উপন্যাসিকা
FREE SHIPPING IN INDIA
উপন্যাসিকা
হঠাৎ একটা চাপা গরগর আওয়াজে দুজনেই ফিরে তাকায়। পিঠ বাঁকিয়ে, নখ বের করে, লোম ফুলিয়ে আকারে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে এক পা এক পা করে হোরেমহেবের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে নুবিয়া। কীভাবে যেন বুঝতে পেরেছে কিছু একটা গোলমাল হয়েছে এখানে।
বুমা ব্যানার্জী দাস
মাসর বা মিশর হল ইজিপ্টের আরবি নাম।
কেমেট শব্দের অর্থ, কৃষ্ণ ভূমি। ইজিপ্টের প্রাচীন নাম।
শাসককে বোঝাতে ফারাও (পের-আ) শব্দটি ব্যবহার করা হলেও সরাসরি সম্বোধনের ক্ষেত্রে ইজিপ্টের প্রজারা রাজাকে হেমেফ বলে ডাকত। এর অর্থ, মহামহিম বা হিজ ম্যাজেস্টি।
এক
১৩৪১ খ্রিস্টাব্দ
সমুদ্র আজ বড়ো ক্ষিপ্ত। হিন্দ মহাসাগরের এই অঞ্চলটুকু সাধারণত শান্তই থাকে। বাহিতির এই নিয়ে তিনবার আসা হল এই রাস্তায়। তার গ্রিক বন্ধু ওরায়নই তাকে এই রাস্তা প্রথম চেনায়। ও অবশ্য এই সমুদ্রকে বলে এরিথ্রিয়ান সাগর। এই সমুদ্রের খাঁড়িতে পৌঁছে বাঁক নিয়ে ঢুকতে হয় একটা নদীতে। সেই নদীই নিয়ে যায় মুজিরিসে। হেলাস, রোমা, মাসর থেকে বড়ো বড়ো বণিকরা হাজির হয় হিন্দের এই বন্দরে। দেশ বটে একটা, যেন ধনরত্নের অফুরন্ত ভাণ্ডার। দামি পাথর, মশলা, হাতির দাঁত, রেশম থরে থরে সাজানো। হেলেনিকরা পড়ে থাকে গোলমরিচের পেছনে। মাসরের বেশিরভাগ বণিকরাও তাই।
বাহিতির অবশ্য লক্ষ অন্যদিকে। আর কয়েক বছর যাক না, দেখিয়ে দেবে সে। মাসরের সবচেয়ে ধনী বণিকের শিরোপা তার মাথাতেই বসবে। এবারে সঙ্গে করে যা এনেছে ও, ওই বন্দরভরা সমস্ত মুক্তো, রেশম আর হাতির দাঁতের বিনিময়েও তার দাম উঠবে না, তা সে জানে। ও-জিনিস নিয়ে সরাসরি রাজদরবারেই চলে যাওয়া যেতে পারে। তবে এই দেশের মানুষ ঠকায় না; দামি বস্তুর কদর করে, উচিতমতো দাম দেয়। আর এ-জিনিস তো… কোমরবন্ধ থেকে ঝুলতে থাকা রেশমের ছোট্ট বটুয়ার ভেতরের বাক্সটাকে সাবধানে আর একবার আঙুল ছুঁইয়ে দেখে নেয় বাহিতি। এর জুড়ি আর কোথাও নেই। শুধু পাথর হিসেবে এর মূল্য যাই হোক না কেন, এর আসল মূল্য অন্য জায়গায়। তাই রাজদরবারেই যেতে হবে তাকে। হয়তো ভাগ্যই তাকে হাত ধরে নিয়ে গিয়েছিল সেদিন ওই আড়াই হাজার বছরের পুরোনো ভূতের শহরে।
নীলনদ বেয়ে যেতে যেতে জায়গাটা চোখে পড়েছে অনেকবারই, তবে যাওয়ার সাহস কখনও হয়নি। অনেকরকম গল্প চালু আছে জায়গাটাকে নিয়ে। কোনও এক রানি নাকি গায়েব হয়ে গিয়েছিল পুরো। না হলে যেতে আর তার কী? এসব সমাধিগুলো ঘাঁটলে বেশ ধনরত্ন পাওয়া যায়। আর এমন কাজ সে প্রথমবার করল এমনটাও নয়। তবে এবারই প্রথম কপাল ঠুকে চুপিসারে ঢুকে পড়েছিল সেই পোড়ো শহরে। বহু আগে কবে যেন কিছুদিনের জন্য মাসরের রাজধানী হয়েছিল এই শহর। নাহ্, সমাধি-টমাধি কিছু খুঁজে পায়নি, তবে এটা পেয়েছিল। আর বহু প্রচলিত একটা কিংবদন্তির সঙ্গে মিলিয়ে এটা যে কী তা আন্দাজ করতে অসুবিধা হয়নি ধুরন্ধর ব্যবসায়ী বাহিতির।
খাঁড়ির বাঁক ঘুরে পূর্ণা নদীতে পড়তেই গোলমালটা নজরে এল তার। এখান থেকে বন্দরটা স্পষ্টভাবেই দেখা যায়। প্রথমে মনে হয়েছিল, কোনও কারণে হয়তো বন্দরে আজ অতিরিক্ত ব্যস্ততা, ছোটাছুটি। কয়েক মুহূর্তেই ভুল ভেঙে যায় বাহিতির। এই ছোটাছুটি আতঙ্কের। বন্দরের মানুষগুলো দিকভ্রান্তের মতো কোনোকিছু থেকে আত্মরক্ষার তাগিদে পালানোর চেষ্টা করছে। তার বিস্ফারিত চোখের সামনেই কেউ কেউ লাফিয়ে পড়ল পূর্ণার ফুলে ওঠা জলে। কীসের এত আতঙ্ক এদের? সেটাও পরিষ্কার হয়ে যায় তখনই। বন্দর সংলগ্ন বিশাল গুদামঘর হঠাৎ কেঁপে ওঠে তীব্রভাবে, চওড়া ফাটল দেখা দেয় তার আপাতনিশ্ছিদ্র দেওয়ালের গায়। আতঙ্কে কেঁপে ওঠে বাহিতিও। ততক্ষণে তার মাল্লারাও সচেতন হয়ে গিয়েছে। নদীর জলেও কি ঘূর্ণি তৈরি হচ্ছে এবার?
“ডাও ফেরাও, মুখ ঘোরাও খাঁড়ির দিকে!” চিৎকার করে ওঠে বাহিতি, “ভূমিকম্প হচ্ছে ওখানে!”
বলতে-বলতেই বিশাল গুদামঘরটা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে খেলাঘরের মতো।
“জলে টান বাড়ছে হুজুর, ডাও ঘুরছে না।” বাহিতির পায়ের কাছে আর্তনাদ করে বসে পড়ে প্রাচীন, অভিজ্ঞ আর বিশ্বাসী মনসুর। মাসরের অন্যতম সেরা নাবিক।
প্রবলভাবে পাক খেতে খেতে ডাও নৌকা এগিয়ে যায় মুজিরিস বন্দরের দিকে। তবে তাকে এখন আর বন্দর বলা চলে না। প্রবল ঢেউ আছড়ে পড়ছে ঘাটার ওপর। রজ্জুবদ্ধ জাহাজের সারি সেই ঢেউয়ের ধাক্কায় কাত হয়ে যাচ্ছে প্রথমে, তারপর মাস্তুল ভেঙে প্রচণ্ড শব্দে ধাক্কা খাচ্ছে ঘাটার স্তম্ভে। জলে ভাসছে অসংখ্য ছোটো নৌকা আর সুলুপের ভাঙা টুকরো। ভয়াবহ আর্তনাদ ভেসে আসছে বন্দরের দিক থেকে। মনসুর হাল ছেড়ে হাঁটু ভেঙে বসে পড়ে জাহাজের পাটাতনে।
“আল্লাহ্, যা আমার নয়, তাতে লোভ করা গুনাহ্। গুনাহ্ কবুল!” বাহিতিও বসে পড়ে তার পাশে।
কয়েক মুহূর্তের জন্য মনে হয় সব স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে, তারপর কানফাটানো শব্দে ঘাটার গায়ে আছড়ে পড়ে বাহিতির ডাও। ভাঙা মাস্তুলের ধারালো একটা খণ্ড আমূল বিঁধে যায় বাহিতির পেটে। কোমরবন্ধ ছিঁড়ে ছিটকে যায় বটুয়াটা। দুর্বল একটা হাত নিমেষের জন্য বাড়িয়ে ধরে বাহিতি, হয়তো ধরতে চায় তার সাতরাজার ধন। তারপরই এলিয়ে যায় হাতটা। বাক্সসমেত বটুয়া কোথায় ছিটকে পড়ে কে জানে।
খ্রিস্টপূর্ব ১৩৪8, কেমেট (ইজিপ্ট)
হেমেফ (ফারাও) আজ ডেকে পাঠিয়েছিলেন তাঁর প্রিয় শিল্পীকে। নিজের আর তাঁর প্রিয়তমা পত্নীর আবক্ষ মূর্তি গড়ার ভার তাকে দিয়েছেন তিনি। খুশিমনেই সে-ভার গ্রহণ করেছে থাটমস।
হেমেফ তার কদর করেন। তাই এই নতুন শহরে এসেও তার নিজের বিশাল কর্মশালা গড়ে তুলতে অসুবিধা হয়নি কোনও। বছর দুই আগে হেমেফ এই নতুন শহর আমর্না স্থাপন করে রাজ্যপাট এখানে তুলে আনেন। সবদিক দিয়েই অনেক পরিবর্তন এনেছেন বর্তমান ফারাও। কেমেটবাসীরা বরাবরই বহু ঈশ্বরবাদী। কিন্তু ফারাও বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছেন সেখানেও। তিনি একমাত্র সূর্যদেব আটেনের অনুগামী। অন্য সমস্ত দেবতার পূজা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। একেশ্বরবাদী ফারাও চতুর্থ আমেনহোটেপ নিজের নামটাও পালটে ফেলেছেন। আমুনের কোনও সংস্রব তিনি রাখতে চান না। আমেনহোটেপ শব্দের অর্থ হল ‘আমুন সন্তুষ্ট হলেন’। স্বাভাবিকভাবেই সে-নাম তিনি বর্জন করেছেন। তাঁর বর্তমান নাম আখেনআটেন। দেব আটেনের মন্দির ছাড়া আর সব মন্দিরের অনুদান বন্ধ করে দিয়েছেন তিনি।
আমুনের মন্দিরের পূজারিরা এতকাল সীমাহীন ধনসম্পদ ও ক্ষমতা ভোগ করে এসেছে। বলাই বাহুল্য, সে-সব হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা ফারাওয়ের ওপর একেবারেই সন্তুষ্ট নয়। তবে থাটমস শিল্পী মানুষ। রাষ্ট্রনীতি, রাজনীতির খবরে তার উৎসাহ নেই। ফারাও যখন এই নতুন শহর পত্তন করে চলে এলেন, সে অত কিছু না ভেবে তার জিনিসপত্র আর কর্মীর দল নিয়ে সঙ্গে চলে এসেছিল। সত্যি বড়ো তাড়াহুড়ো করে তৈরি এই আমর্না। বেশিরভাগ বাড়ি কাদামাটির ইট দিয়ে গাঁথা, চুন রঙ করা। শহরের তেমন শ্রী-সৌন্দর্য কিছু নেই। তার মূর্তিশালা অবশ্য পাথরের গাঁথুনি দিয়ে তৈরি, ওরই মধ্যে একটু ভদ্রস্থ। নামযশও মন্দ হয়নি। মূর্তিকার থাটমসকে একডাকে কমবেশি সকলেই চেনে। তবে তার আমর্না চলে আসার কারণ কেবলমাত্র ফারাওয়ের প্রতি আনুগত্য নয়। আরও কিছু কারণ আছে, তবে তা অত্যন্ত গোপন। সে-কথা ঘুণাক্ষরেও কেউ টের পেলে থাটমসের প্রাণসংশয় হবে।
থাটমসের শরীরে রাজরক্ত না থাকলেও তার জন্ম উচ্চবংশে, নেফারতিতিরও তাই। কেমেটের বর্তমান সর্বময়ী রানি তার শৈশবের সঙ্গী। শুধু তাই নয়, থাটমস জানত নেফারতিতির সঙ্গেই একদিন তার বিবাহ হবে। কিন্তু নেফারতিতির পিতা আই অত্যন্ত ক্ষমতালোভী, তাই ফারাওয়ের পরিবারে যুক্ত হওয়ার সুযোগ সে ছাড়তে চায়নি। অবশ্য নেফারতিতিকে সম্রাজ্ঞীরূপেই মানায়। শুধু সৌন্দর্য নয়, রুচি, মননশীলতা, বুদ্ধিমত্তা— সবদিক থেকেই তিনি অনন্যা। তবু কোথায় যেন আঘাত লেগেছিল থাটমসের। আজও তার সমস্ত সৃষ্টির প্রেরণা ওই অপরূপ মুখশ্রী। খুব গোপনে তিল তিল করে থাটমস তাঁর একটি আবক্ষ মূর্তি গড়ে তুলতে শুরু করেছে ইতোমধ্যেই। আর আজ ফারাও স্বয়ং তাকে সেই একই আদেশ দিলেন। তার এই অনুভূতির কথা হেমেফ আখেনআটেন টের পেলে আর দেখতে হবে না; বহিষ্কৃত হওয়া থেকে দাসত্ব— যে-কোনো শাস্তিই জুটতে পারে। তবে এটা গৌণ, আসলে আইকে থাটমস একেবারেই বিশ্বাস করতে পারে না। সম্রাজ্ঞীর পিতা হয়ে সে সন্তুষ্ট থাকবে না, তার আসল নজর ফারাওয়ের সিংহাসনের দিকে। এর জন্য জামাতাকে তো বটেই, কন্যাকে হত্যা করতেও সে দ্বিধা করবে না বলেই থাটমসের বিশ্বাস। সুচতুর আই ধীরে ধীরে নিজের গুরুত্ব বাড়িয়ে চলেছে। হেমেফ তাকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করেন। তবে কেমেটের অন্দর চিরকালই ষড়যন্ত্রের খাসমহল। সেরকম কোনও প্রচেষ্টা আটকানোর ক্ষমতা থাটমসের নেই, তবু যদি সাবধান করে দেওয়া যায় তার শৈশবের খেলার সাথীকে। তবে নেফারতিতি তাঁর পিতার থেকে তাকে বেশি বিশ্বাস করবে, এটাও অসম্ভব। তবু এই অচলাবস্থা থেকে নিজেকে মুক্ত করার সাধ্য থাটমসের নেই।
আপাতত এইসব না ভেবে ফারাওয়ের আদেশ পালন করাই সমীচীন। থাটমস জানে, এটাই হবে তার শিল্পী জীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি। ফারাওয়ের কাছ থেকে দুটি রত্ন সে চেয়ে নেবে ঠিক করেছে। নেফারতিতির মূর্তির চোখে রত্ন দুটি স্থাপন করবে। যদিও সে ধূসর-নীল চোখ দুটির তুল্য রত্ন পৃথিবীতে কোথাও হয়তো নেই। ফারাও নিজেই মূর্তি গড়ার আদেশ দিয়েছেন, নিশ্চয়ই রাজি হবেন দুটি রত্ন দান করতে।
