উপন্যাস
FREE SHIPPING IN INDIA
উপন্যাস
পাহাড়ের চূড়ায় উঠেই বুকটা ধক করে উঠল জিলিনের। একশো গজের মধ্যেই জনা তিরিশেক তাতার দাঁড়িয়ে। ব্যাটাদের চোখে পড়ামাত্রই ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে আনল জিলিন। কিন্তু তাতারেরাও তাকে দেখে ফেলেছে ততক্ষণে। মুহূর্তের মধ্যে বন্দুক বার করে পূর্ণ বেগে ঘোড়া ছুটিয়ে তার পিছু নিয়েছে তারা।
লিও তলস্তয়
অনু: রাজীবকুমার সাহা
জিলিন তখন সেনাবাহিনীর অফিসার, ককেশাসে আছে।
একদিন বাড়ি থেকে চিঠি এল একখানা, মায়ের লেখা।—
‘বয়স তো হল। এইবারে মরবার আগে বুকের ধনটিকে দেখে যেতে সাধ হয়। শেষবারের মতো একবারটি দেখা করে যেও, বাবা। আমাকে কবর দিয়ে, তারপর যদি ঈশ্বরের ইচ্ছে হয়, চাকরিতে নয় ফিরে যেও আবার। আমার আশীর্বাদ রইল। তাছাড়া তোমার জন্যে একটা মেয়েও দেখে রেখেছি আমি। সে বুদ্ধিমতী, স্বভাব-টভাব ভালো, কিছু সহায়-সম্পত্তিও আছে তার। যদি তোমার পছন্দ হয়, তবে তাকে বিয়ে করে বাড়িতেই থেকে যেতে পারো।’
বিষয়টা ভেবে দেখল জিলিন। সত্যিই তো। দ্রুত অশক্ত হয়ে পড়ছে মানুষটা, হয়তো বেঁচে থাকতে মায়ের মুখটা দেখার সুযোগ সে আর পাবে না। একবারটি যাওয়াই ভালো। আর মেয়েটি যদি সত্যিই ভালো হয়, তবে আর বিয়েতে আপত্তিই-বা কী?
এই ভেবে কর্নেলের কাছে গিয়ে ছুটির অনুমতি নিল জিলিন। তারপর সহযোদ্ধাদের বিদায় জানিয়ে, বিদায়-আপ্যায়ন হিসেবে তাদের চার বোতল ভদকা খাইয়ে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হওয়ার প্রস্তুতি নিল সে।
ককেশাসে তখন যুদ্ধ। দিন হোক, রাত হোক, কোনও পথই চলাচলে নিরাপদ নয়। কোনও রুশ সৈনিককে তাদের দুর্গের সীমানা থেকে দূরে একা পেলেই হল। সে ঘোড়ায় চড়েই বের হোক বা পায়ে হেঁটে, তাতারেরা তাকে হয় মেরে ফেলে, নয় পাহাড়ে ধরে নিয়ে যায়। তাই সাব্যস্ত হয়েছে, সপ্তাহে দু-দিন এক দুর্গ থেকে আর এক দুর্গে একদল সশস্ত্র সৈন্য যাতায়াত করবে এবং নিরাপদে পৌঁছে দেবে যাত্রীদের।
গ্রীষ্মকাল। ভোর হতেই দুর্গের নিরাপদ আশ্রয়ের মধ্যে মালপত্র-ভরতি গাড়ি-ঘোড়া তৈরি হল রওনা দিতে। সৈন্যদল কুচকাওয়াজ করে বেরিয়ে এল দুর্গের ফটক পেরিয়ে। একসঙ্গে রওনা হল সবাই।
জিলিন ঘোড়ার পিঠে। তার জিনিসপত্র বোঝাই একখানা গাড়িও চলেছে মালবাহী বহরের সঙ্গে। ষোলো মাইল পথ পাড়ি দিতে হবে তাদের।
মালবাহী বহরটার গতি খুব ধীর। কখনও সৈন্যেরা দাঁড়িয়ে পড়ছে, কখনও কোনও গাড়ির চাকা খুলে আসছে, কখনো-বা কোনও ঘোড়া এক পাও এগোতে চাইছে না আর। সবাইকে দাঁড়িয়ে পড়ে অপেক্ষা করতে হচ্ছে তখন।
সূর্য মাঝ আকাশ পেরিয়ে পশ্চিমে হেলে পড়েছে অনেকটা, তখনও অর্ধেক পথও ডিঙোতে পারেনি তারা। চারদিকে ধুলো, প্রচণ্ড গরম; মাথার ওপর প্রখর রোদ যেন আগুন ঝরাচ্ছে। কোত্থাও একটুখানি ছায়া নেই আশেপাশে—যেদিকে চোখ যায়, শুধু বিরাট উন্মুক্ত প্রান্তর; একটা গাছও নেই রাস্তার ধারে, না কোনও ঝোপঝাড়।
ঘোড়ার পিঠে খানিকটা সামনে এগিয়ে গিয়েছিল জিলিন। সেখানে দাঁড়িয়েই বহরের অপেক্ষায় আছে, এমন সময় পেছন দিক থেকে শিঙার সংকেত শোনা গেল—সৈন্যদল আবার থেমে পড়েছে। জিলিন ভাবছে, একাই এগিয়ে যাব কি? ভালো ঘোড়া রয়েছে সঙ্গে। তাতারেরা আক্রমণও করলে জোরে ছুটে পালানো যাবে। পরক্ষণেই মনে হয়, নাকি অপেক্ষা করাই বুদ্ধিমানের কাজ?
এমন সময় বন্দুক কাঁধে আর এক অফিসার, কোস্তিলিন, ঘোড়া ছুটিয়ে তার কাছে এসে বলে, “চলো ভাই, এগিয়ে যাই দুজনে। কাহাঁতক আর চলা যায় এভাবে? খিদে পেয়েছে ভীষণ, গরমও অসহ্য। ঘামে আমার জামাকাপড় কেমন সপসপ করছে, দেখো।”
কোস্তিলিন গাঁট্টাগোট্টা, ভারী চেহারার মানুষ। লালচে মুখ বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে।
জিলিন এক মুহূর্ত ভেবে জিজ্ঞেস করল, “তোমার বন্দুকে টোটা ভরা আছে তো?”
“আলবাত।”
“বেশ, চলো তাহলে। তবে একটা শর্ত—পরিস্থিতি যা-ই হোক, আমরা কিন্তু কেউ আলাদা হব না।”
পাশাপাশি ঘোড়া ছুটিয়ে সেই বিরাট সমতল প্রান্তর পেরিয়ে চলল দুজনে। দু-পাশে সতর্ক দৃষ্টি রেখে গল্প করতে করতে চলেছে। অনেকটা দূর পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে চারদিক। কিন্তু সমতল শেষ হতেই দুই পাহাড়ের মাঝখানের এক উপত্যকায় ঢুকে গেল পথটা। তখন জিলিন বলে, “ওই পাহাড়টার মাথায় উঠে একবার চারপাশটা দেখে নেওয়া ভালো। নইলে কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাতারেরা এসে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে।”
কোস্তিলিন উত্তর দেয়, “ধুস, দরকারটা কী? সোজা এগিয়ে যাই, চলো।”
কিন্তু জিলিন রাজি হল না। বলে, “না, ভাই। তুমি চাইলে এখানে অপেক্ষা করো, কিন্তু একবার চারপাশটা দেখে আসব আমি।”
এই বলে ঘোড়ার মুখ বাঁদিকে ফিরিয়ে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল সে। জিলিনের ঘোড়াটা শিকারি জাতের—পাহাড়ের ঢাল বেয়ে যেন ডানা মেলে উড়ে চলেছে। বাচ্চা অবস্থায় একশো রুবল দিয়ে ঘোড়ার এক পাল থেকে বেছে কেনা। নিজের হাতে শিখিয়ে পড়িয়ে নিয়েছিল তারপর।
পাহাড়ের চূড়ায় উঠেই বুকটা ধক করে উঠল জিলিনের। একশো গজের মধ্যেই জনা তিরিশেক তাতার দাঁড়িয়ে। ব্যাটাদের চোখে পড়ামাত্রই ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে আনল জিলিন। কিন্তু তাতারেরাও তাকে দেখে ফেলেছে ততক্ষণে। মুহূর্তের মধ্যে বন্দুক বার করে পূর্ণ বেগে ঘোড়া ছুটিয়ে তার পিছু নিয়েছে তারা।
প্রাণপণে পাহাড় বেয়ে নীচে নামতে লাগল জিলিন। বাতাসের বেগে ছুটছে ঘোড়া। নামতে-নামতেই সে চিৎকার করে, “তোমার বন্দুক তৈরি রাখো, কোস্তিলিন!”
মনে মনে নিজের ঘোড়াটিকে বলে, ‘এই বিপদটা থেকে আমাকে বের করে নিয়ে চল, সোনা। হোঁচট-টোচট খাস না যেন, একবার পড়ে গেলে সব শেষ। কোনোমতে বন্দুকটার নাগাল পাই যদি, কোনও বাপের ব্যাটা ছুঁতে পারবে না আর।’
কিন্তু কোস্তিলিন কি আর দাঁড়ায়? তাতারদের চোখে পড়তেই ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে দুর্গের দিকে প্রাণপণে ছুট লাগিয়েছে সে। কখনও এ-পাশে, কখনও ও-পাশে চাবুক মারতে মারতে এমন বেগে ছুটেছে যে, ধুলোর মেঘের মধ্যে তার ঘোড়ার দুলতে থাকা লেজটুকুই নজরে আসছে কেবল।
জিলিন বুঝল, পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটজনক। বন্দুক তার হাতে নেই; শুধু একখানা তলোয়ার নিয়ে কীই-বা করা যাবে আর? সৈন্যদলের দিকে ঘোড়া ছুটিয়ে পালাবার চেষ্টা করল সে। কিন্তু ছ’জন তাতার ইতোমধ্যে পথ আটকাতে ছুটে এসেছে তার। জিলিনের ঘোড়াটা যত চমৎকারই হোক, তাতারদের ঘোড়াগুলো আরও দ্রুতগামী। তার ওপর পথ আটকে ফেলেছে আগেই। জিলিন ঘোড়ার লাগাম টেনে অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিতে চাইল। কিন্তু এত জোরে ছুটেছে ঘোড়া, হঠাৎ থামা বা দিক বদলানো তার পক্ষে সম্ভব হল না। সোজা তাতারদের দিকেই ছুটে চলল সে।
ঠিক তখনই জিলিন দেখে, ছাইরঙা ঘোড়ার পিঠে লাল দাড়িওয়ালা এক তাতার ধেয়ে আসছে তার দিকে। লোকটা বন্দুক উঁচিয়ে ধরে দাঁত খিঁচিয়ে চিৎকার জুড়েছে বিকট।
জিলিন মনে মনে বলে, ‘তোদের আমি চিনি, শয়তানের দল! জীবিত ধরতে পারলে গর্তে পুরে রেখে চাবুক মারবি। না, জীবিত আমি ধরা দেব না।’
গায়ে-গতরে তেমন লম্বা-চওড়া না হলেও জিলিনের সাহস অসাধারণ। খাপ থেকে তলোয়ার টেনে বের করে লাল দাড়িওয়ালা তাতারের দিকে সোজা ঘোড়া ছোটাল সে। মনে একটাই সংকল্প—হয় ঘোড়া থেকে ফেলে দেবে ব্যাটাকে, নয় তলোয়ারের এক কোপে ভবলীলা সাঙ্গ করবে।
আর মাত্র এক ঘোড়ার দৈর্ঘ্যের মতো দূরত্ব বাকি কেবল, এমন সময় পেছন থেকে গুলির শব্দ হল একটা। লাগল গিয়ে তার ঘোড়ার গায়ে। সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল ঘোড়াটা, আর জিলিন চাপা পড়ল তার নীচে।
উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল জিলিন। কিন্তু ততক্ষণে দুর্গন্ধময় পোশাক পরা দুই তাতার মিলে তার বুকের ওপর চেপে বসে হাত দুটো পেছন দিকে বেঁধে ফেলতে উদ্যত হয়েছে। প্রবল জোরে ধাক্কা দিয়ে দুজনকেই ছিটকে ফেলল সে। তক্ষুনি আরও তিনজন তাতার ঘোড়া থেকে লাফিয়ে নেমে এসে বন্দুকের কুঁদো দিয়ে পরপর মাথায় মারতে লাগল তার। মারের চোটে চোখ ঝাপসা হয়ে এল জিলিনের; মাথা ঘুরে উঠল, মাটিতে লুটিয়ে পড়ল ফের। তাতারেরা তখন তাকে শক্ত করে ধরে, জিনের পট্টি খুলে এনে দুই হাত পেছন দিকে টেনে নিয়ে নিজেদের বিশেষ ধরনের গিঁট মেরে বেঁধে দিল। তার টুপি খুলে ছুড়ে ফেলল, জুতো খুলে নিল, সারা শরীর তল্লাশি করল, কাপড়চোপড় ছিঁড়ে ফেলল; সমস্ত টাকাপয়সা ও ঘড়িটাও কেড়ে নিল শেষে।
জিলিন ঘাড় ফিরিয়ে নিজের ঘোড়াটার দিকে তাকাল একবার। গুলি খেয়ে যেভাবে পড়েছে, সেভাবেই কাত হয়ে আছে বেচারি। ছটফট করছে প্রাণপণ, চার পা শূন্যে ছুড়ছে, কিন্তু মাটিতে ভর দিতে পারছে না। মাথায় গুলির ক্ষত। সে থেকে কালচে রক্ত গড়িয়ে এসে ক’ফুট ঘেরে চারপাশের ধুলো কাদা করে ফেলেছে।
