বড়ো গল্প
FREE SHIPPING IN INDIA
বড়ো গল্প
সার্কাস ভাঙতে কলকল করে কথা বলতে বলতে বাড়ি ফিরলাম।
“এ কী! সদর দরজা খোলা কেন? লালজি কই?” সেজদা দৌড়ে বাড়ি ঢুকে গেল।
বড়ো জেঠি ডুকরে কেঁদে উঠল।— “আমি জানতাম এমনটাই হবে। বেরোনোর সময় অমন অলুক্ষুনে কথা কেউ বলে? ওরে মেজো, সেজো, ছোটো, আমাদের সর্বনাশ হয়ে গিয়েছে রে!”
সবিতা রায় বিশ্বাস
আমাদের বাড়িতে বড়দাদুর ঘরের দেওয়ালে মস্ত বড়ো একখানা ছবি বাঁধানো আছে। যে-ই ঘরে ঢুকুক না কেন, ছবিখানা চোখে পড়তে বাধ্য। মিলিটারি পোশাক পরা একজন লম্বা-চওড়া পুরুষের হাতে দোনলা বন্দুক আর পায়ের তলায় মুখ থুবড়ে পড়ে আছে রয়াল বেঙ্গল টাইগার। বাঘের ছবিটা স্কুলে, খেলার মাঠে, এমনকি বুধবারের হাটেও আমার মানসম্মান বাড়িয়ে আমাকে একেবারে বড়লাটের নাতি বানিয়ে দিত। সেটা আরও বাড়ত মিছরিলালের জন্যে। মিছরিলাল ছিল বড়দাদুর খাস নোকর। যদিও বড়দাদু স্বর্গবাসী হয়েছেন অনেকদিন, কিন্তু মিছরিলাল আছে, তার পাকা বাঁশের লাঠিটিও আছে। মিছরিলালের সঙ্গে বাজারে গেলেই দুটো অমৃতি না খাইয়ে বাড়ি ফিরত না, তার একটার পয়সা দিত আর অন্যটি মাগনায় জোগাড় করত।
এই মাগনায় খাওয়ার ব্যাপারটা যদিও আমার পছন্দ হত না, কিন্তু হাফ প্যান্ট পরা রোগা টিংটিঙয়ে ছেলেটার আপত্তি শুনতে ভারি বয়েই গেছে তেল মাখানো মোটা বাঁশের লাঠি হাতে পাকানো গোঁফের মিছরিলালের। বলাই ময়রাকে বলত, “বড়াবাবু কে কমরে কি দিওয়ার পর যো বাঘ কি তসবির হ্যায়, উসে ম্যায়নে হি মারা থা।”
বলাই ময়রা বলত, “লালজি, এটা তুমি কী বললে? বড়োবাবুর হাতে বন্দুক, আর বাঘটা মারলে তুমি?”
“অগর আপ ইস পর বিশওয়াস নহি করতে হ্যায় তো ম্যায় ক্যায়া কর সকতা হুঁ?”
বলাই ময়রা লালজির অগর মগর ঠিক বুঝতে না পেরে আর মিছরিলালকে জলদি সরানোর জন্যে আর একখানা কোনা ভাঙা অমৃতি আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে প্রণাম করে বলত, “ছোটোবাবু, আবার আসবেন।”
মিছরিলাল হেঁ হেঁ করে হেসে বলত, “জরুর আসবে, হলওয়াইজি।”
খুব রাগ হত। মিছরিলালের জন্যে আমার প্রেস্টিজ পাংচার। স্কুলে গেলে সবাই বলত, “কী হে ছোটেবাবু, আজ ক’টা ফ্রি হল? অবশ্য তোদের বাড়ির খাওয়াদাওয়া সব তো ফ্রিতেই চলে।”
কথাটা একেবারে মিথ্যে নয়। যে গল্পটা বলছি, সেটা তো পঞ্চাশ-ষাট বছর আগেকার। তখন বাজারের জায়গাটা আমাদেরই ছিল। তাই কিছু কিছু মানুষ যারা সবজি বিক্রি করত, তারা আমাকে দেখলেই জোর করে পটল, কুমড়ো দিয়ে দিত। তাই আমি ঠিক করেছিলাম, মিছরিলালের সঙ্গে কোথাও যাব না। এই লোকটাকে আমার একদম ভালো লাগত না। বড়দাদুর নোকর ছিল, এখন আমার ঘাড়ে চাপার মানে কী? বাড়ির লোকগুলোও যেন কেমন, মিছরিলালকে বলত আমাকে দেখে রাখতে। আমাকে দেখার কী আছে? আমি কি বাঘ-ভাল্লুক নাকি? সবসময় আমার পিছনে ঘুরঘুর করছে!
