রমার্ক ধানু-রাজুকে মাটির নীচে এই ছোটো কুঠুরিটায় এনে ঢুকিয়েছিল, আর দুজন সারারাত ধরে খুব কান্নকাটি করেছিল, তার পরদিন সকালেই কাপালিক এসে ক্রমার্কের মুখ দিয়ে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে বর্তমান ভারতীয় ক্রিকেটে ফাস্ট বোলার আর ওপেনিং ব্যাটসম্যানের যে ভয়াবহ আকাল চলছে, তারই জন্যে ভারতের রাষ্ট্রপতির বিশেষ অনুরোধে কাপালিক দুটি ক্রিকেটপ্রিয় বালককে দুই পক্ষকাল শুদ্ধভাবে ব্রহ্মচর্য পালন করিয়ে অমাবস্যার রাত্রে কালী মন্দিরে বিশেষ পুজার পর ওদের অভিষেক করিয়ে ভারতের ক্রীড়ামন্ত্রী ঘিয়া সিং বাইগনের করকমলে অর্পণ করবেন। পূজা এবং অভিষেক ইত্যাদির দ্বারা তাদের সাফল্য সুনিশ্চিত হয়ে গেলে ঘিয়া সিং বাইগনের বিশেষ কিছুই করার থাকবে না, তিনি শুধু ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের সভাপতি ভিন্ডি সিং টিন্ডা ও রাষ্ট্রপতির অনুমোদন নিয়ে উড়োজাহাজে উঠিয়ে ধানু-রাজুকে পাঠিয়ে দেবেন দুনিয়ার সব ঝানু ক্রিকেট খেলোয়াড়দের বাণপ্রস্থ প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যস্থিত ছোট্ট দ্বীপ ক্রিকেট আইল্যান্ডে, যেখানে থাকেন সেইসব মধ্যবয়স্ক বা বৃদ্ধ ক্রিকেট খেলোয়াড়রা, যাঁরা টেস্ট ক্রিকেটে কমপক্ষে দশটি সেঞ্চুরি, বিশটি হাফ সেঞ্চুরি, কুড়িটি ক্যাচ, দশটি স্টাম্প আউট আর ত্রিশটি নো বল করার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন। ক্রিকেট আইল্যান্ডে ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রাক্তন ফাস্ট বোলার ভিলবার্ট র্যামহারি আর অস্ট্রেলিয়ার প্রখ্যাত ন্যাটা ব্যাটসম্যান পিটার ফার্টের তত্ত্বাবধানে তিন বছর শিক্ষানবিশ থেকে বল-ব্যাটের সবরকম প্যাঁচ-পাঁয়তারা শিখে এলে ভারতীয় ক্রিকেট টিমে তেরো নম্বর এবং চোদ্দ নম্বর খেলোয়াড় হিসেবে তাদের জায়গা করে দেওয়া হবে।
সব শুনে ধানু-রাজু তো থ! কোথায় গোক্ষুর আর কোথায় ক্রিকেট আইল্যান্ড! কোথায় নেতাজি আর কোথায় পেঁয়াজি। দুই হাত তুলে তক্ষুনি দু-ভাই ‘ভারত ক্রিকেটে পুনঃ আসিবে সুদিন’ গাইতে লাগল আর তাই শুনে ক্রমার্ক তার পৈতে দিয়ে ভুঁড়ি চাঁছতে চাঁছতে কুঠুরির বাইরে এসে দরজায় তালা লাগিয়ে কাপালিককে গিয়ে সব জানালে কাপালিক খুশি হয়ে বলেছিলেন, “কিমাশ্চর্যঅতঃপরম।”
তারপর দাড়িতে হাত বুলিয়ে মুচকি হেসে কাপালিক ক্রমার্ককে বলেছিলেন, “ভো ক্রমার্ক! দুই পক্ষকাল পর অমাবস্যার রাত্রে মা ছিন্নমস্তার ইচ্ছায় এদের মস্তকদ্বয় স্কন্ধচ্যুত করে দেবীর পায়ে সমর্পণ করে আমি দ্বিগুণ ক্ষমতার অধিকারী হব। তদবধি এদের প্রাক-বলি জীবনে অভ্যস্ত করাও।”
ক্রমার্ক বলল, “আপনার যথা অভিরুচি। কিন্তু তান্ত্রিকশ্রেষ্ঠ, অন্তত বিকেলে আধঘণ্টা একবার ক্রিকেট খেলতে না দিলে ওরা যে দু-দিনে পাগল হয়ে যাবে। নিজেদের মধ্যে মারামারি করে, দেয়ালে মাথা-টাথা ঠুকে…”
কাপালিক সভয়ে বললেন, “কিন্তু ক্রিকেটীয় পরিবেশ রচনার প্রয়োজনীয় সাজসরঞ্জাম তুমি কোথায় পাবে, ক্রমার্ক? কোথায় পাবে সেই চর্মাবৃত গোলক? কোথায় পাবে গোলকের গতিরোধকারী ঘাত-সহ সেই বিশেষ ধরনের দণ্ড?”
ক্রমার্ক অভয় দিয়ে বলল, “কাপালিকচূড়ামণি, আপনি সে-বিষয়ে চিন্তিত হবেন না। পুরোনো একটা উপাধানের বক্ষে নির্মমভাবে ছুরিকাঘাত করে তুলা নিষ্কাশন করে বহুপূর্বে মৃত একটি মার্জারের চর্মে আবৃত করে বল তৈরি করে নেব আমি। তুলোর বল দেহ বা মুখমণ্ডলে—যেখানেই আঘাত করুক, কোনও প্রতিক্রিয়া হবে না। আর দুই ক্রোশ দূরে নদীর ঘাটে ধীবররা যে বিশেষ লগুড় দিয়ে কাপড় পিটিয়ে ময়লা নিষ্কাশিত করে, তার সঙ্গে ক্রিকেট ব্যাটের সাদৃশ্য অনুধাবনযোগ্য। আপনার অনুমতি পেলে তারই একটি সংগ্রহ করায় কোনও বাধা দেখি না। আর রান্নার জন্য যে কাষ্ঠ সংগ্রহ করে রেখেছি, তার থেকে ছয়খানা সরল ঋজু আড়াই হাত পরিমাণ দণ্ড বের করে স্টাম্প তৈরি করাও শক্ত হবে না।”
খুশি হয়ে কাপালিক বললেন, “ভো ক্রমার্ক, তোমার মস্তিষ্ক সত্যিই খুব উর্বর। তোমার বাচনভঙ্গিও যথেষ্ট উন্নত। অবিলম্বে তোমাকে সম্মোহন শিক্ষার প্রথম পাঠ দেব। তুমি কালক্ষেপ না করে বালকদ্বয়ের জন্য ক্রিকেটীয় পরিবেশ রচনায় যত্নবান হও।”
ঘ্রাঘনখ আর ক্রমার্ককে গত পাঁচ বছরে কাপালিক আরও বেশ কয়েকবার সম্মোহন আর বশীকরণ শেখাবেন বলে আশা দেখিয়েছেন, কিন্তু ওদের বাচনভঙ্গি যথেষ্ট উন্নত না হওয়ায় এ-যাবৎ তাদের কিছুই শেখানো হয়নি। সম্মোহন, বশীকরণ শেখার লোভে দেখতে দেখতে তারা দুজনেই অন্তত কাপালিকের সামনে ভাতকে অন্ন, মাছকে মৎস্য, বেগুনকে বার্তাকু, গাছকে বৃক্ষ ইত্যাদি বলতে অভ্যাস করেছে। তারা এখন আর ভাত খায় না, অন্ন গ্রহণ করে; শোয় না, নিদ্রাদেবীর শরণাপন্ন হয়; গাছে ওঠে না, বৃক্ষে আরোহণ করে; কথা বলে না, বাক্যস্ফূর্তি ঘটায়; বসে না, উপবেশন করে।
কাপালিক শেষ পর্যন্ত তাকে সম্মোহন শেখাবে জানতে পেরে ক্রমার্ক খুশিতে ডগমগ হয়ে কাপালিককে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে উঠে দাঁড়িয়ে পৈতে দিয়ে পিঠের ঘাম আর বুকের ধুলো একসঙ্গে চাঁছতে চাঁছতে মনের খুশিতে হাত-পা ছুড়ে বলতে লাগল, “কাপালিকশ্রেষ্ঠ, আমি যৎপরোনাস্তি আহ্লাদিত হয়েছি। পক্ষ বিস্তার করে বিহঙ্গের মতো গগনে উড্ডীন হবার আকাঙ্ক্ষা বোধ করছি। ময়ূরের মতো পেখম মেলে নৃত্য করতে ইচ্ছে করছে। বর্ষা সমাগমে মত্ত দাদুরীর মতো কণ্ঠ ফুলিয়ে ঘ্যাঙর ঘ্যাঙর ঘ্যাং করে গৃহস্থের বিরক্তি উৎপাদন করতে প্রলোভন হচ্ছে। শাখামৃগের মতো বনের শাখায় লাঙ্গুল সঞ্চালনপূর্বক ক্ষিপ্রগতিতে বিচরণ করার বাসনা জাগছে। গভীর অরণ্যে বন্য শূকর নখ-দন্ত আর নাসাগ্রে মৃত্তিকা স্তর ভেদ করে কন্দমূল আবিষ্কার করার আনন্দে যেমন ঘোঁত ঘোঁত শব্দে বনভূমি প্রকম্পিত করে, আমারও সেইরূপ…”
কাপালিক দেখলেন ক্রমার্কের বাচনভঙ্গি ক্রমশই এত উন্নত হচ্ছে যে এরপর তার সঙ্গে কথা বলা তাঁর পক্ষে বেশ মুশকিল হয়ে দাঁড়াবে। গম্ভীরভাবে হাত তুলে তিনি ক্রমার্ককে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “তিষ্ঠ ক্রমার্ক, এ অব্রাহ্মণসুলভ প্রগলভতা অশোভনীয় এবং অমার্জনীয়। আমার মনে হচ্ছে আমার নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে চতুর্দশীতে পুনঃ পুনঃ পূতিকা ভক্ষণ করে তোমার পিত্ত কুপিত হয়েছে। এমতাবস্থায় অবিলম্বে অশ্বনিম্বের পত্র অমলতাসের দণ্ডিকা চূর্ণের সঙ্গে উত্তমরূপে মিশ্রিত করে গোমূত্র অনুপানের দ্বারা অল্প মাত্রায় দিনে তিনবার তিন মাস ধরে সেবন করে আরোগ্যলাভ করতে যত্নবান হও। বিশালবপু বিপ্র আহারে বিহারে, শয়নে ভোজনে সংযমী হও। সংযম শিক্ষাই সর্ব শিক্ষার মূল।”
এই উপদেশ দিয়ে দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে কাপালিক চলে গেলেন আর ক্রমার্ক এক হাত ভুঁড়িতে, এক হাত মাথায় দিয়ে থপ করে মেঝেতে বসে এতদিনের পরিশ্রম করে শেখা উন্নত বাচনভঙ্গি ভুলে চোখ বড়ো করে পরিষ্কার ফরিদপুরের বাঙাল ভাষায় মন খুলে গালি দিল, “হালার পো হালা ঢ্যামনা, আমার প্যাট দ্যাইখা তর চক্ষু টাডায়, অ্যাঁ? খাড়া, তরে যদি আমি ঢিট না করসি তো আমার নাম… কেরমারকো কাইট্যা ফুডাঘডি রাইখ্যা দিস।”
কিন্তু মুখে যাই বলুক, ক্রমার্ক আশাবাদী মানুষ, তার দায়িত্বজ্ঞানও কম নয়। কে বলতে পারে ছেলে দুটিকে অক্ষত অবস্থায় আগামী অমাবস্যার রাতে হাড়িকাঠে পৌঁছে দিতে পারলে খুশি হয়ে কাপালিক হয়তো শেষ পর্যন্ত তাকে সম্মোহন শিখিয়ে দেবেন। আর একবার সম্মোহন শিখলে… ভাবতে ভাবতে সে এত উত্তেজিত হয়ে পড়ে যে আনন্দে তার ভুঁড়িতে তিনখানা টোল খায়। মনের দুঃখকষ্ট ঝেড়ে ফেলে সে সোৎসাহে কাপালিকের নির্দেশমতো ক্রিকেটীয় পরিবেশ রচনায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
ছয়
ওদিকে গিন্নির অবস্থা দেখে ধনবান আর বসে থাকতে সাহস পেল না। গাঁয়ের লোকে বলল, ‘পয়সাহাটির থানায় গিয়ে পুলিশে খবর দাও।’ ধনবান এক সকালে গোরুর গাড়ি ভাড়া করে গোক্ষুর থেকে পনেরো মাইল দূরে পয়সাহাটিতে পুলিশ থানায় গিয়ে উপস্থিত হল। ওখানে গিয়ে ধনবান শুনতে পেল, চেয়ার-টেবিলে বসেন না পুলিশের ছোটো কর্তা। তিনি একজন ছোটোখাটো জমিদার মনে করেন নিজেকে, আর সে কারণেই চেয়ার-টেবিলে বসে কাজ করেন না তিনি, তক্তপোশে বসে আলবোলার নল মুখে দিয়ে অভিযোগকারীদের নিজের আশ্রিত প্রজা মনে করে সেভাবেই তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলেন।
ধনবান দেখল, থানার সামনে বিশাল লম্বা লাইন। ধান, পাট, গোরু, ছাগল, ফল, মাছ চুরি থেকে জমি নিয়ে মারামারি— সবরকমের অভিযোগ করতে এসেছে দশ গ্রামের লোক। পাক্কা দু-ঘণ্টা ঠায় রোদ্দুরে দাঁড়াবার পর থানার চাপরাশি এসে ধনবানের কানের কাছে মুখ নিয়ে জানাল, একটা টাকা তার হাতে গুঁজে দিলে সে পিছনের দরজা দিয়ে পুলিশের ছোটো কর্তার সঙ্গে চটপট দেখা করিয়ে দিতে পারে। রোদ্দুরে দাঁড়িয়ে থেকে গামছা দিয়ে ঘাম মুছে আর কাছের একটা কুয়োর জল খেয়ে ধনবান তখন হাঁসফাঁস করছিল। চাপরাশির কথামতো একটা টাকা খরচ করে সে থানার পিছন দিকে গিয়ে একটা ছোটো গরাদ ভাঙা জানালার মধ্য দিয়ে মাথা গলিয়ে দিলে ও-পাশ থেকে আর একজন চাপরাশি হ্যাঁচকা টানে তাকে ভিতরে নিয়ে গেল। চাপরাশির দয়ায় সেখানে এক টাকা ঘুষ দিয়ে পিছনের জানালা টপকে ভেতরে ঢোকা পনেরো জনের একটা ছোটো লাইন ইতোমধ্যেই দাঁড়িয়ে গেছে। ফার্স্ট বয় হতে না পেরে ধনবান ব্যাজার মুখে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর তার সামনে দাঁড়ানো টাকমাথা, খোঁচা খোঁচা দাড়িগোঁফওয়ালা লোকটার সঙ্গে খেজুরে আলাপ শুরু করে দিল। টেকো লোকটা জানাল, তার পানের বরজে যে পটলের চাষ হয়, সেই পটল প্রায়ই চুরি হয় বলে সে নালিশ জানাতে এসেছে। ধনবান দেখতে পেল, ওর সামনে যারা দাঁড়িয়ে আছে, তাদের প্রত্যেকের হাতেই একটা করে থলে অথবা ডালা, ঝুড়ি এমনকি খালুই। টেকো লোকটাকে জিজ্ঞেস করে সে জানতে পারল, ছোটো কর্তার ঘরে ঢুকলে নমস্কার করে ‘আইজ্ঞে আপনার গাছের আম, আইজ্ঞে আপনার পুকুরের মাছ…’ ইত্যাদি বলে সেলামি দেবার রেওয়াজ আছে। রেওয়াজ না মানলে কী হয় জানতে চাইলে টেকো লোকটা ভ্রূ কুঁচকে অনেক ভেবেচিন্তে শেষে উত্তর দিল, “বেরমান্ড উইল্টে যায়।”
চট করে সে একবার তার নিজের থলিটাতে হাত দিয়ে গাছের পটলগুলো ভালোভাবে টিপে দেখে নিয়ে ধনবানের শূন্য হাতের দিকে তাকিয়ে বলে, “তোমার মাঠে, গাছে, বাগানে, পুকুরে কি আগুন লেগেছে যে কিছুই হয় না? তা কিছুই যখন আনোনি বাপু, দুটো টাকা ধইরে দিয়ে বোলো, ‘আইজ্ঞে আপনার টাঁকশালের টাকা।’ তাতেই ছোটো কত্তা খুশি হবেন। ছোটো কত্তা ভালোমানুষ, যা পান তাতেই খুশি।”
ছোটো কত্তা যে শুধু ভালোমানুষই নয়, কাজেরও মানুষ, তা ধনবান টের পেয়ে গেল যেভাবে থলি আর ঝাঁকা হাতে গোমড়া মুখে লোকগুলো ছোটো কর্তার ঘরে ঢুকছিল আর মিনিট পাঁচেক পরে কান এঁটো করা হাসি মুখে নিয়ে বেরিয়ে আসছিল, তাই দেখে।
দেড় ঘণ্টা পর ধনবানের ডাক পড়ল ছোটো কর্তার কামরায়। ঘরে ঢুকবার মুখে ছোটো কর্তার চাপরাশি সেলামির কথাটা ধনবানকে মনে করিয়ে দিল। ঘরে ঢুকে ধনবান খক্কর খক করে কাশতে শুরু করল। কামরার মধ্যে একটা তক্তপোশের ওপর তাকিয়ায় হেলান দিয়ে খাকি হাফ প্যান্ট, শার্ট পড়ে চোখ বুজে ভুসভুস করে গড়গড়া টানছেন ছোটো কত্তা। দু-পাশে তকমা আঁটা দুই পিয়ন পাখার হাওয়া করছে সাহেবকে আর একজন তক্তপোশের একপাশে সেলামির জিনিসগুলো গুছিয়ে রাখছে। আর একজন চোখে চশমা আঁটা মুহুরি গোছের লোক লম্বা খাতা খুলে দোয়াত, কলমদানি, রুল, ব্লটিং পেপার এসব নিয়ে বসে। ছোটো কর্তার বিশাল ভুঁড়ি, কদমছাঁট চুল, কাছির মতো মোটা পাকানো গোঁফ, দু-গালে দুই পান, দুই হাতের ছ’আঙুলে সোনা আর লাল, নীল, সাদা পাথর বসানো আংটি, কানে গোঁজা আতর মাখানো তুলো।
দেখেশুনে ধনবান ভক্তিতে গদগদ হয়ে গেল। আহা, হাতে গড়গড়ার নলটির জায়গায় বাঁশিটি ধরিয়ে দিলে একেবারে যেন কলির কেষ্ট। ধনবানকে খালি হাতে ঘরে ঢুকতে দেখে ছোটো কর্তা ভুড়ুক করে গড়গড়া টেনে ভুস করে খানিকটা ধোঁয়া ছেড়ে ভ্রূ কুঁচকে একবার ধনবানের দিকে, একবার সেলামির জিনিস সামলাচ্ছিল যে পিয়ন, তার দিকে তাকালেন। ধনবান চটপট কোমরের গেঁজে থেকে দুটো টাকা বের করে ছোটো কর্তার সামনে রেখে বলল, “আইজ্ঞে, আপনার টাঁকশালের টাকা।”
ছোটো কর্তা চোখ কুঁচকে, মাথা কাত করে আড়চোখে বকপাখি যেভাবে বিলের জলে কুচো মাছ দেখে, তেমনিভাবে এক পলক দেখে নিয়ে বকের মতোই দু-আঙুল দিয়ে ছোঁ মেরে টাকা দুটো তুলে নিয়ে প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে বললেন, “আমার টাঁকশালের টাকা, অ্যাঁ? বাহ্ বেশ বেশ, চমৎকার বলেছ। বেড়ে বলেছ।”
ছোটো কর্তা ধনবানের কথা শুনে এত খুশি হন যে দু-গালের দু-খানা পান সামলে ‘উকলু খুকলু খুক’ শব্দ করে খুব সাবধানে একটু হেসে নেন। কিন্তু হাসির তোড়ে তার বাঁ গালের থেকে পান, সুপুরি, জর্দা বেশ খানিকটা ছিটকে গিয়ে সেলামি সামলে রাখছিল যে পিয়ন, তার ডান গালে, চিবুকের কাছে সেঁটে যায় আর ছোটো কর্তার ডান গালের পানের ছিটে লাগে গিয়ে মুহুরির চশমায়। তাই দেখে ছোটো কর্তার দু-পাশে দাঁড়িয়ে হাওয়া করছিল যে তকমা আঁটা দুই পিয়ন, তারাও খুকখুক খিকখিক করে হেসে উঠে ছোটো কর্তাকে হাওয়া করার কথা বেমালুম ভুলে নিজেদের হাওয়া করতে লাগল।
ধনবানও সবার সঙ্গে গলা মিলিয়ে একটু হিক হিক করে হেসে নিল। সে ভাবল, ছোটো কর্তা, পিয়নরা সবাই যখন খুশি তখন তার জোড়া ছেলে ড্যাডাং ড্যাং ড্যাডাং ড্যাং করে নাচতে নাচতে ফিরে এল বলে। হাফ প্যান্টের পকেট থেকে কোমরের সঙ্গে চেন দিয়ে বাঁধা ট্যাঁক ঘড়ি বের করে ছোটো কর্তা যখন দেখলেন সবাই পাক্কা পঁয়তাল্লিশ সেকেন্ড হেসে নিয়েছে, তখন পুরুষ্টু গোঁফে টোকা মের পান-সুপুরির কুচো ঝেড়ে ফেলে তাকিয়া ডানদিকে থেকে বাঁদিকে টেনে হেলান দিয়ে গড়গড়ায় গুড়ুক গুড়ুক ভুস শব্দ তুলে চোখ বুজে গম্ভীরভাবে বললেন, “সবাইকে আমি দু-মিনিট সময় দিই। তুমি আমাদের সবাইকে খুশি করেছ, তাই তোমাকে আড়াই মিনিট দিচ্ছি। নাও, চটপট বলো।”
ধনবান কোনোদিন ঘড়ির ধার ধারেনি, ঘড়ির হিসেব সে একেবারেই জানে না। সে ভাবল, তাকে যখন বেশি সময় দেওয়া হয়েছে, সে একটু খুলেই বলবে তার ছেলে হারানোর গল্প। তাই সে শুরু করল, “গোক্ষুর গাঁয়ে আমার একখানা গুড়ের দোকান আছে, হুজুর। এখো গুড়, খেজুরি গুড়, তালের গুড়, ভিড় গুড়, চিটে গুড়…”
ছোটো কর্তা চোখ বুজেই বললেন, “বুঝেছি, বুঝেছি। তা কবে তোমার গুড়ের আড়তে চোর ঢুকল সেইটে বলো।”
ধনবান বলল, “আজ্ঞে হুজুর, গুড়ের আড়তে চোর ঢুকতে যাবে কেন? চারপাশে দেড় হাত, নীচে ছ’হাত, ওপরে শালের খুঁটি পুঁতে চার বান টিন দিয়ে ঘিরে তার চারপাশে কাঁটাকুলের গাছ লাগিয়ে…”
ছোটো কর্তা রেগে বললেন, “কাট শর্ট অর গেট আউট।”
সেলামি গুছিয়ে রাখছিল যে লোকটা, সে ইংরেজির অনুবাদ করে বলল, “চটপট বলো নয়তো বেরোও এখান থেকে।”
তখন ধনবান জানাল, জঙ্গলের লাগোয়া মাঠে ক্রিকেট খেলার সময় জঙ্গলে ঢুকে বল খুঁজতে গিয়েছিল ওর দুই ছেলে। সেখান থেকেই দুই ছেলে নিখোঁজ হয়ে গেছে।
সেলামি নেওয়া লোকটা মুহুরিকে বলল, “দেখলে ভায়া, একেই বলে ইঞ্জিরির জোরে পেটের কথা টেনে বার করা। ক্ষ্যামতার দরকার।”
মুহুরি বলল, “যা বলেছ। ছোটো কর্তার মতো কাঁঠাল ফাটানো ইঞ্জিরি এ-দেশে ক’টা সুমুন্দির পো বলতে পারে বলো?”
