বড়ো গল্প
FREE SHIPPING IN INDIA
বড়ো গল্প
উঁচু পাহাড়ের মাথায় হিমশীতল পাথরের গুহার ধারে অলৌকিক শক্তিধর পাখি সিমুর্গ বাস করেন। যুগযুগান্ত ধরে। তিনি সেরা প্রাজ্ঞ, তিনি অমিত শক্তিশালী। তাঁর সৃষ্টি ও বিনাশ একই সঙ্গে অর্থাৎ, তাঁর বিনাশ নেই। তিনিই আমার পিতা, তিনিই আমার মাতা। আমি রাজপুত্র জাল। আমি আসলে মহান সিমুর্গের স্নেহে পালিত মনুষ্য-শাবক। তিনি আমাকে বাঁচিয়েছিলেন।
মৌসুমী রায়
আমার নাম জলেশ্বর জানা। মালদার একটা সরকারি হায়ার সেকেন্ডারি ইস্কুলের শিক্ষকতা থেকে দু-বছর হল অবসর নিয়েছি। ইতিহাসের শিক্ষক ছিলাম। ইতিহাস বিষয়টা আমার এতটাই প্রিয় যে আমি শয়নে স্বপনে ইতিহাসে বুঁদ হয়ে থাকি। মালদার ইস্কুলে থাকাকালীন মাঝে-মাঝেই চলে যেতাম বাংলার সুলতানি আমলের ভাঙাচোরা প্রাসাদ, মসজিদ দেখতে। যেতাম পালযুগের রক্তমৃত্তিকা মহাবিহারের ধ্বংসস্তূপে। বসে বসে কল্পনা করতাম কত কিছু। কিন্তু হঠাৎ করে আমার জীবনে ম্যাজিকের মতন কী যে সব ঘটে গেল, তার কথাই বলতে বসেছি।
অবসর নিয়ে কান্দিতে গ্রামের বাড়িতে ফিরে আসার পরে জীবনযাপন কেমন হবে সেই নিয়ে চিন্তায় ছিলাম। বিয়ে-থা করিনি, পৈতৃক বাড়ি, ভালো পেনশন পাই। ছোটো ভাগনের পরামর্শে ঐতিহাসিক জায়গা বেড়ানো শুরু করলাম, সে-ই সব ব্যবস্থা করে দিল। প্রথমে গেলাম মিশর। তারপরে এ-বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে আমার যাবার ব্যবস্থা হল উজবেকিস্তানে। ভাগনেই বুদ্ধি দিল, ব্যবস্থাও করে দিল। বলল, “দেশটা বিদেশ হলেও কাছেই, বেশ নিরাপদ আর সস্তা। তার চাইতে ভালো ব্যাপার হল, আমার এক বন্ধু জামাল এখন তাশখন্দের ভারতীয় দূতাবাসে আছে। ও-ই সব ব্যবস্থা করে দেবে। মামা ভাবো, তুমি সমরখন্দ আর বোখারা দেখতে পাবে! মধ্য এশিয়া, রেশম পথ, তৈমুরলং...”
“সে তো আমার স্বপ্ন রে। একা একা পারব তো?”
“আরে, জামাল তো আছে!”
“ইরানে গণ্ডগোল হতে পারে—পারস্য কবে যে যেতে পারব।”
“সব আস্তে আস্তে হবে, মামা।”
উজবেকিস্তান এয়ারলাইনসের প্লেনে করে একদিন বিকেলবেলা তাশখন্দের এয়ারপোর্টে হাজির হলাম। সেই ইতিহাসের তাশখন্দ! মধ্যযুগ থেকে শুরু করে এই সেদিনও সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্গত তাশখন্দ। যেখানে ১৯২০ সালে মানবেন্দ্রনাথ রায়, অবনী মুখার্জির সাহায্যে ভারতীয় কম্যুনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা; যেখানে ১৯৬৬ সালে আমাদের প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রীর রহস্যময় মৃত্যু— সেখানে আমি পা দিয়েছি ভাবতেই গা শিউরে উঠছিল। নির্দেশ মতন ডলার ভাঙানো, স্থানীয় মোবাইলের সিম ও ইয়ানডেক্স কার্ড কিনে, মালপত্র নিয়ে নিশ্চিন্তে উজবেক ইমিগ্রেশনে লাইন দিয়েছি। সবাই আমাকে দেখছে। আমাকে অনেকেই দেখে বলে আমি অবাক হই না। ছোটোবেলায় হীনমন্যতায় ভুগতাম, এখন আর নয়। কারণ আমার গায়ের রঙ। আমার শ্বেতী আছে, মাথার চুল থেকে পায়ের পাতা অবধি আগাগোড়া ধবধবে সাদা— মানে যাকে অ্যালবিনো বলা যেতে পারে। তাই বরাবর আমাকে সবাই তাকিয়ে দেখে, ঘুরে ঘুরে দেখে, তাতে আমি এখন আর ঘাবড়াই না।
তাই লাইনে দাঁড়িয়ে আমি মোটেই অবাক হলাম না। কিন্তু যখন ইমিগ্রেশন অফিসার আমার কাগজপত্র পড়ে আমার দিকে অনেকক্ষণ হাঁ হয়ে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল, “জাল! ইউ আর জাল!” তখন দেখলাম পাশের কাউন্টারের অফিসার নড়েচড়ে আমার দিকে তাকাল, তারপর তাদের নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কীসব বলাবলি করল। আমার একটু অস্বস্তি হচ্ছিল, ভাবলাম এরা ঢুকতে দেবে তো? তাই জিজ্ঞেস করলাম, “এনি প্রবলেম, স্যর?”