আমার মতোই আরও একজন মিছরিলালকে মোটেই সহ্য করতে পারত না। সে হল আমাদের আলতামাসি। আলতামাসি শুধু পুজো-পার্বণে মা, জেঠিমা, কাকিমা এদের আলতা পরাত তা নয়, উঠোন, ঠাকুরদালান সব জায়গাতে আল্পনা দিত আর যারা ছোটো মেয়ে ছিল, তাদের মেহেন্দি পরাত।
আলতামাসিকে নিয়ে একটা মজার গল্প আছে। এক বৃহস্পতিবারে আলতামাসি চুপড়ি করে আলতা, সিঁদুর, নখ কাটার নুরুন, পায়ের গোড়ালি ঘষা ঝামা, এমনকি ছোটো মেয়েদের হাতের রঙবেরঙের কাচের চুড়ি নিয়ে হাজির। আগে যে মা-কাকিমাদের আলতা পরাত, সে পনেরো দিনের ছুটি নিয়ে তার মেয়ের বাড়ি গিয়েছিল, কিন্তু মাস পার হয়ে গেলেও আসার নামগন্ধ নেই। ঠাকুমা খুব রেগে ছিল, ঘরের মেয়ে-বউদের পায়ে আলতা না থাকলে সংসারের অকল্যাণ হয়। আলতামাসিকে পেয়ে ঠাকুমা খুব খুশি। ভেতরবাড়ির লালদালানে আলতামাসিকে ঘিরে একেবারে মেলা বসে গেল। মা-জেঠিমাদের পায়ের নখ কেটে, ঝামা দিয়ে ঘষে গোড়ালি পরিষ্কার করে, নকশা করে আলতা পরিয়ে দিতে ঠাকুমার মুখের হাসি আর ধরে না। ঠাকুমা খুশি হয়ে আলতামাসিকে মানদাপিসির ঘরে একখানা তক্তপোশে ঠাঁই দিল।
বাড়ি-ভরতি লোকজন কেউ কোনও আপত্তি না করলেও মিছরিলাল আলতামাসিকে দু-চক্ষে দেখতে পারত না। মিছরিলাল তার সন্দেহের কথা চুপিচুপি ঠাকুমাকে বলেছিল। কিন্তু ঠাকুমা তো কানে ভালো শোনে না, ফোকলা দাঁতে একগাল হেসে বলেছিল, “ও আলতা, এদিক আয় দিকিনি। শোন মিছরির কথা, বুড়ো বয়সে তারও আলতা পরার শখ হয়েছে। দে দেখি পরিয়ে।”
আলতামাসি ঠাকুমার ডাক শুনে পড়িমরি করে চুপড়ি নিয়ে এসেছিল, কিন্তু এই কথা শোনার পর রেগে গিয়ে যা বলল তার মানে আমি ঠিক বুঝতে পারিনি। মিছরিলালও কিছু বুঝেছে বলে আমার মনে হল না। তবে পালিয়ে বড়দাদুর ঘরে গিয়ে কবাট দিল। মিছরিলাল ঠাকুমার কানে কানে বলতে গিয়েছিল, আলতামাসিকে তার মোটেই বিশ্বাস হয় না। সারাক্ষণ চুপড়ি নিয়ে ঘুরছে, কোন দিন না বহুদিদিদের সোনা-গয়না চুপড়ির মধ্যে করে নিয়ে পালিয়ে যায়!