খুশি হয়ে ছোটো কর্তা কান থেকে আতর ভেজানো তুলো নিয়ে গোঁফে বুলিয়ে মুহুরিমশাইকে বললেন, “মুহুরিমশাই, দেখো তো কবে আমার গোক্ষুর গাঁয়ে ইনভেস্টিগেশনের সময় হবে?”
লম্বাচওড়া মোটা খাতার পাতা উলটে মুহুরিমশাই বলল, “আজ্ঞে, আগামী শুক্রবারের পরের শুক্রবার বিকেল তিনটের আগে আপনার সময় হচ্ছে না।”
ছোটো কর্তা আতর ভেজানো তুলো কানের মধ্যে রেখে চিন্তিত মুখে গোঁফে তা দিয়ে বললেন, “তাই তো দেখছি, একেবারে ঠাসা অ্যাপয়েন্টমেন্ট। তা দেখো বাপু, কী নাম বললে তোমার? ধনবান? বাহ্, বেশ নাম। চেহারা আর হাবভাব দেখেই নামের অর্ধেকটা জেনে গিয়েছিলাম। দেখো বাপু ধনবান, আমার এনগেজমেন্ট তো শুনলে, এখন চটপট আমার টাঁকশালের তৈরি আরও কয়েকখানা ভালো নমুনা দেখাও দেখি। একটু তাড়াতাড়ি ইনভেস্টিগেশন করে না নিলে আবার তোমার ছেলে দুটো লাপাতা হয়ে যেতে পারে, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে তো। কী বলো তোমরা, অ্যাঁ?”
সেলামিমশাই, মুহুরিমশাই আর পিয়ন দুটো সমস্বরে বলে উঠল, “সে আর বলতে, হুজুর। সময়ে কাজ না করলে তার ভোগ সগ্গে গিয়েও ভুগতে হয়।”
সেলামিমশাই গম্ভীরভাবে বলল, “কথায় বলে, গোরু হারালে গোরু খুঁজে পাওয়া যায়, কিন্তু ছেলে হারালে…”
কিন্তু ছোটো কর্তার ভ্রূকুটি দেখে ও মাঝখানেই থেমে গেছে। সেলামিমশাই এবার চুপিচুপি ধনবানের গালে কুটুস করে একটা ছোট্ট চিমটি কেটে বলল, “কত্তা পাঁচ টাকা চাইছেন। চটপট বের করো, নইলে সব ভণ্ডুল হয়ে যাবে।”
ধনবান গোমড়া মুখে ট্যাঁক থেকে পাঁচ টাকার একটা নোট বের করে ছোটো কর্তার ভুঁড়ির সামনে রেখে বলল, “আপনার টাঁকশালের…”
ছোটো কর্তা ধনবানের মুখের কথা ছিনিয়ে নিয়ে বললেন, “বুঝেছি, আর কষ্ট করে পুরো বলতে হবে না।”
এবার আর দু-আঙুল দিয়ে নয়, পুরো পাঁচ আঙুলে নোটটা তুলে বুক পকেটে রেখে বললেন ছোটো কর্তা, “মুহুরিমশাই, আগামী বুধবার সকাল দশটায় গোক্ষুর লিখে রাখো।”
সাত
বুধবার সকাল দশটায় ছোটো কর্তা ভালো ঘোড়ায় আর পিছনে খাতাপত্র বগলে নিয়ে চাপরাশি একটা বেতো ঘোড়ায় করে গোক্ষুর গ্রামে ঢুকলেন। খবর পেয়ে ধনবান দোকান ছেড়ে ছুটল ছোটো কর্তাকে অভ্যর্থনা জানাতে।
ধনবানকে দেখে চাপরাশি খুশি হয়ে বলল, “যাক, তাড়াতাড়ি এসে গেছ দেখছি। এবার ছোটো কর্তার ঘোড়াকে এক টাকা আর আমার ঘোড়াকে এক আনা ঘোড়ানামুনি দিয়ে ভুঁয়ে নামাও। একদম দেরি করবে না, দেরি করলে আবার ঘোড়াদের মেজাজ বিগড়ে যাবে, মুখ ঘুরিয়ে থানার দিকে ছুট লাগাবে।”
ধনবান ঘোড়ানামুনির নাম কোনোদিন শোনেনি, তাই একবার ঘোড়াগুলোর দিকে তাকাল। দুটো ঘোড়াই শান্তভাবে দাঁড়িয়ে লেজ দোলাচ্ছে।
ছোটো কর্তা হাফ প্যান্টের পকেট থেকে কোমরের সঙ্গে চেনে বাঁধা ঘড়িটা দেখে বললেন, “আর দেরি নয়, ইনভেস্টিগেশনের কাজ শুরু করতে হবে চটপট। এখান থেকে আটঘড়া, তারপর বেতাল, তারপর ঘুঁটিয়ারা, তারপর…”
চাপরাশি বলল, “আজ্ঞে পাতাহাটি, আমড়াতলি আর খাগনা।”
ছোটো কর্তা বললেন, “এতগুলো গ্রামে ইনভেস্টিগেশন করতে হবে, বুঝলে? নাও, এবার চটপট আমার টাঁকশালের দু-খানা ছোটোখাটো নমুনা দেখিয়ে ঘোড়া দুটোকে ঠান্ডা করো।”
ধনবান গোমড়া মুখে ট্যাঁক থেকে খুতি বের করে সওয়া টাকা বের করলে ছোটো কর্তা আঙুলে ছোঁ মেরে টাকাটি তুলে পকেটে পুরে, ঘোড়ার পিঠে চিত হয়ে শুয়ে পড়ে ঘোড়ার লেজ ধরে পিছন দিক দিয়ে পিছলে ধপ করে মাটিতে নেমে ধনবানকে চমকে দিয়ে বললেন, “আগে এটা উডগোবিস্টান সাহেবের ঘোড়া ছিল। সাহেবি কায়দায় না নামলে এখনও ব্যাটা ভীষণ রেগে যায়।”
চাপরাশি এক আনা ঘোড়ানামুনি পেয়ে দিশি কায়দায় লাফ দিয়ে বেতো ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে বলল, “কত্তা, এস্পটে যাবেন তো?”
ছোটো কর্তা কান থেকে আতর ভেজানো তুলো নিয়ে গোঁফে বুলিয়ে নিয়ে চাপরাশিকে ধমকে দিয়ে বললেন, “এস্পট নয়, স্পট ইনভেস্টিগেশন। ইংরেজি জানো না, তবু বলা চাই। ইংরেজিতে উচ্চারণটাই হল আসল। কেন, সরেজমিনে তদন্ত বললেই পারো!”
চাপরাশি দুই কানে আঙুল ছুঁইয়ে বলে, “আজ্ঞে কত্তা, ভুল হয়ে গেছে, ক্ষমা করবেন। আপনার সঙ্গে থেকে থেকে ইংরেজি বলার এমন বদ অভ্যাস হয়ে গেছে যে বাড়িতে গিয়ে বউ-ছেলের সঙ্গে পর্যন্ত ভুলে ইংরেজি বলে ফেলি। বেচারারা এত ঘাবড়ে যায়, কী বলব। তা আপনি কোথায় বসবেন কত্তা যদি একটু বলে দেন তবে সেইরকম…”
ছোটো কর্তা বললেন, “এই আমগাছের নীচেই আমি বসব। চেয়ার-টেবিল নিয়ে এসো। দু-তিনরকমের ফল চাই, জল চাই আর ভালো বাঁশের একখানা কঞ্চি চাই। আমি এখানে আসবার আগে ভালোভাবে কেস স্টাডি করে নিয়েছি। এই গ্রামেই ধনবানের কোনও শত্রু আছে যে ছেলে দুটোকে হাপিস করে কোথাও আটকে রেখেছে। গ্রামের সবক’টা বদমাশ, স্কাউন্ড্রেল, ব্যাড ক্যারেক্টারকে ধরে নিয়ে এসো। ইনভেস্টিগেশন চটপট শুরু করে দিই। ইনভেস্টিগেশন ফি জমা দেবার জন্য আমার টেবিলে একটা বড়ো মাটির ঘট রেখে দাও।”
চাপরাশি গ্রামের পাঠশালা ছুটি করিয়ে দিয়ে পাঠাশালার ছেলেদের মাথায় চেয়ার-টেবিল চাপিয়ে, ফলের বাগান থেকে ইচ্ছেমতো লিচু, আম, কাঠাল, ডাব পাড়িয়ে আমগাছের নীচে ছোটো কর্তার ইনভেস্টিগেশনের পাক্কা বন্দোবস্ত করে দিল। কুমোরপাড়া থেকে ফি জমা নেবার বড়ো মাটির ঘটও এসে গেল। তারপর স্কাউন্ড্রেল, ব্যাড ক্যারেক্টারদের ধরবার জন্য বেতো ঘোড়ায় চেপে ছুটল গ্রামের মধ্যে। যেসব চাষাভুষো, কামার-কৈবর্ত, তাঁতি, মুচি, জোলা, তিলি গত দশ বছরের মধ্যে একবারও পুলিশের খাতায় ওঠেনি বা পুলিশকে পয়সা দেয়নি, তাদের গোরু-ছাগলের মতো ক্ষেত, বাগান, পুকুর, বাড়ি— যে যেখানে ছিল, সেখান থেকে তাড়িয়ে আমগাছের নীচে জড়ো করে লাইনে দাঁড় করিয়ে দিল। চাপরাশির আদেশে যারা এসে লাইনে দাঁড়িয়েছিল, তাদের মধ্যে পাপ্পর সিং, ঘর্ঘর সিং, ঘর্ঘর সিংয়ের ছেলে লাট্টু সিং, কাস্তেকোদাল কর্মকার, এমনকি পাঠশালা পালিয়ে জঙ্গলে পাখি দেখে বেড়ানো ভোদন্তও ছিল।
ছোটো কর্তা পানের জায়গায় দু-গালে দু-খানা করে লিচু পুরে কাগজ-কলম নিয়ে ইনভেস্টিগেশন শুরু করলেন।
চাপরাশি আগেই সবাইকে বলে দিয়েছিল, “দেখো বাপু, তাড়াতাড়ি যদি ছোটো কর্তার ইনভিজিলেশন থেকে ছাড়া পেতে চাও তো এক আনা এক পয়সা সঙ্গে নিয়ে এসো। ছোটো কর্তা ডাকলে এগিয়ে এসে এক আনা টেবিলের উপর রাখা মাটির ঘটে ফেলবে, আর এক পয়সা ছাড়া পাবার পর আমার হাতে দিয়ে তবে তোমার ছুটি মিলবে।”
কুড়িয়ে বাড়িয়ে, লক্ষ্মীর ঘট ভেঙে, চেয়েচিন্তে প্রায় সবাই এক আনা এক পয়সা সঙ্গে নিয়ে এসেছে। চাপরাশি পরিষ্কার জানিয়েছে, “পয়সা না দিলে ইনভিজিলেশনের ঠ্যালায় হাত-পা ভেঙে যদি থানায় নিয়ে হাজতে পোরে ছোটো কর্তা, তখন কিন্তু চাপরাশি সাহেবের পায়ে মাথা কুটলেও কোনও লাভ হবে না, বলে দিচ্ছি।”
বেশিরভাগ লোকের ট্যাঁকেই এক আনা এক পয়সা থাকায় ছোটো কর্তার তদন্তে কোনোই অসুবিধে হল না। চাপরাশি সাহেব লাইন লাগাবার সময়ই সব্বাইকে ভালোভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিল ছোটো কর্তা কী কী প্রশ্ন করবেন আর তার কী কী উত্তর দিতে হবে।
ছোটো কর্তা লাইনের একেবারে সামনে দাঁড়ানো গ্রামের নাপিত সীতাপতি শীলকে ডাকলেন, “ইঢার আও।”
ইংরেজ আমল কয়েক বছর আগেই শেষ হয়ে গেলেও সাহেবদের মতো ইংরেজদের স্টাইলে বাংলা বলার অভ্যাসটা ইনভেস্টিগেশনের সময় কাজে লাগান ছোটো কর্তা।
সীতাপতি জোড়হাতে এগিয়ে এসে ট্যাঁক থেকে এক আনা বের করে ঘটে ফেলে দিয়ে মাথা নীচু করে একপাশে সরে দাঁড়াল। ছোটো কর্তা জিজ্ঞেস করলেন, “টুমার কী নাম আছে?”
চাপরাশি পাশে দাঁড়িয়ে ছোটো কর্তার সাহেবি বাংলাকে অনুবাদ করে দিল, “নাম বল, নাপতে।”
সীতাপতি বলল, “আজ্ঞে, সীতাপতি শীল।”
“ঢন্বানের ডুই স্যান্টানের অন্টরঢানের বিষয়ে টুমি কী জ্যান?”
চাপরাশি সাহেব বলল, “ধনবানের দুই ব্যাটা যে লাপাতা হয়ে গেল সে ব্যাপারে কিছু জানিস তো চটপট বল।”
সীতাপতি করজোড়ে বলল, “আজ্ঞে সাহেব, আমি কিছু জানি না।”
“ইস মাহিনেকো পহেলা বুডবার বেইকাল চারটে হইটে রাত আটটা কোঠায় চিলে?”
চাপরাশি বলল, “মাসের পেত্থম বুধবার বিকেল থেকে রাত দুই পহর অব্দি কী কচ্ছিলি?”
সীতাপতি মাথায় হাত দিয়ে ভাবতে শুরু করল। মাসের প্রথম বুধবার বিকেলে সে কিছু একটা করেছিল, কিন্তু কিছুতেই অত পিছনের কথা তার মনে পড়ল না। অসহায়ভাবে চাপরাশির দিকে সীতাপতি তাকাল আর সঙ্গে সঙ্গে তার মনে পড়ে গেল সেদিন সে কী করেছিল, কেননা চাপরাশি সাহেব ছোটো কর্তার নজর এড়িয়ে তার ডানহাতের মোটা মোটা চার আঙুল বাঁহাতের তেলোতে শানিয়ে দেখিয়ে দিল সে মাসের প্রথম বুধবার কী করছিল। সীতাপতি বলল, “আজ্ঞে সাহেব, মাসের পেত্থম বুধবার বিকেল থেকে মাঝরাত পজ্জন্ত খান তিনেক ক্ষুরে ধার দিয়েছিলাম।”
ছোটো কর্তা তার খুদে চোখ দুটো আরও ছোটো করে বললেন, “খিউরে ডার ডিয়াছ? কীসের নিমিট্ট?”