ঘোড়াটার কাছে গিয়ে জিন খুলতে শুরু করেছে এক তাতার। তখনও ছটফট করে চলেছে বেচারা। কোমর থেকে একখানা ছুরি বের করে এক টানে তার শ্বাসনালিটা কেটে দিল লোকটা। শিসের মতো একটা করুণ শব্দ বেরিয়ে এল ঘোড়াটার গলা থেকে। সারাটা শরীর ঝাঁকিয়ে উঠল একবার, তারপর সব শেষ। জিন ও অন্যান্য সাজসরঞ্জাম খুলে নিল তাতারেরা।
লাল দাড়ি নিজের ঘোড়ায় চড়ে বসতে অন্যেরা মিলে তুলে জিলিনকে পেছনে বসিয়ে দিল তার। পড়ে না যায় যাতে, তাতারটার কোমরের বেল্টের সঙ্গে শক্ত করে বেঁধে দিল তাকে। ঘোড়া ছুটিয়ে তারপর পাহাড়ের পথ ধরল দলটা।
লাল দাড়ির পেছনে বাঁধা অবস্থায় দুলতে দুলতে চলেছে জিলিন। ঘোড়ার দোলায় তার মাথা গিয়ে ঠোকা খাচ্ছে তাতারের দুর্গন্ধময় পিঠে। চোখের সামনে শুধু সেই বলিষ্ঠ পিঠ আর শক্ত শিরা-উপশিরায় ভরা ঘাড়-গর্দান—পরিষ্কার করে কামানো মাথার নীলচে ঘাড়ের পেছনটা।
জিলিনের মাথায় লেগেছে। ক্ষত থেকে বেয়ে আসা রক্ত শুকিয়ে চোখের ওপর জমে আছে। না পারছে জিনের ওপর খানিক গুছিয়ে বসতে, না পারছে চোখে জমে থাকা রক্তটা মুছে ফেলতে। হাত দুটো এত শক্ত করে বেঁধেছে শয়তানেরা, কাঁধের হাড় পর্যন্ত টনটন করছে।
অনেকক্ষণ ধরে একের পর এক পাহাড় টপকে এগিয়ে চলেছে তাতারেরা। একটা নদী পার হল এইবারে। উপত্যকা চিরে চলে যাওয়া শক্ত এক পাকা পথ ধরল তারপর।
কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তাকে, বুঝতে চেষ্টা করছিল জিলিন। কিন্তু চাপ রক্তে তার চোখের পাতা আঠা হয়ে আছে, আর বাঁধা অবস্থায় মাথাটাও ঘোরানো যাচ্ছে না।
সন্ধ্যা নেমে এল ধীরে ধীরে। আরও একটা নদী পার হয়ে পাথুরে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ওপরে উঠল তারা। সেখানে বাতাসে ধোঁয়ার গন্ধ, চারদিকে কুকুরের ঘেউ ঘেউ। আউল, অর্থাৎ তাতারদের এক পাহাড়ি গ্রামে এসে পৌঁছেছে দলটা।
ঘোড়া থেকে নামল তাতারেরা। তাদের ছেলেমেয়েরা ছুটে এসে ঘিরে ধরল জিলিনকে। কী এক উল্লাসে চিৎকার করতে করতে তার দিকে ছোটো ছোটো পাথর ছুড়তে লাগল বিচ্ছুগুলো। লাল দাড়ি ধমক দিয়ে সরিয়ে দিল তাদের। জিলিনকে ঘোড়া থেকে নামিয়ে নিজের এক চাকরকে হাঁক পাড়ল তারপর।
সেই ডাকে এক নোগে লোক (তাতার জনগোষ্ঠীর একটা শাখা) দৌড়ে এল তাড়াতাড়ি। গালের হাড় উঁচু, গায়ে বলতে শুধু ছেঁড়া জামা একখানা—সেও এমন ছেঁড়া যে বুকের বেশিরভাগটাই খোলা। তাকে কীসব হুকুম দিল লাল দাড়ি। খানিক পরেই ব্যাটা ফিরে এল একজোড়া বেড়ি হাতে। তাতে ওক কাঠের দুই মোটা খণ্ডে লোহার বলয় লাগানো, আর একখানা বলয়ের সঙ্গে জোড়া লোহার বন্ধনী ও তালা।
জিলিনের হাতের বাঁধন খুলে তার এক পায়ে সেই বেড়ি পরিয়ে শক্ত করে আটকে দিল তারা। টেনে-হিঁচড়ে এনে এক গোলাঘরে ঠেলে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে দরজায় তালা মেরে দিল তারপর।
জিলিন গিয়ে পড়ল জমির সারের জন্যে জমিয়ে রাখা একগাদা গোবরের ওপর। কিছুক্ষণ নিঃশব্দে সেখানেই পড়ে রইল সে। হাতড়ে হাতড়ে খানিক নরম একটু জায়গা খুঁজে নিয়ে গা এলিয়ে দিল তারপর।
দুই
রাতে প্রায় একটুও ঘুম হল না জিলিনের। বছরের এই সময়টায় রাত খুব ছোটো হয়। অল্পক্ষণের মধ্যেই কুঁড়েঘরের দেয়ালের এক ফাঁক দিয়ে ভোরের আলো ঢুকল এসে। উঠে দাঁড়াল জিলিন। নখ দিয়ে খুঁটে খুঁটে ফাঁকটাকে খানিক বড়ো করল সে। তাতে চোখ লাগিয়ে বাইরে উঁকি দিল তারপর।
দেখে, একটা পথ নীচে নেমে গিয়েছে পাহাড় বেয়ে। ডানপাশে একখানা তাতারি কুঁড়ে, তার সামনে দুটো গাছ। কালো এক কুকুর শুয়ে আছে দরজার চৌকাঠে। আশেপাশে একটা ছাগল আর তার ছানা ক’টা চরে বেড়াচ্ছে লেজ নাড়িয়ে।
এরপর দেখে, এক তাতার তরুণী নারী আসছে হেঁটে। লম্বা, ঢিলেঢালা, উজ্জ্বল-রঙা এক জামা গায়ে। জামার নীচে ঢোলা পাজামা আর চামড়ার উঁচু বুট। মাথার ওপর তোয়ালে পেতে, তার ওপর জলভরা বড়ো একখানা ধাতুর কলশি বয়ে আনছে। এক তাতার শিশুর হাত ধরা এক হাতে। ছেলেটার মাথা পরিষ্কার কামানো, গায়ে একটা জামা শুধু। মেয়েটা সাবধানে পা ফেলছে যখন, মাথার ওপর কলশির ভার সামলাতে গিয়ে পিঠের পেশিগুলো স্পষ্ট কেঁপে উঠছে তার।
কুঁড়ের ভেতরে জলটা রেখে গেল তরুণী। তার কিছুক্ষণ পর গতদিনের সেই লাল দাড়ি তাতারটা বেরিয়ে এল বাইরে। আজ তার গায়ে রেশমের টিউনিক, কোমরে রুপোর হাতলের ছুরি। খালি পায়ে জুতো গলানো, আর মাথায় কালো ভেড়ার চামড়ার লম্বা টুপি, কপালের অনেক পেছনে ঠেলে পরা। বাইরে এসে আড়মোড়া ভেঙে নিজের লাল দাড়িতে হাত বোলাল সে। খানিক দাঁড়িয়ে থেকে চাকরটাকে কীসব নির্দেশ দিয়ে চলে গেল তারপর।
দুই কিশোর ছেলে ঘোড়ায় চড়ে পাশ দিয়ে চলে গেল এরপর। ঘোড়াদের জল খাইয়ে ফিরেছে তারা; নাক তখনও ভেজা।
আরও ক’টা ন্যাড়া ছেলে দৌড়ে বেরিয়ে এল তারপর। কারও গায়ে পাজামা নেই, একখানা করে লম্বা জামা পরা শুধু। গোলাঘরের কাছে এসে জড়ো হল সবে মিলে। মাটি থেকে সরু এক ডাল কুড়িয়ে নিয়ে দেয়ালের ফাঁক দিয়ে ভেতরে খোঁচাতে লাগল একজনা। জিলিন জোরে চিৎকার করে উঠল হঠাৎ। ভয় পেয়ে চেঁচাতে চেঁচাতে দৌড়ে পালাল ছেলেরা। খোলা হাঁটুগুলো রোদের আলোয় চকচক করে উঠল ওদের।
ভীষণ তেষ্টা পেয়েছে এইবারে জিলিনের। গলা শুকিয়ে কাঠ। মনে মনে ভাবে, ইস, অন্তত একটাবার যদি কেউ দেখতে আসত আমাকে! ঠিক তখনই গোলাঘরের তালা খোলার শব্দ কানে আসে। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল সেই লাল দাড়ি। সঙ্গে আর একজন—খাটো গড়ন, রঙ কালো। বড়ো বড়ো উজ্জ্বল কালো চোখ, টকটকে লাল গাল, তাতে ছাঁটা দাড়ি। হাসিখুশি চেহারা, মনে হয় যেন অকারণেই হাসতে ভালোবাসে সে। বেশভূষায় মালুম হয় লাল দাড়ির চেয়েও বেশি সচ্ছল বা। গায়ে সোনালি কারুকাজের নীল রেশমের টিউনিক। বড়োসড়ো রুপোর ছুরি গোঁজা কোমরে। পায়ে রুপোর নকশা করা লাল মরক্কো চামড়ার জুতো, তার ওপর আবার মোটা চামড়ার বাইরের জুতো পরা। মাথায় সাদা ভেড়ার চামড়ার টুপি।
ভেতরে ঢুকেই বিরক্তির সুরে কী যেন বিড়বিড় করতে লাগল লাল দাড়ি। দরজার চৌকাঠে হেলান দিয়ে দাঁড়াল তারপর। একহাতে ছুরিটা নিয়ে খেলতে খেলতে আড়চোখে এমনভাবে তাকিয়ে রইল জিলিনের দিকে, যেমনটা শিকারকে নজরে রাখে নেকড়ে।
ওদিকে কালো তাতারটার স্বভাব একেবারে উলটো। চটপটে, প্রাণবন্ত—স্প্রিংয়ে ভর করে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে যেন। সোজা জিলিনের কাছে এসে সামনে উবু হয়ে বসল সে। তারপর তার কাঁধ চাপড়ে কীসব বলতে লাগল দ্রুত। ঝকঝকে দাঁত দেখা যাচ্ছে তার। চোখ টিপছে বার বার, আর টক টক শব্দ তুলছে জিভে। একটাই কথা মুখে—‘গুড রুস! গুড রুস!’
তার একটা কথাও বুঝতে পারল না জিলিন। তারও একটাই কথা মুখে—“জল! একটু জল দাও আমায়!”
কালো তাতারটা খানিক হাসল কেবল। আবার “গুড রুস!” বলে নিজের ভাষায় কথা বলে যেতে লাগল অনর্গল। জিলিন ঠোঁট ও হাতের ইশারায় বোঝাতে চেষ্টা করল যে খুব তেষ্টা পেয়েছে তার, জল চাই।
এবার জিলিনের ইশারা বুঝতে পারল কালো তাতারটা। সে হেসে উঠে দরজার বাইরে মুখ বাড়িয়ে হাঁক দিল, “দিনা!”
ছোটো এক মেয়ে দৌড়ে এল ভেতরে। বছর তেরো বয়স। পাতলা গড়ন, মুখের আদলে সহজেই বোঝা যায় কালো তাতারেরই মেয়ে সে। স্বচ্ছ কালো চোখ, মুখখানা ভারি মিষ্টি। চওড়া হাতার লম্বা নীল রঙের জামা গায়ে, কটিবন্ধ নেই কোনও। জামার ঝুলে, সামনের অংশে এবং হাতার কানায় লাল কাপড়ের পাড়। জামার নীচে পাজামা। পায়ে চটি, তার ওপর শক্ত, উঁচু গোড়ালিওয়ালা বাইরের জুতো। গলায় রুশ রুপোর মুদ্রায় গাঁথা একখানা হার। মাথায় ওড়না-টোরনার বালাই নেই। পাতাকাটা কালো চুলে ফিতে বাঁধা, তাতে সোনালি জরি আর রুপোর মুদ্রা গাঁথা।
তার বাবা কী হুকুম দিল তাকে, মেয়েটা দৌড়ে বেরিয়ে গিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই ধাতুর এক পাত্রে জল নিয়ে ফিরে এল ফের। সেটা জিলিনের হাতে দিয়ে হাঁটু মুড়ে এমনভাবে উবু হয়ে বসল যে, হাঁটু প্রায় মাথার সমান উঁচু হয়ে রইল। বিস্ফারিত চোখে জিলিনের জল খাওয়া দেখতে লাগল তারপর, যেন কোন বুনো জন্তু সামনে বসে আছে তার।
জিলিন জলটা শেষ করে পাত্রটা তার হাতে ফিরিয়ে দিতেই এমন চমকে উঠে ছিটকে পিছিয়ে গেল মেয়ে, যেন কোন বুনো পাহাড়ি ছাগল। এই ভঙ্গি দেখে হেসে উঠল তার বাবা। আবার যেন কী এক কাজে পাঠাল লোকটা মেয়েটাকে। কলশিটা নিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে গেল সে। কাঠের একখানা গোল থালায় করে খামির ছাড়া রুটি হাতে ফিরে এল তারপর। আবার উবু হয়ে বসে বিস্ময়ভরা চোখে জিলিনের দিকে তাকিয়ে রইল আগের মতো।
খাওয়া শেষ হতে দুই তাতার বেরিয়ে গেল এরপর। দরজা আবার বাইরে থেকে তালাবন্ধ।
অল্পক্ষণ পরেই সেই নোগে চাকরটি এসে বলে, “আয়দা, মালিক! আয়দা!”