এই ঘটনার পরে মিছরিলাল আলতামাসিকে দেখলেই বড়দাদুর ঘরে ঢুকে যেত। কারণ, আলতামাসি বাঘের জুলজুলে চোখের দিকে তাকালেই ভিরমি খেত। বাবানদাদা যেই বলত, “লালজি আপ বহুত ডরপোক হ্যায়। তুমি আলতামাসিকে এত ভয় পাও কেন? তাই তো মাসি বলে, এই বাঘ তুমি মারোনি।” মিছরিলাল লাফিয়ে উঠে বলত, “কৌন কহতা হ্যায় কি ম্যায় ডরপোক হুঁ? ম্যায়নে হি ইস বাঘ কো মারা।”
বাড়ির ছোটোরা একজোট হয়ে মিছরিলালকে রাগিয়ে দেবার জন্যে বলত, “তা তোমার যখন এত সাহস, আর একটা বাঘ মেরে দেখাও। এবার ছোটকাকুর ক্যামেরায় তোমার ছবি তুলে রাখব।”
আলতামাসি দরজার বাইরে থেকে খুকখুক করে হেসে বলত, “তোমরা যে কী বলো। মিছরি আলতা দেখে অজ্ঞান হয়ে যায়, রক্ত দেখলে ঠিক অক্কা পাবে, ও মারবে বাঘ? সব গালগল্প, ফক্কা।”
২
বড়ো জেঠু বাড়ি না থাকায় বাড়ি একেবারে আড্ডাখানা হয়ে উঠেছিল। প্রায় দু-বছর পর বাড়ি ফিরল জেঠু। ত্রিতাল না নৈনিতাল, কোথায় নাকি গবেষণা করতে গিয়েছিল। এদিকে ঠাকুমা কানে শোনে না, ঠাকুমার কথাও কেউ শোনে না। মা, জেঠিমা, কাকিমারা তিনবেলা হেঁসেল সামলাতেই ব্যস্ত। কাকুদের অফিস-আদালত আছে, অতএব বাড়িটা চলছিল অতিথিনিবাসের মতো। যে-কেউ এসে বলত, ‘আমি হলাম তোমাদের ছোটদাদুর বড়ো কাকুর পিসতুতো শালার মাসতুতো ভাই। এই পাশের গাঁয়ে ভাইজির বিয়ে দিয়েছি, ভাবলাম তোমাদের খবর নিয়ে যাই।’ খবর নিতে এসে ওই যে তিনি চিলেকোঠার ঘরের দখল নিলেন, তিন মাসের মধ্যে নট নড়নচড়ন। বাড়ির লোকের থেকে এইরকম আত্মীয়স্বজনের সংখ্যা বেশি ছিল।
আলতামাসি না থাকলে তাদের নিজের বাড়ি ফেরত পাঠানো সম্ভব হত না। জামাকাপড় পরিষ্কার করতে দিলে মাসির ইশারায় জলে নীলের বড়ি না গুলে আলতাবড়ি গুলে দিত রঘু। তারপর তাদের বাড়ি ফিরে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকত না। আলতামাসি এদের জব্দ করলেও মিছরিলালকে জব্দ করতে না পেরে সারাদিন ঠাকুমার কানের কাছে গজগজ করত। তাতে অবশ্য ঠাকুমার কিছুটি যেত আসত না। ঠাকুমা বলত, “আমি তো সবাইকে বলি, আলতা আমার আর জন্মে মেয়ে ছিল। দে তো মা, ভালো করে চুলে বিলি কেটে দে। হবে হবে, তোর মনের ইচ্ছে পূরণ হবে। এখন কোমরে বেশ করে গরম তেল মালিশ কর দেখি। মিছরি খাবার শখ হয়েছে তা আগে বললেই হত! পরের হাটে এক কেজি আনিয়ে দেবো’খন। আখের গুড়, ধানি লংকা আর খানিক সরষের তেল দিয়ে মাখিস। আর শোন, বউমাদের বলিসনে। আমাকেও এক দলা দিস, চেটে চেটে খাব।”
“কী খাবে, ঠাকুমা?”
ফোকলা দাঁতে একগাল হেসে ছোটো বোন মাধুকে বলত, “ছ্যাঁচড়া। আলতা খুব ভালো মাখে।”
এরপরে আলতামাসি দুঃখ পাবে না তাই কি হয়? আলতামাসি মনের দুঃখে চুপড়ি কোলে নিয়ে ঠাকুরদালানের পাশের শিউলিতলায় বসে ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ করে কাঁদতে লাগল। সবসময় সবাই যদি সন্দেহ করে, কথা না বোঝে, তবে তো কান্না আসবেই। আমাদের বাড়ির অতিথিদের অনেকেরই ধারণা, আলতামাসি নিশ্চয় কোনও বদ মতলবে আমাদের বাড়ি এসেছে। আলতামাসি সর্বক্ষণ মাথা-ভরতি সিঁদুর, আর চওড়া করে আলতা পরে, কচরমচর করে পান চিবোয়। অথচ স্বামীর নাম জিজ্ঞেস করলে বলে, মনে নেই। নিজের আসল নামটাও নাকি ভুলে গিয়েছে। জেঠিমা, কাকিমারা এসব শুনলে খুব রেগে যেত। বলত, “মনে না থাকলে কী করবে? মিথ্যে কথা বলবে? ওর কপাল সুখ নেই গো, তাই তো মাথার গণ্ডগোলে নাম-ঠিকানা সব ভুলে গিয়েছে। মানুষটাকে সেই কতকাল আগে থাকতে দেখছি, সবসময় ন্যায্য কথা বলে, তা সে যদি দোষ হয় তো দোষ। তোমরা কেউ ওর মনে দুঃখ দিও না।”
শিউলিতলায় বসে আলতামাসি যখন ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ করে কাঁদছিল আর কাপড়ের আঁচলে শিকনি মুচছিল, তখনই সদর দরজা দিয়ে হ্যাট, কোট, বুট পরে ঢুকল বড়ো জ্যাঠামশাই। যে আলতামাসি চুপড়ি ছাড়া এক পাও কোথাও যায় না, সে যে কেমন করে হুঁশ মন্তর ফুশ হয়ে গেল কে জানে! আমরা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে চুপড়ি ঘিরে দাঁড়িয়ে আছি, পা যেন মাটিতে আটকে গেছে। জ্যাঠামশাই জলদগম্ভীর স্বরে মিছরিলালকে ধমক দিল, “ছোটো ছেলেরা এখানে কী করছে? আজ মাস্টার পড়াতে আসেনি?”
