ছোটো গল্প
FREE SHIPPING IN INDIA
ছোটো গল্প
তার ঠিক তিনদিন পর, সেদিন ছিল পূর্ণিমা। সন্ধের আগেই পুব আকাশে থালার মতো চাঁদ উঠেছিল। অন্ধকার আস্তে আস্তে এগোচ্ছিল জলের দিকে। তারপর হঠাৎ ঝুপ করে সন্ধে নামল, আর তক্ষুনি কোত্থেকে যেন ছুটে এসে পিতু এই বড়ো এক ঢ্যালা ছুড়ল পানাপুকুরে। অমনি সেই ব্যাঙ মা এক লাফে উঠে পিতুর ঘাড় ধরে টেনে নিয়ে গেল জলে। তারপর হাঁকুপাঁকু করে পিতু উঠে এল বটে, কিন্তু ততক্ষণে তার যা হওয়ার হয়ে গেছে।
শাশ্বত কর
“ঢিল মেরো না। মারতে নেই।”
“কেন? মারলে কী হয়?”
চোখ বড়ো বড়ো করে সেই ছেলে বলল, “এমনিতে কিছু হয় না বটে, তবে কখনো-কখনো হয়।”
কথাটা ঠিক বিশ্বাস হল না ঋষির। জিজ্ঞেস করল, “কখনো-কখনো কী হয়?”
সরু সরু ভুরু নাচিয়ে সেই ছেলে বলল, “হয়, হয়। অনেক কিছুই হয়।”
“ব্যাঙ হয়।”
“হ্যাঁ, ব্যাঙও হয়। আমাদের পিতু তো ব্যাঙ হয়ে গেল!”
“মানুষ কখনও ব্যাঙ হয়? মিথ্যে কথা বলছিস?” বেশ তেড়েফুঁড়ে বলে উঠল ঋষি।
আসলে খানিক রাগ হয়েছে ঋষির। হওয়াটাই স্বাভাবিক। এই ছেলেটাকে আগে কোনোদিন পার্কে দেখেনি। অথচ সেই অচেনা ছেলেই কিনা ওর হাতখানা চেপে ধরেছে! আর তাও যাকে বলে একেবারে মোক্ষম সময়ে। টিপ করে ঢিলটা ছুড়তে যাবে, তখনই! আরে, অপমানের শোধটাই তো নেওয়াই গেল না ছেলেটার জন্য।
শহরের মধ্যিখানে এই পার্কটা একটা দারুণ জায়গা। অনেকটা জায়গা নিয়ে। মাঝখানে প্রমাণ আকারের একটা মাঠ—অনায়াসে চার-পাঁচটা দল সেখানে ক্রিকেট, ফুটবল খেলতে পারে। মাঠের চার ধার দিয়ে উঁচু লোহার গ্রিল, গ্রিলের অন্য পাশে বাঁধানো হাঁটাপথ। তার পাশে বাঁধানো সব সার সার বেঞ্চ। বেঞ্চের আর ধারের বাগানখানায় আম, জাম, পেয়ারা, কাঁঠাল তো আছেই; তা ছাড়া জারুল, কৃষ্ণচূড়া, অশোক, বেল, শাল, শিমুলও আছে। আর আছে বসন্তকালে টকটকে লাল ফুলে ছেয়ে থাকা একটা মাদার গাছ। ফুলের কথা বলতে গেলে এই পার্কের যে মালির দল, তার সর্দারের কথা বলতেই হয়। সর্দারের নাম রতন নায়েক। ছোট্টখাট্টো মানুষ। কারও সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় কথা নেই। সারাক্ষণ খাকি হাফ প্যান্ট আর খাকি হাফ শার্ট, হাতে খুরপি। লোকে বলে, রতনের নাকি মাথার দোষ। গাছের গোড়ার মাটি খোঁচাতে খোঁচাতে নাকি একা একা কথা বলে। অবশ্য তারা সবাই এ-কথাও বলে যে, রতনের হাতে নাকি জাদু আছে। কোনও গাছ তার হাতে মরে তো নাই, উলটে মৃতপ্রায় গাছও রতনের পরিচর্যায় ফুলে ফুলে হেসে ওঠে।
