নিবন্ধ
FREE SHIPPING IN INDIA
নিবন্ধ
বার্ধক্য প্রতিরোধ এবং মানবদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দীর্ঘকালীন সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও এই রহস্যময় জিনের কারিকুরি প্রয়োগ করার স্বপ্ন দেখছেন গবেষকরা। মানুষের দীর্ঘতম মহাকাশ যাত্রায় যখন প্রজন্মের পর প্রজন্ম পাড়ি দিতে হবে, তখন কি আমরাও পারি না এই নেমাটোডের মতো নিজেদের ক্রিপ্টোবায়োসিস প্রক্রিয়ায় ঘুম পাড়িয়ে রাখতে?
কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়
সাইবেরিয়ার জমাট বাঁধা পারমাফ্রস্ট। যেখানে আকাশ আর মাটির সীমানা মিশে যায় ধূসর কুয়াশায়, আর হাড়কাঁপানো বাতাস প্রতিমুহূর্তে জানান দেয় যে এখানে প্রাণের অধিকার নেই। হাজার হাজার বছর ধরে এই বিজন তুষার মরুভূমির গভীরে এক নিস্তব্ধ অন্ধকার বিরাজ করছিল। সময় সেখানে থমকে ছিল আদিম কোন জাদুমন্ত্রে। উপরে পৃথিবীর বুক চিরে কত কী ঘটে গেল! অতিকায় পশমওয়ালা ম্যামথরা পৃথিবী থেকে বিলীন হয়ে গেল, মানুষ গুহা ছেড়ে অট্টালিকা বানাল, সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন হল, এমনকি বড়ো বড়ো যুদ্ধ আর বিপ্লবে বদলে গেল পৃথিবীর মানচিত্র। কিন্তু মাটির ৪০ মিটার নীচে বরফের এক সুরক্ষিত প্রকোষ্ঠে এক ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রাণ স্পন্দনহীন হয়ে পড়ে ছিল, যেন সে মহাকালের এক সাক্ষী। সেটি কোনও রূপকথার রাজপুত্র নয়, বরং মাত্র এক মিলিমিটার দৈর্ঘ্যের একটি সূক্ষ্ম নেমাটোড কৃমি, যার নাম বিজ্ঞানীরা দিয়েছেন ‘প্যানাগ্রোলাইমাস কোলিমায়েনসিস’ (Panagrolaimus kolymaensis)।
২০১৮ সালে যখন রুশ বিজ্ঞানীরা কোলিমা নদীর তীরের সেই প্রাচীন বরফ খনন করে গবেষণাগারে নিয়ে এলেন, তখন কেউ ভাবেনি সেই মাটির দলা থেকে ইতিহাসের সবচেয়ে বড়ো বিস্ময় জেগে উঠবে। বরফ গলে জল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কয়েক হাজার বছরের সেই মৃতপ্রায় প্রাণটি আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠল। শুধু জেগে ওঠাই নয়; সে নড়াচড়া শুরু করল, আহার গ্রহণ করল এবং ল্যাবরেটরির পেট্রি ডিশে অবলীলায় বংশবিস্তার শুরু করে দিল। কার্বন ডেটিং পদ্ধতিতে পরীক্ষা করে দেখা গেল, এই প্রাণীটি আজ থেকে প্রায় ৪৬,০০০ বছর আগে পৃথিবীর আলো দেখেছিল। অর্থাৎ, সেই সময় পৃথিবীতে নিয়ানডারথাল মানুষরা বিচরণ করত। একবিংশ শতাব্দীর ল্যাবে যখন সেই কৃমিটি তার লেজ নাড়াল, তখন বিজ্ঞানের চেনা ব্যাকরণ এক লহমায় ওলটপালট হয়ে গেল।
এই অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের মূলে যে রহস্যময় জৈব জাদু কাজ করেছে, বিজ্ঞানের ভাষায় তার নাম ‘ক্রিপ্টোবায়োসিস’ (Cryptobiosis)। এটি জীবনের এমন এক বিচিত্র অবস্থা, যাকে জীবন এবং মৃত্যুর মধ্যবর্তী এক ধূসর এলাকা বলা যেতে পারে। যখন পরিবেশ প্রতিকূল হয়ে ওঠে, তীব্র ঠান্ডা, অক্সিজেনের চরম অভাব কিংবা জলের অনুপস্থিতি, তখন এই নেমাটোডরা তাদের শরীরের বিপাকীয় প্রক্রিয়া বা মেটাবলিজম প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনে। তাদের শরীরের জল শুকিয়ে যায়, কিন্তু কোশগুলো ধ্বংস হয় না। কোশের সুরক্ষায় তখন কাজ করে ‘ট্রেহালোজ’ (Trehalose) নামক এক বিশেষ ধরনের শর্করা। এটি কোশের অভ্যন্তরে একটি সুরক্ষা দেওয়াল তৈরি করে, যা বরফের ধারালো স্ফটিককে কোশের দেয়াল ফুটো করতে বাধা দেয়। হাজার হাজার বছর ধরে সেই কৃমিটি টাইম মেশিনের মতো বর্তমান সময়ে এসে অবতীর্ণ হয়েছে।
