ভ্রমণকথা
FREE SHIPPING IN INDIA
ভ্রমণকথা
প্রায় কেঁদে ফেলব, এই সময় হঠাৎ দেখি টম নেই। হাওয়া। জাস্ট ভ্যানিশ। ব্যাগটা? আমার ব্যাগটা? তাও নেই। ধপ করে বসে পড়লাম। হায়, মনুষ্যত্ব হারানোর কম্পিটিশনে এরাও তাহলে প্রতিযোগিতায়!
সোমা দে
এক
প্রায় ষোলো বছর ধরে পৃথিবীর নানা প্রান্তে সফর চলছে। মূলত কর্মযোগে। সফরের সবই মসৃণ তো নয়। পথে নানা ঝুঁকি। তারই কিছু বিশেষ রইল এইখানে।
সে-সময় আমি শুধু দৌড়োচ্ছি। এক সপ্তাহ গ্রিনল্যান্ডে, আর পরের সপ্তাহে মালদ্বীপ, তারপরে অন্য কোথাও এবং তারপরে অন্য কোনখানে। যাত্রাপথের নানা মাধ্যম— বাস, ট্রাম, ট্যাক্সি, উড়োজাহাজ, জলজাহাজ— এদের মাধ্যমে আবহাওয়া, তাপমাত্রার তোয়াক্কা না করে ছুটছি।
এই ছুটন্ত ঘোড়া সবে যখন ছুটতে শিখছে, উপনীত হয়েছে ফ্রান্সের Toulouse শহরে, সাল ২০১০। কথা ছিল, চারদিন পরে যেতে হবে বেলজিয়ামে, ফ্লাইটে। দিন চলছে। হঠাৎ খবর এল, আইসল্যান্ড থেকে ভলকানো এমন ফুলেফেঁপে উঠেছে যে তার ধোঁয়ায় ইউরোপের ফ্লাইটের রাস্তা প্রায় বন্ধ। প্রথমে তেমন আমল দিইনি। ধীরে ধীরে লন্ডনের হিথরোর মতো ব্যস্ত এয়ারপোর্টও যখন জানাল ইউরোপের মধ্যে সব ফ্লাইট আপাতত স্থগিত, ভিতরে শুরু হল দুশ্চিন্তা— কীভাবে বেলজিয়াম যাব!
চুপচাপ বসে থেকে কবে ভলকানোর ঝলকানো শেষ হবে, অপেক্ষা করাই যেত! কিন্তু আমি দেখলাম, স্থানীয় মানুষ ট্রেন ব্যবহার করছেন। আকাশপথ বন্ধ হলেও স্থলপথ বলবত। তাই ঠিক করলাম, ট্রেনে যাওয়া যাক বেলজিয়াম। টিকিট ইত্যাদি নিজেকেই কাটতে হবে। ওই সময়ে ট্রেন স্টেশন জনাকীর্ণ, কারণ সকলের কাছেই ওইটিই একমাত্র পথ।
অন্য বেশ কিছু শহরের মতো সেই সময় ফ্রান্স শহরে ইংরিজি বলার চল সাধারণের মধ্যে কম। কষ্ট করে বুঝে একটি অতিশয় লম্বা লাইনে দাঁড়ালাম। কাউন্টারে পৌঁছে হাঁকুপাঁকু করে যখন বেলজিয়ামের টিকিট চাইলাম, জানলাম, এই লাইনটি লোকাল যাত্রার। দেশের বাইরে যাওয়ার জন্য যে টিকিট কাউন্টার, সেটি ওইদিকে শুনে যেদিকে দেখলাম, সেখানে আরও একটি অতীব লম্বা লাইন। বুঝলাম, পরিস্থিতি ভয়ানক। চারদিকে মানুষের মুখে আশঙ্কা; কবে পৌঁছবে, কখন পৌঁছবে এই নিয়ে নানা দুশ্চিন্তা।
এইখানে পাঠকদের মনে করিয়ে দেওয়া ভালো যে, হোয়াটস-অ্যাপ, জি.পি.এস., ফোর-জি ইত্যাদি তখন দুর্লভ অথবা অনুপলব্ধ। যোগাযোগ বলতে টেলিফোন কল এবং তা বিদেশে যথেষ্ট ব্যয়বহুল।
