বড়ো গল্প
FREE SHIPPING IN INDIA
বড়ো গল্প
পরের দিন সকালে অফিসে যাবার পথে গাড়িতে আমার ডায়েরিখানা ব্যাগ থেকে বের করে দু-মাস আগের ডেটের একটা নোট খুঁজছিলাম। ঠক করে একটা খাম নীচে পড়ে গেল। তুলে দেখি, অবিনাশের ভাই নিরাপদের সেই ফটোটা। তুলে নিয়ে ফের ঢুকিয়ে রাখলাম ডায়েরিটার ফাঁকে। তারপর কী ভেবে ফের ফটোটা বের করে দেখলাম ছেলেটির মুখ— সোজা তাকানো অন্তর্ভেদী দৃষ্টি। বাই চান্স ফটোটা উলটে পিছনের পিঠটার দিকে তাকালাম এক ঝলক। সেখানে, কী আশ্চর্য, দেখি নীল কালিতে টানা টানা হস্তাক্ষরে লেখা রয়েছে— ‘Hope Club’।
দীপঙ্কর চৌধুরী
অবিনাশ আমার ইস্কুলের বন্ধু।
আমরা স্কুল পাশ করে বেরিয়ে গিয়েছি তা অবশ্য বহুকাল, বছর ত্রিশেক হবে তো বটেই। স্কুলের পরে কলেজে পড়তে আমি কলকাতার হস্টেলে চলে আসি, তারপর চাকরি-বাকরি নিয়ে হেথায় হোথায় ঘুরেছি, গ্রামে আর ফেরা হয়নি পাকাপাকিভাবে। আর অবিনাশ গ্রামেই রয়ে গিয়েছিল, আমি যদ্দূর জানতাম। ওদের পারিবারিক ব্যাবসা ছিল ভুষিমালের, আর একটা মুদির দোকানও ছিল। অবিনাশ সে-সব নিয়েই জীবনটা কাটিয়ে দিচ্ছিল, এমনটাই জানতাম। বড়ো একটা যোগাযোগ ছিল না।
আজ সক্কালবেলা অফিস খুলতে না খুলতেই সেই অবিনাশ এসে হাজির; যার সঙ্গে আমার দেখা হল বছর বিশ-পঁচিশ পরে তো বটেই, তার বেশিও হতে পারে। গ্রামের বাড়িতে আমার যাতায়াত ক্রমেই কমছিল। বাবা মারা যাবার পরে প্রায় বন্ধই হয়ে যায়, যখন মাকে আমি নিয়ে চলে আসি নিজের কাছে। পরে তো গ্রামের বাড়ি বেচেই দেওয়া হল।
আজ প্রথম দর্শনে তো আমি প্রায় চিনতেই পারিনি অবিনাশকে। মোটাসোটা সে কোনোকালেই ছিল না, কিন্তু এখন পাকিয়ে শুকনো দড়ি হয়ে গেছে একেবারে। মাথার সব চুল সাদা, দাঁতও পড়ে গিয়েছে বেশ কয়েকটা। ময়লাটে খদ্দরের পাঞ্জাবি ও পায়জামা পরনে।
“এ কী চেহারা হয়েছে রে তোর, অবিনাশ? কোনও বড়ো অসুখ-বিসুখ করেছিল নাকি?” শুধাই।— “বয়স তো তোর গোটা পঁয়তাল্লিশ হবে, নাকি? আমরা তো সমবয়সিই।”
জবাব না দিয়ে বললে সে, “এত বড়ো ব্যাংকের ম্যানেজার তুমি! আলাদা চেম্বার! তড়িৎবরন শূরকে খুঁজে পেতে তাই বেগ পেতে হয়নি।” ম্লান হাসে অবিনাশ।
“চা খাবি তো, না কফি?” বেল টিপে বেয়ারাকে দু-কাপ কফি বানাতে বলে দিলাম। এখানেই আজকাল কফি মেশিন রাখা আছে।
“তারপর, বল, হঠাৎ এতদিন পরে দর্শন দিলি যে! কী মনে করে?”
“কাকিমা কেমন আছেন?” আমার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে পালটা প্রশ্ন করে অবিনাশ।
মা চলে গিয়েছেন একুশে। কোভিডে। জানালাম সেটা। বলেই বললাম, “এত বচ্ছর পরে দেখা তোর সঙ্গে, বলতে খারাপ লাগছে, ঠিক সাড়ে এগারোটায় একটা জরুরি মিটিং আছে আমার—ভিডিও কনফারেন্সে। তার পেপার-টেপারগুলো একটু স্টাডি করে নিতে হবে রে এখনই। তোর যদি জরুরি কিছু বলার থাকে তো এক্ষুনি বল, নইলে পরে একদিন সময় নিয়ে বসে আমরা লম্বা গল্পগুজব করতে পারি। আমার মোবাইল নম্বরটা রাখ।”
মনের মধ্যে বেল বাজছে আমার, আসন্ন মিটিংয়ের। দেওয়াল ঘড়িতে পৌনে এগারোটা বাজছে।
“জানি, তুমি ব্যস্ত মানুষ, ভাই।” বলতে বলতে কাঁধের ঝোলা থেকে একটা পুরোনো পেটমোটা ডায়েরি বের করলে সে। তার দু-পাশে দুটো লাল রাবার-ব্যান্ড বাঁধা, ভিতরে বিস্তর কাগজপত্তর। ব্যান্ড খুলে ভিতর থেকে একটা খাম বের করল। তার থেকে বেরোল একটি সাদাকালো ফটো। পাসপোর্টের চাইতে বড়ো সাইজের, পোস্টকার্ড সাইজ যাকে বলে। আমার হাতে ধরিয়ে দিতে দেখলাম, একটি বেঁটেখাটো অল্পবয়সি রোগাটে তরুণের ফটো, সোজা তাকিয়ে আছে ক্যামেরার দিকে। স্টুডিওতে তোলা ফটো যেমন হয়ে থাকে আর কি।