সে-ব্যাটাও রুশ জানে না। জিলিন এটুকু বুঝতে পারল যে, কোথাও সঙ্গে যেতে বলা হচ্ছে তাকে।
নোগের পেছন পেছন চলল জিলিন। পায়ে বেড়ি থাকায় হাঁটতে খুব কষ্ট। পা টেনে ধরছে, ফলে ঠিকমতো কদম ফেলা দায়।
গোলাঘর থেকে বেরিয়ে জিলিন দেখে, খান দশেক বাড়ি নিয়ে গড়ে উঠেছে ছোট্ট এক তাতার গ্রাম। ছোটোখাটো নজর মিনারওয়ালা তাতার মসজিদও আছে একখানা। একটা বাড়ির সামনে জিন পিঠে তিনটে ঘোড়া দাঁড়িয়ে। ক’টা বাচ্চা ছেলে তাদের লাগাম ধরে আছে। ঠিক তখনই বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল সেই কালো তাতারটা। জিলিনকে সঙ্গে আসতে ইশারা করল হাত নেড়ে। তারপর নিজের ভাষায় কী যেন বলতে বলতে হেসে ঘরে ঢুকে গেল আবার।
জিলিনও ঢুকল গিয়ে। বেশ ভালো ঘরটি। কাদালেপা মসৃণ দেয়াল। সামনের দেয়ালের পাশে রঙিন পালকের গদি আর লেপের উঁচু এক স্তূপ। আশেপাশের দেয়ালে দামি কার্পেট ঝোলানো। কার্পেটের গায়ে রুপোর কারুকাজ করা বন্দুক, পিস্তল আর তলোয়ার সাজিয়ে রাখা।
একটা দেয়ালের গা ঘেঁষে মাটির মেঝের সমান উচ্চতায় ছোট্ট একখানা উনুন। এত তকতকে মেঝেটা, যেন সদ্য ঝাঁট দেওয়া ধান মাড়াইয়ের উঠোন।
ঘরের এককোণে পরিসর জায়গায় মোটা ফেল্টের চাদর বিছানো। তার ওপর রঙিন গালিচা পাতা, গালিচার ওপর পালক ঠাসা নরম কুশন। সেই কুশনগুলোর ওপর বসে পাঁচজন তাতার—কালো লোকটা, লাল দাড়ি আর তিন অতিথি। সবার পায়ে ঘরে পরার নরম চটি। প্রত্যেকের পিঠের পেছনে আর একটা করে কুশনের ঠেস। সামনে গোল রেকাবিতে বাজরার পিঠে। পাশে বাটিতে গলানো মাখন, আর একখানা পাত্র-ভরতি বুজা—তাতারি বিয়ার। পিঠে ছিঁড়ে মাখনে ডুবিয়ে খাচ্ছে সবাই।
কালো তাতারটা ঝট করে উঠে দাঁড়িয়ে জিলিনকে একপাশে বসাতে হুকুম দিল—তবে গালিচায় নয়, খালি মাটির ওপর। তারপর আবার নিজের জায়গায় গিয়ে কুশনে বসে পিঠে আর বুজা খেতে দিল অতিথিদের।
চাকরটা ধরে বসিয়ে দিল জিলিনকে। তারপর নিজের বাইরের জুতোগুলো খুলে দরজার পাশে অন্য জুতোগুলোর কাছে রেখে এল সে। ফেল্টের চাদরের ওপর মনিবদের খানিক কাছাকাছি বসে পড়ল এসে। গভীর আগ্রহে তাদের খাওয়া দেখে নিজের অজান্তেই বার বার ঠোঁট চাটতে লাগল তারপর।
তাতারেরা পেট ভরে খাওয়া শেষ হতে দিনার মতোই পোশাক পরা—লম্বা গাউন, পাজামা আর ওড়না মাথায় এক মহিলা এসে বাদবাকি খাবারদাবার তুলে নিয়ে গেল সব। সুন্দর দেখতে একখানা গামলা আর সরু গলার এক কলশি এনে রাখল তারপর। হাত ধুয়ে দুই হাত বুকের সামনে ভাঁজ করে হাঁটু গেড়ে বসল তাতারেরা। চারদিকে ফুঁ দিয়ে নমাজ পড়ল।
খানিকক্ষণ নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা শেষে অতিথিদের একজন জিলিনের দিকে ফিরে রুশ ভাষায় বলতে শুরু করল তারপর।
“এই কাজি মহম্মদ বন্দি করেছে তোমায়, বুঝলে।” লাল দাড়ির দিকে আঙুল তুলল লোকটা। তারপর কালো তাতারটার দিকে ইশারা করে জানাল, “আর উপস্থিত তোমাকে আবদুল মুরাদের হাতে তুলে দিয়েছে সে। এখন থেকে আবদুল মুরাদই তোমার মালিক।”
জিলিন কোনও উত্তর দেয় না।
তখন আবদুল মুরাদ হাসতে হাসতে বলতে শুরু করল নিজেই। জিলিনের দিকে আঙুল তুলে একই কথা আওড়াতে লাগল বার বার, “সৈনিক রুস, গুড রুস।”
দোভাষী জানাল, “তোমার বাড়িতে চিঠি লিখে মুক্তিপণ পাঠাতে হুকুম দিয়েছেন তিনি। টাকা এসে গেলেই ছেড়ে দেবেন তোমায়।”
জিলিন এইবারে একটুক্ষণ ভেবে প্রশ্ন করল, “কত চাইছেন?”
তাতারেরা নিজেদের মধ্যে কিছুক্ষণ আলোচনা করার পর দোভাষী উত্তর দিল, “তিন হাজার রুবল।”
“অসম্ভব।” জিলিনের সটান উত্তর, “অত টাকা দিতে পারব না আমি।”
সঙ্গে সঙ্গে লাফ মেরে উঠে দাঁড়াল আবদুল মুরাদ। উত্তেজিত কণ্ঠে জিলিনকে কীসব বলতে লাগল হাত নেড়ে। তার ধারণা, জিলিন নিশ্চয়ই বুঝতে পারছে তার কথা।
দোভাষী তর্জমা করল— “বেশ, কত দেবে তাহলে?”
খানিক ভেবে জিলিন উত্তর দেয়, “পাঁচশো রুবল।”
তক্ষুনি তাতারেরা একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠেছে সব। দ্রুত নিজেদের ভাষায় তর্ক করতে লাগল তারা। আবদুল মুরাদ লাল দাড়ি কাজি মহম্মদকে এক হাত নিয়েছে। চিৎকার করে এমন দ্রুত কীসব বলতে লেগেছে যে, থুতু ছিটকোচ্ছে মুখ থেকে। আর কাজি মহম্মদ চোখ কুঁচকে জিভ দিয়ে চুকচুক শব্দ করে যাচ্ছে কেবল।
কিছুক্ষণ পর সবাই শান্ত হলে দোভাষী বলে ফের, “পাঁচশো রুবল মালিকের পক্ষে যথেষ্ট নয়। তিনি নিজেই দুশো রুবলে কিনেছেন তোমাকে। কাজি মহম্মদের তাঁর কাছে ঋণ ছিল, সেই ঋণের বদলে তোমাকে তাঁর হাতে তুলে দিয়েছে। তিন হাজার রুবলের কমে কিছুতেই হবে না। আর চিঠি লিখতে রাজি না হও যদি, তোমাকে গর্তে ফেলে চাবুক মারা হবে তবে।”
জিলিন জানে, ভয় পেলেই মাথায় চড়ে বসবে ব্যাটারা। সে হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বলে, “ওই কুত্তাটাকে বলে দাও, ভয় দেখিয়ে আমার কাছ থেকে কিছু আদায় করা যাবে না। সে চেষ্টা করে যদি, কোনও চিঠিই লিখব না আমি। একটা কানাকড়িও মিলবে না আর। তোদের মতো কুকুরকে ভয় পাইনি কোনোদিন, পাবও না!”
দোভাষী কথাগুলো তর্জমা করে শোনাতেই আবার একসঙ্গে চেঁচামেচি শুরু করল সবাই। তর্কবিতর্ক চলল অনেকক্ষণ। তারপর আবদুল মুরাদ উঠে এসে দাঁড়াল জিলিনের সামনে। হাসতে হাসতে বলল, “জিগিত রুস! জিগিত রুস!”
তাদের ভাষায় জিগিত মানে সাহসী বীর।
এরপর দোভাষীকে কিছু একটা বলল লোকটা। দোভাষী জিলিনকে জানাল, “বেশ, এক হাজার রুবল দিলেই তিনি রাজি।”
কিন্তু জিলিন নিজের সিদ্ধান্তে অটল। বলে, “পাঁচশো রুবলের বেশি আমি কানাকড়িও দেব না। আর মেরে ফেললে এটুকুও পাবে না।”
আবার কিছুক্ষণ নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করল তাতারেরা। প্রাথমিক উত্তেজনাটা অনেকটাই থিতু হয়েছে এখন। চাকরটাকে কিছু আনতে বাইরে পাঠাল তারা। প্রতীক্ষায় রইল সবাই। একবার জিলিনের দিকে, পরক্ষণেই দরজার দিকে তাকাচ্ছে বার বার।
অল্প পরেই ফিরে এল চাকরটা। সঙ্গে এক স্থূলকায়, খালি পা, ছেঁড়া-ফাটা কাপড় পরা লোক। তারও এক পায়ে জিলিনের মতো বেড়ি।
বিস্ময়ে হাঁ হয়ে গেল জিলিন। এ যে কোস্তিলিন! সেও ধরা পড়ল তবে!
পাশাপাশি বসানো হল দুই বন্দিকে। অমনি নিজেদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া সব ঘটনা শোনাতে লেগেছে পরস্পর। তাতারেরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে শুনছে।
জিলিন নিজের বন্দি হওয়ার কাহিনি শোনাল। কোস্তিলিন জানাল, পালিয়ে যাওয়ার সময় তার ঘোড়া থেমে গিয়েছিল হঠাৎ। গুলিও ফসকেছে। তখন এই আবদুলই ধরে ফেলে তাকে।
এমন সময় উঠে দাঁড়িয়ে কোস্তিলিনের দিকে আঙুল তুলে কীসব বলে উঠল আবদুল মুরাদ। দোভাষী তর্জমা করে জানাল যে, দুজনেই এখন থেকে একই মনিবের বন্দি। যে আগে মুক্তিপণের টাকা দেবে, তাকেই আগে ছেড়ে দেওয়া হবে। তারপর সে জিলিনের দিকে ফিরে বলল, “তুমি খামোখাই রাগ দেখাচ্ছ, ভায়া। অথচ তোমার সঙ্গীটি দেখো কত শান্তশিষ্ট! ইতোমধ্যেই বাড়িতে চিঠি লিখে দিয়েছে সে। পাঁচ হাজার রুবল পাঠাবে ওরা। ভালোমন্দ খেতেও পাবে তাই, যত্নআত্তি পাবে।”
জিলিন উত্তর দেয়, “আমার সঙ্গী যা খুশি করতে পারে। তার টাকাকড়ি থাকতে পারে, আমার নেই। আমি যা বলেছি, তা-ই শেষ কথা। ইচ্ছে হলে মেরে ফেলো আমাকে, তাতে তোমাদের লাভ হবে না কোনও। কিন্তু পাঁচশো রুবলের বেশি চেয়ে কোনও চিঠি আমি লিখব না।”
নীরবতা নেমে এল ঘরে।
আবদুল মুরাদ উঠে দাঁড়াল হঠাৎ। একখানা হাতবাক্স খুলে একটা কলম, কালি আর একটুকরো কাগজ বের করে হাতে দিল জিলিনের। তার কাঁধে চাপড় মেরে লিখতে ইশারা করল তারপর। শেষ পর্যন্ত পাঁচশো রুবলেই রাজি সে।
“এক মিনিট।” দোভাষীকে বলে জিলিন, “তাকে বলো, ভালো খাবার চাই আমাদের, পরার মতো ভালো কাপড়-জুতো, আর আমাদের দুজনকে একসঙ্গে থাকতে দেয় যেন। তাতে মনটাও খানিক ভালো থাকবে আমাদের। আর হ্যাঁ, পায়ের এই বেড়িগুলোও খুলে দিতে হবে কিন্তু।”
বলে মনিবের দিকে তাকিয়ে হাসে জিলিন। মনিবও হাসে। দোভাষীর কথা শুনে বলে, “বেশ। ওদের সবচেয়ে ভালো কাপড় দেব আমি—এমন আলখাল্লা আর জুতো, পরে বিয়ে করতেও লজ্জা হবে না। খাওয়াব রাজার ছেলের মতো। চাইলে দুজনে একই গোলাঘরে থাকতেও পারে একসঙ্গে। কিন্তু ওই পায়ের বেড়িটি খোলা যাবে না, পালাবে তো। তবে রাতে রাতে খুলে দেওয়া হবে।”
বলেই উঠে দাঁড়ায় আবদুল মুরাদ। জিলিনের কাঁধে জোরে চাপড় মেরে হেসে বলে, “ইউ গুড, আই গুড!”
জিলিন চিঠিটা লিখল বটে, কিন্তু ঠিকানা দিল ভুল, কখনোই বাড়িতে পৌঁছতে না পারে যাতে। মনে মনে স্থির করে—‘পালাব আমি।’
জিলিন আর কোস্তিলিনকে সেই গোলাঘরে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হল আবার। শোওয়ার জন্যে ভুট্টার শুকনো খড়, এক পাত্র জল, ক’খানা রুটি, দুটো পুরোনো আলখাল্লা আর ছেঁড়াখোঁড়া মিলিটারি বুটজোড়া দেওয়া হল তাদের। সম্ভবত মেরে ফেলা রুশ সৈনিকদের দেহ থেকে খুলে নেওয়া হয়েছিল সে-সব।
রাতে তাদের পায়ের বেড়ি খুলে দেওয়া হয়, গোলাঘরের দরজায় তালা পড়ে।
তিন
এইভাবে একমাস কাটল দুজনের বন্দিজীবন।
তাদের মনিব আবদুল মুরাদ হাসে আর বলে, ‘ইউ, ইভান, গুড! আই, আবদুল, গুড!’ কিন্তু খেতে-টেতে দেয় না ভালো। কখনও বাজরার আটার খামিরহীন চাপাটি, কখনো-বা খানিক কাঁচা ময়দার খামির শুধু।
কোস্তিলিন দ্বিতীয় বার চিঠি লিখল বাড়িতে। তারপর থেকে সে আর কিছুই করে না—মনমরা হয়ে বসে থাকে শুধু আর মুক্তিপণের টাকা আসার অপেক্ষা করে। দিনের পর দিন গোলাঘরে পড়ে পড়ে ঘুমোয় আর হিসেব করে আর ক’দিন পরে বাড়ি থেকে উত্তর আসতে পারে।
জিলিন জানে, তার চিঠি কখনোই পাবে না কেউ। তাই আর দ্বিতীয় কোনও চিঠি লেখেনি সে। মনে মনে ভাবে, ‘আমার মা-ই বা এত টাকা কোথায় পাবে? সংসার তো চলে আমার পাঠানো টাকাতে। মাকে যদি পাঁচশো রুবল জোগাড় করতে হয় এখন, ঘটিবাটি বেচতে হবে। এর চাইতে ঈশ্বর যদি সহায় হন তবে এক না একভাবে পালিয়ে আমি যাবই।’
সেই থেকে মনে মনে পালানোর ফন্দি ভাঁজছে জিলিন। শিস দিতে দিতে কখনও গ্রামময় ঘুরে বেড়ায়। কখনও বসে কাদামাটির পুতুল গড়ে, কিংবা ডালপালার ঝুড়ি বোনে। হাতের কাজে জিলিন অসম্ভব দক্ষ।
একদিন কাদামাটি দিয়ে এক পুতুল গড়ল সে। তাতে নাক বসাল, হাত দিল, পা দিল—এমনকি তাতারদের পোশাকের আদলও ফুটিয়ে তুলল গায়ে। তারপর গোলাঘরের ছাদের ওপর রেখে দিল ওটাকে। তাতার মেয়েরা জল আনতে বেরোল যখন, দিনার চোখে পড়ল পুতুলটা। অন্য মহিলাদের ডেকে দেখাতে কলশি নামিয়ে রেখে পুতুলের দিকে তাকিয়ে হাসাহাসি করতে লাগল তারা। ছাদ থেকে পুতুলটা পেড়ে এনে তাদের দিকে বাড়িয়ে ধরল জিলিন। মহিলারা ফের একপ্রস্থ হাসাহাসি করল বটে, কিন্তু জিনিসটা হাত পেতে নেবার সাহস হল না কারও। পুতুলটা তখন মাটিতে নামিয়ে রেখে গোলাঘরের ভেতরে ঢুকে গেল জিলিন। অপেক্ষায় রইল, কী হয়।
খানিক পরেই দৌড়ে এসে চারপাশ দেখে নিয়ে ছোঁ মেরে পুতুলটা তুলে নিয়ে ছুট্টে পালাল দিনা।
পরদিন ভোরে আবার দেয়ালের ফাঁক দিয়ে বাইরে উঁকি দিল জিলিন। দেখে, ঘর থেকে বেরিয়ে এসে দরজার চৌকাঠে বসেছে দিনা। কোলে সেই পুতুল। লাল কাপড়ের ছোটো ছোটো টুকরো দিয়ে পুতুলটাকে নতুন করে সাজিয়েছে সে। সত্যিকারের শিশুর মতো কোলে করে দুলিয়ে দুলিয়ে তাতার ভাষায় ঘুমপাড়ানি গান গাইছে।
ঠিক তখনই এক বুড়ি বেরিয়ে এসে খানিক বকাঝকা করল দিনাকে। তারপর হাত থেকে পুতুলটা কেড়ে নিয়ে টুকরো টুকরো করে ভেঙে অন্য কাজে পাঠিয়ে দিল মেয়েটাকে।
কিন্তু জিলিন হাল ছাড়ল না। আগেরটার চাইতেও বেশি সুন্দর আবার একখানা নতুন পুতুল গড়ে দিনাকে উপহার দিল সে।
একদিন ছোটো একটা জগ নিয়ে এল দিনা। মাটিতে রেখে সামনে বসে হাসতে লাগল জিলিনের মুখে তাকিয়ে। বার বার জগটাকে আঙুল তুলে দেখাচ্ছে দিনা।
জিলিন ভাবে, এত ফুর্তি কেন মেয়ের। জগটা তুলে নিল সে। প্রথমে ভেবেছিল, জল আছে বুঝি। কিন্তু দেখা গেল, না, দুধ ভরে এনেছে মেয়ে। জিনিল দুধ খেয়ে বলে, “বাহ্! বেশ তো!”
