প্রবন্ধ
FREE SHIPPING IN INDIA
প্রবন্ধ
একটা ছোটো হাঙর ভেলাকে ঘিরে পাক খেতে শুরু করেছিল। পুন টের পেয়েছিলেন, জলের তলা থেকে হাঙরটা ভেলার তলায় ধাক্কা দিচ্ছে। পুন ভেলার দু-পাশে বাঁধা দড়ি ধরে ভেলার ব্যালেন্স ঠিক রাখছিলেন কোনোরকমে। এতদিনকার নাবিক জীবনে পুন ভালোই চিনে গেছিলেন এই রাক্ষসদের। কোনোভাবে ভারসাম্য হারিয়ে জলে পড়ে গেলে হাঙরের খাদ্য হবেন তিনি। শুধু তাই নয়, চারপাশে ঘুরে বেড়ানো আরও হাঙর মিলে চেটেপুটে খাবে তাঁকে।
অরিন্দম দেবনাথ
সময়টা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের। প্রায় সারা পৃথিবী ইচ্ছে বা অনিচ্ছায় জড়িয়েছে যুদ্ধে। হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে রোজ। ১৯৪৫-এর আগস্ট মাসে বিমান থেকে ফেলা ‘লিটল বয়’ আর ‘ফ্যাটম্যান’ নামের আমেরিকার দুই পারমাণবিক বোমায় জাপানের দুটি শহর হিরোশিমা ও নাগাসাকি ধ্বংস হয়ে যায়। শুধু এই দুই শহরেই মারা যায় আনুমানিক দুই লক্ষাধিক মানুষ। এর পরেই শুরু হয় পারমাণবিক অস্ত্রের প্রতিযোগিতার যুগ। যা আজও চলছে। ২০২৬-এ আমেরিকা-ইরান-ইজরায়েল যুদ্ধ পারমাণবিক অস্ত্রের ওপর দখলদারি প্রসঙ্গকে আরও গুরুতর করে তুলেছে। যুদ্ধ মানে শুধু ধ্বংস আর মৃত্যুর ভয়াবহতাই নয়, যুদ্ধ অনেক বীরত্বের গল্পও শোনায়। তেমনি এক অসম সাহসী মানুষ ছিলেন পুন লিম (Poon Lim)।
ব্রিটিশ বাণিজ্য জাহাজ এস.এস. বেনলোমন্ড (SS Benlomond) দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে দক্ষিণ আমেরিকার দিকে যাচ্ছিল। কিন্তু যাত্রা মোটেই সুখকর ছিল না, জাহাজ ছাড়ার কিছুদিনের মধ্যেই ১৯৪২-এর ২৩ নভেম্বর এক জার্মান ডুবোজাহাজ U-172 মেঘলা আকাশের রাতের অন্ধকারে টর্পেডো ছুড়ে জাহাজটা ধ্বংস করে দেয়। সে-সময় জাহাজের অবস্থান ছিল ব্রাজিলের উপকূল থেকে প্রায় ৪০০ মাইল দূরে— 00.30°N 38.45°W। ডেকের নীচে থাকা কর্মীরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই কয়েক মিনিটের মধ্যেই জাহাজ ডুবতে শুরু করে টর্পেডো আঘাতে। ডুবন্ত জাহাজের পঞ্চান্ন জন কর্মীর মধ্যে কোনোক্রমে একজন মানুষ একটা লাইফ জ্যাকেট গায়ে চাপিয়ে ঝাঁপ দিতে সক্ষম হয়েছিলেন দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে। সক্ষম হয়েছিলেন বলা ঠিক নয়, বলা ভালো গায়ে জ্যাকেট চাপাতে না চাপাতেই ডুবন্ত জাহাজের দুলুনিতে আটলান্টিকের ঠান্ডা জলে ছিটকে পড়েছিলেন। ওই অসামরিক জাহাজকর্মী ছিলেন চিনদেশীয় পুন লিম। যতদূর জানা যায়, মাত্র দু-মিনিটের মধ্যে বাকি চুয়ান্ন জনকে নিয়ে জলের তলায় চলে গেছিল এস.