রাত ঘন হয়ে আসে। থাটমসের কর্মীরা যে যার বাড়ি ফিরে গিয়েছে অনেকক্ষণ। তার সবসময়ের সঙ্গী প্রিয় পোষ্য, বেড়াল নুবিয়া কোল ঘেঁষে এসে বসে। তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে অস্ফুট স্বরে থাটমস বলে, “নুবি দেখিস, হাজার হাজার বছর পরেও লোকে আমাকে মনে রাখবে। আইকে ভুলে গেলেও থাটমসকে কেউ ভুলবে না।”
খ্রিস্টপূর্ব ১৩৩৪, কেমেট
অসন্তোষ ঘনিয়ে উঠেছে দেশজুড়ে। ফারাও আখেনআটেন বহু ঈশ্বরবাদী কেমেটবাসীর প্রিয় দেবতাদের ইচ্ছামতো আরাধনা করার স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছেন বহুদিন। তাও তারা মেনে নিয়েছিল, সূর্য দেবতা আটেন চিরকালই তাদের শ্রদ্ধেয়। কিন্তু বাকি সব মন্দিরের পূজা শুধু বন্ধ করে দিয়েই ফারাও ক্ষান্ত হননি, মন্দির-গাত্র থেকে আমুন ও অন্যান্য দেবতাদের নাম পর্যন্ত তিনি সরিয়ে দিয়েছেন। তাঁর লোকেরা কোথাও ছেনি-বাটালি দিয়ে ঘষে, কোথাও সম্পূর্ণ মন্দির ধূলিসাৎ করে আটেন ছাড়া অন্য সমস্ত দেবতাদের নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করছে। এমনিতেই কেমেটবাসী তাদের ওপর জোর করে চাপানো এই একেশ্বরবাদ একেবারেই মেনে নিতে পারেনি। এবার তার সঙ্গে যোগ হয়েছে ক্ষোভ ও হতাশা। আমুনের পূজারিদের তিনি বাধ্য করেছেন আটেনের মন্দিরে পূজা করতে। শুধু তাই নয়, নিজেকে ও তাঁর পত্নীকে তিনি দেবতা বলেও ঘোষণা করেছেন। ফারাওদের চিরকালই ঈশ্বরের প্রতিভূ বলে মেনে নিয়েছে কেমেটবাসী। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনও ফারাও নিজেকেই দেবতা বলে স্থাপিত করার চেষ্টা করেননি।
তাছাড়া তিনি সুশাসকও নন। নিজের প্রাসাদের বাইরে কী হল, না হল— কোনোকিছুতেই তাঁর আগ্রহ দেখা যায় না। ফারাও আখেনআটেন সম্ভবত মনে করেন, যেহেতু তিনি স্বয়ং ঈশ্বরের অবতার, তাই ফারাওয়ের স্বাভাবিক দায়িত্বপালন তাঁর না করলেও চলবে। অর্থনীতি হোক বা বিদেশনীতি, সবকিছুই ফারাও অবহেলার চোখে দেখেন। তাঁর প্রজাদের মধ্যে যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, সেটা তিনি বুঝেও না বোঝার ভান করেন। এতদিনের রাজধানী থিবস ছেড়ে নতুন রাজধানী আমর্নাতে চলে আসার সিদ্ধান্তও বিরক্ত করেছে প্রজাদের।
তাই ফারাওয়ের আকস্মিক মৃত্যুসংবাদ বিশেষ বিচলিত করতে পারেনি তাদের। পরবর্তী ফারাও কে হবেন, তাই নিয়ে নানা জল্পনা চলছে।
ফারাওয়ের মৃত্যুসংবাদ শুনে প্রাসাদে ছুটে গেছিল থাটমস। কিছুদিন ধরে তাঁর স্বাস্থ্য ভালো যাচ্ছিল না সেটা জানত, কিন্তু মৃত্যুসংবাদ একেবারেই অপ্রত্যাশিত। শেষ শয্যায় শায়িত আখেনআটেনকে তখন নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তাঁর আরাধ্য দেবতা আটেনের মন্দিরে। সেখানেই তিন থেকে চার মাস সময় ধরে তাঁর দেহ সমাধিস্থ করার প্রক্রিয়া চলবে। প্রথা অনুযায়ী পরবর্তী ফারাওয়ের নামও ঘোষণা করা হবে এবার। রাজবংশেরই কাউকে নির্বাচন করা হতে পারে, অথবা রানি যদি পুনরায় কাউকে বিবাহ করতে মনঃস্থির করেন, সেও হতে পারে পরবর্তী ফারাও।
থাটমসের মনের কোণে কোথাও কি ক্ষীণ একটা আশা জন্মাচ্ছে? হবেও বা। এই ক’বছরে ধীরে ধীরে সে যে ফারাও ও তাঁর পত্নীর অত্যন্ত কাছের মানুষ হয়ে উঠেছিল, তা তো ঠিক। আখেনআটেন কোনোদিনই প্রজারঞ্জক, প্রজাপ্রিয় নন। খুব বেশি বন্ধুজন নেই তাঁদের। ফারাওয়ের তিন কন্যা। এমনিতেই কেমেটের এতদিনের ইতিহাসে মাত্র তিনবার ফারাও হিসেবে মেয়েদের দেখা গিয়েছে। মারনিথ, সোবেকনেফেরু আর হাতশেপসুট। তাও ফারাও হাতশেপসুটের সমস্ত চিহ্ন তাঁর পরবর্তী ফারাও মুছে দিতে সক্রিয় হয়েছিলেন। সে যাক, আখেনআটেনের তিন কন্যার মধ্যে কারও ফারাও হওয়ার যোগ্যতা বা ক্ষমতা আছে বলে থাটমসের মনে হয় না। সেক্ষেত্রে জামাতাকে ফারাও করা হতে পারে, অথবা স্বয়ং রানি যদি পুনর্বার… এই সম্ভাবনার কথা আর ভাবতে চায় না থাটমস। কিন্তু একেবারেই কি পারে না এরকম হতে? হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া প্রায় সারা কেমেট থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিলেন ফারাও আখেনআটেন। এই মুহূর্তে থাটমসের মতো বন্ধু বা নিকটজন আর কেউই প্রায় নেই রানির। শিল্পী থাটমসকে আমর্নাবাসী ভালোবাসে। ক্ষমতায় থাকতে গেলে রানির পক্ষে থাটমসকে বিবাহ করাই কি সেরা পন্থা নয়? গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে থাটমসের। এতদিনের এই অসম্ভব স্বপ্ন সত্যি হবে কি? যদিও ফারাও হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা তার কোনোদিনই ছিল না, তবু ভাবতে খারাপ লাগছে না একেবারেই। নিজের মনকে এবার ধমক দিয়ে বশে আনার চেষ্টা করল থাটমস। নেফারতিতির এমন বিপদের দিনে সে কিনা ফারাও হওয়ার স্বপ্নে মশগুল হয়ে পড়ছে!
দিবাস্বপ্ন ভেঙে চমকে ওঠে থাটমস। সবাই হঠাৎ চুপ করে গিয়েছে; ঠিক চুপ নয়, যেন একেবারে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে সামনের দিকে। প্রাসাদ প্রাঙ্গণে শায়িত মৃত ফারাওয়ের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন রানি। তাঁর পাশে দেব আটেনের প্রধান পূজারি প্যারেনেফার। রানির চোখ দুটি উদাস, সদ্য শোকের চিহ্ন সুস্পষ্ট।
ভিড়ের মধ্যে থেকে থাটমস চেষ্টা করে রানির দৃষ্টি আকর্ষণ করতে, বোঝাতে চায় সে তৈরি তাঁর পাশে থাকার জন্য। আশ্বাস দিতে চায়। এগিয়ে আসে প্যারেনেফার। ঘোষণার ভঙ্গিতে বলতে থাকে, “ফারাও আখেনআটেনের আকস্মিক মৃত্যুতে কেমেটের সিংহাসনে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে তা পূর্ণ করার দায়িত্ব গ্রহণ করছেন স্বয়ং রানি। এই মুহূর্ত থেকে কেমেট নেফারনেফারুআটেনকে তার নতুন ফারাও রূপে স্বীকার করে নিল।”
বিস্ময়ে স্তব্ধ এক প্রাঙ্গণ আমর্নাবাসীর সামনে আটেনের প্রধান পূজারি ফারাওয়ের চিরপরিচিত নীল মুকুট বা খেপ্রিশ পরিয়ে দিল নেফারতিতির মাথায়। আখেনআটেনকে অনুসরণ করে নেফারতিতিও নিজের নাম পরিবর্তন করেছিলেন অনেক আগেই। আমর্নাবাসীদের দিকে তাকান নতুন ফারাও। কারও মুখে উৎসাহ বা সমর্থন খুঁজে পান না তিনি। নেফারনেফারুআটেন ভালো করেই জানেন, আখেনআটেন ফারাও হিসেবে সফল ছিলেন না। তার ওপর কেমেটবাসী নারীকে শাসক হিসেবে আজও মেনে নিতে পারে না। ফারাও হাতশেপসুট সর্বকালের সেরা ফারাও হওয়া সত্ত্বেও পুরুষ ফারাওদের মতো নকল দাড়ি পরিধান করতেন। প্রয়োজনবোধে তাঁকেও হয়তো তাই করতে হবে।
এছাড়া আর কোনও উপায় যে তাঁর কাছে ছিল না। কন্যা মেরিতাতেনের বিবাহ হয়েছে বটে, কিন্তু জামাতা স্মেনখারে সম্ভবত বহু ঈশ্বরবাদী। সে ফারাও হলে এই আমর্না হয়তো পরিত্যক্ত হবে। রাজধানী ফিরে যাবে থিবসে। আখেনআটেনের আর এক রানির পুত্র তুতানখামুনের বয়েস মাত্র ছয় বছর। তাকে ফারাও হিসেবে স্বীকার করার আগে আরও অন্তত দুই-তিন বছর অপেক্ষা করতে হবে। নেফারনেফারুআটেন জানেন, তাঁর কাজটা খুব কঠিন হবে। আমুনের পূজারিরা একজোট হচ্ছে ধীরে ধীরে। গুপ্তচরের সংবাদ অনুযায়ী, তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছে তাঁরই পিতা সেনাপতি আই। কেমন অস্বস্তি হয় নেফারতিতির—না না, ফারাও নেফারনেফারুআটেনের। পুরোনো নামটা কতদিন মনে করেননি তিনি। মাঝে মাঝে মনে হয় কীই-বা হল, কী পেলেন এই অর্থহীন ঝঞ্ঝাটের মধ্যে গিয়ে। দেব আটেন হোক বা আমুন, কে আরাধ্য তাতে খুব কিছু যায় আসে কি?
মাথায় একটা ঝাঁকুনি দেন নতুন ফারাও। কী সব ভাবছেন তিনি! ফারাওয়ের কোনও দুর্বলতা, কোনও দ্বিধা মানায় না যে। তাও যেন কীসের আশায় ভিড়ের মধ্যে একটা চেনা মুখ, কোনও একটা বন্ধুত্বপূর্ণ মুখ খুঁজতে থাকেন নেফারতিতি। চোখ আটকে যায় একটা মুখে অবশেষে। কিন্তু তার চোখেও যেন আজ চিরপরিচিত বন্ধুত্বের ছাপ নেই। কী রয়েছে? ভর্ৎসনা কি? কিন্তু কেন? বুঝে ওঠার আগেই চেনা মুখটি ভিড়ের মধ্যে আবার হারিয়ে যায়।
পূজারি প্যারেনেফারের কণ্ঠস্বরে সংবিৎ ফিরে আসে তাঁর। ফারাও হিসেবে তাঁর প্রথম ঘোষণা কী হবে, তাই জিজ্ঞেস করছে প্যারেনেফার। সব ভুলে দায়িত্বে মন দেন নতুন ফারাও।
***
রাত গভীর হয়ে আসে। নিজের জীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তির সামনে এসে দাঁড়ায় থাটমস। তার অধীত সমস্ত শিক্ষা, সমস্ত যত্ন একত্রিত হয়েছে এই একটি আবক্ষ মূর্তির মধ্যে। সামান্য ওপর দিকে ওঠানো চিবুক, তাতে রাজকীয় ভঙ্গিটি সুস্পষ্ট হয়েছে আরও। ঠোঁটের কোণে খেলা করছে এক মায়াবী হাসি। এমন কোনও মূর্তি কেমেটে আজ পর্যন্ত তৈরি হয়নি। ফারাও আখেনআটেনও মুগ্ধ হয়েছিলেন এই সৃষ্টি দেখে। চোখের মণিতে থাটমস প্রথমে দুটি স্ফটিক বসিয়েছিল। আখেনআটেন দুটি দুষ্প্রাপ্য লাপিস লাজুলি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন তাকে। মধ্যরাতের আকাশের মতো তাদের রঙ। তার ওপর লাপিস লাজুলির সোনালি শিরাগুলো তারার মতো ফুটে আছে। এখন সেই দুটিই বসানো আছে চোখে। এমন লাপিস লাজুলি আগে কখনও দেখেনি থাটমস। সে দুটির আর্থিক মূল্য সে কল্পনাও করতে পারে না। ক্লান্ত একটা হাসি ফুটে ওঠে তার মুখে। চুনাপাথরের ওপর এলাব্যাস্টারের স্তর দিয়ে তিল তিল করে বানিয়েছে ওই মূর্তি।
আজ চিরকালের মতো দূরে চলে গেল তার শৈশবের সঙ্গী। সে এখন ফারাও আর থাটমস সামান্য প্রজামাত্র। তাই হোক তবে। সে, তার বিশ্বস্ত নুবিয়া আর তার সৃষ্টি, এই নিয়েই বাকি জীবনটা কেটে যাবে।
খ্রিস্টপূর্ব ১৩৩০, কেমেট
নেফারতিতি নেই! রানি নেফারতিতি, ফারাও নেফারনেফারুআটেন, সুন্দরীশ্রেষ্ঠা, বুদ্ধিমত্তায়, জ্ঞানে, সংস্কৃতিতে সারা কেমেট কেন, সারা জগতে যার তুলনা মেলা ভার, সেই নেফারতিতি আর নেই। থাটমসের এক শিক্ষানবিশ ছুটতে ছুটতে এসে যখন খবরটা দিল, সূর্য তখন মাঝগগনে। কয়েক মুহূর্ত হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে সে দৌড়াতে থাকে প্রাসাদের উদ্দেশে। ষড়যন্ত্র সফল হল তবে!