এবার আর সীতাপতিকে চাপরাশি সাহেবের কিছু বলতে হল না। সে নিজেই জবাব দিল, “আজ্ঞে আমাদের গাঁয়ের চাষাভুষোদের দাড়ি তো দাড়ি নয় হুজুর, নলখাগড়ার বন। একবার চাঁছলেই ক্ষুর ভোঁতা হয়ে যায়। পিত্যেক মাসের পেত্থম বুধবার তাই একটু ক্ষুরগুলো ধার দিয়ে রাখি।”
ছোটো কর্তা খুশি হয়ে বললেন, “ভেরি গুড। টুমি যাইটে পারো।”
সীতাপতি চাপরাশি সাহেবের হাতে এক পয়সা গুঁজে দিয়ে মালকোঁচা মেরে এমন একখানা দৌড় দিল যে বাড়ির কাছে এসে থামতে না পেরে বাড়ি পিছনে ফেলে পঞ্চাশ গজ দূরে একটা ডোবার মধ্যে ঢিপ করে পড়ে কোনোমতে ব্রেক কষে কাঁপতে কাঁপতে এসে বাড়ি ঢুকল।
দেখতে দেখতে ছোটো কর্তার সামনে রাখা মাটির বড়ো ঘটটি টইটম্বুর হয়ে গেল, লিচুর আঁটিতে টেবিলের সামনে একটি ছোটো স্তূপ গড়ে উঠল, পাঁচ-সাতটা ডাবের খোসা এদিক ওদিক ছড়িয়ে পড়ল, এমনকি টেবিলে রাখা পাকা কাঁঠালের মাঝখানে পাঁচ ইঞ্চি পরিধি ও তিন ইঞ্চি গভীর একটি নিখুঁত গর্ত তৈরি হল, যার মধ্য থেকে মাঝে মাঝে ছোটো কর্তা এক-আধ কোয়া বের করে আতর মাখানো গোঁফ বাঁচিয়ে মুখে ফেলতে লাগলেন। কিন্তু স্কাউন্ড্রেল আর ব্যাড ক্যারেক্টারদের লাইন প্রায় ফুরিয়ে এলেও, লাগাতার দেড় ঘণ্টা ইনভেস্টিগেশন করে ছোটো কর্তা ‘ঢনবানের স্যান্টানডের অন্টরঢানের’ কোনও কিনারা করতে পারলেন না। প্রথমদিকে ধনবান দূরে মাটিতে গামছা পেতে বসে উৎসাহ নিয়ে ছোটো কর্তার জেরা লক্ষ করছিল, কিন্তু ছোটো কর্তার সাহেবি বাংলা শুনতে শুনতে তার কিছুক্ষণ পরেই চোখ জড়িয়ে এল, হাই উঠল। সে একটু সরে আমগাছের পিছনে শুয়ে এক লম্বা ঘুম দিয়ে ফেলল।
একে একে পাপ্পর সিং, ঘর্ঘর সিং, লাট্টু সিং, কুচুটে কর, এমনকি কাস্তেকোদাল পর্যন্ত এক আনা এক পয়সা খরচ করে ইনভেস্টিগেশনের বেড়া পার করলে প্রায় শেষ দিকে এল পাঠশালা পালানো জঙ্গলে পাখি দেখে বেড়ানো ভোদন্ত। ছোটো কর্তা শেষ চারটে লিচু দুই গালে ফেলে গোঁফে আর একবার আতর বুলিয়ে নিয়ে চাঙ্গা হয়ে ভোদন্তকে ডাকলেন, “ইঢার আও।”
ভোদন্ত আমগাছের মগডালে একটা বউ কথা কও মনোযোগ দিয়ে দেখছিল, ছোটো কর্তার ডাক সে শুনতে পেল না। ছোটো কর্তা রেগে গিয়ে কাঁঠালের সুড়ঙ্গে হাত ঢুকিয়ে দু-কোয়া কাঁঠাল ভুচরো সমেত বের করে এনে কাঁঠাল দু-কোয়া মুখে পুরে ভুচরো ছুড়ে মারলেন ভোদন্তের মুখে। ভোদন্তের মুখ সবসময়ই অর্ধেকটা খোলা থাকে, ভুচরোটা নাক আর ঠোঁটের মাঝবরাবর পড়তেই গাছের ডালে চোখ রেখেই ভোদন্ত জিভ বের করে ভুচরো চেটে নিল মুখের ভিতর। তারপর বিস্বাদ লাগতে ওয়াক থু করে ফেলতে গিয়ে ওটা ছিটকে গিয়ে ছোটো কর্তার শাঁসালো গোঁফে এমন বিশ্রীভাবে আটকে গেল যে ছোটো কর্তা দুই হাত দিয়ে টানাটানি করে ভুচরো গলিয়ে ফেলে কালো গোঁফকে হলুদ করে তুলে চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠে হিন্দিতে চেঁচাতে লাগলেন, “পাকড়ো! পাকড়ো ইসকো, মার ডালো, হাড্ডি তোড় দো।”
চাপরাশি লাফিয়ে এসে ভোদন্তের ছুঁচলো থুতনি হাতের মুঠোয় ধরে হিড়হিড় করে ছাগলের মতো টেনে নিয়ে এসে ছোটো কর্তার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বলল, “হুজুর, এই হচ্ছে এ-গাঁয়ের সবচাইতে ঘাগু চোর। একে জিজ্ঞেস করলেই ধনবানের ব্যাটাদের সব খবর জানতে পারবেন।”
ছোটো কর্তা বাঁশের কঞ্চি তুলে নিয়ে ভোদন্তকে পেটাবার জন্য সবে মাথার উপর উঠিয়েছেন, এমন সময় একটা নীল ডুমো মাছি এসে বসল ওঁর ঠিক গোঁফের মাঝখানে আর অমনি কাঁঠালের রসে পাখা আটকে মাছিটা বিজ্জ্ শব্দ করে পাখা ঝাপটাতে লাগল। কঞ্চি ফেলে দিয়ে ছোটো কর্তা ময়দান কাঁপিয়ে এমন একখানা হ্যাঁচ্চো দিলেন যে ছয় ইঞ্চি লম্বা, এক ইঞ্চি চওড়া গোঁফ ওলটপালট হয়ে মাছিটাকে জড়িয়ে পাটিসাপটা পিঠে হয়ে গেল।
হ্যাঁচ্চো দিয়ে ক্লান্ত হয়ে ছোটো কর্তা ধপ করে চেয়ারে বসে হাঁকলেন, “পানি লে আও, খড়কে লে আও, গামছা লে আও, গোঁফ সাফ করো।”
চাপরাশি হাতের কাছে জল না পেয়ে আর একটা ডাব কাটিয়ে নিয়ে, গাছের শুকনো ডাল ভেঙে খড়কে বানিয়ে, ধনবানের কাঁধের গামছা ছিনিয়ে নিয়ে ছোটো কর্তার গোঁফ সাফ করতে লেগে গেল। প্রথমে খড়কে দিয়ে খুঁচিয়ে মাছি বের করল চাপরাশি সাহেব। মাছিটা ছাড়া পেয়ে বোঁ করে উড়ে গেল। তারপর ভুচরোর সেঁটে যাওয়া টুকরো অতি যত্নের সঙ্গে খড়কেতে জড়িয়ে হ্যাঁচকা টান দিতেই ভুচরোসুদ্ধ একগোছা গোঁফ ছিঁড়ে বেরিয়ে এল। ছোটো কর্তা যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠলেন, “ওরে ব্বাপ! ব্যাটা আমার বিলিতি গোঁফটাকে দিলি তো মাটি করে! এ একজনের কম্ম নয়, চার-পাঁচজন নখওলা মানুষ ডেকে সাফ কর চটপট। তারপর দেখছি ইনভেস্টিগেশন কাকে বলে।”
লাইনে তখনও যে পাঁচ-ছয়জন লোক দাঁড়িয়ে ছিল, তাদের মধ্যে জনা তিনেকের লম্বা নখ ছিল। চাপরাশি সাহেবের নির্দেশে তাঁরা নখ দিয়ে সাবধানে ছোটো কর্তার গোঁফ সাফ করতে শুরু করল। চাপরাশি শুধু মাঝে মাঝে ডাবের জল দিয়ে গোঁফ ভিজিয়ে দিচ্ছিল।
ভোদন্ত এসব কাণ্ডকারখানা দেখে বউ কথা কও পাখি ভুলে ফ্যাচ ফ্যাচ করে হাসছিল। চাপরাশি তাকে বলল, “ছোটো কর্তার গোঁফ নষ্ট করার জন্য চার আনা জরিমানা দিতে হবে তোকে।”
ভোদন্ত নির্বিকারভাবে বলল, “আমার কাছে একটা পয়সাও নেই।”
চাপরাশি বলল, “তবে হাতকড়া তোর কপালে ঝুলছে।”
তারপর ভোদন্তের পিঠে চট করে একটা চিমটি দিয়ে ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, “এক আনা আমার হাতে দিলে আমার হাত ফসকে পালাতে দেব।”
ভোদন্ত এত মনোযোগ নিয়ে ছোটো কর্তার গোঁফ পরিষ্কার করা দেখছিল যে চাপরাশি সাহেবের কথা তার কানে গেল না। সে ওর মুখনাড়া দেখে বলল, “হুঁ।”
নখ দিয়ে ভুচরো খুঁটে বের করে ডাবের জলে গোঁফ ভালোভাবে ধুয়ে গামছা দিয়ে মুছে নেবার পর ছোটো কর্তা বুক পকেট থেকে একটা ছোটো আয়না আর একখানা খুদে চিরুনি বের করে আয়নায় গোঁফ দেখে চিরুনি দিয়ে আঁচড়ে গোঁফ পরিষ্কার করে নিলেন। তারপর তদন্ত শুরু করে দিলেন। চাপরাশি যথারীতি ছোটো কর্তার সাহেবি বাংলা অনুবাদ করে দিতে লাগল।
“নেইম বাটাও।”
“ভোদন্ত।”
“ভো ডান্ট? কী উড্ডেশে টোমার নাম ভো ডান্ট হইল?”
“আজ্ঞে ছোটোবেলা দাঁত উঠতে দেরি হয়েছিল, সেজন্য ভেউ ভেউ করে কাঁদতাম, তাই ঠাকুদ্দা দুটো মিলিয়ে প্রাকৃত পদ্ধতিতে ভোদন্ত নাম রাখলেন।”
“ফানি ওল্ড বয়। ইস মাহিনেকো পহেলা বুডবার বেলা চারটো হইটে রাট আটটা কোটায় চিলে?”
“আজ্ঞে মাঠের ধারে যে জঙ্গল, সেই জঙ্গলে ছিলাম।”
“কীসের নিমিট্ট?”
“আজ্ঞে পাখি দেখতে। রোজই গ্রামের ও-ধারের জঙ্গলে আমি পাখি দেখি।”
“আর ওই জঙ্গল থেকেই লাপাতা হয়েছে ধনবানের দুই ছেলে। ইউরেকা! হি ইজ দ্য রিয়েল কালপ্রিট!” দুই হাত উপরে তুলে ঘোষণা করলেন ছোটো কর্তা। চাপরাশি তার খাকি ব্যাগ থেকে হাতকড়া বের করে ভোদন্তের হাতে পরিয়ে দিল।
ধনবান আর গোক্ষুর গাঁয়ের লোকদের অবাক করে দিয়ে ছোটো কর্তা ঘট-ভরতি পয়সা তাঁর ঘোড়ার গলায় ভালোভাবে রশি দিয়ে বেঁধে নিয়ে, আর ভোদন্তকে চাপরাশির পিছনে বেতো ঘোড়ায় উঠিয়ে পয়সাহাটির দিকে রওনা দিলেন। তার আগে অবশ্য দুজনের ঘোড়াউঠুনি বাবদ ধনবানকে এক টাকা এক আনা দিতে হয়েছে।
ছোটো কর্তা সাহেবি স্টাইলে ঘোড়ার ল্যাজ ধরে পিছন দিক দিয়ে ঘোড়ায় উঠলে ধনবান জিজ্ঞেস করল, “আজ্ঞে কত্তা, ভোদন্তের তো নিজের মাথা গোঁজার জায়গা নেই, ও কোথায় আমার ছেলেদের আটকে রাখবে?”
ছোটো কর্তা গোঁফে তা দিয়ে বললেন, “ওকে জেরা করলেই সেসব জানা যাবে।”
ছোটো কর্তা এবার গম্ভীরভাবে জানালেন, “ইনভেস্টিগেশনের পর রিপোর্ট তৈরি হবে, সেই রিপোর্ট বড়ো কত্তাকে দেখাতে হবে। বড়ো কত্তা রিপোর্টে ইয়েস নো ভেরি গুড লিখে দেবেন, তারপর রিপোর্ট যাবে টাইপবাবুর কাছে। টাইপবাবু কার্বন লাগিয়ে রিপোর্টের ছ’কপি টাইপ করে আমার কাছে আনলে এক কপি রেখে বাকি পাঁচ কপি পাঠাব…”
ধনবানের মাথার মধ্যে এবার আর একটা নয় একসঙ্গে এক ঝাঁক মাছি বোঁ বোঁ করে দু-পাক ঘুরে এল। আমগাছের নীচে মাথায় হাত দিয়ে সে ধপ করে সেই যে বসে পড়ল, চোখ খুলল ঠিক দশ মিনিট পর। ততক্ষণে ছোটো কর্তা আর চাপরাশি ওর নজরের বাইরে চলে গেছে।
ছয়দিন পরে ভোদন্তকে দেখা গেল নাটু সর্দারের আমবাগানে দোয়েল পাখি দেখছে। তাকে অনেক জিজ্ঞেসবাদ করে শুধু এইটুকু জানা গেল যে জেলহাজতে তার খাওয়াদাওয়ার ভালোই ব্যবস্থা করেছিল ওখানকার জমাদার। শুধু দিনে তিনবার তার মাথার উকুন বাছিয়ে নিত ওই ঝাঁকড়া চুলের লোকটা, আর রাতে একবার তার খড়খড়ে পিঠ চুলকে দিতে হত ভোদন্তকে।
আট
কাপালিকের নির্দেশে ধানু-রাজুর জন্য ক্রিকেটীয় পরিবেশ তৈরি করতে দুই ক্রোশ দূরে নদীর পাড়ে ধোপাদের গাঁ থেকে ক্রমার্ক কাপড় পেটানো চ্যাপ্টা তক্তা চুরি করে, পুরোনো বালিশ কেটে তুলো বের করে বেড়ালের চামড়া দিয়ে মুড়ে জুতো সেলাইয়ের সূচ দিয়ে বল তৈরি করে ফেলল। কাঠের গোলা থেকে কাঠের টুকরো বেছে নিয়ে চেঁছে পরিষ্কার করে ছয়খানা স্টাম্পও তৈরি করে নেয় ক্রমার্ক। তারপর বিকেল হলে ঘ্রাঘনখকে সঙ্গে নিয়ে সে গিয়ে মাটির নীচে ছোট্ট কুঠুরি খুলে ধানু-রাজুর চোখে কাপড় বেঁধে তাদের হাত ধরে কুঠুরির বাইরে নিয়ে আসে।
ধানু-রাজু তাদের চোখ কেন বাঁধা হল জানতে চাইলে ঘ্রাঘনখ গম্ভীরভাবে জানায়, “ক্রখদেব রচিত ক্রিকেট সংহিতায় ক্রিকেট শিক্ষণ প্রণালীর যে বিশদ বর্ণনা আছে, তাতে পরিষ্কার লেখা আছে, চর্মাবৃত গোলক ক্ষেপণকারী ও উইকেটাগ্রে যষ্ঠিধারীকে অন্ধকার অর্গলবদ্ধ কুঠুরি থেকে বের করে চোখ বন্ধ করে সরাসরি ক্রিকেটভূমিতে নিয়ে চোখ খুলবে যাতে, যাতে…”
বিশালবপু ক্রমার্ক ঘ্রাঘনখের বাক্যটি পূর্ণ করল, “যাতে ক্রিকেটীয় পরিবেশ তথা ক্রিকেটভূমির সঙ্গে তার আত্যন্তিক, সার্বিক, হার্দিক সম্যকরূপে পরিচয় ঘটে।”
ধানু-রাজু এত ছোটো প্রশ্নের এত বড়ো আর গোলমেলে ব্যাখ্যা শুনে মাথা ঘুরে পড়ে যাচ্ছিল, ঘ্রাঘনখ ও ক্রমার্ক তাদের ধরে ফেলল।
জঙ্গলের মধ্যে একটা পরিষ্কার জায়গায় ধানু-রাজুর জন্য ক্রিকেটীয় পরিবেশ রচনা করে ঘ্রাঘনখ ও ক্রমার্ক। ধানু-রাজুর নির্দেশ মেনে নিয়ে গাছের ডাল থেকে তৈরি করা ছ’টা স্টাম্প পোঁতে ঘ্রাঘনখ মাঠের দু-পাশে, ক্রমার্ক মাঠের চারপাশে ছোটো ছোটো কাঠি পুঁতে বাউন্ডারি সীমানা ঠিক করে নেয়।
ক্রিকেটীয় পরিবেশ রচনার পর ধানু-রাজুর চোখ খোলা হলে ওরা তো অবাক। ওদের মনে হল, সেদিন বিকেলেও ওরা এরকম জঙ্গলের পাশেই ক্রিকেট খেলতে এসেছিল। কিন্তু তারা নিজেদের মধ্যে চোখাচোখি করা ছাড়া আর কোনও কথা বলে না। তাদের ভয়, ওসব পুরোনো কথা তুললে এই মোটা ভুঁড়িওয়ালা আর প্যাঁকাটে টেকো লোক দুটো হয়তো বিরক্ত হয়ে তাদের ঘরকুনো মনে করে বাপের জিম্মায় রেখে আসবে। ক্রিকেট আইল্যান্ডে ভিলবার্ট র্যামহরি আর পিটার ফার্টের কাছে তাদের আর যাওয়া হবে না। কাজেই তুলোর বল আর কাপড় পেটানো তক্তা নিয়েই তাঁরা মহা উৎসাহে খেলতে লাগল। ঘ্রাঘনখ আর ক্রমার্ক দু-পাশে বাউন্ডারি লাইনে দাঁড়িয়ে ফিল্ডিং দিতে লাগল। কিন্তু পুরোনো শক্ত তুলোর বল এত ভারী যে ধানু ছয় পা ছুটে এসে গায়ের জোরে বল করলে রাজু দু-পা এগিয়ে এসে সজোরে ব্যাট হাঁকালেও বল দুজনের মধ্যেই পড়ে।
এক ওভার পিটিয়ে রাজু ক্রমার্কের বহু যত্নে, পরিশ্রমে সেলাই করা বল ফাটিয়ে ফাট্টাফাই করে দেয়। বল ফাটিয়ে ধানু-রাজু দুজনেই মহা উৎসাহে চেঁচায়, “আমরা এই কাপড় কাচা ব্যাট দিয়ে বাজে ঢ্যাপসা বল পেটাব না। আমাদের ভালো ব্যাট চাই, সত্যিকার ক্রিকেট বল চাই।”
ক্রমার্ক আর ঘ্রাঘনখ ধানু-রাজুর উৎসাহ দেখে ঘাবড়ে যায়। ক্রখদেবের ক্রিকেট সংহিতায় ক্রিকেটীয় পরিবেশ বিঘ্নিত হলে তার জন্য কী বিশেষ ব্যবস্থা অবলম্বন করার নির্দেশ আছে তা ঘ্রাঘনখ এবং ক্রমার্ক কিছুতেই মনে করতে পারল না। তারা তাদের একমাত্র অস্ত্র ‘উন্নত বাচনভঙ্গি’র সাহায্যে ধানু-রাজুকে ঠান্ডা রাখবার চেষ্টা করল। ঘ্রাঘনখ বলল, “বৎস, তোমরা অদ্য ক্রিকেট গোলকের যে নিদারুণ অবমাননা করেছ, তা দেখলে স্বয়ং ক্রখদেব মূর্ছা যাবেন। এক্ষণে যষ্টি সংবরণ করতঃ গৃহাভিমুখী হওয়াই শ্রেয়।”
ঘ্রাঘনখের কথা শুনে ধানু-রাজুর মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। বলল, “আমরা তোমাদের ভুজুংভাজুং শুনতে রাজি নই। আমরা ভালো বল চাই, ব্যাট চাই।”
রাজু তার সঙ্গে গলা মেলাল, “চল দাদা, আমরা বাড়ি গিয়ে ভালো ব্যাট-বল নিয়ে আসি। এ কাপড় পেটানো তক্তা দিয়ে তুলোর বল পেটালে কোনোদিনই আমাদের ইন্ডিয়ান টিমে জায়গা হবে না।”
ধানু বলল, “তাই চল, এ-ব্যাটারা খালি খটরমটর অং বং চং করে কথা বলে, কাজের বেলা ঢি ঢি। আজ সন্ধের সময় দাড়িওয়ালা দাদু ঘরে এলে দাদুকে বলে এ-দুটোকে কান ধরে ওঠবোস করিয়ে দেব।”
সারাদিন ক্রিকেটীয় পরিবেশ রচনার জন্য ছোটাছুটি, দৌড়াদৌড়ি, সেলাই-ফোঁড়াই করে এখন হাঁটুর বয়সি ছেলেদের মুখে এসব গালমন্দ শুনে ক্রমার্কের মেজাজ এত খারাপ হয়ে যায় যে তার ইচ্ছে করে একটা স্টাম্প তুলে নিয়ে দুটোকে ভালোভাবে পিটিয়ে ঠান্ডা করে দেয়। কিন্তু ওদের শরীরে কোনও জায়গা কেটে ছিঁড়ে গেলেই কাপালিকের হাতে কঠিন শাস্তি পেতে হবে, এই ভয়ে মনের রাগ চেপে ক্রমার্ক বলে, “শোনো বালকদ্বয়। এই বন অতি নির্জন, গভীর, শ্বাপদসঙ্কুল, ভূতপ্রেতাদি পরিবেষ্টিত, সিংহ, ব্যাঘ্র, বন্য শূকর, বহুবিধ সর্প ইত্যাদিতে পরিপূর্ণ এবং সেই হেতু বিপজ্জনক, ভীতিকর ও দূরতিক্রম্য। এমতাবস্থায় গৃহ প্রত্যাবর্তনই সর্বতোভাবে কাম্য।”
ক্রমার্কের কথা শেষ হবার আগেই উন্নত বাচনভঙ্গির আঘাতে পুরোপুরি বোল্ড আউট হয়ে ধানু-রাজু ‘আঁ আঁ’ করে মাথা ঘুরে মাটিতে পড়ে যাবার আগেই ঘ্রাঘনখ ও ক্রমার্ক দুজনকে ধরে ফেলে। তারপর ওদের কাঁধে তুলে নিয়ে এসে মেঝের নীচের কুঠুরিতে তালাবন্ধ করে দিল। সন্ধের দিকে কাপালিক চিরুনি দিয়ে দাড়ি আঁচড়াতে আঁচড়াতে ঘরে ঢুকে যখন জিজ্ঞেস করলেন, “অদ্য ক্রিকেট ক্রীড়ায় কোনও বিঘ্ন উপস্থিত হয়নি তো?” ধানু-রাজু একসঙ্গে লাফিয়ে উঠে ঘ্রাঘনখ ও ক্রমার্কের বিরুদ্ধে জোরদার নালিশ ঠুকে দেয়। সবশেষে ধানু বলে, “আমাদের সঙ্গে কেউ অং বং চং করলে আমরা আর সহ্য করব না, আমরা ঢিল ছুড়ব।”
রাজু বলল, “আমাদের ভালো ব্যাট-বল চাই, নইলে আমরা খেলব না।”
কাপালিক দাড়িতে চিরুনি আটকে রেখে অনেক কষ্টে তাঁর বাচনভঙ্গিকে যথাসম্ভব অবনত করে বললেন, “নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই, তোমরা যাহাতে উত্তম ব্যাট-বল লইয়া ক্রীড়া করিতে পারো তাহার অতিশীঘ্র ব্যবস্থা করিব। উহারা যাহাতে উন্নত বাচনভঙ্গি দ্বারা তোমাদের পীড়িত না করে তাহার জন্যও যথোচিত নির্দেশ দিব।”
সেদিন রাত্তিরেই কাপালিকের নির্দেশে ঘ্রাঘনখ আর ক্রমার্ক মালকোঁচা মেরে, গায়ে তার্পিন তেল মেখে, সিঁদকাটি নিয়ে গোক্ষুর গাঁয়ে ঢুকল। ধনবানের বড়ো দোতলা মাটির বাড়িটা খুঁজতে ওদের কোনোই অসুবিধা হল না।
সিঁদ কেটে ঘ্রাঘনখ যে-ঘরে ঢুকল, সে-ঘরেই ধানু-রাজুর মা চোখ বুজে শুয়ে ছিল। শোকে তাপে তার চুলগুলো সব এই ক’দিনেই পেকে শণের নুড়ি, হাত-পা শুকিয়ে কাঠি কাঠি, মুখে সুখের টোল উঠে গিয়ে দুঃখের আঁকিবুকি, কাটাকুটি রেখা। ধানু-রাজুর মার বয়স এক লাফে মগ ডালে পৌঁছে গেছে।
ঘ্রাঘনখ তার টেকো মাথা আর লম্বা চোয়াল উঁচু করে ঘরের চারপাশ এবং বিছানায় লেগে থাকা ধানু-রাজুর মাকে দেখে নিয়ে মাথা নীচু করে সিঁদকাটা গর্তের মধ্য দিয়ে ক্রমার্ককে বলল, “এক্ষনে আইস আমরা উদ্দিষ্ট বস্তুর সন্ধানে প্রবৃত্ত হই।”
ক্রমার্ক সিঁদকাটা গর্ত দিয়ে মাথাটা গলিয়ে দিল, কিন্তু তার বিশাল ভুঁড়ি কিছুতেই গর্তের ও-পারে ঠেলে তুলতে পারল না। ক্রমার্ক অনুপায় হয়ে ঘ্রাঘনখকে বলল, “ভো ঘ্রাঘনখ, আমার বপুদেব এত অপরিসর গহ্বরে অবগাহন করতে রাজি নয়। তুমি বরঞ্চ দ্বার উন্মুক্ত করো, আমি বপুদেবকে নিয়ে অবিলম্বে চৌর্যবৃত্তিতে প্রবৃত্ত হই।”
ঘ্রাঘনখ আর একবার তার লম্বা গলার ওপর লম্বা চোয়াল এ-পাশে ও-পাশে ঘুরিয়ে দেখে নিয়ে গর্তে মুখ রেখে বলল, “এই প্রকোষ্ঠ দ্বারহীন। কিয়ৎক্ষণ অপেক্ষা করো, তোমার জন্য অন্য কক্ষের দ্বার উন্মুক্ত করছি।”
হামাগুড়ি দিয়ে বাইরের ঘরে এসে ঘ্রাঘনখ দেখল, তক্তপোশে ধনবান হাতে গড়গড়ার নল নিয়ে তাকিয়ায় মাথা রেখে বেশ ঘুমোচ্ছে। এই ঘরে দরজা ছিল, কাজেই ঘ্রাঘনখ উঠে তাঁর লম্বা প্যাঁকাটির মতো আঙুল দিয়ে ছিটকিনি খুলে, ঠ্যাঙা তুলে দরজা হাট করে খুলে ফেলল। দরজা খুলতে গিয়ে খুট করে একটু শব্দ হল। ধনবান চোখ না খুলেই বলল, “ক’মন, পেরভু?”