এস. বেনলোমন্ড। হয় জাহাজের সঙ্গে তলায় তলিয়ে গেছিলেন, অথবা টর্পেডোর ধাক্কার আঘাতে ডেকে কাজ করতে থাকা কর্মীরা ছিটকে পড়েছিলেন জলে, যাঁদের কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। সম্ভবত ভাগ্যবান পুন লিম ছাড়া আর কেউ লাইফ জ্যাকেট বা লাইফ বোটের নাগালও পাননি।
পুন লিমের জন্ম হয়েছিল ১৯১৮ সালে চিনের হাইনান দ্বীপে। কাজেই সমুদ্রের সঙ্গে তাঁর পরিচয় জন্ম থেকেই। ১৯৩০-এর দশকে পুম লিম যখন সবে কৈশোরে পা রেখেছেন, তখন জাপান চিনের দিকে হাত বাড়াচ্ছে জানতে পেরে পুমের বাবা সপরিবারে মালয়েশিয়ায় চলে যান এবং জেলেদের সঙ্গে কাজ করা শুরু করেন। এর কিছুদিন পর বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা এবং যুদ্ধের সম্ভাব্য নৃশংসতার ভয়ে পুমকে দূরে পাঠিয়ে দেবেন ঠিক করেন। দাদার মতো লিম ব্রিটিশ মার্চেন্ট নেভিতে কেবিন বয় হিসেবে যোগ দেন। কিন্তু বৈষম্য ও নির্যাতনের ফলে কাজ ছেড়ে দিয়ে হংকংয়ে চলে গিয়ে একজন মেকানিক হন। এদিকে যুদ্ধ আবার ঘনিয়ে আসছিল। ১৯৪১ সাল নাগাদ জাপান হংকং আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে জানতে পেরে আবার ব্রিটিশ মার্চেন্ট নেভির পণ্যবাহী জাহাজ এস.এস. বেনলোমন্ডয়ে স্টুয়ার্ড হিসেবে যোগ দেন।
এস.এস. বেনলোমন্ড ছিল ধীর গতির পণ্যবাহী জাহাজ, অস্ত্রশস্ত্রও বিশেষ কিছু ছিল না এই জাহাজে। শুধু তাই নয়, যুদ্ধের আবহে জাহাজটি অন্য জাহাজদের কাছাকাছি না থেকে চলছিল একাকী।
ঠান্ডা জলে ছিটকে পড়ার পর ঘটনার অভিঘাতে হতভম্ব হয়ে গেলেও হুঁশ হারাননি পুম লিম। ব্রাজিল থেকে প্রায় ৭৫০ মাইল পশ্চিমে লাইফ জ্যাকেটের সাপোর্টে ভেসে থাকতে থাকতে পুম দেখেছিলেন ডুবোজাহাজ U-172-কে ভেসে উঠতে। ডুবোজাহাজের ডেক থেকে জলে ভাসতে থাকা পুম লিমকে দেখলেও ওরা ওঁকে উদ্ধারের চেষ্টা করেনি, বরং ধীরে ধীরে ডুব দিয়েছিল অতল জলে।
পুন ধরেই নিয়েছিলেন আর খানিক সময়ের মধ্যেই তাঁর মৃত্যু ঘটবে; হয় ক্লান্তিতে জলে ডুবে, না-হয় হাঙরের পেটে। দূরদূরান্ত অবধি কোনও জাহাজের চিহ্নমাত্র নেই। ডাঙাও নেই চারশো মাইলের মধ্যে। একটা জাহাজ যে হারিয়ে গেছে, সে-খবর রটে যেতে খুব বেশি সময় লাগবে না। সে-খবর পেয়ে কোনও মিত্র জাহাজ যদি কাছাকাছির মধ্যে আসেও, তাকে কি আর না ডুবিয়ে ছাড়বে শত্রু ডুবোজাহাজ! হাজারো চিন্তা ভিড় করেছিল পুনের মনে।