পার্কের বাইরে লোহার গেটের বাঁ-ধারে ফুটপাথ ঘেঁষে রতনের ঝুপড়ি। সেখানে সারাদিন তার বউ চায়ের দোকান চালায় আর সময় সময় বিড়াল-কুকুর খাওয়ায়। শহরের বাবুদের বাড়িতে খাবার আসে যেসব প্লাস্টিকের কৌটোয়, তাদের থেকে সে সব জোগাড় করে, ধুয়ে-পাকলে তার মধ্যে কুকুর-বেড়ালদের খেতে দেয় রতনের বউ। গোটা পাঁচেক বেড়াল আর সাতটা কুকুর খেতে আসে তিন বেলা। রতনের বউ তাদের দুধভাত দেয়। বেড়ালদের খাওয়ার জায়গা ঝুপড়ির ছাদে আর কুকুররা ঝুপড়ির পাশে ফুটপাথে।
বেড়ালগুলো প্রায় সারাটা দিনই পার্কের ভিতরে কাঠবেড়ালি, পাখিদের তাড়া করে বেড়ায়; কখনো-বা বেঞ্চির উপর শুয়ে থাকে। বিকেল শেষ হয়ে এলেই রতনের ঝুপড়ির ছাতে কখনও পড়ন্ত রোদ পোহায়, কখনও আবার ছাতের কোণে যেখানে অর্জুন গাছের একটুকরো ছায়া আস্তে আস্তে বড়ো হয়, সেখানে গিয়ে আড়মোড়া ভাঙে। ছাতের বিচুলিতে, প্লাস্টিকে নখ দিয়ে আঁচড়ায়। যেই না রতনের বউ ভিতর থেকে চিৎকার করে ওঠে, অমনি আবার আঁচড়ানো বন্ধ করে এদিক-ওদিক দেখে শুয়ে পড়ে।
পার্কে কয়েকটা দুষ্টু ছেলে আসে। তারা খেলে না, খালি একে অন্যের নামে খারাপ কথা বলে, মারামারি করে। আর অকারণে একে অন্যকে, রতনের বউয়ের বেড়ালগুলোকে, এমনকি গাছের পাখি, কাঠবেড়ালিদেরও ঢিল মারে।
ঋষি দেখেছে ওদের। ওদের দেখাদেখি ওরও ঢিল ছোড়া অভ্যেস হয়ে গেছে। ঋষি তো এখানে বলতে গেলে রোজই আসে। রোজ যে খেলতে আসে তা নয়, ওর দলের খেলা তো শুধু শনি-রোববার।
এখন নভেম্বরের শেষাশেষি। শীত পড়েনি তেমন। সন্ধের পর একটু কুয়াশা হয় বটে, তবে ঘরে পাখা চালালে আরাম লাগে। মা বলেন, এই সময়টাই নাকি মারাত্মক, সাবধানে না থাকলেই সর্দিকাশি। ঋষির আর আলাদা কী! ওর তো আবার সারাবছরই নাকে জল, হাতে রুমাল। মা অবশ্য সেজন্যেই ওকে পার্কে নিয়ে আসতেন। এখন মায়ের কাছে দুটো ছেলেমেয়ে এই সময় টিউশন নিতে আসে বলে ঋষি একাই আসে। মাঠে অনেকগুলো দল খেলে—কোনো-কোনোদিন ওদের সঙ্গে ভিড়ে যায়, আবার কোনো-কোনোদিন একা-একাই বেঞ্চে বসে খেলা দেখে।