আসলে সে স্বপ্নে দেখছিল, তার গুড়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে স্বয়ং নারদ। ইন্দ্রের সভায় বিশেষ ভোজের ব্যবস্থা করবার দায়িত্ব পড়েছে নারদের। পায়েসের জন্য ভালো খেজুর গুড়ের খোঁজ করতে স্বর্গ-পাতাল হয়ে মর্ত্যে এসে নারদ সোজা ধনবানের গুড়ের দোকানে হাজির হয়েছে। যখন ঘ্রাঘনখ খুট করে দরজাটা খুলল, তখন পুরো একঘণ্টা দরদাম শেষ করে নারদ ঢেঁকি পেতে বসে মাথার ঘাম আঙুল দিয়ে চেঁছে ফেলে নস্যির ডিব্বেতে তিন টোকা মেরে এক টিপ নস্যি নিয়ে কতটা গুড় নিলে কাজ চলবে তাই ভাবছিল। ধনবানের মুখে ‘ক’মন, পেরভু’ শুনে ঘ্রাঘনখ বলল, “আপাতত বিশ মনেই কাজ চলে যাবে।”
নারদ বিশ মন গুড় কিনবে শুনে ধনবান ঘুমের মধ্যেই খুশিতে ডগমগ হয়ে দাঁত বের করে হাঁক দেয়, “পাঁচু, আড়তের পিছনে আমগাছে বড়ো কাঁটাটা বাঁধ তো। ওজনগুলো ঝেড়েপুঁছে নে, গুড় মাপা টিন…”
ততক্ষণে ক্রমার্ক তার বিশাল ভুঁড়ি দুলিয়ে দরজা দিয়ে কাত হয়ে ঢুকে থপথপ করে এগিয়ে এসে ধনবানের বিড়বিড়ানি শুনে খুক করে কেশে একটু হেসে উঠতেই ঘ্রাঘনখ মুখ ছুঁচলো করে চোখ-মুখ আর তার সারসের মতো গলার এমন একখানা ভঙ্গি করল, যা দেখে মনে হল সে এক্ষুনি ক্রমার্কের ভুঁড়িতে কাঠঠোকরার মতো ঠকাঠক তার মুখ ঠুকতে থাকবে।
এরপর দুজনে সন্তর্পণে আর একটা ছোটো কামরায় ঢুকল। ওটা ছিল ধানু-রাজুর পড়ার ঘর। ওখানেই ঘুড়ি, লাটিম আর অন্য কিছু খেলনার সঙ্গে রাখা ছিল আর এক সেট ব্যাট, বল আর স্টাম্পগুলো। ওগুলো তুলে নিয়ে ওরা চটপট বেরিয়ে এল ধনবানের বাড়ি থেকে।
পরদিন বিকেলে যথাযথ ক্রিকেটীয় পরিবেশ রচনা করে খেলার মাঠে ধানু-রাজুকে নিয়ে এল ক্রমার্ক ও ঘ্রাঘনখ। সঙ্গে এলেন কাপালিক। ব্যাট, বল, স্টাম্প দেখে ধানু-রাজু তো খুশিতে আত্মহারা। আরে! এগুলো তো ওদেরই ব্যাট-বল! কোথা থেকে জোগাড় করল এগুলো এই পেটমোটা আর প্যাঁকাটে লোক দুটো? নিশ্চয়ই চুরি করেছে ব্যাটারা। ধানু একবার বাবা-মার কথা জিজ্ঞেস করতে মুখ খুললেই রাজু ওকে চিমটি কেটে চুপ করে দিল, কারণ বাড়ি ফেরার নয়, এখন ক্রিকেট আইল্যান্ডে যাবার স্বপ্ন দেখছে ওরা। খেলা শুরু করার আগে কাপালিকের নির্দেশে ওরা ‘ভারত ক্রিকেটে পুনঃ আসিবে সুদিন’ প্রার্থনাসংগীত গাইল—
‘ব্যাট ধরো কষে বীর
বল ছুড়ো খেয়ে ক্ষীর
ভাঙো আম্পায়ারের শির, নাহি ভয়।’
তারপর দু-ভাই মনের খুশিতে ব্যাট-বল নিয়ে মেতে উঠল। কাপালিকের নির্দেশে ক্রমার্ক অনেকদূর থেকে ছুটে এসে আস্তে করে ছুড়তে লাগল বল, আর ধানু-রাজু পালা করে পিটিয়ে বল জঙ্গলের মধ্যে ফেলতে লাগল। ঘ্রাঘনখ খুঁজে পেতে পাঁচ মিনিট পর বল নিয়ে এসে হাজির হতে না হতে বল পিটুনি খেয়ে আবার জঙ্গলে। আবার পাঁচ মিনিট বাধ্যতামূলক বিরতি। বাধ্য হয়ে শেষে ধানু-রাজু জোরে না পিটিয়ে আস্তে পেটাতে শুরু করল।
দাড়িতে হাত বুলিয়ে কাপালিক খুশি হয়ে সবাইকে বললেন, “ক্রিকেট অতি স্বাস্থ্যকর, সুন্দর ও মনোরম ক্রীড়া। এই জন্যই ক্রিকেট সংহিতায় ক্রখদেব বলেছেন, ‘ক্রীড়ায়াং ক্রিকেটং শ্রেষ্ঠং’।”
এই বলে কাপালিক নিশ্চিন্ত হয়ে ঘরে ফিরে গেলেন।
দু-দিন আগে অবিলম্বে সম্মোহন শেখাতে রাজি হয়েও কাপালিক শেষ পর্যন্ত তাকে কীভাবে নিরাশ করল তাই মনে পড়ায় ক্রমার্ক মনে মনে বলল, ‘ঢ্যামনা!’ কিন্তু মুখে বলল, “অতি সত্য কথা, গুরুদেব।”
নয়
কাস্তেকোদাল কামারের চৌকশ, সেয়ানা ছেলে কর্মকুশল কলকাতার বড়বাজারের কাছে লোহাপট্টিতে লোহা কিনতে গিয়েছিল। গাঁয়ে ফিরে এসে ধনবানকে সে এক জবর খবর দিল। লালবাজারের কাছে ডোডো লেনে নাকি এক ধুন্ধুমার গোয়েন্দা আছেন, যাঁর নাম শুনলে নাকি ছেলেচোর, মেয়েচোর, বুড়োচোর, বুড়িচোর, অ্যামচোর, ঘ্যামচোর সব মুচ্ছো যায়। গোয়েন্দার ভয়ে উত্তর আর মধ্য কলকাতা ছেড়ে চোরেরা সব দলে দলে ওদিকে বারাসত, বীরভূম তক আর এদিকে বালিগঞ্জ, বাটানগর তক ছড়িয়ে পড়েছে। বেলঘরিয়া থেকে বউবাজার আর চিৎপুর থেকে চিনাবাজার পর্যন্ত এখন আর চোরেদের উৎপাত নেই। দরজা-জানালা হাট করে খুলে রেখে লোকজন ঘর ছেড়ে দিব্যি অফিস, বাজার, সিনেমা, থিয়েটার, শ্বশুরবাড়ি, বাপের বাড়ি পজ্জন্ত ঘুরে আসে, ম্যাও বেড়ালটাও চৌকাঠ মাড়ায় না। কর্মকুশল এসব নিজের চোখে দেখে এসেছে। গোয়েন্দার নাম দেশবিদেশে এমন ছড়িয়ে পড়েছে যে লন্ডন-ফন্ডনের বড়ো বড়ো লালমুখো সাহেব গোয়েন্দারা এসে সকাল বিকেল ডোডো লেনের গোয়েন্দার বাড়ির সামনে হত্যে দেয়। কিন্তু গোয়েন্দা এসব সাহেব-ফাহেবকে পাত্তা দেন না। পিছন দরজা দিয়ে বা ছাদ দিয়ে সবার চোখে ধুলো দিয়ে ছদ্মবেশে সুট করে কখন যে নিজের কাজে বেরিয়ে যান, কেউ জানে না। গোয়েন্দার এক ট্যাঁরা স্যাঙাৎ আছে, সে শুধু দরজা একটু খুলে তার ভালো চোখটা দিয়ে ক’টা সাহেব হত্যে দিয়েছে গুনে নিয়ে একটা খাতায় টুকে রেখে ‘নো মিট গেট লস্ট’ এই জাতীয় কড়া ইংরেজি ধাতানি দিয়ে সাহেবগুলোকে ভাগিয়ে দেয়। গোয়েন্দার একটা বিদঘুটে নামও আছে। কর্মকুশল অনেক কষ্টে নামটা পলতা পর্যন্ত মনে রেখেছিল। পলতার জলের ট্যাংকে লোহা গুনতে গিয়ে কখন গোয়েন্দার নামটা তার মন থেকে খসে পড়ে, সে টের পায়নি।
ওদিকে ছেলে হারিয়ে বিছানায় কাঁথামুড়ি দিয়ে সারাদিন শুয়ে থাকে যে ধনবানের গিন্নি, তার আর উঠবার নাম নেই। ধনবানের কপালে এখন জোটে শুধু সেদ্ধভাত, আলুনি ডাল আর একটা ঘ্যাঁট জেলখানার কয়েদিদের মতো। বাজারে গুড়ের দোকানে ঝাঁপ ফেলে দিতে হয়েছে তাকে। মনের দুঃখে তক্তপোশে বসে সে এত বেশি তামাক টানে আর এত বেশি ধোঁয়া ছাড়ে যে ঘরের মধ্যে ঘটিবাটি, চাল-ডাল খুঁজতে বাড়ির পুরোনো ঝি আন্নাকালীকে কুপি জ্বালাতে হয়। আন্নাকালী জানে, মেঘ থেকে বিষ্টি হয়। তামাকের মেঘ জমে জমে একদিন নিঘ্ঘাত ঘরের মধ্যে তামাক বিষ্টি হবে। তখন কী মজাটাই না হবে এই ভেবে আন্নাকালী আনন্দে কাপড় কাচতে গিয়ে এক গামলা গরম জলে সোডার জায়গায় এক কাড়ি নুন ঢেলে বসে থাকে।
কর্মকুশলের মুখে ধুন্ধুমার গোয়েন্দার কাণ্ডকারখানা শুনে ধনবান ভাবে, জোড়া ছেলে ফিরিয়ে আনার জন্য থানাপুলিশ, ওঝা-ফকির অনেক তো হল, একবার গোয়েন্দা লাগিয়ে দেখলে কেমন হয়। কর্মকুশল জানিয়েছে, গোয়েন্দার কাছে টাকার কোনও দাম নেই। যার পায়ে সাহেবসুবো গড়াগড়ি খায়, টাকা তার কাছে রামকৃষ্ণ, অর্থাৎ টাকা মাটি মাটি টাকা। টাকা ঘরে তোলা নয়, টাকা যাতে ঘরে ঢুকতে না পারে তার জন্যই না সে সামনের দরজা খোলে না! সাহেবদের ‘নো মিট, গেট লস্ট’ করে দেয়! হ্যাঁ তবে কেস জবরদস্ত হওয়া দরকার। বড়ো কেস হলে তবেই গোয়েন্দা ডোডো লেন ছাড়েন। কিন্তু মধ্য কলকাতার দাপুটে গোয়েন্দা বেলঘরিয়ার এদিকে পা রাখতে রাজি হবেন কি না, সেটাও একটা চিন্তার বিষয়। তবে ভরসা এই যে পুলিশ, ওঝা হদ্দ হয়েছে ধনবানের জোড়া ছেলের পেছনে, কাজেই এটা যে জব্বর কেস, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তাই কর্মকুশল ধনবানকে ভরসা দিয়েছে যে বেড়াল যেমন গরম তেলে ছোঁক করে মাছ পড়লে নাক উঁচু করে হাওয়ায় গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে হেঁসেলের দিকে গুটিগুটি এগোয়, কিংবা শকুন আকাশ থেকে নেংটি ইঁদুরটি মরলেও হুস করে নেমে আসে, ঠিক তেমনি ধনবানের জোড়া ছেলের লাপাতা হবার খবরে ডোডো লেন ছেড়ে গোয়েন্দামশাই গোক্ষুর গাঁয়ে ধেয়ে আসবেন।
দোকানে তালা ঝুলিয়ে, ট্যাঁকে কিছু টাকা গুঁজে, কর্মকুশলকে নিয়ে এক শনিবারের সন্ধেতে ধনবান এসে হাজির হল ডোডো লেনে গোয়েন্দার বাড়ির দোরগোড়ায়। তিন-তিনবার কলকাতা ফেরত সেয়ানা ছেলে কর্মকুশল টুক টুক করে দরজায় তিন টোকা দিতেই দরজা খুলে বেরিয়ে এল ধুরন্ধর ধুন্ধুমার গোয়েন্দা চৌকশ চিরকুমার চৌধুরীর (সংক্ষেপে চৌচিচৌ) স্যাঙাৎ শিশু (ছড়িয়ে লিখলে শিবনাথ শুঁড়ি)।
শিশুর চেহারা শিশুর মতোই। দাড়িগোঁফহীন, বেঁটে, থলথলে, গোলগাল চেহারা, ‘ঠাকুর ঘরে কে রে? কলা খাইনে’ মুখের ভাব। বয়স শুধু বোঝা যায় তার ভালো চোখটিতে যেটি সবসময়ই সন্দেহে তীব্র, তীক্ষ্ণ, সূচিভেদ্য, মাটি খুঁড়ে কেঁচো এবং কেঁচো খুঁড়ে সাপ বের করার জন্য আগ্রহী। আর বয়স ধরা পড়ে তার কাঁচাপাকা ছোটো করে কদমছাঁট চুলে। কর্মকুশল আর ধনবানকে দেখে সে তার ছুঁচের মতো দৃষ্টি ফুটিয়ে দুজনকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিয়ে শিশুর মতো নরম তুলতুলে আধো আধো গলায় জিজ্ঞেস করল, “কী তাই?”
কর্মকুশল বলল, “গোয়েন্দামশাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ কত্তে এয়েছি আমরা।”
শিশু বলল, “কী পেয়োজন?”
এবার ধনবান হাতজোড় করে বলল, “আজ্ঞে আমার একজোড়া ছেলে হারিয়েছে দু-মাস হল। কিছুতেই হদিস করতে পারছি না।”
শিশুর চোখের দৃষ্টি যেন একটু কম ধারালো হল, মাছ কোপানো ট্যাঁটার মতো। বলল, “পুলিত, তানা ঘুলে এয়েছেন?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ।” বলল ধনবান।
“ওঝা, ফকিলকে পয়তা দিয়েতেন?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ।”
“গেয়ামে গেয়ামে ঢ্যাঁড়া পিতিয়েছেন?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ।”
“চৌচিচৌ চায়েবের কাতে কে পাতিয়েতে?”
