প্রবন্ধ
FREE SHIPPING IN INDIA
প্রবন্ধ
ধীরে ধীরে সংবিৎ ফিরছে জুলিয়ানের। নাহ্, এতক্ষণ সে নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে ছিল, কিংবা অচেতন হয়ে ছিল। সে কোথায়? মনে হচ্ছে ধীরে ধীরে শরীরে সাড় ফিরে আসছে। চেনা একটা জায়গা। কিন্তু এখানে কেন সে? হাত দুটো প্রথমে সাড়া দিল। হাত নাড়িয়ে জুলিয়ান বুঝল, সে একটা নরম আঠালো কাদার মধ্যে পড়ে রয়েছে। কিন্তু চোখ দুটো তার খুলছে না কেন?
অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
গলা পর্যন্ত পাঁকে ডুবে আছে জুলিয়ান। ওর গা ঘিনঘিন করছে। পাঁকের বদ গন্ধ ওর বহু পরিচিত, কিন্তু এখন অসহ্য লাগছে। গন্ধটা নাক থেকে সোজা পেটে ঢুকে যাচ্ছে যেন। রেইন ফরেস্টের মাটিতে লতাপাতা পচে যে গন্ধটা কাদা থেকে আসে, তা তার অজানা নয়। কিন্তু মনে হচ্ছে ওর শরীরটা ক্রমশ যেন পাঁকের মধ্যে কোথায় তলিয়ে যেতে বসেছে। একটা প্রবল মৃত্যুভয়, নাকি দম আটকে যাবার ভয় ক্রমশ জুলিয়ানের শরীর অবশ করে দিচ্ছে। উফ্, কাঁধের ওপরে প্রচণ্ড ব্যথা, অজানা কীটের দংশনে সারা শরীরে জ্বালা ধরছে। নির্ঘাত মরে যাচ্ছে জুলিয়ান। চিৎকার করে ডাকতে ইচ্ছে করছে, ‘মা-আ-আ-আ!’, কিন্তু জল পিপাসায় গলা শুকিয়ে কাঠ। একটুও স্বর বেরোচ্ছে না।
ধীরে ধীরে সংবিৎ ফিরছে জুলিয়ানের। নাহ্, এতক্ষণ সে নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে ছিল, কিংবা অচেতন হয়ে ছিল। সে কোথায়? মনে হচ্ছে ধীরে ধীরে শরীরে সাড় ফিরে আসছে। চেনা একটা জায়গা। কিন্তু এখানে কেন সে? হাত দুটো প্রথমে সাড়া দিল। হাত নাড়িয়ে জুলিয়ান বুঝল, সে একটা নরম আঠালো কাদার মধ্যে পড়ে রয়েছে। কিন্তু চোখ দুটো তার খুলছে না কেন? একটা হাত কোনোরকমে চোখের সামনে এনে চোখের পাতা খুলতে চেষ্টা করল জুলিয়ান। সে টের পায়, একটা চোখ তার ফুলে ঢোল, সেটা কিছুতেই খুলছে না। আর একটা চোখ সামান্য খুলতেই চোখে পড়ল মাথার ওপর সবুজ রঙের একটা পর্দামতো কী যেন।
মাথাটাতে একটু সাড় ফিরেছে। কিন্তু কোমরের নীচ থেকে তার শরীর এখনও অসাড়। চোখের দৃষ্টি একটু স্বাভাবিক হতে জুলিয়ান টের পেল, এক গভীর জঙ্গলে চিত হয়ে শুয়ে রয়েছে সে। কিন্তু কীভাবে যে এখানে এল, কিছুতেই মনে আসছে না। মাথার ওপর সবুজ ফিকে আলো। বিশাল বিশাল গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে আর কতটাই-বা সূর্যের আলো এসে মাটিতে পৌঁছতে পারে? গাছগুলো মাথায় প্রায় দেড়-দুশো ফিট উঁচু হবে। এত ঘন যে, ফাঁকফোকর খুব কম।
জুলিয়ানের মনে হল, উঠে বসলে হয়তো মাথাটা কাজ করবে, আবার মনে পড়ে যাবে সব। কিন্তু তার চশমাটা গেল কোথায়? হাতড়ে আশেপাশে কোথাও সেটা খুঁজে পেল না জুলিয়ান। এবার সে মনের জোরে উঠে বসতেই টনটন করে উঠল কণ্ঠদেশ। একটা হাত আপনা থেকেই উঠে এল সেখানে। যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গেল জুলিয়ানের সারাটা শরীর, যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল শরীরে। আপনা থেকেই ‘মা’ শব্দটা বেরিয়ে আসতেই মায়ের কথা মনে পড়ে গেল।