যাই হোক, ইন্টারন্যাশনাল কাউন্টার থেকে টিকিট নিতে গিয়ে দেখলাম উনি তিনটে টিকিট দিলেন। Toulouse থেকে Bordeaux, Bordeaux থেকে Paris এবং Paris থেকে Brussels— এইভাবে পৌঁছতে হবে বেলজিয়াম। অর্থাৎ, তিনটি ট্রানসিট ট্রেন। আর মাঝে দশ থেকে পনেরো মিনিটের সময় ব্যবধান। দেখেই মাথায় হাত। শুধু তাই নয়, প্যারিসে কেবল প্ল্যাটফর্ম চেঞ্জ করতে হবে না, স্টেশনও চেঞ্জ করতে হবে। মাথা ঘুরছে। চোখে যে সরষে ফুল দেখব, সে শক্তিও নেই। শুধু অন্ধকার। কলকাতা শহরের শিয়ালদহ আর হাওড়ার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে মন প্রমাদ গুনছে, এই যাত্রা খুব সুখকর হবে বলে মনে হয় না। আমার মুখ-চোখের ভয়ানক অবস্থা দেখে কাউন্টারের ভদ্রমহিলা আশ্বস্ত করলেন বটে, তবু দুশ্চিন্তা কাটে না।
টিকিট নিয়ে হোটেলে ফিরে ব্যাগ গোছালাম। ট্রেন পরের দিন সকালে। সারারাত কাটল নির্ঘুম। পরের দিন হুড়োহুড়ি করে বিশাল ব্যাগ নিয়ে পৌঁছে গেলাম স্টেশনে। ট্রেনে যাওয়ার কথা ভাবা ছিল না, তাই ব্যাগের আয়তন ফ্লাইট-উপযুক্ত। এখন হ্যাঁচোড়প্যাঁচোড় করে কোনোরকমে সামলাই। সামনে সিঁড়ি এবং এস্কালেটর। হায়! এস্কালেটর কাজ করছে না। দিশাহারা হব হব, ও কী! একজন ইউরোপিয়ান ভদ্রলোক আমার পাশ দিয়ে গিয়ে আমার ব্যাগটি নিয়ে তরতর করে উঠে পড়ছেন এস্কালেটরে। ভাবলাম, এ কী, এ কী! নিয়ে পালাচ্ছে নাকি! ও বাবা না, উপরে উঠে আমার দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করছেন আমার ওঠার। সাহায্য করলেন, কিছু না বলতেই।
বিদেশে অচেনা মানুষের এমন সহায়তা, অচেনা জায়গা হঠাৎ কেমন ভালোবাসার হয়ে গেল। একটি জায়গা শুধুই তো তার দর্শনীয় বস্তুগুলোর জন্য নয়। মানুষ, পরিবেশ এবং আরও বিষয় থাকে। যেমন দেখি, ট্রেন আগেই এসে হাজির। ট্রেনে জায়গা অনেক। কেউ দাঁড়িয়ে নেই। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। কেউ ঘাড়ের ওপর উঠে পড়ছে না। ট্রেন ছুটতে শুরু করল, সঙ্গে মনের পরিবর্তন। ভিতরে আরামে বসে, বাইরে মনোরম সবুজ দৃশ্য, একের পর এক রঙ, রস, গন্ধ! হঠাৎ মনে হল, এই ট্রেন জার্নি না করলে ইউরোপ দেখাই অপূর্ণাঙ্গ থেকে যেত।
Bordeaux-এ পৌঁছলাম নির্ধারিত সময়ের পনেরো মিনিট আগেই। যে প্ল্যাটফর্মে পরবর্তী ট্রেন, তা একেবারে চোখের সামনেই এবং ট্রেন দাঁড়িয়ে আছেই। মসৃণ এবং স্নিগ্ধ।