ঘণ্টা দু-এক প্রবল ঠান্ডা নোনা জলে সাঁতার কাটতে কাটতে, অথবা উঁচু ঢেউয়ে দোল খেতে খেতে যখন শরীরের পেশিগুলো হাল ছেড়ে দিতে বসেছে, তখন পুনের নজরে আসে, দূরে কিছু একটা ভাসছে। বাঁচার তাগিদে, লাইফ জ্যাকেটের দৌলতে কোনোরকমে জলে ভেসে থাকা ঠান্ডায় খিল ধরে যাওয়া শরীরটাকে মনের জোরে সাঁতরে টেনে নিয়ে যেতে থাকেন অজ্ঞাত ভাসমান বস্তুর দিকে। ঢেউয়ের তালে তালে বস্তুটাও দূরে সরে যাচ্ছিল। আচমকা এক উঁচু ঢেউ বস্তুটাকে ঠেলে নিয়ে আসে পুনের হাতের নাগালের মধ্যে।
দূর থেকে ভাসমান বস্তুটাকে প্যাকিং বাক্সের কাঠের টুকরো মনে করলেও সেটার কিনারা ধরে পুন টের পেয়েছিলেন, বস্তুটা কোনও কাঠের টুকরো নয় বরং একটা কাঠের ভেলা, সম্ভবত কোনও জাহাজ থেকে ছিটকে পড়েছে বা ডুবন্ত জাহাজ থেকে ভেসে এসেছে। যাই হোক, ভেলাটার কিনারা ধরতে পারলেও ক্লান্ত শরীরে জলের মধ্যে উঁচু ভাসমান বস্তুর ওপর ওঠা সহজ কাজ নয়। বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেও ভেলায় চড়তে ব্যর্থ হন পুন। পুন জানতেন, ভেলায় উঠতে না পারলে জীবনের কোনও আশা থাকবে না। শরীরের সব শক্তি এক করে পুন হ্যাঁচোড়প্যাঁচোড় করে কোনোরকমে উঠে পড়েন ভেলার ওপরে।
ভেলায় শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে বুক ভরে নিশ্বাস নেবার পর পুন দেখেন, ভেলাটা লম্বা-চওড়ায় আট ফুট আর তাতে বাঁধা একটা ছোটো বাক্স বোঝাই সারভাইভাল কিট। বাক্স খুলে পুন দেখেন, তাতে রয়েছে টিনের পাত্র ভরা বিস্কুট, চল্লিশ লিটার কাহয়ার জল, ছোটো থলে বোঝাই সুগার কিউব, কিছু চকোলেট, একটা ব্যাটারিচালিত টর্চ, দুটো ধোঁয়া জ্বালাবার পাত্র আর শুকনো কাপড়।
পুন বুঝে গেছিলেন, যতদিন না তিনি ‘উদ্ধার’ পান ততদিন পর্যন্ত এই ছোট্ট ভাঁড়ারই ভরসা। কিন্তু কতদিন? পুন নাবিক জীবনের অভিজ্ঞতায় জানতেন, মাঝসমুদ্রে কেউ তাঁকে উদ্ধার করতে আসবে, বিশেষ করে যুদ্ধকালীন সময়ে, ভাবাটাই বোকামি। তাই এই খাদ্য শেষ করে ফেললে বাঁচার লড়াই অসম্ভব হবে। তাই তিনি প্রথম দিন থেকেই জলের পাত্রে বৃষ্টির জল ধরা শুরু করলেন। দিনের হিসেব রাখতে দড়িতে গিঁট বাঁধা শুরু করলেন। একটা দিন মানে একটা গিঁট।