ফারাও নেফারনেফারুআটেন রাজ্যভার গ্রহণ করার পর সে স্বেচ্ছায় আর কখনও প্রাসাদে পদার্পণ করেনি। দুই বছর আগে ফারাও দায়িত্ব তুলে দেন বালক রাজা তুতানখামুনের কাঁধে। তবে পরোক্ষভাবে নেফারতিতিই কেমেট পরিচালনা করতেন। এই মৃত্যুসংবাদ যেমন অনভিপ্রেত, তেমনই আকস্মিক। তিনি অসুস্থ ছিলেন এমন সংবাদও তো শোনা যায়নি! একটা তীব্র সন্দেহ থাটমসের মনকে ঘোলাটে করে তোলে।
আখেনআটেনের মৃত্যুর পর থেকেই ক্ষুব্ধ পূজারিদের নেতৃত্ব দিতে শুরু করেছিল আই। সে থিবসে থাকলেও তার প্রভাব প্রতিপত্তি আমর্নাতেও ছড়িয়ে পড়েছে ততদিনে। সে আর তার বিশ্বস্ত সঙ্গী হোরেমহেব মিলে রীতিমতো বড়ো একটা দল গড়ে তুলেছে। কন্যা নেফারনেফারুআটেন ফারাও হওয়ার পর অনেকবার তাকে আমর্না আসতে দেখেছে থাটমস। আইকে বড়ো ধূর্ত মনে হয় তার। নেফারনেফারুআটেন ফারাও হিসেবে আখেনআটেনের থেকে অনেক বেশি সফল। প্রজাদের ক্ষোভ খানিকটা হলেও প্রশমিত হয়েছে। যদিও একনিষ্ঠ সূর্যের পূজারি হওয়ার কারণে একেশ্বরবাদই তিনি ধরে রেখেছিলেন। এরপর ফারাও তুতানখামুন অবশ্য কী করেন সেটা দেখার বিষয়।
তীক্ষ্ণ সন্দেহটা মনে ধরে রেখে প্রাসাদ প্রাঙ্গণে পাগলের মতো ঢোকে থাটমস। নিশ্চয়ই এতক্ষণে সেখানে শায়িত করা হয়েছে ভূতপূর্ব ফারাওয়ের দেহ। সবাই ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে তাঁর চারপাশে। কিন্তু কোথায় কী? প্রাসাদ প্রাঙ্গণ তো সম্পূর্ণ ফাঁকা। এরই মধ্যে ফারাওয়ের দেহ নিয়ে চলে গেল দেব আটেনের মন্দিরে? তাহলে তো আর বিদায় জানানোও সম্ভব হবে না। কারণ, মন্দিরের দরজা বন্ধ করে পূজারিরা ফারাওয়ের দেহ প্রস্তুত করবে সমাধিস্থ করার জন্য। চলতে থাকবে নানা রাসায়নিক প্রক্রিয়া। সেটাই চিরকালীন প্রথা। সেখানে পূজারিরা ছাড়া অন্য কারও প্রবেশের অনুমতি থাকবে না তখন।
হঠাৎ প্রাসাদের এক কর্মচারীকে দেখতে পেয়ে দ্রুত তার দিকে এগিয়ে যায় থাটমস।
“শোনো, ফারাওয়ের নশ্বর দেহ কখন নিয়ে গিয়েছে?” গলা কেঁপে যায় থাটমসের।
“সে তো বহুক্ষণ।” অধৈর্যভাবে বলে লোকটি, “তাঁর পিতা শোকবিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন, তাই প্রাঙ্গণে শায়িত রাখা হয়নি।”
“পিতা! সেনাপতি আই আমর্নায়?” কী এক অমঙ্গল আশঙ্কায় কেঁপে ওঠে থাটমস।
“হ্যাঁ, তিনি তাঁর সঙ্গী মাননীয় হোরেমহেব— সবাই তো এখানে।” এবার চলে যেতে উদ্যত হয় লোকটি।
“তাঁরা দেব আটেনের প্রধান মন্দিরে গিয়েছে তো?” আবার জিজ্ঞেস করে থাটমস।
“সে আমি জানি না।” শব্দগুলো উদাসভাবে বলে লোকটি প্রাসাদে ঢুকে যায় আবার।
ছটফট করতে থাকে থাটমস। মনটা বড়ো কু ডাকছে। এখুনি যেতে হবে আটেনের মন্দিরে। কিন্তু কীভাবে যাবে তাড়াতাড়ি? প্রাঙ্গণের এক প্রান্তে রাখা দু-ঘোড়ায় টানা গাড়িটা তার চোখে পড়ে হঠাৎ। কার ওয়েরেরেত (যুদ্ধ রথ) এটা কে জানে। আর অত ভাবতেও পারছে না সে। ছুটে গিয়ে ঘোড়ায় টানা গাড়িটাতে উঠে পড়ে থাটমস। উল্কার বেগে বেরিয়ে যেতে যেতে প্রাঙ্গণের পার্শ্ববর্তী এক অলিন্দে হঠাৎ চোখে পড়ে বালক তুতানখামুন একাকী বসে আছে। বিষণ্ণ ফারাও।
“কেউ আছ?”
মুঠো পাকিয়ে সর্বশক্তি দিয়ে আটেনের মন্দিরের বন্ধ দরজায় ধাক্কা মারতে থাকে থাটমস। কোনও সাড়া নেই। তবু হাল ছাড়ে না সে, ধাক্কা মারতেই থাকে। বহুক্ষণ বাদে পেছন থেকে কে বিরক্তভাবে বলে ওঠে, “কী চাই?”
“শোনো,” ব্যগ্রভাবে বলে ওঠে থাটমস, “ফারাওয়ের মরদেহ কি এখানে আনা হয়েছে? ভেতরে দেহ প্রস্তুতির কাজ শুরু হয়েছে?”
“এখানে কিছু আসেনি।” প্রধান পূজারি প্যারেনেফারের কণ্ঠে প্রগাঢ় উদাসীনতা— “এভাবে দরজায় ধাক্কা মেরো না। দেব আটেনের বিশ্রামের সময় এটা।”
“দয়া করো, বলে দাও কোথায় নিয়ে গিয়েছে তাঁকে। তুমি তো নিজে তাঁর মাথায় নীল মুকুট পরিয়েছিলে।”
প্যারেনেফারের পায়ের কাছে বসে পড়ে থাটমস।
হঠাৎ মুখটা কেমন পালটে যায় প্যারেনেফারের। চোখ দুটো রক্তাভ। প্রায় ফিসফিস করে বলে ওঠে, “পাবে না, কোথাও পাবে না তাঁর দেহ।”
আর দাঁড়ায় না প্যারেনেফার।
ছিটকে বেরিয়ে যায় থাটমস। সে ঠিক খুঁজে বের করবে। ফারাও তো বটেই, রানিরাও তাঁদের জীবিতকালেই নিজেদের সমাধি স্থান নির্বাচন করে রাখেন। কাজও শুরু হয়ে যায় বহু আগে। রানি থাকাকালীনই নেফারতিতি তাঁর সমাধিমন্দিরের কাজ শুরু করে দিয়েছিলেন। কাজ প্রায় শেষও হয়ে গিয়েছে। সে-জায়গা ভালোভাবেই চেনে থাটমস। হয়তো সেখানেই গিয়েছে সরাসরি। পাগলের মতো ঘোড়া দুটোকে ছোটায় সে।
ক্ষীণ একটা চাঁদ আবছা আলো ছড়াচ্ছে। সেই আলোয় ততোধিক আবছা হেরে যাওয়া একটা মানুষ দুই হাঁটুর ওপর মাথা নামিয়ে বসে আছে একটা প্রায় সম্পূর্ণ সমাধি মন্দিরের পাশে। মাঝে মাঝে শরীরটা কেঁপে কেঁপে উঠছে তার। নিঝুম চরাচর নিস্তব্ধ, শুধু গভীর রাতের হাওয়ায় বালির কণার ঘূর্ণি উঠছে থেকে থেকে। ফাঁকা সমাধিমন্দিরের ভেতর নিশাচর পাখিদের ডানা ঝাপটানোর শব্দ প্রতিধ্বনি তুলছে। যেন বলছে, ‘হারিয়ে গিয়েছে, ফারাও নেফারতিতি হারিয়ে গিয়েছে চিরতরে।’
দিন তিনেক পর ফারাও তুতানখামুন কেমেটের রাজধানী আবার থিবসে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলেন। তবে এই সিদ্ধান্ত তাঁর নিজের, না পরোক্ষভাবে সেনাপতি আইয়ের, সেটা থাটমস জানে না। খুব পরিকল্পিতভাবে, আই আর তার সাঙ্গপাঙ্গ আখেনআটেন ও নেফারতিতির সমস্ত চিহ্ন মুছে দিচ্ছে একটু একটু করে।
পরিত্যক্ত হবে তাঁদের সাধের আমর্না। থাটমসকেও সযত্নে গড়ে তোলা এই কর্মশালা ফেলে চলে যেতে হবে। সাজিয়ে রাখা মূর্তিগুলোর পাশে এসে দাঁড়ায় সে। তার সেরা সৃষ্টি, কী করবে এটা নিয়ে এখন? যদি আই এটাও নষ্ট করে ফেলে? ভাগ্যিস এটা তার কাছেই থেকে গিয়েছিল, প্রাসাদে আর নিয়ে যাওয়া হয়নি। তাহলে হয়তো এতক্ষণে এটার অস্তিত্ব আর থাকত না। খবর পেয়েছে থাটমস, দেব আমুনের মন্দিরে আবার পুজো শুরু হয়ে গিয়েছে। একেশ্বরবাদী ফারাওদের ইজিপ্টের শত্রু বলে প্রচার করছে আই আর হোরেমহেব।
নাহ্, গোছগাছ করা দরকার। উঠে দাঁড়াতে যায় থাটমস, হঠাৎ ধড়াম করে দরজাটা খুলে যায়, ভেতরে ঢুকে আসে হোরেমহেব। গর্বিত উদ্ধত পদক্ষেপ তার। রুক্ষ স্বরে জিজ্ঞেস করে সে, “তুই সেই শিল্পীটা না? মূর্তি গড়িস?”
চুপ করে থাকে থাটমস, কীই-বা উত্তর দেবে!
হোরেমহেব পায়ে পায়ে এগিয়ে যায় সেই মূর্তিটির দিকে। বুক দুরদুর করতে থাকে থাটমসের, কী হবে এবার?
“বাহ্, চমৎকার হাত তো তোর!” বাঁকা গলায় বলে হোরেমহেব, “এই সেই নেফারতিতি?”