তারা মাথা নেড়ে একগাল হেসে বলল, “নো। ইউ আর ওয়েলকাম টু উজবেকিস্তান।”
বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনের মধ্যে একজন মহা লম্বু যুবক আমাকে বেরোতে দেখেই আমার দিকে তড়বড় করে এগিয়ে এসে ভাঙা ভাঙা ইংরিজিতে বলল, “জাল স্যর, গুড ইভনিং। আমি কামাল। জামাল স্যর আমাকে পাঠিয়েছেন।”
আমি এবারে নিশ্চিন্তে তাশখন্দের রাস্তায় পা রাখলাম। কিন্তু তখন কি ভেবেছিলাম, এর পরে কী কী হতে যাচ্ছে!
দিল্লিতে জামালি-কামালির গল্প শুনেছিলাম। উজবেকিস্তানে এসে আমার জামালি-কামালি জুটে গেল। তাদের ব্যবস্থাপনা আর আতিথেয়তায় আমি বেশ মুগ্ধ হয়ে গেছিলাম। জামালের সঙ্গে দেখা হয়নি, কারণ সে একটা কূটনৈতিক কাজে কিরঘিজস্তান গেছিল। কিন্তু সব ব্যবস্থা করে গেছিল।
এখানকার গাড়ির ব্যবস্থাটা আমি বুঝে গেছিলাম। আমাদের ওখানকার ওলা-উবেরের মতন। তবে বেশ সস্তা। ড্রাইভারেরা বেশ ভদ্র, রাস্তাঘাট জানে আর চিটিংবাজির কোনও ব্যাপার নেই এখানে। কামাল আমাকে কয়েকটা উজবেকি ও রাশিয়ান শব্দ শিখিয়ে দিল। এখানে ইংরিজি কেউ বোঝে না, শুধু উজবেকি আর রাশিয়ান। তাছাড়া ফোনে অনুবাদের অ্যাপ লাগিয়ে দিল। ওর সামনাসামনি অভ্যাস করেও নিলাম। নতুন টেকনোলজি শিখতে আমার খুব ভালো লাগে।
তাশখন্দে দেখার তো অনেক কিছুই আছে। ঐতিহাসিক সৌধ অজস্র। সেই প্রায় ছ’-সাতশো বছর আগেকার বানানো সব বিশাল বিশাল সৌধ; তাদের মধ্যে প্রাসাদের চাইতে বেশি রয়ে গেছে সমাধি, মসজিদ, মাদ্রাসা, মাজার আর দুর্গ। তাদের গায়ে পারসিক রীতিতে বানানো অপূর্ব সব টাইলের কাজ। প্রধানত বেলেমাটির রঙের ওপরে নীল রঙের নানা শেডের নানা নকশার টাইল, কালো ও সাদা নকশা বা ক্যালিগ্রাফি। কিন্তু সামনাসামনি দেখে তো সব নতুন নতুন লাগল। কামাল বলল, সোভিয়েত জমানায় সব সৌধের পুনর্জন্ম হয়েছে। সারিয়ে-সুরিয়ে সব প্রায় নতুন ঝকঝকে করে তুলেছে। নতুন জমানা পুরোনো জমানার সবকিছু ধ্বংসই করে শুনেছি, এখানে তার উলটো ইতিহাস শুনে বেশ ভালো লাগল। সবাই যদি এমন হত। তাহলে আজও বামিয়ানের বুদ্ধমূর্তি থাকত, নালন্দা মহাবিহার থাকত...
সোভিয়েত জমানায় বানানো তাশখন্দের পাতাল রেলে চড়ে বেশ রোমাঞ্চ হচ্ছিল। এখানে পাতাল রেল এসেছে আমাদের অনেক আগে। ভিড়, তবুও লোকজন ভদ্র। স্টেশনগুলো বেশ শিল্পসম্মত। শুনেছিলাম মস্কোর পাতাল রেলের স্টেশনগুলো নাকি এক-একটা আর্ট গ্যালারি। এখানে তার ছিঁটেফোঁটা দেখে নিলাম। আসলে তাশখন্দ একটি সোভিয়েত মডেল শহর। বিশাল বিশাল রাস্তা, গাছে ঢাকা পার্ক, ঝিল, এক ধাঁচের বানানো বাড়িঘর। সবই বেশ বড়োসড়ো। কামালের সঙ্গে তিনদিন ধরে অনেক জায়গাই দেখে এলাম। বেশ ধীরেসুস্থে, সময় নিয়ে নিয়ে দেখলাম। ফেরার পথে তাশখন্দ হয়েই ফিরব, তখন জামালের সঙ্গে দেখা করে যাব।
মজার জায়গা হল কোকলদাস মাদ্রাসা। অতীব দর্শনীয় স্থাপত্য। শুনলাম, সোভিয়েত জমানায় একে ‘নাস্তিকতার মিউজিয়াম’ বানানো হয়েছিল। ব্যাপারটা বেশ কৌতূহল জাগাল। রাশিয়ানরা নাকি কোথাও কোথাও এরকম মিউজিয়াম বানিয়েছিল, এখন সে-সব নেই। আর তাশখন্দের কোকলদাস মাদ্রাসা অনেক ভোল বদলে ফের সেই মাদ্রাসাই হয়ে গেছে। তবে হেরিটেজ মাদ্রাসা। দূরদূরান্ত থেকে মানুষজন দেখতে আসে। তা সে বেশ আহামরি দেখার মতনই। পাশেই চোরসু বাজার। কামালি জোর করেই নিয়ে গেল আমাকে। সেখানের কুমড়ো আর মুলোর সাইজ দেখে তো আমার চোখ ছানাবড়া!