মিছরিলাল নিজের পিঠ বাঁচাতে হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিল।— “উহ্ আ গয়া হ্যায়। লুচি অউর হালওয়া খা রহা হ্যায়।”
মিছরিলাল কেন যে আলতামাসির কথা বলল না, এটা বুঝলাম না। পরে বাবানদাদা বলেছিল, “মাথামোটা এটাও বুঝলিনে? মাস্টারমশাইয়ের ওপরে লালজি চটে আছে যে! মাস্টারমশাই লালজির কথা শুনে কিছু বুঝতে পারেন না। বলেন, অর্ধ শতাব্দীর বেশি তুমি বাংলা মুলুকে আছ, অথচ বাংলা বলতে পারো না? হিন্দিও বলো জগাখিচুড়ি ভাষায়। লজ্জা! লজ্জা!”
যদিও মিছরিলাল দমবার পাত্র নয়। সেও বলে, “হমার দেশের ভাষা হামি ছাড়বে কেন?”
জেঠু আসার পরে এসব ঝগড়া উধাও। তবে জেঠু তো বেশিদিন বাড়ি থাকে না, এটাই মুশকিল। অন্য কাকুরা, আমার বাবা অফিস-আদালত করে, কিন্তু বাড়ির ব্যাপারে মাথা গলায় না। ঠাকুমা তো কানেই শোনে না। তাই জেঠু ঠিক করেছে, এবার আমার মাকেই দায়িত্ব দিয়ে যাবে। বড়ো জেঠিমা এ-কথা শুনে খুব খুশি। আসলে জেঠিমা রান্না করে খাওয়াতে খুব ভালোবাসে। সেটা জানে বলেই জেঠু ছ’মাস পরে বাইরে যাবার সময় মাকেই দায়িত্ব দিয়ে গেলে।
জেঠু যাবার আগে লোক লাগিয়ে বাড়িঘর সারিয়ে, রঙ করিয়ে একেবারে ঝাঁ চকচকে করে ফেলল। দেখে কে বলবে, দুশো বছরের পুরোনো বাড়ি! আলতামাসির কাজও বেড়ে গেছে খুব। খাটের তলায় বড়ো বড়ো তোরঙ্গ থাকে, সেগুলোর মধ্যে কাঁসা-পেতলের বাসন ঠাসা। আলতামাসি সেগুলো তেঁতুল দিয়ে ঘষে ঘষে একেবারে নতুন করে ফেলল। মিছরিলাল তো এসব দেখে রেগে টং। বড়াবাবুর এ কাম ঠিক হল না। আলতা চুপড়ির মধ্যে করে ঠিক কিছু বাসন নিয়ে পালিয়ে যাবে। তবে এসব কথা জোরে বলত না লালজি। মাস্টারমশাই পড়াতে আসলে তাঁর কানে কানে বলত। মিছরিলালের সামনের কয়েকটা দাঁত পড়ে গিয়েছিল বলে বেশিরভাগ কথাই হাওয়া হয়ে বেরিয়ে যেত। মাস্টারমশাই আর কী করেন। তেল মাখানো বাঁশের লাঠি দেখে ভয় কে না পায়! তাই বলতেন, “ঠিক। ঠিক। সহি বাত।”
বাড়িঘর রঙ করার আরও একটা কারণ ছিল, বড়দিদির বিয়ে। বড়দিদি হল মেজো জেঠুর মেয়ে। বড়ো জেঠু আলতামাসিকে বলে দিয়েছে বড়দিদিকে কাঁচা হলুদ আর দুধের সর বেটে মাখাতে। চন্দন, মুসুরডাল—সে বিরাট লিস্টি। আসলে বড়দিদির গায়ের রঙটা একটু চাপা কিনা!
