ছোটো গল্প
FREE SHIPPING IN INDIA
ছোটো গল্প
বুড়ো ইতোমধ্যে কোথা থেকে দড়ি বার করেছে। হলদেটে পাকানো স্তূপাকৃতি সে-দড়ি কুণ্ডলী পাকিয়ে থাকল খানিক। তারপর নিজে থেকেই উঠতে লাগল আকাশে। সে কী ওঠা রে বাপ! ছ’তলা বাড়ি সমান উঠল। উঠে ওই ফণা দোলাচ্ছে।
সিদ্ধার্থ দাশগুপ্ত
ট্রেন আছে একটা লোকাল কলকাতা যাবার। সাড়ে আটটায় ঢুকবে স্টেশনে। বাঁচা গেছে। আজকেই বাড়ি পৌঁছে যাব। হয়তো রাত একটা-দেড়টা হবে ঢুকতে। হোক। লেখালেখিতে প্রায়শই রাত কাবার হয়ে যায় আমার।
টিকিট কেটে নিশ্চিন্ত হয়ে বসলাম বেঞ্চে। ছোট্ট স্টেশন, ছোট্ট টিকিটঘর। গুটিকয় লোক এদিক-ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। প্ল্যাটফর্মে আলোর থেকে আঁধারি বেশি। সে যাক। কাজ হয়ে গেছে। এবার ঘরের ছেলে ঘরে ফেরা। বর্ধমানের এই প্রাত্যন্ত জায়গায় সাধ করে আসিনি আমার মতো ঘরকুনো মানুষ।
এখনও আধা ঘণ্টা দেরি আছে। কী করি কী করি ভাবতে-ভাবতেই দেখি টিকিটঘরের লাগোয়া দেয়ালে ঠেস দিয়ে কে যেন বসে আছে। আগে খেয়াল করিনি তো! তাকিয়েই আছে। হাসছে। সাদা পোশাক। পাজামা চুস্ত মনে হল। টিকিটঘরের আলো খানিকটা মুখের ওপর পড়েছে। বলিরেখাময় মুখ। বুড়ো মানুষ। ভিখারি হতেই পারে। পাগল হবারও সম্ভাবনা আছে।
মুখ ঘুরিয়ে নিতাম। হঠাৎ সে একটা সাদা পিংপং বল কোথা থেকে বার করল। বার করে লোফালুফি করতে লাগল। বাস রে! সাদা বল একবার কালো হল। তারপর আবার সাদা। আবার কালো। তারপর লাল, নীল, হলুদ… খেয়াল করলাম, ওই জায়গাটুকুতে আলোর কিন্তু উজ্জ্বলতা আছে, সারা স্টেশনে সামান্য আলো থাকলেও।
বাপরে, জাদুকর! একসময় আমারও খুব শখ ছিল ও-লাইনে। বই কিনেছি। তাসের ম্যাজিক প্র্যাকটিস করেছি। সে-সব অবশ্য ছোটোবেলায়। কলেজ ছাড়তে এমন অন্নচিন্তা ভগবান দিলেন যে বাধ্য হয়েই সব শখ-টখ…
সে যাক গে। বুড়ো ইতোমধ্যে কোথা থেকে দড়ি বার করেছে। হলদেটে পাকানো স্তূপাকৃতি সে-দড়ি কুণ্ডলী পাকিয়ে থাকল খানিক। তারপর নিজে থেকেই উঠতে লাগল আকাশে। সে কী ওঠা রে বাপ! ছ’তলা বাড়ি সমান উঠল। উঠে ওই ফণা দোলাচ্ছে।
পরের পাঁচ মিনিট মুগ্ধ হয়ে দেখলাম দড়ি ছাড়াও রুমালের নানা কারসাজি। বলা ভালো, চোখ ছানাবড়া করে বসিয়ে রাখল বেঞ্চে। তারপর দেখতে পেলাম ট্রেন ঢুকছে পশ্চিমদিক থেকে। উঠলাম। পকেট থেকে পয়সা বার করলাম। পয়সা নয়, টাকা। একশো টাকা। যা দেখিয়েছে তার থেকে অনেক কম। তবে এর থেকে বেশি তো আর রাস্তার ভেল্কিওয়ালাকে দেওয়া যায় না।
সেও উঠেছে। দু-হাত পেতেছে দাঁড়িয়েছে। মাথা যেন কৃতজ্ঞতায় নুয়ে পড়েছে। হাতে টাকা দিলাম। বললাম, “অসাধারণ। কোনও তুলনা হয় না। যা দিলাম অনেক কম…”
“বাবু, আসল জিনিস দিন।” স্পষ্ট হিন্দি উচ্চারণ।
চমকে উঠলাম। আসল জিনিস? কী বলতে চায়? বুক গুরগুর করে উঠেছে।
সটান দাঁড়িয়ে এখন। মাথায় অন্তত সাড়ে ছয় ফুট। দানবের মতো চেহারা। রাস্তায় দেখলে লোকে আঁতকে উঠবে।
“হ্যাঁ, আসল জিনিস। নইলে গাড়ি তো যাবে না।”
ট্রেন! ট্রেন কই? এই তো ঢুকছিল। কোথায় গেল?