এভাবেই পৌঁছলাম প্যারিস। স্টেশনের বাইরে ট্যাক্সি। ট্যাক্সির ভদ্রলোককে মনে হল জিজ্ঞেস করি, কোনোভাবে আইফেল টাওয়ার দেখা যায় কি না স্টেশনে যাওয়ার পথে। হাসিমুখে রাজি হলেন। মাত্র পাঁচ মিনিট দাঁড়িয়ে আইফেল টাওয়ারের আইকনিক এই অবয়ব দেখে টুক করে মোবাইলে একটি ছবি তুলে ঝটপট উঠে পড়লাম ট্যাক্সিতে। ধীরে ধীরে পৌঁছলাম Brussels।
আর পরের দিন অফিসে আমাকে দেখে সবাই অবাক। কেউ ভাবতেই পারেনি আমি এসে পৌঁছব এই সংকটের মধ্যে। যে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজেই নিজেকে চব্বিশ ঘণ্টা আগে দুষছিলাম, শেষে দেখলাম তা হল বলেই জীবনের পাতায় একটি জাঁকালো পাতা যুক্ত হল।
দুই
কাজের সূত্রে এবার চললাম মস্কো। এর আগেও বারকয়েক গিয়েছি, ঘটনাচক্রে তা জুন-জুলাই ছিল। এবার জানুয়ারির শুরুতে যেতে হচ্ছে ভেবে গুগল খুলে টেম্পারেচার দেখতে গেলাম। দেখে হার্টে একটা চিনচিন অনুভব করলাম, মাইনাস টোয়েন্টি এইট ডিগ্রি সেলসিয়াস। রিয়েলি? আর ইউ সিরিয়াস! চোখে ভুল দেখছি কি? কচলে-মচলে আবার দেখি, মাইনাস টোয়েন্টি এইট। এবার চোখে সরষে ফুল, সব যেন ধোঁয়া ধোঁয়া।
সবকিছুরই সেকেন্ড ওপিনিয়ন নেওয়া বাঙালির রক্তে। গুগলকে অবিশ্বাস করার ধৃষ্টতা দেখালাম, আরও বার দশেক অন্য সাইট চেক করলাম— ড্যাম, একই রেজাল্ট। প্লাস ফিফটিনের কলকাতায় বসে মাইনাস টোয়েন্টি এইট কল্পনা করা অসম্ভব জেনেও চেষ্টা করতে গিয়ে ভীষণ বিষম খেলাম। হার্টে চিনচিনের সঙ্গে এবার মাথা ভোঁ ভোঁ, পেট গুড়গুড় শুরু হল। টেম্পারেচার অ্যানালিসিস করতে গিয়ে জানলাম, রাশিয়া পৃথিবীর শীতলতম দেশগুলির মধ্যে একটি।
যাই হোক, যেতে যখন হবেই, ভাণ্ডার খুঁজে বার করা গেল যেসব শীতের পোশাক, যারা এতদিন ন্যাপথালিনের আবেশে মাখা, যারা আলোর মুখ দেখেনি বহু শতক হয়ে গেল। কলকাতাতে নেহাতই তাদের গুণের কদর ছিল না। এবার পূর্ণ মর্যাদা পাবে বুঝে তারাও বেশ ফুলেফেঁপে। দুটি নিতেই বাক্স-প্যাঁটরা ফুল।
তার পরে বেশ টেনশনের রাতগুলো কাটিয়ে পৌঁছলাম ‘মস্কোভা’। এয়ারপোর্টে পৌঁছে বোঝার উপায় নেই বাইরে কী অপেক্ষা করছে। ব্যাগপত্তর গুছিয়ে বাইরে আসতে-আসতেই রাত, মানে টেকনিক্যালি সকাল ২:৩০। টম ক্রুসের লুকওয়ালা ড্রাইভার আমার নামওয়ালা সাইন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নিজেকে অ্যাঞ্জেলিনা মনে হল। গটগট করে এগিয়ে গেলাম, বলতে পারেন ভেসে গেলাম। হঠাৎ মনে পড়ল, ক্যাশ চাই। ঠান্ডার ডান্ডাতে বাকি সব ভুলেছি। কার্ডটা ভুলিনি ভাগ্যিস। সামনেই চারটে এ.টি.