ওদিকে মিছরিলালের কাজও খুব বেড়ে গেছে। বাড়ির পূর্বপুরুষদের বড়ো বড়ো অয়েল পেন্টিং নামিয়ে সাফসুতরো করে দেওয়ালে টাঙিয়ে রাখছে। আমাদের বাড়ির একটা ঘর সবসময় বন্ধ থাকত, সেই ঘরটাও মা মিছরিলালকে দিয়ে খুলিয়ে পরিষ্কার করাচ্ছে। আমাদের ওই ঘরের আশেপাশে যাওয়া নিষেধ। কিন্তু যেটা বারণ করা হয়, ছোটোদের সেইটাই করতে বেশি ইচ্ছে হয়।
“আরে বাপরে! বন্দুক!”
আর একটু হলেই বাবানদাদার জন্যে আমরা মিছরিলালের কাছে ধরা পড়ে যেতাম। লালজি মাথায় পাগড়ি বেঁধে বন্দুকে তেল মাখাচ্ছে, আর মনের আনন্দে হনুমান চালিসা গাইছে। মিছরিলাল রোজ সন্ধেবেলায় হনুমান চালিসা গায়। শুনতে শুনতে আমাদেরও মুখস্থ হয়ে গেছে।—
‘শ্রী গুরু চরণ সরোজ রজ, নিজ মন মুকুর সুধারি।
বরণৌ রঘুবর বিমল যশু, জো দায়ক ফলচারি॥
বুদ্ধিহীন তনু জানিকৈ, সুমিরৌ পবন কুমার।
বল বুদ্ধি বিদ্যা দেহু মোহি, হরহু কলেশ বিকার॥’
কখন যে একটু একটু করে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়েছি, বুঝতেই পারিনি। এই ঘরের দেওয়ালে হরিণের মাথা, কাচের মধ্যে ভাল্লুকের চামড়া, মোষের শিং— কত কিছু যে আছে! কেমন যেন বোঁটকা গন্ধ। হ্যা-হ্যা-হ্যা-আ-হ্যাঁচ্চো! কিছুতেই হাঁচিটা ঠেকিয়ে রাখতে পারলাম না। ঠিক সেই সময়ই পেছন থেকে কে যেন আমার আর টুবলুর জামার কলার ধরে নিয়ে এসে বলির পাঁঠার মতো মায়ের সামনে ফেলে দিল। এই প্রথম সেজদাদা এমন একটা কাজ করল। একটু আধটু বকে, “গোল্ডি, পড়তে বোস। বাবানের সঙ্গে মিশলে মুখ্যু হয়ে থাকতে হবে, এই আমি বলে দিলাম। কাকু জানতে পারলে খুব দুঃখ পাবে। অত বড়ো একজন ডাক্তারের ছেলে হয়ে তুই কি ঘোড়ার ঘাস কাটবি?”
এই এক মুশকিল! সেজদাদা কলেজে পড়ে বলে জেঠুদের মতো কথা বলবে? কিন্তু এখন মায়ের হাত থেকে বাঁচব কী করে? পাখার ডাঁটি মা কালীর খাঁড়ার মতো করে উঁচু করে ধরেছিল মা, কিন্তু আমার পিঠে চেপে বসার আগেই আলতামাসি ঝড়ের গতিতে এসে গজগজ করতে করতে আমাকে আর টুবলুকে কলতলায় নিয়ে বসিয়ে দিল। তারপর সাবান দিয়ে জোরে জোরে গা ঘষতে লাগল। আলতামাসি না থাকলে কী যে হত! তাই তো টিকটিকি লজেন্স কিনলেই মাসিকে একটা করে দিই।
৩
সেই বছরই শীতকালে আমাদের স্কুলের খেলার মাঠে মডার্ন সার্কাসের তাঁবু পড়ল। স্কুলের পাশেই মধুমতী নদী। সারাদিন নদীর ঘাটে ভিড় লেগেই আছে। সার্কাসের হাতি ওখানেই বাঁধা থাকে যে! এত বছর পরেও পরিষ্কার মনে আছে, বাবানদাদা বাড়ি এসে কানে কানে বলত স্কুল ছুটির পরে তাঁবুর চারপাশে উঁকি মেরে জলহস্তী, বাঘ, সিংহ, কাকাতুয়া, পায়রা সব দেখেছে। শুধু আমারই কিছু দেখা হল না। আমি তখন প্রাইমারি স্কুলে পড়ি। স্কুল আমাদের বাড়ির কাছেই ছিল। আমি খুব কান্নাকাটি করাতে মা বলল, “আমরা বাড়ির সবাই মিলে সার্কাস দেখে আসি। ছোটো বাচ্চাগুলো বাঘ, সিংহ দেখে ভয় পেয়ে কান্নাকাটি করলে ওদের দাদারা সামলাতে পারবে না। প্রথম শো-ই ভালো। তবুও ফিরতে ফিরতে সন্ধে হবে।”
মিছরিলাল খুব সাহস দিল।— “দেখিয়ে আসেন, মাইজি। হামি আছে, হামার বন্দুক আছে, বাড়ি পাহারা দিবে।”
মিছরিলালের কথা শুনে সবাই আঁতকে উঠে বলল, “বন্দুক? বন্দুক কোথায় পেলে?”