কিন্তু মা কোথায় তার? মা… হ্যাঁ, এইবার মনে পড়েছে, মায়ের সঙ্গে প্লেনের সিটে বসে ছিল সে। কিন্তু প্লেনটা? কোথায় যেন তারা যাচ্ছিল? সর্বশক্তি দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে সব মনে করার চেষ্টা করে হুমড়ি খেয়ে মাটিতে পড়ে গেল জুলিয়ান। আবার কাদায় মাখামাখি হল তার পোশাক। একটা খোলা চোখ দিয়েই নিজের শরীরের দিকে তাকিয়ে মনে পড়তে লাগল এক এক করে— সব, যা কিছু ঘটেছে গতকাল সন্ধেয়। তাহলে সে একদম একা এখন, এই গভীর জঙ্গলে। পরনের ফ্রকটা সব মনে পড়িয়ে দিচ্ছে এক এক করে। নতুন বছর আসছে বলে মা তাকে দুটো পোশাক কিনে দিয়েছিল বাজার থেকে। সোনালি রঙ জুলির খুব পছন্দ বলেই সেই রঙের ফ্রকটা পরেই রওনা হয়েছিল সে।
মাথাটা এখনও ঝিমঝিম করছে জুলিয়ানের। কিন্তু একা এই জঙ্গল থেকে বেরোতে হলে মনে জোর আনতে হবে যে করেই হোক। মাকে খুঁজে বার করতেই হবে। মা ছাড়া জঙ্গলকে এত নিবিড় করে চেনেই-বা কে? তাঁর কাছেই যে জুলিয়ানের জঙ্গলের হাতেখড়ি। কিন্তু ঠিক তার পাশেই বসে ছিলেন মারিয়া। তিনিও কি হারিয়ে গিয়েছেন জঙ্গলে? প্লেন থেকে মাটিতে জুলিয়ান পৌঁছলই-বা কেমন করে? প্রশ্নেরা ভিড় করে মাথায়, কিন্তু মনের মধ্যে ঘটনাগুলো জুড়ে একত্র করতে অসুবিধা হচ্ছে তার। সারাটা শরীর জুড়ে কীটপতঙ্গের কামড়ের জ্বালায় ঠিকমতো মনঃসংযোগ করতে পারছে না সে।
পেরুর রাজধানী লিমা থেকে পুকাল্পা যাচ্ছিল মা আর মেয়ে। গন্তব্য ছিল পাঙ্গুয়ানা রিসার্চ সেন্টার। প্লেনে লিমা থেকে পুকাল্পা, তারপর পুকাল্পা থেকে চার-পাঁচ ঘণ্টা নৌকো সওয়ারি করলে চলে যাওয়া যায় ছায়া সুনিবিড় জঙ্গলের মধ্যে পাতায় ছাওয়া, বেড়া দিয়ে ঘেরা সেই শান্তির কুটিরে।
গত দু-চারদিন ধরে লিমাতে বৃষ্টি হচ্ছিল ঝেঁপে। হবে নাই-বা কেন? সময়টা বর্ষাকাল। একের পর এক ফ্লাইট বাতিল। ওদিকে জুলিয়ানের বাবা ডক্টর হান্স উইলহেম কোপকে পাঙ্গুয়ানা রিসার্চ সেন্টারে তাদের অপেক্ষায় দিন গুনছেন। নতুন বছর আসছে সামনে। জুলিয়ানের মা মারিয়া প্রচুর উপহার কিনেছেন তাঁর স্বামীর জন্য। প্লেনের টিকিট কেটে মা আর মেয়েতে মিলে ক্রিসমাস আর নতুন বছরের জন্য কেনাকাটা করেছে বাজার থেকে। ডক্টর হান্স তাঁর একটি বিশেষ গবেষণা শেষ করার জন্য বিগত তিন-চার মাস ধরে পাঙ্গুয়ানাতে রয়েছেন পরিবার ছেড়ে। রিসার্চ সেন্টারে চারজন কর্মচারী রাখতে হয়েছে, তাদের জন্যও বাজার থেকে কেনাকাটা সেরেছিলেন মারিয়া। গতকাল ছিল ডিসেম্বরের ছাব্বিশ তারিখ। শেষ মুহূর্তে মা কী করে যে প্লেনের টিকিট জোগাড় করেছিল, কে জানে?