“আজ্ঞে, লোহা পট্টিতে সবার মুখে ওঁর খুব নামডাক শুনে এখানে এয়েচি।” কর্মকুশল জানাল।
শিশুর গোল মুখে টোল পড়ল। দরজা খুলে বলল, “আচুন, বছুন, তামাক খাচুন। চায়েব চা খেটে চিনেবাজার গেচেন। চুপচাপ বচে থাকুন, ইডিক উডিক টাকাবেন না, নখ খুঁটবেন না, হাঁচি-কাচি ডেবেন না, কটাবাট্টা বলবেন না, গুনগুন করে গান গাইবেন না, কেমন? আমি একন আপনাডের জন্য টামুক আনচি, চায়েব এলে খাটা পেনচিল নিয়ে ঢুকব, কেমন? আচি।”
এই বলে একটা ছয় হাত লম্বা, তিন হাত চওড়া চিমসে ঘরে নোংরা তক্তপোশের ওপর কর্মকুশল আর ধনবানকে বসিয়ে রেখে শিশু ভেতরের ঘরে ঢুকে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিল। কর্মকুশল আর ধনবান হাত-পা গুটিয়ে জড়োসড়ো হয়ে বসে ভয়ে ভয়ে নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। কর্মকুশল তার খুদে চোখ দুটো যতটা সম্ভব বড়ো করে, মাথা নেড়ে ধনবানকে জানাবার চেষ্টা করল, গোয়েন্দার স্যাঙাতের দাপটে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে ডাকসাইটে গোয়েন্দার কাছে ধনবানকে সে নিয়ে এসেছে, এবার তার একটা হিল্লে হবেই। ধনবানের চোখ বড়োও হয় না, ছোটোও হয় না, কাজেই তামাকের ধোঁয়াতে পাকানো বাদামি গোঁফ নাড়িয়ে সে জানাল, হ্যাঁ, এবার যে সেরকমই একটা কিছু হতে যাচ্ছে তাতে তারও কোনও সন্দেহ নেই। শিশুর কথামতো চুপচাপ দুজন নোংরা, সিমেন্ট উঠে যাওয়া মেঝের দিকে তাকিয়ে মাথা নীচু করে বসে রইল।
কাছেপিঠে কোথাও টিনের কারখানা থেকে ঠুং ঠাং, খুং খাং শব্দ আসছিল। কর্মকুশল কান পেতে সেই শব্দ শুনে আঁচ করতে পারছিল যে একটা বত্রিশ ইঞ্চির পেল্লায় টিনের বাক্সের দু-পাশে আংটা লাগানো হচ্ছে। আশেপাশে কোনও মিষ্টির দোকান থেকে যে মিষ্টি গন্ধ আসছিল, তাই শুঁকে ধনবান জানতে পারল নলেন গুড়ের পাক দিয়ে একটি বড়ো কড়াই নামানো হল এইমাত্র। এবার ছাঁচে ফেলে সন্দেশ বানানো হবে। এছাড়া আরও অনেক শব্দ ও গন্ধ আসছিল চারপাশ থেকে যার কোনও কূলকিনারা করতে পারল না কর্মকুশল ও ধনবান।
খুট করে একটা শব্দ হল। দুজনেই বুঝল ভিতরের দরজা খুলল, তবু তারা কেউ চোখ তুলল না। গোয়েন্দার বাহন বলে কথা। পান থেকে চুন খসলে আর রক্ষে নেই। এবার শিশুর গলা শোনা গেল, “ঢয়ুন, টামুক ঢয়ুন।”
এদিক ওদিক না তাকিয়ে কর্মকুশল মাথা নীচু করে হাত বাড়িয়ে বলল, “ডিন, থুড়ি দিন।”
হুঁকো কর্মকুশলের হাতে দিয়ে শিশু বলল, “একি অভড্ডটা! মাটা টুলে একবার ডেকবেন না ছাপ ডিচ্চি না ব্যাঙ ডিচ্চি? ঘরের মড্ডে ইডিক উডিক টাকাটে না কয়েচি, টাই বলে আমাল ডিকে টাকাবেন না এটা কেমনটরো কটা, অ্যাঁ? চি চি চি! চৌচিচৌ চাব চুনলে কিন্টু ভালি লাগ কব্বেন। নিন, গিয়ে বচে বালো কলে টানুন।”
মাথা তুলবার আগেই খুট করে দরজা বন্ধ হল আর কর্মকুশল হুঁকো হাতে গিয়ে বসল ধনবানের পাশে।
আধঘণ্টা তামাক টেনে দুজনে যখন প্রায় কল্কেটাকে তামাক বানিয়ে পুড়িয়ে ফেলেছে, তখন আবার খুট করে দরজা খুলল। শিশু একহাতে একটা চেয়ার, আর এক হাতে একটা ম্যাগ্নিফাইয়িং গ্লাস, বগলে খাতা, কানে পেন্সিল নিয়ে হুড়মুড় করে এসে ঢুকল। তক্তপোশের ওপর দেয়াল ঘেঁষে চেয়ার বসিয়ে তক্তপোশের নীচ থেকে একটা ভাঙা তোবড়ানো মোড়া টেনে-হিঁচড়ে বের করে চেয়ারের পাশে বসিয়ে ধপ করে বসে পড়ে, কান থেকে পেন্সিল তুলে, খাতা সামনে বাগিয়ে ধরে, হাফ শার্টের বুক পকেট থেকে বের করে চটপট সুতো বাঁধা গোলমতো চশমা নাকে এঁটে কানে সুতো জড়িয়ে, খাতার ওপর পেন্সিল ঠুকে যতটা সম্ভব রাশভারী গলায় জানান দিল, “চায়েব চিনাবাজার টেকে চা খেয়ে এচে গেচেন। এক্কুনি একানে এচে বচবেন। চায়েবের কটাবাট্টা আপনারা কিচু বুয়বেন না, আমি টানচিলিট করে দেব, টবে বুয়বেন। চায়েবের চামনে আচবেন না, কাঁডবেন না, যা যা জিজ্ঞেচ কব্বে টাই টাই উট্টর ডেবেন, চায়েবের মুকের ডিকে টিন চেকেন্ডের বেচি টাকাবেন না। ম্যাগুনিফাইল গেলাচ নিয়ে চাহেব লোপালুপি কল্লে পিত পিত করে দেকে কিল কিল করে আচবেন না। আয়ো অনেক ‘না’ আচে, চেগুলো যাডের চেলেপুলে আলিয়েচে টাডের জন্য নয়, ছেজন্য আল বললাম না।”
গটমট করে বাঁহাতে ছোটো হুঁকো, ডানহাতে বেতের তেল চকচকে রুপো বাঁধানো ছড়ি হাতে গোয়েন্দামশাই পাশের দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকে কোনোদিকে না তাকিয়ে সোজা তক্তপোশের ওপর চেয়ারে গিয়ে বসে হুশ হুশ করে দু-খানা জব্বর টান দিয়ে হুঁকোটা মোড়ার ওপর বসা শিশুর ফতুয়ার ঢাউস পকেটের মধ্যে রেখে দিলেন। পকেটের মধ্যে শিশু যে হুঁকো রাখার জন্য বিড়ে রেখেছে কে বুঝবে? হুঁকো দিব্যি পকেটের মধ্যে সেঁধিয়ে গ্যাঁট হয়ে বসে গিয়ে ডাঁটখানা বাইরে বেরিয়ে রইল। হালকা ধোঁয়া শিশুর কানের পাশ দিয়ে উঠে ঘরে ভেসে বেড়াতে লাগল।
শিশু এবার বড়ো একটা ম্যাগ্নিফাইয়িং গ্লাস চৌচিচৌর হাতে তুলে দিল আর তিনি ম্যাগ্নিফাইয়িং গ্লাস হাতে নিয়ে তার মধ্য দিয়ে কর্মকুশল আর ধনবানকে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন। কর্মকুশল আর ধনবান অস্বস্তিতে উশখুশ করতে লাগল। এ কী রে বাবা! গোল, মোটা আতস কাচটার মধ্য দিয়ে লোকটা আবার আমাদের দেখছে কেন? ছেলেহারানো বাপের কপালে কি কোন রাস্তায় ছেলে পালাল, তার হদিস মেলে নাকি?
চৌচিচৌর চেহারা, পোশাকআশাকও তাদের বেশ চমকে দিয়েছিল বইকি। পায়ে জুতো নয়, টায়ারের স্যান্ডেল, হাঁটু পর্যন্ত তোলা আটহাতি কালো রঙে ছোবানো ধুতি, পেল্লায় বেঢপ হাঁটু-ছোঁয়া সবুজ পাঞ্জাবি। পকেটে না জানি কী আছে, এত ফুলে আছে যে মনে হচ্ছে খান দু-এক থান ইট তো আছেই, তারপরে আরও কিছু থাকলে থাকতে পারে। শিরা-ওঠা হাতের সবক’টা আঙুলে তামার তার প্যাঁচানো। চৌচিচৌর মুখ লম্বা রামগরুড়ের ছানার মতো, অর্থাৎ মুখে সবসময়ই একটা হাসি হাসি হাসব না ভাব। চোখ বড়ো, কান বড়ো আর খাড়া খরগোশের মতো। নাক খাড়া, একটু বাঁকানো, টিয়ার ঠোঁটের মতো। দাঁত উঁচু, কপালও তাই। মাথার খুপরির মাঝখান থেকেই চুলের রাজত্ব শুরু, তার আগে কোনোদিন কপালের আশেপাশে চাষাবাদ হয়ে থাকলেও তার কোনও চিহ্ন নেই এখন। মাথায় চুলের ঘাটতি পুষিয়েছে নাকের মধ্যের আর কানের ওপরের শণের গুচ্ছের মতো একগোছা লোম।
ম্যাগনিফায়িং গ্লাস নামিয়ে রেখে, শিশুর হাত থেকে খাতা নিয়ে তাতে চোখ বুলিয়ে শিশুকেই চৌচিচৌ জিজ্ঞেস করলেন, “পাখি কবে উড়ল?”
শিশু ধনবানকে জিজ্ঞেস করল, “ছেলেলা কবে পালাল?”
ধনবান বলল, “আজ্ঞে চত্তির মাসের পেত্থম বুধবার।”
চৌচিচৌ শিশুকে এবার জিজ্ঞেস করলেন, “ঠোঁটে দানা-টানা নিয়ে গেছে?”
শিশু চৌচিচৌর কথা ‘টানচিলিট’ করে ধনবান মহাজনকে জিজ্ঞেস করল, “থঙ্গে তাকাপয়তা নিয়ে গেতে?”
ধনবান মাথা নেড়ে বলল, “আজ্ঞে, না। কিরকেট না মিরকেট কী এক খেলা আছে, বাপে খেদানো মায়ে তাড়ানো, পাঠশালা পালানো ছেলেপুলেরা গাঁয়ে চালু করেছে, তাই খেলতে গেছল জঙ্গলের ধারে। সেখান থেকেই উধাও হয়েছে ওরা।”
চৌচিচৌ চট করে ম্যাগনিফাইয়িং গ্লাস দিয়ে ধনবান আর কর্মকুশলকে একনজর দেখে নিয়ে শিশুকে বললেন, “চটপট ছবি আঁকো। জঙ্গলে অমঙ্গল, মাঠে পাখিদের ক্রিকেট খেলা, বিকেল কিংবা সন্ধেবেলা। এক পাখি বল ছোড়ে, অন্য পাখি ঘুরেফিরে, বল মারে হেথা হোথা, বল ছোটে যথা তথা।”
শিশু পাখি আঁকায় বেশ ওস্তাদ বোঝা গেল। ‘দ’-এর নীচের ডান্ডাটাকে মোচড় দিয়ে ঘুরিয়ে টেনে ডানদিকে উঠিয়ে পাখির বুক-পেট এক লহমায় এঁকে, ‘দ’-এর গোড়া থেকে ডানদিকে নীচে ঝুলিয়ে আর এক টান মেরে সে গোটা পাখি আঁকে। পাখির পেটের নীচে ‘২২’ এঁকে সে পা জোড়ে, ‘দ’-এর কোমরের খাঁজে ফুটকি ফেলে সে চোখ আঁকে, তারপর পেটের মধ্যে কয়েকটা আঁকাবাঁকা কেঁচো ছেড়ে দিয়ে সে দিব্যি এক নাম-না-জানা পাখি আঁকে চোখের লহমায়। দু-মিনিটের মধ্যে জঙ্গলের পাশে পাখিদের ক্রিকেট খেলার আসর বসিয়ে ফেলে শিশু।
“জোড়া পাখি ক্রিকেট খেলতে খেলতে কখন উড়ল, অন্য পাখিরা তখন কী করছিল?”
ধনবান গাঁয়ের ছেলেদের মুখে যা শুনেছে তাই বলল। রাজুর বলে ধানু বল পিটিয়ে ফেলল জঙ্গলে আর ওই বল খুঁজতে গিয়েই ছেলে দুটো নিখোঁজ হল।
চৌচিচৌ শিশুকে বললেন, “আঁকো— এক পাখি বল ছোড়ে, অন্য পাখি মারে তেড়ে। বল ওঠে আকাশে, পাখি ভাসে বাতাসে। গাছপালা ভেদ করে, বল এসে ভুঁয়ে পড়ে। অন্ধকার অন্ধকার, পাখি ওড়ে চারধার। যায় না কিছুই দেখা, পাখি ওড়ে হেথা হোথা। কোথা গেলে বল পাই, পাখি ভাই পাখি ভাই। পথহারা দুই ভাই, কোথা যায় ঠিক নাই। গভীর বনেতে এসে, ভগ্নোদ্যম হয়ে শেষে। বল না খুঁজে পেয়ে, অশ্রু পড়ে গাল বেয়ে। এক পাখি বলে ‘ভাই, চল ফিরে ঘর যাই। অনেক হয়েছে খোঁজা, এ-কাজ নহে তো সোজা। কমপক্ষে দশ পাখি, খুঁজে দেখে প্রতি শাখী। তবে বল পাওয়া যাবে, নইলে বল বাঘে খাবে।’ এই ভাবি দুই ভাই, তুড়ি মারে তোলে হাই। পথ খোঁজে আঁকুপাঁকু, করে খুব হাঁকুডাকু। কেউ না যে দেয় সাড়া, বন মাঝে পথহারা। কোথা গেল দুই ভাই, কারও কিছু জানা নাই। চৌচিচৌ প্রতিজ্ঞা করে, জোড়া পাখি আনবে ধরে।”
এক নিশ্বাসে চৌচিচৌ পাখি হারাবার বৃত্তান্ত সাঙ্গ করলেন। শিশু এক পাতায় ছবি এঁকে ফেলল— গভীর বন, বনের ওপর দুই পাখি উড়ছে, বনের মধ্যে মাটিতে পড়ে আছে লাল টুকটুকে বল, কিন্তু পাখিরা তা দেখতে পাচ্ছে না। অন্যান্য পাখিরা কেউ ব্যাট হাতে, কেউ স্ট্যাম্প হাতে জঙ্গলের বাইরে খোলা জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। পরের পাতার ছবিতে শিশু এঁকে দেখাল কীভাবে ক্লান্ত পাখিরা কাঁদছে আর উড়ে উড়ে পথ খুঁজছে, তারপর পথ খুঁজে না পেয়ে গালে পা দিয়ে চিন্তা করছে।
আঁকা শেষ করে শিশু খাতা মেলে ধরল চৌচিচৌর সামনে। চৌচিচৌ ভালোভাবে ছবি দেখে এক-আধ জায়গায় পেন্সিল আলতোভাবে বুলিয়ে ভুল শুধরে দিয়ে আর একবার ম্যাগ্নিফাইয়িং গ্লাসের মধ্য দিয়ে কর্মকুশল আর ধনবানকে একনজর দেখে নিয়ে শিশুকে বললেন, “জেনে নাও পাখিদের নামধাম কী, বিদ্যে কতদূর। গাঁয়ের অন্য পাখিদের সঙ্গে বনিবনা আছে কি নেই। কোন ফল কিংবা পোকা ঠুকরে বেশি খায়, আশেপাশে ঈগল বা বাজপাখির বাস আছে কি না, পাখিরা আগে কোনোদিন বাসা ছেড়ে উড়ে পালিয়েছিল কি না, ইত্যাদি ইত্যাদি।”
ধনবান শিশুর ‘টানচিলিট’-এর অপেক্ষা না করে নিজে থেকেই এবার জবাব দিতে শুরু করেছিল। কেননা চৌচিচৌর কথায় শুধু পাখির জায়গায় ছেলে বসিয়ে দিলেই বাকিটা বুঝতে কারও কোনও কষ্ট হবার কথা নয়। কিন্তু পাখি কোন ফল বা পোকা খায় এবং গাঁয়ের আশেপাশে ঈগল বা বাজপাখি আছে কি না, এই প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে সে হোঁচট খেল। হোঁচট খেয়ে অসহায়ভাবে শিশুর দিকে তাকাল। শিশু তার ‘টানচিলিট’-এর সাহায্য নিচ্ছে না বলে ধনবানের ওপর এমনিতেই রেগে গিয়েছিল, এখন মাঝপথে আটকে যেতেই ভালো চোখে ছুঁচের মতো এফোঁড়-ওফোঁড় করা নজরে ধনবানকে ফুটিয়ে বাচ্চাদের মতো গাল আর ঠোঁট ফুলিয়ে, নাক কুঁচকে বলল, “বেথি বেথি, একুন নিজে নিজে বয়ে যান, আবাল আমাকে দিগ্যেত কলতে কেন আথেন? তক্কুনি তো বলে দিয়েথিলাম চায়েবের কটাবাট্টা আপনারা কিচ্চু বুয়বেন না। আমি টানচিলিট করে ডেব, টবে বুয়বেন, তা আমাল কতা কে চোনে, নিন একন বুয়ুন, বেথি বেথি।”
চৌচিচৌ এতক্ষণে ম্যাগ্নিফাইয়িং গ্লাস নিয়ে লোফালুফি শুরু করেছেন। শিশু ক’বার তার ‘চায়েব’ আতস কাচ লুফলেন তা গুনতে লাগল, “এক, ডুই, টিন, চাল, পাট…” তারপর দশ হলে “ড-অ-অ-চ!” বলে চেঁচিয়ে খাতায় লিখে রাখল। তাই দেখে ধনবান শিশুর বকুনি পর্যন্ত ভুলে গিয়ে হাঁ করে তাকিয়ে রইল। এ কী রে বাবা! জাঁদরেল গোয়েন্দা চৌচিচৌ ছেলেপুলেদের মতো একটা আতস কাচ নিয়ে লোফালুফি করছেন কেন? কর্মকুশল তার পকেট থেকে লাল ছিটের রুমাল বের করে মুখে চাপা দিল হাসি আটকাতে। কেননা শিশু আগেই বলেছে ‘ম্যাগনিফাইল গেলাচ নিয়ে চায়েব লোপালুপি করলে পিত পিত করে ডেকে কিল কিল করে আচবেন না।’ শিশুর এক চোখের নজরে সব ধরা পড়ে, সব বলতে একেবারে সব। তার ট্যাঁরা চোখ দেয়ালের দিকে ফেরানো, কিন্তু আসলে তার ট্যাঁরা চোখ আতস কাচের ওঠাপড়া লক্ষ রাখে, আর ভালো চোখ তার ঝাঁঝালো কড়া দৃষ্টিতে দেখে ধনবান আর কর্মকুশলের হাবভাব।
“আপনালা যদি চায়েবের লোপালুপি ডেকে আচেন, টবে চায়েব এক্কুনি আপনাদেল ঘাল ঢলে বেল কলে দেবেন, হ্যাঁ।” শিশু জানিয়ে দিল।
তাই শুনে নিমেষে ধনবান আর কর্মকুশল গম্ভীর হয়ে গেল।
একশো বার আতস কাচ লোফালুফি করে চৌচিচৌ শিশুকে বললেন, “জোড়া পাখির হদিস তো একরকম করেই নিয়েছি শিশু, কিন্তু টাঁকশালের বড়ো ঘণ্টি না বাজলে বুলগেরিয়া পার হয়ে ও-পারে যাই কী করে?”
শিশু ধনবানের দিকে তাকিয়ে সংক্ষেপে বলল, “এবাল ট্যাঁকেল কাপল আলগা কলো, চায়েবকে বেলগলিয়াল ও-পালে নিটে চাও তো পয়চা খয়চ কট্টে হবে।”
“আজ্ঞে কত?” বুকের ধুকপুকুনি বুকেই আটকে রেখে শুকনো গলায় ধনবান জিজ্ঞেস করল আর সেই সঙ্গে কর্মকুশলকে কনুইয়ের গুঁতো দিল সে যদি কিছু সস্তায় রফা করতে পারে। চৌচিচৌ আর শিশুর কথাবার্তা, ভাবভঙ্গি সবই তার কাছে এত রহস্যময় মনে হচ্ছিল যে সে যে সার্কাস বা ম্যাজিক দেখছে না, সেটাই তার পক্ষে বিশ্বাস করা শক্ত হয়ে পড়েছে।
এবার শিশু তাকাল চৌচিচৌর দিকে। চৌচিচৌ শিশুর পকেট থেকে হুঁকো বের করে নিয়ে বার কয়েক কষে টান দিয়ে হুঁকোটা যথাস্থানে শিশুর পকেটের মধ্যে বিড়ের ওপর বসিয়ে দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে নিজের মনে বিড়বিড় করে বললেন,
“দু এক্কে দুই, আট দুগুনি ষোলো
ঘরের দরজা খুলে চৌচিচৌ বেরোল।
দু এক্কে দুই, তিন দুগুনে ছয়
তল্পিতল্পা গুচ্যে নিয়ে শিশু পিছু লয়।
ডোডো লেনে বড়ো ভিড়, সাঁতার কাটা দায়
হ্যাটর ম্যাটর সাহেব সুবো সবাই পিছু ধায়।
দুই কুড়ি চার টাকা দিয়ে কাছিম ভাড়া করে
চিচৌ-শিশু পৌঁছল গিয়ে লালবাজারের মোড়ে।
ঘোড়া, গাধা, পঙ্খীরাজ পায় না কিছু তারা
শুয়োর-টানা ফিটন তারা করল শেষে ভাড়া।
এক মোহরে বউবাজার, দুই মোহরে কলেজ স্কোয়ার,
তিন মোহরে ঠনঠনিয়া, চার মোহরে বেলঘরিয়া।
বেলঘরিয়ায় বেলের পানা সস্তা বিকোয় দেখে
দশ টাকাতে গেলাস দু-এক নেয় যে তারা চেখে।
মনের জোরে এবার দুজন সুমুখ পানে চায়
বেলঘরিয়া পার হবার করবে কী উপায়।
আকাশে নেই হেলিকপ্টার, ডাঙায় নেই গাড়ি
বেড়াল টানা এক্কা এসে পড়ল তাড়াতাড়ি।
এক্কা টানে হুলো বেড়াল, চিচৌ-শিশু সওয়ার
পার হয়ে যায় বেলঘরিয়া হতেই সাঁঝের আঁধার।”
শিশু তার খাতায় হিসেব কষে নিয়ে বলল, “ডুচো চয় টাকা বেলগলিয়া পাল হবাল জন্য চটপট ডিয়ে ডিন, বাদবাকি পলে ডিলেও চলবে।”
শুনে ধনবানের মাথার মধ্যে একটা ভোমরা ভোঁ করে দেড় পাক ঘুরে আসতেই সে বুকে হাত দিয়ে তক্তপোশে শুয়ে পড়ে। আর কর্মকুশল চটপট পকেট থেকে তার ছিট কাপড়ের লাল রুমাল বের করে চোখে-মুখে হাওয়া দেয়। এসব দেখে শিশু বা চৌচিচৌর মধ্যে কোনও ভাবান্তর হয় না। এধরনের ঘটনা যে তারা সদাসর্বদাই দেখতে অভ্যস্ত তা কর্মকুশল দুজনের হাবভাব দেখে বুঝে নেয়। চৌচিচৌ আতস কাচ লোফালুফি করে আর শিশু তার পকেটের মধ্যে দাঁড় করানো হুঁকোর মুখ থেকে কল্কি খুলে নিয়ে দুই হাতে সাপটে ধরে হুশ হুশ করে টান দেয়।
কর্মকুশল শিশুকে বলে, “একটু জল এঁর চোখে-মুখে…”
শিশু বাধা দিয়ে বলে, “পেয়োজন নেই, টামাক কেলেই ছব টিক হয়ে যাবে।” এই বলে কল্কেতে কষে টান দিয়ে সে কর্মকুশলের হাতে তুলে দিয়ে বলে, “তোকে-মুকে ডোয়া ডিন, টামুক কাওয়ান।”
এতক্ষণে চৌচিচৌ কথা বললেন, “দুই দিয়ে ভাগ করে বাদ দাও তিন, নাও টাকা চটপট বয়ে গেল দিন।”
শিশু আবার হিসেব কষল খাতায়। তারপর বলল, “চায়েব বলে ডিয়েচেন, একচো টাকা ডিন চটপট, আমাডের চময়ের কি ডাম নেই নাকি?”