ফট করে টুবলু বলে দিল, “সেদিন তো লালজি বন্দুকে তেল মাখাচ্ছিল আর গান গাইছিল। আমি, মানে আমরা সবাই নিজের চোখে দেখেছি।”
এ-কথা শুনে সেজদাদা বেজায় চটে গেল।— “মিছরিলালজি, এটা তুমি ঠিক করোনি। বড়ো জেঠু জানতে পারলে খুব রাগ করবেন। ওই বন্দুক বড়দাদুর। তুমি আর কখনও ওতে হাত দেবে না।”
লালজি কিছু বলার চেষ্টা করছিল, কিন্তু মা থামিয়ে দিয়ে বলল, “তোমার হাতে বাঁশের লাঠিই যথেষ্ট। আর বড়ো খোকা থাকছে, আলতাও যাবে না বলছে। বাবুরা অফিস-আদালত থেকে বাড়ি ফিরলে তাদের চা-জল এগিয়ে দেবে।”
আলতামাসি থাকার কথা শুনে মিছরিলাল খুব রেগে গেল।— “আলতাকো সাথ লে যান, মাইজি। উহ্ বহুত…”
এটুকু শুনেই আলতামাসি ক্ষেপে লাল।— “খবরদার লালজি, একদম বাজে কথা বলবে না! তুমি তো থাকবে বাইরে, অন্দরে একজন না থাকলে চলে?”
আমার তো খুব চিন্তা হচ্ছিল, সার্কাস দেখাটাই না বরবাদ হয়ে যায়! শেষমেশ ঠাকুরমাকে গিয়ে কেউ কানের কাছে বলাতে ঠাকুমা লাঠি হাতে পুতুলের মতো মাথা নাড়তে নাড়তে এসে বলল, “তোরা যা। আমি তো আছি।”
মাধু হিহি করে হেসে বলল, “ও ঠাকুমা, তুমি বেড়াল তাড়াতে পারো না, তুমি ধরবে চোর?”
মাধুর কথা শুনে বড়ো জেঠি রেগে গেল।— “এ কী অলুক্ষুনে কথা! হঠাৎ করে চোর-ডাকাতের কথা তোর মাথায় এল কেন?”
“না, মানে মিছরিলালজি বন্দুক দিয়ে বাঘ মেরেছিল তো! তাই ভাবলাম, এবার…”
“থাক, থাক। ওসব কথা আর মুখে এনো না।”
ওদিকে সেজদাদা টিকিট কেটে এনেছে। এখন যদি এইসব ঝগড়া শোনে, রেগেমেগে সব টিকিট ছিঁড়ে ফেলতে পারে। বাড়িতে সবাই বলে, বড়দাদুর নাকি এমন রাগ ছিল।
সার্কাসের তাঁবুতে ঢুকে আমি তো ওপরের দিকেই তাকিয়ে আছি। বাপরে! কত্ত উঁচু! বাবানদাদা হাত চেপে ধরেছিল, না-হলে হোঁচট খেয়ে পড়েই যেতাম। আমাদের টিকিট ছিল সামনের দিকের চেয়ারে। বসতে না বসতেই বেজে উঠল বাজনা। আমি তো বুঝতেই পারছি না কোথা থেকে শব্দ আসছে। বাবানদাদা ফিসফিস করে বলল, “ওরে বুদ্ধু, ওই ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখ, ওখানে বসে বাজনা বাজাচ্ছে।”
দেখব কী! আমার তো মাথা ঘুরতে লাগল। অত ওপর থেকে হাত ছেড়ে দুলছে সবাই। সেজদাদা বলল, “এটা ট্রাপিজের খেলা।”
কীসব খেলা! একটা সুন্দরী মেয়ের বুকের ওপর দিয়ে হাতি চলে গেল। হাতি নারকেল ফাটিয়ে গণেশ পুজো করল। সিংহ যখন এল, আমি তো ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলেছিলাম। আমাদের বাড়িতে দুটো টিয়াপাখি আছে, খাঁচায় থাকে। সবার নাম ধরে ডাকে। কিন্তু টিয়াপাখিও যে সাইকেল চালাতে পারে, এই প্রথম দেখলাম। সার্কাসের বাঘদের মনে হয় রাগ নেই। খুব সুন্দর একটা মেয়ে বাঘের গায়ে হেলান দিয়ে শুয়ে থাকল, বাঘটা কিচ্ছু বলল না!