শুরু থেকেই বাক্সের খাবারে হাত না দিয়ে পুন চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন সমুদ্র থেকে খাবার জোগাড় করতে। কিন্তু ভাবা আর করার মধ্যে অনেক ফারাক। পুন প্রথমেই যে কাজটা করেছিলেন তা হল বাক্সটাকে ভেলায় থাকা দড়িদড়া দিয়ে আরও কষে বাঁধা, যাতে ঢেউয়ের ধাক্কায় একমাত্র টিকে থাকার হাতিয়ারও হাতছাড়া না হয়ে যায়। দীর্ঘদিনের জাহাজি অভিজ্ঞতায় পুন বুঝে গেছিলেন, তাঁকে বসে বা শুয়ে থাকতে হবে ভেলার মাঝামাঝি অংশে; বেশি নড়াচড়া করলে ভেলা উলটে যাবে। আর উথাল সমুদ্রে ওলটানো ভেলা সোজা করা বা তাতে উঠে বসা অসম্ভব, বিশেষ করে ক্লান্ত অশক্ত শরীরে।
একটা করে দিন যায় আর দড়িতে একটা করে গিঁট পড়ে। সবসময় বৃষ্টি হয় না, আর হলেও ছোটো পাত্রে পানীয় জল ধরা— মুখে বলা সহজ হলেও কাজে করে দেখানোটা জটিল, বিশেষ করে যখন ভেলা প্রতিমুহূর্তে বিশাল ঢেউয়ের তালে দুলে চলেছে। ছোটো পাত্রে বেশি জল ধরা সম্ভব নয় বুঝে পুন তাঁর লাইফ জ্যাকেটের ক্যানভাস দিয়ে থলে বানিয়ে নিয়েছিলেন।
সমুদ্রের ঢেউয়ে খেলনা নৌকার মতো দুলতে থাকা ভেলাকে জলে ডুবে যাওয়া থেকে রক্ষা করাটা ছিল এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। ঝোড়ো হাওয়ায় ওঠা বড়ো ঢেউ খানিক বাদে-বাদেই ধুইয়ে দিয়ে যেত ছোট্ট কাঠের ভেলাটিকে। জন্ম থেকেই সমুদ্র দেখা পুন এসব সামলাচ্ছিলেন দক্ষ হাতেই।
ভেলার পেরেক আর টর্চ লাইটের ভেতরকার স্প্রিং খুলে তা বেঁকিয়ে গোটা কয়েক মাছ ধরার বঁড়শি বানিয়ে নিয়েছিলেন পুন। মোটা দড়ির পাক খুলে তা থেকে পেয়েছিলেন মাছ ধরার বঁড়শির সুতো। বেঁচে থাকার জন্য অনেক উদ্ভাবনী চিন্তা ভর করেছিল পুনের মাথায়।
মাঝে মাঝে লম্বা পথ পাড়ি দিতে দিতে দু-একটা ক্লান্ত অ্যালবাট্রস বা সি-গাল পাখি ভেলায় কিনারায় এসে বসত। তখন নিঃসাড় হয়ে শুয়ে থাকতেন পুন, তারপর সুযোগ বুঝে হাত বাড়িয়ে খপ করে ধরে ফেলতেন বিশাল একটা পাখিকে। তারপর সেই পাখি মেরে তার কাঁচা মাংস চালান করতেন পেটে, আর যা খেতে পারতেন না সেগুলো রেখে দিতেন মাছ ধরার টোপ হিসেবে।
মাছ ধরে তা খাওয়ার পর বাড়তি মাছের টুকরো জমিয়ে রাখতেন পরের দিন খাওয়ার জন্য। উত্তাল সমুদ্রে আট ফুট বাই আট ফুট ভেলায় সহায়-সম্বলহীনভাবে ভাসতে ভাসতে, মৃত্যু বা বেঁচে থাকা কোনটা আগে হানা দেয় ভাবতে ভাবতে, প্রায় কঙ্কালে পরিণত শরীরে মোটা দড়ির পাক খুলে তৈরি সুতো আর পেরেক দিয়ে বানানো বঁড়শি দিয়ে পাখির নাড়িভুঁড়ি বা মাছের টুকরো ঝুলিয়ে মাছ ধরা আর পুকুর, নদী বা লেকের ধারে মাছ ধরায় অনেক ফারাক আছে। একটা বেঁচে থাকার তাগিদে আর একটা আনন্দ বা জীবিকার জন্য।
