ভ্রমণকথা
FREE SHIPPING IN INDIA
ভ্রমণকথা
এই গনগনির ডাঙাই হল সেই যুদ্ধক্ষেত্র যেখানে ভীম বক রাক্ষসকে বধ করেছিলেন আর তাঁদের সেই ভয়ানক যুদ্ধের ফলেই নাকি এখানকার মাটি লণ্ডভণ্ড হয়ে এই সমস্ত ভূমিরূপ সৃষ্টি হয়েছে।
সায়ন্তনী পলমল ঘোষ
ছোট্ট বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই আমেরিকার আরিজোনা প্রদেশের ‘গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন’-এর নাম শুনেছ? কলোরাডো নদীর এই গিরিখাত বিশ্ববিখ্যাত। অতুলনীয় এর সৌন্দর্য, কিন্তু তোমরা কি কেউ জানো, আমাদের এই বাংলার গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন কোথায় আছে? আজ তোমাদের বাংলার গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন ঘুরতে যাবার গল্প শোনাব।
পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার নাম তো সবাই জানো। স্বয়ং বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জেলা বলে কথা। এই পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার গনগনির ডাঙাতে আছে বাংলার গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন। এই জেলার অধিবাসী হওয়ার সুবাদে বহুদিন ধরে গনগনি ঘুরতে যাবার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু অনেক দূরের জায়গা ঘুরে ফেললেও ঘরের কাছের গনগনি আর যাওয়া হচ্ছিল না। অনেকবার যাওয়ার প্ল্যান হলেও কিছু না কিছু সমস্যায় পরিকল্পনা বাতিল করতে হয়েছে।
আমার ভগ্নীসমা সহকর্মী চৈতি এবার রীতিমতো হুমকি দিয়েছিল, ২০২৫ সালের মধ্যে গনগনি যেতেই হবে, না হলে মুশকিল আছে।
অবশেষে ২০২৫ সালের শেষ দিনে, অর্থাৎ ৩১ ডিসেম্বর আমি আর আমার তিন সহকর্মী সুজাতাদি, বর্ণালীদি আর চৈতি বেরিয়ে পড়লাম গনগনির উদ্দেশে। আমাদের সঙ্গী হল বর্ণালীদির বড়ো ছেলে শোভন। শোভনই গাড়ি ড্রাইভ করবে।
মেদিনীপুর শহর ছেড়ে ন্যাশনাল হাইওয়ে ধরে ছুটে চলল গাড়ি। পথে পেরোলাম ভাদুতলার জঙ্গল, গোদাপিয়াশালের জঙ্গল। প্রতিদিনই এই পথ দিয়ে যাতায়াত করতে হয়, কিন্তু তবুও প্রতিবারই এই জঙ্গলের সৌন্দর্য যেন নতুন লাগে। শালবনি ছাড়িয়ে পেরোলাম বিখ্যাত আরাবাড়ির জঙ্গল। রাস্তা ভালো হওয়ায় গাড়ি দুরন্ত গতিতে ছুটে পার হয়ে গেল কুবাই ব্রিজ। এরপর চন্দ্রকোনা রোড, গড়বেতা শহর ছাড়িয়ে এগিয়ে চললাম গনগনির ডাঙ্গার উদ্দেশে। দুই পাশে কাজুবাদামের জঙ্গলের মধ্য দিয়ে রাস্তা গিয়ে পৌঁছেছে আমাদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে যা গনগনির মাঠ বা গনগনির ডাঙা বা গনগনির খুল্যা (গর্ত) নামে পরিচিত।