পুরো গোটা একটা ট্রেন হাওয়া। শুনশান প্ল্যাটফর্ম। যেমন দু-মিনিট আগে ছিল। আমি উদ্ভ্রান্তের মতো এদিক-ওদিক তাকালাম। চিহ্ন নেই এতটুকু।
ম্যাজিক? অনুভব করলাম, হাত কাঁপছে। শরীর ঘামছে। চিনচিন একটা ব্যথা বুকে ছড়িয়ে পড়ছে। গলাও শুকিয়ে আসছে। ঠোঁট মুছতে গিয়ে দেখি… হাতে শ্বেতীর দাগ। একটা সাদা স্পট ছোটোবেলাতে ছিল বাঁহাতের কানাতে। মা ভয় পেয়ে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেছিল। ডাক্তার দেখেই আশ্বস্ত করেছিল। বলেছিল, ‘শ্বেতী হয়নি।’
সেই নিরীহ স্পট এখন শ্বেতী হয়েছে। একজায়গায় নেই, আস্তে আস্তে হলেও বাড়ছে। প্রায় চোখের সামনে জিনিসটা ছড়িয়ে পড়ছে শরীরে।
“এখনও সময় আছে, বাবু। পাপ বাড়াবেন না। এখনও…”
আকাশ ফাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম, “তুমি কী জানো? কতটুকু জানো? সেই ছোটোবেলায় কোন অভাবে পরে… বাপ-মা দুজনকে হারিয়ে…”
চিৎকার নয়। বুক নিংড়ানো কান্না। কতদিন পরে।
সেই চিৎকারেই সংবিৎ ফিরে এল। কেউ কোথাও নেই। ফাঁকা প্ল্যাটফর্ম।
জাদুকর নেই। উধাও।
ঘড়িতে আটটা দশ। ট্রেন এখনও আসেইনি। ঢুকতে কুড়ি মিনিট আরও।
ছুটছি রাস্তা দিয়ে। লোকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছে। মফস্সল শহরে কোট-টাই পরা বাবু ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে, যেন কেউ তাড়া করেছে জান নেবার জন্য। চমকে হাঁ করে দেখার জিনিস।
রাস্তা, গলি পেরিয়ে সেই বাড়ির সামনে।
পুরোনো একতলা। ওই যে আলো জ্বালানো ঘরে। বুড়ো অধিরাজ সেন নিশ্চয়ই ডিনার শেষ করেছেন। এখন ওষুধ খাবেন। তারপর নার্স বিছানায় শুইয়ে দেবে। ক্ষীণ দৃষ্টিশক্তি ছিল এই সেদিনও। ছেলের মৃত্যুর পরে সেটুকুও হারিয়েছেন। মেধাবী ছেলেটি এক দুর্ঘটনায় আচমকাই চলে গেছে ছ’মাস আগে। তারপরেই কলকাতা ছেড়ে এই মফস্সলে চলে এসেছেন অধিরাজ। বাড়িটা আগেই কেনা ছিল। শেষজীবন এখানেই কাটাতে চান।
দরজা খোলাই ছিল। আমি ঢুকলাম। চেয়ারে বসে দম নিচ্ছি। অধিরাজ আমার দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন। চোখ নেই এই যা ভরসা। নইলে ও-চোখের দিকে কি তাকিয়ে থাকতে পারতাম আর? কখনোই না। চোর কখনও পারে?
