বড়ো গল্প
FREE SHIPPING IN INDIA
বড়ো গল্প
চৈত্রের কাঠফাটা দুপুর ছিল সেটা, আকাশ থেকে যেন আগুন ঝরছিল। সেই আগুনে পুড়তে পুড়তে আমরা মাঠে এসে দাঁড়ালাম। আগেই বলেছি, কোনও অজ্ঞাত কারণে কাছারিবাড়ির মাঠে ঘাস বড়ো হত না। যেটুকু যা ছিল, চৈত্রের রোদে তাও হলুদ হয়ে গেছে। চারদিক খাঁ খাঁ করছে। সে যে কী নিঃসীম শূন্যতা, সে আমি আপনাদের বলে বোঝাতে পারব না। দেখলাম, রজতদার মুখও শুকিয়ে এসেছে।
অদিতি ভট্টাচার্য
“কী গপ্পের বই এটা, মশাই? কোথা থেকে জোগাড় করলেন?”
সুখেন্দু হাজরা একটা বই খুলে চোখ বোলাচ্ছিলেন, প্রদীপ শাসমল পাশ থেকে উঁকি মেরে জিজ্ঞেস করলেন।
“নাতি-নাতনিকে রোজ গল্প বলতে হয়, বুঝলেন?” হাতে ধরা বইটা বন্ধ করে সুখেন্দু বললেন, “নিজেরা যে পড়ে না তা নয়, তবে অত ঝোঁক নেই যত আছে মোবাইল ফোন নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করায়। নিজেদের পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপারেও তারা খুব স্পষ্ট। মনোমতো গল্প না হলে শুনবে না। মনোমতো বলতে কী বলুন তো?”
“কী?”
“ভূতের গল্প, অলৌকিক এইসব। তা আমার যে দু-চারটে বই ছিল, সেখানকার সব গল্প বলা হয়ে গেছে। নতুন গল্প কোথা থেকে পাই? বানানোর ক্ষমতা নেই। তাই মিত্রবাবুর কাছে গেছিলাম। ওঁর বাড়িতে কত যে বই! ছোটোদের, বড়োদের, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, কবিতা—কিছু বাদ নেই! ছোটোখাটো লাইব্রেরি বলতে পারেন। এই বইটা নিয়ে এসেছিলাম, নাতি-নাতনি শুধু শোনেনি, পড়েওছে। খুব ভালো লেগেছে তাদের। ‘এরকম বই আরও এনে দাও, দাদান’ করে বায়না জুড়েছে। এখান থেকে ফেরার পথে বইটা মিত্রবাবুকে দিয়ে আসব আর এরকম আরও দু-চারটে বই-টইয়ের যদি নাম-টাম বলেন। কিনেই নেব, কত আর নিয়ে আসা যায়!”
“আপনার নাতি-নাতনি ছেলেমানুষ, তাদের না-হয় ভালোমন্দ বোঝার বয়স হয়নি। কিন্তু আপনি কোন আক্কেলে ওদের এসব গাঁজাখুরি গপ্পো গেলাচ্ছেন?” প্রদীপ একেবারে তেরিয়া হয়ে উঠলেন।— “আবার বলেছেন পছন্দ করে! আরে মশাই, পছন্দ কি আর এমনি এমনি হয়েছে? আপনি ওদের এসব ছাইপাঁশ শুনিয়ে শুনিয়ে ওদের রুচিই এরকম করে দিয়েছেন! বন্ধ করুন মশাই, ইমিডিয়েটলি এসব ট্র্যাশ শোনানো, পড়া—সব বন্ধ করুন। ছেলেমেয়ে দুটোর ভবিষ্যৎ নিজের হাতে আর ঝরঝরে করে দেবেন না। গপ্পো শোনাতে হয় তো নানারকম আবিষ্কারের গপ্পো শোনান, বিজ্ঞানের গপ্পো বলুন, বড়ো বড়ো বৈজ্ঞানিকদের জীবনী পড়তে দিন, তা নয় যত্ত গাঁজাখুরি!”
পাড়ায় নতুন একটা আড্ডা হয়েছে। এঁদের মধ্যে অনেক সদস্য আগেও বিকেল, সন্ধেয় জড়ো হয়ে গল্প-টল্প করতেন—কখনও চায়ের দোকানে, কখনও পার্কের বেঞ্চে—তবে ইদানীং এ-আড্ডাটার একটা পাকাপোক্ত ঠিকানা হয়েছে। এ-পাড়ারই নতুন বাসিন্দা কালীপদ সান্যালের উদ্যোগে। মাস কয়েক হল নতুন বাড়ি কিনে এসেছেন, সংসারে দুটি মানুষ—উনি আর ওঁর স্ত্রী। ছেলেমেয়েরা কেউ এ-রাজ্যে থাকে না। মিশুকে মানুষ, এসেই পাড়ার সকলের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় সেরে ফেলতে দেরি করেননি। বয়স আশি পেরোলেও এখনও যথেষ্ট শক্তসমর্থ আছেন।
“রোজ একটা সময় সবার সঙ্গে বসে খানিক গল্পগাছা করলে ভালোই লাগে। আমাদের এই বুড়ো বয়সে আর আছেটা কী? তবে তারও একটা জায়গা থাকা দরকার। আজ এখানে, কাল ওখানে, কখনও রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই দুটো কথা বলে চলে এলাম, এরকম ভালো লাগে না।” একদিন বলেছিলেন কালীপদ।
বলা বাহুল্য, কারোরই আপত্তি ছিল না। কিন্তু জায়গাটা কোথায় হবে?