আর লাল নাকের ছোটো ছোটো মানুষগুলো কি হাসাতেই না পারে! বাবানদাদা বলল, “ওদের জোকার বলে।”
বাবানদাদা এত কিছু জানল কী করে? ও কি কোনোদিন লুকিয়ে লুকিয়ে সার্কাস দেখেছে? কিন্তু আমার যে হাসতে হাসতে সুসু পেয়ে গেল। মাকে বলতে মা সেজদাকে দিয়ে বাইরে পাঠিয়ে দিল।
সার্কাসে ঢোকার সময় খেয়াল করিনি, এখন দেখলাম কত্ত দোকান বসেছে। লোকজন মেলায় গেলে যেমন জিলিপি, পাঁপড় খায়, এখানেও কচমচ করে খেয়ে যাচ্ছে। সেজদাদা তাঁবুতে ঢোকার আগে অনেক বাদাম কিনে ঢুকল। বলল, ফেরার পথে দু-সের গরম জিলিপি নিয়ে যাবে। আমার তো মনে হচ্ছিল এখন কিনলেই ভালো হত! জিলিপি খেতে খেতে সার্কাস দেখতাম। সেজদাদা কী করে যে মনের কথা বোঝে! বলল, “ওরে বোকা, এখন জিলিপি খেলে রসে হাত চ্যাটপ্যাট করত। জল পেতি কোথায়?”
তাই তো! এ-কথাটা তো আমার মনে হয়নি। সবাই যে বলে গোল্ডি খুব বোকা, সেটা ঠিকই বলে। নাহ্, আমি বড়দাদার মতো বোকা আর কুঁড়ে হব না, সেজদাদার মতো বুদ্ধিমান হব। আর পড়াশোনায় ফাঁকি দেব না।
সার্কাস ভাঙতে কলকল করে কথা বলতে বলতে বাড়ি ফিরলাম।
“এ কী! সদর দরজা খোলা কেন? লালজি কই?” সেজদা দৌড়ে বাড়ি ঢুকে গেল।
বড়ো জেঠি ডুকরে কেঁদে উঠল।— “আমি জানতাম এমনটাই হবে। বেরোনোর সময় অমন অলুক্ষুণে কথা কেউ বলে? ওরে মেজো, সেজো, ছোটো, আমাদের সর্বনাশ হয়ে গিয়েছে রে!”
আমার মায়ের মাথা খুব ঠান্ডা। মা সবাইকে শান্ত করে বাড়ি ঢুকল।
সেজদা হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বলল, “বড়দা এখনও ভাতঘুম দিচ্ছে। তাকে ডেকে কোনও লাভ নেই। লালজিকে দেখলাম না, তবে সব ঘরের তালা বন্ধই আছে।”
মা বলল, “আলতা? সে কী করছে?”
সেজদাদা বলল, “তাই তো, আলতামাসির খবর তো নেওয়া হয়নি। আমি যাচ্ছি।”
মা বলল, “থাক, আমি দেখছি। সদর দরজা বন্ধ করো। বড়দিদি, তোমরা সবাই ঘরে গিয়ে কুপি, হ্যারিকেন জ্বালাও। বাবান, গোল্ডি, মাধু আর সবাই তোমাদের বড়দাদার ঘরে গিয়ে বোসো। আমি না ডাকা পর্যন্ত কেউ বের হবে না।”
সেজদাদা খুব কাজের। লন্ঠন এনে মায়ের হাতে দিতে মা সব ঘরের তালা ভালো করে পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখে একটা ঘরের তালা খোলা। চাবি ঝুলছে বাইরে। সেজদাদা আর মা তাড়াতাড়ি ভেতরে ঢুকে দেখে মিছরিলাল উপুড় হয়ে পড়ে আছে, পাশে বন্দুকটাও পড়ে আছে। ভালো করে দেখে মা বুঝতে পারে, মিছরিলাল কোনও কারণে ভয় পেয়ে অজ্ঞান হয়ে গেছে। চোখে-মুখে জলের ছিটে দিয়ে সেজদাদা জ্ঞান ফেরালে প্রথম কথা বলল, “হামি জিন্দা আছি?”