স্কুলে ছুটি পড়ে যেতে বাবার কাছে লম্বা ছুটি কাটাতে যাচ্ছে সতেরো বছরের মেয়ে জুলি, তার কাছে সেটাই ছিল বড়ো কথা। তবে পাঙ্গুয়ানা রিসার্চ সেন্টার তার কাছে নতুন নয়, সেখানে বাবা-মায়ের সঙ্গে বসবাস করার অভিজ্ঞতা জুলিয়ানের সেই ছোট্ট বয়স থেকেই। কাজেই সেটা তার দ্বিতীয় ঘর বললেও অহেতুক হবে না।
মারিয়া এবং হান্স কোপকে দুজনেই জীববিজ্ঞানী। আমাজনের জঙ্গলে প্রায় হাজার তিনেক বিভিন্ন ধরনের প্রাণী দেখা যায়। এক-একটি বিশেষ প্রাণীর বেশ কয়েকটি প্রজাতির দেখা পেতে গেলে আসতে হবে আমাজনের জঙ্গলে। গাছ ও প্রাণীদের এত বৈচিত্র্য পৃথিবীর আর কোথাও দেখতে পাওয়া যায় না। প্রায় পঞ্চান্ন লক্ষ বর্গ-কিলোমিটার জুড়ে দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলে গড়ে উঠেছে আমাজন রেইন ফরেস্ট। বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের পাঁচ ভাগের এক ভাগ আসে আমাজনের জঙ্গল থেকে। এত গাছের সমাবেশের কারণে এই জঙ্গলকে বলা হয় পৃথিবীর ফুসফুস। যদিও এই জঙ্গলের সিংহভাগ রয়েছে ব্রাজিলে, তবে পেরুতেও তার বিস্তৃতি অনেকটা। পেরুর অর্ধেক আমাজনের জঙ্গলে ঢাকা।
তরুণ বয়স থেকে কোপকে দম্পতি জার্মানিতে পড়াশুনো শেষ করে গবেষণার জন্য পেরুতে চলে আসেন। দুজনে মিলে মূল্যবান সব কাজ করছিলেন এই অঞ্চলে। অধ্যবসায় সার্থক হয়েছিল যখন পেরু সরকার তাঁদের গবেষণার জন্য আর্থিক অনুদান দেয়। ছোট্ট একটা পাতায় ছাওয়া কুটির তৈরি করে সেখানেই প্রতিষ্ঠিত হয় পাঙ্গুয়ানা রিসার্চ সেন্টার। পাঙ্গুয়ানা আমাজনের জঙ্গলের এক অপূর্ব পাখি। পক্ষী বিশারদ মারিয়া এই পাখির নামে প্রতিস্থানের নামকরণ করেন। জঙ্গলকে খুব কাছ থেকে দেখে দুই বিজ্ঞানী তথ্য সংগ্রহ করে লিখেছিলেন বহু গবেষণাপত্র। বিদেশেও তাঁদের নাম ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছিল। দুর্গম জঙ্গলে খাবার সুলভ নয়, আর অসুখ থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে গবেষণা করা যে কতটা দুরূহ, তা কেবল জানতেন হান্স ও মারিয়া।
জুলিয়ান যখন মাত্র চোদ্দ বছর বয়স পেরিয়েছে, তখন থেকেই সে পাঙ্গুয়ানা রিসার্চ সেন্টারে নিয়মিত এসেছে। জঙ্গলকে নিবিড় করে কাছে পেয়ে যেন সে হয়ে উঠেছে এক জঙ্গল কন্যা।