আমার ঘোরাফেরা করতে খুব একটা সমস্যা হচ্ছিল না। এর পরে যাব সমরখন্দ, তৈমুরের রাজধানী। সেখানে থাকার জায়গা বুক করা আছে। ট্যাক্সি তো আছেই, দরকার হলে গাইডের ব্যবস্থা হয়ে যাবে। অতএব জলেশ্বর জানার একক যাত্রার শুরু।
ভোরবেলা কামালি তাশখন্দের রেল স্টেশন থেকে আমাকে অ্যাফ্রোসিয়াব নামে একখানা অসাধারণ রেলকারে চাপিয়ে দিয়ে গেল।
সমরখন্দ শহরটার খানিকটা অংশ কিন্তু মধ্যযুগীয় ঘরানা বজায় রেখেছে। সেরকম এক জায়গায় একটি মনোরম আস্তানা জুটল আমার। রৌদ্রালোকিত চত্বর, রঙিন ফুলের লতা আর তরুণ উজবেক স্বামী-স্ত্রীর চালানো ছিমছাম হোটেলে গিয়ে বেশ ভালো লাগল। তারাই আমাকে ম্যাপে শহরের নকশা বুঝিয়ে ভাঙা ইংরিজিতে মোটামুটি একটা আইডিয়া দিয়ে দিল।
ছোটোবেলা যাত্রা দেখেছিলাম ‘রক্তলোলুপ তৈমুর’। ইতিহাসের সিলেবাস তৈমুরকে নিষ্ঠুর এক পিশাচ হিসাবেই দেখিয়েছে। কিন্তু এখানে তৈমুর জাতীয় হিরো। তাঁর সাম্রাজ্য ছিল চিনের সীমানা থেকে ইউরোপের সীমানায়, দক্ষিণে বোগদাদ থেকে দক্ষিণ-পূর্বে আফগানিস্তান ও ভারত ছুঁইছুঁই। শুধু যুদ্ধ জয় আর বিশাল সাম্রাজ্য তৈরি নয়, তাঁর সুশাসন এবং সম্পদ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যাচর্চা, বিজ্ঞানচর্চা, শিল্পকলা, স্থাপত্য, সাহিত্য—সব মিলিয়ে সেই মধ্যযুগীয় পরিবেশেই জন্ম হয়েছিল তৈমুরিদ রেনেসাঁর, কয়েকশো বছর টিকেও ছিল। তার অবশিষ্ট এখনও দেখে চলেছি, বুঝে চলেছি।
‘গুর-ই-তৈমুর’-এ তৈমুর লং ও তাঁর বংশধরদের সমাধিস্থলের স্থাপত্য ও শিল্পকলা দেখে আমার তো চোখ ট্যাঁরা হয়ে গেল। তারপরে একে একে তাঁর বেগমের নামের মসজিদ, হজরত খিজিরের মাজার এবং শাহি জিন্দা দেখে আমার চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছিল। নীল টাইলের এত সৌন্দর্য দু-চোখ ভরে দেখছিলাম, তার সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাস মিলিয়ে নিচ্ছিলাম। ইতিহাসের শহর, মানুষজন আন্তরিক, রাস্তাঘাট ভালো, ভালো খাবারদাবার— আর কী চাই?
উলুঘ বেগের মিউজিয়াম আর তাঁর মানমন্দির পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধে হয়ে গেল। সেই নির্জন সাজানো গোছানো সৌধের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে তৈমুর বংশের আর এক প্রসিদ্ধ সন্তান বাবরের স্মৃতিকথা ‘বাবরনামা’-তে লেখা এই মানমন্দিরের বর্ণনা মনে পড়ছিল। উলুঘ বেগ ছিলেন তৈমুরের নাতি। সর্ববিদ্যায় পারদর্শী এই মানুষটির আবার গণিতে ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে ছিল অসাধারণ জ্ঞান। তাঁর সময়ে সমরখন্দ বিজ্ঞানচর্চার এক অন্যতম পীঠস্থান হয়ে ওঠে। উলুঘ বেগের নিজের লেখা নক্ষত্রবিদ্যার বই আজও সমাদৃত হয়।
সে যাই হোক, মনের আনন্দে তারা দেখার ভাঙাচোরা দেয়াল আর মিউজিয়ামটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে যখন বেরিয়েছি, তখন কেউ কোত্থাও নেই। তারাভরা আকাশের নীচে বসে কত কী ভাবনা মনে এল। সঙ্গে খানিক অস্বস্তিও হল। বিদেশ-বিভূঁইয়ের এই নির্জন জায়গায় একা বসে, যদি কিছু বিপদে পড়ি? উঠতে যাচ্ছি, মিউজিয়ামের গেট বন্ধ করে বয়স্ক গেটকিপার দেখি আমার কাছে এগিয়ে আসছে। আমি সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করতেই সে দেখি উত্তেজিত হয়ে ‘আসলমু আলয়কুম’ বলে উজবেক ভাষায় হড়বড় করে কীসব বলে যাচ্ছে। শুধু একটাই কথা শুনতে পাচ্ছি—জাল? জাল?
আমি আর না দাঁড়িয়ে নেমে এসে ট্যাক্সি ধরে সোজা হোটেলে ফিরে এলাম।
পরের দিন আরও কয়েকটা দ্রষ্টব্য জায়গা দেখে এবং ফের আরও কয়েকজনের বিস্ফারিত চোখের মুখোমুখি হয়ে সন্ধেবেলা হোটেলে ফিরে মালিককে জিজ্ঞেস করলাম, সবাই আমাকে দেখে ‘জাল’ বলছে কেন। ছেলেটি তখন ভাঙা ভাঙা ইংরিজিতে বলল, “আমিও প্রথমে তোমাকে দেখে আর তোমার নাম দেখে বেশ চমকে উঠেছিলাম। আসলে পারস্যের এক কিংবদন্তির হিরো ছিল, তার নাম রাজপুত্র জাল। শাহনামা বইতে তার কথা রয়েছে। প্রাচীন পারস্যের সিস্তান দেশের রাজা, আর এক কিংবদন্তি রুস্তমের বাবা। কিছু মনে কোরো না, সে এই তোমারই মতন পুরোপুরি অ্যালবিনো ছিল। রাজামশাই তাকে ছোটোবেলাতেই পাহাড়ের মাথায় ফেলে দিয়ে এসেছিল। সে মরে যেতেই পারত, কিন্তু তাকে বাঁচিয়ে দেয় রূপকথার অলৌকিক সিমুর্গ পাখি। সিমুর্গ অনেকটা আমাদের হুমা পাখি বা সাহেবদের ফিনিক্স পাখির মতন। দ্যাখোনি, তাশখন্দ এয়ারপোর্টে হুমা পাখির ছবি? হুমা আমাদের জাতীয় প্রতীক। পারস্যের সিমুর্গ আর আমাদের হুমা এক টাইপের পাখি। তাকে নিয়ে কত গল্প-কাহিনি।”
“তারপর?”