খানিকক্ষণ চুপচাপ। তারপর বললেন, “যাও রেখে দাও, যেখানে ছিল।”
আমি অবাক হয়ে গেলাম। মানুষটি জানতেন। আমি চোর যে জেনে বসেছিলেন চুপচাপ? কেন? অসহায় বলে?
এবার শব্দ করে হাসলেন।— “জানতাম তো। ইয়াকুব বলেছে।”
ইয়াকুব?
“সাড়ে ছ’ফুট, বুঝলে? সেটাই কাল হল অবশ্য। কর্নেল স্লিম্যানের দলবল ধরে নিলে শেষমেশ।”
বুঝছি একটু যেন কার কথা বলছেন। সেই, সেই জাদুকর…
“ওরা বহু পুরুষের বাজিকর। জাতে রহিলা মুসলমান। হাতসাফাই, দড়ির খেলা এসব দেখিয়ে বেড়াত। তারপর লোভ বাড়ল। ঠগির দল ডেকে নিল। ঠগি বোঝো তো?”
বুঝি না আবার? ঠগি নিয়ে আমার লেখা বেরিয়েছে নামি ম্যাগাজিনে। একটা বড়ো লেখার তালেও আছি। উত্তর ভারতের বিখ্যাত ডাকাত গোষ্ঠী। রাস্তায় নিরীহ পথচারীকে গলায় ফাঁস দিয়ে মেরে সর্বস্ব কেড়ে নিত। প্রায় ছ’শো বছর দাপিয়ে রাজত্ব করেছে। সিপাই বিদ্রোহের কিছু পরে ব্রিটিশ এই ঠগি ডাকাতের অত্যাচারে তিতিবিরক্ত হয়ে চিরুনি তল্লাশি করে এদেরকে মারে। কর্নেল স্লিম্যানের নেতৃত্বে এই ঠগিদমন ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে আছে।
“তারপর ব্রিটিশ তৎপর হল। ঠগি নির্মূল হল দেশ থেকে। ইয়াকুব ধরা পড়েছিল। কিন্তু দড়িতে ওর মৃত্যু হয় বলো? দড়ি তো ওর কথা শোনে। ফাঁসির দড়ি তিনবার ছিড়ে গেল। ফাঁসুড়েরা ভয় পেয়ে গেল। বলল, এ-মানুষ শয়তান। একে মারব না। ফাঁসি রদ হয়ে যাবজ্জীবন হল। মেয়াদ শেষের আগেই পালাল। তারপর…”
“এখনও…” কোনোমতে স্বর ফুটেছে আমার।
“হ্যাঁ, এখনও সে রয়েছে। মৃত ভেবো না। মরেনি। কী করে বেঁচে রয়েছে আজ দু’শো বছর জিজ্ঞেস কোরো না। ও পারে। ওরা জাত জাদুকর। হাত সাফাইয়ের খেলা শুধু নয়, প্রকৃতির কিছু গোপন রহস্যও আয়ত্ত করেছে ওরা। ওরা বলছি, ওদের একটা ছোটো দল আছে। কী করে টিকে আছে, কথায় আছে জানি না। তবে ওরা আছে।”
বইয়ের তাকে রেখে দিলাম ডায়েরি। চুরি করেছিলাম। ঊনবিংশ শতকের এক কর্নেলের ডায়েরি। সিপাহি বিদ্রোহের সময় মারা যান। অধিরাজ সেন—পদ্মশ্রীপ্রাপ্ত খ্যাতনামা ঐতিহাসিক ও সংগ্রাহক, সিপাই বিদ্রোহের চলমান এনসাইক্লপিডিয়া—তাঁকে অসহায় অন্ধ বৃদ্ধ ভেবে চুরি করেছিলাম। নামি প্রবন্ধকার আমার বাইরের পরিচয়। আদতে আমি চোর। দুষ্প্রাপ্য ঐতিহাসিক জিনিস বিদেশে পাচার করি। ইন্টারভিউ নিতে এসে দেখে লোভ সামলাতে পারিনি।