‘ম্যাক্স প্লাঙ্ক ইনস্টিটিউট অব মলিকুলার সেল বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিক্স’-এর বিজ্ঞানীরা এই বিস্ময়কর জীবের জিন বিশ্লেষণ করে দেখেছেন যে, এদের টিকে থাকার কৌশল অনেকটা আজকের দিনের টারডিগ্রেড (Tardigrades) বা জল-ভাল্লুকদের মতো। তবে ৪৬ হাজার বছর টিকে থাকাটা এক অকল্পনীয় রেকর্ড। এই আবিষ্কার আমাদের প্রথাগত জীবনের সংজ্ঞাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আমরা এতদিন জানতাম জীবন মানেই গতির নিরন্তর প্রবাহ, কিন্তু এই নেমাটোড প্রমাণ করল, জীবন মানে কখনো-কখনো সম্পূর্ণ থেমে যাওয়া এবং উপযুক্ত সময়ে আবার শুরু হওয়া। এটি যেন মহাকালের ললাটে এক চপেটাঘাত, যেখানে মৃত্যুও হার মেনেছে ধৈর্যের কাছে।
এই ক্ষুদ্র প্রাণীর পুনরুত্থান শুধু জীববিজ্ঞানের পাতায় একটি তথ্য হয়ে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি আমাদের মহাকাশ গবেষণার নতুন দিগন্ত খুলে দিচ্ছে। আমরা যদি মঙ্গলের শুকনো ধুলোয় বা বৃহস্পতির উপগ্রহ ইউরোপার জমাট বরফের নীচে প্রাণের সন্ধান করি, তবে এই নেমাটোড আমাদের আশার আলো দেখায়। যদি পৃথিবীর বৈরী পরিবেশে একটি প্রাণ ৪৬ সহস্রাব্দ কাটিয়ে দিতে পারে, তবে মহাবিশ্বের অন্য কোনও হিমশীতল কোণেও হয়তো এমন কোনও প্রাণ ঘুমিয়ে আছে, যারা একটু উষ্ণ ছোঁয়ার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। এছাড়া বার্ধক্য প্রতিরোধ এবং মানবদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দীর্ঘকালীন সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও এই রহস্যময় জিনের কারিকুরি প্রয়োগ করার স্বপ্ন দেখছেন গবেষকরা। মানুষের দীর্ঘতম মহাকাশ যাত্রায় যখন প্রজন্মের পর প্রজন্ম পাড়ি দিতে হবে, তখন কি আমরাও পারি না এই নেমাটোডের মতো নিজেদের ক্রিপ্টোবায়োসিস প্রক্রিয়ায় ঘুম পাড়িয়ে রাখতে?
প্রকৃতি তার প্রতিটি ধূলিকণায় কত গভীর রহস্য লুকিয়ে রাখে, তা ভাবলে শিহরিত হতে হয়। যে কৃমিটি ৪৬ হাজার বছর আগে সাইবেরিয়ার ঘাসে বিচরণ করত, সে আজ মানুষের আধুনিক ল্যাবরেটরিতে নতুন প্রজন্মের জন্ম দিচ্ছে। তার কাছে বর্তমান আর অতীতের মধ্যে কোনও ব্যবধান নেই। সে যেন এক অমর পর্যটক, যে বরফের গুহায় সময়কে বন্দি করে রেখেছিল। এই আবিষ্কার আমাদের শেখায় যে, বিনাশই শেষ কথা নয়; প্রতিকূলতার চরম সীমায় গিয়েও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার নামই হল জীবন। হয়তো কোনও একদিন এই ছোট্ট জীবের শরীর থেকে পাওয়া জ্ঞান আমাদের শিখিয়ে দেবে কীভাবে সময়কে জয় করতে হয়, কীভাবে মৃত্যুকে অপেক্ষায় রেখে মহাকালের পথে যাত্রা করতে হয়।
লেখকের অন্যান্য লেখা
শুভাঞ্জন ব্যানার্জী ▪ প্রবাহনীল দাস
লিও তলস্তয় ▪ নলিনাক্ষ ভট্টাচার্য
তাপস মৌলিক ▪ অংশু পাণিগ্রাহী ▪ বাণীব্রত গোস্বামী ▪অরিন্দম ঘোষ ▪ রঞ্জন দাশগুপ্ত ▪ সিদ্ধার্থ দাশগুপ্ত ▪শাশ্বত কর ▪ রাজীব রায় গোস্বামী ▪ সায়নদীপা পলমল ▪ প্রদীপ কুমার দাস
বদ্রীনাথ পাল ▪ তাপস বাগ ▪ বসন্ত পরামানিক ▪ গোবিন্দ মোদক ▪ সুব্রত দাস ▪ অর্ণব ভট্টাচার্য ▪ সুজাতা চ্যাটার্জী ▪ মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় দাস ▪ মধুমিতা ভট্টাচার্য ▪ ড. রমলা মুখার্জী ▪ সনৎকুমার ব্যানার্জী ▪ বিদ্যুৎ মিশ্র ▪ রাজর্ষি মণ্ডল ▪ রূপালী মুখোপাধ্যায় ▪ শক্তিপদ পণ্ডিত ▪ শম্ভু সরকার ▪ সুব্রত চৌধুরী
অদিতি ভট্টাচার্য ▪ দীপঙ্কর চৌধুরী ▪ মৌসুমী রায় ▪ সবিতা রায় বিশ্বাস ▪ সহেলী রায় ▪ কিশোর ঘোষাল
অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায় ▪ অরিন্দম দেবনাথ ▪ কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায় ▪ দীপক দাস ▪ ড. উৎপল অধিকারী ▪ চন্দ্রানী মজুমদার
সায়ন্তনী পলমল ঘোষ ▪ সোমা দে ▪ শংকর লাল সরকার ▪ সন্দীপন সাহা
অলংকরণ
মায়াসখা নন্দী ▪ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ▪ একপর্ণিকা ক্রিয়েটিভস