“রাজকুমার জালকে সেই পাখিই মায়ের স্নেহে পালন করে। আবার প্রকৃত গুরুর মতন তাকে বিদ্যাবুদ্ধি আর শৌর্যে তুখোড় করে তোলে। বড়ো হয়ে যখন রাজপুত্র জাল বেরিয়ে পড়ে মানব-সংসারে, তখন সেই অলৌকিক পাখি তার পালক উপহার দিয়ে বলে, ‘যখন প্রয়োজন পড়বে, এই পালক পুড়িয়ে আমাকে স্মরণ করবে।’ তারপরে রাজপুত্র জালের আরও কত কী কাহিনি আছে! মধ্য এশিয়া, পশ্চিম এশিয়া তো গল্পগাথার দেশ। তবে সবাই এটা মনে করে যে সিমুর্গ পাখি অনেক কিছুই অসাধ্যসাধন করতে পারে, আর তাকে আহ্বান করতে পারে একমাত্র রাজপুত্র জাল।”
গল্প শেষ করে ছেলেটি আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
আমি হেসে ফেললাম।— “আমি এক আধবুড়ো বিদেশি, আমাকে রাজপুত্র জালের সঙ্গে…”
সে বলল, “তুমি জানো না কীসের থেকে কী না হতে পারে!”
এর পরের গন্তব্য বোখারা।
সেই মার্কো পোলো থেকে অরেলস্টাইন— কে না বলেছেন রেশমপথের প্রাণকেন্দ্র বোখারার কথা! আমি উজবেকিস্তানে আসবার আগেও অনেক বইপত্র পড়ে এসেছি, ফের ট্রেনে বসে নোট বইয়ের পাতা ওলটাতে ওলটাতে বোখারার ইতিহাস পড়া শুরু করলাম। সেখানে অনেক কিছু দেখার আছে। বোখারার পরে আমার যাবার কথা খিভা, একদা খোয়ারিজম রাজ্যের অন্যতম মরু শহর খিভা। সেখানেও দূরপাল্লার ট্রেনে চেপে যাব। পথে পড়বে কিজিলকুম মরুভূমি আর আমু দরিয়া নদী— ভাবতেই শিহরন হচ্ছিল।
বোখারাতে গিয়ে আমার খুব ইচ্ছা বাহা-আল-দিন নকশবন্দির মাজার দেখতে যাবার। সেটা নাকি শহর থেকে খানিকটা দূরে, কিন্তু তার আলাদা মহিমা আছে। সুফি সাধক বাহা-আল-দিন ‘নকশবন্দি’ ধারার জনক, তাঁর অজস্র অনুগামী। তাঁর মাজারের শান্ত সমাহিত রূপ আর দেয়ালের টাইলের কাজ নাকি দেখার মতন।
বোখারায় পৌঁছতে পৌঁছতে বিকেল হয়ে গেল। ছোট্ট হোটেলখানা শহরের একটু ভেতর দিকে, কিন্তু পৌঁছে ব্যবস্থাপনা দেখে খুশি হলাম। এখানের সব হোটেলই খুব পরিষ্কার, লোকজনের আচার-ব্যবহার অত্যন্ত শিষ্ট।
মালিকমশাই যেন আমার জন্যই বসে ছিলেন। আমার চেহারা দেখে চমকে ওঠেননি, যেন জানতেন এরকম কেউ হবে। হয়তো হোটেল বুকিংয়ের সময় পাসপোর্টে আমার ছবি দেখেছেন। তাঁর চেহারা উজবেকদের মতন নয় মোটেই। আলাপ হলে জানলাম, তিনি ইরানের অর্থাৎ প্রাচীন পারস্যের মানুষ। নতুন হোটেল খুলেছেন, নাম দিয়েছেন ‘খুর্জা স্টুডিও’। হোটেলের নামডাক হয়েছে, কিন্তু এখন খালি। একাই থাকেন, পরিবার রয়েছে আন্দিজানে।
এখানে থাকার সঙ্গে সকালের প্রাতরাশ দেবার প্রথা। রাতে কী খাওয়া যেতে পারে বলাতে, তিনি জানালেন যে অর্ডার দিয়ে খাবার আনাতে পারি, নইলে সবচাইতে ভালো হয় যদি লাবি হাউজ কমপ্লেক্সে চলে যাই। লাবি হাউজটা কী সেটা জানতে চাওয়ায় তিনি আমাকে বোখারার সমস্ত দ্রষ্টব্য জায়গার একখানা ম্যাপ ধরিয়ে দিয়ে মুচকি হেসে বলেন, “আপনি ট্যাক্সি নিয়ে লাবি হাউজেই যান। আপনার কপাল ভালো থাকলে সেখানের সেরা খাবারের দোকানগুলোতে আপনার ডিনার জুটে যাবে।”
যদিও খুব ক্লান্ত লাগছিল আজ, তবুও খিদে বলে কথা। গাড়ি এল। এখানকার ড্রাইভারেরা বেশি কথা বলে না, বললেও তা বোঝা মুশকিল। তারাও আমার কথা বুঝবে না। আমার বরাবরের অভ্যাস জ্ঞানলাভের জন্য স্থানীয় সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জায়গাটাকে বোঝা। কিন্তু উজবেকিস্তানে এসে কোথাও সে-আশা পূর্ণ হয়নি। তবে এ-দেশ যাকে বলে ‘ট্যুরিস্ট-ফ্রেন্ডলি’ দেশ, তাই ঘোরাফেরা করতে এখনও অবধি অসুবিধা হয়নি।
গাড়ি চলেছে, একটু লম্বা রাস্তা। রাস্তা বেশ অন্ধকার। তাই ফোনে বাড়িতে কথা বলছিলাম। কিন্তু বলতে বলতে খেয়াল করলাম যে অনেকদূর চলে এসেছি। রাস্তা এখন অন্ধকার আঁকাবাঁকা গলি ধরেছে, দু-পাশে অন্ধকারের মধ্যে আমাদের কাশীর গলির মতন গায়ে গায়ে বাড়ি। একটু চিন্তায় পড়ে গেলাম। এ আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে রে? কোনও বিপদে পড়ব না তো?