গাছের একটা লম্বা ডাল চাপ দিয়ে ভেঙে সেটাকে লাঠি বানিয়ে নেয় জুলি। সন্ধের পর ওটা বেশি কাজে আসবে। এখনও ভর দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটা যাবে এটা দিয়ে। এই ভেবে এগোতে গিয়ে সে দেখে তার এক পায়ের জুতো নেই। চারদিকে তাকিয়ে কোথাও জুতোর হারানো পাটিটা নজরে আসে না তার। এক পা এক পা করে জঙ্গল ভেদ করে হাঁটতে থাকে জুলিয়ান। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে মানুষের আবাসের বাইরে থাকায় লতাপাতা আর গাছের ডালপালায় দুর্ভেদ্য আমাজনের জঙ্গল। একটা ছুরি বা চাকু যদি হাতের কাছে পাওয়া যেত, তাহলে গাছ কেটে এগোতে সুবিধে হত। যে-জিনিস হাতের কাছে নেই, তার জন্য দুঃখ করে লাভ নেই। তাই সে সাবধানে জঙ্গল ভেদ করে এগোতে থাকে। কিন্তু ঠোক্কর বাঁচিয়ে, কখনও ঝুঁকে, বা কখনও প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে জঙ্গলের মাঝে খুব ধীরে এগোতে থাকে জুলিয়ান। গন্তব্য জানা নেই, শুধু জঙ্গল না পেরোলে নিজেকে বাঁচানো যাবে না, সেটা সে জানে।
জুলিয়ানের বেশ মনে আছে, পাঙ্গুয়ানার কাছে জঙ্গলে একা একা ঘুরে বেড়াতে গিয়ে সে সবসময় ফেরার রাস্তার চিহ্ন রাখার জন্য গাছের গায়ে আলতো কোপ বসিয়ে দিত। একবার জঙ্গলে রাস্তা হারালে ঘুরে মরতে হবে একই জায়গায়, বেরোবার পথ থাকবে না; সেটা সে শিখে নিয়েছিল বাবার এক স্থানীয় সহায়কের কাছ থেকে। গাছের গায়ে কোপ বসাতে একটু দুঃখ হত ঠিকই আহত গাছগুলোর জন্য। তবে সে জানত যে গাছেদের ক্ষত তারা নিজেরাই সারিয়ে নেয়, মানুষের মতো তাদের ডাক্তার লাগে না।
এদিক ওদিক চক্কর দিয়ে নিজের একপাটি জুতো না পেয়ে একটু মনখারাপ হয়ে যায় জুলিয়ানের। কিন্তু অন্য পায়ে যে পাটিটা আছে, তাকে বর্জন করা উচিত হবে না। একটা পায়ের পাতা অন্তত ক্ষত হবার থেকে বাঁচবে। হাঁটতে থাকে জুলি। তার কান সজাগ থাকে। আপাতত বাতাসে কান পেতে বুঝতে হবে জলের কোনও সরসর শব্দ পাওয়া যায় কি না। বাবা বলতেন, যদি জঙ্গলে হারিয়ে যাও, তবে প্রথম কাজ হল কোনও জলধারা খুঁজে বার করা, আর সেটা ধরে এগিয়ে যাওয়া। জলধারা একটা না একটা সময় ঠিক জনপদে নিয়ে যাবে তোমাকে। জলের উৎস সন্ধানে বাতাসে কান লাগিয়ে হাঁটতে থাকে জুলি।