গাড়ি থেকে নেমে দেখলাম, চারপাশে বেশ কিছু দোকানপাট বসে গোটা চত্বরটিকে বেশ জমজমাট করে রেখেছে। আসল জিনিস দেখার উদ্দেশ্যে সামনে এগিয়ে গেলাম এবং দৃশ্যতই মুগ্ধ হয়ে গেলাম। আমাদের সামনে তখন বাংলার গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন। নীচে বয়ে চলেছে শিলাবতী নদী, যার স্থানীয় নাম শিলাই। এই শিলাবতী নদীর ক্ষয়কার্যের ফলে সৃষ্টি হয়েছে প্রায় ৭০ ফুট গভীর গিরিখাত বা র্যাভাইন। এই অঞ্চল ল্যাটেরাইট মৃত্তিকা সমৃদ্ধ। মাটিতে উচ্চমাত্রায় আয়রন অক্সাইড থাকার কারণে মাটি শক্ত এবং রঙ লাল। বহুবছর ধরে তীব্র লিচিং বা প্রাকৃতিক ক্ষয়কার্যের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপগুলি দেখে একটাই শব্দবন্ধ মনে ভেসে উঠল, ‘ভয়ংকর সুন্দর’। নাম না জানা কোন ভাস্কর যেন ছেনি-হাতুড়ি দিয়ে পাথুরে লাল মাটির গায়ে খোদাই করে রেখেছেন তাঁর অপরূপ শিল্পকর্ম।
সিমেন্ট বাঁধানো সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে গেলাম আমরা আর তারপর শুরু হল আমাদের সমবেত অ্যাডভেঞ্চার। উঁচু উঁচু, ছোটো ছোটো পাহাড়সদৃশ ভূমিরূপগুলিতে বেশ কসরত করে উঠতে হল। লাল ধুলোয় জামাকাপড় মাখামাখি। ভরা শীত বলে সোয়েটার পরেই সবাই চলে এসেছি, কিন্তু পরে আপশোশ হচ্ছে কেন গাড়িতে রেখে এলাম না। রীতিমতো ঘাম দিচ্ছে। ওপর থেকে চারদিকে তাকালেই দু-চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছে। অদূরেই বয়ে চলেছে সুন্দরী শিলাবতী। চারদিকে লাল মাটির অপূর্ব সব ভূমিরূপ। শীতকাল বলে প্রচুর পর্যটকের সমাগম হয়েছে। বেশ অনেকগুলো ভূমিরূপের ওপরে উঠলাম আমরা। কোথাও ছোটো গুহার মতো সৃষ্টি হয়েছে, আবার কোথাও বিশাল এক ফোকর, যার মধ্য দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখতে বেশ মজা লাগছে। অনেকগুলো জায়গায় ওঠা আমাদের বেশ বিপদজ্জনক মনে হল, তাই আমরা এবার ক্ষান্ত দিলাম। কিন্তু বহু সাহসী পর্যটক সেইসব জায়গাতেও উঠছেন।
নীচে নেমে আমরা চললাম নদীর তীরে। পথে দেখা হল কিছু স্কুল ছাত্রছাত্রী এবং তাদের শিক্ষকদের সঙ্গে। আলাপ করে জানলাম, তাঁরা এসেছেন বীরভূম থেকে। স্থানীয় কিছু মানুষ নদীতে তাঁদের প্রয়োজনীয় কাজকর্ম সারছেন। নদীর তীরে মনের সুখে বিভিন্ন ভঙ্গিমায় ফটো তুলে আমরা এবার চললাম আর একটি বিশেষ জিনিস দেখতে।
গনগনির ডাঙা শুধু তার ভৌগোলিক সৌন্দর্যের জন্যই বিখ্যাত তাই নয়, এর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে ইতিহাস এবং পৌরাণিক মিথ। সম্রাট আকবরের রাজস্ব সচিব টোডরমল রাজস্ব আদায়ের সুবিধার জন্য মেদিনীপুর জেলাকে যে কয়টি পরগনা বা মহালে ভাগ করেছিলেন, তার মধ্যে অন্যতম ছিল ‘বগড়ি পরগনা’ যা এই গড়বেতা অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত ছিল, আর তার মধ্যেই ছিল এই গনগনির