বেশ খানিক এভাবে যাবার পরে আমাকে রাস্তায় নামিয়ে দিয়ে সামনের দিকে হাত দেখিয়ে ড্রাইভার বলল, “লাবি হাউজ।”
একটু দ্বিধা নিয়ে নেমে হেঁটে হেঁটে একটু এগোতেই দেখি দূরে বেশ কিছু গাড়ি আর লোকজন দাঁড়িয়ে, আর একটা আলোকিত তোরণদ্বার দেখা যাচ্ছে। বাইরে নির্জন অন্ধকার, শুধু ফটকের ভেতর থেকে আলো আর আওয়াজ টের পাওয়া যাচ্ছে।
ফটক দিয়ে ঢুকতেই পৌঁছে গেলাম আরব্য রজনীর গল্পে।
মাইল খানেক জুড়ে পাথরের চত্বর, মাঝে মাঝে পুকুর আর অজস্র সৌধ। নানাদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে অজস্র দোকান আর খাবারের জায়গা। বিচিত্র নকশাকাটা রঙিন-সব ডোমের ঘেরাটোপে মৃদু আলোর বাহার, তারের বাজনার আওয়াজ, কত বৈচিত্র্যের আর রঙের পশরা সাজানো চারদিকে, দোকানি আর খদ্দের, বিদেশি ভ্রমণকারী, হইচই আর জমজমাট আনন্দের আসর।
আমার পুরো ব্যাপারটাই স্বপ্নের ঘোরে দেখা মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, এ যেন রূপকথার জায়গা যা রাত হলেই জেগে ওঠে অথবা জায়গাটা আসলে সত্যি নেই।
আশ মিটিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি, চারদিকের রূপ-রস-বর্ণ উপভোগ করছি— যেন হঠাৎ করে মধ্যযুগের মধ্যে সেঁধিয়ে গেছি। গায়ে চিমটি কেটে দেখলাম একবার, তারপর এক দোকানে চায়ের গেলাস নিয়ে বসলাম। সেখানে দলবল নিয়ে উজবেকি গায়কেরা বলিউডের গান গাইচ্ছিল বলে বিশ্বাস হল যে নাহ্, ব্যাপারটা সত্যি। লাবি হাউজ সত্যি!
চা আর সোমসা খেয়ে একটু চাঙ্গা হয়ে ঘুরতে বেরিয়েছি, ভাবছি বাড়ির লোকেদের জন্য এই বেলা কিছু কিনি, তখন খেয়াল করলাম, কয়েকজন আমার পিছু নিয়েছে। যেদিকে যাচ্ছি না কেন কে বা কারা যেন সঙ্গে সঙ্গে যাচ্ছে। কী রে বাবা! একটু চিন্তায় পড়লাম। রাতবিরেতে একা বেরিয়েছি। যদিও জায়গাটা রূপকথার গল্পের মতন নাটকীয়, তবু একসময় তো দোকানে দরজা পড়বে, শুনশান হবে পথঘাট (যদি সত্যি সত্যি হয়)। কী করব ভাবছি, হঠাৎ সামনে দেখি মস্ত বড়ো পুতুলনাচের পুতুলের দোকান। বোর্ডে লেখা, ‘শাহেনশাহ্ সিকন্দর দ্য গ্রেট, পারস্যের জাদু পুতুলওয়ালা’। কৌতূহলে ঢুকেই পড়লাম। চারদিকে শুধু হাতে বানানো পুতুল, তাদের বিচিত্র মুখ, সাজ, রঙ, বেশবাস। সবাই এক-একটা গল্পের চরিত্র। আর তাদের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন পেল্লায় এক গোঁফ মুখে, আলখাল্লা পরে স্বয়ং কারাব্বাস বারাব্বাস… না, শাহেনশাহ্ সিকন্দর পুতুলওয়ালা, বোখারার নামকরা পুতুল নাচিয়ে ও পুতুল কারিগর। ভাবছি, যেন পুতুলনাচের মধ্যে ঢুকে গেছি, সব যেন জীবন্ত। আর হো হো করে হাসতে হাসতে শাহেনশাহ্ সিকন্দর এক পারস্য সুন্দরীর সঙ্গে হাত-পা নেড়ে গল্প করছে। ভাষা বুঝি না, কিন্তু কিছু কিছু ফার্সি তো আমাদের ভাষাতেও রয়েছে।
দিব্যি তাদের গল্প চলছিল, আমি আগ বাড়িয়ে এক ডাকাত-পুতুলের মুখের কাছে মুখ বাড়িয়ে তার অনবদ্য মুখ ভঙ্গিমা দেখছি, হঠাৎ শুনি—‘জাল!’ দেখলাম, শাহেনশাহ্ সিকন্দর আর পারস্য সুন্দরী আমার প্রায় গা ঘেঁষে এসে আমাকে চোখ গোল গোল করে দেখছে।
এরপরে পরিষ্কার ইংরিজিতে শুনলাম, “রাজার কুমার জালের আবির্ভাব ঘটেছে!”