আজকে আসা ইস্তক দেখছে পুবের গেটের কাছে অর্জুন গাছের নীচের বেঞ্চটায় আয়েশ করে বসে আছে বেড়ালটা। শেষ বিকেলের রোদে তার সাদা গা লালচে, চোখ দুটো ঘিরে গোল গোল কালো লোম—যেন সানগ্লাস পরে আছে। মাঝে মাঝে তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে এক-আধবার ঋষির দিকে তাকাচ্ছে, তারপর হাই তুলে ফের চোখ বন্ধ করছে। ঋষি একবার ওর দিকে তাকিয়ে ভুরু নাচাল। তাতে বিজ্ঞের মতো মুখ ঘুরিয়ে নিল বেড়ালটা, তারপর চোখ বুজে তিরতির করে কান নাচাতে লাগল।
ব্যাপারটা কিন্তু ঋষির দুর্বল জায়গায় আঘাত করেছে। কেন বলো তো? আসলে ঋষি নিজে বেশ কয়েকবার এই চেষ্টাটা করে দেখেছে, পারেনি। সে পারেনি বটে, কিন্তু লোকনাথ পারে। লোকনাথ হল ওদের বাড়িতে ইলেক্ট্রিকের কাজ করতে আসে যে বিশুকাকু, তার হেল্পার। লোকনাথ পারতেই পারে, কিন্তু ঋষি না পারাতে যে তাচ্ছিল্যের ভাবটা লোকনাথ ফুটিয়েছিল মুখে আর ঋষিকে লুকিয়ে বিশুকাকুকে যে কথাগুলো শুনিয়েছিল, তা শুনে বেজায় খারাপ লেগেছিল ঋষির। কান গরম হয়ে গেছিল। এই বেড়ালটার কান নাচানো দেখে সেগুলোই আবার মনে পড়ল ঋষির। আর একবার কি চেষ্টা করবে? চেষ্টা করতে দোষ কী?
নাহ্। দু-পাশের ঠোঁট বেঁকিয়ে প্রায় কান ছুঁয়ে ফেলল কিন্তু কান দুটো একটুও নড়ল না। তক্ষুনি বেড়ালটা ফের ওর দিকে ঘুরে ঘাড় নাচিয়ে যেন মুচকি হাসল। আর যায় কোথা। অপমানের শোধ তুলতে পায়ের কাছে পড়ে থাকা একটা ঢেলা তুলে যেই না বেড়ালটাকে ঢিলাতে যাবে, অমনি কে যেন ওর হাতটা ধরে ফেলল।
প্রায় ওর বয়সিই একটা ছেলে। বাদামি রঙের হাফ প্যান্টের ওপর লাল রঙের একটা হাফ শার্ট পরা। শার্টটা যেন ওর তুলনায় একটু বড়োই, ঢলঢল করছে। ঋষির সঙ্গে চোখাচোখি হতেই হাতটা ছেড়ে দিয়ে বলল, “ঢিল মেরো না। মারতে নেই।”
লাল ঢলঢলে হাফ শার্ট পরা সেই ছেলে ডানহাতের বুড়ো আঙুল আর তর্জনী দিয়ে গলার কণ্ঠার কাছটা ধরে বলল, “সত্যি কথা! ব্যাঙ দেখলেই ঢিল ছুড়ত পিতু।”
“তাই ব্যাঙ হয়ে গেল?”
“হল তো! আমার চোখের সামনে, বিশ্বাস করো!”