জঙ্গলের সবুজ আলো ক্রমশ আরও ফিকে হয়ে আসছে। তার মানে অন্ধকার হতে আর বাকি নেই। সময়ের কথা মনে পড়তেই হাতের কবজিতে বাঁধা ঘড়িটার দিকে মন এবং নজর পড়ে তার। কী আশ্চর্য! ঘড়িটা দিব্যি চলছে! এখন বাজে বিকেল পাঁচটা।
আর একটু এগিয়ে গিয়ে সে একটা গাছের গুঁড়ি বেছে নিয়ে সেখানে হেলান দিয়ে বসে পড়ে। এখানেই রাত কাটাতে হবে আপাতত। সকাল হলে খুঁজে নিতে হবে জলের আওয়াজ। লিমাতে এখন অপরাহ্ণের মেজাজ। সবাই পার্কে বেড়াতে বেরিয়েছে, কিংবা শপিং সেন্টারে ভিড় করেছে। তারা জানে না, লিমা শহরের এক মেয়ে জঙ্গলে একা হারিয়ে গিয়েছে আজ। জুলিয়ানের মনটা বিষণ্ণতায় ভরে যায়।
হঠাৎ ফ্রকের পকেটে হাত চলে যেতে সেখানে তার হাত ঠেকে যায় একটা প্যাকেটে। আহ্, কী আনন্দ! এক প্যাকেট চকলেট রয়ে গিয়েছে এখনও। ভাগ্যিস কোথাও পড়ে যায়নি জঙ্গলের মধ্যে। এই মুহূর্তে প্রবল খিদে পেয়ে যায় জুলির। একটা চকলেট মুখে পুরে হেলান দিয়ে বসে সে ভাবতে থাকে গতকাল ঘটে যাওয়া ঘটনার পরপর সব মুহূর্ত। ঘুমে চোখ দুটো জুড়িয়ে আসে জুলিয়ানের। অন্ধকার ক্রমশ গাঢ় হতে থাকে। বিচিত্র শব্দ ওঠে চারদিক থেকে। নিশাচরেরা খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে পড়েছে।
জুলিয়ানরা যে-প্লেনে উঠেছিল, সেই প্লেনের যাত্রী ছিল দুজন আমেরিকান তরুণ, হয়তো জুলিয়ানের বয়সিই হবে। এয়ারপোর্টে ওরা যেচে জুলির সঙ্গে আলাপ জুড়েছিল। ছেলে দুটো নিজেদের ঘর ছেড়ে আমাজনের জঙ্গল দেখার জন্য বেরিয়ে পড়ে আটকে যায় লিমাতে। ওরাও পুকাল্পা যাচ্ছিল একই প্লেনে। সপ্রতিভ ছেলে দুটোর সঙ্গে জুলিয়ান ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে কথা বলেছিল। ছেলে দুটো স্প্যানিশ জানে না। আমাজনের জঙ্গল নিয়ে নানা কথা তারা জুলিয়ানের কাছ থেকে খুব আগ্রহভরে জেনে নিচ্ছিল। কিন্তু প্লেনে ওরা জুলির ধারেকাছেও ছিল না। জুলি আর তার মা মারিয়ার সিট ছিল একেবারে শেষের আগের রো-তে। জানালার ধারের সিটটা জুটেছিল জুলির বরাতে। তার পাশে মারিয়া বসেছিলেন, আর আইলে সিটে বসেই নাক ডাকাচ্ছিল একটা মোটা লোক। তারপর কী যেন হয়েছিল? মাথাটা টনটন করে ওঠে জুলির। প্রায় সংজ্ঞা হারায় সে।