থাটমস বোধ হয় বেখেয়ালে দুই পা এগিয়ে গিয়েছিল, এক টানে খাপ থেকে তলোয়ার খুলে নেয় হোরেমহেব, চোখের পলকে থাটমসের গলার কাছে ধরে হিসহিসে গলায় বলে, “ভুলে যা এই মূর্তি তুই বানিয়েছিলি, যতগুলো মূর্তি এখানে আছে সবক’টার কথা ভুলে যা। থিবস ফিরে যা, ঘরসংসার কর। আইয়ের মূর্তি গড় এবার থেকে। অন্যথায়…”
কথা শেষ করে না হোরেমহেব। হঠাৎ ঝুঁকে পড়ে নেফারতিতির মূর্তির চোখ দুটো মন দিয়ে দেখতে থাকে। তার নিজের চোখ তখন লোভে চকচক করছে।
“এই সেই দুষ্প্রাপ্য লাপিস না?” বিকৃত শোনায় এবার হোরেমহেবের গলা, “শুনেছি এগুলোর কথা।”
“না-আ-আ!” বিকট একটা আর্তনাদ বেরিয়ে আসে থাটমসের গলা থেকে।
হোরেমহেব ততক্ষণে তলোয়ারের ফলা ঢুকিয়ে দিয়েছে নেফারতিতির সেই অনিন্দ্যসুন্দর চোখে, বের করে এনেছে সেই দুষ্প্রাপ্য লাপিস। সর্বশক্তি দিয়ে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে থাটমস। কাঁধে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে তাকে ছিটকে ফেলে দেয় হোরেমহেব। অসহায়ভাবে থাটমস দেখে, প্রথম লাপিসটি কোমরবন্ধে ঝোলানো ছোটো একটা চামড়ার থলিতে রেখে হোরেমহেব নেফারতিতির মূর্তির দ্বিতীয় চোখে ধারালো তলোয়ারের ফলা ঢুকিয়ে বের করে আনে দ্বিতীয় লাপিসটি।
অব্যক্ত কান্নায় গলা বুজে আসে থাটমসের। সে যে শিল্পী, লড়াই করতে শেখেনি কখনও।
হঠাৎ একটা চাপা গরগর আওয়াজে দুজনেই ফিরে তাকায়। পিঠ বাঁকিয়ে, নখ বের করে, লোম ফুলিয়ে আকারে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে এক পা এক পা করে হোরেমহেবের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে নুবিয়া। কীভাবে যেন বুঝতে পেরেছে কিছু একটা গোলমাল হয়েছে এখানে।
‘হে আটেন, নুবিয়াকে রক্ষা করো!’ বুকে হেঁটে নুবিয়ার দিকে এগিয়ে গিয়ে তাকে আটকানোর চেষ্টা করে থাটমস। কেমেটবাসীর কাছে বেড়াল অত্যন্ত পবিত্র প্রাণী ঠিকই; দেবী বাস্তের প্রতিভূকে হয়তো নিজের থেকে কিছু করবে না হোরেমহেব, কিন্তু নুবিয়া যদি হোরেমহেবকে আক্রমণ করে, তাহলে সে কী করবে জানা নেই। নিজের আতঙ্কে থাটমস খেয়াল করে না যে ধীরে ধীরে ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে হোরেমহেব।
“এই, যাহ্ যাহ্!” বলতে বলতে পিছোতে থাকে হোরেমহেব, তার গলা কাঁপছে তখন। ধাক্কা লেগে মেঝেতে গড়িয়ে পড়ে নেফারতিতির দৃষ্টিহীন মূর্তি।
থাটমস নুবিয়ার কাছে পৌঁছানোর আগেই পিঠ বাঁকিয়ে মস্ত একটা লাফ দিয়ে হোরেমহেবের ঘাড়ে গিয়ে পড়ে নুবিয়া আর একটা জোরালো আঁচড়ে তার একপাশের গাল ফালা হয়ে গলগল করে রক্ত পড়তে থাকে। এক হাতে নুবিয়াকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে টলমল পায়ে ছুটে বেরিয়ে যায় হোরেমহেব। এই প্রাণীটিকে সে প্রচণ্ড ভয় পায়। দেবী বাস্তের প্রতিভূ হিসেবে নয়, এমনি প্রাণী হিসেবেও বেড়াল দেখলেই সে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।
বেশ খানিকক্ষণ পর হোরেমহেবের খেয়াল হয়, দ্বিতীয় লাপিসটি নেই, কখন যেন তার হাত থেকে পড়ে গিয়েছে কোথাও।
উঠে দাঁড়ায় থাটমস। পা কাঁপছে তার, চোখ দিয়ে জলের ধারা নেমেছে। নিজের ওপর ধিক্কারে মাথা নীচু হয়ে আসে। থরথর করে কাঁপতে থাকা হাত দুটো দিয়ে মেঝেতে গড়িয়ে পড়া মূর্তিটাকে তুলে ধরে। বাঁ কানের ওপর দিকটা ভেঙে গিয়েছে। দৃষ্টিহীন চোখ দুটোতে যেন ধিক্কার মাখানো— ‘নিজের শ্রেষ্ঠ কীর্তিকেও রক্ষা করতে পারলে না, থাটমস?’
উন্মাদের মতো লাফিয়ে ওঠে সে। পুরোনো স্ফটিক দুটো কোথায় যেন? কাঁপতে থাকা হাত দুটোকে বহুকষ্টে নিয়ন্ত্রণে এনে কাজে লেগে পড়ে উদভ্রান্ত শিল্পী। সময় খুব কম, আমর্না ছাড়তে হবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।
মাঝরাত। একটি চোখে পুরোনো স্ফটিকটি স্থাপন করা হয়ে গিয়েছে। অন্য চোখটির সাদা অংশ মেরামত করেছে থাটমস। তবে সেটি তখনও দৃষ্টিহীন। অন্য স্ফটিকটি হাতে ধরে গভীর চিন্তায় মগ্ন সে। কানের ভাঙা অংশটুকু পুনরায় গঠন করার চেষ্টা করেনি; কী হবে আর, তার জীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি এখানেই পরিত্যাগ করে চলে যেতে হবে তাকে। আইয়ের দলবল এই মূর্তি জনসমক্ষে আসতে দেবে না কোনোদিন। আবার চোখ উপচে জল গড়িয়ে আসে থাটমসের। মানুষের ক্ষুদ্র জীবনে শ্রেষ্ঠত্ব বার বার ধরা দেয় না। তার জীবনে সে অমূল্য সম্পদ ধরা দিয়েও হারিয়ে গেল।
হঠাৎ উন্মত্তের মতো মাথা ঝাঁকিয়ে সাজা হয়ে দাঁড়ায় থাটমস।— থাক তবে এই অর্ধদৃষ্টি। ওই অসামান্য চোখ দুটির একটিতে স্ফটিক, আর একটিতে শূন্য দৃষ্টি নিয়ে যুগের পর যুগ তুমি অপেক্ষায় থেকো, হে তিলোত্তমা। অনন্যা হয়েও অসম্পূর্ণ থাকো।
দুই হাতে মুখ ঢেকে, হাঁটু ভেঙে বসে পড়ে অসফল শিল্পী।
রাত গভীর হতে হতে কখন যেন তারারাও ঝাপসা হয়ে আসে। অবশেষে একসময় উঠে দাঁড়ায় থাটমস। এবার সে দৃঢ়, একাগ্র; মনঃস্থির করা হয়ে গিয়েছে তার। ব্যস্ত হাতে কিছু জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে পোঁটলা বাঁধে একটা। কোলে তুলে নেয় ঘুমন্ত নুবিয়াকে। তারপর একবারও পেছনে না তাকিয়ে বেরিয়ে যায়। চোখ তার ধকধক করছে যেন।
আমর্না ছেড়ে অনেকেই ততক্ষণে থিবসের পথে রওনা দিয়েছে। প্রাসাদ খালি, দাসদাসীরাও কেউ কোথাও নেই। একটা প্রেতপুরীর মতো দাঁড়িয়ে থাকে আমর্না। যুগ যুগ ধরে তার ওপর জমতে থাকে ধুলো আর অবহেলার আস্তরণ। অপেক্ষায় থাকে আমর্না। অনেক, অনেকদিনের অপেক্ষা। ততদিনে কোথায় হারিয়ে যায় এক অনাদৃত শিল্পী, এক ক্ষমতালোভী সেনাপতি, এক বালক ফারাও। চিরকালের মতো হারিয়ে যায় এক অনিন্দ্যসুন্দরীও। হারিয়ে যায় একেশ্বরবাদ আর বহু ঈশ্বরবাদের দ্বন্দ্ব।
আর থাটমসের পরিত্যক্ত কর্মশালার এককোণে সবার চোখের আড়ালে পড়ে থাকে এক উজ্জ্বল দুষ্প্রাপ্য রত্ন। একটি লাপিস লাজুলি— মধ্যরাতের আকাশের মতো তার রঙ, সোনালি শিরাগুলো দেখলে মনে হয় আকাশে তারা ফুটে আছে। এক ফারাওয়ের নয়নের মণি। জানতে পারে না থাটমস, জানতে পারে না হোরেমহেব। তারও ওপর জমতে থাকে ধুলো আর বিস্মৃতির চাদর। তৈরি হয় অন্য এক প্রেক্ষাপট। ইতিহাস প্রস্তুতি নেয় নতুন এক অধ্যায়ের।
দুই
মে ২০১৮, কলকাতা
বিশ্বসংসার ভুলে প্রাচীন এক কাগজের ওপর ঝুঁকে ছিলেন মানুষটি। পেন্সিল দিয়ে ভীষণ সাবধানে প্যাপিরাসের মার্জিনে কিছু লিখছিলেন মাঝে মাঝে। এরকম সময় নাকি বন্যা, ঝঞ্ঝা, প্লাবন, দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা—কোনোকিছু ঘটলেও টের পান না তিনি। হঠাৎ কানের ঠিক পাশে মৃদু একটা সুড়সুড়ির সঙ্গে মিহি সুরে—‘ম্যাঁও।’
প্রবল চমকে উঠেছিলেন ঐতিহাসিক মহাশয়। পেন্সিল কেঁপে গিয়ে আর একটু হলেই খোঁচা লেগে প্রাচীন প্যাপিরাসটির দফা সেরেছিল আর কি। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে চাপা একটা খিঁকখিঁক আওয়াজ কানে আসাতে বিরক্ত হওয়ার কথা মুহূর্তে ভুলে গেলেন তিনি। বরং উজ্জ্বল হাসিতে মুখ ঝলমল করে উঠল তাঁর।
“কী রে, এই এলি?”
তাঁর ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে একটি মেয়ে। গার্গী— মুখখানি সারল্যে মাখামাখি। চাপা হাসিতে চোখ দুটো চকচক করছে। কোলে থাবা বাড়িয়ে একটা বেড়াল, নধরকান্তি এবং কুচকুচে কালো।
“শিগগির ওটাকে সরা, আমার প্যাপিরাসের দিকে ব্যাটার কুনজর।” প্রাচীন লিপিগুলিকে ঝটপট সামলাতে সামলাতে ঐতিহাসিকের ভীত উক্তি।
“মামু, তুমি যে কেন ভুষোর নামে মিথ্যা দোষ দাও বুঝি না।” সখেদে বলে গার্গী।
কোল থেকে নামিয়ে দিতে গার্গীর আদরের ভুষো ভারি বিরক্তভাবে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। রাস্তা থেকে একে কুড়িয়ে পেয়েছিল গার্গী বছর দু-এক আগে। তখন হাড় জিরজিরে একরত্তি ছানা, এখন যদিও আদরযত্নে পালোয়ানমার্কা চেহারা হয়েছে তার।
মিটমিট করে হেসে চেয়ার টেনে মামুর পাশে বসে পড়ে গার্গী। তার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা এই ঘরটা। হয়তো তার নিজের ঘরটির থেকেও প্রিয়। সেই কোন ছোটোবেলা থেকে সারাবছর ধরে অপেক্ষা করত এই মে মাসের জন্য। গরমের ছুটি পড়লেই সোজা মামুর কাছে। ঐতিহাসিক মহলে একডাকে সবাই চেনে তার মামুকে। শুধু নিজের দেশে নয়, ইজিপ্টোলজিস্ট ডক্টর অর্ধেন্দুশেখর রায়চৌধুরী নানা আন্তর্জাতিক সম্মানে ভূষিত হয়েছেন বহুবার। নিজের লম্বা নাম আর পাণ্ডিত্য ছাড়া আর সমস্ত বিষয়েই সম্পূর্ণ বাহুল্যবর্জিত এই মানুষটি। নিজের সংসার নেই; ইতিহাসের, বিশেষ করে প্রাচীন ইজিপ্টের পটভূমিই বোধ হয় তাঁর সংসার। একমাত্র পিছুটান এই ভাগনি। গার্গীকে তিনি সন্তানসম স্নেহ করেন। মামা-ভাগনি মিলে ইতোমধ্যে বেশ কিছু রহস্যের সমাধানও করে ফেলেছেন। গার্গী যদিও ইতিহাসের ছাত্রী নয়, তার বিষয় রসায়ন। সে এখন স্নাতকোত্তর বিভাগের ছাত্রী। তবে ইতিহাস তার নেশা। ছোটো থেকে গরমের ছুটিগুলোতে মামুর পাশে পাশে ছায়ার মতো থেকে ধীরে ধীরে ইতিহাসের প্রতি তার তীব্র ভালোবাসা গড়ে উঠেছে। হয়তো এই কারণেই তার বন্ধুসংখ্যা একটু কম। কিন্তু মামুর দৌলতে তার জীবনে রহস্য ও উত্তেজনার কোনও অভাব নেই।
“এটা কীসের আমন্ত্রণপত্র, মামু?” টেবিলের একপাশে রাখা আকর্ষণীয় কার্ডটির দিকে হাত বাড়ায় গার্গী। আমন্ত্রিত বক্তা হিসেবে নানা মিউজিয়াম, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আহ্বান পান অর্ধেন্দুশেখর। “কেরালার মুজিরিস হেরিটেজ প্রজেক্ট, সেটা কী গো?” গার্গী কার্ডের ওপরের লেখাটা পড়ে।
“মুজিরিসের কথা তো তুই জানিস নিশ্চয়ই, ভারতবর্ষের হারিয়ে যাওয়া বিখ্যাত এক বন্দর। পেরিয়ার নদীর মুখে, মানে আরব সাগরের ওপর এখনকার মালাবার কোস্টে ছিল এই বন্দর নগরী। আসলে কত পুরোনো সেই নিয়ে নানা মুনির নানা মত। কেউ কেউ মনে করেন, তিন হাজার বছর আগে তৈরি হয়েছিল এই মুজিরিস। ইজিপ্ট, ব্যাবিলন, রোম— সমস্ত প্রাচীন সভ্যতার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল এই বন্দরের।” ঈষৎ থামলেন অর্ধেন্দু।
“তারপর? হারিয়ে গেল কেন?” গার্গী ব্যস্ত হয়ে বলে।
“আনুমানিক ১৩৪০-৪১ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ কোনও ভয়ানক ঝড় বা ভূমিকম্প বা এরকম কোনও কারণে একেবারেই আচমকা হারিয়ে যায় মুজিরিস। যাকে বলে রাতারাতিই বেমালুম হাওয়া।”
“তারপর, এরা খুঁজে পেল? কীভাবে?” গার্গীর চুল খাড়া হয়ে ওঠে।
“সে কি আর একদিনে রে? প্রাচীন তামিল সাহিত্যে এই বন্দরের কথা পাওয়া যায়, আনুমানিক একটা অবস্থানও। কিন্তু বহুদিন পর্যন্ত সেরকম কিছু হদিস বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তারপর সম্ভবত ১৯৮৩-এ কেরালার পট্টনাম গ্রামে অনেকগুলো প্রাচীন রোমান মুদ্রা পাওয়া যায়। সেই এলাকায় বহুবছর ধরে খননকার্য চালিয়ে এই হারিয়ে যাওয়া বন্দরের নানা ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার করে কেরালার একটি সংস্থা। অবিশ্যি পট্টনামই সেই মুজিরিস কি না তা নিয়ে প্রচুর মতভেদ আছে।” অর্ধেন্দুর মুখে হাসি ফুটে ওঠে। তিনিও তাঁর এই প্রিয় শিষ্যার অপেক্ষায় থাকেন।
“কিন্তু এই হেরিটেজ প্রজেক্টটা কী?” গার্গীর কৌতূহলের শেষ নেই।
“আসলে ওটা একটা ট্যুরিজম প্রজেক্ট। এই ক’বছর হল শুরু হয়েছে, বা হচ্ছে বলতে পারিস। পুরো সাইটটা ঘুরিয়ে দেখাবে, যার ইচ্ছা একটু পড়াশোনা করতে পারে মুজিরিস নিয়ে, এই আর কি।”
“তোমাকে কীসের ওপর বলতে ডেকেছে?” গার্গী নাছোড়বান্দার ঠাকুরদা।
“ওই একটা সেমিনার আছে পরের মাসে, আমাকে মুজিরিস আর ইজিপ্টের মধ্যে প্রাচীন বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়ে বলতে হবে।”
“আমিঁও যাবোঁ তোমাঁর সাথেঁ এবাঁর…” এতক্ষণে আসল সুরটা ধরে গার্গী।
“আরে দাঁড়া, আমি হ্যাঁ বলিনি এখনো ওদের। আগে এটার পাঠোদ্ধার করতে হবে খুব শিগগির।” হাতে ধরা প্যাপিরাসটা দেখান অর্ধেন্দু।
“ওসব ছাড়ো এখন। ভারতবর্ষের সঙ্গে কী কী জিনিসের ব্যাবসা চলত প্রাচীন ইজিপ্টের?” গার্গী আবার লেগে পড়ে।
“আবার কী—হাতির দাঁত, মুক্তো, মশলা, বিশেষ করে কালো গোলমরিচ। জানিস, হাসবি না কিন্তু, ফারাও দ্বিতীয় রামসেসের মমির নাকের ছিদ্র ঠাসা ছিল এই গোলমরিচ দিয়ে। এটা মমি তৈরির প্রক্রিয়ার অংশ আর কি। সেই গোলমরিচ কিন্তু এই মুজিরিস থেকেই যেত ইজিপ্টে। উফ্, বললাম হাসিস না!”