“নিশ্চয়ই চিনতে পারছ না? ওর নাম নিরাপদ। নিরাপদ সাহা। নামকরণের ক্ষেত্রে বাবা আমাদের দুই ভাইকেই পুরোনো কালে ফেলে রেখেছিলেন। আধুনিক স্টাইলের নাম নয় আমাদের কারোরই, দিদিদেরও না।”
অবাক হলাম খুবই। বলি, “তোর ভাই? যে মাধ্যমিকে স্ট্যান্ড করেছিল? খবরের কাগজে নাম বেরিয়েছিল! তা নিয়ে আমাদের পরিবার-মহলে যথেষ্ট চর্চাও হয়েছিল সে-কালে। অনেক ছোটো তো তোর চাইতে, না? আমরা যখন ইস্কুল ছেড়ে বেরোই, তোর ভাই তখন ক্লাস টু-থ্রিতে পড়ে বোধ হয়।”
ঘাড় নাড়ল অবিনাশ।
তারপর অবাক করা প্রশ্ন তার, “আচ্ছা, নিরাপদ কি কখনও এসেছে তোমার কাছে? তুমি কি চেনো তাকে, দেখেছ? এত বড়ো ব্যাংক তোমাদের, সারা ভারতে ব্রাঞ্চ ছড়িয়ে আছে।”
চূড়ান্ত অবাক হলাম। অবিনাশের এই মেধাবী ছোটো ভাইটি কি হারিয়ে গিয়েছে? কবে? শুনিনি তো! হলে খুব হালের খবর হবে, নইলে ঠিকই লতায়-পাতায় খবর চলে আসত আমার কানে। গ্রাম ছাড়লেও গ্রাম-সুবাদের আত্মীয়-বন্ধু কয়েকজনের সঙ্গে ভালোই যোগাযোগ আছে আমার এখনও—যেমন, শ্যামল, শ্যামল রক্ষিত। ফরেস্টে চাকরি করে।
অনুসন্ধিৎসু হল মনটা। জানতে ইচ্ছে করছে কী হয়েছিল ব্যাপারটা। কিন্তু মাথার মধ্যে টিকটিক করছে ঘড়িটা। সাড়ে এগারোটায় মিটিং। ভিডিও কনফারেন্সে স্বয়ং জেনারেল ম্যানেজার সাহেব থাকবেন মুম্বইয়ের হেড অফিস থেকে।
অবিনাশ বুঝতে পেরেছে আমার মনের কথাটা। এক চুমুকে কাপের বাকি কফিটুকু শেষ করে বললে, “এই ফটোটা রাখো তোমার কাছে। নইলে ভুলে যাবে। তুমি ব্যস্ত মানুষ। আমি আবার আসব।” বলতে বলতে সেই ফটোর খামটা ধরিয়ে দিলে আমার হাতে।
“তোর ভাইয়ের ফটো আমি রেখে কী করব, বল? আমার মনে থাকবে ঠিকই।” বলতে বলতে ফটোখানা তার হাতে ফেরত দেব কি, চোখ তুলে দেখি যেমন হন্তদন্ত হয়ে এসেছিল, সে তেমনই ঝড়ের বেগে উধাও হয়ে গেল শ্রীমান অবিনাশচন্দ্র সাহা, আমার ছোট্টবেলার গ্রামীণ বন্ধু।
ভাগ্যিস হাতে ফটোখানা ধরিয়ে দিয়ে গিয়েছিল সে, নইলে, সত্যি বলছি, সারাদিনের ওই তুমুল মিটিং ও তার পরবর্তী ডেভেলপমেন্টে নিশ্চয়ই ভুলে যেতাম অবিনাশের ভাইয়ের নিরুদ্দিষ্ট হবার খবর।
অত্যন্ত ডিস্টার্বিং মিটিং হয়েছে আজ। একটা বড়ো অভিযোগ। চুরির। রেভিনিউ লস। দোহাত্তা চুরি নাকি তলে তলে হয়ে চলেছে আমার শাখায়। আমি ধরতে পারিনি? অডিট রিপোর্টেও তেমন কিছু নেই।
জি.এম. সাহেব শেষে বললেন, “ভালোমানুষী করার জন্যে তো আপনাকে মেন ব্রাঞ্চের হেড করা হয়নি, মি. শূর। প্রেসে বেরিয়ে গেলে ব্যাংকের মুখ পুড়বে। আগে থেকে সাবধান হোন।”
এইরকম বেইজ্জত হইনি আগে কখনও। মনটা বড়োই বিধ্বস্ত হয়ে গেল।
সারাদিনের কঠিন কাজের শেষে বাড়ি ফিরে অনেক রাতে বিছানায় শুয়ে দৈনিক খবরের কাগজখানায় একটু চোখ বোলাতে গিয়ে দেখি বেডসাইড টেবিলে কাগজটার পাশেই আমার পার্সোনাল ডায়েরির ফাঁক দিয়ে সেই সাদাকালো ফটোটার একটা কোনা উঁকি মারছে। টেনে বের করে নিয়ে এবার পূর্ণ চক্ষে দেখলাম ছেলেটির ছবিটা। আবার। একহারা চেহারার বছর বিশ-বাইশের যুবক এক। কালো ফুল প্যান্ট ও চেক চেক সাদা ফুল শার্ট পরে বসে আছে চেয়ারে। চোখ দুটি বড়ো জ্বলজ্বলে তার। ছবিখানা বেশ পুরোনো মনে হল। কারণ, হিসেবমতো ছেলেটির বয়স আজ বছর পঁয়তিরিশ হবার কথা। কী যে হয়েছিল ছেলেটির! কোথায় যে উধাও হয়ে গেল সে দাদাকে জলে ফেলে দিয়ে! অবিনাশ বিয়ে-থা করেনি, সেটা জানতাম। ছোটো ভাইটিকে নিশ্চয়ই বড্ড ভালোবাসত।
পাস্ট টেন্সে ভাবছি কেন? নিশ্চয়ই এখনও বাসে। ছেলেটি আছে কোথাও লুকিয়ে। বেচারি কোনও বিপদে পড়েনি তো?