এম.। বীরবিক্রমে এগিয়ে গেলাম। টম ক্রুস আমার ব্যাগটি নিয়ে আমাকে খানিক বোঝা মুক্ত করে বাধ্য ছেলের মতো পিছনে দাঁড়িয়ে আছে। এ.টি.এম.-এ কার্ড ঢুকিয়ে এদিক-ওদিক টেপাটেপি করতেই দুমদাম রাশিয়ান হরফে কীসব এসে সব শান্ত। এক সেকেন্ড, দু-সেকেন্ড, তিন-চার-পাঁচ-ছয়— শান্ত। ইতনা সন্নাটা কিউ হ্যায় ভাই! মানে? টাকা? কার্ড? টাকা বেরোল না। কার্ডও না। অসহায় চোখে তাকাই এদিক-ওদিক। ক্যানসেল টেপাটেপি করি, নাথিং। মানেটা যা দাঁড়াল, তা হল, এ.টি.এম.-এর খিদে পেয়েছিল মাঝরাতে, বাঙালির যেমন পায়, ফ্রিজে রাখা মিষ্টির খিদে। এরও পেয়েছিল, খেয়ে নিল আমার কার্ড। আমার ততক্ষণে মাথায় হাত, চোখ কপালে এবং আর যা যা কিছু ওপরে ওঠা বা নীচে নামা সম্ভব। চোখ ফেটে কান্না বেরিয়ে আসে প্রায়, টমবাবু আন্দাজ করে ছুটে আসে। কিন্তু রাশিয়ার অধিকাংশের মতো উনিও ইংরিজি বলেন না। নানা অঙ্গভঙ্গি হলো, আশেপাশের অনেকে এসে আরও টেপাটেপি করলেন। এ.টি.এম.-এর বোধ হয় ততক্ষণে খাবার স্টমাক পেরিয়ে ইন্টেস্টাইনে। নো মোর আশা।
প্রায় কেঁদে ফেলব, এই সময় হঠাৎ দেখি টম নেই। হাওয়া। জাস্ট ভ্যানিশ। ব্যাগটা? আমার ব্যাগটা? তাও নেই। ধপ করে বসে পড়লাম। হায়, মনুষ্যত্ব হারানোর কম্পিটিশনে এরাও তাহলে প্রতিযোগিতায়! নিজেকে অসহায় মনে হল। কী করব, কী করা উচিত— এসব ভাবার মানসিক স্থিতি তখন হারিয়েছি। একটা শূন্যতা। ব্ল্যাংক। এমটিনেস। গলা ছেড়ে কাঁদতে পারলে ভালো লাগবে মনে হল। কিন্তু না, আমরা শহুরে সভ্য আর্বানিটির তত্ত্বাবধানে অভ্যস্ত। বেসামাল হলে চলবে না। হাসি পেলে মুখ টিপে। কান্না পেলে লুকিয়ে। কলকাতা হলে এতক্ষণে একটা মিনি ঝাঁক তৈরি হত আমাকে ঘিরে। এখানে কারোর সময় নেই। মাঝরাতে এমনিতেই সবাই হয় ক্লান্ত, নয় ব্যস্ত।
বোধ হয় মিনিট দু-তিনেক ওভাবেই বসে। শক্তি কিছু জড়ো করে এয়ারপোর্ট সিকিউরিটির কাছে গেলাম। ভাঙা ইংলিশ বলে তারা। বোঝার চেষ্টা করছে যথাসম্ভব। আমি তত ধৈর্য হারাচ্ছি। মনে মনে কী কী গালাগালি দেব সেটা সাজাচ্ছি। ঠিক করলাম, চারদিকে জানাব এই ঘটনা, এই অরাজকতার ব্যাপারে। তোলপাড় করে দেব পৃথিবী। উড়িয়ে দেব, ভাসিয়ে দেব, আমি ঝঞ্ঝা, আমি ঘূর্ণি, আমি পথ-সম্মুখে যাহা পাই যাই চূর্ণি। ফাটিয়ে... আরে, ওই তো, ওই তো টম ক্রুজ, ওই তো! পালাচ্ছে, নাকি আমার দিকেই আসছে? হ্যাঁ, আমার দিকেই। হাতে ব্যাগটাও আছে। হাঁপাতে হাঁপাতে ইশারায় বোঝাল, ওই এ.টি.