এটা কি পুতুলনাচের কোনও ডায়ালগ? আমি কি কোনও কিসসা-কাহিনির মধ্যে ঢুকে পড়েছি? নিশ্চয়ই সেরকম কিছু ঘটেছে আমার অজান্তেই। আমার পিছু যারা নিয়েছিল, তারা নিঃশব্দে দোকানে ঢুকে আমাকে ঘিরে ফেলেছে। পারস্য সুন্দরী হাততালি দিয়ে এক পাক নেচে উঠেছে। চারপাশে টুং টাং বাজনা বেজে উঠেছে। আর শাহেনশাহ্ সিকন্দর আমার কানের কাছে ফিসফিস করে বলছে, “মহামহিম, স্বাগত। যথাসময়ে তুমি এসে পড়েছ তাহলে! আমাদের পারস্যদেশের সামনে ঘোর বিপদ, আমাদের বাঁচাও, মহান পাখি সিমুর্গকে জাগাও। তুমি ছাড়া সে-কাজ কেউ পারবে না। আর সিমুর্গ না জাগলে আমাদের পারস্যদেশ ঘোর সংকটে পড়বে।”
শাহেনশাহের মোটা মোটা কালো ভুরুর তলায় বড়ো বড়ো সবুজ চোখে দেখি জল টলটল করছে।
“আমি তো কিছুই বুঝছি না, মহাশয়! আমি ভারত থেকে বেড়াতে আসা জলেশ্বর জানা। আমি রাজপুত্রও নই, সিমুর্গ পাখিও চিনি না।”
“মহান সিমুর্গ রয়েছেন কার্পেট কারখানার কোনও এক কার্পেটের নকশার ভেতরে। আপনিই একমাত্র তাকে খুঁজে পেয়ে আহ্বান করতে পারেন। আমাদের হাতে বেশি সময় নেই আর!” সুন্দরী বলে।
“কী জ্বালা রে বাবা!”
আমার মুখে বিরক্তি দেখে পুরো পুতুলঘরটা তখন জেগে ওঠে যেন। মানুষ আর জাদু-পুতুলেরা আমাকে ঘিরে কী এক মায়াবী সুরে গান গেয়ে ওঠে। আর সেই সুরের রেশে আমি যেন হাওয়ায় ভেসে ভেসে বাইরের চত্বরে বেরিয়ে পড়ি। আর বিরক্তি লাগছে না। মনের মধ্যে থেকে একটা আহ্বান এসেছে, সিমুর্গকে খুঁজে বের করতেই হবে, সিমুর্গকে…
উঁচু পাহাড়ের মাথায় হিমশীতল পাথরের গুহার ধারে অলৌকিক শক্তিধর পাখি সিমুর্গ বাস করেন। যুগযুগান্ত ধরে। তিনি সেরা প্রাজ্ঞ, তিনি অমিত শক্তিশালী। তাঁর সৃষ্টি ও বিনাশ একই সঙ্গে অর্থাৎ, তাঁর বিনাশ নেই। তিনিই আমার পিতা, তিনিই আমার মাতা। আমি রাজপুত্র জাল। আমি আসলে মহান সিমুর্গের স্নেহে পালিত মনুষ্য-শাবক। তিনি আমাকে বাঁচিয়েছিলেন।
সেই স্বপ্নমায়ার জগতে বিচরণ করতে করতে আমি, জলেশ্বর বা রাজকুমার জাল মহান সিমুর্গের সন্ধানে লাবি হাউজের প্রতিটা কার্পেট কারখানায় ঘুরতে থাকলাম সারা রাত ধরে। কারখানারা খোলা ছিল না বন্ধ ছিল মনে নেই, কারখানায় আমাকে ঢুকতে দিয়েছিল কি না আমার মনে নেই, শুধু যেন অনন্তকাল ধরে আমি কার্পেটের নকশা বিশ্লেষণ করে যাচ্ছি। আমার পেছন পেছন শাহেনশাহ্ সিকন্দর আর পারস্য সুন্দরী প্রায় নেই হয়ে ঘুরছে।
গতকাল ট্রেনের পরে পেটে খাবার জোটেনি। খেতে এসেছিলাম লাবি হাউজে, তাও জুটল না তেমন। এখন খিদে-তেষ্টা ভুলে মহান সিমুর্গকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। রাত শেষও হচ্ছে না, আমাদের সঙ্গে লাবি হাউজও জেগে রয়েছে। দোকানে কেনাবেচা চলছে। গানবাজনা, হই-হল্লা, আলোর রোশনাই— সবকিছু জেগে আছে।
সবচেয়ে মস্ত কার্পেট কারখানার সামনের দিকটা দোকান, সেখানে ঢুকি অবশেষে। তারা ফলাও করে সিমুর্গের নকশাকাটা কার্পেটের বিজ্ঞাপন দিয়েছে। সেখানে দেয়ালজোড়া কার্পেটের রোল, কিন্তু সবক’টা খুলে বের করে নকশা বোঝা কি মুখের কথা?
হুঁশ ছিল না তেমন, হঠাৎ দেয়ালজোড়া আয়নায় চোখ চলে গেল। আমার সাদা চেহারা তো সারাজীবন দেখে আসছি, আজ আয়নায় দেখি এক সাদাচুলো শ্বেতী হওয়া যুবক। পরনে গল্পকথার পোশাক, কোমরবন্ধে এক লম্বা ঝলমলে পালক। এ-ই কি তাহলে সিমুর্গের পালক? এত সুন্দর যার পালক, সে না জানি কেমন সুন্দর! এইবার সিমুর্গের চেহারা আর রঙবাহারের কিছুটা আন্দাজ পেলাম, আর সেই মতন নকশা দেখতে লাগলাম।
পেছন থেকে পারস্য সুন্দরী বলে উঠল, “বুঝলে এতক্ষণে, কেন তোমাকে দেখেই আমরা চিনতে পেরেছিলাম? এই মায়া আয়নায় তুমি নিজেকে চিনতে পারলে অবশেষে। এবারে তাড়াতাড়ি করো।”
“তোমাদের এত তাড়া কীসের?”
“জানো না, আমাদের পারস্যদেশে যুদ্ধ বেধেছে, এক ভুঁইফোঁড় সাহেব বলেছে আমাদের অসাধারণ দেশটাকে শেষ করে দেবে? তা যুদ্ধ অনেক দেখেছি আমরা, এবারে হঠাৎ করে আরও বিপদ এসে গেছে। শাহেনশাহ্ সিকন্দর, তুমিই ভালো করে ইংরিজিতে ওঁকে বুঝিয়ে বলো না!”