কর্মকুশল ধনবানের মুখে-চোখে কল্কের ধোঁয়া দিচ্ছিল, এবার কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে বলল, “শুনেচ খুড়ো, গোয়েন্দা সাহেব বিনি পয়সায় তোমার জোড়া ছেলে খুঁজে দেবেন, নাও ওঠো।”
ধড়মড় করে ধনবান উঠে বসল। ‘বিনি পয়সায়’ কথাটাই তার কানে ঢুকে জ্ঞান ফিরিয়ে আনবার পক্ষে যথেষ্ট।
“কী বিনি পয়সায় পাওয়া যাচ্ছে রে কম্মোকুশল?” বলে ধড়মড়িয়ে উঠতেই কর্মকুশল চুপিচুপি বলল, “ট্যাঁক খুলে শ-টাকার নোটটা এই বেলা বের করো খুড়ো। বলেছিলাম না, গোয়েন্দা সাহেবকে বেলঘরিয়া পার করাতেই যত খচ্চা? নাও কড়কড়ে নোটটা সাহেবকে পেন্নামি দাও। কোথায় দুশো ছয় আর কোথায় শ’, ভাব দিকি? সস্তার চেয়েও সস্তা। বেলঘরিয়া ছাড়ালে পর এক্কেবারে ফিরি, যাকে বলে বিনি পয়সায় ব্যাগার। হ্যাঁ গো, তাই বলেছেন গোয়েন্দা সাহেব তুমি যখন ঘুমিয়ে ছিলে। নাও, ট্যাঁকটা আলগা করো দিকিন, চটপট, এত বড়ো গোয়েন্দার পকেটে ‘টাইম’ আবার বেশি সময় থাকে না কি না, উপচে পড়ে যায়, তাই…”
একবার কর্মকুশলের মুখের দিকে, একবার শিশু-চৌচিচৌর মুখের দিকে তাকাল ধনবান।— “ছেলে দুটোকে ফিরে পাব তো সাহেব? তাড়াতাড়ি ফিরে পাব তো? এই নিন, এই নিন টাকা। তাড়াতাড়ি ধরে আনবেন তো?”
ট্যাঁক থেকে টাকাটা বের করে চৌচিচৌকে দিতে গেলে শিশু ভ্রূ কুঁচকে বলল, “চায়েব টাকা নেন না, আমাকে ডিন।”
শিশু নোটটা নিয়ে চৌচিচৌর চোখের সামনে ভালোভাবে মেলে ধরল আর চৌচিচৌ আতস কাচের মধ্য দিয়ে জলছাপ থেকে শুরু করে নোটের দু-পাশে যা কিছু লেখা ছিল সব ভালো করে পড়ে নিয়ে শিশুকে বললেন, “অতএব টাঁকশালের ছোটো ঘণ্টা বাজল, শিশু। নোট ডাউন, বুধবার ভোর পাঁচটায় যাত্রা, আর. জি. করের সামনে উভয়পক্ষের রথ ও সারথি চাই, মার্টিন সাহেবের ট্রেনে চড়ে গোক্ষুর যাব আমরা।”
শিশু টানচিলিট করল, “ছোমবার লিকচা নিয়ে আল. জি. কলের ছামনে ডালাবেন। আমলা আচব, আপনালা আচবেন, টালপল… টালপল হ্যাঁ, আপনাডের ছঙ্গে লেলগালিতে চলে গোক্কুল যাট্টা কব্বো। কেমন, মনে ঠাকবে টো? ঢন্যবাড।”
রাস্তায় নেমে ছিট রুমালে নিজের কপালের ঘাম মুছে, ধনবানের কোঁচা খুলে মাথা, বুক, পেটের ঘাম যত্ন করে মুছিয়ে দিয়ে কর্মকুশল একগাল হেসে বলল, “বলেছিলাম না খুড়ো, মস্ত বড়ো গোয়েন্দা? সগ্গো মত্ত পাতাল যেখানেই নুইক্যে থাকুক, দেখবে তোমার ছেলেরা এবার পড়িমড়ি করে, বাপ বাপ করে ছুট্টে এসে গোয়ালে ঢুকবে। কম্মোকুশল শুধু লোহাই পেটায় না, গুণী লোকেরও আঁতিপাঁতি খবর রাখে।”
ধনবান ট্যাঁকে হাত বুলোতে বুলোতে মনের দুঃখ মনেই চেপে রেখে বলতে চাইল ‘হুঁ’, কিন্তু তার জড়িয়ে আসা গলা দিয়ে কেঁপে কেঁপে যে শব্দটা বেরোল তা ‘হুঁ’ নয়, ‘উহুঁহুঁ’।
দশ
জঙ্গলের পর জঙ্গল, তার পরে জঙ্গল, তার পরেও জঙ্গল আর তার মধ্যে সেই ইটখসা পুরোনো বাড়িটার নীচের কুঠুরির মধ্যে দেখতে দেখতে ধানু-রাজুর প্রায় একমাস কেটে গেল। লম্বা দাড়িওয়ালা কাপালিক রোজ সকালে এসে একবার সংস্কৃত-ঘেঁষা ভাষায় খোঁজ নেন দুই ভাইয়ের, “তোমাদের দুই ভ্রাতার আহার, নিদ্রা এবং ক্রীড়ায় কোনও বিঘ্ন উপস্থিত হয়নি তো?”
একমাস চর্ব্য চোষ্য লেহ্য পেয় খেয়ে খেয়ে ধানু-রাজু এখন বেশ মোটা, গোলগাল চেহারার হয়ে গেছে। আগে বিশাল ভুঁড়ি, পৈতেওয়ালা ক্রমার্ক কাপালিকের সংস্কৃত-ঘেঁষা ভাষার অনুবাদ করে দিত, এখন আর সেটা দরকার হয় না। ধানু-রাজু মোটামুটি কাপালিকের কথা বুঝতে পারে, এমনকি কখনো-কখনো শুদ্ধ ভাষায় দু-একটা কথা বলতেও পারে। যেমন এখন কাপালিকের প্রশ্নের জবাবে ধনরাজ বলল, “ওসব তো অতি উত্তম, দাদু। কিন্তু আমাদের ক্রিকেট আইল্যান্ডে কবে স্থানান্তরিত করবে সেটা পরিষ্কার জানিয়ে দাও বাপু।”
ধনমান বলল, “জঙ্গলের মধ্যে ক্রিকেট খেলতে আমাদের আর ভালো লাগছে না। ভালো বোলার নেই, ফিল্ডার নেই, ধুর আমার তো ভাল্লাগে না এখানে আর। চল রাজু, আমরা বরং গোক্ষুরে ফিরে যাই নিজের বাড়িতে।”
কাপালিক লম্বা পাকা দাড়িতে হাত বুলিয়ে মৃদু হেসে বললেন, “আর মাত্র দুই দিবস অপেক্ষা করো, তারপর তোমাদের অভিষেক হবে অমাবস্যার রাত্রে কালীমাতার মন্দিরে। অতঃপর তোমাদের আমি অর্পণ করব ভারতের ক্রীড়ামন্ত্রী ঘিয়া সিং বাইগনের করকমলে। উনি তোমাদের ক্রিকেট আইল্যান্ডে স্থানান্তরিত করার উপযুক্ত ব্যবস্থা করবেন।”
ধানু-রাজু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। যাক, এতদিনে ক্রিকেট আইল্যান্ডে গিয়ে ফাস্ট বোলার ভিলবার্ট র্যামহরি আর নাটা ব্যাটসম্যান পিটার ফার্টের সঙ্গে ক্রিকেট খেলার সুযোগ পাবে ওরা।
সেদিন বিকেলে যখন ভুঁড়িওলা ক্রমার্ক আর লম্বা প্যাঁকাটে ঘ্রাঘনখ ব্যাট-বল নিয়ে ওদের সঙ্গে ওই ভূতুড়ে বাড়িটার পিছনে ওদের জন্য তৈরি করা পিচে ক্রিকেট খেলতে এল, ওদের মধ্যে নতুন উৎসাহ লক্ষ করে ক্রমার্ক ঘ্রাঘনখকে বলল, “এই দুই বালকের মধ্যে যে নতুন উদ্যম প্রত্যক্ষ করছি তার কী কারণ হতে পারে?”
ঘ্রাঘনখ ওর টাক চুলকে বলল, “নিশ্চয়ই গুরুদেব ওদের কিছু বলেছেন।”
“দু-দিন পরে তো ওদের মা ছিন্নমস্তার সামনে বলি হবে, কিন্তু ছাগল দুটো এখনও মনের আনন্দে বল পিটিয়ে যাচ্ছে।”
ঠিক সেই মুহূর্তেই রাজু ধানুর বল এত জোরে পেটাল যে বল চলে গেল জঙ্গলের অনেক ভেতরে। যথারীতি ঘ্রাঘনখ চলে গেল বলের সন্ধানে আর ক্রমার্ক রইল মাঠে ধানু-রাজুর পাহারা দিতে।
ধানু বলল, “দাড়িওয়ালা দাদুর সঙ্গে সকালে কথা হয়েছে আমাদের। অমাবস্যার রাতে কালী মার সামনে অভিষেক করিয়ে ভারতের ক্রিকেট মন্ত্রী ঘিয়া সিং বাইগনের হাতে আমাদের তুলে দেওয়া হবে। উনি আমাদের পাঠিয়ে দেবেন ক্রিকেট আইল্যান্ডে ট্রেনিংয়ের জন্য।”
ক্রমার্ক মুচকি হেসে বলল, “অতি উত্তম।”
“হাসছ কেন তুমি?” জিজ্ঞেস করল রাজু।— “দাড়িওয়ালা বুড়ো কি ঠাট্টা করেছে আমাদের সঙ্গে?”
ক্রমার্ক বলল, “না না, আমি হাসছি এই জন্য যে তোমাদের দুজনের এই ক্রিকেট খেলায় ফিল্ডিং দেওয়া থেকে মুক্তি পাব আমরা দুজন।”
ক্রমার্ক ভাবছিল, এই জোড়া পাঁঠার অমাবস্যার রাতে ভালোভাবে বলি হয়ে গেলে কাপালিকের তান্ত্রিক ক্ষমতা অনেক বৃদ্ধি পাবে। তখন কাপালিককে বশীকরণ আর সম্মোহন শেখাবার কথা তুলবে ও। আর কতদিন এই ভাঙা বাড়িতে কাপালিকের সেবা করবে ক্রমার্ক? ক্ষমতা অর্জন করলে লাল কাপড় পরে, মাথায় লাল বড়ো টিকা লাগিয়ে গোক্ষুর বা পাতাহাটিতে গিয়ে শ্মশানের কাছে ছিন্নমস্তার থান বানিয়ে নিজের ব্যাবসা শুর করবে ও। কিন্তু তার আগে ওকে যে কাজটা করতে হবে সেটা ওর মোটেই পছন্দের নয়। জোড়া পাঁঠাকে বলি দেবার গুরুদায়িত্বটা যে ওরই ঘাড়ে এসে পড়েছে। তান্ত্রিকের আদেশে কবুতর থেকে পাঁঠা ক্রমার্ক অনেক বলি দিয়েছে গত তিন বছরে, কিন্তু জলজ্যান্ত দুটো ছেলেকে কচুকাটা করার কথা চিন্তা করলে ওর হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসে। মিনমিন করে তান্ত্রিককে ও একবার বলেছিল ঘ্রাঘনখকে কাজটা সঁপে দেবার জন্য, কিন্তু তান্ত্রিক গম্ভীরভাবে সাদা বাংলায় জানিয়ে দিয়েছেন, “সম্মোহন, বশীকরণ যদি শিখতে চাও তবে বলিটা তোমাকেই দিতে হবে। ঘ্রাঘনখের মতো দুর্বল ব্যক্তির কাজ নয় এটা। শুধু শক্তি নয়, ভক্তি আর একাগ্রতারও প্রয়োজন আছে এই কাজে। দেবী ছিন্নমস্তার আশীর্বাদ না পেলে তুমি তান্ত্রিক বিদ্যার অধিকারী হবে কী করে?” ক্রমার্ক তাই তান্ত্রিকের আদেশ অমান্য করার সাহস জুগিয়ে উঠতে পারেনি।
ধানু-রাজু একসময় এসে ওর পাশে দাঁড়াল।
“কী চিন্তা করছ তুমি এত?” জিজ্ঞেস করল রাজু।— “আমাদের ছেড়ে থাকতে কষ্ট হবে তোমার, তাই না?”
ঘ্রাঘনখ আর ক্রমার্ক ওদের এই দুই পরিচারক এবং খেলার সাথীর মধ্যে ক্রমার্ককেই বেশি পছন্দ ওদের দুজনার। কাপালিকের সামনে ওর সাধুভাষায় কথা বলার চেষ্টা দেখে ওরা যেমন হাসাহাসি করে তেমনি খেলাচ্ছলে কখনও ওর ভুঁড়িতে সুড়সুড়ি বা চিমটি কাটলেও ক্রমার্ক ওদের কিছু বলে না, কিন্তু ঘ্রাঘনখের টাক নিয়ে মশকরা করলে ও ওদের গাঁট্টা মারতে ছাড়ে না।
ক্রমার্ক ধানু-রাজুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, “কষ্ট তো একটু হবেই। এতদিন তোমাদের সঙ্গে ক্রিকেট খেললাম, এখন একা হয়ে যাব। এই জঙ্গলে একা একা থাকতে কারও ভালো লাগে, বলো?”
“তাহলে জঙ্গল ছেড়ে অন্য কোথাও যাও না কেন তোমরা?” জিজ্ঞেস করল ধানু।
“সে অনেক কথা। নাও, তোমাদের বল এসে গেছে। খেলো গিয়ে তোমরা। বেশি জোরে পিটিও না, সন্ধে হয়ে আসছে, জঙ্গলে বল খুঁজে পাওয়া যাবে না।”
রাজু ঘ্রাঘনখকে জিজ্ঞেস করল, “এত সময় লাগল কেন তোমার বল খুঁজতে?”
ঘ্রাঘনখ লম্বা মুখটা আরও লম্বা করে বলল, “জঙ্গলে একটা বুনো শুয়োর তাড়া করেছিল আমায়। অনেক কষ্টে বল নিয়ে ফিরেছি। আবার বল জঙ্গলে গেলে আমি খুঁজতে যেতে পারব না।”
“অদ্যকার ক্রীড়া এখানেই সমাপ্ত।” ক্রমার্ক ঘোষণা করল।
“আর কল্য কোনও ক্রীড়া হইবেক না।” বলল ঘ্রাঘনখ।
“কেন? কাল কেন খেলতে পাব না আমরা?” জিজ্ঞেস করল ধানু-রাজু।
“অমাবস্যা পুজোর আগের দিন আমাদের অনেক কাজ থাকে, তাই তোমাদের সঙ্গে থাকতে পারব না আমরা।” বলল ক্রমার্ক।
“তোমরা না থাকলে আমরা দুজনে এখানে এসে বল খেলব।”
ঘ্রাঘনখ বলল, “অসম্ভব।”
ক্রমার্ক বলল, “কাল বরঞ্চ বিকেলে তোমাদের আমি জঙ্গলের মধ্যে একটা সুন্দর জায়গা দেখিয়ে আনব। ওখানে সরোবর আছে, পাখপাখালি আছে, ফল-ফুলের গাছ আছে, আরও…”
ঘ্রাঘনখ অবাক চোখে ক্রমার্কের দিকে তাকালে ও চোখ টিপে দিল শুধু এটা জানাতে যে ও মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে ছেলে দুটোকে, কারণ বলির পাঁঠা দুটোকে ভালোভাবে সামলে রাখাই এখন ওর কাজ হবে। শরীরে কোনোরকম কাঁটাছেঁড়া না হয়, কোনও খুঁত যেন না থাকে সেটা দেখাই হবে ক্রমার্কের দায়িত্ব।
রাতে খাওয়ার আগে ওদের মেঝের নীচের কামরায় আবার এলেন কাপালিক, সঙ্গে ক্রমার্ক। তাঁর মুখের মিষ্টি হাসিটা গিরগিটির হাসির মতো মনে হল ধানু-রাজুর। রাতে সাধারণত কাপালিক ওদের ঘরে আসেন না, তাই ওরা একটু অবাক হল। খটোমটো বাংলায় নয়, কাপালিক সোজাসুজি সাদা বাংলায় ওদের বললেন, “পরশু তোমাদের অভিষেক হবে দেবীর সামনে। কাল তোমরা এ-ঘর ছেড়ে বেরোবে না।”
ধানু ব্যাজার মুখ করে বলল, “সারাদিন আমরা ঘরে বসে কী করব?”