নাহ্, শেষরক্ষা হল না। চেপে রাখা হাসিটা এবার গার্গীর নাক-মুখ দিয়ে ঘোঁতমতো একটা আওয়াজ করে বেরিয়ে এল— “ইশ্ মামু, মমি হয়েও হাঁচত তাহলে বেচারা রামসেস। হিহি, নাকে ঠাসা গোলমরিচ!”
হাসতে হাসতে গার্গী হয়তো পড়েই যেত চেয়ার থেকে, বাঁচাল শশিদা। শশিকান্ত হল অর্ধেন্দুশেখরের সর্ব কাজের কাণ্ডারি। সে না থাকলে এই মানুষটি হয়তো তাঁর পাণ্ডিত্যের সমুদ্রে ডুবে সময়মতো খাওয়াদাওয়া করতেও ভুলে যেতেন। তবে তাঁর দৈনন্দিন জীবন এতটাই সাধারণ যে শশিকান্তর রান্নাবান্না করে একেবারেই সুখ হয় না। সেও অপেক্ষা করে থাকে কবে তার গার্গীদিদিমণি আসবে, আর সে আশ মিটিয়ে নানারকম রান্না করে তাকে খাওয়াবে। বলা বাহুল্য, গার্গীও তাকে একেবারেই নিরাশ করে না।
“দিদিমণি, লুচি ভেজেছি, এসো।” নীচ থেকে শশিদার গলা ভেসে আসে।
লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ায় গার্গী।— “ওহ্ শশিদা, ইউ আর গ্রেট!” নাচতে নাচতে বেরিয়ে যাচ্ছিল সে, হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে বলে, “যাই বলো, আমি তোমার সঙ্গে যাবই।”
দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে যায় গার্গী। সস্নেহে সেদিকে তাকিয়ে থাকেন অর্ধেন্দু। এই ক’টা দিন বাড়িটা একেবারে মাতিয়ে রাখে মেয়েটা। ওর মনটা যেন এখনও পড়ে আছে কৈশোরের দরজায়। থাক, যতদিন এরকম থাকে। একটা পরিতৃপ্তির নিশ্বাস ফেলে আবার প্রাচীন প্যাপিরাসের মধ্যে ডুবে যান ঐতিহাসিক।
৬ই ডিসেম্বর, ১৯১২, আমর্না
একরাশ ধুলো উড়িয়ে ভীষণ অপরিষ্কার একটা জিপ ছুটে চলেছে এবড়ো-খেবড়ো রাস্তা ধরে। গাড়ির ছাদে ছোট্ট, প্রায় চোখে না পড়ার মতো একটা জার্মান পতাকা আটকানো। গাড়ি চালাচ্ছেন জার্মান পুরাতত্ত্ববিদ বরশার্ড। জিপের পেছনের আসনে তাঁর দল বিরক্তমুখে বসে। তারা বরশার্ডের জেদে বেশ অখুশি। কম দিন তো হল না। এবার যেন বুনোহাঁসের পেছনে ছোটা হচ্ছে। কেন রে বাবা, তোর না-হয় চরম দায়, বার্লিনে দেখাবার মতো কিছু নিয়ে না যেতে পারলে মুখ দেখাতে পারবি না, তার জন্য পুরো দলটাকে এরকম নাজেহাল করার মানে হয়! তাছাড়া পাওয়ার আর কিছু বাকি আছে কি? ব্রিটিশ পুরাতত্ত্ব বিভাগ কম দিন তো হল না আমর্নার দিগ্বিদিকে খুঁড়ে চলেছে। কিছু কি আর রেখে গিয়েছে ওরা এতদিনে?
সেই কবে ১৮৮৭ নাগাদ জ্বালানি খুঁজতে গিয়ে এই অঞ্চলের এক মহিলা প্রায় তিনশোটি লিপি আঁকা মাটির ফলক খুঁজে পায়। পরে বোঝা যায়, সেগুলো ফারাও আখেনআটেনের কূটনৈতিক নথি। তার অনেক আগে থেকেই অবশ্য এই এলাকায় ছোটোখাটো খননকার্য চালানো হয়েছিল, তবে তা সেরকম কিছু নয়। এই ফলকগুলো প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই ব্রিটিশ আর ইজিপশিয়ান পুরাতত্ত্ববিদরা পুরোদমে খননকার্য শুরু করে দিয়েছিল। একটু একটু করে আবিষ্কৃত হল হারিয়ে যাওয়া এক শহর। প্রাসাদ, সাধারণ বাড়ি, আটেনের বিশাল মন্দির; এক হারিয়ে যাওয়া ফারাওকে যেন নতুন করে খুঁজে পাওয়া গেল। ফারাওয়ের পাশে তাঁর রানিকেও পাওয়া গেল। রানি নেফারতিতি, আশ্চর্য তাঁর রূপ। কিন্তু পাওয়া গেল না রানির কোনও সমাধিমন্দির। হয়তো রানি এখানে মারা যাননি তাও হতে পারে। মূল ইজিপ্ট থেকে এই জায়গা বেশ দূরে। এইটুকু বোঝা গিয়েছে, এই ফারাও আখেনআটেন একমাত্র সূর্য দেবতা আটেনের পূজারি ছিলেন। হয়তো সেই কারণেই তাঁকে আলাদা রাজধানী প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছিল, কেবলমাত্র আটেনেরই পুজো হত সেখানে। এসব ছাড়াও কাচের কারখানার ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গিয়েছে।
বরশার্ড আরও কী পাওয়ার আশা রাখেন, সে তিনিই জানেন। পুরাতত্ত্ববিদরা খননকার্য শুরু করার অনেক আগেই কত কিছু যে লুঠ হয়ে গিয়েছে, তার হিসেব নেই। দামি কিছু থাকার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
অবাক হয়ে সবাই দেখে, জিপ দক্ষিণ-পশ্চিমদিকে ঘুরছে। ওদিকটা একেবারেই ধু ধু। কেউই তাই ওদিকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়নি আগে। সেই কারণেই হয়তো বরশার্ড একটা শেষ চেষ্টা করে দেখছেন।
১৯২৪, নয়েস মিউজিয়াম, বার্লিন
বিশাল হলঘরে তিলধারণের জায়গা নেই। কাগজের রিপোর্টার, ঐতিহাসিক, বৈজ্ঞানিক, সাহিত্যিক, শিল্পী, অভিনেতা— খুঁজলে বার্লিনের সমস্ত বিখ্যাত মানুষকেই হয়তো পাওয়া যাবে ভিড়ের মধ্যে। তাছাড়া বিভিন্ন দেশের বিশিষ্ট আমন্ত্রিত অতিথিগণও আছেন। উপবিষ্ট দর্শকের ঠিক সামনে পর্দা ঢাকা একটা চৌকোনা অংশ। সবাই অধীর আগ্রহে সেই দিকেই তাকিয়ে আছে।
ধীরে ধীরে এগিয়ে আসেন একজন সৌম্যদর্শন মানুষ, অভ্যর্থনা জানান সমবেত অতিথিদের। ইনি জেমস সাইমন। পুরাতত্ত্ববিদ বরশার্ডের নেতৃত্বে আমর্না খননকার্যের ইনিই ছিলেন প্রধান পৃষ্ঠপোষক। খননকার্যে লব্ধ প্রায় সমস্ত জিনিস ওঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহেই স্থান পেয়েছিল। তার মধ্যে কিছু কিছু সর্বসাধারণের জন্য প্রদর্শিত হয়েছে কয়েকবার, কিন্তু বিশেষ একটি মহামূল্যবান দ্রষ্টব্য বস্তু কোনোদিনই লোকচক্ষুর সামনে আসেনি। আজ এই প্রথম পৃথিবীর মানুষ স্বচক্ষে দেখতে পাবে সেটা। অন্যান্য জিনিসগুলির সঙ্গে সেই অদৃষ্টপূর্ব বস্তুটিও সাইমন দান করেছেন মিউজিয়ামকে। এই ক’বছরে বহু বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে সেই বিশেষ জিনিসটিকে ঘিরে। আজ অবশেষে মুখোমুখি পৃথিবীর মানুষ ও এক হারিয়ে যাওয়া রানি।
পর্দা সরে যায় নাটকীয়ভাবে। সমবেত মানুষের প্রথমে স্তব্ধ হয়ে যায়, পরমুহূর্তে ফেটে পড়ে বিস্ময়ে। বাস্তবিক এই অপূর্ব নিখুঁত আবক্ষ মূর্তি সম্ভবত প্রাচীন ইজিপ্টের শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম।
প্রাথমিক বিস্ময়ের ধাক্কা কাটলেই সাইমনের দিকে অবিশ্রান্ত প্রশ্নবাণ নিক্ষিপ্ত হতে থাকে।— “এটা কি সত্যি যে ইজিপ্ট সরকারের সঙ্গে ফারাও নেফারতিতির এই আবক্ষ মূর্তি নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে?”
সাইমন নিজেকে গুছিয়ে নেন। তারপর বলেন, “হ্যাঁ, এ-কথা সত্যি। ইজিপ্ট নেফারতিতিকে ফেরত চায়। কিন্তু রানি এখানেই থাকবেন, আপনারা নিশ্চিন্ত থাকুন।”
“কিন্তু এ-কথা কি সত্যি নয়, লুকিয়ে নিয়ে আসা হয়েছিল এই মূর্তি? খননকার্য শেষে জানানো হয়নি নাকি?” শানিত প্রশ্ন ধেয়ে আসে।
সামান্য অস্বস্তিতে পড়েন সাইমন। তবে তা বুঝতে দেন না, শান্তভাবে বলেন, “দেখুন, ইজিপ্টকে জানানো হয়েছিল এক রানির মূর্তি আমরা পেয়েছি। ওরা নিজেরাই খতিয়ে দেখেনি, তাছাড়া তখন আমরাও সঠিক বুঝিনি বরশার্ড কী অমূল্য বস্তু উদ্ধার করেছেন।”
“তাহলে এতদিন ধরে লোকচক্ষুর সামনে আসেনি কেন এ-বস্তু?” এই সাংবাদিক নির্ঘাত ইজিপ্টের।
সামান্য আমতা আমতা করেন সাইমন— “দেখুন, এত বড়ো একটা আয়োজন, সময় তো লাগবেই।” পরমুহূর্তেই কথা ঘুরিয়ে নিয়ে মোলায়েম গলায় বলেন, “বিতর্ক ছাড়া এই অনুপম মূর্তিটির ব্যাপারে অন্য কোনও প্রশ্ন নেই কারও?”
একসঙ্গে বেশ কয়েকটি গলা শোনা গেল এবার— “বাঁ কানের ওপরের অংশ ভাঙা, একটি চক্ষু মণিহীন কেন? এইভাবেই কি মূর্তিটি পাওয়া গিয়েছে?”
হাত তুলে সবাইকে শান্ত হতে বলেন সাইমন। এবার আশ্বস্ত লাগে তাঁকে। যাক, আলোচনাটা ঘুরিয়ে দেওয়া গিয়েছে। বলতে থাকেন, “এইভাবেই পাওয়া গিয়েছিল। কোনো-কোনো ঐতিহাসিকের ধারণা, নেফারতিতির হয়তো চোখের কোনও সমস্যা ছিল। কিন্তু আমর্নার প্রাসাদে পাওয়া অন্যান্য নিদর্শনে তাঁর দুটি চোখই যথাযথ আছে দেখা যায়। সুতরাং, এর পেছনে সম্ভবত অন্য কোনও রহস্য আছে যা আমরা হয়তো কখনোই জানতে পারব না।”
ঠিক মাথার ওপর আর দু-পাশ থেকে আলো ফেলা হয়েছে অপূর্ব ওই মূর্তিতে। কেমন অপার্থিব দেখাচ্ছে যেন। মনে হচ্ছে এই পৃথিবীর কেউ নয় সে। সৌন্দর্যের নতুন সংজ্ঞা তৈরি হচ্ছে আজ। ওই টানা টানা দুই চোখে, ওই অধরোষ্ঠে ফুটে থাকা মায়াবী হাসিতে পৃথিবীকে নতুন করে যেন সৌন্দর্য চেনাচ্ছে এক সূর্যতপা রহস্যময়ী।
তবে তখনও তার যাত্রা শেষ হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিউজিয়াম থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় রানিকে। এক সময়ে বাংকারে থাকারও সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য হয়েছে তাঁর। তারপর নানা মিউজিয়াম ঘুরে আবার বহুবছর পর ফিরে এসেছিলেন সেই নয়েসে। ইজিপ্ট অবশ্য সর্বদাই চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছে তাঁকে ফিরিয়ে আনার। কিন্তু বাড়ি আর ফেরা হয়নি ফারাও নেফারনেফারুআটেনের।
মে ২০১৮, কলকাতা
“মামু, ওটা ইজিপ্টের সূর্য দেবতা আটেনের ছবি না?”