সে-সমস্যারও সমাধান কালীপদ করেছিলেন। ওঁর বাড়ির বাগানে টিনের একটা শেড আছে। জায়গাটা বাড়ির পেছন দিকের ঢাকা বারান্দা সংলগ্ন।
“এখানে বসলে হয় না? ক’খানা প্লাসটিকের চেয়ার জোগাড় করে ফেলা যাবে। বাগানের খোলামেলার মধ্যেও হল, সবসময় কি বাড়ির মধ্যে ভালো লাগে?” বলেছিলেন কালীপদ।
বাকিরা এক বাক্যে সায় দিয়েছিলেন।
“বেশ তো, তাহলে... আজ তো রবিবার, আগামীকাল সোমবার, পরের সোমবার; পরের সোমবার থেকেই বসা যাক। শুভস্য শীঘ্রম। আরও আগে করতাম, কিন্তু গিন্নির হুকুমে পুরী যেতে হচ্ছে। আগামীকালই বেরোচ্ছি। তাই আর কী।”
সোমবার সকলে এসে দেখলেন কালীপদ এর মধ্যে শেডে একখানা পাখা আর আলোও লাগিয়ে ফেলেছেন, কয়েকখানা চেয়ার তো আছেই, একখানা টেবিলও রেখেছেন। যাকে বলে একেবারে পাকাপোক্ত ব্যবস্থা।
সকলে খুশিই হয়েছিলেন। সেই থেকে আড্ডাটি নিয়মিত চলছে, সদস্য সংখ্যাও বেড়েছে। আজও আড্ডা জমজমাট। সেখানেই সুখেন্দুকে ভূতের গল্পর বইরের পাতা উলটোতে দেখে প্রদীপ এত কথা বলে ফেললেন।
“গাঁজাখুরি বলুন আর যাই বলুন, ভূতের গল্পের মতো গল্প হয় না। এককালে, এককালে বলি কেন, এখনও সুযোগ হলে পড়ি।” সমরেশ বললেন।
“পড়েন? বেশ করেন। আপনি পড়তেই পারেন। আপনার আর ভালোমন্দ নতুন করে কিছু হওয়ার আছে কি? নেই। কিন্তু কচি ছেলেমেয়েগুলোর মাথা খাওয়া কেন বাপু?” বাংলার পাঁচের মতো মুখ করে বললেন প্রদীপ।
“মাথা খাওয়া! এ কী বলছেন! মোবাইলে গেম খেলা আর ভিডিও দেখার থেকে শতগুণে ভালো।” এরকম কথাও কেউ কেউ বললেন।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই বোঝা গেল আড্ডা দু-ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। একদল ভূতের, শুধু ভূতের নয় গল্পর বই পড়ার পক্ষে; আর এক দল প্রদীপের মতো ভূত-পেতনির ওপরে অত হাড়ে চটা না হলেও ‘এসব পড়ে আর কী হবে? তাছাড়া বাংলা বই ক’জন পড়ে? কোনও কাজে তো আর আসবে না।’ এরকম মনোভাব পোষণ করেন।
কালীপদ একটা কথাও এতক্ষণ বলেননি, শুধু মিটিমিটি হাসছেন আর অন্যদের বাকযুদ্ধ উপভোগ করছেন।
“আচ্ছা, এই যে আপনারা এত ভালো গপ্পো, তত ভালো গপ্পো করছেন, সব যে গপ্পো তা তো মানছেন? কোনও সত্যি ঘটনা তো নয়! এত যে পড়েছেন, আজ অবধি কোনও সত্য ঘটনা অবলম্বনে কিছু পড়েছেন কি? পড়েননি, আমি হলফ করে বলতে পারি। আচ্ছা, পড়ার কথা বাদ দিন, শুনেছেন কি? কেউ ভূত, পেতনি, দৈত্য-দানোটানো কিছু চোখের সামনে দেখেছেন বলে শুনেছেন বা ওই যে অলৌকিক বলছেন, অদ্ভুত অদ্ভুত সব ঘটনা, তাই তো? কী যেন বেশ বলেন আপনারা? বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা চলে না, গালভরা একখানা কথা বটে, সেরকমও কি কিছু শুনেছেন? শুধু আপনারা নন, আপনাদের কোনও আত্মীয়স্বজন, চেনা পরিচিত, বন্ধুবান্ধব কেউ শুনেছে? শোনেনি। তিনকুলে কেউ শোনেনি। না আমার, না আপনাদের। আরে মশাই, সত্যি কথাটা মানুন। বুদ্ধিতেই সব হয়। এই যে জগৎ চলছে, এও হল বুদ্ধিতে। সব কাজকর্মই তাই। কাজেই ‘বুদ্ধিতে ব্যাখ্যা চলে না’ এরকম কোনও জিনিস হয় না। কাজেই যা হয় না তা ওই ছোটো বাচ্চাগুলোকে গেলানো কেন? একেবারে একটা খারাপ নেশার মতো ব্যাপার হয়ে যাচ্ছে তো!” এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে গেলেন প্রদীপ।
এ এক অকাট্য যুক্তি সত্যি, এ বিষয়ে কারোর কোনও অভিজ্ঞতা নেই।
সকলে কালীপদকে ধরলেন— “কী ব্যাপার কালীপদদা, আপনি কিছু বলছেন না যে? এ ব্যাপারে আপনার মত কী?”
প্রদীপও কালীপদর দিকে তাকালেন।— “ঠিক কথা, আপনার মতটাও জানা দরকার। আপনি আমাদের মধ্যে বয়সে সবচেয়ে বড়ো, আপনি কিছু বলবেন না তা তো হয় না।”
“বলব?” কালীপদ বললেন, “বললে তো নিজের অভিজ্ঞতার কথাই বলতে হয়।”
“নিজের অভিজ্ঞতা? মানে ওই ভূত-পেতনির অভিজ্ঞতা!” প্রদীপ অত্যন্ত আশাহত।— “আপনাকে একজন বিচক্ষণ মানুষ বলেই জানতাম, সেই আপনি কিনা এরকম একখানা কথা বললেন!”