সারভাইকাল কিটে থাকা খাদ্য-পানীয় প্রায় শেষ হয়ে গেছে। দেখতে দেখতে কেটে গেছে ৫০ দিন। পুন যেন অন্য ধাতুতে গড়া। ভেঙেও ভাঙছেন না। একাকী রোদ-জল-ঠান্ডার সঙ্গে লড়াই করে চলেছেন ছোটো ভেলায় হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে। দিনের বেলায় চোখের সামনে গনগনে সূর্য আর রাতে তারাভরা আকাশ। একদিকে চামড়া জ্বালানো গরম, আর একদিকে কনকনে ঠান্ডা। সব বোধশক্তি যেন হারিয়ে গেছিল পুনের। শক্তিহারা শরীরে ঝিমুনি এলেও গভীর ঘুমের উপায় নেই, ভেলার ওপর শরীরের ভারসাম্য হারালেই কাঠের আশ্রয় উলটে জলে পড়ে যাওয়ার ভয়। পুন জানতেন, একবার জলে পড়ে গেলে আর লড়াই করে ভেলায় চড়ার শক্তি তিনি পাবেন না। মাঝে-মাঝেই ঝোড়ো হাওয়ায় ওঠা দুরন্ত ঢেউ ভেলাকে ছুড়ে দিত শূন্যে। যাঁদের উত্তাল নদী বা সমুদ্রে নৌকা বাওয়ার বা সমুদ্র ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আছে, তাঁরাই একমাত্র এই পরিস্থিতি অনুভব করতে পারবেন। সে-সময় জাহাজ বা নৌকোর ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারলে অঘটন ঘটে যেতে পারে। সাধারণ নদী পারাপারের সময় সেজন্য নৌকার মাঝি নৌকার দু-পাশে যেন সমান ভার থাকে তা নৌকা চালানোর আগে দেখে নেন।
কাঁচা মাছ, পাখির মাংস আর বৃষ্টির জল খেয়ে সমুদ্রে ভেসে বেঁচে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছিলেন পুন। মনের জোরে লড়ে যাচ্ছিলেন এই আশায় যে কোনও না কোনোদিন ভাসতে ভাসতে তিনি পৌঁছে যাবেন কিনারায়, বা কোনও জাহাজ তাঁকে দেখতে পেয়ে তুলে নেবে ডেকে। কিন্তু দিনের পর দিন কেটে গেলেও পুনের ভাগ্যে কিছুই ফলেনি।
একদিন পুন লক্ষ করেন, তিনি সমুদ্রের এমন জায়গায় পৌঁছেছেন যেখানে সমুদ্র ভীষণ শান্ত। জল এত পরিষ্কার যে জলের ভেতর সমুদ্রের গভীরের অনেকটাই পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। সমুদ্র শান্ত থাকায় নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে নেবার কথা ভাবছিলেন পুন। কিন্তু কপালে যাঁর লড়াই লেখা আছে, তাঁর কি আর ঘুম হয়! হঠাৎ পুন লক্ষ করেন, জলের তলায় বিশাল বিশাল কালচে মাছ ঘুরে বেড়াচ্ছে। জলের ওপর দিয়ে দ্রুতবেগে ভেলার দিকে এগিয়ে আসা তেকোনা পাখনা দেখে পুনের চিনতে ভুল হয়নি জল-রাক্ষস হাঙরকে।
একটা ছোটো হাঙর ভেলাকে ঘিরে পাক খেতে শুরু করেছিল। পুন টের পেয়েছিলেন, জলের তলা থেকে হাঙরটা ভেলার তলায় ধাক্কা দিচ্ছে। পুন ভেলার দু-পাশে বাঁধা দড়ি ধরে ভেলার ব্যালেন্স ঠিক রাখছিলেন কোনোরকমে। এতদিনকার নাবিক জীবনে পুন ভালোই চিনে গেছিলেন এই রাক্ষসদের। কোনোভাবে ভারসাম্য হারিয়ে জলে পড়ে গেলে হাঙরের খাদ্য হবেন তিনি। শুধু তাই নয়, চারপাশে ঘুরে বেড়ানো আরও হাঙর মিলে চেটেপুটে খাবে তাঁকে।