অর্ধেন্দুশেখরের হাতে ধরা সেই প্রাচীন প্যাপিরাসের দিকে দেখিয়ে গার্গী বলে। একদম ওপরে আটেনের পরিচিত ছবি, বাচ্চারা যেমন সূর্য আঁকে অনেকটা সেরকমই, শুধু রশ্মি রেখাগুলোর প্রত্যেকটার শেষে একটা করে মানুষের হাতের পাতা।
“হুম।” অন্যমনস্কভাবে বলেন অর্ধেন্দু।
“কী লেখা আছে গো ওটাতে?” গার্গীর গলায় গল্প শোনার আবদার।
“তুই আমর্না লেটার্সের নাম শুনেছিস নিশ্চয়ই?” প্যাপিরাসটা সাবধানে তুলে রাখতে রাখতে বলেন অর্ধেন্দু।
“সেই আমর্না থেকে উদ্ধার করা মাটির ফলকে লেখা চিঠিগুলো?” গার্গী চেষ্টা করেও ফারাওয়ের নামটা মনে করতে পারে না।
“হ্যাঁ, ইজিপ্ট আর দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার কিছু দেশ যেমন ইরাক, সিরিয়ার শাসকদের মধ্যে লেখা চিঠিপত্র। সে-কালের বিদেশনীতির এক আশ্চর্য নথি। ফারাও আখেনআটেন একেশ্বরবাদী ছিলেন মনে আছে নিশ্চয়ই, আটেন ছাড়া সবার পুজো বন্ধ করে দিয়েছিলেন? তিনিই নতুন রাজধানী আমর্না স্থাপন করেছিলেন। তবে সবক’টা আমর্না লেটারস যে তাঁরই সময়ের, তা নয় কিন্তু। কিছু তাঁর বাবা তৃতীয় আমেনহোটেপের সময়েরও।”
“তা তোমার ওটা তো প্যাপিরাস, ফলক নয়। ওটার সঙ্গে আমর্না লেটার্সের কী সম্পর্ক?”
“বলছি, তাড়া দিস না। এটা ফলক নয় ঠিকই, কিন্তু এটা বাদাখশানের সম্রাটকে লেখা কোনও চিঠির খসড়া। হয়তো পরে এই খসড়া থেকে বক্তব্য ফলকে আঁকা হয়েছিল। খসড়া বলছি দুটো কারণে। এক, এটা হাইরোগ্লিফিকে লেখা। আমর্না লেটার্স অবশ্যই হাইরোগ্লিফিকে লেখা নয়, কারণ বিদেশিরা সেটা পড়তে পারবে না। আর দ্বিতীয়ত, এ-চিঠি কোথাও পাঠানো হয়নি, কারণ এটা আমর্না থেকেই পাওয়া গিয়েছে।”
“কী এমন লেখা আছে ওটাতে যে তুমি দিনরাত্রি নাক গুঁজে পড়ে আছ? আর এটা তুমি পেলেই-বা কোথা থেকে?”
“উফ্, দাঁড়া, বলছি। এত ব্যস্ত কেন? এটা আমাকে ইজিপ্ট সরকারের পক্ষ থেকে পাঠানো হয়েছে। এটাতে লেখা আছে, বাদাখশানের শাসকের কাছে ফারাও দুষ্প্রাপ্য দুটি পাথর চেয়েছেন, যাদের রঙ হবে মধ্যরাতের আকাশের মতো। বদলে ওরা পাবে ইজিপ্টের বিখ্যাত গার্নেট।”
“ভালো আবদার তো!” গার্গী নাক কুঁচকে বলে।
“আবদার কেন হবে, বাদাখশানে সেরা লাপিস লাজুলি পাওয়া যেত, এখনও যায়। বাদাখশান হল আফগানিস্তানে, সেটা নিশ্চয়ই বলতে হবে না?”
“কিন্তু এ কোন ফারাও?” গার্গী জানত না বাদাখশান কোথায়, কিন্তু সেটা বলার কোনও মানে হয় না।
“নাম বা সিলমোহর কিছু নেই, কিন্তু ওপরের ওই সূর্য দেখে নিশ্চিতভাবে বলে যায় ইনি আখেনআটেন। সন্দেহ করা হয়, অল্প সময়ের জন্য নেফারতিতি ফারাও হয়েছিলেন, কিন্তু সেই সংক্রান্ত সমস্ত প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা করা হয় তাঁর মৃত্যুর পর। তাঁর সময়ের এরকম কোনও নথি পাওয়া যায়নি। তাঁর সমাধি পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায়নি আজও।”
“ইশ, পেয়েছিল মামু, সে-পাথর? কী করল সেটা নিয়ে? নেফারতিতিকে দিল?”
“আর তো জানা নেই রে।”
গার্গী খানিকক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর হঠাৎ লাফিয়ে ওঠে— “মামু, ওরা তোমাকে পাথর দুটো খুঁজে বের করতে দিয়েছে!”
ফারাও তুতানখামুনের শেনু আংটি আর ফারাও ক্লিওপ্যাট্রার ক্যাটস-আই উদ্ধার করে দেওয়ার পর ইজিপ্ট সরকার তাঁকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার চোখে দেখে। আরও একটা আশ্চর্য জিনিস তিনি উদ্ধার করেছেন, তবে সেটা ভারতীয় যাদুঘরেই সংরক্ষিত আছে বর্তমানে।
গার্গীর উত্তেজনা দেখে হেসে ফেলেন অর্ধেন্দুশেখর।— “আরে আর কোনও ক্লু নেই কোথাও। সে-পাথর আদৌ এসেছিল কি না ইজিপ্টে, এলেও কোথায় গেল, কোনোভাবেই আর কোনও চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায় না। কেস ক্লোজড।”
“নির্ঘাত দিয়েছিল নেফারতিতিকে, একে তো বেচারির মূর্তিতে একটা চোখ নেই। আচ্ছা মামু, ওই মূর্তিতেই বসানো ছিল না তো পাথরগুলো?”
“তুই গল্প বানানো বন্ধ করবি?”
লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ায় গার্গী। তারপর বেরিয়ে যেতে যেতে বলে, “দেখো, তুমিই ওগুলো উদ্ধার করবে, আর খুব তাড়াতাড়ি।”
অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখছিল গার্গী। ফারাওদের মতো পোশাক আর মাথায় নীল মুকুট পরা এক নারীমূর্তি ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে তার দিকে। মূর্তিটি সামনে আসার পর গার্গী চমকে গিয়ে দেখে, ফারাওয়ের চোখে কালো সানগ্লাস। একেবারে কাছে এসে তর্জনী দিয়ে চশমাটা নাকের ওপর সামান্য নামিয়ে দেয় ফারাও। ভীত গার্গী দেখে, ফারাওয়ের একটা চোখের মণি নেই। সঙ্গে সঙ্গে ঘুম ভেঙে উঠে বসে সে। বাপরে, কী উদ্ভট স্বপ্ন! কিন্তু ঘুমটা ভাঙল কীভাবে? স্বপ্ন দেখে তো নয়। পরমুহূর্তেই গার্গী টের পায়, ফোন বাজছে। নির্ঘাত ওই আওয়াজেই ঘুমটা ভেঙেছে। উফ্, এত সকালে আবার কে? তার ওপর ফোনটা নীচে। মামু কিছুতেই মোবাইল ফোন ব্যবহার করবে না। একটা এক্সটেনশন তো অন্তত ওপরে রাখলে পারে। গজগজ করতে করতে নেমে ফোনটা ধরে গার্গী। শশিদা বোধ হয় বাগানে জল দিচ্ছে।
“হ্যালো!” বলেই একেবারে স্ট্যাচু হয়ে যায় গার্গী। এই গলা এত সকালে শোনার একটাই মানে হতে পারে। সাতসকালে ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামের পুরাতত্ত্ব বিভাগের কিউরেটর অপরেশ বাগচী মামুকে নিশ্চয়ই খোশগল্প করার জন্য চাইছেন না। নির্ঘাত কোনও রহস্য, আর সেটা সমাধান করার জন্য অর্ধেন্দুশেখরের সাহায্যের প্রয়োজন হয়েছে তাঁর। ঘুম-টুম কেটে চাঙ্গা হয়ে যায় গার্গী। চিৎকার ছাড়ে, “মামু-উ-উ-উ-উ!”
সন্ধে নেমে গিয়েছে। অর্ধেন্দুশেখরের দোতলার কাজের ঘরে বড়ো টেবিল ঘিরে চারজন বসে। বাগচী, অর্ধেন্দু নিজে, গার্গী আর ইয়াসির। এই চতুর্থ ব্যক্তিকে বাগচী সঙ্গে করে এনেছেন। বছর পঁয়ত্রিশের এক ইজিপশিয়ান এবং ঐতিহাসিক। আপাতদৃষ্টিতে সদাহাস্যময়, কিন্তু অত অকারণে কান এঁটো করা হাসি গার্গীর একেবারেই না-পসন্দ।
সকালে বাগচী ফোন করে শুধু জানান, তিনি রাজ্যের বাইরে থেকে ফোন করছেন, বিশেষ প্রয়োজন অর্ধেন্দুর সঙ্গে, পৌঁছতে পৌঁছতে বিকেল হয়ে যাবে। অর্ধেন্দু ছাড়া আর কারও পক্ষে নাকি এ-সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়।
এটা শোনার পর থেকে গার্গী প্রত্যেক আধঘণ্টা অন্তর ঘোষণা করেছে যে বাড়ির সমস্ত ঘড়ি স্লো। অবশেষে সাড়ে পাঁচটা নাগাদ ওই ইয়াসিরকে সঙ্গে নিয়ে হাজির হয়েছেন কিউরেটর অপরেশ বাগচী। বিদেশি অতিথির সম্মানে কথাবার্তা ইংরেজিতেই হয়।
“শুনলাম আপনাকে মুজিরিস হেরিটেজ প্রজেক্টে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। আমি, মানে আমরা ওখান থেকেই আসছি।” বাগচীর গলা চাপা উত্তেজনায় কেঁপে ওঠে।
মামা-ভাগনিতে মুহূর্তে চোখাচোখি হয়। ব্যাপারটা কী?
“হ্যাঁ, কিন্তু আমি এখনও যাব কি না কিছু ঠিক করিনি। কী ব্যাপার, বাগচী?”
“এখনও মুজিরিস সাইটের কিছু কিছু জায়গায় খননকার্য চলছে। ওরা একটা বেসরকারি সংস্থাকে দিয়ে কাজটা করালেও আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া স্বাভাবিকভাবেই গোটা ব্যাপারটার তত্ত্বাবধান করে। তাই সেরকম উল্লেখযোগ্য কিছু পেলে আমাদের জানাতে ওরা বাধ্য।”
“কী পেয়েছেন ওঁরা?” গার্গী আর স্থির থাকতে পারে না।
বিশাল এক চুমুকে কফিটা শেষ করে নেন বাগচী। তারপর চকচকে চোখে নিজের ওভারনাইট ব্যাগটা খুলতে খুলতে বলেন, “সপ্তাহ খানেক আগে এটা পায় ওরা। হেরিটেজ প্রজেক্টের সেমিনারে এবারের আলোচ্য বিষয় যেহেতু ইজিপ্টের সঙ্গে মুজিরিসের বাণিজ্যিক সম্পর্ক, তাই ইয়াসিরকে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে ইজিপ্ট থেকে মাস দু-একের জন্য আনা হয়েছে। ও এই ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ। তার মধ্যে এই কাণ্ড।”
মাঝারি আকারের একটা বাক্স খুব সাবধানে টেবিলের ওপর রাখেন বাগচী। গার্গী নিশ্বাস বন্ধ করে ফেলে। অর্ধেন্দুশেখরের মুখে স্মিত হাসি, চোখ দুটো অসম্ভব উজ্জ্বল। তাঁর অসামান্য মেধাকে কাজে লাগানোর মতো কোনও সুযোগ আবার এসেছে কি না সেটাই বোঝার যেন চেষ্টা করছেন।
বাক্সের ডালাটা খুলে ফেলেন বাগচী। ভেতরে খড় আর থার্মোকলের বিছানায় শোওয়ানো রেশমের কাপড়ে মোড়া আরও একটি বাক্স। কাপড়-সমেত বাগচী সেটা অর্ধেন্দুকে ধরিয়ে দেন। তাঁর হাত সামান্য কাঁপছে।
ঘর নিস্তব্ধ। একটা ইঞ্চি ছয়েকের চৌকো বাক্সের দিকে চারটি মানুষ অপলকে তাকিয়ে আছে। বাক্সটি সম্ভবত ব্রোঞ্জের। উচ্চতায় তিন ইঞ্চি মতো। ডালার ডানদিকে নীচের কোণ বরাবর কারও মুখের বাঁ পাশ খোদাই করা, কোনও রানি বা ফারাও হবেন সম্ভবত। বাক্সের বাঁদিকে ওপরের কোণে খোদাই করা সূর্যের প্রতিমূর্তি। গোলাকার সূর্য থেকে বাক্স ঘিরে নেমে এসেছে রশ্মি, প্রত্যেকটা রশ্মির শেষে একটা করে ছোট্ট হাতের পাতা। পাতার মাঝখান থেকে সম্পূর্ণ রশ্মি বরাবর খাঁজ কাটা, অর্থাৎ প্রত্যেকটা রশ্মির মধ্যে যেন সরু ঘাট তৈরি হয়েছে। খাঁজটা রশ্মির শেষ পর্যন্ত গিয়ে থেমে যায়নি, সূর্যকে ঘিরে প্রসারিত হয়েছে। খাঁজের ওপর ভীষণ সূক্ষ্ম ধাতব জালের আবরণ। রশ্মিগুলো ছড়িয়ে পড়েছে বাক্সের ওপরে এবং দুই পাশে। সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে, কোনও রানি বা ফারাও মাথা ঈষৎ উঁচু করে সূর্যের উপাসনা করছেন। বাক্সের সামনের দিকে যেখানে ডালার বিভাজনটা তৈরি হয়েছে সেখানে মাঝবরাবর, অর্থাৎ বাক্সে তালা বা ছিটকিনি সাধারণত যেখানে থাকে, ঠিক সেই জায়গাটাতে ধাতব ফ্রেমে ঘেরা একটা ছোট্ট নীলচে ধূসর পাথর বসানো। পাথরের ঠিক ওপরে একটা রশ্মির শেষ, অর্থাৎ হাতের অংশটা।
“কী আছে এই বাক্সে?” প্রশ্নটা করেই উত্তরটা সম্ভবত বুঝতে পেরেছিলেন অর্ধেন্দুশেখর।
“সেটার জন্যই তো আপনার দ্বারস্থ হওয়া।” মিনমিন করে বলেন অপরেশ বাগচী, “বলা বাহুল্য, আমরা বাক্সটা নানাভাবে খোলার চেষ্টা করেছি। জ্যাম হয়ে গিয়েছে ভেবে জোড়ের মুখটাতে চাড় দিয়েও দেখেছে ইয়াসির, কিন্তু এ আপনি ছাড়া…”
চাড় দেওয়ার কথা শুনে চমকে উঠে অর্ধেন্দু তাকান ইয়াসিরের দিকে। ইয়াসির নির্বিকারভাবে বলে, “পাথরটাতে চাপ দিলে ওটা ওই ফ্রেম থেকে বেরিয়ে ওর ওপরের ওই সূর্যরশ্মির হাতের পাতার ভেতর ঢুকে গিয়ে রশ্মির মাঝের খাঁজটাতে গিয়ে পড়ে। একবার খাঁজে ঢুকে গেলে ওই স্লট বা ঘাট বেয়ে যে-কোনো রশ্মির খাঁজে গড়িয়ে চলে যেতে পারে পাথরটা, সেটা আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন। কিন্তু তাতে বাক্সটা খোলার কোনও সুবিধা হয় না, পাথরটা দামি কিছুও নয়।”
অর্ধেন্দুর কপালে ঘোর ভ্রূকুটি। ইয়াসিরের কথাগুলো শুনে কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছে তাঁর। এ কেমন ঐতিহাসিক? এরকম একটা বাক্স চাড় দিয়ে খোলার চেষ্টা করছে, পাথরটার দাম অর্থমূল্যে বিচার করছে?