“আহ্! কালীপদদাকে আগে বলতেই দিন না, তারপর না-হয় আপনার যা মনে হয় বলবেন।” অন্যরা প্রদীপকে থামালেন।— “আপনি বলুন কালীপদদা।”
কালীপদ অন্যমনস্ক, যেন কিছু ভাবছেন। একটু পরে বললেন, “বলতে পারি, কিন্তু আপনারা বিশ্বাস করবেন কি? বলে দেখেছি, দু-চারজন ছাড়া কেউই করেনি। ভূত, অতিপ্রাকৃত ব্যাপার-স্যাপার সবাই বইয়ের পাতাতেই পছন্দ করেন, নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গেলে হাসির খোরাক হতে হয়। ভাবে, বুড়োর ভীমরতি হয়েছে, উলটোপালটা বকছে। এ ব্যাপারে বেশিরভাগ মানুষেরই প্রদীপবাবুর মতো মনোভাব।”
“তবে? বেশিরভাগ মানুষ যা ভাবে সেটাই তো ঠিক।” প্রদীপের মুখে চওড়া হাসি।
ওদিকে অন্যরা গল্পের গন্ধ পেয়ে নড়েচড়ে বসেছেন।
“বিশ্বাস-অবিশ্বাসের কথা পরে, আপনি শুরু তো করুন কালীপদদা!” সবাই সমস্বরে বলে উঠলেন।
“শুনুন তবে। কিছু কিছু ঘটনা এমনই হয়, মনের মধ্যে এমনই দাগ কেটে বসে যায় যে ভোলা যায় না বা তুচ্ছ ভেবে উড়িয়েও দেওয়া যায় না। এও তেমনই ঘটনা, অন্তত আমার কাছে। যে সময়ে এ-ঘটনা ঘটে, তখন আমি তখন আমার বি.এসসি ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র। ফিজিক্সে অনার্স ছিল আমার। শুনলে অবাক হবেন, সে-সময় আমিও কিন্তু আমাদের এই প্রদীপবাবুর মতোই কট্টরপন্থী ছিলাম। সবকিছুকে যুক্তির নিক্তিতে ওজন করতাম। ভূত, ভগবান—কোনোকিছুতেই বিশ্বাস ছিল না, এসব নিয়ে আলোচনাও পছন্দ করতাম না। তবে পরে মনে হয়েছে, এরকম হওয়ার পেছনে কারণও ছিল। আমার বাবা বরাবরই রুগ্ন মানুষ ছিলেন—আজ এটা, কাল সেটা লেগেই থাকত। একসময় বাবা খুব অসুস্থ হলেন। অনেক ডাক্তারবদ্যি করেও অসুখ তো সারলই না, উলটে বাবার শরীর ক্রমশ খারাপ হতে লাগল, তারপর তো একদিন আমাদের ছেড়ে চলেই গেলেন। আমার তখন মাত্র ন’বছর। বিপদ তো কখনও একা আসে না, সঙ্গীসাথী জুটিয়ে নিয়েই আসে, দুঃসংবাদও। বাবার কাজকর্ম মিটল কি মিটল না, আর একটি খবর এল, একেবারে বাড়ি বয়েই এল। আমার বাবা নাকি তাঁর ভাগের পৈতৃক সম্পত্তির অংশ সব নিজের দাদাকে আগেই বিক্রি করে দিয়েছেন। এ-কথা সত্যি যে, বাবা গ্রামের বাড়ি, জমিজমার ব্যাপারে কিছুটা উদাসীনই ছিলেন, আমার জ্যাঠামশাইয়ের ব্যবহারও ভালো ছিল না, রুগ্ন এই ভাইটিকে এবং ভাইয়ের স্ত্রী-ছেলেকে কখনোই সুনজরে দেখতেন না। হয়তো সে কারণেই আমরা গ্রামের বাড়িতে বছরে এক-দু’বারের বেশি যেতাম না। বাবার কর্মস্থল ছিল কলকাতা, সেখানেই থাকতাম। গ্রামে গেলে চাল, ডাল, শাকসবজি কিছু পেতাম; মার জোরাজুরিতে নিয়ে আসা হত, এর বেশি কিছু নয়। মা অনেকবার বলেছিলেন, ‘তুমি তো যেতে চাও না, দেখাশোনাও করো না, তাহলে বিক্রি করে দাও না কেন?’ বাবা যেমন নিরুত্তর থাকতেন, তেমন কোনও উদ্যোগও নিতেন না। হয়তো ওই শরীরে অত ধকল নিতে পারতেন না।
“ ‘এখন এসব কথা বলতে আমারও ভালো লাগছে না। আমারই তো ছোটো ভাই। দশটা নয়, পাঁচটা নয়, একটাই ভাই। আমি থাকতে চলে গেল। কিন্তু এসব বিষয় সম্পত্তি বড়ো গোলমেলে জিনিস, তাই এখনই বলতে বাধ্য হচ্ছি, জমিজমা-টমা আর তোমাদের কিছু নেই। ঝকু সব আমাকেই বিক্কিরি করে দিয়ে গেছে। তাই বলে ভেবো না, আমি ঠকিয়েছি। বাজারের দাম বুঝে যা ন্যায্য মূল্য হয় তাই ধরে দিয়েছি। কাগজপত্তরও আমার সব আছে। বাড়ির ভাগও নেবে না বলে লিখেপড়ে দিয়েছে, কিন্তু তাই বলে কি তোমরা মা-ব্যাটা দু-দিন গিয়ে ওখানে থাকতে পারবে না? নিশ্চয়ই পারবে। নিজের বাড়ির মতো করেই থাকবে।’ আমার জ্যাঠামশাই বললেন। মা তো, বলা বাহুল্য, আকাশ থেকে পড়লেন। তিনি এর বিন্দুবিসর্গ কিছুই জানতেন না, বিশ্বাসও করেননি। কিন্তু কিছু করা গেল না। করতে হলে তো কোর্ট-কাছারি করতে হত, মার পক্ষে সেসব করা তখন সম্ভব ছিল না। আশ্চর্য, পিসিরাও সবাই জ্যাঠামশাইয়ের পক্ষ নিলেন। ওঁরাও নাকি এসব আগে থেকেই জানতেন।
“ ‘সবাই সবকিছু জানল, শুধু এই এক আমিই কিছু জানলাম না! গাগোছ ছিল না ঠিকই, কিন্তু একেবারে সব বিক্রি করে দেবে, আমি কিছু জানব না—এ হতে পারে না। কী আর করব, আমার কপাল!’ মা দুঃখ করে বলেছিলেন।
“এরপরে মার লড়াই, আমাকে মানুষ করা—সেসবের মধ্যে আর যাচ্ছি না। শুধু এটুকু বলতে পারি, মা শুধু যে মনেপ্রাণে ঈশ্বরে বিশ্বাসী মানুষ ছিলেন তা নয়, আস্তে আস্তে কুসংস্কারাচ্ছন্নও হয়ে উঠছিলেন। পরিস্থিতির চাপেই হয়তো-বা।
“যাই হোক, আসল ঘটনা বলি। আগেই বলেছি, তখন আমি বি.এসসি ফাইনাল ইয়ারে পড়ছি। আমার মার কাছে একটি মূল্যবান বস্তু ছিল, একটি মোহর।”
“মোহর!” সুখেন্দু অবাক হয়ে বলে উঠলেন, “আগেকার রাজরাজড়াদের সময়ে শুনেছি মোহর-টোহর ব্যবহার হত মুদ্রা হিসেবে, সেইরকম কিছু নাকি, কালীপদদা?”