ডাঙা। তখন এই ডাঙার চারদিকে ছিল ঘন শাল জঙ্গল। বগড়ি পরগনার বিখ্যাত রাজা ছিলেন গজপতি সিংহ। পরবর্তীকালে তাঁর বংশধর ছত্র সিংহের আমলে এই অঞ্চলে ইংরেজদের বিরুদ্ধে ‘নায়েক বিদ্রোহ’ সংঘঠিত হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন অচল সিংহ নামের এক বিদ্রোহী। গনগনির ডাঙার শাল জঙ্গলে লুকিয়ে থেকে বিদ্রোহীরা গেরিলা কায়দায় ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতেন, অর্থাৎ জঙ্গল থেকে বেরিয়ে অতর্কিতে আক্রমণ হানতেন তাঁরা। বিদ্রোহীদের সঙ্গে পেরে না উঠে ও’কেলি নামক এক ইংরেজ সেনাপতি গোলাবর্ষণ করে এই শাল জঙ্গলকে সম্পূর্ণ রূপে পুড়িয়ে দেন, যে কারণে এখন এখানে কোনও শাল জঙ্গলের অস্তিত্বই নেই। অচল সিংহকে ইংরেজরা এই যুদ্ধে ধরতে পারেনি। পরে ছত্র সিংহের বিশ্বাসঘাতকতায় অচল সিংহ ধরা পড়েন।
গনগনির ডাঙা যেমন ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সাক্ষী, তেমনি একটি প্রচলিত মিথ হল, এখানেই হয়েছিল দ্বিতীয় পাণ্ডব ভীম এবং বকাসুর বা বক রাক্ষসের যুদ্ধ। মহাভারতের এই গল্প তো সবাই জানে। অজ্ঞাতবাসকালে যখন একচক্রা নগরে পঞ্চপাণ্ডব এবং মাতা কুন্তী এক ব্রাহ্মণের গৃহে বাস করতেন, তখন গৃহস্বামীকে রক্ষা করার জন্য ভীম বক রাক্ষসের আহার হিসেবে গিয়েছিলেন এবং তাঁদের মধ্যে ভীষণ যুদ্ধ হয়েছিল। কথিত আছে, এই গনগনির ডাঙাই হল সেই যুদ্ধক্ষেত্র যেখানে ভীম বক রাক্ষসকে বধ করেছিলেন আর তাঁদের সেই ভয়ানক যুদ্ধের ফলেই নাকি এখানকার মাটি লণ্ডভণ্ড হয়ে এই সমস্ত ভূমিরূপ সৃষ্টি হয়েছে।
তাহলে বুঝতেই পারছ ছোট্ট বন্ধুরা, গনগনির ডাঙাতে ভূগোল, ইতিহাস আর মহাকাব্য সব হাত ধরাধরি করে বসে আছে!
আমরা এইবার ওপরে উঠে টিকিট কেটে ঢুকলাম পার্কের মতো একটি জায়গায়। এখানে একটি ওয়াচ টাওয়ার আছে। বহু লোক ওয়াচ টাওয়ারে উঠছেন ওপর থেকে চারপাশের মনোরম দৃশ্যাবলি দেখার জন্য। পিকনিক করার জন্য অনেক শেড করা আছে। প্রচুর লোক চড়ুইভাতির মজা নিচ্ছেন। বাগানে ফুটে আছে বড়ো বড়ো লাল গোলাপ। আমরা বেশ কিছু ফটো তুললাম এখানে। এখানেই আমরা দেখলাম বক রাক্ষসের হাড়। দুইখানা মোটা, বেশ লম্বা দুটি জিনিস একটি পাথরের বেদিতে প্রোথিত আছে। চৈতি হাড় দুটি কী দিয়ে তৈরি এই বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করাতে তাকে এক ধমক লাগালাম, ‘এ কি আর তোমার-আমার হাড়? এ হল বক রাক্ষসের হাড়, এমনই হবে।’
বক রাক্ষসের হাড়ের সঙ্গে পোজ দিয়ে ফটো তোলার পর দূরের দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। সূর্যদেব পাটে বসেছেন শিলাবতীর কোলে। চারদিকের লাল মাটির সঙ্গে দিগন্তজুড়ে কমলা রঙের হোলি। অপূর্ব সে দৃশ্য। খানিকক্ষণ চুপ করে প্রকৃতির এই খেলা উপভোগ করার পর আমরা চললাম এই চত্বরে অবস্থিত রেস্তোরাঁটির উদ্দেশে। এতক্ষণে বেশ খিদে পেয়ে গেছে। বক রাক্ষসের দেশে এসে খিদে না পেলে বক রাক্ষসের অপমান করা হয়।