শাহেনশাহ্ ভারী গলায় বলে, “গত মাসে পারস্যের মিনাব শহরে একটা মেয়েদের ইস্কুলে খেলা দেখাতে গেছিলাম, সে কী চমৎকার সব খুকুমণিরা! আমাদের পুতুলনাচ দেখে তারা পরের দিন পুতুলদের দেখতে এল আর জাদু-পুতুলদের সঙ্গে তাদের কী ভাবটাই জমেছিল, তাই না অনাহিতা?” একটু কেঁদে নিল শাহেনশাহ সিকন্দর।— “শুনলাম, কাল দুপুরে সেই ইস্কুলেই নাকি আকাশ থেকে বোমা ফেলবে। তাহলে তাদের কেউ একজনও বাঁচবে না গো।”
সিকন্দর হাউ হাউ করে কাঁদতে থাকে, আরও কারা যেন চারদিক থেকে ফোঁপাতে থাকে।
“তোমরা খবর পেলে কী করে?”
“পুতুলেরাই খবর এনে দিল। বাতাসে বাতাসে ওদের কাছে খবর পাঠিয়েছে সাগরপারের পুতুলেরা, জেনে গেছে পারস্যের পুতুলেরা আর আমার নাচঘরের পুতুলেরা। আর এমন সময় তুমিও, রাজার কুমার জাল আমার দোকানে ঢুকলে। তাই তো তোমাকে হাতজোড় করে অনুরোধ করছি যে তোমার সিমুর্গকে জাগাও, খুকুমণিদের বাঁচাও!”
চারদিকে বেজায় কান্নাকাটি শুরু হয়ে গেল। সিকন্দর আর সুন্দরী কাঁদে, পুতুলেরা কাঁদে, কারখানার বেবাক কর্মচারীরা কাঁদে।
আমার মাথার সমস্ত বুদ্ধি আর একাগ্রতাকে দিয়ে আমি এবারে মহান সিমুর্গকে খুঁজতে শুরু করলাম। খুঁজতে খুঁজতে কী করে যে সময় কেটে যাচ্ছিল, টের পাচ্ছিলাম না। সঙ্গীদের সবাইকে দোকান থেকে বের করে দিয়েছিলাম, কাজের সময় কি এত কান্নাকাটি ভালো লাগে?
মস্ত কারখানার গুদামে বেশ কিছু বাতিল কার্পেট পড়ে ছিল। খুঁজতে খুঁজতে সেখানে গেলাম। মাথা ঠান্ডা করে খোঁজ লাগালাম। অবশেষে এক ছাতা পড়া ছেঁড়াখোঁড়া প্রাচীন কার্পেট খুলে আমি তো হতবাক! এতক্ষণ ঘণ্টার পর ঘণ্টা শ-খানেক কার্পেটের রঙবাহার আর নকশার গোলকধাঁধায় চোখ গুলিয়ে গেছিল। কিন্তু এ যে অনন্য এক গালিচা! এর নকশা, রঙ সবই যে বোখারার সব গালিচাকে টেক্কা দেবে, তাতে সন্দেহ নেই। এই কার্পেট বোধ হয় স্বর্গের কোনও শিল্পীর সৃষ্টি। এটাতে চেপেই কি আলাদিন উড়ে গেছিল? বা, খলিফা হারুন অল রশিদের রাজসভায় কি এটাই পাতা ছিল?
আমি স্তব্ধ হয়ে সব ভুলে নতজানু হয়ে সেই আশ্চর্য গালিচা দেখছিলাম। আর তখনই চোখে পড়ল, গালিচার একদম মাঝখানে নকশাজুড়ে রয়েছেন অলৌকিক সিমুর্গ পাখি—তাঁর রূপ আর রঙের বর্ণনা নাই-বা দিলাম। মাথাটা ঠান্ডা করে কোমর থেকে পালক বের করে মিলিয়ে নিলাম পাখির গায়ের পালকের রঙের সঙ্গে। মিলে গেল। বলতে গেলে, পালকটা জ্বলতে জ্বলতে মিলিয়ে গেল নকশার পাখির গায়ে। আর আমি হতভাগা শুধু হাতজোড় করে গুনগুন স্বরে অজানা ভাষায় প্রার্থনা করে গেলাম নকশার পাখির সামনে। আমার দু-চোখ ভেসে যাচ্ছে জলে, মনের ভেতর থেকে এক তীব্র আকুতি জেগে উঠে চারপাশের আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে যাচ্ছে।
জেগে উঠলেন অলৌকিক সিমুর্গ পাখি। ছোট্টটি তখনও, আস্তে করে পাখা ছড়ালেন। সে কী অলৌকিক রংবাজি! তারপরে চোখের সামনে আস্তে আস্তে উড়ে কারখানার অলিগলির মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে গেলেন বাইরে। ততক্ষণে তাঁর আকৃতি বেড়েই চলেছে। আমি দৌড়চ্ছি পেছন পেছন। পাখি বেরিয়ে গেলেন বাইরে। কারখানার বাইরের চত্বরে তখনও পুতুলদের কান্নাকাটি চলছে। আকাশে ভোরের আলো ফুটবে হয়তো। হালকা বেগুনি- গোলাপি অপার্থিব আলোয় ভরা আকাশে বিশাল ডানা দুটি ছড়িয়ে দিয়ে পশ্চিমে পারস্যদেশের পথে উড়াল দিলেন অতিকায় সিমুর্গ পাখি। তাঁর পালকের রঙে রামধনু ঝলকাচ্ছে। আমরা বোবা হয়ে সেই অলৌকিক দৃশ্য দেখছি।
আমি জলেশ্বর জানা আবার সেই ষাট বছরের মানুষটি হয়ে গেছি, ভারত থেকে বেড়াতে আসা ইতিহাসের মাস্টারমশাই। কিসসা-কাহিনির এই জটিল জাদুকরি খেলার মধ্যে ঢুকে পড়ে হতভম্ব হয়ে গেছি। কিন্তু খেয়াল হল যে আশেপাশে সব ভোঁ ভাঁ— কোথায় শাহেনশাহ্ সিকন্দর, কোথায় পুতুলের দল, কোথায়-বা পারস্য সুন্দরী অনাহিতা?