“একেবারেই তাই। মা বলতেন আকবরি মোহর।” বললেন কালীপদ, “মাকে ওটা মার এক পিসিমা দিয়েছিলেন। বাবা মারা যাওয়ার পরে তিনি এসেছিলেন মার সঙ্গে দেখা করতে। মোহরটা দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘এটা বাড়িতে রাখবি। হাজার অভাবে পড়লেও কখনও এটার দিকে তাকাবি না।’ গুরুজন মানুষ, দিয়েছেন, মা কথা শুনেছিলেন। তারপরে আস্তে আস্তে ওটার ওপর মার এক অদ্ভুত বিশ্বাস জন্মায়, একটা ন’বছরের ছেলেকে নিয়ে জলে পড়েও যে কোনোরকমে মা সংসার চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন, এর পেছনেও ওই আকবরি মোহরের কোনও প্রভাব আছে, এ-কথা মা বার বার বলতেন। আমি অবশ্য কুসংস্কার বলেই উড়িয়ে দিতাম। মার সামনে বলতেও দু-বার ভাবতাম না। মা দুঃখ পেতেন। এইভাবে কেটে যাচ্ছিল দিনগুলো, এর মধ্যে হঠাৎ এক কাণ্ড ঘটল। আকবরি মোহর উধাও হল।”
“বলেন কী! চুরি হল?” সমস্বরে প্রশ্ন হল।
“চুরি তো বটেই। চুরি না হলে এমনি এমনি কি আর হাওয়া হয়ে যায়! কোথাও নিয়েও যাওয়া হয়নি যে হারিয়ে যাবে। তবে আশ্চর্য, যেখানে আকবরি মোহর ছিল, সেখানে মার একজোড়া কানের দুলও ছিল। দুলজোড়া কিন্তু যথাস্থানেই আছে, নেই শুধু আকবরি মোহর। মা তো খুব ভেঙে পড়লেন।
“ ‘এ খুব খারাপ ব্যাপার হল, জানি না আবার নতুন কোন বিপদ আসছে।’ মা বললেন।
“মার শরীরটাও সে-সময় বিশেষ ভালো যাচ্ছিল না, তার ওপর এই মনখারাপ। মার মনে কী করে যেন বদ্ধমূল ধারণা হয়ে গেল যে ওঁর হাতে আর বেশিদিন সময় নেই। ‘তুই একটা ভালো চাকরিবাকরি পেয়েছিস, এটুকু অন্তত যদি দেখে যেতে পারতাম,’ এ আক্ষেপ মার মুখে লেগেই ছিল। আমি বুঝিয়ে বুঝিয়ে পারছিলাম না। শুধু আমি কেন, আমাদের আত্মীয়স্বজনরাও পারছিলেন না।
“এই অবস্থায় আবার আমার জ্যাঠামশাইয়ের এক চিঠি এসে উপস্থিত হল। না, ডাকে পাঠাননি। গ্রামের একজনের হাতে পাঠিয়েছেন। গ্রামের বাড়িতে আর যাতায়াত তেমন না থাকলেও জ্যাঠামশাইদের খবরাখবর যে কিছু রাখতাম না তা নয়। জ্যাঠাইমা গত হয়েছেন ততদিনে, ওঁদের পাঁচ ছেলেমেয়ের কেউই ধারেকাছে থাকে না। জমিজায়গা যা ছিল সব বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল বলেই শুনেছিলাম। জ্যাঠামশাই বাবার থেকে অনেকটা বড়োও ছিলেন, বয়সের ভারে ওঁর শরীরও ভেঙে পড়েছে। যে ছেলেটি চিঠি নিয়ে এসেছিল, সেও সেই কথা বলল, ‘শরীরগতিক একেবারেই ভালো নয়। কখন কী হয়ে যায় তার ঠিক নেই। আপনাকে বিশেষ করে যেতে বলেছেন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। যদি আমার সঙ্গেই যেতে পারেন তো খুব ভালো হয়।’
“চিঠিতেও সেই কথাই ঘুরেফিরে বার বার লেখা। ‘মরণাপন্ন জ্যাঠামশাইয়ের কাতর অনুরোধটুকু রেখো’— শেষে এ-কথাও লিখেছেন দেখলাম। আমার সঙ্গে জ্যাঠামশাইয়ের এত কী দরকার থাকতে পারে ভেবে পেলাম না। মার তো এসব খবর শুনেই মুখ শুকিয়েছে। ভেবেচিন্তে যাওয়াই ঠিক করলাম।
“জ্যাঠামশাইকে যে এ-অবস্থায় দেখব, এ আমার কল্পনাতেও ছিল না। অস্থিচর্মসার চেহারা, বিছানায় প্রায় মিশে গেছেন। আমাকে দেখে অতিকষ্টে উঠে বসে আমার হাত দুটো ধরে হাউহাউ করে কেঁদে ফেললেন।— ‘নিজের ছেলেমেয়েদের হাজারবার বললেও তারা আসে না, বুড়ো বাপকে ভুলেই গেছে। তুই তবু এলি।’
“আরও আশ্চর্য হলাম, যখন দেখলাম জ্যাঠামশাই বালিশের তলা হাতড়ে হাতড়ে একখানা দলিল বার করে বললেন, ‘নিজের পাপের ফল তো নিজেই ভুগছি। যা করেছি তা তো আর পালটাতে পারব না, তবু এইটুকু দিয়ে গেলাম তোকে। লজ্জার কথা আর কী বলব, নিজের ছেলেমেয়েদের হাত থেকে এটুকুই বাঁচাতে পেরেছি, এটা তোর। কাছারিবাড়ির মাঠ এখন থেকে তোর।’
“তখন সন্ধেবেলা। ওদিকে তখনও বৈদ্যুতিক আলো যায়নি। জ্যাঠামশাইয়ের ঘরের লন্ঠনের টিমটিমে আলোয় কাছারিবাড়ির মাঠের নাম শুনে আমারও বুক কেঁপে উঠেছিল, তা সে আমি মুখে যতই বড়ো বড়ো কথা বলি না কেন।” কালীপদ থামলেন।
এর মধ্যে সমরেশ পাড়ার চায়ের দোকানে ফোন করেছিলেন, ছেলেটা এসে চা দিয়ে গেছে। প্রথম প্রথম কালীপদ এতে আপত্তি করতেন। বলতেন, “এ কী কথা, আমার বাড়িতে এসেছেন, চা কেন দোকান থেকে আসবে?”