এর মধ্যে বাড়িতে জেঠু, কাকুরা ফিরে এসেছে। এমনকি বড়ো জেঠুও। মা লালজিকে বড়ো জেঠুর জিম্মায় রেখে লন্ঠন নিয়ে বাড়ির পিছনে গোয়ালঘরের দিকে পা বাড়াল। সেজদাদা খুব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করাতে মা বলল, “বাড়িতে বাঘ ঢুকেছে। মনে হচ্ছে আলতা ওদিকেই আছে।”
সেজদাদা মায়ের কথা শুনে অবাক। আগেই বলেছি, আমার মা ছিল খুব বিচক্ষণ, বুদ্ধিমতী। তাই তো বড়ো জেঠু বাড়ির দায়িত্ব মাকে দিয়েছিল। কিন্তু মিছরিলাল যে বন্দুক নিয়ে এমন বোকামি করবে সেটা বুঝতে পারেনি। মা বাড়ি ঢুকেই বাঘের গায়ের গন্ধ পেয়েছিল। কলঘরের সামনের ভেজা মাটিতে বাঘের পায়ের ছাপ দেখেছিল। ছাপ দেখে মায়ের মনে হয়েছিল আমাদের কাজলির ছোটো বাছুরের মতো হবে।
মায়ের ধারণা পুরোপুরি মিলে গিয়েছিল। আলতামাসি বাঘ দেখে ভয় না পেয়ে গোয়ালঘরের বাঁশের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে বোতলে করে দুধ খাওয়াচ্ছিল।
সে একখানা কাণ্ড বটে! বাঘের গায়ে হাত বুলিয়ে দেখেছিলাম সবাই। বেচারা মিছরিলালজি লজ্জায় একবারও উঁকি দিয়ে দেখেনি। বন্দুক হাতে নিয়ে বাঘের ডাক শুনেই জ্ঞান হারাল! এরপরে আর কোনোদিন বলেনি, ‘উস বাঘকো ম্যায়নে হি মারা থা।’
সেজদাদা খবর দিতে সার্কাস দলের ম্যানেজার নিজে এসে বাঘের বাচ্চাটাকে নিয়ে গিয়েছিল। বড়ো জেঠুকে নমস্কার করে বলেছিল, “আপনারা খুব ভালো মানুষ। অন্য কারও হাতে পড়লে বিক্রি করে দিত। কখন যে বাচ্চাটা খাঁচা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল, আমরা জানতেই পারিনি। আপনাদের সবাইকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি, আর একদিন আমাদের সার্কাস দেখে যাবেন। টিকিট কাটবেন না, এটা আমার তরফ থেকে ছোট্ট উপহার।”
শুভাঞ্জন ব্যানার্জী ▪ প্রবাহনীল দাস
লিও তলস্তয় ▪ নলিনাক্ষ ভট্টাচার্য
তাপস মৌলিক ▪ অংশু পাণিগ্রাহী ▪ বাণীব্রত গোস্বামী ▪অরিন্দম ঘোষ ▪ রঞ্জন দাশগুপ্ত ▪ সিদ্ধার্থ দাশগুপ্ত ▪শাশ্বত কর ▪ রাজীব রায় গোস্বামী ▪ সায়নদীপা পলমল ▪ প্রদীপ কুমার দাস
বদ্রীনাথ পাল ▪ তাপস বাগ ▪ বসন্ত পরামানিক ▪ গোবিন্দ মোদক ▪ সুব্রত দাস ▪ অর্ণব ভট্টাচার্য ▪ সুজাতা চ্যাটার্জী ▪ মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় দাস ▪ মধুমিতা ভট্টাচার্য ▪ ড. রমলা মুখার্জী ▪ সনৎকুমার ব্যানার্জী ▪ বিদ্যুৎ মিশ্র ▪ রাজর্ষি মণ্ডল ▪ রূপালী মুখোপাধ্যায় ▪ শক্তিপদ পণ্ডিত ▪ শম্ভু সরকার ▪ সুব্রত চৌধুরী
অদিতি ভট্টাচার্য ▪ দীপঙ্কর চৌধুরী ▪ মৌসুমী রায় ▪ সবিতা রায় বিশ্বাস ▪ সহেলী রায় ▪ কিশোর ঘোষাল
অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায় ▪ অরিন্দম দেবনাথ ▪ কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায় ▪ দীপক দাস ▪ ড. উৎপল অধিকারী ▪ চন্দ্রানী মজুমদার
সায়ন্তনী পলমল ঘোষ ▪ সোমা দে ▪ শংকর লাল সরকার ▪ সন্দীপন সাহা
অলংকরণ
মায়াসখা নন্দী ▪ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ▪ একপর্ণিকা ক্রিয়েটিভস