এম. যে ব্যাংকের, তার অফিস দোতালায়। টম ক্রুজ ওখানেই ছুটেছিল। কিন্তু এত রাতে তাদের ব্যাংকের কোনও লোক নেই। আরও অনেক কিছু বোঝাতে চাইলেও পারছিল না, তাই সঙ্গে নিয়ে এসেছে আধো ইংরিজি বলা পথচলতি প্যাসেঞ্জারকে। প্যাসেঞ্জার ভদ্রলোকটি সমস্তটা মন দিয়ে শুনলেন এবং বেশ ক’টা পটাপট ফোন করলেন, সাদা কাগজে খসখস লিখে দিলেন একটা ঠিকানা আর আমাকে জানালেন, উপযুক্ত প্রমাণসহ আগামীকাল এই ঠিকানায় গেলেই পাওয়া যাবে রিপ্লেসড কার্ড। ঠিকানাটি ওই ব্যাংকের মেইন অফিস। আর টমবাবাজির গাড়ি ভাড়া টাকা নাকি পরে দিলেও চলবে। এবার চোখের জল আর আর্বানিটি ধরে রাখতে পারল না। কান্না হয়ে বেরিয়ে এল।
তিন
মনে আছে, ২০১৪ সালের মাঝামাঝি, রাশিয়া এবং ইউক্রেনের বিবাদের জেরে ইউক্রেনের কাছে মালয়েশিয়ার ফ্লাইট দুর্ঘটনার পরে সেই রুটের সমস্ত ফ্লাইট অনির্দিষ্টকালের জন্য বাতিল করা হয়েছিল। আমি সে-সময় ইউক্রেন, কিয়েভে এবং ঠিক একই দিনে ইউক্রেন ছেড়ে দেশে ফেরার কথা। যতদিন কিয়েভ শহরে ছিলাম, খবরে শুনেছি ক্রমাগত দুই দেশের অস্থির অবস্থার কথা। পথে মানুষ কম, আতঙ্কে আছেন। যে-কোনো বড়ো শব্দে মানুষ সন্ত্রস্ত হয়ে উঠছেন। যেদিন ফেরার কথা, ব্যাগ গুছিয়ে বেরোব, ঠিক তখনই নিউজে দেখি মালয়েশিয়ার ফ্লাইট দুর্ঘটনার খবর। আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে আমার ট্র্যাভেল এজেন্টের ফোন। তিনি জানালেন, আমার ফ্লাইটও ওই রুটেই ছিল। কিন্তু যেহেতু একটু পরে ছিল, তাই দুর্দশা এড়াতে পেরেছি, এ-যাত্রা বেঁচে গেছি। শুনে একটু সামলে নিতে মনে হল, স্বস্তি। প্রাণ আছে, এখনও প্রাণ আছে। এরপর ট্র্যাভেল এজেন্ট বলে যাচ্ছেন যে, ভিসাটি আমার আজকের দিন অবধিই বৈধ। তাই যদি আজ কোনোভাবে এই দেশ থেকে না বেরোতে পারি, তাহলে এখানে এই পরিস্থিতিতেই ভিসা এক্সটেনশন পদ্ধতির মধ্যে যেতে হবে। আর তা এই প্রবল ভয়ানক অস্থির পরিবেশে খুব সুখকর যে হবে না, তা বলাই বাহুল্য। ভীষণ ঘাবড়ে গেলাম। ঠিক করলাম, এয়ারপোর্টে যাই। সারা রাস্তায় মনে হল, সবাই এয়ারপোর্টেই ছুটছে। পালতে চাইছে যেভাবেই হোক। এদিক-ওদিক ট্রাফিক জ্যাম।