২
সকালে ঘুম থেকে উঠে কিছুক্ষণ মোবাইল ফোন নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করবার বদ-অভ্যাস ধরে গিয়েছে আজকাল। না ঘেঁটে থাকতেই পারি না। অজুহাতটা অবিশ্যি দেখা, জরুরি কোনও মেসেজ এসেছে কি না। এতদিন যদিও সাতসকালে উঠতে না উঠতেই ‘জরুরি খবর’ না দেখেও বেশ কেটে যাচ্ছিল জীবনটা।
প্রাক্তন সিনিয়র কলিগ চক্রবর্তীদা (রিসেন্টলি রিটায়ার্ড) দেখি মেসেজ করেছেন— ‘কী ভাই তড়িৎ, তুমি তো কই জয়েন করলে না আমাদের ক্লাবে? এসো এসো, জয়েন করো। আনন্দে থাকবে।’
ক্লাব, মানে লাফিং ক্লাব। সকালবেলায় একটা পার্কে জনা বিশ-ত্রিশ মেয়ে-পুরুষ হাত-পা ছুড়ে খুব হাসে। হো হো করে। কেন হাসে জানি না, তারাও জানে না। তবু হাসে। সেটাই এই ক্লাবের উদ্দেশ্য। এতে নাকি মনের গ্লানি দূর হয়ে যায়। মন উন্মুক্ত হয়।
চক্রবর্তীদা আগেও কয়েকবার বলেছেন আমাকে ওঁদের এই ক্লাবে জয়েন করতে। আমি সাড়া পাইনি মন থেকে। অকারণে গ্রুপ-লাফিং পাগলামির নামান্তর বলে মনে হয়েছে আমার। তাছাড়া আমার পক্ষে সময় বের করাও মুশকিল।
আমি এদিকে নাজেহাল হয়ে রয়েছি আপিসের সেই চোরা-চুরির অভিযোগ নিয়ে। খুবই নাজেহাল। সত্যিই তো, ব্রাঞ্চ হেড হিসেবে দায়িত্ব তো এড়াতে পারি না আমি।
পরের দিন সকালে অফিসে যাবার পথে গাড়িতে আমার ডায়েরিখানা ব্যাগ থেকে বের করে দু-মাস আগের ডেটের একটা নোট খুঁজছিলাম। ঠক করে একটা খাম নীচে পড়ে গেল। তুলে দেখি, অবিনাশের ভাই নিরাপদের সেই ফটোটা। তুলে নিয়ে ফের ঢুকিয়ে রাখলাম ডায়েরিটার ফাঁকে। তারপর কী ভেবে ফের ফটোটা বের করে দেখলাম ছেলেটির মুখ— সোজা তাকানো অন্তর্ভেদী দৃষ্টি।
বাই চান্স ফটোটা উলটে পিছনের পিঠটার দিকে তাকালাম এক ঝলক। সেখানে, কী আশ্চর্য, দেখি নীল কালিতে টানা টানা হস্তাক্ষরে লেখা রয়েছে— ‘Hope Club’।
এ আবার কী নাম রে বাবা! চক্রবর্তীদাদের লাফিং ক্লাবের নাম শুনেছি। কিন্তু এ তো লাফ নয়, হোপ ক্লাব। লাফিং ক্লাবে গিয়ে যেমন সবাই হাসে, এই ক্লাবে কি সকলে হোপ করে? আশা! কীসের আশা? জিজ্ঞেস করতে হবে তো অবিনাশকে, ফের যখন আসবে। ওকে আমার নম্বরটা দিলাম বটে (কিছুটা ওর হাত থেকে শিগগির পরিত্রাণ পেতে), কিন্তু ওরটা তো নিয়ে রাখা হল না। অতএব, আমাকে অপেক্ষা করতে হবে ওর মর্জির উপরে—কখন সে আসে।
এদিকে আমি এখন মরছি নিজের আপিসে চুরির সমস্যায়। কী করে যে তার হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়! এখন ওসব ক্লাব-টাব নিয়ে কি আমার ভাববার সময় আছে?
৩
লাঞ্চের সময়ে শেখরকে ফোন করলাম। ওর অবশ্য লাঞ্চ ব্রেক বলে কিছু হয় কি না সন্দেহ, কারণ শেখর দত্তরায় পুলিশের বড়ো কর্তা, চব্বিশ ঘণ্টাই সে অন-ডিউটি।
“হোপ ক্লাব বলে কোনও ক্লাবের নাম শুনেছিস কি?” ভনিতা না করে সরাসরি শুধাই।
শেখর আমার কলেজের বন্ধু, আজও যার সঙ্গে আমার প্রায়ই দেখাসাক্ষাৎ হয়। ওর বাবা-মা আমাদের হাউজিং সোসাইটিতেই থাকেন, তাই শেখর প্রায় রোজই সন্ধ্যার দিকে একবার করে আসে।
“বালিগঞ্জের দিকে ওই নামে একটা ফাউন্ডেশন আছে শুনেছি। পথশিশুদের নিয়ে কাজ করে। নামি সংস্থা। কেন বল তো?” বললে শেখর।
“সেটা নয় বোধ হয়। এটার নাম হোপ ক্লাব। কলকাতাতেই হতে হবে এমন কোনও কথা নেই। আমাদের গ্রামের দিকে…”
“বর্ধমানে?”
“নট শ্যুওর। পুলিশকে অ্যাপ্রোচ করছি মানেই কোনও ক্রিমিন্যাল অ্যাঙ্গেল যে থাকতে হবে এমন কোনও কথা নেই। এমনিই জানতে চাইছি, একজন মিসিং পার্সনের ব্যাপারে।”
“মিসিং পার্সন? কোন লোক হারিয়ে গেছে? ডায়েরি হয়েছে? নাম্বারটা আছে? থাকলে দে।”
“না, মানে…” কোঁতাতে থাকি আমি। অবিনাশের কাছ থেকে এটা তো জেনে নেওয়া হয়নি।
ঘাগু পুলিশ অফিসার শেখর দত্তরায়ের অসুবিধে হল না বুঝতে। বললে, “তেমন জরুরি না হলে এখন রেখে দে। আজ সন্ধেয় আমি আসব মায়ের কাছে। তখন কথা হবে তোর সঙ্গে।”
আচ্ছা, কেন যে আমি ওই অবিনাশের ভাইয়ের নিরুদ্দেশ নিয়ে এত ভাবতে বসেছি, বলো তো? আমি তো আর পুলিশ নই, না সে আমাকে ভাইকে খুঁজে দেবার দায়িত্ব দিয়ে গেছে। এমনিই এসে খোঁজ করছিল ভায়ের। ডিটেইলসেই তো শোনা হল না। কেন যে ওর নম্বরটা রাখলাম না!
৪
এদিকে আর এক কাণ্ড।
সক্কাল সক্কাল আমার মোবাইলে অচেনা নম্বর থেকে একটা মেসেজ এসেছে। আসছে। এসে চলেছে বেশ কয়েকবার। লিখছে, ‘নিত্যানন্দ সব জানে।’
কে নিত্যানন্দ? সে কী ‘সব’ জানে? সেটা জেনে আমিই-বা কী করব?
‘গলানো সোনা আটাশ টাকা’-মার্কা কোনও বিজ্ঞাপনী স্টান্ট হবে ভেবে মুছে দিলাম মেসেজটা।
আবার এলো। আবার মুছে দিলাম।
চুরির বিষয়টা নিয়ে ভাবছিলাম। কী হতে পারে? কার থাকতে পারে ভেস্টেড ইন্টারেস্ট?