ঋষির বিশ্বাস হচ্ছিল না। ছেলেটা বলে চলেছিল, “প্রথমেই কিন্তু হয়নি। রোজ ঢিল ছুড়ত। কতবার ব্যাঙেরা মানুষের রূপ ধরে এসে ওকে বারণ করে গেছে! শোনেইনি।”
এবার মজা লাগছিল ঋষির। গতবছর দাদু চলে গেছেন। তারপর থেকে তো গল্প শোনাই হয়নি। কেউ তো বলে না। গল্প শোনার লোভে রাগ-টাগ ভুলে ছেলেটার হাত ধরে ঋষি বলল, “চল, আমরা ওখানে গিয়ে বসি।”
ছেলেটা আপত্তি করল না। বেড়ালটা ওদের আসতে দেখে বিরক্ত হয়ে উঠে লেজ মোটা করে দু-বার আড়মোড়া ভেঙে এক লাফে পার্কের পাঁচিলে গিয়ে উঠল। সেখানে বসে ঋষি জিজ্ঞেস করল, “এইবার পিতুর গল্পটা বল। আচ্ছা দাঁড়া, তার আগে তোর নামটা তো জানি! তোর নাম কী রে?”
“আগে তোমার নাম বলো।”
“কেন? তুই আগে বল! আমি আগে জিজ্ঞেস করেছি।”
“সে করো গে। তুমি আগে নাম বলো, না হলে আমার নাম তো বলবই না, পিতু কীভাবে ব্যাঙ হল তাও কিন্তু বলব না।”
আবার রাগ হল ঋষির। বলল, “বলিস না! ভারি তো ব্যাঙের গল্প!”
“আচ্ছা, তা হলে আমি চললাম।” বলে ছেলেটা চলে যাওয়ার উপক্রম করল।
অমনি ঋষি বলে উঠল, “আচ্ছা আচ্ছা, বলছি। আমার নাম ঋষি। এবার তো তোর নামটা বলবি?”
“আমার নামও ঋষি।”
প্রচণ্ড বিরক্ত হল ঋষি। ইয়ার্কি করছে ছেলেটা! থাক ওর গল্প ওর কাছে। বেঞ্চ থেকে উঠে চলে যাবে, এমন সময় চোখে পড়ল বেড়ালটাকে। পাঁচিল ছেড়ে সে-ব্যাটা তখন দোলনায় গিয়ে উঠেছে। উঠবি ওঠ, তা না, একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে ওর দিকে! দৃষ্টিটা দেখেই যত রাগ গিয়ে পড়ল ওর ওপর। কেন যে ওই ছেলেগুলো বেড়ালগুলোকে দেখলেই ঢিলায়, তা বেশ বুঝতে পারল ঋষি। নিমেষের মধ্যে একটা ঢিল তুলেই ছুড়ে মারল সে।
ঠং করে ঢিলটা গিয়ে লাগল দোলনার শিকলে। সেই শব্দে বেড়ালটা তড়াক করে লাফিয়ে উঠেই তরতর করে নেমে পালাল।
হাঁই হাঁই করে উঠে ছেলেটা বলল, “বারণ করছি, শুনছ না তো! বুঝবে ঠেলা!”
“কেন শুনব রে তোর কথা? আমার নামটা নিয়েও ভ্যাঙাচ্ছিস!”
“ভ্যাঙালাম কোথায়? সত্যিই আমার নাম ঋষি। বিশ্বাস করো! এই তো খানিক আগে আমি চন্দনের সঙ্গে খেলছিলাম। তুমি ওকে জিজ্ঞেস কোরো, দেখবে ও বলবে আমার নাম চন্দন।”
“তবে যে বললি তোর নাম ঋষি?”
“ঋষিই তো!”
“তবে যে বললি চন্দন?”
“সে তো চন্দনের সঙ্গে খেলছিলাম যখন। চন্দনের সঙ্গে খেললে আমার নাম চন্দন, রাকেশের সঙ্গে খেললে আমার নাম রাকেশ, আর ঋষির সঙ্গে গপ্পো করলে আমার নাম ঋষি।”
“এরকম কখনও হয়?”
“কেন হবে না? জল যেখানে থাকে সেরকমই দেখতে হয় কই না?”
“তুই কি জল?”
“জলই তো! তুমি জানো না, আমাদের দেহের তিনভাগ জল?”