“এই আমার শেষ কাজ। ঠগিদের নিয়ে অনেক তথ্য পেয়েছি। ইয়াকুব এই আসবে আলো নেভানোর পরে। গল্পের ঝাঁপি উপুড় করবে। সকালে ডিকটেশন দিই।”
সর্বনাশ! ইয়াকুব আসবে আবার! ভয়ে লাফিয়ে উঠলাম।
“কী করে খুঁজে পেল আমায় জানি না। ওরা পারে। ছেলে চলে যাবার পর বাঁচার ইচ্ছে যখন আর নেই, একদিন সামনে এসে সালাম জানিয়ে বলেছিল, ভয় পাবেন না। আমি আছি আপনার সেবক। আমার গল্প বলব। আপনি লিখবেন। এখনও বাঁচতে হবে ক’দিন। এখনও সময় হয়নি। যম আমি ঠেকিয়ে রাখব কয়েকদিন। আমরা বাজিকর। মৃত্যুকে জয় কেউ করে না, কিন্তু আমরা কয়েকবার ফেরত পাঠাতে পারি ছলচাতুরি করে।
“ঠগি নিয়ে লেখা শেষ হল একদিন। বললাম, এবার যেতে দাও। সে রাজি নয়। এখন ভারতের জাদুবিদ্যার আদি ইতিহাস লেখা ধরেছি। কত অজানা তথ্য, কত পুরোনো, সেই আদি মহাভারতের…”
আমি তড়িঘড়ি বেরিয়ে গেলাম। ইয়াকুবের মুখোমুখি হওয়ার সাহস নেই আমার। কোনোমতে পালিয়ে বাড়ি পৌঁছতে পারলে বাঁচি এখন।
লেখকের অন্যান্য লেখা
শুভাঞ্জন ব্যানার্জী ▪ প্রবাহনীল দাস
লিও তলস্তয় ▪ নলিনাক্ষ ভট্টাচার্য
তাপস মৌলিক ▪ অংশু পাণিগ্রাহী ▪ বাণীব্রত গোস্বামী ▪অরিন্দম ঘোষ ▪ রঞ্জন দাশগুপ্ত ▪ সিদ্ধার্থ দাশগুপ্ত ▪শাশ্বত কর ▪ রাজীব রায় গোস্বামী ▪ সায়নদীপা পলমল ▪ প্রদীপ কুমার দাস
বদ্রীনাথ পাল ▪ তাপস বাগ ▪ বসন্ত পরামানিক ▪ গোবিন্দ মোদক ▪ সুব্রত দাস ▪ অর্ণব ভট্টাচার্য ▪ সুজাতা চ্যাটার্জী ▪ মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় দাস ▪ মধুমিতা ভট্টাচার্য ▪ ড. রমলা মুখার্জী ▪ সনৎকুমার ব্যানার্জী ▪ বিদ্যুৎ মিশ্র ▪ রাজর্ষি মণ্ডল ▪ রূপালী মুখোপাধ্যায় ▪ শক্তিপদ পণ্ডিত ▪ শম্ভু সরকার ▪ সুব্রত চৌধুরী
অদিতি ভট্টাচার্য ▪ দীপঙ্কর চৌধুরী ▪ মৌসুমী রায় ▪ সবিতা রায় বিশ্বাস ▪ সহেলী রায় ▪ কিশোর ঘোষাল
অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায় ▪ অরিন্দম দেবনাথ ▪ কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায় ▪ দীপক দাস ▪ ড. উৎপল অধিকারী ▪ চন্দ্রানী মজুমদার
সায়ন্তনী পলমল ঘোষ ▪ সোমা দে ▪ শংকর লাল সরকার ▪ সন্দীপন সাহা
অলংকরণ
মায়াসখা নন্দী ▪ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ▪ একপর্ণিকা ক্রিয়েটিভস