আমার চেম্বারে বসে রিভলভিং চেয়ারটা ঘুরিয়ে মুখটা পিছনের কাচের জানালাটার দিকে করে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। এই দোতলা থেকে নীচে দেখা যায় পাশেরই একটা চার্চ-স্কুলের সবুজ লনটা। এখন দুপুর রৌদ্রে কেউ নেই সেখানে, কেবল পাঁচিলের উপরে বসে কয়েকটা কাক ঝগড়া করছে।
সামনের দিকে তাকিয়ে আছি বটে, কিন্তু চোখে যেন দৃষ্টি নেই। মনটা চিন্তাচ্ছন্ন।
হঠাৎ ঠকঠক আওয়াজ শুনে চেয়ারটার মুখ ফিরিয়ে সামনের দিকে করে দেখি, এক দশাশই মানুষ দাঁড়িয়ে আছে সামনে। ঠুকঠুক করে আমার সামনের টেবিলটার কাচের উপরে টোকা মারছে। খালি গা, পরনে একটা সাদা লুঙ্গি, একজন মাঝবয়সি মানুষ। অঙ্গে-কপালে তিলক ও গলায় রুদ্রাক্ষের মালা, কাঁধে ঝোলা। গাত্রবর্ণ কুচকুচে কালো। দক্ষিণদেশের মানুষ, সন্দেহ নেই।
এখন অফিস আওয়ারে ব্রাঞ্চ ম্যানেজারের দরোজা সর্বদাই খোলা থাকে যে-কোনো কাস্টমারের জন্যে। আমিও, অন প্রিন্সিপল, নিজের চেম্বারের দরোজা সবসময়ই হাট করে খুলে রাখি। এটা প্রতীকী। যে-কেউ ব্যাংকের মেন হলে ঢুকে এলে ম্যানেজারের চেম্বারে চলে আসতে আপত্তি নেই।
“ইয়েস!” বলে সেই সাধুসন্ত মানুষটিকে হাত দেখিয়ে ইঙ্গিত করলাম সামনের চেয়ারে বসতে।
উনিও সটান বসে পড়ে সম্পূর্ণ দক্ষিণী উচ্চারণে হিন্দিভাষায় কত কী বলে গেলেন। শেষে কাঁধের ঝোলা থেকে একটা চাঁদা কালেকশনের রসিদ বই বের করাতে উদ্দেশ্যটা পরিষ্কার হল। যা বোঝা গেল, উনি একটা মঠ বা সংগঠন বা সোসাইটির পক্ষ থেকে আসছেন, যাদের কাজ বা উদ্দেশ্য হল টার্মিনালি সিক মানুষের চিকিৎসা করা, শুশ্রূষা করা— আশা বা হোপ জাগিয়ে রাখা। সে উদ্দেশ্যেই ডোনেশন কালেকশন। সাধু উদ্দেশ্য, সন্দেহ নেই।
তিনি বেরিয়ে যাবার পরে পরেই, আমি তখন অন্য ফাইল খুলে বসেছি, একটা রোগাটে ড্রাইভার-গোছের ছোকরা (কারণ, তার হাতের চাবিটা দোলাচ্ছে) আমার চেম্বারে ঢুকে কেমন যেন তুতলে তুতলে শুধালে, “নিত্যানন্দজি চলে গয়ে ক্যায়া? নিত্যানন্দজি কি চলে গেছেন?”
বলতে বলতে সে হাত দিয়ে আমার সামনের চেয়ারটির দিকে ইঙ্গিত করলে, যেখানে একটু আগেই সেই দক্ষিণী সাধু-গোছের মানুষটি এসে বসেছিলেন।
আমি ঘাড় নেড়ে ‘হ্যাঁ’ জানিয়ে হাতের ফাইলে মনোনিবেশ করার এক মিনিট পরেই মনে হল, আচ্ছা, ওই ছেলেটা কার যেন নাম করল? নিত্যানন্দজি? নিত্যানন্দ? এ-ই সব জানে বলে সকাল থেকে বেশ কয়েকটা মেসেজ পেয়েছিলাম না? আশ্চর্য তো! সেই ছোকরাই-বা কোথায় গেল? এক্ষুনি ছিল তো এখানে।
দৌড়ে নিজের চেম্বার থেকে বেরিয়ে ব্রাঞ্চের মেন গেটের বন্দুকধারী প্রৌঢ় দারোয়ানকে গিয়ে শুধোলাম, “আরে চৌবেজি, ওয়হ্ লড়কা কহাঁ গয়া?”
“কৌন লড়কা, স্যার?”
এখন এই বিজি আওয়ারে কত কত লোকজন এত্ত বড়ো এই ব্রাঞ্চে ঢুকছে-বেরোচ্ছে, আসছে-যাচ্ছে। ঠিক কার কথা বলছি সেটা না বললে দারোয়ানই-বা কী করে বুঝবে, কে?
ফিরে এলাম নিজের চেম্বারে। হঠাৎ কী মনে হতে বুকপকেটে হাত ঢুকিয়ে সেই স্লিপটা বের করলাম, চাঁদা নিয়ে যেটা কেটে আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন একটু আগে সেই নিত্যানন্দজি। নেবার সময় তখন মোটেই দেখিনি, এখন রসিদটা বের করে দেখি তার হেডিংয়ে বড়ো বড়ো করে ছাপা রয়েছে— ‘হোপ ক্লাব’, তলায় হিন্দিতে সই, ‘নিত্য’।
কী সমাপতন! আমার বাল্যবন্ধু সেই অবিনাশের নিরুদ্দিষ্ট ভাইয়ের ফটোটার পিছনেও হোপ ক্লাব লেখা ছিল না, যেটার বিষয়ে আমি আমার পুলিশ-বন্ধু শেখরের কাছে খোঁজখবর করেছিলাম? এই হোপ ক্লাব আর সেই হোপ ক্লাব কি একই?