“লুডো খেলবে তোমরা।” বলল ক্রমার্ক।
কাপালিক বললেন, “আর কাল তোমাদের জন্য বিশেষ ভোজের আয়োজন করা হয়েছে। তণ্ডুল আর কোনও আমিষ পদ থাকবে না ওতে, দুগ্ধজাত খাদ্য খেতে হবে তোমাদের। লুচি, আলুর দম, পায়েস খাবে তোমরা।”
“লুডো খেলব, লুচি খাব।” রাজু বলল, “অতি উত্তম।”
“পায়েস খাব আর পালটি মারব, অতি উত্তম।” বলল ধানু।
ক্রমার্ক মনে মনে বলল, ‘যা-ই করো, ওটাই তোমাদের শেষ ভোজন হবে।’
“বিকেলে জঙ্গলে যাব না আমরা সরোবর আর পাখপাখালি দেখতে?” জিজ্ঞেস করল রাজু ক্রমার্কের দিকে তাকিয়ে।
কাপালিক বললেন, “বনভ্রমণ আপাতত স্থগিত রাখতে হবে তোমাদের। অভিষেক শেষ হয়ে গেলে বিবেচনা করা যাবে।”
ধানু-রাজু এবার একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল, “ক্রমার্ক কথা দিয়েছে আমাদের সরোবর দেখাবে, পাখি দেখাবে।”
কাপালিক এবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন ক্রমার্কের দিকে।— “এই আশ্বাস বাক্য দেবার অনুমতি তোমাকে দিইনি আমি, ক্রমার্ক। কী করে তুমি…”
ক্রমার্ক হাতজোড় করে বলল, “গুরুদেব, আপনিই তো আমাকে বলেছিলেন, যূপকাষ্ঠে সমর্পণ করার আগে বধ্যদের ক্ষুদ্র ইচ্ছা পূরণ করা অভিপ্রেত। ওদের সরোবরে পাখি দেখার অতীব ইচ্ছে হয়েছে, তাই ওদের আমি আশ্বাস দিয়েছি কাল বিকেলে অল্প সময়ের জন্য ওদের জঙ্গল ঘুরিয়ে আনব।”
কপালিক দাড়িতে আঙুল বুলিয়ে বললেন, “তথাস্তু। এক ঘণ্টা বনভ্রমণের অনুমতি দিলাম। সন্ধ্যার পূর্বেই প্রত্যাগমন করবে তোমরা। এর অন্যথা হলে শাস্তি পেতে হবে তোমাকে।”
ক্রমার্ক হাতজোড় করে বলল, “যথা আজ্ঞা, গুরুদেব।”
ক্রমার্কের কথা বুঝতে পারেনি ধানু-রাজু। যূপকাষ্ঠ, বধ্য এসব শব্দ আগে শোনেনি ওরা। নিজেদের মধ্যে চাওয়চাওয়ি করল ওরা। তারপর ধানু হেসে বলল, “অতি উত্তম।”
এগারো
অনেক বাধাবিপত্তি কাটিয়ে, অনেক টাকা খরচ করে শেষ পর্যন্ত ধনবান আর কর্মকুশল ডোডো লেনের সুবিখ্যাত গোয়েন্দা চৌকশ চিরকুমার চৌধুরী, ওরফে চৌচিচৌ আর তাঁর অ্যাসিস্ট্যান্ট শিবনাথ শুঁড়ি ওরফে শিশুকে নিয়ে এল গোক্ষুর গাঁয়ে। ধনবানের বাড়িটা এক পাক দিয়ে, ঘরে ঢুকে ধানু-রাজুর বই-পুথি, কাপড়চোপড় শুঁকে আর ওদের খেলার জিনিসগুলো দেখে এবং গাঁয়ের ছেলেদের ডেকে কয়েকটি প্রশ্ন করে চৌচিচৌ আবিষ্কার করলেন, ধানু-রাজুর ব্যাট, বল এবং স্টাম্প কয়েকদিন আগে একরাতে চুরি হয়ে গিয়েছে। পকেট থেকে বিশাল এক রুমাল বের করে চৌচিচৌ মুখ পুঁছে বললেন, “হুম। মনে হচ্ছে পাখিরা এসে ওদের খেলার সামগ্রী নিয়ে গেছে। অকুস্থলে যাওয়া যাক এবার। চটপট আমার হুঁকো তৈরি করো, শিশু।”
ধনবানের বউ ‘ও ধানু-রাজু রে, কোথায় গেলি রে’ বলে বিছানা ছেড়ে উঠে কোঁকাতে কোঁকাতে রান্নাঘরে গিয়ে শিশুর কল্কেতে আগুন ধরিয়ে দিল।
“আমার বাছারা কবে ফিরে আসবে, বাবারা?” জিজ্ঞেস করল ছেলেহারানো মা।
চৌচিচৌ বললেন, “নিশ্চিন্ত থাকুন মা, আজ সন্ধের আগেই ফিরবে ওরা ঘরে।”
ধনবান, কর্মকুশল আর গাঁয়ের দুটো ছেলেকে, যারা দূর থেকে ধানু-রাজুর খেলা দেখেছিল সেদিন, ওদের নিয়ে চৌচিচৌ এবার চললেন অকুস্থলে, জঙ্গলের পাশের সেই মাঠে যেখানে শেষবার দেখা গিয়েছিল ধানু-রাজুকে। ছেলে দুটো ওদের দেখাল মাঠের কোন জায়গা থেকে বল পিটিয়েছিল ধনরাজ আর মাঠ পেরিয়ে জঙ্গলের কোন দিকে বল গিয়ে পড়েছিল।
আর একবার ‘হুম’ বলে শিশুর বিশাল পকেট থেকে ছোটো হুঁকো বের করে চৌচিচৌ গুড়ুক গুড়ুক করে কয়েক টান দিয়ে মাথা পরিষ্কার করে নিয়ে বললেন, “নাও শিশু, এবার পাখির যে ছড়াটা আমি ডিক্টেট করেছিলাম আমার ডোডো লেনের অফিসে বসে, সেটা পড়ে শোনাও দেখি।”
“এক্কুনি ছোনাচ্ছি, চায়েব।” বলল শিশু। তারপর কাঁধের ঝোলা থেকে বের করল ওর ডায়েরি। গলা খাঁকারি দিয়ে ও বলল, “ছোনো ছবাই, চায়েব কীভাবে ডোডো লেনে বছে গোক্কুর গাঁয়ে কী হয়েচে তা বুজে গিয়েচেন তা ছোনো ছবাই। হাতজোড় করে ছোনো, যেমন সত্যনারায়ণের পাঁচালি ছোনো তোমরা।”
ডায়েরি খুলে সুর করে পাখির পাঁচালি পাঠ করতে শুরু করল শিশু—
“এক পাখি বল ছোড়ে, অন্য পাখি মারে তেড়ে
গাছপালা ভেদ করে, বল এসে ভুঁয়ে পড়ে
অন্ধকার, অন্ধকার, পাখি ওড়ে চারধার…”
পাখির পাঁচালি শেষ হলে সবাই তালি দিল, কারণ ওর শেষ দুটো লাইন খুবই আশাব্যঞ্জক ছিল—
‘কোথা গেল দুই ভাই, কারও কিছু জানা নাই
চৌচিচৌ প্রতিজ্ঞা করে, জোড়া পাখি আনব ধরে।’
চৌচিচৌ বলল, “পাখিরা এই জঙ্গলেই কোথাও লুকিয়ে আছে। জঙ্গলে ঢুকতে হবে আমাকে। তোমরা সব এখন ঘরে ফিরে যাও। সন্ধের আগেই ওদের দুজনকে নিয়ে ফিরব আমি।”
ধনবান বলল, “আমিও আপনার সঙ্গে যাব ছেলেদের খুঁজতে।”
শিশু বলল, “নট অ্যালাউড। চায়েবের ছঙ্গে আমি ছালা আল কেউ যাবে না।”
ধনবান বলল, “কিন্তু এই জঙ্গল খুব ঘন। অন্ধকার আর বনবেড়াল, বুনো শুয়োর, এসবও আছে এখানে।”
শিশু বলল, “আপনালা একদম ভাববেন না, চায়েবের ছঙ্গে ছব আছে, তাই না চায়েব?”
চৌচিচৌ মৃদু হেসে তাঁর হাঁটু ছোঁয়া সবুজ পাঞ্জাবির বিশাল দু-পকেট থেকে একে একে বের করে দেখালেন একটি তিন ব্যাটারির টর্চ, একটা ন’ফলা মাল্টিপারপাস সুইস নাইফ, ম্যাগ্নিফাইয়িং গ্লাস, এক বান্ডিল দড়ি আর একটা কম্পাস। আশ্বস্ত হয়ে ধনবান এবং ছেলে দুটো আওয়াজ দিল, “চৌচিচৌ গোয়েন্দা কি জয়! শিশু কি জয়!” তারপর ওরা যে যার কাজে চলে গেল।
চৌচিচৌ একবার তাকালেন জঙ্গলের দিকে। তারপর বললেন, “কম্পাস খুলে উত্তর-দক্ষিণ ঠিক করে নাও শিশু, আমরা উত্তর-পুব দিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমে যাব যাতে জঙ্গলের বেশিরভাগ আমাদের ডানদিকে পড়ে। খাবার কী সঙ্গে আছে তোমার?”
“মুলি আল কদমা, চায়েব।”
“ভেলি গুড। তামাকের স্টক?”
“একপো’ল একটু কম।”
“চলবে। কম্পাস খোলো, জঙ্গল চলো।”
চৌচিচৌ আর শিশু সদর্পে জঙ্গলে ঢুকলেন। শ্যাওড়া গাছের ডালে পেতো ভূত আর মেটো ভূত পাতা আর মাটি খেয়ে ঘুমোচ্ছিল, শুকনো পাতার ওপর চৌচিচৌর টায়ারের স্যান্ডেলের আওয়াজ শুনে সজাগ হয়ে পেতো বলল, “দেঁখ কাঁণ্ড, ধঁনবাঁন গোঁয়েন্দা হাঁজির কঁরেছে ছেঁলে খুঁজতে।”
মেটো বলল, “সঁঙ্গে আঁবার এঁকটা চেঁলা নিঁয়ে এঁসেঁছে ব্যাঁটা।”
“এঁখন কীঁ হঁবে রে মেঁটো?” জিজ্ঞেস করল পেতো।
“ঘোঁড়ার ডিঁম হঁবে।” বলল মেটো, “যেঁমন গোঁয়েন্দা, তেঁমন তাঁর চেঁলা। ওঁরা দুঁজনেই এঁই জঁঙ্গলে পঁথ হাঁরাবে, দেঁখে নিঁস তুঁই।”
ভবিষ্যৎবাণীতে মেটোর জুড়ি নেই জানে পেতো, তাই মাথা নেড়ে বলল, “ঠিঁক, কিঁন্তু তাঁরপর কীঁ হঁবে, মেঁটো?”
“ ওঁয়েট অ্যাঁন্ড সিঁ।” সাহেবি ভূতের মতো ইংরেজিতে বলল মেটো।
জলাশয়টা মন্দির থেকে বেশি দূরে নয়। ক্রমার্ক এখানে আসে বিশেষ পুজোর জন্য পদ্মফুল তুলতে। জলে ভেসে বেড়ায় কয়েকটি পাটকিলে রঙের বুনোহাঁস, পানকৌড়ি, আর পুকুরের একপাশে যে বাঁশঝাড়, তাতে বসে থাকে দুটো মাছরাঙা পাখি সুযোগ বুঝে জলে ঝাঁপ দিয়ে মাছ ধরবার আশায়। এই পুকুরে ছোটোবড়ো মাছ আছে অনেক যা জাল ফেলে ধরার দায়িত্ব ঘ্রাঘনখের ওপর দিয়েছেন কাপালিক। পুকুরের চারপাশে জবা ফুলের গাছ আছে, আর আছে পেয়ারা, আম, আমলকির গাছ।
ধানু-রাজু জঙ্গলের মধ্যে পুকুর দেখে অবাক হল, খুশিও হল। ওরা দুজনেই গেল আমলকি আর পেয়ারা ছিঁড়তে। ক্রমার্কের মনে হল, আগামী কাল মধ্যরাতে এদের দুজনকে বলি দিতে ওর হাত কেঁপে যাবে। একমাস ওদের খাইয়ে-পরিয়ে, ওদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলে ওদের ওপর মায়া পড়ে গেছে ক্রমার্কের। এই ভয়াবহ কাজটা করে সে কাপালিকের কাছ থেকে শিখবে সম্মোহন ও বশীকরণ মন্ত্র। কিন্তু কাপালিকের মন বোঝা দায়। ও যদি শেষে পিছিয়ে যায়? ক্ষমতার লোভে ও যদি আরও বলি চড়াতে চায় ছিন্নমস্তার সামনে? লোকালয় থেকে আরও নিষ্পাপ ছেলেকে ধরে আনার দায়িত্ব দেয় ওকে? ও যদি শর্ত রাখে দশটা ছেলেকে ছিন্নমস্তার সামনে বলিতে চড়ানোর পরই ও শেখাবে সম্মোহন ও বশীকরণ বিদ্যা? পুলিশ তদন্তে নেমে পড়লে নরহত্যার কোনও অভিযোগ তো কাপালিকের বিরুদ্ধে যাবে না, ক্রমার্ককেই দায়ী করা হবে। ফাঁসির সাজা হবে ওর, কমপক্ষে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। এর থেকে পাতাহাটিতে শিবু ময়রার দোকানে ভিয়েনের কাজ করে জীবন কাটিয়ে দেওয়া অনেক ভালো। ক্রমার্ক ঘাটের পৈঠাতে বসে দেখল, ধানু-রাজু মহানন্দে ডাঁসা পেয়ারা খাচ্ছে পুকুরের ও-পাড়ে বসে, দুজনের হাতে কয়েকটা জবা ফুল। ওই জবা ফুল আর রক্তচন্দন ওদের মাথায় ছুঁইয়ে ওদের বলিতে চড়ানো হবে কাল রাতে। ক্রমার্ক হাততালি দিল— “ধানু-রাজু শীঘ্র এসো, তোমাদের গৃহে প্রত্যাবর্তনের সময় উপস্থিত।”
ধানু-রাজু পেয়ারা খেতে খেতে আওয়াজ দিল, “আসছি।”
ক্রমার্ক এবার নিজেই এগিয়ে গেল পুকুরের ও-পাড়ে। ওরা তখনও পেয়ারা চিবিয়ে যাচ্ছিল। ক্রমার্ক এবার শুদ্ধ ভাষা পুরোপুরি বর্জন করে সাদামাটা বংলায় বলল, “চলো তোমাদের আরও একটা সুন্দর জায়গায় নিয়ে যাচ্ছি আমি। সেখানে আরও একটা পুকুর আর পাখি দেখবে, ফল খাবে তোমরা।”
“তাই?” বলল রাজু।— “চল দাদা, এই ভুঁড়িওয়ালার সঙ্গে আর একটু ঘুরে নিই আমরা।”
“কিন্তু সন্ধে হয়ে গেলে ফিরব কী করে আমরা?” জিজ্ঞেস করল ধানু।
ক্রমার্ক এবার ওর ফতুয়ার পকেট থেকে একটা কেরোসিনের ছোটো কাচের কুপি বের করল, আর একটা দেশলাই। জঙ্গলে বেরোলে এটা ও সর্বাদাই সঙ্গে রাখে। ওগুলো ওদের দেখিয়ে ক্রমার্ক বলল, “কোনও ভয় নেই, আলো জ্বালিয়ে নিলে আমাদের চলতে কোনও অসুবিধে হবে না।”
ক্রমার্ক ওদের নিয়ে ক্রমশ গভীর জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে গেল। একটু পরে ও কুপিটা জ্বালিয়ে নিল কেননা ঘন জঙ্গলে সামনে পিছনে কিছুই নজর আসছিল না ওদের। ঘরে ফেরা পাখিদের কিচিরমিচির আর পাখা ঝাপটানোর শব্দ শুনতে পাচ্ছিল ওরা, দু-একটা বন্যপশুর উৎকট চিৎকারও কানে ভেসে আসছিল ওদের। কিন্তু আধঘণ্টা চলার পরেও কোনও পুকুর দেখতে পেল না ওরা, ফলের গাছও দেখা গেল না।
ধানু বলল, “কোথায় তোমার পুকুর, কোথায় তোমার ফলের গাছ?”
ক্রমার্ক এবার একটা ঝাঁকড়া সেগুন গাছের নীচে দাঁড়িয়ে বলল, “শোনো ছেলেরা, আমরা আর ওই ইটখসা পুরোনো বাড়িটায় ফিরে যাচ্ছি না।”
রাজু বলল, “তাহলে কোথায় যাব আমরা?”
“যেখান থেকে তোমরা এসেছ, সেই গোক্ষুর গাঁয়ে।”
ধানু-রাজুর মুখ হাঁ হয়ে গেল। এ পেটমোটাটা কী বলছে? ধানু দাঁড়িয়ে পড়ল। বলল, “আমরা বাড়ি ফিরতে চাই না, আমরা ওই পুরোনো বাড়িটায় ফিরে যেতে চাই।”
রাজু বলল, “দাড়িওয়ালা দাদু আমাদের ক্রিকেট আইল্যান্ডে পাঠাবে কথা দিয়েছে। কাল আমাদের অভিষেক হবে, তারপর প্লেনে করে আমরা চলে যাব দিল্লি।”
“খেল মন্ত্রী ঘিয়া সিং বাইগনের কাছে।” বলল ধানু।
“তোমাদের কোথায় পাঠানোর ব্যবস্থা হয়েছে সেটা তোমরা জানো না।” ক্রমার্ক বলল কুপিটা ওদের মুখের সামনে ধরে। অর্বাচীন এই বালকদের ভ্রম ভাঙাতে হবে এখন, নইলে এরা ওর কথা শুনবে না, ভাবল ক্রমার্ক।
“কী বলছ তুমি? আমাদের ইন্ডিয়ান টিমে জায়গা হবে ক্রিকেট আইল্যান্ডে তিন বছর ভিলবার্ট র্যামহরি আর পিটার ফার্টের সঙ্গে প্র্যাকটিস করার পর।”
ক্রমার্ক এবার ভুঁড়ি নাচিয়ে খ্যাক খ্যাক করে খটাসের মতো হেসে উঠল।— “কাপালিক তোমাদের যমরাজের টিমে খেলতে পাঠাবে কাল মাঝরাতে। কাল সকালে রামদাটা শানানোর কথা আমার। মাঝরাতে মাথায় লাল টিকা লাগিয়ে, কানে জবা ফুল গুঁজে ছিন্নমস্তার সামনে হাড়িকাঠে ফেলে তোমাদের পাঁঠার মতো বলি দেবার কাজটা যে আমাকেই দেওয়া হয়েছে, সেটা তোমরা জানবে কী করে?”
ধানু-রাজুর মুখ হাঁ হয়ে গেল।— “কী বলছ তুমি? আমাদের ভাওতা দিয়েছে ওই দাড়িওয়ালা বুড়ো?”
ক্রমার্ক মাথা দোলাল।— “ও অনেক তন্ত্রমন্ত্র জানে, আরও শক্তি অর্জন করতে চায় তোমাদের বলি দিয়ে ছিন্নমস্তার সামনে। বলো এবার, তোমরা ফিরে যাবে ওই ভাঙা বাড়িটায়?”
ধানু-রাজু একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল, “না!”
“তবে চুপচাপ ঘরে ফিরে চলো আমার সঙ্গে। আমি তোমাদের বাড়ির কাছে ছেড়ে দিয়ে চলে যাব পাতাহাটি। ওখানে একটা মিষ্টির দোকানে কাজ করতাম আমি। দেখি তিন বছর পরে কাজটা ফিরে পাই কি না আবার।”
ধানু-রাজু আর কোনও কথা না বলে কুপির আলোয় ক্রমার্কের সঙ্গে চলতে লাগল জঙ্গলের মধ্য দিয়ে।
বারো
ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে প্রায় তিন ঘণ্টা কম্পাসের সাহায্যে উত্তর-পুব থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম হেঁটে চৌচিচৌ ও শিশু আবিষ্কার করলেন ওঁদের কম্পাস কাজ করছে না, তার মানে পথভ্রষ্ট হয়েছেন। আরও সহজভাবে বললে, ওঁরা জঙ্গলে পথ হারিয়েছেন।
“হল্ট!” আদেশ দিলেন চৌচিচৌ।— “লাঞ্চের ব্যবস্থা করো, শিশু। তারপর আমাদের কোর্স কারেকশন করতে হবে, না হলে পাখি ধরা যাবে না।”
‘কোর্স কারেকশন’ কথাটা এর আগে শোনেনি শিশু, কিন্তু ও জানে ওটা ইংরেজি শব্দ। একটা গোলমাল হয়েছে, সাহেব সেটা শোধরাতে চান। শিশু চটপট ঝোলা থেকে মুড়ি আর কদমা বের করল। শালপাতায় খেতে দিল সাহেবকে, সামনে রাখল ছোটো একটি জলের বোতল। শিশু নিজের জন্য ওর কোঁচড়েই মুড়ি ঢেলে ওখান থেকে খেতে শুরু করল।
“এত্তা কতা বলব, চায়েব?” খেতে খেতে জিজ্ঞেস করল শিশু।
“খাওয়ার সময় নো স্পিকিং শিশু, কতবার বলেছি তোমাকে!” বললেন চৌচিচৌ একটা কদমা মুখে ফেলে।
এই শিশুকে নিয়ে আর বেশিদিন চালানো যাবে না, চৌচিচৌ ভাবলেন জঙ্গলের মধ্যে একটা বেজিকে দৌড়ে যেতে দেখে। বাচ্চার মতো কথাবার্তা, বুদ্ধিসুদ্ধিও তেমনি। কম্পাসটা যে কাজ করছে না সেটা বুঝতে পুরো তিন ঘণ্টা লাগিয়ে দিল ব্যাটা! শার্লক হোমসের চাই ওয়াটসনের মতো চৌকশ সহকারী। নাহ্, ডোডো লেনে ফিরে গিয়ে অন্য লোক খুঁজতে হবে চৌচিচৌকে। শিশুকে ঘরদোর পরিষ্কার করা আর তামাক সাজার কাজেই লাগাতে হবে।
মুড়ি-কদমা খেয়ে, জলের বোতল থেকে কিছুটা জল খেয়ে চৌচিচৌ ইঙ্গিতে জানিয়ে দিলেন, এখন তাঁর তামাক সেবন করার সময় হয়েছে। শিশু কোঁচড়ের মুড়ি শেষ করে পকেট থেকে ছোটো হুঁকো বের করে দেশলাই জ্বেলে তামাক সাজতে শুরু করল। তারপর একটা ছোটো ঢেঁকুর তুলে শিশু বলল, “চায়েব, আমাল তো মনে হচ্ছে, আমলা এই জঙ্গলেল মদ্দে একেবালে হালিয়ে গেচি।”
চৌচিচৌ একটু হাসলেন। যে সন্দেহটা কিছুক্ষণ ধরে ওঁর মনে ঘোরাফেরা করছে, সেটাই শিশু বলে ফেলেছে। জোড়া পাখি ধরে আনার যে প্রতিশ্রুতি চৌচিচৌ ধনবানকে দিয়েছিলেন, তা রক্ষা করার চেয়ে এই জঙ্গল থেকে বেরোনোটা এখন বেশি জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সহকারীর সামনে কী করে নিজের ভুল স্বীকার করেন চৌচিচৌ, তাই বললেন, “ঠিক হারাইনি, একটু অফ ট্র্যাক হয়ে গেছি, শিশু। এখন আমাদের প্রথম কাজ হবে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে কম্পাস মেরামত করা, তারপর কাল গাঁয়ের আরও কয়েকজনকে নিয়ে পুরো জঙ্গলটা কম্বিং করা।”
হুঁকো সাহেবের হাতে দিয়ে শিশু বলল, “ছেটা কী জিনিস, চায়েব?”
“চিরুনি তল্লাশি, শিশু। জঙ্গলের এ-মাথা থেকে ও-মাথা খুঁজে বেড়ানো। পাখি দুটো যে জঙ্গলের মধ্যেই কোথাও আছে তাতে আমার কোনও সন্দেহ নেই।”
শিশু বলল, “থিক বলেতেন, চায়েব। কিন্তু একুন কী কলে বেলোব আমলা এখান থেকে?”