কথা শুনে দিনার আনন্দ ধরে না। বলে ওঠে, “গুড, ইভান, গুড!”
খুশিতে হাততালি দিয়ে লাফিয়ে উঠল দিনা। পরক্ষণেই জগটা তুলে নিয়ে পালিয়ে গেল হঠাৎ। তারপর থেকে দিনা রোজই প্রায় খানিকটা করে লুকিয়ে দুধ এনে দেয় জিলিনকে।
ছাগলের দুধ দিয়ে একধরনের পনির বানায় তাতারেরা। সেই পনির তারা বাড়ির ছাদে শুকোতে দেয়। সুযোগ পেলেই দিনা সেই শুকনো পনিরের খানিকটা চুপিচুপি দিয়ে আসে জিলিনকে। আবার আবদুল ভেড়া জবাই করেছিল যেদিন, সেদিনও জামার হাতায় লুকিয়ে খানিকটা মাংস এনে দিল মেয়েটা। এটা ওটা এনে সামনে ফেলে দিয়েই দাঁড়ায় না আর, দৌড়ে পালিয়ে যায় চোখের পলকে।
তারপর তুমুল ঝড় উঠল একদিন। টানা এক ঘণ্টা ধরে মুষলধারে বৃষ্টি। ঘোলা জল নেমে আসছে তামাম ঝরনা বেয়ে। নদীর ঘাটে জল বেড়েছে প্রায় সাত ফুট। বড়ো বড়ো পাথর পর্যন্ত গড়িয়ে নিয়ে চলেছে অবলীলায়, এমন স্রোত। অসংখ্য ঝোরা নেমে আসছে পাহাড়ের গা বেয়ে, তার বুকজুড়ে জলের হিংস্র গর্জন। ঝড় থেমে গেলে গ্রামের রাস্তা দিয়েও স্রোতের মতো জল বইতে লাগল অবিরাম।
মনিবের কাছ থেকে একখানা ছুরি চেয়ে নিল জিলিন। সে দিয়ে ছোটো একটা কাঠের গুড়ি থেকে পাতলা করে কেটে একখানা চাকা বানাল সে। দুটো পুতুল বসাল চাকার দু-পাশে। বাচ্চা মেয়েরা রঙিন কাপড়ের টুকরো এনে দিল কিছু। সে দিয়ে পুতুল দুটোকে চাষি আর চাষি-বউয়ের পোশাক পরিয়ে দিল জিলিন। চাকাটা এমনভাবে তৈরি করেছে সে, জলে নামিয়ে দিলে স্রোত কেটে এগিয়ে চলে সেই জোড়া পুতুল। জলে ছাড়তেই মুহূর্তের মধ্যে ঘুরতে শুরু করল চাকা, আর দুই পুতুলও নেচে উঠল সঙ্গে সঙ্গে।
গোটা গ্রাম ভেঙে পড়ল দেখতে দেখতে। বাচ্চা ছেলেমেয়ে, তাতার নারী-পুরুষ—ভিড় করে এল সবাই। বিস্ময়ে চুকুচুক শব্দ তুলছে জিভে।
“আহ্, রুস! আহ্, ইভান!”
আবদুল মুরাদের কাছে একখানা রুশ ঘড়ি ছিল—নষ্ট। জিলিনকে ডেকে ঘড়িটি দেখিয়ে জিভ দিয়ে শব্দ করে সে বোঝাতে লাগল যে, এ আর চলছে না। জিলিন বলে, “আমাকে দাও, সারিয়ে দিচ্ছি।”
ছুরি দিয়ে ঘড়িটি খুলে ফেলে ভেতরের সব যন্ত্র পরীক্ষা করল জিলিন। আবার আগের মতো জোড়া লাগিয়ে দিল সেসব। ঘড়ি সচল হল। আবদুল মুরাদ খুব খুশি হল তাতে। নিজের একপ্রস্থ পুরোনো টিউনিক পুরস্কার দিয়ে ফেলল জিলিনকে। জামাটার নানা জায়গায় ছেঁড়া আর ফুটো। জিলিন আপত্তি করল না। রাতে কম্বল করে গায়ে চাপা দেওয়া যাবে অন্তত।
চারদিকে জিলিনের সুনাম ছড়িয়ে পড়ল এরপর। দূরদূরান্তের তাতার গ্রাম থেকেও লোকজন ছুটে আসতে লাগল তার কাছে। নষ্ট বন্দুক বা পিস্তলের তালা নিয়ে আসছে কেউ, কেউ-বা ভাঙা ঘড়ি—মেরামত করে দিতে হবে। আবদুল মুরাদও ক’টা কাজের জিনিস এনে দিয়েছে তাকে—একজোড়া সাঁড়াশি, ক’টা তুরপুন, একটা রেত।
এক তাতার গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ল একদিন। লোকজন এসে জিলিনকে বলে, “চলো, সুস্থ করে দাও তাকে।”
এদিকে চিকিৎসাবিদ্যার কী জানে জিলিন? তবুও রোগী দেখতে গেল। মনে মনে ভাবে, সারলে এমনিতেই সেরে উঠবে ব্যাটা। আমি এর ওষুধ দেব কী? গোলাঘরে ফিরে এসে সামান্য বালির সঙ্গে একটু জল মিশিয়ে নিল সে। তাতারদের সামনেই সেই জলের ওপর বিড়বিড় করে কী এক মন্ত্রমতো আওড়ে অসুস্থ লোকটাকে খেতে দিল তারপর। তাতারটা সুস্থও হয়ে উঠল সৌভাগ্যক্রমে।
এরপর থেকে একটু একটু করে তাতার ভাষা শিখতে শুরু করেছে জিলিন। গ্রামের কয়েকজন তাতারের সঙ্গে বেশ মিলমিশ হয়ে গেল তার। দরকার পড়লেই তারা দূর থেকে ডাকে, ‘ইভান! ইভান!’ অনেকের চোখে আবার বুনো জন্তুর মতো সন্দেহ আর অবিশ্বাস। বিশেষ করে লাল দাড়ি কিন্তু জিলিনকে সহ্য করতে পারে না একেবারে। দেখা হলে ভ্রূ কুঁচকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, কিংবা গালাগাল করে।
এক বুড়ো আছে, আউলে (গাঁয়ে) থাকে না, পাহাড়তলি থেকে মাঝে মাঝে আসে এখানে। জিলিন তাকে গ্রাম পেরিয়ে মসজিদের পথে যেতেই দেখতে পায় শুধু। বেঁটেখাটো লোকটা, টুপি বেড় দিয়ে একখানা সাদা কাপড় পাগড়ির মতো জড়িয়ে রাখে। তুষার সাদা দাড়িগোঁফ ছোটো করে ছাঁটা। পোড়া ইটের মতো লালচে মুখ, অজস্র বলিরেখা তাতে। নাকখানা বাজপাখির ঠোঁটের মতো তীক্ষ্ণ। ধূসর চোখ দুটো নির্মম কঠোর। দু-পাশে দুটি শ্বদন্ত বাদে মুখে দাঁত নেই আর। পাগড়ি মাথায় লাঠি হাতে ধীরে ধীরে হেঁটে যায় সে। আর এমন দৃষ্টিতে তাকায় চারদিকে, যেন শিকারের খোঁজে কোন নেকড়ে বেরিয়েছে। জিলিনকে দেখলেই রাগে নাক টেনে মুখ ফিরিয়ে চলে যায় বুড়ো।
একদিন জিলিন পাহাড় বেয়ে নেমেছে বুড়োটা কোথায় থাকে দেখবে বলে। পথ ধরে নামতে নামতে পাথরের দেয়ালঘেরা ছোট্ট এক বাগানের সামনে এসে পৌঁছেছে সে। দেয়ালের ও-পারে চেরি আর খুবানির গাছ, একচালা এক কুঁড়ে। আরও কাছে গিয়ে দেখে, খড় বুনে মৌচাক বানিয়ে রাখা আছে ক’টা। মৌমাছিরা গুনগুন করে উড়ে বেড়াচ্ছে চারদিকে। আর হাঁটু গেড়ে বসে একখানা মৌচাকে কী খুটুরখাটুর করছে বুড়ো। ডিঙি মেরে দেখতে গিয়ে পায়ের বেড়ি ঝনঝন করে উঠল জিলিনের। ঘুরে তাকিয়েই বিকট এক চিৎকার করে কোমর থেকে পিস্তল বের করে জিলিনকে গুলি করে দিল বুড়ো। কোনোমতে দ্রুত পাথরের দেয়ালের আড়ালে সরে গিয়ে নিজেকে বাঁচাল সে।
বুড়ো সোজা জিলিনের মনিবের কাছে নালিশ ঠুকল এসে। আবদুল মুরাদ জিলিনকে ডেকে হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করল, “তুমি আবার বুড়োর বাড়িতে গিয়েছিলে কী করতে?”
জিলিন উত্তর দিল, “আমি তার ক্ষতি করিনি কোনও। কোথায় থাকে, দেখতে গিয়েছিলাম শুধু।”
আবদুল মুরাদ বুড়োকে বুঝিয়ে বলল বিষয়টা। কিন্তু রাগ কমল না তার। ফোঁস ফোঁস করে নিজের ভাষায় চেঁচাতেই লাগল। শ্বদন্ত দুটো বেরিয়ে পড়েছে। জিলিনের দিকে মুঠি উঁচিয়ে ক্রোধে কাঁপছে সে।
বুড়োর সব কথা বুঝতে না পারলেও জিলিন এটুকু বুঝেছে যে, বুড়ো আবদুল মুরাদকে বলছে—রুশ বন্দিদের আউলে রাখা ঠিক নয়, মেরে ফেলা উচিত।
রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বুড়ো চলে গেল শেষে।
সে চলে যাওয়ার পর জিলিন প্রশ্ন করে, “কে লোকটা?”
আবদুল মুরাদ উত্তর দেয়, “আরে এখানকার মানী লোক খুব! আমাদের মধ্যে এই লোকটাই ছিল সবচেয়ে সাহসী যোদ্ধা। অনেক রুশকে হত্যা করেছে সে। একসময় ধনসম্পদও ছিল প্রচুর। তিনটে বেগম আর আটজন ছেলে ছিল তার। এক গ্রামেই থাকত সবাই। রুশরা এসে সেই গ্রাম ধ্বংস করে দেয় একদিন। তার সাত ছেলেকে মেরে ফেলে। এক ছেলে বেঁচে ছিল, সে রুশদের কাছে আত্মসমর্পণ করে। বুড়োও আত্মসমর্পণ করে তিন মাস রুশদের সঙ্গেই ছিল। তার ছেলেটাকে খুঁজে বের করে নিজের হাতে হত্যা করে পালিয়ে এল শেষে।
“তারপর থেকে কোনোদিন যুদ্ধে যায়নি আর। মক্কা চলে গেল। সেজন্যেই মাথায় পাগড়ি পরে সে। মক্কা ফেরত লোকেদের হাজি বলে ডাকা হয়।
“তোমাদের রুশদের একেবারেই সহ্য করতে পারে না সে। আমাকে বার বার বলে তোমাদের মেরে ফেলতে। কিন্তু আমি তো তোমাকে মারতে পারি না। আমার টাকা লেগে আছে তোমার ওপর। তাছাড়া তোমাকে আমি ভালোও বেসে ফেলেছি, ইভান। কথা দিয়ে না ফেললে তোমাকে ছেড়ে দেওয়া তো দূর, কাছছাড়াই করতাম না আমি।”
এই বলে হেসে রুশ ভাষায় নিজের সেই বুলি আওড়াল আবদুল মুরাদ, “ইউ, ইভান, গুড; আই, আবদুল, গুড!”
চার
এইভাবে আরও এক মাস বন্দি অবস্থায় কাটল জিলিনের। কখনও এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ায় দিনে, কখনও হাতের কাজে ব্যস্ত থাকে। কিন্তু রাত গভীর হলে, গোটা আউল নিঝুম হয়ে এলে গোলাঘরের মেঝে খুঁড়তে শুরু করে।
কাজটা মোটেই সহজ নয়। মাটির নীচে অজস্র পাথর। তবুও ছোট্ট রেতখানা দিয়ে ধীরে ধীরে পাথর ঘষে, মাটি সরিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে লাগল জিলিন। অনেক কষ্টে দেয়ালের নীচে একটা গর্তও খুঁড়ে ফেলল অবশেষে। একজন মানুষ হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে।
জিলিন মনে মনে ভাবে, ইস, এইবারে শুধু চারপাশটা ভালো করে চিনে নিতে পারতাম যদি, আর কোন দিকে গেলে নিজের লোকদের ধরা যাবে তা যদি জানতে পারতাম! এই তাতারগুলো তো মুখ খুলবে না কেউ।
আবদুল মুরাদ সেদিন বাড়ি ছিল না। দুপুরে খেয়েদেয়ে জিলিন ঠিক করল গ্রামের ও-পাশের পাহাড়টায় উঠে চারদিকটা দেখে আসবে একবার। ওদিকে আবদুল মুরাদ বেরোনোর আগে রোজকারমতো ছেলেকে হুকুম দিয়ে গিয়েছে জিলিনের ওপর নজর কড়া রাখতে, চোখের আড়াল না হয় যেন। ফলে জিলিনকে পাহাড়ের দিকে যেতে দেখেই পেছন পেছন দৌড়ে এসে চিৎকার করতে লাগল ছেলেটা— “যেও না! বাবা বারণ করে গেছে। ফিরে এসো এক্ষুনি, নইলে লোক ডাকব আমি!”