আমার হ্যান্ড ব্যাগ খুলে পার্সোনাল ডায়েরির ফাঁক থেকে অবিনাশের ভাই নিরাপদ সাহার ফটোখানা ফের বের করে উলটে আর একবার দেখে নিলাম লেখাটা— ‘হোপ ক্লাব’। ছেলেটার ছবিটাও ফের দেখলাম আর একবার। আর আশ্চর্য, ছেলেটাকে এবার যেন কেমন চেনা চেনা লাগল। একে যেন কোথায় দেখেছি। রিসেন্টলি। মনে পড়ছে না।
সেই চাঁদার স্লিপটা বের করে তাতে কোনও কন্ট্যাক্ট নম্বর পেলাম না, কেবল ‘রেজিস্ট্রেশন নং ৩৬৫৮৯’ লেখা আছে দেখলাম। আর একটা আধা-খ্যাঁচড়া ঠিকানা— ‘মণ্ডলপাড়া, কলকাতা – ৭০০১২৫’।
মাথাটা বেশ ঘুরছে বনবন করে।
দুটো বেজে গেছে। লাঞ্চ ব্রেক। এবার কিছু খেয়ে নেওয়া যাক।
৫
লাঞ্চের পরে শ্যামলকে ফোন লাগালাম। শ্যামল রক্ষিত আমাদের গ্রামেরই ছেলে। আবাল্য বন্ধু আমরা। ফরেস্ট ডিপার্টেমেন্টে ভালো চাকরি করে, আসানসোলে থাকে এখন। বেশ কিছুদিন যদিও দেখাসাক্ষাৎ হয়নি, ফোন-হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ হয় অবশ্য হামেশাই।
হয়তো শহরের বাইরে ছিল শ্যামল তখন। ফোনে আওয়াজটা কেটে কেটে যাচ্ছে। মাঝে-মাঝেই পাশ দিয়ে জোরে হর্ন বাজিয়ে ট্রাক বেরিয়ে যাবার শব্দ পাচ্ছি।
“তুই কেমন আছিস, শ্যামল? অবিনাশ এসেছিল আমার ব্রাঞ্চে কয়েকদিন আগে। হ্যাঁ, অবিনাশ সাহা। তোর কাছে কি ওর মোবাইল নম্বরটা আছে?”
“কী? কী বলছিস? কে? কে এসেছিল?”
“অবিনাশ। অবিনাশ সাহা। আমাদের ক্লাসের…”
“কী যে আলফাল বলছিস তুই, কিছুই বুঝতে পারছি না। শুনতেও পাচ্ছি না ভালো। এখন হাইওয়েতে ড্রাইভ করছি। সন্ধ্যায় ফোন করব তোকে।”
সমস্যাটার হাল হল না।
এদিকে হাল হল না আমার অফিসের চুরির অভিযোগটারও।
আচ্ছা, আমি কি ‘হোপ’ করতে পারি যে এই সমস্যাটার সমাধান হয়ে যাবে? এই হোপ ক্লাব কি আমায় কোনও হেল্প করতে পারে না যাকে একটু আগেই চাঁদা দিলাম? নিত্যানন্দজিকে ধরলে কেমন হয়?
আর তখনই আমাদের গুঁফো দারোয়ান সৎনাম চৌবে বন্দুক হাতে হন্তদন্ত হয়ে আমার চেম্বার ঢুকে বললে, “হজৌর, তনিক আইয়ে ন ইধর।”
চেম্বার থেকে বেরিয়ে ব্রাঞ্চ হলের ওইদিকের জানালার ধারে নিয়ে গিয়ে ব্লাইন্ডস সরিয়ে কাচ ভেদ করে অঙ্গুলিনির্দেশ করে দেখালে সে— “আপনি কি তখন ওই ছেলেটিকে খুঁজছিলেন, স্যার?”
ভালো করে তাকিয়ে দেখি, হ্যাঁ বটে। ওই তো বড়ো রাস্তার ও-পারে একটা মারুতি জিপসির পাশে দাঁড়িয়ে হাতের মোবাইল দেখছে ছেলেটি, যে কিছুক্ষণ আগেই আমার কাছে এসে নিত্যানন্দজির খবর নিচ্ছিল। সে কি ওই নিত্যানন্দ-সাধুর গাড়ির ড্রাইভার?
ওকে আমার খুব দরকার। খুব দরকার। কেন দরকার আমি শ্যুওর নই, কিন্তু খুব দরকার। কারণ? কারণ, ওকে দেখতে এক্কেবারে অবিনাশের হারানো ভাই নিরাপদের মতো। হয়তো সে নিরাপদই, এমনটা মনে হল আমার।
আবার ভাবি, মাধ্যমিকে স্ট্যান্ড করা ছেলে গাড়ির ড্রাইভারের চাকরি করবে? আহ্, কী জ্বালা, সে যে ড্রাইভারই, এমনটাই-বা আমি ভাবতে গেলাম কেন?
আর কাল বিলম্ব না করে দুড়দুড় করে সিঁড়ি ভেঙে নিজেই একতলায় নেমে গেলাম।
একতলায় বড়ো রাস্তার উপরে ব্রাঞ্চের গেটে দাঁড়িয়ে আছি আমি। চেনা লোকজন ‘হ্যালো’, ‘নমস্কার’ জানাচ্ছে। হেভি ট্রাফিকের জন্যে তক্ষুনি রাস্তা পেরিয়ে ও-পারে যেতে পারছি না। উপরন্তু, হাফ-রাস্তায় উঁচু ডিভাইডার রয়েছে। আমাকে সে-পাশ দিয়ে ঘুরে এসে ও-পারটায় যেতে হবে।
ছেলেটাকে এবার ভালো করে দেখলাম, মানে এতটা দূর থেকে যতটা ভালো করে হয় আর কি। আমার বুকটা ধুকপুক করতে লাগল। এ-ই কি সে? অবিনাশের নিরুদ্দিষ্ট ভাইয়ের সমস্যাটার কি তাহলে সমাধান হয়ে গেল?