দু-দু’বার হাঙরটা ভেলার ওপর লাফিয়ে ওঠার চেষ্টা করতে পুন ঠিক করে নিয়েছিলেন তাঁর পরবর্তী অ্যাকশন। পুন বুঝতে পেরেছিলেন, হাঙরটা বার বার ভেলায় ধাক্কা দিলে, ভেলা উলটে যেতে পারে একসময়। হাঙরটা থেকে বাঁচার একমাত্র উপায়, ভেলার ওপর মুখ তুললেই সেটাকে ধরা।
মাঝসমুদ্রে পুঁচকে ভেলায় বসে হাঙর ধরব ভাবা সহজ, বাস্তবে করা কঠিনের থেকেও কঠিন। তার ওপর যে লোকটা হাঙর ধরবে, সে মাসের পর মাস ধরে রোদে ঘেমে, জলে ভিজে, ঠান্ডায় কেঁপে, অখাদ্য-কুখাদ্য খেয়ে, বৃষ্টির জল পান করে দুর্বল শরীরে বেঁচে আছে। তাও সে-খাবার যে রোজ জোটানো যাবে বা আকাশ থেকে মিষ্টি জল নেমে আসবে, তার নিশ্চয়তা নেই এবং মেলেওনি। ফলে ক্যানভাসের থলেতে আটকানো জল আর রোদে শুকানো মাছের টুকরো ভরসা। এর মধ্যে বেশ কয়েকবার ফালি করে ভেলার ওপর শুকোতে দেওয়া মাছ হয় জলে ভেসে গেছে, না-হয় ঝোড়ো হাওয়ায় উড়ে গেছে। কিন্তু পুন তো আর সাধারণ মনের মানুষ নন। প্রকৃতির সঙ্গে লড়তে লড়তে তাঁর নার্ভগুলো ‘অ্যালয় স্টিল’ হয়ে গেছে যা মরচে ধরে বা ঠান্ডা-গরমে সহজে নষ্ট হবার নয়।
পুন দু-হাতে জড়িয়ে নিয়েছিলেন ক্যানভাসের ফালি। হাঙরটা ভেলার ওপর মুখ তুলতেই ক্যানভাস জড়ানো দু-হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরেছিলেন হাঙরের চোয়াল। একদিকে আধা জলে ঝুলে থাকা এক হাঙর, আর একদিকে হাঙরের ডেরায় জলের ওপর খুদে ভেলায় ভাসতে থাকা এক হতভাগ্য মানুষ। পুনের ভাগ্য ভালো ছিল, হাঙরটা লম্বায় খুব বেশি বড়ো ছিল না। হাঙরটা অর্ধেক ভেলার ওপর থাকা অবস্থায় সেটাকে মারার জন্য পুন সারভাইভাল কিটের বাক্সটা একহাতে তুলে হাতুড়ির মতো কয়েক ঘা বসিয়ে দিয়েছিলেন হাঙরটার মাথায়। তারপর সেটাকে ভেলায় তুলে সারভাইভাল কিট থেকে পাওয়া টিনের কৌটোর টুকরোর ফালি দিয়ে পেট চিরে প্রথমেই লিভারটা কেটে বের করে মুখে পুরে দিয়েছিলেন। বিগত কয়েকদিন খাবার কিছু জোটেনি পুনের। এক বন্দর থেকে আর এক বন্দরে ঘুরে বেড়ানো নাবিক পুন জানতেন, হাঙরের লিভার ‘এনার্জি’-ভরা।