ইয়াসির বলে চলে, “ওপরের সূর্যটা নিঃসন্দেহে দেব আটেন বা আটন। গোলাকার সূর্য থেকে রশ্মি নেমে আসছে, সেগুলো এক-একটা মানুষের হাতের মতো, এভাবেই সবসময় আটেনকে দেখানো হত। নীচের ফারাও সূর্য উপাসক আখেনআটেন হতে পারেন বা নেফারতিতি। এইভাবে উপাসনার ভঙ্গিতে আখেনআটেন আর নেফারতিতির দাঁড়িয়ে থাকার ছবি তো বিখ্যাত। আপনি নিশ্চয়ই অনেকবার দেখেছেন সেটা, মিস্টার রায়চৌধুরী?”
জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে অর্ধেন্দুশেখরের দিকে তাকায় ইয়াসির। মৃদু মাথা নাড়েন অর্ধেন্দু।
ইয়াসির আবার বলতে থাকে, “তবে এখানে এটা আখেনআটেন নয়, নির্ঘাত নেফারতিতি। কেন বলছি বলুন তো?”
অর্ধেন্দুশেখর কিছু বলার আগেই লাফিয়ে ওঠেন বাগচী। ইয়াসিরের বক্তৃতা শুনে তিনি যথেষ্ট বিগলিত। মুগ্ধ গলায় বলেন, “এই তো, চোখের মণিটা খোদাই করেনি, চোখটা বিলকুল ফাঁকা, নেফারতিতির মূর্তির বাঁদিকের চোখে যেমন মণি বসানো নেই, ঠিক সে-রকম।”
গার্গী এতক্ষণে কিঞ্চিৎ ধাতস্থ হয়ে স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে বলে, “বাক্সটা একবার ঝাঁকিয়ে দেখব আদৌ কিছু আছে কি না?”
অর্ধেন্দু ধীরে ধীরে বাক্সটা হাতে তুলে নেন।
বাগচী বলেন, “বাক্সটা কিন্তু অত পুরোনো, মানে রানি নেফারতিতির সময়ের নয়। আমাদের, মানে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার বিশেষজ্ঞদের মতে, এটা কিছুতেই সাতশো বছরের বেশি পুরোনো নয়।”
অর্ধেন্দু বাক্সটা হাতে নিয়ে চিন্তায় ডুবে যান। খড় আর থার্মোকল ভরা বড়ো বাক্সটা ইয়াসির সরিয়ে নিয়ে নিজের কাছে রাখেন। বাগচী অর্ধেন্দুকে কিছু বলতে যান, গার্গী নিজের ঠোঁটের ওপর তর্জনী রেখে ইশারায় বারণ করে।
অনেকক্ষণ ধরে বাক্সটার দিকে তাকিয়ে থাকেন অর্ধেন্দু। হঠাৎ ছোট্ট পাথরটার ওপর চাপ দিয়ে সেটা ঢুকিয়ে দেন তার ওপরের রশ্মির হাতের পাতাটার মধ্যে। তারপর বাক্স হেলিয়ে পাথরটা গড়িয়ে দেন রশ্মির খাঁজের মধ্যে দিয়ে। ইয়াসিরের মুখে সামান্য ব্যঙ্গ। বাক্সটাকে হেলিয়ে, ঘুরিয়ে পাথরটাকে এক রশ্মির খাঁজ থেকে পরের রশ্মির খাঁজে নিয়ে যান অর্ধেন্দু, একটা থেকে আর একটাতে। গোলাকার পাথর খুব সহজেই গড়িয়ে যায়। খাঁজের ওপর খুব সূক্ষ্ম জালের মতো থাকার দরুন পাথরটা গড়িয়ে বাইরে চলে আসার সম্ভাবনা নেই। আর শুরুর ওই বিশেষ জায়গাটা ছাড়া আর কোথাও দিয়েই পাথরটাকে রশ্মির খাঁজে ঢোকানোর উপায় নেই।
বাগচী ব্যস্ত হয়ে বলেন, “ডক্টর রায়চৌধুরী!”
মুখ তোলেন অর্ধেন্দুশেখর। চোখ দুটোতে যেন আলো জ্বলছে। স্মিত মুখে বলেন, “ব্যাগাটেলি খেলেননি ছোটোবেলায়? অনেকদিন পরে একটু খেলছি।”
আবার মন দিয়ে গড়াতে থাকেন পাথরটা। একসময় নেফারতিতির মাথার ঠিক ওপরে এসে পৌঁছায় সেটা। এবারে খাঁজটা কপাল বেয়ে নেমে গিয়েছে চোখের দিকে। অর্ধেন্দু পাথরটা গড়িয়ে এনে বসান চোখের শূন্য মণির ওপর।
ইয়াসির পিঠ টান করে বসে আছে, বাগচী ঘামতে শুরু করে দিয়েছেন। গার্গীর হাঁটু দুটো কাঁপছে।
চোখের মণির জায়গায় পাথরটা বসে এখন। সামান্য থামেন অর্ধেন্দু। চোখ তুলে বাগচীকে বলেন, “রানি নন, ফারাও নেফারতিতি।” তারপর পাথরটার ওপর বুড়ো আঙুল দিয়ে চাপ দেন।
খুট আওয়াজটার সঙ্গে সঙ্গে গার্গী চোখ বুজে ফেলেছিল। বাগচীর গলা থেকে হেঁচকি তোলার মতো একটা আওয়াজ বেরোতে আবার চোখ খুলে ফেলেন। টেবিলের ওপর বাক্সটা খোলা পড়ে আছে। ভিতরে হালকা নীল মখমলের ওপর শোওয়ানো একটা পাথর। ঠিক যেন মাঝরাতের আকাশের মতো রঙ। সোনালি শিরাগুলো দেখলে মনে হয় যেন তারা জ্বলছে। গার্গীর ভেতরটা কেমন কাঁদো কাঁদো হয়ে যায়।
অর্ধেন্দু অস্ফুট স্বরে বলেন, “বাদাখশান থেকে দুষ্প্রাপ্য লাপিস লাজুলি এসেছিল তাহলে।”
বাগচী ঢোঁক গিলে ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলেন, “এটাই তাহলে ফারাও নেফারতিতির হারিয়ে যাওয়া চোখের মণি? কিন্তু হিসেব মিলছে না যে। যতদূর জানি, নেফারতিতির মানে ফারাও নেফারতিতির এক চোখে স্ফটিক বসানো আছে, আর এক চোখ ফাঁকা। এটা যদি হারানো মণিটা হয়, তাহলে আর এক চোখের লাপিসটা কোথায়? দুই চোখে দুইরকম পাথর বসানোটা কেমন লাগছে না?”
“লাপিস দুটোই ছিল।” হঠাৎ ইস্পাতের মতো ঠান্ডা একটা গলা ভেসে আসে ওঁদের পিছন থেকে।
চমকে তাকান সবাই। ইয়াসির কখন নিঃশব্দে উঠে গিয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের পিছনে। ঠান্ডা শান্ত গলায় হাতের ছোট্ট পিস্তলটা নাচাতে নাচাতে আবার বলে, “দুটোই ছিল। একটা আছে আমার কাছে আর অন্যটা খুঁজে বেড়াচ্ছি আজ বহুবছর ধরে।”
ইয়াসিরের চোখ দুটো ধকধক করে ওঠে। তারপর রুক্ষ কর্কশ গলায় সে চিৎকার করে ওঠে, “দাও!”
কেউ টেবিল থেকে ওঠার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করে না। বাগচী তোতলাতে থাকে, “ব-ব-বন্দুক কোথা থেকে প-পেলে? ফ্লাইটে সিকিউরিটি চেকিংয়ের সময়ে ধরা পড়ল না তো!”
ইয়াসিরের মুখে ক্রূর একটা হাসি ফুটে ওঠে। চিবিয়ে চিবিয়ে সে বলে, “তোমার মতো একজন বেখেয়াল এবং গবেট লোক কী করে এরকম দায়িত্বপূর্ণ পদে থাকে বুঝি না। এটা বেরেটা পিকো পিস্তল, ওজন সাড়ে তিনশো গ্রামও নয়। কীভাবে এনেছি দেখবে?”
ইয়াসির সামান্য ঝুঁকে খড় আর থার্মোকল ভরা বাক্সটা তুলে নেয়। হাড় জ্বালানো হাসির সঙ্গে বলতে থাকে, “তোমার অলক্ষ্যে এর খড়ের নীচে আরাম করে শুয়ে ছিল আমার পিস্তল। তোমার চোখকে ফাঁকি দিয়ে ওটা ঢোকানো কোনও ব্যাপারই ছিল না। এই বাক্সটার যে সিকিউরিটি চেকিং হবে না, এর জন্য বিশেষ অনুমতি নেওয়া হয়েছে, সেটা তো আমি ভালো করেই জানতাম। তাই আমি নই, তুমিই আমার হয়ে এটা নিয়ে এসেছ। এবার ভালোয় ভালোয় আমার জিনিস আমাকে দাও।”
গার্গীর বুকের ভেতর যেন এক্সপ্রেস ট্রেন চলতে থাকে। কী হবে এবার?
পাশ থেকে অর্ধেন্দু অত্যন্ত শান্ত গলায় বলেন, “তোমার জিনিস বলছ কেন? আর অন্যটাও-বা তোমার কাছে এল কী করে?”
ঠান্ডা চোখে অর্ধেন্দুশেখরকে জরিপ করে ইয়াসির। বোধ হয় এতটা সাহস সে আশা করেনি। হিসহিসে গলায় ইয়াসির বলতে থাকে, “আচ্ছা, শুনেই নাও আশ মিটিয়ে। আমি ফারাও হোরেমহেবের পবিত্র বংশোদ্ভূত। তিনি প্রথম পাথরটা ওই আটেন পূজারি নেফারতিতির কাছ থেকে পেয়েছিলেন। দ্বিতীয়টা কোনও কারণবশত পাননি, সেটা যেন পৃথিবীর বুক থেকে গায়েব হয়ে যায়। আমি প্রাচীন ইজিপ্ট নিয়ে, বিশেষ করে বাকি পৃথিবীর সঙ্গে তার বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়ে পড়াশোনা করেছি, গবেষণা করেছি, বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেছি শুধু ওই দ্বিতীয় পাথরটা খুঁজে বের করব বলে। আমি নিশ্চিত ছিলাম, ও-পাথর ইজিপ্টের বাইরে কোথাও চলে গিয়েছে। কোনও সংগ্রহশালায় থাকলে খবর অবশ্যই পেতাম।
“মুজিরিসে খননকার্য শুরু হওয়া থেকে আমি খবর রেখেছি। তারপর ইজিপ্ট সরকারের পক্ষ থেকে এখানে আসাটা একেবারেই সহজ ছিল, কারণ বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমি যথেষ্ট পরিচিত। অবশ্য আমার আসল উদ্দেশ্য সম্পর্কে ইজিপ্ট সরকারের কোনও ধারণাই নেই।” এবার তৃপ্তির হাসি ফুটে ওঠে ইয়াসিরের মুখে।— “ওই বাক্সটা দেখামাত্রই ওতে কী আছে আমি বুঝতে পেরেছিলাম। শুধু কী করে খুলতে হবে সেটাই বুঝতে পারিনি।”
বাগচী কিছু একটা বলতে যান, দাঁত খিঁচিয়ে ওঠে ইয়াসির।— “অনেক কথা হল, এবার আমার জিনিস আমার কাছে আসুক।”
ইস্পাতের মতো কঠিন গলায় অর্ধেন্দুশেখর বলেন, “হোরেমহেব প্রথম পাথরটা ফারাও নেফারতিতির কাছ থেকে পায়, না চুরি করে, ইয়াসির? ঠিক যেমন তুমি এখন করছ? হোরেমহেব সেনাপতি আইয়ের সঙ্গে একজোট হয়ে ষড়যন্ত্র করেছিল তাঁর বিরুদ্ধে। তিনি স্বেচ্ছায় তাকে এই মহার্ঘ্য বস্তু দান করবেন, এটা বিশ্বাসযোগ্য কি?”