আর ঠিক সেই মুহূর্তে আমার মোবাইলে ফোন এসে গেল একটা। স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখি, স্বয়ং জোনাল ম্যানেজার সাহেবের ফোন। নিশ্চয়ই ব্রাঞ্চের সেই চুরির বিষয়ে খোঁজখবর করছেন।
ঠিক তাই।
রাস্তার একটু সাইডে চলে গিয়ে অ্যাটেন্ড করলাম ওঁর কলটা। ডিটেইলসে বললাম কী কী স্টেপ নিয়েছি আমরা। বস সন্তুষ্ট হলেন কি না বোঝা গেল না, হুঁ হুঁ হাঁ হাঁ করে গেলেন।
কল শেষে চোখ তুলে ও-পারে সেই মারুতি জিপসি আর ড্রাইভার ছোঁড়াকে আর দেখতে পেলাম না। চলে গেছে। হোপ ক্লাবের গাড়ি চলে গেছে—হয়তো নিত্যানন্দকে নিয়েই, যে কিনা ‘সব জানে’। এমনটাই মনে হল আমার।
৬
হে প্রিয় পাঠক, এখন আমাদের ফিরে যেতে হবে বহুকাল আগের পুরোনো একটা কাহিনিতে।
অনেক বচ্ছর আগের কথা। বছর ত্রিশেক হবে হয়তো, দু-এক বছর কমবেশি হতে পারে। প্রৌঢ় জলধরবাবু হন্তদন্ত হয়ে ট্রেন ধরতে যাচ্ছিলেন। সকাল এগারোটার মধ্যে আদালতে পৌঁছতেই হবে তাঁকে, জরুরি মামলা আছে। কিন্তু এক মিনিটের জন্যে উনি মিস করলেন ট্রেনটা। উনি যখন ওভারব্রিজ দিয়ে দৌড়ে নেমে এসে প্লাটফর্মে পা দিলেন, স্পিড নিয়ে নিয়েছে ট্রেনটা। দৌড়ে গিয়ে চড়ার রিস্ক নেওয়া যায় না।
নেক্সট ট্রেন আধঘণ্টা পরে।
স্টেশনে ভিড় খুব, গরমও অত্যধিক। সিমেন্টের যে বেঞ্চিটাতে জলধরবাবু বসতে পেয়েছিলেন, সেখানে ওঁর গায়ের পাশেই বছর ছয়-সাতের এক হাফ প্যান্ট পরা বালক মলিন মুখে বসে ছিল, গায়ে ছেঁড়া শার্ট। ভিখারি নয়, তাহলে বেঞ্চে এসে বসত না, উপরন্তু মুখেও তার একটা বুদ্ধিদীপ্ত ভাব আছে।
ট্রেনটা লেট করছে। হাতের কাগজটাকে হাতপাখা করে হাওয়া খাচ্ছে লোকে। জলধরবাবুও।
অবশেষে ট্রেনটা এসে পড়াতে সকলে হুড়মুড় করে উঠে পড়ল। কিন্তু চুঁচুড়াতে পৌঁছে জানা গেল যে সেদিন কোর্টে কীসের একটা হরতাল না কী কারণে কোনও মামলা-টামলা হবে না, পরে আবার ডেট পড়বে। অতএব, বাড়ি ফিরে আসা ছাড়া গত্যন্তর নেই।
ফিরতি পথে, অবাক কাণ্ড, বাড়ির স্টেশনে নেমে জলধরবাবু দেখতে পেলেন, সেই সিমেন্টের বেঞ্চিতে সেই বালকটি ঠায় তেমনভাবেই বসে আছে মলিন মুখে। তখন প্রখর রোদ্দুর, বিকেল তিনটে বাজবে হয়তো। স্টেশন শুনশান।
অবাক হলেন জলধরবাবু। কষ্ট পেলেন। সেই সকাল ন’টা থেকে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা ছেলেটি এভাবে বসে আছে? কাছে গিয়ে শুধান, “খিদে পেয়েছে? খাবি কিছু?”
ছেলেটি উঠে দাঁড়াল। চা-স্টলে চা-কেক কিনে খাওয়া হল। দুজনেই খেলেন।
“বাড়ি কোথায় তোর? কী নাম? আগে তো দেখিনি কখনও এখেনে?”
ছেলেটি কিছু না বলে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে জলধরবাবুর মুখের পানে। শেষে কিছুটা গ্যাঁ গোঁ শব্দ করে কিছু বলতে চাওয়াতে বুঝলেন, ছেলেটি বোবা। মূক। কিন্তু এল সে কোথা থেকে, কেনই-বা এখানে—সেসব প্রশ্নের নিরসন হল না।
এখানে পড়ে থাকলে যদি খারাপ লোকের খপ্পরে পড়ে? ভাবলেন জলধরবাবু। কিন্তু করাই-বা কী যায়? দশটা টাকা তার হাতে দিতে গেলে নিল না সে ছেলে। ঘাড় নাড়ল।
বাড়ি ফিরে এসেও ছেলেটির অসহায় মুখটা ভুলতে পারলেন না জলধরবাবু। কেন এত এত বার মনে আসছে? সে তো ওঁর হয় না কেউই।
পরের দিন সকালে, কী জানি কীসের টানে, ফের সেই ছেলেটিকে দেখতে জলধরবাবু গেলেন রেলস্টেশনে। বেশি দূরে নয় ওঁর বাড়ি থেকে। স্টেশনে তাকে দেখতে না পেয়ে এ-ধার ও-ধার খুঁজছেন, ভাবছেন সে হয়তো ট্রেন ধরে চলে গিয়েছে যেখান থেকে এসেছিল, এমন সময়ে দেখেন, স্টেশনের বাইরে খানিকটা দূরে একটা বড়ো অশ্বত্থগাছের তলার বাঁধানো বেদিতে চুপ করে বসে আছে ছেলেটা।
কোথায় ছিল সে ছেলে সারারাত? কী খেয়েছে? অচেনা এক পথ-বালকের জন্যে এহেন উৎকণ্ঠা যে তাঁর কেন সেটা বুঝলেন না প্রৌঢ় মানুষটি। তাকে প্রশ্ন করেও লাভ নেই কারণ, সে তো বলতে পারে না। পরম মমতায় তাকে সামনের একটা মিষ্টির দোকানে বসিয়ে কচুরি-মিষ্টি খাওয়ালেন জলধরবাবু।
অতঃ কিম্?