না, কোনও ঘটনাই পুন লিখে রাখতে পারনেনি। উদ্ধারের পর স্মৃতি হাতড়ে এসব বলেছিলেন। ফলে অনেক ঘটনাই সাধারণ লোকের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। পাশাপাশি সংবাদমাধ্যম যে ‘স্টোরি’ বানাতে গিয়ে পুনের অভিজ্ঞতাকে অতিরঞ্জিত করেনি, এ-কথাও জোর দিয়ে বলা যাবে না। কিন্তু এও সত্য, পুন তাঁর জাহাজ টর্পেডোর আঘাতে সমুদ্রে ডুবে যাওয়ার পর সমুদ্রে একাকী ভেসে ছিলেন দিনের পর দিন, মাসের পর মাস। দড়ির গিঁট রাত পার হলে দিনের হিসেব রেখে চলেছিল।
জাহাজডুবির পর কেটে গেছে আশি দিন। পুন তখনও বেঁচে আছেন ছোটো কাঠের ভেলার ওপর।
হাঙর শিকারের পর একদিন ভেলার ওপর নিরাশ হয়ে বসে থাকা পুনের কানে আসে প্লেন ওড়ার আওয়াজ। পুন ভালো করে নজর করে দেখেন, অনেকটা দূরে সমুদ্রের ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে একটা প্লেন। উদ্ধার পাওয়ার আশা জাগে পুনের মনে। পাগলের মতো হাত নাড়াতে থাকেন পুন। প্লেনটা নেমে আসে জলের কাছাকাছি। প্লেনের নীচের অংশ খুলে নেমে আসে একটা হলুদমতো বস্তু। কিন্তু জলে পড়তে ডুবে যাওয়ার পরিবর্তে ভেসে থাকে সেটা। পুন পরিচিত এই বস্তুটার সঙ্গে— মার্কিং বয়া। সমুদ্রে দূর থেকে কোনোকিছু চেনাতে এই ভাসমান হাওয়া ভরা জিনিসটি সাহায্য করে। প্লেন থেকে বস্তুটি ফেলা হয়েছিল এক কারণেই, যাতে উদ্ধারকারীরা সহজে জায়গাটা চিনতে পারে।
কিন্তু পুনের জন্য আর একটি চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছিল। প্লেন থেকে বয়া ফেলার ঘণ্টা দু-এক পরেই শুরু হয় প্রচণ্ড ঝড় আর বৃষ্টি। উথালপাতাল ঢেউ পুনের ভেলাকে বয়া থেকে সরিয়ে নিয়ে যায় বহুদূরে উত্তাল সমুদ্রের মাঝে।
পুনের শরীর ছেড়ে দিয়েছিল। তিনি লড়াই বন্ধ করে দিয়ে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন ভাগ্যের হাতে। ইতোমধ্যে পার হয়ে গেছে ১৩০ দিন। পুন টের পাচ্ছিলেন, তিনি অন্য কোন সমুদ্রে পৌঁছে গেছেন যেখানে ঢেউ আর উত্তাল নয়। জলের রঙও বদলে গেছে অনেকটা, যেমনটা হয় নোনা জলে মিষ্টি জল মিশলে। কালচে নীলে ঘোলাটে ভাব এসেছে। কিন্তু পুন আর কিছু বিশ্লেষণ করার অবস্থায় ছিলেন না। পুনের কংকালসার দেহ হাত-পা ছড়িয়ে এলিয়ে পড়ে ছিল ভেলার ওপর।
পুন জানতেন না যে তিনি প্রায় কয়েকশো মাইল জলে ভেসে পৌঁছে গেছেন ব্রাজিলের জলসীমায়। এক ব্রাজিলিয়ান মাছধরা নৌকার তিন মাল্লার দূর থেকে নজরে আসে ভাসমান ভেলাটিকে। ভালো করে দেখে মনে হয় একটা শরীর যেন পড়ে আছে কাঠের ভেলার ওপর। দ্রুত ওরা এগিয়ে আসে ভেলা লক্ষ করে, উদ্ধার করে নিয়ে যায় সোজা হাসপাতালে।