এয়ারপোর্টে চারদিকে বিশৃঙ্খলা, ফ্লাইট শুরুর কোনও ইঙ্গিত নেই, বিমানবন্দরে আটকে থাকা মানুষের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। ভয়ানক। আমার ফ্লাইট কাউন্টারেও ভিড়। সবাই অস্থির। এর মধ্যে কিছু মানুষ সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে চাইছেন। বলছেন, হোটেলের ব্যবস্থা করবেন, চারগুণ টাকার এই মুহূর্তে কী করা যাবে, সেই উৎকণ্ঠা। বোধ হয় একসময় মাথা ঘুরে পড়েও গেলাম। চোখ খুলতে দেখি আমার এয়ারলাইন্স-এর স্টাফেরা আমাকে একটি জায়গায় নিয়ে রেখে জল ইত্যাদি দিচ্ছে।
আমি বেঁচে আছি এই ভরসায়, শক্তিতে কয়েক ঘণ্টা আরও কাটালাম। ট্র্যাভেল এজেন্টকে ফোন করছি, অন্য এয়ারলাইন্সে উপায় দেখছি— এভাবেই কাটল সারারাত। স্নায়ু দুর্বল, কিন্তু আমি নিজেকে উজ্জীবিত করার জন্য কঠোর চেষ্টা করছি।
কোনোরকমে একটি ফ্লাইট পাওয়া গেল, যা অর্ধেক পৃথিবী ঘুরিয়ে আমাকে পৌঁছে দেবে দেশে। তাই হোক, তবু মুক্তি। ফ্লাইট উঠে যখন চলছি, আমি প্রাণ বাঁচিয়ে ফিরছি। কিন্তু এখনও কত মানুষ আটকে। স্থানীয় মানুষ, তাদের এই থেকে-থেকেই অস্থিতিশীল জীবন, এর শেষ কোথায়! কোনও গুপী-বাঘা আসুক কখনও। অমোঘ সত্য বলুক সরলভাবে, ‘তোরা যুদ্ধ করে করবি কী, তা বল, মিথ্যে অস্ত্রশস্ত্র ধরে প্রাণটা কেন যায় বেঘোরে!’ গান গেয়ে থামিয়ে দিক লড়াই। মানুষ সুস্থ থাক। লড়াই থামুক। যদি হতেই হয়, হোক গানের লড়াই।
(সত্য ঘটনা অবলম্বনে)
শুভাঞ্জন ব্যানার্জী ▪ প্রবাহনীল দাস
লিও তলস্তয় ▪ নলিনাক্ষ ভট্টাচার্য
তাপস মৌলিক ▪ অংশু পাণিগ্রাহী ▪ বাণীব্রত গোস্বামী ▪অরিন্দম ঘোষ ▪ রঞ্জন দাশগুপ্ত ▪ সিদ্ধার্থ দাশগুপ্ত ▪শাশ্বত কর ▪ রাজীব রায় গোস্বামী ▪ সায়নদীপা পলমল ▪ প্রদীপ কুমার দাস
বদ্রীনাথ পাল ▪ তাপস বাগ ▪ বসন্ত পরামানিক ▪ গোবিন্দ মোদক ▪ সুব্রত দাস ▪ অর্ণব ভট্টাচার্য ▪ সুজাতা চ্যাটার্জী ▪ মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় দাস ▪ মধুমিতা ভট্টাচার্য ▪ ড. রমলা মুখার্জী ▪ সনৎকুমার ব্যানার্জী ▪ বিদ্যুৎ মিশ্র ▪ রাজর্ষি মণ্ডল ▪ রূপালী মুখোপাধ্যায় ▪ শক্তিপদ পণ্ডিত ▪ শম্ভু সরকার ▪ সুব্রত চৌধুরী
অদিতি ভট্টাচার্য ▪ দীপঙ্কর চৌধুরী ▪ মৌসুমী রায় ▪ সবিতা রায় বিশ্বাস ▪ সহেলী রায় ▪ কিশোর ঘোষাল
অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায় ▪ অরিন্দম দেবনাথ ▪ কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায় ▪ দীপক দাস ▪ ড. উৎপল অধিকারী ▪ চন্দ্রানী মজুমদার
সায়ন্তনী পলমল ঘোষ ▪ সোমা দে ▪ শংকর লাল সরকার ▪ সন্দীপন সাহা
অলংকরণ
মায়াসখা নন্দী ▪ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ▪ একপর্ণিকা ক্রিয়েটিভস