“ওসব বললে চলবে না। তাহলে আমরা আর এখানে রোজ আড্ডা মারতে আসবই না।” সকলে একযোগে বলেছেন, কালীপদও বাধ্য হয়ে মেনে নিয়েছেন।
চায়ে চুমুক দিয়ে কালীপদ আবার শুরু করলেন, “সারা রাত ভালো করে ঘুম হল না। খালি মনে হচ্ছিল, জ্যাঠামশাই আমাকে কাছারিবাড়ির মাঠই কেন দিয়ে গেলেন! ও-মাঠের বদনাম কিছু কম ছিল না। কোনও এক কালে কোনও জমিদারের কাছারিবাড়ি ছিল ওই মাঠে। তখন অবশ্য তার দু-একটা ঘর ছাড়া কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। জমিদার কেমন ছিলেন সে নিয়েও মতভেদ আছে। কেউ বলে প্রজাবৎসল ছিলেন, অন্যায় করে কেউ তাঁর কাছ থেকে পার পেত না, আবার কেউ কেউ অন্য কথা বলে। ‘সবসময়ই কি আর ন্যায় বিচার হত? যা উচিত তাই সব হত? হত না।’ ওই কাছারিবাড়িতেই নাকি অনেক অত্যাচার, অনেক জুলুম হয়েছে। অনেক অসহায় মানুষের দীর্ঘশ্বাস, চোখের জল ওখানের বাতাসে মিশে আছে। কাছারিবাড়ি সংলগ্ন অনেকটা জমি ফাঁকা মাঠের মতো পড়ে থাকত। সে-মাঠে থাকার মধ্যে ছিল একটা বিশাল পাকুড়গাছ, আর গোটা কয়েক তালগাছ। কীভাবে ওই কাছারিবাড়ির মাঠ হাতবদল হতে হতে আমাদের বংশের হাতে এসে পৌঁছেছিল, সে আমি বলতে পারব না।
“দুপুরে, সন্ধের পর ও-মাঠ নাকি ভয়ংকর হয়ে উঠত। গ্রামের একটেরেতে মাঠটা। একা কেউ চট করে ও-মাঠ পার করে গ্রামে ঢুকতে বা বেরোতে চাইত না। অনেকবারই অচেতন মানুষকে ও-মাঠে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। গ্রামের লোক দেখতে পেয়ে দল বেঁধে গিয়ে তুলে এনে শুশ্রূষা করে জ্ঞান ফিরিয়েছে। হুঁশ ফিরে প্রত্যেকে কমবেশি একইরকম কথা বলেছে। ও-মাঠ থেকে নাকি বেরোনো যায় না। গোলকধাঁধার মতো হয়ে ওঠে ও-মাঠ, পথিককে ছুটিয়ে মারে। হঠাৎ করে শোঁ শোঁ করে হাওয়া ওঠে, মাঠের ধুলো গোল হয়ে ঘুরতে ঘুরতে ওপরে উঠতে থাকে। সেই ধুলোর মধ্যে অনেকে কারও মুখও নাকি দেখতে পেয়েছে। চোখের ভুল হতে পারে। কিন্তু এসব আমরা ছোটোবেলা থেকে শুনেছি। বড়োদেরও চট করে ও-মাঠে একা যেতে দেখিনি। আরও এক আশ্চর্যের ব্যাপার কী জানেন, ও-মাঠে বড়ো বড়ো ঘাস হতে দেখিনি কখনও। অদ্ভুত এক ধু ধু করা শূন্যতা, রুক্ষতায় ভরা ছিল ও-মাঠ।”
“ধুলোর মধ্যে কারোর মুখ! হুঁহ্! বললেই হল! যত্তসব আজগুবি কথা।” প্রদীপ এতক্ষণ চুপচাপ শুনছিলেন, এবার বলে উঠলেন, “তা কার মুখ, কীসের মুখ—এসব কিছু কেউ বলেছিল, না শুধু ভয় পেয়েই খালাস?”
কালীপদ হেসে ফেললেন। বললেন, “বলবে না কেন, সবাই জানত ও-মুখ কার। আমাদের পাশের গ্রামের এক বিধবা বুড়ি তাড়া খেয়ে এ-মাঠে ঢুকেছিল। গ্রামের দিকে কুনজর-টজর এসবে খুব বিশ্বাস ছিল সে-সময়, জানেন তো। অনেক অসহায় মহিলাদের ডাইনি অপবাদ দিয়ে গ্রামছাড়া করা হত, শুনেছেন নিশ্চয়ই? ওই বুড়ি বেচারির কপালেও তাই ঘটেছিল। তাড়া খেয়ে এ-মাঠের মাঝে এসে পড়েছিল। কাছারিবাড়ির মাঠে ঢুকেছে, ভালো হয়েছে, এবার মজা বুঝবে, এই ভেবে পাশের গ্রামের লোক আর কিছু না করে চলে গেছিল। গরমকাল ছিল তখন। বুড়ি পাকুড়গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে বসে ছিল। পরের দিনও দেখা গেল বুড়ি ওভাবে বসে আছে। এমনিতেও খুব দরকার না পড়লে ও-মাঠে কেউ যেত না, তখন তো আরওই গেল না। কিন্তু তার পরের দিনও যখন বুড়িকে ঠায় ওভাবে বসে থাকতে দেখা গেল, তখন অনেকের একটু সন্দেহ হল। গ্রামের লোকজন দল বেঁধে পাকুড়গাছের কাছে গিয়ে দেখল বুড়ি মরে কাঠ। মাঠের বদনাম আরও বাড়ল। ভরদুপুরে মাঠের পাশ দিয়ে যেতে-যেতেও অনেকে দেখেছে, সাদা থান পরা কেউ গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে বসে আছে।
“এহেন কাছারিবাড়ির মাঠ আমাকে দেওয়ার কী কারণ থাকতে পারে ভেবে পেলাম না। সত্যি কথা বলতে, ও-জমি নিয়ে তো কোনও কাজই হবে না। নাকি বিক্রি হয়নি বলেই জ্যাঠামশাই দিলেন? পরের দিন সকালে গ্রাম থেকে চলে আসার আগে একবার কাছারিবাড়ির মাঠে গেছিলাম। ঝকঝকে রোদ্দুর চারপাশে, সেই রোদে দাঁড়িয়ে তখন অন্তত মাঠটাকে অত ভয়ংকর বলে মনে হয়নি আমার। আমি গোটা মাঠ পার করে ঢুকিনি, যেদিক দিয়ে ঢুকেছিলাম, সেদিকে কিছুটা গেলেই ভাঙাচোরা কাছারিবাড়ি। চলেই আসছিলাম, হঠাৎ কোত্থেকে একটা লোক সামনে উদয় হল। ছেঁড়া জামাকাপড় পরা, হাতে না-কাটা বড়ো বড়ো নখ, গায়ে পুরু ময়লা, চুলে জটা। দেখে ভবঘুরে বা পাগল মনে হয়। আমাকে বেশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল কয়েক মুহূর্ত, তারপর হা হা করে হেসে উঠল। সে কী হাসি! অস্বীকার করব না, আমার কীরকম অস্বস্তি হল, চলে এলাম ওখান থেকে। পথচলতি দু-একজন লোককে জিজ্ঞেস করে জানলাম, এ লোকটাকে নাকি দু-চারদিন হল গ্রামে দেখা যাচ্ছে। কোত্থেকে এসেছে, কেউ জানে না। মনে মনে ভাবলাম, গ্রামে এসেছে এসেছে, কাছারিবাড়ির মাঠে কী করছে? মতলবটা কী? এখানেই থাকবে নাকি? তাহলে তো কিছু ব্যবস্থা করতে হবে। অবাক হয়ে লক্ষ করলাম, আমার মধ্যে মালিক সত্ত্বার স্ফূরণ বেশ ভালোই হয়েছে।
“ ‘আমার এরকমই কিছু সন্দেহ ছিল। যখন সব নিয়ে নিল তখন কিছু মনে হল না, আর এখন এই কাছারিবাড়ির মাঠ দিতে এসেছে!’ মা তো সব শুনে একেবারে হায় হায় করে উঠলেন বলতে গেলেন, ‘তুই নিলি কেন? জানিস না ও কী জায়গা! কতবছর ওভাবেই পড়ে আছে, কেউ কিছু করেছে? সব জেনেশুনেও তুই নিলি, আবার ওখানে গেলিও!’