অতঃপর এমন কোনও অচেনা নাবালককে পেলে যা করা উচিত তা-ই করেছিলেন জলধরবাবু। একটা রিকশায় চড়ে দুজনে লোকাল থানার সামনে এসে দাঁড়ালেন। সেখানটায় ভিড়ভাড় লোকজনও মন্দ নেই। আর তখনই থানার ওই সাইনবোর্ড আর লালবাড়ি আর গেটে বন্দুকধারী পুলিশ দেখে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল ছেলেটি। জলধরবাবুর হাত দুটি ধরে ভয়ে থরথর করে কাঁপতে লাগল সে। বোঝা গেল, পুলিশ-সংক্রান্ত কোনও দুরভিজ্ঞতা আছে ছেলেটির।
কী আর করেন, কোন সে এক অজানা মায়া থেকে রিকশা ঘুরিয়ে নিজ বাসার অভিমুখে চললেন জলধরবাবু, ছেলেটিকে সঙ্গে নিয়ে।
জলধর সাহাদের পারিবারিক ব্যাবসা আছে মুদিখানার এবং মস্ত বড়ো একটি ভুষিমালের দোকান। যৌথ পরিবারে মোট সদস্য সংখ্যা বাইশ। সেই পরিবারে এক ভৃত্যের মতো ঠাঁই পেয়ে গেল ছেলেটি। কিন্তু অচিরেই তার অসাধারণ মেধার পরিচয় প্রকাশিত হতে লাগল। জলধরবাবুরা ধর্মভীরু বৈষ্ণব পরিবার, বাড়িতে শ্রীরাধাকৃষ্ণের যুগলমূর্তি প্রতিষ্ঠিত আছেন, নিত্য পূজা হয়। ওঁর বড়দাদা শ্রীশশধরচন্দ্র সাহা সংসারের কর্তা, দয়ালু ভক্ত মানুষ। তাঁরই দয়ায় ছেলেটিকে ইস্কুলে ভরতি করে দেওয়া হল এবং তাকে নিয়ে জলধরবাবু বনহুগলির স্পিচ-থেরাপি হসপিটালে যাওয়া-আসা শুরু করলেন। ক্রমে ভাষা ফুটল তার মুখে, যদিও বড়ো হয়েও সে একটু জড়িয়ে জড়িয়ে ও তুতলে কথা বলত।
হ্যাঁ, এই ছেলেটিই মাধ্যমিক পরীক্ষায় সিক্সথ স্ট্যান্ড করেছিল, কাগজে নাম বেরিয়েছিল। তার আগে অবশ্য জলধরবাবু তাকে আইনমাফিক দত্তক নেন, যদিও তাঁর দুই বিবাহযোগ্যা কন্যা ও ক্লাস টেনে পড়া এক ছেলে তখনই বর্তমান। এ-খবরটি বিশেষ পাঁচকান করেননি ওঁরা।
নিরাপদ সাহার এই কাহিনিটা যদিও আমি নিজের ভাষায় গুছিয়ে লিখলাম এখানে, তবু এর আসল সোর্স হচ্ছে আমার অভিন্নহৃদয় বন্ধু, পুলিশের ডিসি মি. শেখর দত্তরায়। সত্যি, পুলিশ কী না পারে? শেখরকে আমার বন্ধুর ভাইয়ের নিরুদ্দেশের খবর জানিয়ে সাহায্য চাওয়াতে ক’দিনের মধ্যে তার পুরো ঠিকুজি-কুলুজি এনে দিয়েছিল সে, যেটা ওপরে লিখলাম।
“তবে এই ছেলেটি যে পরে বা হালে মিসিং হয়েছে, সেটা কিন্তু আমাদের রেকর্ডে নেই। কারণ, কোনও এফ.আই.আর হয়নি।” বললে শেখর।
আমি কিন্তু মনে মনে ছটফট করছি, সেই যে কোত্থেকে হঠাৎ একদিন এসে অবিনাশ তার হারানো ভাইয়ের ফটোটা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে উধাও হল, কই, তার পরে তো সে আর একদিনও এসে খোঁজখবর করলে না! না একটা ফোন। আমিই যে ছাই কেন ওর মোবাইল নম্বরটা নিয়ে রাখলাম না।
৭
এর পরের দিনই ব্রাঞ্চের ওল্ড রেকর্ড রুম থেকে একগাদা পুরোনো ভাউচার পাওয়া গেল যেগুলোতে আমার সই আছে। শিউরে উঠলাম আমি। এ তো অকাট্য প্রমাণ, যে ওই সমস্ত এক্সপেন্ডিচার আমার জ্ঞাতসারেই হয়েছে! কিন্তু কবে এই ভাউচারগুলো জমা হয়েছিল আমার কাছে আর আমিও সম্মতি দিয়েছিলাম? আমার কিছুই মনে পড়ছে না। এ থেকে যে গভীর বিপদে আমি পড়ে যেতে পারি, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। যদি না, অবশ্য, এই ভাউচারগুলো জাল হয়।
আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার রথীন নন্দী বললে, “স্যার, এই ভাউচারগুলো এখনই আমরা সামনে আনব না, হোল্ড করব। আগে আমাদের ব্যালেন্সটা ট্যালি করা হয়ে যাক, তারপর এগুলোর হিল্লে হবে’খন।”
রথীনকে একটা অস্ফুট ‘থ্যাংক ইউ’ বলা ছাড়া আর কোনও শব্দ বেরোল না আমার গলা থেকে। টেনশনে যদিও কাঁটা হয়ে রইলাম আমি।
আর, তার একটু পরেই সেই অজানা নম্বর থেকে আবার আমার মোবাইলে একটা মেসেজ এল— ‘নিত্যানন্দ সব জানে।’
মাথাটা গরম হয়ে উঠল। আমি মরছি নিজের জ্বালায়, এখন কে আমার সঙ্গে এমন প্র্যাক্টিক্যাল জোক করে? এটাকে তখন আর কোনও বিজ্ঞাপনের প্রোমোশন বলে ভাবতে পারলাম না। মুছে না দিয়ে সেই নম্বরে সঙ্গে সঙ্গে একটা কল করলাম। ম্যান্ডেটরি ওয়েটিং, আর তার পরে এক টিপুন পাঁচ টিপুন ইত্যাদি করে করে হিন্দিতে মহিলা অপারেটরের সুভাষিতাণী যখন শুনতে পেলাম, ততক্ষণে বুঝে গিয়েছি যে এটা যোগ-থেরাপি ধরনের কোনও ‘মন্দির কোম্পানি’-র প্রমোশন বটে।
কিন্তু সেই হোপ ক্লাব? সেটার কী হল? তাকে যে নগদ একশত টঙ্কা চাঁদা দিয়েছিলাম যার রসিদটা এখনও আমার পকেটের মধ্যে গজগজ করছে! ফস করে আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, ‘নিত্যানন্দজি এসেছিলেন আমার কাছে, নিরাপদও। আপনাদের হোপ ক্লাবে যেতে বলে গেছেন আমাকে।”
চুপ করে রইলেন সেই অপারেটর মহিলা।
“কী হল? চুপ করে আছেন কেন? কিছু বলুন!” চেঁচিয়ে উঠে বললাম। আমার মাথার মধ্যে তখন সেই বিতর্কিত ভাউচারগুলির ছবি ভেসে ভেসে উঠছে যেগুলো নাকি আমিই সই করে পারমিশন দিয়েছিলাম (কিন্তু, অনন্তর কিছুই আর স্মরণে নাই)!