এখানে দেখলাম সরকারি গেস্ট হাউসও আছে। গেস্ট হাউসের রুমগুলির নাম বিভিন্ন নদীর নামে। বিষয়টা বেশ ভালো লাগলো আমার।
রেস্তোরাঁর পেছন দিকে গেস্ট হাউসের অতিথিদের রাতের খাবারের জন্য সবজি কাটা হচ্ছে। ভেতরে বেশ ভিড়। আমরা খাবারের অর্ডার দিয়ে বসে রইলাম। বেশ কিছুক্ষণ পরে খাবার এল। খেয়েদেয়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম। বাইরে বেশ কিছু দোকান বসেছে। ভাবলাম, গনগনির স্মৃতি হিসেবে কিছু কিনি। দোকানগুলিতে বিভিন্ন ধরনের হস্তশিল্প বিক্রি হচ্ছিল। আমি টেরাকোটার তৈরি কিছু গহনা কিনলাম আর ছানাটার জন্য একটা ছোটো ছোটো বলভরা বন্দুক। তাকে আনতে পারিনি বলে মনটা খারাপ লাগছিল।
এবার ফেরার পালা। সময় নেই, তাই ইচ্ছে থাকলেও এই অঞ্চলের বিখ্যাত বগড়ির কৃষ্ণরায় জিউর মন্দির দর্শন হল না। এই মন্দিরটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বগড়িরাজ গজপতি সিংহের মন্ত্রী রাজ্যধর রায়। এখানে রাধাকৃষ্ণের যুগলমূর্তি পূজিত হয়। এই মন্দিরের দোল উৎসব খুব বিখ্যাত। পরে কখনও মন্দির দর্শন করব, এই ভেবে শীতের পড়ন্ত বিকেলে গনগনিকে পেছনে ফেলে আমরা আবার মেদিনীপুরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলাম।
শুভাঞ্জন ব্যানার্জী ▪ প্রবাহনীল দাস
লিও তলস্তয় ▪ নলিনাক্ষ ভট্টাচার্য
তাপস মৌলিক ▪ অংশু পাণিগ্রাহী ▪ বাণীব্রত গোস্বামী ▪অরিন্দম ঘোষ ▪ রঞ্জন দাশগুপ্ত ▪ সিদ্ধার্থ দাশগুপ্ত ▪শাশ্বত কর ▪ রাজীব রায় গোস্বামী ▪ সায়নদীপা পলমল ▪ প্রদীপ কুমার দাস
বদ্রীনাথ পাল ▪ তাপস বাগ ▪ বসন্ত পরামানিক ▪ গোবিন্দ মোদক ▪ সুব্রত দাস ▪ অর্ণব ভট্টাচার্য ▪ সুজাতা চ্যাটার্জী ▪ মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় দাস ▪ মধুমিতা ভট্টাচার্য ▪ ড. রমলা মুখার্জী ▪ সনৎকুমার ব্যানার্জী ▪ বিদ্যুৎ মিশ্র ▪ রাজর্ষি মণ্ডল ▪ রূপালী মুখোপাধ্যায় ▪ শক্তিপদ পণ্ডিত ▪ শম্ভু সরকার ▪ সুব্রত চৌধুরী
অদিতি ভট্টাচার্য ▪ দীপঙ্কর চৌধুরী ▪ মৌসুমী রায় ▪ সবিতা রায় বিশ্বাস ▪ সহেলী রায় ▪ কিশোর ঘোষাল
অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায় ▪ অরিন্দম দেবনাথ ▪ কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায় ▪ দীপক দাস ▪ ড. উৎপল অধিকারী ▪ চন্দ্রানী মজুমদার
সায়ন্তনী পলমল ঘোষ ▪ সোমা দে ▪ শংকর লাল সরকার ▪ সন্দীপন সাহা
অলংকরণ
মায়াসখা নন্দী ▪ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ▪ একপর্ণিকা ক্রিয়েটিভস