জিলিন তাকে বোঝাবার চেষ্টা করে— “বেশি দূরে আমি যাচ্ছি না, বাপু। ওই পাহাড়টার মাথায় উঠব শুধু। রোগী চিকিৎসার জন্যে ওষুধি গাছ চাই একটা। চাইলে তুমিও আমার সঙ্গে চলো না। দেখছ না, আমার পায়ে বেড়ি? এই অবস্থায় আমি পালাব কী করে? কাল একটা ধনুক আর ক’টা তির বানিয়ে দেব তোমায়।”
ছেলেটাও রাজি হল শেষে। পাহাড়ের দিকে রওনা হল দুজনে। পাহাড়টার চূড়াটা খুব একটা উঁচু বা দূর বলে মনে হচ্ছে না। কিন্তু পায়ের বেড়ি নিয়ে সেই পথ বেয়ে ওঠা দায়।
প্রাণপণ চেষ্টায় একসময় পাহাড়চূড়ায় গিয়ে উঠল জিলিন। সেখানে বসে চারপাশের ভূপ্রকৃতিটা ভালো করে লক্ষ করতে লাগল সে। দক্ষিণে গোলাঘরের ও-পারে এক উপত্যকা। সেখানে ঘোড়ার পাল চরছে। উপত্যকার নীচে আর একটা তাতার আউল। তার ও-পারে আরও খাড়া এক পাহাড়, আর তার পরেও আর একখানা। পাহাড়গুলোর মাঝে নীলচে ঘন বন। তারও বহুদূরে একের পর এক পাহাড়শ্রেণি আকাশের দিকে উঠে গেছে। সবচেয়ে উঁচু শৃঙ্গগুলো বরফে ঢাকা—চিনির মতো সাদা। আর এগুলোর মধ্যে একটা শৃঙ্গ অন্য সবের চেয়ে অনেক উঁচুতে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে।
পুবে-পশ্চিমেও একইরকম অসংখ্য পাহাড়। তাদের খাঁজে খাঁজে তাতার আউল থেকে ধোঁয়া উঠছে ইতিউতি।
জিলিন হতাশ হয়। ভাবে, চারদিকেই তো তাতার বসতি! এরপর রুশ জনপদের দিকে দৃষ্টি ফেরায় সে। একটা নদী বয়ে চলেছে ঠিক তার পায়ের নীচ বরাবর। তার ধারে সেই আউল, যেখানে বন্দি আছে সে। ছোটো ছোটো বাগান মিলে ঘিরে রেখেছে গ্রামটাকে। নদীর ধারে কাপড় কাচছে মেয়েরা। ছোট্ট ছোট্ট খেলনা-পুতুলের মতো দেখাচ্ছে এত উঁচু থেকে।
আউলের ও-পারে একটা পাহাড়, দক্ষিণের তুলনায় অনেক নীচু। এর পরে পাশাপাশি দুটো ঘন বনাচ্ছন্ন পাহাড়। মাঝখানে বিস্তীর্ণ এক নীলচে সমতলভূমি। সেই সমতলের অনেক অনেক দূরে ধোঁয়ার মেঘের মতো কী উড়ছে যেন।
জিলিন মনে করার চেষ্টা করল, দুর্গে থাকাকালীন সূর্য কোন দিকে উঠত আর অস্তই-বা যেত কোথায়। হিসেব মিলিয়ে কোনও সন্দেহ রইল না আর—ওই সমতলেই আছে রুশদের দুর্গ। ওই দুই পাহাড়ের মাঝখান দিয়েই পালাতে হবে তাকে।
সূর্য তখন অস্ত যেতে বসেছে। রক্তিম আভায় লাল হয়ে উঠেছে বরফে ঢাকা সব সাদা পাহাড়। কালচে পাহাড় সব ঢেকে যাচ্ছে গাঢ় অন্ধকারে। কুয়াশা উঠে আসছে খাদ থেকে। আর যে উপত্যকাটায় জিলিন রুশ দুর্গ আছে বলে মনে করছে, অস্তগামী সূর্যের আভায় সেটিতে যেন আগুন লেগেছে।
গভীর মনোযোগে জিলিন তাকিয়ে রইল সেদিকে। কোথাও যেন চিমনির ধোঁয়ার মতো কিছু একটা কাঁপতে কাঁপতে ওপরে উঠছে উপত্যকাটায়। আর সন্দেহ নেই কোনও—আলবাত রুশ দুর্গ আছে ওখানে।
এরই মধ্যে সন্ধে নেমে গিয়েছে। মোল্লার আজানের সুর ভেসে এল কানে। পশুর পাল ঘরে ফিরছে। হাম্বা রব তুলেছে গোরু-বাছুর। সঙ্গে থাকা ছেলেটি বার বার বলে চলেছে, ‘চলো, বাড়ি যাই।’ কিন্তু জিলিনের ইচ্ছে করছে না একেবারেই।
দুজনে গ্রামে ফিরে এল শেষে।
জিলিন ফন্দি আঁটে, ‘পথঘাট জেনে এসেছি, পালাতে হবে এইবারে।’ ঠিক করল, আজ রাতেই পালাবে সে। রাতে বেশ অন্ধকার জমে এখন। ক্ষয়া চাঁদ। কিন্তু কপাল মন্দ, সন্ধেতেই তাতারেরাও ফিরে এল গাঁয়ে। সাধারণত ভেড়া-ছাগলের পাল নিয়ে খোশমেজাজেই গ্রামে ফেরে তারা। কিন্তু আজ কোনও জন্তুজানোয়ার নেই সঙ্গে। একটা লাশ নিয়ে ফিরেছে তারা—লাল দাড়ির ভাই, যুদ্ধে মারা গিয়েছে। দলের সবার মুখ গম্ভীর, চোখে বিষণ্ণতা। গ্রামের লোকজন লাশ কবরে দেওয়ার জন্যে জড়ো হল সব। জিলিনও কৌতূহলবশত বেরিয়ে এল বাইরে।
লাশ কোনও কফিনে রাখা হল না। সাদা সুতির কাপড়ে জড়িয়ে নিয়ে চলল গ্রামের বাইরে। বিশাল ক’টা চিনার গাছের নীচে ঘাসের ওপর শুইয়ে রাখা হল সেখানে। মোল্লা আর গ্রামের বয়স্ক লোকেরা হাজির হল এসে। টুপির চারপাশে কাপড় পেঁচিয়ে, জুতো খুলে রেখে লাশের সামনে পাশাপাশি উবু হয়ে বসল তারা।
সবার সামনে মোল্লা। তার ঠিক পেছনে পাগড়ি পরা তিন বুড়ো, আর তাদের পেছনে গ্রামের অন্যসব তাতারেরা। মাথা নামিয়ে নীরবে বসে সবাই। অনেকক্ষণ পর মোল্লা মাথা তুলে বলে উঠল, “আল্লাহ্!” এই একটামাত্র শব্দ উচ্চারণ করেই আবার মাথা নীচু করল সে। অন্যরাও মাথা নামিয়ে নীরবে বসে রইল দীর্ঘক্ষণ। কেউ নড়ল না, শব্দ করল না।
কিছুক্ষণ পরে মোল্লা ফের মাথা তুলে বলে উঠল, “আল্লাহ্!”
এইবারে সবাই একসঙ্গে উত্তর দিল, “আল্লাহ্! আল্লাহ্!”
তারপর আবার নিস্তব্ধতা। লোকগুলো সব ঘাসের ওপর পড়ে থাকা লাশটার মতোই নিশ্চল। সামান্যতম নড়াচড়াও করছে না কেউ। জ্যান্ত লাশ যেন এক-একটা। বাতাস লেগে চিনার গাছের পাতায় ওঠা মৃদু খসখস বাদে আর কোনও শব্দ নেই কোথাও।
মোল্লা ফের প্রার্থনা শুরু করলে উঠে দাঁড়াল সবাই। লাশ তুলে কবরের কাছে নিয়ে গেল তারা। সাধারণ কোনও গর্ত নয়, মাটির নীচে পাশ বরাবর ছোটো একখানা প্রকোষ্ঠ বা গুহার মতো খোঁড়া হয়েছে তাতে। লাশটার বগলে হাত গলিয়ে ও পা ধরে গর্তে নামাল ওরা। তারপর দেহটা সামান্য বাঁকিয়ে সেই প্রকোষ্ঠের ভেতরে নামিয়ে দিল বসানো অবস্থায়। লাশের দুই হাত বুকে ভাঁজ করে রাখা।
সবুজ ক’টা লতাপাতা নিয়ে এল নোগে চাকরটা। সেসব কবরে ঠুসে মাটি চাপা দেওয়া হল দ্রুত। কবরের মাটি সমান করে মাথার দিকে একটা পাথর খাড়া করে পুঁতে দিল শেষে। পা দিয়ে সবাই মাটি শক্ত করে চেপে দিল এরপর। কাজ সেরে আবার দীর্ঘক্ষণ কবরের সামনে সার বেঁধে চুপ করে বসে রইল সবাই। শেষে উঠে দাঁড়িয়ে তিনবার আল্লার নাম নিয়ে গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল প্রত্যেকে।
উপস্থিত বুড়ো মানুষদের হাতে এইবারে কিছু টাকাকড়ি দিল লাল দাড়ি। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে একটা চাবুক নিয়ে নিজের কপালে তিনবার আঘাত করে বাড়ির পথ ধরল সে।
পরদিন সকালে জিলিন দেখে, আরও তিনজনকে সঙ্গে করে একটা মাদি ঘোড়া গ্রাম থেকে বাইরে নিয়ে যাচ্ছে লাল দাড়ি। গ্রামের সীমানা পেরিয়েই গায়ের টিউনিকটা খুলে ফেলে হাতা গুটিয়ে নিল সে। একটা ছোরা বার করে শানপাথরে ধার দিতে বসল এইবার। ঘোড়াটার মাথা চেপে ধরেছে অন্য দুই তাতার। লাল দাড়ি এক টানে তার নলিটা কেটে দিতেই লুটিয়ে পড়ল ঘোড়াটা। তারপর বলিষ্ঠ দুই হাতে চামড়া ছাড়াতে লেগে পড়ল সে। ওদিকে গ্রামের মেয়েরা এসে নাড়িভুঁড়ি ধোওয়ার কাজে লেগে গিয়েছে ততক্ষণে। ঘোড়ার মাংস তুলে নিল ঘরে। তারপর মৃতের স্মরণে আয়োজিত ভোজে যোগ দিতে গোটা গ্রাম এসে হাজির হল লাল দাড়ির বাড়িতে।
তিনদিন ধরে সেই মাংস খেল তারা, সঙ্গে বুজা। আর মৃত ব্যক্তির আত্মার জন্যে প্রার্থনা করল। এই ক’দিন তাতারেরা গ্রামেই ছিল সব, যায়নি কোথাও।
চতুর্থ দিন দুপুরের দিকে জিলিন দেখে, বেরোবার তোড়জোড় করছে তাতারেরা। ঘোড়াদের বের করে আনা হয়েছে, তৈরি হচ্ছে সবাই। লাল দাড়ি-সহ জনা দশেক তাতার ঘোড়ার পিঠে রওনা হয়ে গেল শেষে। কিন্তু আবদুল মুরাদ গেল না, গ্রামেই থেকে গেল।
অমাবস্যা গেছে মাত্র দু-দিন হয়। রাত এখনও ঘন অন্ধকার। আজ রাতেই পালানোর উপযুক্ত সময়। কোস্তিলিনকে নিজের পরিকল্পনার কথা জানায় জিলিন। কিন্তু কোস্তিলিনের সাহস ভেঙে গিয়েছে আগেই। আঁতকে উঠে বলে, “পালাব কী করে? আমরা তো পথই চিনি না!”
“আমি চিনি।”
“ধরো পথ জানোই,” কোস্তিলিন বলে, “তবুও এক রাতের মধ্যে আমরা দুর্গে পৌঁছতে পারব বলছ?”
জিলিন উত্তর দেয়, “না পারলে জঙ্গলে রাত কাটাব। আমি কিছু শুকনো পনির জমিয়ে রেখেছি, দেখো। এখানে মনখারাপ করে বসে থেকে কী লাভ? তোমার মুক্তিপণের টাকা এসে গেলে তো ভালোই, কিন্তু টাকাটা যদি জোগাড়ই না হয়? তার ওপর তাতারেরা খুব রেগে আছে এখন। রুশরা তাদের একজনকে মেরে ফেলেছে। আমাদেরও মেরে ফেলার কথা বলাবলি করছে তারা।”
কোস্তিলিন কিছুক্ষণ ভেবে বলে, “বেশ, চলো তবে।”
পাঁচ
হামাগুড়ি দিয়ে গর্তে গিয়ে ঢুকল জিলিন। তারপর আরও খানিক বড়ো করে খুঁড়ল ওটিকে, কোস্তিলিনও বেরোতে পারে যাতে। এরপর চুপচাপ বসে অপেক্ষায় রইল দুজনে গোটা আউল নীরব হয় কখন।
চারদিক নিঝুম হলে পর দেয়ালের নীচের গর্ত দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল জিলিন। ফিসফিস করে ডাকল, “এসো।”
কোস্তিলিনও হামাগুড়ি দিয়ে বেরোতে গেল, কিন্তু পায়ে এক পাথর লেগে শব্দ উঠল খানিক। সাংঘাতিক হিংস্র এক প্রহরী কুকুর আছে আবদুল মুরাদের, ছোপছোপ দাগ গায়ে, নাম অউলিয়াশিন। জিলিন ক’দিন ধরে নিয়মিত খাবার খাইয়ে বাগে এনেছে তাকে। শব্দ শুনে ঘেউ ঘেউ করে লাফিয়ে উঠল সেই অউলিয়াশিন। সঙ্গে সঙ্গে গ্রামের অন্য কুকুররেরাও চিৎকার করে ডাকতে শুরু করল ফের। খুব আস্তে করে শিস দিয়ে কুকুরটার দিকে একটুকরো পনির ছুড়ে দিল জিলিন। অউলিয়াশিন জিলিনকে চেনে, লেজ নাড়তে নাড়তে চুপ করে গেল।
কিন্তু ততক্ষণে আবদুল মুরাদ কুকুরের ডাক শুনে ফেলেছে। নিজের কুঁড়ে থেকে চিৎকার করে উঠল সে, “হ্যাট, হ্যাট, অউলিয়াশিন!”