“আপনি স্বয়ং নিত্যানন্দজির দর্শন পেয়েছেন, আপনি তো ভাগ্যবান। ওঁকে কিন্তু আসলে কেউই দেখতে পায় না।”
“কেন দেখতে পাবে না? কী অনব-সনব বলছেন আপনি, ম্যাডাম? দিব্য আমার থেকে একশত টাকা চাঁদা কেটে নিয়ে গেলেন…” বলতে বলতে আমার চেম্বারের কাচের বাইরে দেখি সেই ‘ড্রাইভার নিরাপদ’ ক্যাশ কাউন্টারের লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। তার নাম আদৌ নিরাপদ কি না জানি না, তবু উত্তেজনার বশে ফোনের লাইনটা কেটে দিয়ে, “এই, এই নিরাপদ, নিরাপদ…” বলতে বলতে আমি লাফ মেরে চেয়ার ছেড়ে উঠে বেরোতে গেলাম আর তখনই এল বাল্যবন্ধু শ্যামল রক্ষিতের ফোনটা, যে সেদিন ‘সন্ধেবেলা ফোন করব’ বলে আর করেনি।
সেটা বলাতে শ্যামল বললে, “তা তুই যদি উদ্ভট-সব কথাবার্তা বলিস আর অলীক লোকজনকে দেখতে পাস, তো তার জবাব কীই-বা দোব আমি, বল তো?”
এই প্রকার হেঁয়ালি করে কথা বলতে ভালোবাসে শ্যামল, দেখছি তো আবাল্য। কিছুতেই সহজে ঝেড়ে কাশবে না।
কথা বলতে বলতে ব্রাঞ্চের মেইন হলের দিকে এগোতে এগোতে দেখলাম সেই ‘ড্রাইভার নিরাপদ’ ছেলেটি পাশের টয়লেটের গেট খুলে ঢুকে গেল ভিতরে। আমি বাইরে দাঁড়িয়ে মোবাইলে কথা বলে চলেছি শ্যামলের সঙ্গে, যে কিনা আবাল্য থাকত আমাদের গ্রামের পাশের বাড়িটিতেই এবং এখনও গ্রামের সঙ্গে ভালোই যোগাযোগ আছে তার।
আর এমনই সংযোগ, ঠিক তখনই মোবাইলে কঁক কঁক করে ‘কল ওয়েটিং’ দেখাতে তাকিয়ে দেখি স্বয়ং জোনাল ম্যানেজার সাহেবের ফোন। শ্যামলকে হোল্ডে রেখে ওঁর কলটা অ্যাটেন্ড করতে করতে আনমনে চেম্বারে ফিরে আসি। বস প্রথমেই অতি আনন্দিত স্বরে বলে উঠলেন, “কনগ্রাচুলেশন, মি. শূর! সুখবর আছে। হেড অফিস ওই রেভিনিউ লিকেজ, মানে চুরির অ্যালিগেশনটা তুলে নিয়েছে। ওদেরই কিছু মিস-আন্ডারস্ট্যান্ডিং বা মিস-ক্যালকুলেশন হয়েছিল বোধ হয়। হেড অফিস থেকে জি. এম. সাহেব আমাকে এক্ষুনি কল করেছিলেন। যা হোক, আপনি বাঁচলেন, আমিও হাঁপ ছাড়লাম। মেল পেয়ে যাবেন আপনি একটু পরেই।”
ধপ করে বসে পড়লাম আমি নিজের চেয়ারে। হাসব, না কাঁদব, না ঘামব—কিছুই বুঝলাম না। কিংকর্তব্যবিমূঢ়!
পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখ মুছতে গিয়ে হাতে ঠেকল সেই হোপ ক্লাবের রশিদটা। হোপ-ক্লাব! লাফিং ক্লাবের মতো আর একটা ক্লাব। সকালে উঠে পার্কে দাঁড়িয়ে হো হো করে হাসার বদলে এই ক্লাবের সকলে আশা করে। হোপ! আর সেই আশার যানটি নিরাপদভাবে চালিয়ে নিয়ে যে চলে, তার আদি ও অনন্ত ঠাহর হয় না—কোত্থেকে যে সে এল, আর কোথায়ই-বা উধাও হয়ে গেল? তার কোনও বিনাশও নেই বটে—সে অবিনাশ! মাঝ থেকে, থেকে যাওয়া হয় আনন্দে—নিত্য আনন্দে। নিত্যানন্দ!
এবার চোখ তুলে চেম্বারের কাচের মধ্যে দিয়ে বাইরে দেখলাম সেই ‘নিরাপদ’ ছোকরাটা আমায় যেন টা টা করতে করতে দরজা দিয়ে বেরিয়ে চলে গেল।
লেখকের অন্যান্য লেখা
শুভাঞ্জন ব্যানার্জী ▪ প্রবাহনীল দাস
লিও তলস্তয় ▪ নলিনাক্ষ ভট্টাচার্য
তাপস মৌলিক ▪ অংশু পাণিগ্রাহী ▪ বাণীব্রত গোস্বামী ▪অরিন্দম ঘোষ ▪ রঞ্জন দাশগুপ্ত ▪ সিদ্ধার্থ দাশগুপ্ত ▪শাশ্বত কর ▪ রাজীব রায় গোস্বামী ▪ সায়নদীপা পলমল ▪ প্রদীপ কুমার দাস
বদ্রীনাথ পাল ▪ তাপস বাগ ▪ বসন্ত পরামানিক ▪ গোবিন্দ মোদক ▪ সুব্রত দাস ▪ অর্ণব ভট্টাচার্য ▪ সুজাতা চ্যাটার্জী ▪ মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় দাস ▪ মধুমিতা ভট্টাচার্য ▪ ড. রমলা মুখার্জী ▪ সনৎকুমার ব্যানার্জী ▪ বিদ্যুৎ মিশ্র ▪ রাজর্ষি মণ্ডল ▪ রূপালী মুখোপাধ্যায় ▪ শক্তিপদ পণ্ডিত ▪ শম্ভু সরকার ▪ সুব্রত চৌধুরী
অদিতি ভট্টাচার্য ▪ দীপঙ্কর চৌধুরী ▪ মৌসুমী রায় ▪ সবিতা রায় বিশ্বাস ▪ সহেলী রায় ▪ কিশোর ঘোষাল
অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায় ▪ অরিন্দম দেবনাথ ▪ কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায় ▪ দীপক দাস ▪ ড. উৎপল অধিকারী ▪ চন্দ্রানী মজুমদার
সায়ন্তনী পলমল ঘোষ ▪ সোমা দে ▪ শংকর লাল সরকার ▪ সন্দীপন সাহা
অলংকরণ
মায়াসখা নন্দী ▪ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ▪ একপর্ণিকা ক্রিয়েটিভস