“আমি যত বলি, ‘যেমন পড়ে আছে তেমন থাক না, আমরা তো আর এখনই কিছু করতে যাচ্ছি না। তুমি এত চিন্তা করছ কেন?’ মা শোনেন না। দু-একদিন পরে বললেন, ‘বিক্রি করার ব্যবস্থা করতে হবে। এখনই। ও তোর ঘাড় থেকে নেমেছে দেখলে আমি তবুও একটু নিশ্চিন্তে যেতে পারব।’ মার শারীরিক অবস্থা তখন অনেকটাই ভালোর দিকে। ডাক্তারবাবুও বলেছেন ভয়ের কোনও কারণই নেই, কিন্তু মার মনে ওই যে এক ধারণা একেবারে গেঁথে গেছে, সে আর যাচ্ছে না। শেষ অবধি রজতদাকে ডেকে পাঠালেন মা। বললেন, রজতদাকেই বলবেন ও-জমি বিক্রির ব্যবস্থা করতে। আমার ওপরে তেমন ভরসা ছিল না।
“এই দেখুন, রজতদা কে, তা-ই বলিনি। আমাদের বাড়ির কাছাকাছি থাকত, আমার মেজোমাসির বন্ধুর ছেলে। ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল আমাদের, মা রজতদাকে নিজের বড়ো ছেলে বলেই মানতেন।
“রজতদা এল, মার সব কথা শুনে বলল, ‘আপনি একেবারে ভাববেন না, মাসিমা। কিছু না কিছু ব্যবস্থা হয়েই যাবে। আর জমিটা নিয়ে কিছু ভুল তো করেনি। আপনাদের প্রাপ্য তো কিছুই পাননি, যেটা পাচ্ছেন সেটা ছাড়বেন কেন? আমি না-হয় আগে একবার জায়গাটা দেখে আসি।’
“রজতদা একা যাবে, সে কি আর হয়, আমিও সঙ্গে গেলাম। বাড়িতেই গেলাম প্রথমে, জ্যাঠামশাইয়ের অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। মানসিকভাবেও মনে হল পুরো সুস্থ নেই, কীসব বিড়বিড় করে যাচ্ছেন। বাড়ির পুরোনো ঝি বারণ শুনল না, আমাদের দুটি ভাত না খাইয়ে ছাড়ল না। কাছারিবাড়ির মাঠ ঘুরে আমরা স্টেশনে চলে যাব, এরকমই ঠিক আছে। সে-দিনটা যেন এখনও আমার চোখের সামনে ভাসে, এই এত বছরেও এতটুকু ঝাপসা হয়নি। চৈত্রের কাঠফাটা দুপুর ছিল সেটা, আকাশ থেকে যেন আগুন ঝরছিল। সেই আগুনে পুড়তে পুড়তে আমরা মাঠে এসে দাঁড়ালাম। আগেই বলেছি, কোনও অজ্ঞাত কারণে কাছারিবাড়ির মাঠে ঘাস বড়ো হত না। যেটুকু যা ছিল, চৈত্রের রোদে তাও হলুদ হয়ে গেছে। চারদিক খাঁ খাঁ করছে। সে যে কী নিঃসীম শূন্যতা, সে আমি আপনাদের বলে বোঝাতে পারব না। দেখলাম, রজতদার মুখও শুকিয়ে এসেছে। তবে আমার সামনে নিজের দুর্বলতা ঢাকবার জন্যেই বোধ হয় কিছুটা জোর করেই বলল, ‘এসেছি যখন, তখন চল মাঠটা একবার ঘুরেই দেখে যাই। ওই-ওইটা তো বোধ হয় কাছারিবাড়ি, তাই না?’
“আমি মাথা নাড়লাম। মাঠের মাঝখানে সেই পাকুড়গাছ। পাশ দিয়ে যেতে যেতে আড়চোখে তাকালাম। নাহ্, গুঁড়িতে হেলান দিয়ে কেউ বসে নেই। কোনোরকম গোলকধাঁধাতেও পড়লাম না। ভাঙা কাছারিবাড়িতে সেই পাগলটা এখনও থাকতে পারে, এরকম একটা সন্দেহ আমার ছিলই, তাই আর ওদিকে যেতে চাইলাম না। রজতদাকে বললাম, ‘চলো ফিরি।’
“আমার কথা রজতদার কানে ঢুকল বলে মনে হল না। সে তখন ওই পাকুড়গাছের আশেপাশেই ঘুরঘুর করে বেড়াছে। গাছের গুঁড়ি, ঝুরি ছুঁয়ে দেখছে, মুখ-চোখও কেমন যেন। আমার ঠিক ভালো লাগল না, মনে হল এক্ষুনি এখান থেকে চলে যাওয়াই মঙ্গল। রজতদাকে হাত ধরে টেনে আনতে যাচ্ছিলাম, এমন সময় হঠাৎই মনে হল চারপাশের আলো যেন খুব কমে যাচ্ছে। দমকা একটা হাওয়া উঠল। কাছারিবাড়ির মাঠের শুকনো ধুলোবালি হু হু করে সে-হাওয়ায় উড়ে চলল আর কোত্থেকে যেন নিকষ কালো মেঘের দল এসে গোটা আকাশটা ঢেকে ফেলল। বুঝলাম, কালবৈশাখীর ঝড় উঠবে। গ্রামের ফাঁকা মাঠে ঝড় যে কীরকম হয় তা শহরের এই ইট-কাঠের জঙ্গলে থেকে বোঝা সম্ভব নয়। যাঁরা দেখেছেন, তাঁরা আমার কথার সঙ্গে একমত হবেন।
“ ‘রজতদা, শিগগির চলো, দৌড়ও!’ আমি চেঁচালাম। সঙ্গে সঙ্গে ছুটতেও শুরু করলাম, কিন্তু একটু যেতে না যেতেই কীরকম সন্দেহ হওয়ায় পেছন ফিরে দেখি রজতদা আমার পেছন পেছন আসছে না, বরং উলটোদিকে কাছারিবাড়ির দিকে ছুটছে।
“ ‘ওদিকে কোথায় যাচ্ছ, রজতদা? এদিকে এসো।’ আমি চেঁচালাম। কিন্তু ততক্ষণে সোঁ সোঁ আওয়াজ করে ঝড় উঠতে শুরু করে দিয়েছে, রজতদাও আমার কথা শুনতে পেয়েছে বলে মনে হল না। বাধ্য হয়ে আমিও এবার উলটোমুখে দৌড়তে শুরু করলাম।