লাবি হাউজের চত্বরে বসে আছি। আকাশ পরিষ্কার হয়েছে। একটা একটা করে খাবারের দোকান খুলছে। কৌতূহলী দোকানি আমাকে ঘুম থেকে জেগে ওঠা মাতাল-টাতাল ভাবছে হয়তো। এদিকে পেট চোঁ চোঁ করছে খিদেয়।
পুকুরপাড়ে চা আর খাবার খেতে খেতে দেখলাম, আজ ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬। আমেরিকা আর ইজরায়েল মিলে ইরানে বোমা আর মিসাইল ছুড়ছে। অর্থাৎ, যুদ্ধ শুরু হয়েছে। দেশে ফিরে যেতে পারব তো? প্লেন-টেন বন্ধ হয়ে যাবে না তো? তখনই জামালির ফোন এল।— “জেঠু, ভালো আছেন তো? আমি তাশখন্দে ফিরে এসেছি। যুদ্ধ নিয়ে ভাববেন না, ফেরার প্লেন এখনও ঠিক আছে। আপনি বোখারা হয়ে খিভা ভালো করে ঘুরে তাশখন্দে ফিরে আসুন। এবারে তাশখন্দে এলে আমি আপনাকে এখানের রাশিয়ান সার্কাস দেখাব।”
খেয়েদেয়ে চেয়ারে প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। উজ্জ্বল রোদ, শীতের আমেজ। হঠাৎ দেখি হইহই লেগে গেছে এলাকায়। চত্বর জুড়ে উড়ে চলেছে রঙিন প্রজাপতির দল। কী সুন্দর! কী সুন্দর! চোখ রগড়ে দেখি প্রজাপতি নয়, ছোট্ট খুকুসোনাদের দল! তাদের কলকাকলিতে চারদিকে আনন্দ লহরি জেগেছে, রঙিন হয়ে উঠেছে চারপাশ। চত্বর ভরে হাসতে হাসতে ছুটছে প্রায় দেড়শো ইরানি স্কুলছাত্রী, সঙ্গে তাদের দিদিমণি-মাস্টারমশাইরা। ইন্দ্রজাল বটে!
শাহেনশাহ্ সিকন্দরের জাদু-পুতুলের দোকান খোলেনি এখনও। কিন্তু আমি জানি তারা সব বাতাসে খবর পেয়ে গেছে।
রাতে ভাগনে ফোন করে জানাল, ইরানের মিনাবে মেয়েদের ইস্কুল লক্ষ্য করে মিসাইল ছুড়েছিল আমেরিকা, কিন্তু তা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে। তবে প্রায় দেড়শো ছাত্রী গায়েব, সঙ্গে তাদের শিক্ষকেরাও।
আমি তো জানি তারা সবাই বোখারাতে বহাল তবিয়তেই আছে। যুদ্ধ থামলে তারা দেশে ফিরে যাবে। পুতুলেরা বাতাসে বাতাসে পারস্যের পুতুলদের কাছে তাদের ভালো থাকার খবর পাঠাবে।
আর অলৌকিক সিমুর্গ পাখি? ভস্ম থেকে জেগে উঠে এখন তিনি কোন গালিচার নকশায় প্রবেশ করেছেন কে জানে।
শুভাঞ্জন ব্যানার্জী ▪ প্রবাহনীল দাস
লিও তলস্তয় ▪ নলিনাক্ষ ভট্টাচার্য
তাপস মৌলিক ▪ অংশু পাণিগ্রাহী ▪ বাণীব্রত গোস্বামী ▪অরিন্দম ঘোষ ▪ রঞ্জন দাশগুপ্ত ▪ সিদ্ধার্থ দাশগুপ্ত ▪শাশ্বত কর ▪ রাজীব রায় গোস্বামী ▪ সায়নদীপা পলমল ▪ প্রদীপ কুমার দাস
বদ্রীনাথ পাল ▪ তাপস বাগ ▪ বসন্ত পরামানিক ▪ গোবিন্দ মোদক ▪ সুব্রত দাস ▪ অর্ণব ভট্টাচার্য ▪ সুজাতা চ্যাটার্জী ▪ মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় দাস ▪ মধুমিতা ভট্টাচার্য ▪ ড. রমলা মুখার্জী ▪ সনৎকুমার ব্যানার্জী ▪ বিদ্যুৎ মিশ্র ▪ রাজর্ষি মণ্ডল ▪ রূপালী মুখোপাধ্যায় ▪ শক্তিপদ পণ্ডিত ▪ শম্ভু সরকার ▪ সুব্রত চৌধুরী
অদিতি ভট্টাচার্য ▪ দীপঙ্কর চৌধুরী ▪ মৌসুমী রায় ▪ সবিতা রায় বিশ্বাস ▪ সহেলী রায় ▪ কিশোর ঘোষাল
অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায় ▪ অরিন্দম দেবনাথ ▪ কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায় ▪ দীপক দাস ▪ ড. উৎপল অধিকারী ▪ চন্দ্রানী মজুমদার
সায়ন্তনী পলমল ঘোষ ▪ সোমা দে ▪ শংকর লাল সরকার ▪ সন্দীপন সাহা
অলংকরণ
মায়াসখা নন্দী ▪ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ▪ একপর্ণিকা ক্রিয়েটিভস
বহু কলমের গল্পে, প্রবন্ধে, সত্যি ঘটনায়, তথ্যে, গ্রাফিক নভেলে প্রাইমেটদের হাজারো কাণ্ড।
শিবশঙ্কর ভট্টাচার্যের অসামান্য লেখায় ও আঁকায় কিশোর গল্প সংকলন।