১৩৩টা গিঁট ছিল দিন গোনার দড়িতে। তারিখটা ছিল ১৯৪৩-এর ৫ এপ্রিল। পুনের বয়স তখন বছর ২৫। অসুস্থ থাকলেও পুন লিম নিজেই হেঁটে প্রবেশ করেছিলেন হাসপাতালে। চার সপ্তাহ ব্রাজিলের হাসপাতালে থাকার পর ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ পুনকে মিয়ামি-নিউইয়র্ক হয়ে ব্রিটেন ফেরত নিয়ে যায়।
সে-সময়কার সারা পৃথিবীর প্রায় সব খবরের কাগজগুলো পুনের ঘটনা নিয়ে যা হেডলাইন করেছিল, তাকে গোদা বাংলায় বলা যেতে পারে – ‘রাখে কৃষ্ণ মারে কে?’ যখন সাংবাদিকরা পুনকে জানিয়েছিলেন যে আজ পর্যন্ত কেউ উত্তাল সমুদ্রে ১৩৩ দিন ভেলায় ভেসে বেঁচে থাকেনি—এ এক রেকর্ড, তখন পুন বলেছিলেন, ‘আমি চাই না আমার রেকর্ড কেউ ভাঙুন।’ যদিও ২০০৫-২০০৬ সালে তিন মেক্সিকান নাবিক এক বিকল হয়ে যাওয়া মাঝধরা নৌকায় প্রশান্ত মহাসাগরে প্রায় ১০ মাস ভেসে ছিলেন। জোস নামের আর এক জেলে নৌকা বিকল হয়ে যাওয়ায় ৪৩৯ দিন সমুদ্রে নিখোঁজ ছিলেন, কিন্তু ২০২৬-এর এপ্রিলের তথ্য অনুযায়ী, এঁদের কেউই পুন লিমের মতো ভেলায় ভাসা লড়াই করেননি। পুনের অসম সাহসিকতার জন্য পঞ্চম জর্জ ওঁকে ‘ব্রিটিশ এম্পায়ার মেডেল’ দিয়ে সম্মানিত করেন।
১৯৯১ সালের ৪ জানুয়ারি নিউইয়র্ক শহরে মারা যান মৃত্যুকে কাছ থেকে দেখা এই মানুষটি।
লেখকের অন্যান্য লেখা
শুভাঞ্জন ব্যানার্জী ▪ প্রবাহনীল দাস
লিও তলস্তয় ▪ নলিনাক্ষ ভট্টাচার্য
তাপস মৌলিক ▪ অংশু পাণিগ্রাহী ▪ বাণীব্রত গোস্বামী ▪অরিন্দম ঘোষ ▪ রঞ্জন দাশগুপ্ত ▪ সিদ্ধার্থ দাশগুপ্ত ▪শাশ্বত কর ▪ রাজীব রায় গোস্বামী ▪ সায়নদীপা পলমল ▪ প্রদীপ কুমার দাস
বদ্রীনাথ পাল ▪ তাপস বাগ ▪ বসন্ত পরামানিক ▪ গোবিন্দ মোদক ▪ সুব্রত দাস ▪ অর্ণব ভট্টাচার্য ▪ সুজাতা চ্যাটার্জী ▪ মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় দাস ▪ মধুমিতা ভট্টাচার্য ▪ ড. রমলা মুখার্জী ▪ সনৎকুমার ব্যানার্জী ▪ বিদ্যুৎ মিশ্র ▪ রাজর্ষি মণ্ডল ▪ রূপালী মুখোপাধ্যায় ▪ শক্তিপদ পণ্ডিত ▪ শম্ভু সরকার ▪ সুব্রত চৌধুরী
অদিতি ভট্টাচার্য ▪ দীপঙ্কর চৌধুরী ▪ মৌসুমী রায় ▪ সবিতা রায় বিশ্বাস ▪ সহেলী রায় ▪ কিশোর ঘোষাল
অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায় ▪ অরিন্দম দেবনাথ ▪ কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায় ▪ দীপক দাস ▪ ড. উৎপল অধিকারী ▪ চন্দ্রানী মজুমদার
সায়ন্তনী পলমল ঘোষ ▪ সোমা দে ▪ শংকর লাল সরকার ▪ সন্দীপন সাহা
অলংকরণ
মায়াসখা নন্দী ▪ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ▪ একপর্ণিকা ক্রিয়েটিভস