জিলিন তাতে ভয় না পেয়ে কুকুরটার কানের পেছনে আলতো করে চুলকে দিল একটুক্ষণ। অউলিয়াশিনও শান্ত হয়ে জিলিনের পায়ে গা ঘষছে, লেজ নাড়াচ্ছে আরামে।
কিছুটা সময় একটা কোণের আড়ালে লুকিয়ে বসে রইল দুজনে। অল্প পরেই চারদিক নিঝুম হয়ে এল ফের। একটা খোঁয়াড় থেকে ভেড়ার গলা ঝাড়ার শব্দ ভেসে আসছে শুধু। সঙ্গে খাদে বয়ে যাওয়া জলের কলকল শব্দ।
ঘন অন্ধকার চারদিক। মাথার ওপর তারাভরা আকাশ। লালচে একফালি নতুন চাঁদ পাহাড়ের আড়ালে ডুবতে বসেছে। উপত্যকাগুলো সব দুধের মতো সাদা কুয়াশায় ঢেকে আছে।
জিলিন উঠে দাঁড়িয়ে বলে, “চলো, বন্ধু! রওনা হওয়া যাক এইবারে।”
এগোতে শুরু করেছে দুজনে। কয়েক পা যেতেই মসজিদের ছাদ থেকে মোল্লার চিৎকার ভেসে এল, ‘আল্লাহ্! বিসমিল্লাহ্! আর-রহমান!’ অর্থাৎ, গ্রামের লোকেরা এখন নমাজ পড়তে মসজিদে যাবে। আবার এক দেয়ালের আড়ালে লুকিয়ে বসে পড়ল দুজনে। অপেক্ষায় রইল লোকজনের মসজিদের দিকে চলে যাওয়া অবধি। চারদিক আবার নিস্তব্ধ হয়ে এল শেষে।
“এবার চলো। ঈশ্বর আমাদের সহায় হোন!”
বুকে ক্রুশচিহ্ন এঁকে দুজনে রওনা হল আবার। একটা বাড়ির উঠোন পেরিয়ে, পাহাড় বেয়ে নীচে নেমে নদীর কাছে এল তারা। নদী পার হয়ে এগিয়ে চলল উপত্যকার বুকে।
ঘন কুয়াশা জমেছে মাটির কাছাকাছি। আকাশে জ্বলজ্বল করছে অসংখ্য তারা। তারা দেখে পথ চিনে এগোচ্ছে জিলিন। ঠান্ডা কুয়াশায় হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে না। তবে সমস্যা অন্যত্র। দুজনেরই জুতোজোড়া পুরোনো, ক্ষয়ে গিয়েছে। খুলে ফেলে দিয়ে খালি পায়ে পাথর থেকে পাথরে লাফিয়ে চলতে শুরু করেছে জিলিন। আকাশের তারার অবস্থান দেখে পথ ঠিক করে।
কোস্তিলিন ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ছে এইবারে। বলে, “একটু আস্তে চলো, ভাই। এই হতচ্ছাড়া জুতোতে পায়ে ফোস্কা পড়ে গেল যে।”
“খুলে ফেলো। হাঁটতে সুবিধে হবে।”
কোস্তিলিন জুতো খুলে ফেলল। কিন্তু সুরাহা হল না কিছু। ধারালো পাথরে পা কেটে যেতে লাগল তার। আরও পিছিয়ে পড়ল সে।
জিলিন সাহস দেয়, “পা কাটলে সেরে যাবে। কিন্তু তাতারদের হাতে ধরা পড়লে রক্ষে নেই।”
কোস্তিলিন কোনও উত্তর করে না। গোঙাতে গোঙাতে জিলিনের পেছনে হাঁটতে থাকে।
অনেকক্ষণ হল উপত্যকা ধরে এগিয়ে চলেছে তারা। ডানদিক থেকে কুকুরের ঘেউ ঘেউ ভেসে এল হঠাৎ। জিলিন থমকে দাঁড়িয়ে চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিয়ে চার হাত-পা দিয়ে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল দ্রুত। খানিক পর বলে ওঠে, “এহে! ভুল পথে চলে এসেছি আমরা। অনেক বেশি ডানদিকে সরে গেছি। এ যে আর একটা আউল, পাহাড়ের চূড়া থেকে একেই দেখেছিলাম আমি। ফিরে যেতে হবে আমাদের। তারপর বাঁদিকের পাহাড়টায় উঠতে হবে গিয়ে। ওখানে নিশ্চয়ই বন আছে একটা।”
কোস্তিলিন থামায়, “একটু দাঁড়াও, ভাই! একটু শ্বাস নিতে দাও আগে। পা দুটো কেটে রক্ত বেরোচ্ছে একেবারে।”
“ওসব সেরে যাবে। একটু হালকা পায়ে লাফিয়ে হাঁটো দেখি, এইভাবে।”
এই বলে দ্রুত ফিরে গিয়ে পাহাড়টার বাঁদিকের বনটার দিকে চলল জিলিন। কোস্তিলিন সেই পিছিয়েই আছে। গোঙাতে গোঙাতে এগিয়ে চলেছে। জিলিন মুখে ‘শ-শ’ আওয়াজ তুলে সঙ্গীকে শব্দ করতে বারণ করে এগোতে শুরু করে ফের।
পাহাড়ে উঠে সত্যিই একটা বন মিলল, যেমনটা বলেছিল জিলিন। বনে ঢুকে ঝোপঝাড় ঠেলে এগোতে লাগল দুজনে। কাঁটাঝোপে তাদের কাপড়চোপড় ছিঁড়ে ফালাফালা হয়ে যাচ্ছে। অবশেষে সরু এক পাকদণ্ডির সন্ধান পেয়ে সেই পথ ধরল।
“দাঁড়াও!”
ঘোড়ার খুরের শব্দ কানে আসছে পথে। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে কান পেতে রইল তারা। ঠিক ঘোড়ার খুরের আওয়াজের মতোই মনে হচ্ছে বটে। কিছুক্ষণ পর থেমেও গেল ফের। তারপর আবার হাঁটা। আবার সেই খুরের শব্দ। তারা থামলে শব্দও থামে। গুড়ি মেরে শব্দটার সন্ধানে এগিয়ে চলল জিলিন। সেখানটায় অন্ধকার গাঢ় হয়নি তখনও। দেখে, কিছু একটা দাঁড়িয়ে আছে পথের ওপর। দেখতে অনেকটা ঘোড়ার মতো, পুরোপুরি ঘোড়াও নয়। পিঠেও কিছু একটা রয়েছে যেন, কিন্তু সেটিকেও মানুষের মতো বলে মনে হচ্ছে না। ফোঁস ফোঁস করে শ্বাস ছাড়ছে। জিলিন ভাবে, এ আবার কী জিনিস? খুব আস্তে একটা শিস দিয়ে উঠল সে। অমনি চোখের পলকে সে-জানোয়ার পথ ছেড়ে ঘন জঙ্গলের ভেতর হাওয়া। এমন বিকট ডালপালা ভাঙার শব্দ উঠল চারদিকে, প্রবল ঘূর্ণিঝড় বইছে যেন।
কোস্তিলিন ভয়ে ধপ করে বসে পড়েছে ততক্ষণে। জিলিন হেসে বলে, “হরিণ। শিং দিয়ে ডালপালা ভেঙে এগোচ্ছে শুনতে পাচ্ছ না? আমরা যেমন ওকে ভয় পেয়েছি, ও-ও তেমনি আমাদের।”
আবার শুরু হল পথচলা। এরই মধ্যে পশ্চিমে হেলে পড়েছে সপ্তর্ষিমণ্ডল। ভোর হতে আর দেরি নেই বেশি। দুজনের কেউই জানে না আদৌ ঠিক পথে এগোচ্ছে কি না। জিলিনের মনে হচ্ছে, এই পথেই তাকে ধরে এনেছিল তাতারেরা। সে-হিসেবমতো রুশ দুর্গ এখনও প্রায় সাত মাইল দূরে। কিন্তু নিশ্চিত হওয়ার কোনও উপায় নেই। রাতের আঁধারে যে-কেউ পথ ভুল করতে পারে।
আরও কিছুদূর যাওয়ার পর একটা ফাঁকা জায়গায় এসে পৌঁছল তারা। কোস্তিলিন সেখানে বসে পড়ে বলে, “তোমার যা ইচ্ছে করো, ভাই। আমি এক পাও হাঁটতে পারব না আর। পা চলছে না।”
জিলিন অনেক বোঝানোর চেষ্টা করল। কোস্তিলিন অনড়। বলে, “না, ভাই। আমার পক্ষে কোনোমতেই সম্ভব নয় আর।”
জিলিনের ধৈর্য ভেঙে গেল এইবারে। রুক্ষ স্বরে বলে উঠল, “বেশ, আমি একাই যাচ্ছি তবে। বিদায়!”
এই কথা শুনে তাড়াতাড়ি উঠে জিলিনের পেছনে আবার হাঁটতে শুরু করল কোস্তিলিন।
আরও প্রায় তিন মাইল পথ পেরিয়ে গেল তারা। এদিকে কুয়াশা আরও ঘন হয়েছে বনে। এক গজ দূরের জিনিসটাও মালুম হয় না স্পষ্ট। আকাশের তারার আলোও ম্লান হয়ে আসছে ক্রমশ।
হঠাৎ সামনে ঘোড়ার খুরের শব্দ শোনা গেল কোথায়। লোহার নাল টকাটক শব্দ তুলেছে পাথরে। সঙ্গে সঙ্গে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ে মাটিতে কান পেতে কিছু শোনার চেষ্টা করল জিলিন। বলে, “একজন ঘোড়সওয়ার আসছে এই পথে।”
তাড়াতাড়ি পথ ছেড়ে ঝোপের আড়ালে গিয়ে উবু হয়ে বসে পড়ল দুজনে। জিলিন সাবধানে হামাগুড়ি দিয়ে পথের ধারে গিয়ে উঁকি মারল। দেখে, ঘোড়ায় চড়ে একটা গোরু হাঁকিয়ে নিয়ে চলেছে এক তাতার। গুনগুন করে গানও ধরেছে আপনমনে। রাস্তাটা পার হয়ে গেল লোকটা।
জিলিন ফিরে এসে কোস্তিলিনকে বলে, “ঈশ্বর জোর রক্ষে করেছেন আমাদের। সে চলে গেছে, বন্ধু। ওঠো, যাওয়া যাক।”
কোস্তিলিন উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে সঙ্গে-সঙ্গেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ল আবার। কাতর স্বরে জানায়, “আমি পারছি না। সত্যি বলছি, আর পারছি না। একটুও শক্তি নেই আর শরীরে।”
কোস্তিলিন মোটাসোটা ভারী চেহারার মানুষ। বড্ড ঘেমে গিয়েছে এতক্ষণের হাঁটার পরিশ্রমে। কুয়াশার ঠান্ডায় সেই ভেজা শরীর জমে গিয়েছে। তার ওপর রক্ত ঝরছে পা থেকে। সব মিলিয়ে বেচারা অবসন্ন হয়ে পড়েছে একেবারে। তাকে তুলে ধরতে গেল জিলিন। কোস্তিলিন চিৎকার করে উঠল, “আহ্, আহ্! লাগছে ভীষণ!”
বুকটা ধড়াস করে উঠল জিলিনের। চাপা গলায় তিরস্কার করল, “আহ্, চেঁচাচ্ছ কেন? এখনও কাছাকাছিই আছে তাতারটা। কানে যাবে তো!”
তারপর ভাবে, লোকটা তো দেখি ভেঙে পড়েছে একেবারে। কী করি এখন? সঙ্গের মানুষটাকে ফেলে চলে যাব, সেও তো হয় না। ভেবেচিন্তে বলে, “আচ্ছা বেশ, আমার পিঠে চড়ে বসো তবে। সত্যিই হাঁটতে পারছ না যখন, বয়েই নিয়ে যাব তোমাকে।”
কোস্তিলিনকে দাঁড় করিয়ে তার দুই হাত নিজের কাঁধের ওপর ফেলে, ঊরুর নীচে হাত গলিয়ে পিঠে তুলে নিল জিলিন। হাঁটতে হাঁটতে বলে, “একটা কথা—ঈশ্বরের দোহাই, গলাটা চেপে ধরো না যেন। আমার কাঁধ দুটো শক্ত করে ধরে থাকো শুধু।”
কোস্তিলিনের ভারে জিলিনের হাঁটা দারুণ কষ্টকর হয়ে উঠল এইবারে। পা দুটোও রক্তাক্ত। দীর্ঘ পথ হেঁটে সে নিজেও ভীষণ ক্লান্ত। একটু ঝুঁকে কোস্তিলিনের ভার সামলে নিচ্ছে বার বার। মাঝেমধ্যে ঝাঁকুনি দিয়ে তাকে একটু ওপরে তুলে দাঁতে দাঁত চেপে পথ চলে ফের।
এদিকে কোস্তিলিনের চিৎকারটা ঠিকই কানে গিয়েছে তাতারটার। হঠাৎ পেছন থেকে ঘোড়ার দৌড়ের শব্দ পায় জিলিন। সঙ্গে তাতার ভাষায় চিৎকার। সঙ্গে সঙ্গে পথ ছেড়ে ঝোপের ভেতর ঢুকে পড়ল সে। তাতারটা বন্দুক তুলে গুলি ছুড়ল, কিন্তু লক্ষ্যভ্রষ্ট হল। নিজের ভাষায় চিৎকার করতে করতে ঘোড়া ছুটিয়ে রাস্তা ধরে চলে গেল লোকটা।
জিলিন হতাশ স্বরে বলে, “এইবারে সর্বনাশ হল, বন্ধু। ওই শয়তানটা নিশ্চয়ই লোক জুটিয়ে আমাদের খোঁজে আসবে এইবার। এখান থেকে অন্তত দু-এক মাইল দূরে সরে যেতে না পারি যদি, তবেই মরেছি।”
তারপর মনে মনে বলে, কেন যে মরতে এই বোঝা ঘাড়ে নিলাম! একা হলে তো অনেক আগেই পালাতাম।
কোস্তিলিন তাড়াতাড়ি বলে ওঠে, “তুমি পালাও, বন্ধু! আমার জন্যে মরতে যাবে কেন?”