“এই থাম তো! কীসের মধ্যে কী, পান্তা ভাতে ঘি।”
ঋষির বলার ধরনে হাসতে হাসতে সেই ছেলেটা বলল, “না গো, ঠিক কথাই বলছি। আচ্ছা দাঁড়াও, এসব এখন বাদ দাও। বরং তোমায় পিতুর কথাটাই বলি।”
“ঠিক তো?”
ঘাড় নেড়ে ঋষির হাত ধরে ছেলেটা বেঞ্চে বসাতে বসাতে বলল, “তোমার ছোটো পিসি যাদের বলেন ব্যাদড়া ছেলে, পিতু ছিল যাকে বলে তাই।”
এই ছেলেটা তার ছোটো পিসির কথা জানল কেমন করে? সে-কথা জিজ্ঞেস করবে বলে ঋষি যেই হাঁ করেছে, অমনি ফের তার হাতটা চেপে ছেলেটা বলতে থাকল, “দু-পকেট পকেট ভরতি ঢিল থাকত পিতুর। খেয়াল হলেই যাকে খুশি ছুড়ত। তুমি তো জানোই, ছোটোদের শেখাতে ভগবান বাবা-মায়ের রূপ ধরে আসেন। আবার বাবা-মা জানো তো ছানাপোনার ভালোর জন্য অনেক রূপ ধরতে পারেন! তেমনই পিতুর কাছেও এসেছিলেন—ব্যাঙ মা। পিতুর ছোড়া ঢিলে যেবার সতেরোটা ব্যাঙাচির লেজ দুম করে খসে গেল, সেইবার।”
“আবার ঢপ?”
“ঢপ কেন হবে? লেজ খসে গেলে ব্যাঙাচি বাঁচে কেমন করে বলো তো? ব্যাঙ মা তা সইতে পারে? তা ছাড়া এসব আমার নিজের চোখে দেখা যে!”
“তুই সত্যি দেখেছিস?”
“দেখেছি তো! পানাপুকুরে তখন বেগুনি বেগুনি ফুল ফুটেছে। সেইসব ফুলের মধ্য থেকে ঝুপ্পুস করে লাফিয়ে উঠল ব্যাঙ মা। সবুজ-হলুদ গা থেকে তার তিরতির করে রাগ জল ঝরছে। কে তার বাছাদের লেজ খসাল দেখতেই হবে। দেখতে দেখতে মায়ের চোখ পড়ল পিতুর দিকে। সে তখন আর একটা ঢিল ছোড়ার তাল করছে। লম্বা এক লাফে ব্যাঙ মা জল পেরিয়ে গিয়ে পড়ল পুকুরপাড়ের মোল্টা ঝোপে, আর অমনি সেখান থেকে সোজা দাঁড়িয়ে পড়লেন সবুজ-হলুদ ডুরে শাড়ি—এক মানুষ মা! সেই মানুষ মা পিতুর কাছে গিয়ে তার গায়ে মাথায় আদর করে কত কী বোঝাল। পিতুও বুঝল। কিন্তু ঠিক পরের দিন পুকুরপাড়ে আসতেই পিতুর হাত সুড়সুড় করতে শুরু করল। তার পরের দিন সেই সুড়সুড়ি এত বাড়ল যে জলে না ছুড়লেও পিতু ঢিল ছুড়ল পাশের গাছে। সেখানে তখন বসে ঝিমোচ্ছিল এক পেঁচা। পিতুর ছোঁড়া ঢিলে তার কী হল কে জানে, হুড়মুড় করে পড়ে গেল নীচে। ব্যাঙ মা তখন আবার এলেন। এবার কিন্তু বোঝানো নয়, বেশ বকলেন পিতুকে।
“তার ঠিক তিনদিন পর, সেদিন ছিল পূর্ণিমা। সন্ধের আগেই পুব আকাশে থালার মতো চাঁদ উঠেছিল। অন্ধকার আস্তে আস্তে এগোচ্ছিল জলের দিকে। তারপর হঠাৎ ঝুপ করে সন্ধে নামল, আর তক্ষুনি কোত্থেকে যেন ছুটে এসে পিতু এই বড়ো এক ঢ্যালা ছুড়ল পানাপুকুরে। অমনি সেই ব্যাঙ মা এক লাফে উঠে পিতুর ঘাড় ধরে টেনে নিয়ে গেল জলে। তারপর হাঁকুপাঁকু করে পিতু উঠে এল বটে, কিন্তু ততক্ষণে তার যা হওয়ার হয়ে গেছে।”
“কী হয়ে গেছে?”