“ভরদুপুরে সন্ধের অন্ধকার, চারপাশে ধুলো উড়ছে, ঝড়ের আওয়াজ, তালগাছগুলো পাগলের মতো মাথা ঝাঁকাচ্ছে— সব মিলিয়ে আমার মনে হল মাঠটা কেমন যেন ছোটো হয়ে আসছে, যেন চারদিক থেকে আমাদের ঘিরে ফেলছে, আটকে ফেলছে। কথাটা মনে হতেই চরম যুক্তিবাদী আমারও গাটা ছমছম করে উঠল। ক্ষণেকের জন্যেও মনে হল, প্রাণ হাতে করে এ-মাঠ থেকে বেরোতে পারব তো? আমাদের জন্যে এসে রজতদাও বেঘোরে প্রাণ দেবে না তো? মার মুখটা মনে পড়ল।
“রজতদা আমার আগেই কাছারিবাড়িতে ঢুকে পড়েছে। আমি গিয়ে দেখলাম, দু-হাঁটুর মধ্যে মুখ গুঁজে রজতদা বসে, আমিও হাঁপাতে হাঁপাতে রজতদার কাছেই বসে পড়লাম।
“রজতদার গতিপ্রকৃতি আমার বিশেষ সুবিধের লাগল না। এরকম করে মুখ গুঁজে বসে আছে কেন? এত ভয় পাওয়ার ছেলে তো নয়! ‘রজতদা, কী হয়েছে? এরকম করে বসে আছ কেন? দেখো আমার দিকে।’ আমি বললাম।
“রজতদা কোনও উত্তর দিল না, শুধু বাঁকানো পিঠটা থরথর করে কেঁপে উঠল। আমি রজতদাকে ঠেলেঠুলেই ওঠাতে যাচ্ছিলাম, এমন সময় বাইরে থেকে কার কাতর আর্তনাদ ভেসে এল। কেউ যেন ‘বাঁচাও বাঁচাও’ বলে পরিত্রাহী চেঁচিয়ে উঠল। ঝড়ের আওয়াজের মধ্যেও গলাটা চেনা চেনা লাগল। আমি উঠতে যাচ্ছিলাম, রজতদা হাত ধরে টানল। ওর মুখ কিন্তু তখনও ওরকমই দু-হাঁটুর মাঝে গোঁজা। কাছেই কোথাও বিকট কড়কড় শব্দে বাজ পড়ল। আমার এবার বেশ ভয়ই করতে লাগল। একদিকে কালবৈশাখীর তাণ্ডব, অন্যদিকে রজতদার এরকম পিকিউলিয়ার ব্যবহার। আবার সেই চিৎকার, কেউ যেন ‘ছেড়ে দাও, ছেড়ে দাও’ বলে চেঁচিয়ে উঠল।
“কপাল ভালো বলতে হবে, ঝড়টা বেশিক্ষণ চলল না। হাওয়ার দাপট একটু কমতেই আমি বাইরে বেরিয়ে এলাম। আকাশে মেঘ থাকলেও আগের মতো নয়, আলো ফুটেছে। তাতেই দেখলাম, ত্রিসীমানায় কেউ কোথাও নেই। বুঝলাম, ঝড়ের আওয়াজ আর ছোটোবেলা থেকে শুনে আসা গল্প— এই দুইয়ের মিলমিশের ফলেই এসব শোনা। আসলে কিছুই হয়নি। মনে হল রজতদাও ভয়েই ওরকম করছে, গ্রামে কোনোদিন ঝড়-টড় দেখেনি তো। বেরোতে হলে এক্ষুনি বেরোতে হবে, যে-কোনো সময় আবার ঝড়বৃষ্টি শুরু হতে পারে। রজতদাকে ডেকে নিয়ে আসি, এই ভেবে যেই পেছনে ঘুরেছি, দেখি আমার পাশ দিয়ে সাঁ করে তিরবেগে রজতদা বেরিয়ে গেল। যেন প্রাণপণে পালাচ্ছে। অগত্যা আমিও পেছন পেছন দৌড়লাম। স্টেশন ওখান থেকে খুব দূরে ছিল না, পুরো রাস্তাটাই রজতদার সঙ্গে তাল রেখে কখনও ছুটে, কখনও হেঁটে আমাকে আসতে হয়েছিল। গোটা রাস্তায় রজতদা একটাই কথা বলল শুধু, ‘কী ভয়ংকর! ঝড়ের মধ্যে আমি মাঠে আটকে ছিলাম। ও-গাছটা যেন আমাকে গিলে খেতে আসছিল!’
“আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘সে কী কথা! তুমি তো আমার সঙ্গেই কাছারিবাড়ির ভেতরে ছিলে, মাঠে তো নয়।’
“রজতদা কোনও উত্তর দিল না। আমার খুব খারাপ লাগল। রজতদা আমাদের জন্যে অনেক করেছে, এখানে এসে তার কিছু হলে আমার গ্লানির সীমা থাকবে না। এখন স্বীকার করতে বাধা নেই, আমার প্রবল যুক্তিবাদী মনেও ফাটল ধরল। মনে হল, সবকিছুকে বোধ হয় ওরকম হেসে উড়িয়ে দেওয়া ঠিক নয়।
“ট্রেন ঢুকছে প্ল্যাটফর্মে, রজতদা আমার পাশেই দাঁড়িয়ে, তেমনই আতঙ্কিত মুখে, হঠাৎ ঠং করে একটা আওয়াজ। আমাদের দুজনের ঠিক মাঝখানে। আমরা দুজনেই তাকালাম। মাটিতে পড়ে আকবরি মোহর! রজতদা বিস্ফারিত চোখে সেদিকে তাকিয়ে বলল, ‘এটা, এটা তো আমি...’ কথা আর শেষ করল না, দৌড়ে সামনে এগিয়ে একটা কামরায় লাফিয়ে উঠে পড়ল।
“আমি তখনও মোহরটা হাতে নিয়ে হতবুদ্ধির মতো দাঁড়িয়ে। ট্রেনের হুইসিলে সংবিৎ ফিরল। এই ট্রেন ছেড়ে দিলে অনেকক্ষণ বসে থাকতে হবে। চট করে সামনের কামরায় উঠে পড়লাম। তখন বয়স অল্প ছিল, চলন্ত ট্রেনে চড়াটা কোনও ব্যাপার ছিল না।
“বাড়ি ফিরে মাকে মার আকবরি মোহর দিলাম, সব বললাম। মারও আমার মতোই অবস্থা। কী যে বলবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না।”
“রজতদার সঙ্গে আর দেখা হয়েছিল?” সুখেন্দু জানতে চাইলেন, “এ-ঘটনার পরে আপনাদের সামনে আসাটা খুবই অস্বস্তিকর ওঁর পক্ষে।”