জিলিন দৃঢ় কণ্ঠে জবাব দেয়, “না। সঙ্গীকে পথে ফেলে পালানো আমার ধাতে নেই।”
এই বলে আবার কোস্তিলিনকে পিঠে তুলে নিয়ে টলতে টলতে হাঁটতে শুরু করল সে। আরও প্রায় আধ মাইলের বেশি পথ পেরোল এক লপ্তে। বনেরও শেষ নেই, পথও ফুরোয় না। কুয়াশা ধীরে ধীরে পাতলা হয়ে আসছে এইবারে। মেঘ জমতে শুরু করেছে আকাশে। তারাও দেখা যাচ্ছে না আর। জিলিন সম্পূর্ণ ক্লান্ত। রাস্তার ধারে পাথর বাঁধানো এক ঝরনার কাছে এসে থামল সে। পিঠ থেকে নামিয়ে বসিয়ে দিল সঙ্গীকে। বলে, “বিশ্রাম নিই খানিক। একটু জল খাই। সঙ্গে যে পনির আছে, খেয়ে নেওয়া যাক চলো। মনে হয় আর বেশি দূর নয়।”
কিন্তু জল খাওয়ার জন্যে নীচু হয়ে শোওয়ামাত্রই পেছন থেকে ঘোড়ার খুরের শব্দ কানে এল আবার। তাড়াতাড়ি রাস্তা ছেড়ে ডানদিকের ঝোপের মধ্যে ঢুকে এক খাড়া ঢালের নীচে গা এলিয়ে শুয়ে রইল দুজনে। তাতারদের কথাবার্তা ভেসে আসছে কানে। তাতারেরাও ঠিক সেই জায়গাতেই এসে থামল, যেখানে রাস্তা ছেড়ে সরে গিয়েছে জিলিনেরা। কিছুক্ষণ নিজেদের মধ্যে বলাবলি করে এক শিকারি কুকুরকে গন্ধ শোঁকার নির্দেশ দিল তাতারেরা। ঝোপঝাড় ভাঙার শব্দ উঠল আচমকা। মুহূর্তে অচেনা এক কুকুর বেরিয়ে এল ঝোপের আড়াল থেকে। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে, চারপাশ শুঁকে-টুকে জোর ঘেউ ঘেউ শুরু করল সেই দুশমন।
মুহূর্তের মধ্যেই তাতারেরা নেমে এল ঢাল বেয়ে। জিলিন ও কোস্তিলিনকে বেঁধে ঘোড়ার পিঠে তুলে রওনা হয়ে গেল দ্রুত।
মাইল দুই পথ যাওয়ার পর আবদুল মুরাদের সঙ্গে দেখা। পেছনে আরও দুজন তাতার। দলটার সঙ্গে কীসব কথাবার্তা বলে দুই আসামিকে নিজের দুই ঘোড়ায় তুলে আবার আউলে ফিরিয়ে নিয়ে এল আবদুল। মুখে সেই আগের হাসি নেই আর। একটা কথাও বলল না সে।
ভোর হওয়ার আগেই আবার আউলে ফিরে এল দলটা। মাঝপথে নামিয়ে দিতেই চারদিক থেকে ছেলেমেয়েরা ছুটে এসে পাথর ছুড়তে লাগল জিলিনদের। সঙ্গে চিৎকার, গালাগাল। শেষে চাবুক চালাতে লাগল দুজনের ওপর।
তাতারেরাও সবাই গোল হয়ে ঘিরে দাঁড়িয়েছে ততক্ষণে। পাহাড়তলির সেই বুড়ো হাজিও পৌঁছেছে এসে। আলোচনা শুরু হল তাতারদের মধ্যে। জিলিন শুনতে পেল, তাকে আর কোস্তিলিনকে কী করা উচিত এইবারে, সেই কর্তব্যই ঠিক করছে তারা। কেউ বলে, আরও দূরের পাহাড়ি অঞ্চলে পাঠিয়ে দেওয়া উচিত। কিন্তু বুড়ো হাজি রাজি নয়। দৃঢ়স্বরে বলে, “না। মেরে ফেলতে হবে এদের।”
আবদুল মুরাদ লাফিয়ে উঠল সে শুনে। বলে, “আরে না, সে কী! এদের ওপর টাকা লাগিয়ে রেখেছি আমি। মুক্তিপণের টাকা না পেলে আমার ক্ষতি হবে না?”
বুড়োর সাফ জবাব, “একটা টাকাও ওরা দেবে না তোমাকে। সর্বনাশ ডেকে আনবে বরং। রুশদের খাওয়ানোও পাপ। মেরে ফেলো ওদের। ঝামেলা চুকে যাক।”
সভা ভাঙল একসময়। সবাই চলে গেলে আবদুল মুরাদ জিলিনের কাছে এসে শাসাল, “দু-সপ্তাহের মধ্যে যদি মুক্তিপণের টাকা না আসে, আমি চাবকাব তোমাকে। আর যদি পালানোর চেষ্টা করো আবার, কুকুরের মতো গুলি করে মারব জেনে রেখো। নাও, চিঠি লেখো ফের—আর ঠিক ঠিক ঠিকানায় লিখবে এইবারে।”
সামনে কাগজ কলম এনে ধরা হল তাদের। দুজনকে বাধ্য করা হল আবার মুক্তিপণের চিঠি লিখতে। এরপর পায়ে ভারী বেড়ি পরিয়ে মসজিদের পেছনে নিয়ে যাওয়া হল দুজনকে। সেখানে প্রায় বারো বর্গফুট গভীর এক গর্ত। তাতেই ফেলে রাখা হল তাদের।
ছয়
জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠল এইবারে। পায়ের বেড়িও আর খোলা হয় না, একবারের জন্যে খোলা বাতাসে বেরোতেও দেওয়া হয় না। কাঁচা ময়দার খামির কতকটা গর্তে ছুড়ে দেওয়া হয়, কুকুরকে দিচ্ছে যেন; আর একটা টিনের পাত্রে জল নামিয়ে দেওয়া হয় খানিকটা।
বদ্ধ গর্তের ভেতরটা স্যাঁতসেতে আর দুর্গন্ধে ভরা। শ্বাস নেওয়া দায়। কোস্তিলিনের শরীর ভেঙে পড়ল দ্রুত। সারা গা ফুলে যন্ত্রণা শুরু হল। হয় কেবল কোঁকায়, নয় ঘুমিয়ে থাকে সারাক্ষণ। জিলিনও হতাশ হয়ে পড়ছে দ্রুত। বিলক্ষণ বুঝতে পারছে, পরিস্থিতি সঙ্গিন হয়ে উঠছে, কিন্তু পালানোর পথ নেই। ফের একবার গর্ত খুঁড়ে সুড়ঙ্গ বানাবার তাল করল সে, কিন্তু সুবিধে হল না এইবারে। আবদুল মুরাদ টের পেয়ে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে গেল।
একদিন গর্তের মেঝেতে বসে মুক্তির কথা ভাবছে জিলিন। বিষণ্ণ মন। আচমকা একখানা রুটি এসে পড়ল তার কোলের ওপর। তারপর আরও একখানা। এর পরে ঝরে পড়ল একমুঠো চেরি ফল। চমকে ওপরে তাকিয়ে দেখে, গর্তের মুখে দিনা দাঁড়িয়ে। জিলিনের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলেই পালিয়ে গেল দৌড়ে। জিলিনের আশা জাগল, দিনার সাহায্য চাইলে পাব নিশ্চয়ই? গর্তের এককোণে খানিকটা জায়গা পরিষ্কার করে, মাটি কুরে খানিকটা কাদা জোগাড় করে খেলনা গড়তে শুরু করল আবার। খুদে খুদে মানুষ গড়ে, ঘোড়া আর কুকুরের পুতুল গড়ে আর ভাবে, দিনা এলে ওপরে ছুড়ে দেব এগুলো।
কিন্তু পরদিন দিনা এল না। বদলে ঘোড়ার খুরের শব্দ ভেসে এল কানে।
ক’জন ঘোড়সওয়ার এসে ঢুকল গ্রামে। মসজিদের উঠোনে তাতারদের সালিশি বসল ফের। উচ্চৈঃস্বরে তর্ক-বিতর্ক চলছে। তাতে ‘রুশ’ শব্দটা কানে আসছে বার বার। বুড়ো হাজির গলাও চিনতে পারল জিলিন। তাদের ভাষা পুরোপুরি না বুঝলেও আন্দাজ করতে পারছে, রুশ সৈন্যরা সম্ভবত কাছাকাছি এসে পৌঁছেছে কোথাও। তাতারেরা ভয় পাচ্ছে, আউলে হানা দেয় যদি। এমতাবস্থায় দুই বন্দির কী ব্যবস্থা করা, সেও বুঝে উঠতে পারছে না তারা। অনেকক্ষণ আলোচনার পর তাতারেরা চলে গেল মসজিদ থেকে।
এমনি সময় হঠাৎ মাথার ওপর মৃদু খসখস আওয়াজ। জিলিন মুখ তুলে দেখে, গর্তের ধারে উবু হয়ে বসে আছে দিনা। হাঁটু দুটো উঁচু হয়ে আছে মাথার ওপর। বিনুনিতে গাঁথা রুপোর মুদ্রাগুলো গর্তের মুখে ঝুলছে। চোখ দুটো তারার মতো জ্বলজ্বল করছে তার। জামার হাতার ভেতর থেকে দু-খণ্ড পনির বের করে জিলিনের দিকে ছুড়ে দিল সে।
জিলিন সেগুলো লুফে নিয়ে বলে, “আরও আগে এলে না যে? তোমার জন্যে কিছু খেলনা বানিয়ে রেখেছি আমি। এই নাও, ধরো!”
একে একে খেলনাগুলো ওপরে ছুড়ে দিল জিলিন। দিনা ওগুলোর দিকে ফিরেও তাকাল না একবার। মাথা নেড়ে বলে, “ওসব চাই না আমার।” কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে ফের বলে ওঠে, “ওরা তোমাকে মেরে ফেলবে, ইভান!”
এই বলে নিজের গলায় আঙুল দিয়ে ইশারা করে দিনা।
জিলিন জিজ্ঞেস করে, “কে মারবে, দিনা?”
“বাবা। বুড়ো লোকগুলো বলছে, তোমাকে আর বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। কিন্তু আমার খুব কষ্ট হচ্ছে, জানো।”
জিলিন সঙ্গে সঙ্গে বলে, “আচ্ছা বেশ, সত্যিই আমার জন্যে যদি তোমার কষ্ট হয়, তবে লম্বা একটা বাঁশ এনে দাও না।”
দিনা মাথা নাড়ে।— “পারব না।”
জিলিন হাতজোড় করে অনুনয় করে, “দিনা, প্লিজ! এটুকু অন্তত সাহায্য করো। অনুরোধ করছি!”
“অসম্ভব। বাঁশ নিয়ে আসতে দেখে ফেলবে না ওরা? সবাই বাড়িতেই আছে এখন।”
দিনা চলে গেল।
সন্ধ্যা নেমেছে। জিলিন গর্তের ভেতরে বসে। মাঝে-মধ্যে ওপরে তাকাচ্ছে আর ভাবছে—কী হবে এবার? একে একে তারা ফুটছে আকাশে। কিন্তু চাঁদ ওঠেনি তখনও। মসজিদ থেকে মোল্লার কণ্ঠে আজানের ধ্বনি ভেসে এল একবার। তারপর আবার চারদিক নিঝুম।
ঝিমুনিমতো আসছে জিলিনের। দিনার কথাই ভাবছিল মনে মনে—বেজায় ভয় পেয়েছে মেয়েটা। আসবে বলে মনে হয় না আর। ঠিক সেই সময় হঠাৎ খানিকটা কাদামাটি ঝরে পড়ল তার মাথায়। চমকে ওপরে তাকিয়ে দেখে, গর্তের বিপরীত দিকের দেওয়ালের ওপর দিয়ে একটা লম্বা বাঁশ নামানোর চেষ্টা করছে কে। বাঁশটা খানিকক্ষণ দেওয়ালে ঠেকতে ঠেকতে এদিক-ওদিক নড়ল, তারপর ধীরে ধীরে গর্তের ভেতরে নেমে এল পিছলে।
জিলিনের আনন্দ আর ধরে না। তাড়াতাড়ি বাঁশখানা ধরে নীচে নামিয়ে আনল সে। বেশ মজবুত বাঁশ—আবদুল মুরাদের বাড়ির ছাদে পড়ে থাকতে দেখেছে সে।
ওপরে তাকাল জিলিন। আকাশের গায়ে অসংখ্য তারার ঝিকিমিকি। আর ঠিক গর্তের মুখে অন্ধকারের মধ্যে দিনার দুটো চোখ বেড়ালের চোখের মতো জ্বলছে। সে মুখটা গর্তের একেবারে ধারে নামিয়ে এনে ফিসফিস করে ডাকল, “ইভান, ইভান...” একই সঙ্গে হাত নেড়ে ইশারা করল আস্তে কথা বলতে।
জিলিনও গলা নামিয়ে উত্তর দেয়, “বলো।”
দিনা জানায়, “দুজন বাদে বাকিরা চলে গেছে সবাই।”
জিলিন তক্ষুনি কোস্তিলিনকে তাড়া দেয়, “চলো, কোস্তিলিন। আর একবার শেষ চেষ্টা করে দেখা যাক। তোমাকে ওপরে তুলে দেব আমি।”
কিন্তু কোস্তিলিন কিছুতেই রাজি হল না। ক্লান্ত স্বরে বলে, “না, ভাই। আমার পক্ষে সে আর সম্ভব নয়। ঠিকমতো পাশটুকুই ফিরতে পারি না, এতটা পথ যাব কী করে?”
জিলিন একটুক্ষণ চুপ করে থাকে। শেষে বলে, “তবে বিদায় দাও, বন্ধু। আমার ওপর আবার রাগ-টাগ কোরো না যেন।”
জড়িয়ে ধরে বিদায় আলিঙ্গন সারল পরস্পর। বাঁশখানা শক্ত মুঠোতে ধরল জিলিন। দিনাকে বলল, “ভালো করে ধরে থাকো, দিনা।”
ওপরে উঠতে শুরু করল জিলিন। এক-দু’বার হাতও পিছলে গেল তার। পায়ের ভারী বেড়ি বেয়ে ওঠার পথে বড়ো বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নীচ থেকে কোস্তিলিনও যতটা কুলোল, ঠেলে সাহায্য করল বন্ধুকে।
অনেক কষ্টে শেষতক গর্তের মুখে পৌঁছতে সক্ষম হল জিলিন। দিনা ছোট্ট হাত দুটো দিয়ে প্রাণপণে টেনে ধরেছে জিলিনের জামা। মুখে আনন্দের হাসি ফুটে উঠেছে তার।
জিলিন বাঁশটা গর্ত থেকে টেনে তুলে বলে, “এটা আবার আগের জায়গায় রেখে দাও, দিনা। ওরা টের পেয়ে যাবে নইলে, মারধর করবে তোমায়।”
বাঁশ নিয়ে চলে গেল দিনা। আর জিলিন দ্রুত পাহাড় বেয়ে নামতে লাগল নীচে। খাড়া ঢাল বেয়ে নীচে পৌঁছে একখানা ধারালো পাথর কুড়িয়ে নিয়ে পায়ের বেড়ির তালাটা ভাঙার চেষ্টা করল আপ্রাণ। অত্যন্ত মজবুত তালা, অনেক চেষ্টাতেও ভাঙা গেল না তা। বেড়িও এমনভাবে বাঁধা যে তালায় ঠিকমতো আঘাত করাও কঠিন। ঠিক তখনই পাহাড়ের ওপর থেকে দ্রুত নেমে আসার শব্দ কানে এল কার। হালকা পায়ে লাফাতে লাফাতে এগিয়ে আসছে কেউ। জিলিন ভাবে, এ দিনা না হয়ে যায় না।
দিনাই ছিল সত্যি। দৌড়ে এসে একটা পাথর তুলে নিয়ে বলে, “আমায় দাও তো, দেখি একবার।”
হাঁটু গেড়ে বসে প্রাণপণে তালাটা ভাঙার চেষ্টা করতে লাগল মেয়ে। কিন্তু প্যাঁকাটির মতো তার দুর্বল হাতের ডানা এত মজবুত তালাটা সামান্য টসকাতেও পারল না। হাতের পাথর ছুড়ে ফেলে অসহায় কেঁদে উঠল শেষে।
জিলিন আবার তালা ভাঙতে লেগে গেল ফের। দিনা তার পাশটিতে উবু হয়ে বসে একটা হাত আলতো করে ফেলে রেখেছে জিলিনের কাঁধে।
জিলিন চারদিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে আনল একবার। পাহাড়ের আড়াল থেকে বাঁদিকের আকাশে লালচে আভা ফুটে উঠেছে একটা। চাঁদ উঠতে আর দেরি নেই। মনে মনে বলে, ‘চাঁদ গোটাগুটি ওঠার আগেই উপত্যকা পেরিয়ে বনে ঢুকে যেতে হবে আমাকে।’
উঠে দাঁড়াল সে। হাতের পাথরখানা ফেলে দিল। সে পায়ে বেড়িই থাক আর যা-ই থাক, পালাতে তাকে হবেই। দিনাকে বলে, “বিদায়, দিনা! তোমাকে কোনোদিন ভুলব না আমি।”
দিনা ঘন হয়ে এসে জামা হাতড়ে ক’টুকরো পনির বার করে দিল জিলিনের হাতে। জিলিন হেসে বলে, “ধন্যবাদ, পুঁচকি। আমি চলে গেলে কে তোমায় পুতুল গড়ে দেবে, শুনি?”