চৌচিচৌ গুড়ুক গুড়ুক করে বেশ কিছুক্ষণ হুঁকো টানলেন। তারপর শিশুর পকেটে হুঁকো রেখে বললেন “এবার আমাদের ব্যাক-ট্র্যাক করতে হবে, অর্থাৎ যে রাস্তায় এসেছি সে রাস্তায় ফিরে যেতে হবে। মাটিতে আমার টায়ারের স্যান্ডেল আর তোমার পামশুর যে ছাপ পড়েছে, তাই দেখে পিছোতে হবে। ওঠো শিশু টর্চ জ্বালো, দেখো পায়ের ছাপ; ওই দেখে পা ফেলো, কোরো না বিলাপ।”
চৌচিচৌর যেমন কথা তেমন কাজ। শিশু টর্চ জ্বেলে নীচু হয়ে জঙ্গলের মাটিতে পায়ের ছাপ দেখতে লাগল আর চৌচিচৌ তাই দেখে এক পা দু-পা করে পিছোতে লাগলেন।
তেরো
কেরোসিনের কুপি হাতে ক্রমার্ক ধানু-রাজুকে নিয়ে গভীর জঙ্গলের মধ্য দিয়ে সন্তর্পণে এগোচ্ছিল। ক্রমার্ক এই জঙ্গলের নাড়িনক্ষত্র জানে। কাপালিকের আদেশে পুজোর জন্য ফলমূল, কাঠ এবং বলির জন্য পশুপাখি সংগ্রহ করতে বহুবার ওকে জঙ্গলের আনাচে-কানাচে ঘুরতে হয়েছে। প্রতিবার জঙ্গলে ঢুকে ও দা দিয়ে গাছের কাণ্ডের ওপরে একটা তিরচিহ্ন কেটে রেখেছে জঙ্গল থেকে কাপালিকের আস্তানায় ফিরে যাবার দিক নির্দেশের জন্য। কোথাও-বা লাল কাপড়ের টুকরো বেঁধে রেখেছে গাছের ডালে। এখন কুপির আলোয় সেই চিহ্নগুলো দেখে নিয়ে ও সাবধানে এগোচ্ছিল।
হাতের আর পকেটের পেয়ারা শেষ করে ধানু-রাজু ক্রমশ অধৈর্য হয়ে উঠছিল। ‘আর কতদূর এই জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতে হবে আমাদের?’ ওরা মাঝে-মাঝেই জিজ্ঞেস করছিল।
ক্রমার্ক ওদের শান্ত করার জন্য একটা মজার গল্প বলতে শুরু করল, যে গল্পে একটা বানর আর দুটো গোখরো সাপের জবরদস্ত লড়াই ছিল। বুদ্ধিমান বানর কৌশলে দুটো সাপকে কীভাবে নাস্তানাবুদ করে গাছের ডালে ঝুলিয়ে দিল তা শুনে ধানু-রাজু কিছু সময় চুপ হয়ে গেল, তারপর আবার ঘ্যানর ঘ্যানর শুরু করল। তখন ক্রমার্ক একটা মামদো ভূতের গল্প শুরু করল যে ভূত অস্থির, চঞ্চল ছেলেদের ধরে ধরে খায়। ধানু-রাজু এতক্ষণে বুঝে গেছে যে ক্রমার্ক ওদের গল্প দিয়ে ভুলিয়ে রাখতে চেষ্টা করছে, তাই গোক্ষুর গাঁয়ের উত্তরদিকে নদীর পাড়ে যে শ্মশান আছে, সেটা পার হবার সময় যে ছড়াটা বলে, সেটা হাত-পা ছুড়ে চেঁচাতে লাগল, “ভূত আমার পুত, পেতনি আমার ঝি; রাম লক্ষ্মণ বুকে আছে, করবি আমার কী?”
তিন-চারবার ছড়াটা চেঁচিয়ে বলার পর ওরা দূরে কোথাও একটা গলার আওয়াজ পেল। ক্রমার্ক প্রথমে ভাবল ওটা কোনও হায়েনার হাসি বা শেয়ালের হুক্কাহুয়া, কিন্তু ধানু কান পেতে শব্দটা শুনে বলল, “এ তো কোনও বাচ্চার গলা মনে হচ্ছে।”
ক্রমার্ক বলল, “লক্ষণ ভালো ঠেকছে না আমার। এই বনে কোনও নতুন পশুর আমদানি হয়েছে। এসো আমরা একটা গাছের পিছনে লুকিয়ে পড়ি।”
কেরোসিনের কুপিটাকে জামার কাপড় দিয়ে ঢেকে ক্রমার্ক ধানু-রাজুকে নিয়ে একটা বড়ো কিকড় গাছের পিছনে লুকিয়ে পড়ল।
টায়ারের স্যান্ডাল আর পামশুর ছাপ দেখে বেশিদূর পিছোতে পারলেন না চৌচিচৌ আর শিশু। কারণ, টর্চের আলোয় ঘন জঙ্গলের মধ্যে পায়ের ছাপ খোঁজা সহজ নয়। তিনবার তিনদিকে বেশ কিছুটা এগিয়ে গিয়ে আবার ফিরে এসে শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন চৌচিচৌ। জঙ্গলে টর্চ জ্বালিয়ে চলার সমস্যাও আছে। একবার তো আলো পড়ল গিয়ে একটা বনবেড়ালের চোখে। অন্ধকারে ওর চোখটাও টর্চের আলোর মতো জ্বলছিল। চোখে টর্চ পড়ায় ওর এত রাগ হল যে একটা বিকট আওয়াজ করে লাফ দিল ওদের দিকে। ভয়ে শিশু উঠে গেল একটা বুনো তেঁতুল গাছে আর চৌচিচৌ পকেট থেকে নয় ফলার সুইস নাইফ বের করে তৈরি হলেন বনবেড়ালের মোকাবিলা করতে। বেড়ালটা টর্চের আলোয় চৌচিচৌকে দেখে ওকে ভয় দেখাবার জন্য গলায় নানারকম আওয়াজ বের করল— গর্র, ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ, ওয়াও মোয়াও। কিন্তু সাহসি চৌচিচৌ ছুরির ফলাটা বের করে ওর চোখে চোখ রেখে ছড়া কেটে বললেন, “বনবেড়ালের ছা, খাবি আমার ঘা। ছুরি দিয়ে ছাল ছাড়িয়ে করব তোকে ঢাক, তোর হাড় দিয়ে বোল তুলব আমি তাধিন তাধিন তাক।”
বনবেড়াল চৌচিচৌর ছড়াটা খুব সম্ভবত বুঝে ফেলল, কারণ আর একবার ফ্যাঁচ করে ও ল্যাজ গুটিয়ে পালিয়ে গেল। আর ঠিক তার একটু পরেই ওরা শুনতে পেল দূর থেকে মানুষের গলার আওয়াজ। আনন্দে গাছ থেকে লাফিয়ে পড়ে শিশু চেঁচিয়ে উঠল, “চায়েব, ও চায়েব, এ যে মানুচেল গলা ছুনতে পাচ্ছি! কী ছোভাগ্য আমাদেল! এই জঙ্গলে আল পলে থাকতে হবে না আমাদেল।”
চৌচিচৌ কান পেতে শুনলেন ধানু-রাজুর ভূত তাড়ানো ছড়া। তারপর বললেন, “মনে হচ্ছে জোড়া পাখির সন্ধান পেয়ে গেছি আমরা, শিশু। নাও গেট রেডি, আমাদের ডিউ নর্থ এগোতে হবে।”
চোদ্দ
ক্রমার্কের সঙ্গে চৌচিচৌর দেখা হল একটা হেলে পড়া বটগাছের নীচে। শিশু চেঁচিয়ে উঠল, “জোলা পাকি পেয়ে গেচি আমলা, চায়েব!”
ক্রমার্ক বলল, “আপনারা কোত্থেকে আসছেন? কোথায় যাচ্ছেন? কী আপনাদের পরিচয়?”
চৌচিচৌ মুচকি হেসে বললেন, “আমরা গোক্ষুর গাঁ থেকে আসছি। আমার নাম চৌকশ চিরকুমার চৌধুরী, লোকে আমাকে চৌচিচৌ বলে ডাকে। আমি একজন গোয়েন্দা আর আমার সঙ্গে যাকে দেখছেন, তার নাম শিবনাথ শুঁড়ি, সংক্ষেপে শিশু। আমরা এদের দুজনকে খুঁজতেই জঙ্গলে ঢুকেছিলাম, কিন্তু আমাদের কম্পাস খারাপ হয়ে যাওয়ায় দিক ভুল করে ঘুরে বেড়াচ্ছি। এদের দুজনের নাম নিশ্চয়ই ধনমান আর ধনরাজ, সংক্ষেপে ধানু-রাজু?”
ধানু-রাজু একসঙ্গে বলে উঠল, “কে পাঠিয়েছে আপনাকে আমাদের খুঁজতে?”
শিশু বলল, “তোমাদেল বাবা। কখন থেকে তোমাদেল খোঁজাখুঁজি কলছি আমলা, কোতায় লুকিয়েচিলে তোমলা দুজনা?”
ধানু-রাজু খিলখিল করে হেসে উঠল। এই মোটা থলথলে চেহারার লোকটা কীরকম বাচ্চাদের মতো কথা বলে! ধানু শিশুকে নকল করে বলল, “আমাদেল কুব খিদে পেয়েছে, কিচু কেতে দাও আমাদেল।”
শিশু ওর ঝোলার মধ্যে হাত ঢুকিয়ে বলল, “বেচি নেই, আত পাতো তোমলা।”
ধানু-রাজু হাত পাতল আর শিশু ওদের এক মুঠো করে মুড়ি আর একটা করে কদমা দিল। আর সেই থেকে ধানু-রাজুর শিশুকে খুব পছন্দ হয়ে গেল। ওরা দুজনে শিশুর দুই হাত ধরে নাচাতে নাচাতে। ওর সঙ্গে বাচ্চাদের ভাষায় অনর্গল কথা বলতে বলতে ক্রমার্ক আর চৌচিচৌর পিছনে চলতে লাগল। চৌচিচৌর হাতের টর্চ আর ক্রমার্কের কুপি দুয়ের মিলিত আলোয় পথ চলতে ওদের এখন আর কোনও অসুবিধা হচ্ছিল না।
ক্রমার্ক বলল, “আমরা জঙ্গলের শেষ দিকটায় এসে পৌঁছেছি। আর আধঘণ্টা হাঁটলেই গোক্ষুর পৌঁছে যাব আমরা।”
চৌচিচৌ বললেন, “ভেরি গুড। শোনো ক্রমার্ক, তোমার নামটা বড্ড খটোমটো লাগছে আমার। এটাকে একটু ছোটো করা দরকার। ভুঁড়িটাও একটু কমানো দরকার।”
ক্রমার্ক বলল, “আমি একটু গোলগাল বলে বাড়িতে আমাকে গোলু বলে ডাকে সবাই। আপনিও তাই ডাকবেন।”
“তামাক সাজতে পারো?”
“খুব পারি।”
“হিসেব রাখতে পারো?”
“তাও পারি। তিন বছর পাঠশালায় গেছি আমি।”
“ফার্স্ট ক্লাস। মনে হচ্ছে তোমাকে দিয়ে কাজ হবে আমার।”
“কী কাজ?”
চৌচিচৌ তাকালেন পিছনে। ধানু-রাজুর সঙ্গে শিশুর যেরকম জমে উঠেছে, তা দেখে ওর মনে হল শিশু ধনবানের বাড়িতে থেকে গেলে মন্দ হয় না। এই প্রস্তাবটা ধনবানকে দেবেন চৌচিচৌ আর ক্রমার্ক ওরফে গোলুকে নিয়ে ডোডো লেনে ফিরে যাবেন। ছেলে দুটোকে তো ও-ই ধরে আনল আর কুপির আলোতে এখন এই গভীর জঙ্গলে পথ খুঁজে বের করে নিয়ে যাচ্ছে ওদের। গোয়েন্দাগিরিতে ওকে লাগালে ও কালেদিনে ভালো গোয়েন্দা হতে পারবে। কিন্তু এই ছেলে দুটো এতদিন কোথায় ছিল? গোলু ওদের কোথায় খুঁজে পেল? চৌচিচৌ জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি এদের কোথায় খুঁজে পেলে?”
ক্রমার্ক ওরফে গোলু ভুঁড়িতে হাত বুলিয়ে বলল, “এক কাপালিকের আস্তানা থেকে ওদের বের করে পালিয়ে আসছি আমি। সব কথা এখন বলা যাবে না, পরে বলব।”
“ঠিক আছে। তোমার কাজের কথাও তখন বলব আমি।”
একসময় জঙ্গলের সীমানায় পৌঁছে যায় ওদের পাঁচজনের দলটি। ওপরে শ্যাওড়া গাছের ডালে বসে পেতো আর মেটো ভূত ঝিমোচ্ছিল তখন। ওদের গলার আওয়াজ পেয়ে জেগে উঠে নীচে তাকিয়ে পেতো বলল, “কীঁ কাঁণ্ড দেঁখ মেঁটো, ধঁনবাঁনের এঁকজোঁড়া ছেঁলেকে নিঁয়ে ফিঁরে এঁল গোঁয়েন্দাঁ আর কাঁপাঁলিকের চ্যাঁলা!”
মেটো ভূত বলল, “ধঁনবাঁনের বাঁড়িতে নিঁঘ্ঘাত মঁহাভোজ হঁবে কাঁল। চঁল আঁমরাও ওঁখানে ঘুঁরে আঁসব।”
পেতো বলল, “কিঁন্তু আঁমরা যেঁ এঁখন মঁণ্ডা মেঁঠাই খাঁই না। আঁমাদের খাঁবার তোঁ এঁখন পাঁতা আঁর মাঁটি, আঁমরা ওঁখানে গিঁয়ে কী কঁরব মেঁটো?”
“ওঁদের খাঁওয়া দেঁখব আঁর পুঁরোনো দিঁনের কঁথা মঁনে কঁরব। কিঁন্তু এঁই যে পাঁচজন আঁমাদের সাঁমনে দিঁয়ে চঁলে যাঁচ্ছে, ওঁদের সঁঙ্গে এঁকটু খেঁলা কঁরলে কেঁমন হঁয়?”
“খুঁব ভাঁলো হঁয়। মাঁনুষ আঁমাদের মঁনে রাঁখে তেঁমন কিঁছু কঁরা দঁরকার।”
পেতো ভূত আর মেটো ভূত দুজনে এবার গাছের ডাল থেকে জোরে ফুঁ দিল পাঁচজনের ওপর। নীচে চৌচিচৌ থেকে ধানু-রাজু সবাই টের পেল একটা ঠান্ডা, শিরশিরে হাওয়া ওদের মেরুদণ্ড বেয়ে নীচে নেমে গেল অথচ ওরা তো কোনও ভয়ের দৃশ্য দেখেনি এখন!
চৌচিচৌ বললেন, “এটা কী হল, গোলু?”
শিশু চিৎকার করে উঠল, “কিছেল থান্ডা হাওয়া লাগল গায়ে, চায়েব?”
ধানু-রাজু বলল, “আমলাও টেল পেয়েচি।”
গোলু পেটে হাত বুলিয়ে বলল, “এখানে পেতো আর মেটো নামে দুই নিরীহ ভূত থাকে, ওরা একটু মশকরা করল আমাদের সঙ্গে।”
পনেরো
ধনবানের বাড়িতে আজ মহাভোজ। নিমন্ত্রিত গোক্ষুর গ্রামের সবাই। ভিয়েনের কাজে লেগে পড়েছে শিশু। ধানু-রাজু জানিয়ে দিয়েছে, শিশুকে ছাড়া ওদের চলবে না আর এতদিন পরে ফিরে পাওয়া ছেলেদের আবদার মেনে নিয়েছে ধনবান। ধনবান চৌচিচৌ আর ক্রমার্ককেও মহাভোজে থাকতে অনুরোধ জানিয়েছে, কিন্তু চৌচিচৌ রাজি হননি। তাঁকে ডোডো লেনে ফিরতে হবে একটা জটিল কেসের সমাধান করতে। সঙ্গে যাবে ক্রমার্ক ওরফে গোলু। কিন্তু পেটুক গোলু ভিয়েনের চারদিকে ঘোরাঘুরি করছে সকাল থেকেই, অন্তত গোটা দশেক সন্দেশ আর জিবেগজা না খেয়ে সে নড়বে না ধনবানের বাড়ি থেকে জানিয়ে দিয়েছে তার নতুন বস চৌচিচৌকে। অগত্যা চৌচিচৌর ধনবানের বৈঠকখানাতে বসে তামাক সেবন করা ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু শুধু তামাক খেয়ে তো সময় কাটানো যায় না, তাই ধানু-রাজুর কাছ থেকে খাতা-কলম চেয়ে নিয়ে চৌচিচৌ তাঁর গোক্ষুর অভিযানের উপসংহার লিখতে শুরু করলেন—
‘জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে, পথশ্রমে মাথা ধরে
কম্পাস ফেল করে, ভুলভাল ঘুরে মরে
পাখি ধরা বড়ো দায়, কী করি হায় হায়
বটগাছের নীচে এসে, স্থির হয়ে বসে শেষে
কলরব এল কানে, শুনে আশা জাগে মনে
দূরে আলো দেখা যায়— কে যায়, কে যায়
দুই পাখি এল কাছে, সঙ্গে মোটা লোক আছে
পরিচয় বিনিময়, সাঙ্গ হলে জানা যায়
কাপালিকের আস্তানায়, বলি দেবার ইচ্ছায়
বাঁধা ছিল দুই ভাই, পালাবার পথ নাই
গোলুর ছলনায়, দুই পাখি উড়ে যায়
চৌচিচৌ আনল ধরে, ধনবান আনন্দ করে
নিখোঁজের খোঁজ পেল, অভিযান শেষ হল।
শুভাঞ্জন ব্যানার্জী ▪ প্রবাহনীল দাস
লিও তলস্তয় ▪ নলিনাক্ষ ভট্টাচার্য
তাপস মৌলিক ▪ অংশু পাণিগ্রাহী ▪ বাণীব্রত গোস্বামী ▪অরিন্দম ঘোষ ▪ রঞ্জন দাশগুপ্ত ▪ সিদ্ধার্থ দাশগুপ্ত ▪শাশ্বত কর ▪ রাজীব রায় গোস্বামী ▪ সায়নদীপা পলমল ▪ প্রদীপ কুমার দাস
বদ্রীনাথ পাল ▪ তাপস বাগ ▪ বসন্ত পরামানিক ▪ গোবিন্দ মোদক ▪ সুব্রত দাস ▪ অর্ণব ভট্টাচার্য ▪ সুজাতা চ্যাটার্জী ▪ মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় দাস ▪ মধুমিতা ভট্টাচার্য ▪ ড. রমলা মুখার্জী ▪ সনৎকুমার ব্যানার্জী ▪ বিদ্যুৎ মিশ্র ▪ রাজর্ষি মণ্ডল ▪ রূপালী মুখোপাধ্যায় ▪ শক্তিপদ পণ্ডিত ▪ শম্ভু সরকার ▪ সুব্রত চৌধুরী
অদিতি ভট্টাচার্য ▪ দীপঙ্কর চৌধুরী ▪ মৌসুমী রায় ▪ সবিতা রায় বিশ্বাস ▪ সহেলী রায় ▪ কিশোর ঘোষাল
অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায় ▪ অরিন্দম দেবনাথ ▪ কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায় ▪ দীপক দাস ▪ ড. উৎপল অধিকারী ▪ চন্দ্রানী মজুমদার
সায়ন্তনী পলমল ঘোষ ▪ সোমা দে ▪ শংকর লাল সরকার ▪ সন্দীপন সাহা
অলংকরণ
মায়াসখা নন্দী ▪ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ▪ একপর্ণিকা ক্রিয়েটিভস
দু-হাজার তিনশো বছর আগে পাটলিপুত্র থেকে তক্ষশিলা পর্যন্ত বাণিজ্যদলের সংঘাতবহুল রোমাঞ্চকর যাত্রাপথ শেষে এক তরুণ পৌঁছল তক্ষশিলায়। সেই নগরীর রাজনৈতিক পরিস্থিতি তখন উত্তাল। একদিকে গ্রিক বীর আলেকজান্ডার, অন্যদিকে আচার্য কৌটিল্যের অখণ্ড ভারতের স্বপ্নে মশগুল একদল যোদ্ধা। অসংখ্য চরিত্রের ঘনঘটা, ষড়যন্ত্র, কাপুরুষতা আর রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে কিছু মানুষের আত্মমর্যাদা আর স্বাধীনতা রক্ষার সাহসী সংগ্রামের আখ্যান এই উপন্যাস।
উত্তরমেরুর দুর্গম তুষার-মরুতে জীবন যুদ্ধে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে লোকমুখে গড়ে উঠেছিল নানা রূপকথা। মেরু অঞ্চলের অধিবাসীরা পৃথিবীর বাকি অংশ থেকে ছিল বিচ্ছিন্ন। সম্পূর্ণ অচেনা সেই দেশের লোকসংস্কৃতি, আচার ব্যবহার, মনস্তত্ত্বের সাক্ষ্য রেখে গেছে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে বাহিত গল্প-গাথা, যার রূপরেখা ফুটে উঠেছে কুড়িটি লোককাহিনির সংকলন 'তুষারদেশের রূপকথারা' বইটিতে।