উত্তেজনায় উঠে দাঁড়িয়েছেন তিনি, যদিও গলা শুনে বোঝার উপায় নেই।
লাফ দিয়ে টেবিলের সামনে গিয়ে পড়ে ইয়াসির, বাক্সটার দিকে ছোঁ মারতে যায়। গার্গী হাত বাড়িয়ে টেনে নেয় বাক্সটা। বিফল ইয়াসির ক্রোধে অন্ধ হয়ে জোরালো একটা ধাক্কা মারে গার্গীকে। গার্গী বাক্সসমেত ছিটকে পড়ে। তার দিকে ছুটে যান অর্ধেন্দু আর অপরেশ বাগচী।
ঠিক এই সময় দুলকি চালে হেলেদুলে সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসছিল ভুষো। এতক্ষণ কোথায় ছিল কে জানে। হয়তো গোলমাল তার কানে গিয়ে থাকবে। কৌতূহলী কালো বেড়াল ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে ভেতরে ঢুকবে কি না ভাবছিল, হঠাৎ সে পান্না-সবুজ চোখ দুটো মেলে গার্গীকে ছিটকে পড়তে দেখল। মুহূর্তে ফুলে দ্বিগুণ হয়ে গেল ভুষো। পিঠটা ধনুকের মতো বেঁকিয়ে, নখ বের করে, মুখ দিয়ে চাপা গরগর করতে করতে দিল একটা পেল্লায় লাফ।
বিকট একটা চিৎকার শুনে পেছনে তাকালেন অর্ধেন্দু। ঘুরে দাঁড়িয়েছে ইয়াসির। এক পা, এক পা করে পিছিয়ে আসছে তাঁদের দিকে। মুখ ফ্যাকাশে। ইয়াসিরের গলা দিয়ে আর্তনাদের মতো বেরিয়ে আসে, “অ্যাই, যাহ্ যাহ্!” আতঙ্কে চোখ ঠিকরে আসছে তার। উগ্রমূর্তিতে তার দিকে এগিয়ে আসছে ভুষো।
গার্গী যন্ত্রণা ভুলে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ায়।
পিছোতে পিছোতে প্রায় গার্গীদের সামনে চলে এসেছে ইয়াসির। ফ্যাসফ্যাসে গলায় চিৎকার করে বলে চলেছে, “ওকে সরে যেতে বলো! আমার বেড়াল সহ্য হয় না। প্রচণ্ড অ্যালার্জি। সরতে বলো, না-হলে…”
ভুষোর দিকে তাক করে ইয়াসিরের পিস্তল ধীরে ধীরে উঠে আসে, আর গার্গীর মাথার মধ্যে সব ওলটপালট হয়ে যায়। অন্ধের মতো পাশে হাত বাড়িয়ে কী যেন একটা ধরে, তারপর সেটা বোঁ করে ঘুরিয়ে সটান বসিয়ে দেয় ইয়াসিরের পিঠে। ঘোঁকমতো একটা আওয়াজ তুলে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে অজ্ঞান ইয়াসির। গার্গীর কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে ভুষো। তাকে জাপটে ধরে গার্গীও মাটিতে বসে পড়ে, তার পা দুটো ঠকাঠক কাঁপছে তখন।
“শেষে ফারাও তুতানখামুনের খাটের পায়া দিয়ে মারলি হতচ্ছাড়াটাকে!” অর্ধেন্দুর হাসিমাখা গলা ভেসে আসে।
চমকে তাকায় গার্গী। তুতানখামুনের সেই বিখ্যাত ক্যাম্প খাটের পায়ার আড়ালে লুকিয়ে রাখা রাজকীয় আংটি উদ্ধার করে দেওয়ার পর ইজিপ্টের পক্ষ থেকে অর্ধেন্দুশেখরকে সেই পায়াটাই উপহার দেওয়া হয়েছিল। গার্গী সেটাই হাতের কাছে পেয়ে কাজে লাগিয়েছে। মোক্ষম অস্ত্র।
“উফ্, কী ভয়ানক কাণ্ড!” বলতে বলতে অপরেশ বাগচী সামনের চেয়ারে না দেখে বসতে গিয়ে আর একটু হলেই ভুষোর ওপরে বসে পড়তে যাচ্ছিলেন। ভুষো ফ্যাঁস করে বাগচীর দিকে থাবা চালিয়ে গম্ভীর মুখে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। তার দিন বেশ ভালো গেল আজ।
এতক্ষণে প্রাণ খুলে হেসে ওঠে সবাই।
ঠিক সেই মুহূর্তে শশিদা আর একপ্রস্থ কফি আর চিঁড়েভাজা নিয়ে ‘তোমাদের এত গোলমাল কীসের’ বলে এসে দাঁড়াল দরজার মুখে।
***
ইয়াসিরকে শাস্তি দেওয়ার দায়িত্ব ইজিপ্ট নিয়েছে। লোক পাঠিয়ে তারা ইয়াসিরকে ফেরত নিয়ে গিয়েছে। অবশ্য তার আগে বাগচী তাকে কলকাতা পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিল। বলা বাহুল্য, তাকে প্রথম পাথরটা ফেরত দিতে হয়েছে। আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার পক্ষ থেকে দ্বিতীয় পাথরটিও উপহার হিসেবে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে ইজিপ্টে। পাথর দুটি এখন ইজিপ্টের জাতীয় সম্পত্তি।
গার্গী তৈরি হচ্ছে মামুর সঙ্গে মুজিরিস হেরিটেজ প্রজেক্টে যাবে বলে। অর্ধেন্দুশেখর ভাবছেন, ইজিপ্ট থেকে মুজিরিসে আসা এক দুষ্প্রাপ্য পাথরের কাহিনি বলবেন সেখানে। কিন্তু কীভাবে সে-পাথর নেফারতিতির কাছ থেকে মুজিরিসে এসে পড়ল, তা বোধ হয় বাকি জীবন ধরে খুঁজলেও আর জানা যাবে না।
আরও একবার ইজিপ্ট চেষ্টা করেছিল তাদের অপরূপা ফারাওকে নিজের দেশে ফিরিয়ে আনতে। বিফল হয়েছে যথারীতি। বার্লিনের নয়েস মিউজিয়াম আলো করে এখনও থেকে গিয়েছেন সূর্যতপা ফারাও নেফারতিতি। তাই উপায়ান্তর না দেখে শেষ পর্যন্ত ইজিপ্ট নয়েসেই পাঠিয়ে দিয়েছে দুষ্প্রাপ্য লাপিস লাজুলি। যাঁর চোখের মণি, তাঁর কাছেই থাক না-হয়। এবার থেকে নেফারতিতির মনোমুগ্ধকর আবক্ষ মূর্তির পাশে শোভা পাবে দুটি ধূসর নীলচে পাথর। তাদের রঙ দেখে মনে হবে যেন মধ্যরাতের আকাশ। সোনালি শিরাগুলো যেন জ্বলে থাকা তারা।
প্রায় শেষরাত। ঘোলাটে একটা ধোঁয়ায় ভরে যাচ্ছে নয়েসের সেই বিশেষ হলঘর। আশ্চর্য, ফায়ার অ্যালার্ম বেজে উঠছে না কিন্তু। পাক খেয়ে খেয়ে ধোঁয়াটা ঘিরে ফেলেছে নেফারতিতির আবক্ষ মূর্তি। খুব নরম গলায় কে বলে ওঠে, “ফারাও নেফারনেফারুআটেন, আমি ভুল করেছিলাম। তোমাকে অসম্পূর্ণ করে রাখার কোনও অধিকার আমার ছিল না। তোমাকে রক্ষাও আমি করতে পারিনি। আজ তোমার দৃষ্টি আবার সম্পূর্ণ হল, নতজানু হয়ে শিল্পী থাটমস ক্ষমা ভিক্ষা চাইছে। না-হলে যে আমার মুক্তি নেই।”
একটুক্ষণ সব চুপচাপ। সারা পৃথিবী যেন স্তব্ধ হয়ে শুনছে। তারপর আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল সমস্ত ধোঁয়া। আপন মহিমায় জ্বলজ্বল করতে থাকলেন ফারাও নেফারনেফারুআটেন। অসম্পূর্ণা হয়েও যিনি পূর্ণরূপা।
***
সারা বাড়ি নিস্তব্ধ এখন। কাল সকালে মুজিরিস যাত্রা। গার্গী সারাদিন বকবক করে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।
প্রাজ্ঞ ঐতিহাসিকের দোতলার কাজের ঘরের আলো জ্বলছিল এতক্ষণ। এবার আলোটা নিভিয়ে খোলা জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়ান অর্ধেন্দুশেখর। মনে মনে তিনি যেন ঘুরে বেড়ান প্রাচীন আমর্নার এবড়ো-খেবড়ো রাস্তায়। রাজকীয় সমাধিস্থলে তাঁর দেহ পাওয়া যায়নি। মাঝে ভাবা হয়েছিল, বালক ফারাও তুতানখামুনের সমাধি-সংলগ্ন লুকোনো কামরায় বুঝি অবশেষে পাওয়া গেল তাঁর দেহ। সে-ধারণাও ভুল প্রমাণিত হয়েছে। তাহলে কোথায় তিনি? অর্ধেন্দুশেখরের বার বার মনে হয়েছে, আমর্নাকে ঘিরে যে ইজিপ্টের পূর্ব মরুভূমি, সেখানেই কোথাও তাঁকে লুকিয়ে ফেলা হয়েছে চিরতরে। হঠাৎ একদিন কেউ নিশ্চয়ই খুঁজে পাবে, হয়তো তিনিই।
মৃদু হাসেন ঐতিহাসিক। ভবিষ্যতের ঝুলিতে কী আছে কে বলতে পারে? দেখাই যাক না।
লেখিকার অন্যান্য লেখা
শুভাঞ্জন ব্যানার্জী ▪ প্রবাহনীল দাস
লিও তলস্তয় ▪ নলিনাক্ষ ভট্টাচার্য
তাপস মৌলিক ▪ অংশু পাণিগ্রাহী ▪ বাণীব্রত গোস্বামী ▪অরিন্দম ঘোষ ▪ রঞ্জন দাশগুপ্ত ▪ সিদ্ধার্থ দাশগুপ্ত ▪শাশ্বত কর ▪ রাজীব রায় গোস্বামী ▪ সায়নদীপা পলমল ▪ প্রদীপ কুমার দাস
বদ্রীনাথ পাল ▪ তাপস বাগ ▪ বসন্ত পরামানিক ▪ গোবিন্দ মোদক ▪ সুব্রত দাস ▪ অর্ণব ভট্টাচার্য ▪ সুজাতা চ্যাটার্জী ▪ মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় দাস ▪ মধুমিতা ভট্টাচার্য ▪ ড. রমলা মুখার্জী ▪ সনৎকুমার ব্যানার্জী ▪ বিদ্যুৎ মিশ্র ▪ রাজর্ষি মণ্ডল ▪ রূপালী মুখোপাধ্যায় ▪ শক্তিপদ পণ্ডিত ▪ শম্ভু সরকার ▪ সুব্রত চৌধুরী
অদিতি ভট্টাচার্য ▪ দীপঙ্কর চৌধুরী ▪ মৌসুমী রায় ▪ সবিতা রায় বিশ্বাস ▪ সহেলী রায় ▪ কিশোর ঘোষাল
অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায় ▪ অরিন্দম দেবনাথ ▪ কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায় ▪ দীপক দাস ▪ ড. উৎপল অধিকারী ▪ চন্দ্রানী মজুমদার
সায়ন্তনী পলমল ঘোষ ▪ সোমা দে ▪ শংকর লাল সরকার ▪ সন্দীপন সাহা
অলংকরণ
মায়াসখা নন্দী ▪ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ▪ একপর্ণিকা ক্রিয়েটিভস
দু-হাজার তিনশো বছর আগে পাটলিপুত্র থেকে তক্ষশিলা পর্যন্ত বাণিজ্যদলের সংঘাতবহুল রোমাঞ্চকর যাত্রাপথ শেষে এক তরুণ পৌঁছল তক্ষশিলায়। সেই নগরীর রাজনৈতিক পরিস্থিতি তখন উত্তাল। একদিকে গ্রিক বীর আলেকজান্ডার, অন্যদিকে আচার্য কৌটিল্যের অখণ্ড ভারতের স্বপ্নে মশগুল একদল যোদ্ধা। অসংখ্য চরিত্রের ঘনঘটা, ষড়যন্ত্র, কাপুরুষতা আর রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে কিছু মানুষের আত্মমর্যাদা আর স্বাধীনতা রক্ষার সাহসী সংগ্রামের আখ্যান এই উপন্যাস।
উত্তরমেরুর দুর্গম তুষার-মরুতে জীবন যুদ্ধে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে লোকমুখে গড়ে উঠেছিল নানা রূপকথা। মেরু অঞ্চলের অধিবাসীরা পৃথিবীর বাকি অংশ থেকে ছিল বিচ্ছিন্ন। সম্পূর্ণ অচেনা সেই দেশের লোকসংস্কৃতি, আচার ব্যবহার, মনস্তত্ত্বের সাক্ষ্য রেখে গেছে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে বাহিত গল্প-গাথা, যার রূপরেখা ফুটে উঠেছে কুড়িটি লোককাহিনির সংকলন 'তুষারদেশের রূপকথারা' বইটিতে।