স্নেহভরে দিনার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় জিলিন। দিনা আর সামলাতে পারে না নিজেকে। দু-হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল সে। পরমুহূর্তেই ঢাল বেয়ে পাহাড়ি ছাগলছানার মতো দৌড়ে উঠে গেল ওপরে। অমনি বিনুনিতে বাঁধা রুপোর মুদ্রাগুলোও দুলে দুলে টুংটাং শব্দ তুলেছে পিঠে।
জিলিন ক্রুশ আঁকল বুকে। তারপর বেড়ির তালাখানা শক্ত করে চেপে ধরে পা টেনে টেনে পথ ধরল নিজের, কোনও শব্দ না ওঠে যাতে। চোখ ফেলে রেখেছে চাঁদ ওঠার দিক বরাবর।
এই পথ সে চেনে। সোজা এগোলে ছ’মাইল হাঁটতে হবে প্রায়। মনে মনে শুধু প্রার্থনা করে চলেছে, চাঁদটা পুরোপুরি ওঠার আগেই যেন কোনোভাবে বনের ভেতরে ঢুকে যেতে পারে।
একখানা নদী পার হয়ে এল জিলিন। পাহাড়ের আড়ালে সেই লালচে আলো ধীরে ধীরে ফিকে হতে শুরু করেছে। সেই আলোর দিশা ধরে সামনের উপত্যকা হয়ে এগিয়ে চলল সে।
চাঁদ তখনও দিগন্ত টপকে ওঠে আসেনি। চারদিকে আলো বাড়ছে দ্রুত। উপত্যকার এক পাশ উজ্জ্বল হয়ে উঠছে আস্তে আস্তে। আর পাহাড়ের পাদদেশের দীর্ঘ ছায়া গুটি গুটি তার দিকেই এগিয়ে আসছে ক্রমশ। সেই ছায়া ধরে এগিয়ে চলেছে সে। যত দ্রুত সম্ভব হাঁটার চেষ্টা করছে, কিন্তু চাঁদটার সঙ্গে পাল্লা টানতে পারছে না। ডানদিকের পাহাড়চূড়াগুলো ইতোমধ্যেই ঝলমল করতে শুরু করেছে।
জিলিন বনের ধারটায় পৌঁছেছে কোনোমতে, অমনি সাদা গোল চাঁদখানা উঠে এল পাহাড়ের আড়াল থেকে। মুহূর্তের মধ্যে দিনের মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠল চারদিক। গাছের পাতা-লতাগুলো পর্যন্ত স্পষ্ট ঠাহর হচ্ছে। পাহাড় থেকে পাহাড়ে আলো ছড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু চারপাশ এমন নিস্তব্ধ যেন কোনও জীবন্ত প্রাণীই বেঁচে নেই আর এই পৃথিবীতে। নীচের নদীটার কলকল ধ্বনিটুকুই সরব কেবল।
কারও হাতে ধরা না পড়ে বনে ঢুকে যেতে সক্ষম হল জিলিন। ঘন অন্ধকার একটা জায়গা বেছে নিয়ে বসে পড়ল একটু বিশ্রাম নিতে। খানিক জিরিয়ে নিয়ে দিনার দেওয়া একটুকরো পনির মুখে দিল সে। তারপর আবার একটা পাথর কুড়িয়ে পেয়ে পায়ের বেড়ির তালা ভাঙার চেষ্টা শুরু করল। হাতের তালু ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেল, তালা ভাঙল না তবুও। শেষে হাল ছেড়ে দিয়ে পথ চলতে শুরু করল আবার।
মাইলটাক পথ পেরোবার পর শরীর আর চলার মতো রইল না তার। পায়ের ক্ষতে অসহ্য যন্ত্রণা। দশ কদম পরপরই দাঁড়িয়ে পড়তে হচ্ছে। মনে মনে বলে জিলিন, ‘আর উপায় নেই কোনও। যতক্ষণ শক্তি আছে পায়ে, এগিয়ে যেতেই হবে। এখন বসে পড়ি যদি, আর হয়তো উঠতেই পারব না তবে। দুর্গ অবধি পৌঁছা সম্ভব হবে না। সকাল হলে বনের ভেতর কোথাও লুকিয়ে থাকব সারাদিন, রাত নামলে হাঁটব ফের।’
সারারাত একটানা পথ হাঁটল জিলিন। পথে দুজন তাতার ঘোড়সওয়ার পাশ কেটে চলে গেল একবার। ঘোড়ার খুরের শব্দ অনেক দূর থেকেই পেয়েছে সে, আগেভাগেই একটা গাছের আড়াল নিয়ে বেঁচে গেল।
চাঁদের আলো ফিকে হয়ে এল ক্রমে। শিশির জমছে ঘাসে। ভোরের আলো ফুটতে আর দেরি নেই বিশেষ। জিলিন তখনও বনটা ডিঙোতে পারেনি। মনে মনে ভাবে, ‘আর তিরিশ পা, তারপর বসে পড়ব কোথাও।’
তিরিশ পা এগিয়ে জিলিন হঠাৎ দেখে, বন শেষ হয়ে গেছে কখন। সাবধানে বনের ধারে এসে দাঁড়ায় সে। চারদিক বেশ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে এখন। সামনেই বিস্তীর্ণ সমতল ভূমি। আর ঠিক তার ও-পারেই রুশেদের সেই দুর্গ। বাঁদিকে, ঢালের একেবারে তলায় একটা আগুন নিভে এসেছে প্রায়। তার ধোঁয়া ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। আগুনটা ঘিরে ক’জন মানুষ বসে।
চোখ কুঁচকে ভালো করে তাকায় জিলিন। হঠাৎ ঝলসে উঠল ক’খানা বন্দুকের ধাতব ঝিলিক। জিলিন বুঝে যায়, ওরা রুশ সৈনিক—কসাক!
আনন্দে টগবগ করে ওঠে জিলিন। শরীরের বাকি শক্তিটুকু একত্র করে পাহাড় বেয়ে দ্রুত নামতে শুরু করে সে। মনে মনে শুধু একটাই প্রার্থনা চলেছে—‘হে ঈশ্বর, আর যেন কোনও তাতার এই খোলা মাঠে দেখতে না পায় আমাকে। এত কাছে এসেও তবে দুর্গে পৌঁছতে পারব না আর।’
না, শেষরক্ষা হল না। আশঙ্কাটা মিলিয়ে যাওয়ার আগেই বিপদ এসে হাজির হল মূর্তিমান। বাঁদিকের ছোটো এক টিলার ওপর, প্রায় দুশো গজ দূরে কোত্থেকে তিন তাতার ঘোড়সওয়ার দেখা দিল হঠাৎ। জিলিনকে দেখা মাত্র ঘোড়া ছুটিয়ে ধাওয়া করল তারা। বুকটা ধড়াস করে উঠল জিলিনের। দু-হাত ওপরে তুলে প্রাণপণে চিৎকার করতে লাগল, “ভাইসব! ভাইসব! বাঁচাও!”
কসাকরাও শুনতে পেয়ে তাদেরও একদল ঘোড়া ছুটিয়ে তাতারদের পথ আটকাতে বেরিয়ে পড়ল সঙ্গে সঙ্গে। কসাকরা তখনও অনেক দূরে। তাতারেরা এসে পড়েছে কাছাকাছি। জিলিন শেষ শক্তিটুকু একত্র করে পায়ের বেড়িটা এক হাতে তুলে ধরে প্রাণপণে দৌড়তে লাগল কসাকদের দিকে। কী ঘটছে, আর সেই-বা কী করছে, এই বোধটুকুই আর নেই তখন। দৌড়চ্ছে আর বুকে বার বার ক্রুশ এঁকে একটানা চিৎকার করে চলেছে, “ভাইসব! আমার ভাইয়েরা! ভাই!”
কসাকরা দলে প্রায় পনেরো জন। তাতারেরা ভয় খেল। জিলিনের একেবারে কাছে এসে পড়ার আগেই ঘোড়ার মুখ ফিরিয়ে থমকে দাঁড়াল তারা। এই ফাঁকে টলতে টলতে কোনোমতে কসাকদের দলে পৌঁছে গেল জিলিন।
কসাকেরা এইবারে চারদিক থেকে তাকে ঘিরে ধরে একের পর এক প্রশ্ন শুরু করেছে, ‘কে তুমি?’ ‘ঘটনা কী?’ ‘আসছ কোত্থেকে?’
কিন্তু জিলিন তো আর নিজের মধ্যে নেই। অপার স্বস্তি, ক্লান্তি আর আবেগে ততক্ষণে ভেঙে পড়েছে সে। চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে অঝোরে। একটাই শব্দ বলে চলেছে বার বার, “ভাই... ভাইসব...”
এরই মধ্যে দুর্গ থেকে আরও সৈন্য দৌড়ে এসে ঘিরে ফেলল জিলিনকে। কেউ রুটি খেতে দিল। কেউ-বা বাজরার চাপাটি। আর একজন ভদকা এগিয়ে দিল খানিকটা। কেউ নিজের জোব্বাটা খুলে জড়িয়ে দিল গায়ে। পায়ের বেড়ি ভেঙে খুলে দিল কারা।
অফিসাররা চিনতে পারলেন জিলিনকে। তাকে সঙ্গে নিয়ে দুর্গে ফিরে গেলেন তাঁরা। জিলিনকে জীবিত ফিরে পেয়ে খুবই খুশি হল সবাই। সহযোদ্ধারাও সবাই ঘিরে ধরল তাকে।
খানিক সুস্থির হয়ে আদ্যোপান্ত ঘটনা খুলে বলল জিলিন। শেষে হেসে বলে, “ভেবেছিলাম বাড়ি গিয়ে বিয়ে-থা করে থিতু হব—সে আর হল কই! ভাগ্যেই নেই বোধ হয়।”
বাড়ি আর ফিরে যাওয়া হয়নি জিলিনের। ককেশাসেই থেকে গেল সেনাবাহিনীর চাকরিতে।
আরও এক মাস পরে পাঁচ হাজার রুবলের বিনিময়ে মুক্তি পেল কোস্তিলিন। তাকে যখন উদ্ধার করে আনা হয়, তখন প্রায় মরতে বসেছে সে।
শুভাঞ্জন ব্যানার্জী ▪ প্রবাহনীল দাস
লিও তলস্তয় ▪ নলিনাক্ষ ভট্টাচার্য
তাপস মৌলিক ▪ অংশু পাণিগ্রাহী ▪ বাণীব্রত গোস্বামী ▪অরিন্দম ঘোষ ▪ রঞ্জন দাশগুপ্ত ▪ সিদ্ধার্থ দাশগুপ্ত ▪শাশ্বত কর ▪ রাজীব রায় গোস্বামী ▪ সায়নদীপা পলমল ▪ প্রদীপ কুমার দাস
বদ্রীনাথ পাল ▪ তাপস বাগ ▪ বসন্ত পরামানিক ▪ গোবিন্দ মোদক ▪ সুব্রত দাস ▪ অর্ণব ভট্টাচার্য ▪ সুজাতা চ্যাটার্জী ▪ মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় দাস ▪ মধুমিতা ভট্টাচার্য ▪ ড. রমলা মুখার্জী ▪ সনৎকুমার ব্যানার্জী ▪ বিদ্যুৎ মিশ্র ▪ রাজর্ষি মণ্ডল ▪ রূপালী মুখোপাধ্যায় ▪ শক্তিপদ পণ্ডিত ▪ শম্ভু সরকার ▪ সুব্রত চৌধুরী
অদিতি ভট্টাচার্য ▪ দীপঙ্কর চৌধুরী ▪ মৌসুমী রায় ▪ সবিতা রায় বিশ্বাস ▪ সহেলী রায় ▪ কিশোর ঘোষাল
অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায় ▪ অরিন্দম দেবনাথ ▪ কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায় ▪ দীপক দাস ▪ ড. উৎপল অধিকারী ▪ চন্দ্রানী মজুমদার
সায়ন্তনী পলমল ঘোষ ▪ সোমা দে ▪ শংকর লাল সরকার ▪ সন্দীপন সাহা
অলংকরণ
মায়াসখা নন্দী ▪ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ▪ একপর্ণিকা ক্রিয়েটিভস
দু-হাজার তিনশো বছর আগে পাটলিপুত্র থেকে তক্ষশিলা পর্যন্ত বাণিজ্যদলের সংঘাতবহুল রোমাঞ্চকর যাত্রাপথ শেষে এক তরুণ পৌঁছল তক্ষশিলায়। সেই নগরীর রাজনৈতিক পরিস্থিতি তখন উত্তাল। একদিকে গ্রিক বীর আলেকজান্ডার, অন্যদিকে আচার্য কৌটিল্যের অখণ্ড ভারতের স্বপ্নে মশগুল একদল যোদ্ধা। অসংখ্য চরিত্রের ঘনঘটা, ষড়যন্ত্র, কাপুরুষতা আর রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে কিছু মানুষের আত্মমর্যাদা আর স্বাধীনতা রক্ষার সাহসী সংগ্রামের আখ্যান এই উপন্যাস।
উত্তরমেরুর দুর্গম তুষার-মরুতে জীবন যুদ্ধে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে লোকমুখে গড়ে উঠেছিল নানা রূপকথা। মেরু অঞ্চলের অধিবাসীরা পৃথিবীর বাকি অংশ থেকে ছিল বিচ্ছিন্ন। সম্পূর্ণ অচেনা সেই দেশের লোকসংস্কৃতি, আচার ব্যবহার, মনস্তত্ত্বের সাক্ষ্য রেখে গেছে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে বাহিত গল্প-গাথা, যার রূপরেখা ফুটে উঠেছে কুড়িটি লোককাহিনির সংকলন 'তুষারদেশের রূপকথারা' বইটিতে।