“পিতুর গলার স্বর গেছে বদলে। যাই বলে না কেন, সে ওই গ্যাঙর গ্যাঙর। পিতুর চলার ধরন গেছে বদলে। থাকে থাকে আর লাফিয়ে চলে। বিশ্বাস করো, আমি পিতুকে জোনাকি পোকাও খেতে দেখেছি!”
“অ্যাহ্! পোকা কেউ খায়?”
“ব্যাঙ তো পোকাই খায়। অত তাড়াতাড়ি উঠে পড়তে পেরেছিল বলে কেবল অভ্যেসটা ব্যাঙের মতো হয়েছে, নইলে পিতুর পুরোটাই ব্যাঙের মতো হয়ে যেত।”
ঋষির মুখটা হাঁ। ছেলেটার গল্প বলার ধরনটাই এমন যে বিশ্বাস না করে যেন উপায় নেই। তবু মুখে বলল, “ধুস!”
সন্ধে হয় হয়। পার্কের আলোগুলো জ্বলে গেছে। যারা খেলছিল, তাদের বেশিরভাগই খেলা থামিয়ে ছোটো ছোটো দলে মাঠে বসে গল্প করছে। পার্কের রাস্তায় দু-একজন করে সান্ধ্যভ্রমণকারীদের দেখা যাচ্ছে।
এরকম সময় হলে ঋষির বাড়ি যেতে হয়, ছেলেটা যেন জানে। তাই যেন কথা না বাড়িয়ে বলল, “নাও, এবার বাড়ি যাও। আর যেন ঢিল ছুড়ো না, কেমন?”
বেঞ্চি থেকে উঠতে উঠতে ঋষি বলল, “গল্পটা ভালোই বানিয়েছিলে, বলতেই হবে।”
“তুমি বিশ্বাস করছ না!”
ঋষি কিছু না বলে যাওয়ার জন্যে পা বাড়াতেই ছেলেটা বলল, “দেখো, কী সুন্দর চাঁদ উঠেছে!”
ঋষি দেখল, পার্ক পেরিয়ে সোজা রাস্তাটা যেখানে দু-দিকে ভাগ হয়ে গেছে, সেখানের ছ’তলা বাড়িটার ছাত থেকে এই বড়ো গোল থালার মতো চাঁদ উঠেছে।
“আজ কি পূর্ণিমা?”
উত্তরের জন্য ছেলেটার দিকে ফিরতেই দেখল সেও বাড়ি যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু ওর লাল জামাটা পিঠের দু-পাশে অমন ফুলে আছে কেন?
প্রশ্নটা মনে আসতেই ছেলেটা ওর দিকে মাথাটা ফেরাল। অদ্ভুত একটা জ্বলজ্বলে দৃষ্টি। বলল, “বিশ্বাস আমিও করিনি, জানো? আমার কী হয়েছে দেখো।”
কথাটা শেষ হল কী হল না, ফরফর শব্দে ছেলেটা সোজা উড়ে গেল চাঁদের দিকে।
ভয়ে চোখ বন্ধ করতেই মায়ের গলা পেল ঋষি।— “ঠিক ভেবেছি! বোকা ছেলে! এইভাবে পার্কের বেঞ্চিতে কেউ ঘুমায়? হাতে আবার ঢিল কেন? ফেল!”