“ঠিকই বলেছেন। আর কি দেখা হয়? মাও বারণ করেছিলেন। আমি অবশ্য মাকে না জানিয়ে একবার ওদের বাড়িতে গেছিলাম। কিন্তু দেখা হয়নি। তার কিছুদিন পরে ও-তল্লাট ছেড়ে চলেই গেল। এ-ঘটনার সবচেয়ে ভালো দিক কী বলুন তো?” কালীপদ সকলের দিকে তাকালেন। তারপর নিজেই বললেন, “মার অনেক পরিবর্তন হল। একদিনে নয়, আস্তে আস্তে, কিন্তু হল। যে অদ্ভুত ধারণা মনের মধ্যে ঢুকে বসে ছিল, তা আর রইল না। আকবরি মোহরের ওপর বিশ্বাস চলে গেছিল তা বলব না, তবে সেরকম বাড়াবাড়ি কিছু আর ছিল না।”
“সেই মোহর এখনও আছে নিশ্চয়ই?” প্রদীপ জিজ্ঞেস করলেন।
“আছে। তবে আমি আর তাকে বাড়িতে রাখার সাহস করিনি। অ্যান্টিক জিনিস। মা চলে যাওয়ার পরে ব্যাংকের লকারে রেখে দিয়েছি।” বললেন কালীপদ।
“আর কাছারিবাড়ির মাঠ? সেটার কী গতি হল? এখনও ওরকমই পড়ে আছে?” সমরেশের প্রশ্ন।
“হ্যাঁ, ও-মাঠ এখনও ওরকমই পড়ে আছে, থাকবেও মনে হয়। আমি এ-ঘটনার পরেও গেছি কয়েকবার, আলাদা করে কিছু মনে হয়নি। বিক্রির চেষ্টা, সত্যি কথা বলতে আমিই করিনি। থাক না, একটা মাঠ আছে, গ্রামেগঞ্জেও তো আজকাল সব জমিজায়গা ভরেই যাচ্ছে। এবার বলুন, আপনারা কে কী বলবেন।”
“সত্যিই কিছু বলার নেই। কতরকম ঘটনাই যে ঘটে, আমরা আর কতটুকু জানি!” সুখেন্দু বললেন, “তবে প্রদীপবাবুর কী মত তা অবশ্য জানি না।”
প্রদীপের মুখটা তেতো গেলার মতো হল।— “কী আবার মত! আপনারা জানেন না নাকি মশাই? খুব ভালোই জানেন, কিন্তু আমি মুখ ফুটে কিছু বললেই তো হাজার কথা শোনাতে আসবেন। আমার না কিছু বলার দরকার আছে, না কিছু শোনার। গপ্পে গপ্পে অনেক সন্ধে হয়ে গেল, এবার উঠি, আবার কাল আসা যাবে না-হয়।”
প্রদীপ আর দাঁড়ালেন না, হনহন করে চলে গেলেন। অন্যরাও হাসতে হাসতে বাড়ির পথ ধরলেন।
দু-দিন নিম্নচাপের বৃষ্টির জন্যে আড্ডা বসেনি। আজ আকাশ পরিষ্কার হয়েছে, বিকেল হতে না হতেই সুখেন্দু কালীপদর বাড়িতে এসে হাজির। অন্যরা তখনও কেউ আসেননি।
“কাণ্ড শুনবেন কালীপদদা? শুনলে হাঁ হয়ে যাবেন।” বিনা ভূমিকায় বললেন সুখেন্দু, “পরশুর ওই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টির মধ্যেই প্রদীপবাবু মিত্রদার বাড়িতে গেছিলেন। বই নিতে। যেমন তেমন বই নয়, ভূতের গল্পের বই। বলেছেন, ‘সুখেন্দুবাবু যে বইটা নিয়ে গেছিলেন, সেটা আমাকে পড়তে দেবেন? খুব প্রশংসা শুনলাম সুখেন্দুবাবুর কাছে। আমি যত্ন করেই পড়ব, আপনার বই নষ্ট হবে না। এরকম বৃষ্টিবাদলার দিনে ভূতের গপ্পো-টপ্পো বেশ জমে কিনা, তাই চলে এলাম। এতকাল এক পাড়ায় আছি, এটুকু তো আবদার করতেই পারি, কী বলেন?’
“মিত্রদা খুবই অবাক হয়েছেন, তবে দিয়েছেন বইটা। প্রদীপবাবু খুব আগ্রহ সহকারে নিয়ে গেছেন, খুব ভালো লাগছে পড়তে সে-কথা ফোনেও জানিয়েছেন। ভাবুন একবার! এও কি কিছু কম আশ্চর্যের?”
শুভাঞ্জন ব্যানার্জী ▪ প্রবাহনীল দাস
লিও তলস্তয় ▪ নলিনাক্ষ ভট্টাচার্য
তাপস মৌলিক ▪ অংশু পাণিগ্রাহী ▪ বাণীব্রত গোস্বামী ▪অরিন্দম ঘোষ ▪ রঞ্জন দাশগুপ্ত ▪ সিদ্ধার্থ দাশগুপ্ত ▪শাশ্বত কর ▪ রাজীব রায় গোস্বামী ▪ সায়নদীপা পলমল ▪ প্রদীপ কুমার দাস
বদ্রীনাথ পাল ▪ তাপস বাগ ▪ বসন্ত পরামানিক ▪ গোবিন্দ মোদক ▪ সুব্রত দাস ▪ অর্ণব ভট্টাচার্য ▪ সুজাতা চ্যাটার্জী ▪ মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় দাস ▪ মধুমিতা ভট্টাচার্য ▪ ড. রমলা মুখার্জী ▪ সনৎকুমার ব্যানার্জী ▪ বিদ্যুৎ মিশ্র ▪ রাজর্ষি মণ্ডল ▪ রূপালী মুখোপাধ্যায় ▪ শক্তিপদ পণ্ডিত ▪ শম্ভু সরকার ▪ সুব্রত চৌধুরী
অদিতি ভট্টাচার্য ▪ দীপঙ্কর চৌধুরী ▪ মৌসুমী রায় ▪ সবিতা রায় বিশ্বাস ▪ সহেলী রায় ▪ কিশোর ঘোষাল
অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায় ▪ অরিন্দম দেবনাথ ▪ কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায় ▪ দীপক দাস ▪ ড. উৎপল অধিকারী ▪ চন্দ্রানী মজুমদার
সায়ন্তনী পলমল ঘোষ ▪ সোমা দে ▪ শংকর লাল সরকার ▪ সন্দীপন সাহা
অলংকরণ
মায়াসখা নন্দী ▪ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ▪ একপর্ণিকা ক্রিয়েটিভস