মায়ের সঙ্গে বাইরে বেরিয়ে আসতে আসতে ঋষি দেখল, রতন নায়েকের ঝুপড়ির ছাতে ছোটো ছোটো কৌটোয় দুধভাত খাচ্ছে সাত-সাতটা বেড়াল। সেই সানগ্লাসওয়ালা বেড়ালটাও আছে। খাওয়া থামিয়ে সেটা আবার ঋষির দিকে ফ্যাঁচফেচে মুখে তাকিয়ে যেন মাথা নাচাল।
অভ্যেসমতো পকেটে হাত দিতেই আর দুটো ঢিল পেল ঋষি। তাড়াতাড়ি সেগুলো ফেলে দিয়ে মার কাছ ঘেঁষে হাঁটতে হাঁটতে মনে মনে বলল, ‘আর কোনোদিন ঢিল ছুড়ব না। সরি!’
যাক বাবা! বেড়ালটা এবার দুধভাতে মন দিয়েছে।
লেখকের অন্যান্য লেখা
শুভাঞ্জন ব্যানার্জী ▪ প্রবাহনীল দাস
লিও তলস্তয় ▪ নলিনাক্ষ ভট্টাচার্য
তাপস মৌলিক ▪ অংশু পাণিগ্রাহী ▪ বাণীব্রত গোস্বামী ▪অরিন্দম ঘোষ ▪ রঞ্জন দাশগুপ্ত ▪ সিদ্ধার্থ দাশগুপ্ত ▪শাশ্বত কর ▪ রাজীব রায় গোস্বামী ▪ সায়নদীপা পলমল ▪ প্রদীপ কুমার দাস
বদ্রীনাথ পাল ▪ তাপস বাগ ▪ বসন্ত পরামানিক ▪ গোবিন্দ মোদক ▪ সুব্রত দাস ▪ অর্ণব ভট্টাচার্য ▪ সুজাতা চ্যাটার্জী ▪ মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় দাস ▪ মধুমিতা ভট্টাচার্য ▪ ড. রমলা মুখার্জী ▪ সনৎকুমার ব্যানার্জী ▪ বিদ্যুৎ মিশ্র ▪ রাজর্ষি মণ্ডল ▪ রূপালী মুখোপাধ্যায় ▪ শক্তিপদ পণ্ডিত ▪ শম্ভু সরকার ▪ সুব্রত চৌধুরী
অদিতি ভট্টাচার্য ▪ দীপঙ্কর চৌধুরী ▪ মৌসুমী রায় ▪ সবিতা রায় বিশ্বাস ▪ সহেলী রায় ▪ কিশোর ঘোষাল
অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায় ▪ অরিন্দম দেবনাথ ▪ কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায় ▪ দীপক দাস ▪ ড. উৎপল অধিকারী ▪ চন্দ্রানী মজুমদার
সায়ন্তনী পলমল ঘোষ ▪ সোমা দে ▪ শংকর লাল সরকার ▪ সন্দীপন সাহা
অলংকরণ
মায়াসখা নন্দী ▪ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ▪ একপর্ণিকা ক্রিয়েটিভস
ছোট্ট এক পাহাড়ি কন্যে সুলুংটুং। তাকে ঘিরে থাকে স্বপ্নরাজ্যের তিন পাহাড়। ছড়িয়ে আছে অসংখ্য মিথ। সুলুংটুংয়ের সেই তিন পাহাড়ে দুর্ধর্ষ অভিযানের কাহিনি পরিস্ফুট হয়েছে শাশ্বত করের দক্ষ কলমে।
ছোটোদের জন্যে লেখা আট খ্যাতনামা গল্পকারের প্রথম গল্পের সংকলন।
শেখর বসু, অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী, জয়দীপ চক্রবর্তী, দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য, যশোধরা রায়চৌধুরী, সৈকত মুখোপাধ্যায়, চুমকি চট্টোপাধ্যায় ও দ্বৈতা হাজরা গোস্বামী