ঘোর লেগে গিয়েছিল জুলিয়ানের। চেতনা ফিরতে সে টের পেল, বৃষ্টি নেমেছে ঝেঁপে। অনেক ওপরে, পাতার ঘন ছাউনির ফাঁক দিয়ে আকাশের বিদ্যুতের ঝলক দেখা যাচ্ছে। ঝরঝর শব্দে বৃষ্টি পড়ছে। গায়ের জামাকাপড় ভিজে একসা। এখন এই অন্ধকারে অঝোর বৃষ্টির মাঝে নিজেকে নিঃসঙ্গ বলে মনে হচ্ছে জুলির। জোরে কেঁদে উঠতে পারলে বোধ হয় মনটা কিছুটা হালকা হত। জিভ আর ঠোঁট শূন্যে মেলে দিয়ে বৃষ্টির জলপান করতে থাকে তার তৃষ্ণার্ত শরীর। পেটের মধ্যে খিদে পাক দিচ্ছে। আরও একটা চকলেট বার করে খেতে খানিকটা স্বস্তি। মাত্র কয়েকটা চকলেট তার সম্বল। জঙ্গলের অজানা ফলমূল খাওয়া প্রবল বিপদজনক, সে জানে। বাবাই তাকে শিখিয়েছিলেন, না চিনে জঙ্গলের কোনও ফল মুখে তোলা নিষেধ, কারণ অনেক ফল বিষাক্ত হয়, তৎক্ষণাৎ মৃত্যুও ডেকে আনতে পারে। জুলি অবাক বিস্ময়ে গাছের ওপর বসা বাঁদরদের ফল খাওয়া দেখে বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিল, “তাহলে ওরা কেন খায়?”
বাবা জুলির মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বলেছিলেন, “জন্ম থেকেই ওদের মা সব শিখিয়ে দেয়। লক্ষ করে দেখবে, ওরা সব ফলে মুখ লাগায় না। এই বিদ্যেটা ওদের শিখে নিতে হয়, কারণ গাছের ওপরেই তাদের জীবন কাটে। আমাদের মতো মানুষ তো আর জঙ্গলে থাকে না! তবে আমাজনের জঙ্গলেও অনেক মানুষ বসবাস করে। তারাও খাবার জোটায় জঙ্গল থেকে। তারা জানে কোন ফল খেলে শরীর খারাপ হবে না। তবে এই শিক্ষাটা যদি আমরা নিতে যাই, তবে বছরের পর বছর জঙ্গলে কাটাতে হবে, জঙ্গলকে চিনতে হবে হাতের পাতার মতো।”
জুলি হাতের পাতার দিকে তাকিয়ে বলে, “এই দ্যাখো বাবা, একটা লাল রঙের পোকা! কী সুন্দর দেখতে! আমি একে চিনে নিলাম।”
হান্স মিষ্টি হেসে মেয়েকে বলেছিলেন, “যেমন গাছ চিনতে হবে, সেই সঙ্গে চিনে নিতে হবে জঙ্গলের প্রাণীদেরও।”
তারপর লাল পোকাদের জীবন নিয়ে শুনিয়েছিলেন আশ্চর্যসব অজানা বিজ্ঞানের কথা। জুলির মনে হয়েছিল, সে বুঝি রূপকথার গল্প শুনছে।
চমক ভাঙে জুলিয়ানের। চকলেট তো একসময় ফুরিয়ে যাবে, তারপর? সে জানে না। চুপ করে বোঝে, বৃষ্টি ক্রমে ধরে আসছে। বৃষ্টি থামতেই আবার পোকাদের অত্যাচার শুরু হল জুলিয়ানের শরীরে। কিন্তু ওদের দংশন যেন এই দীর্ঘ সময়ে গায়ে সয়ে গিয়েছে তার। কানের মধ্যে কখন যেন একটা পোকা ঢুকে পড়েছিল, সেটা কামড়ে দিতেই জুলি আর্তনাদ করে উঠল। কিন্তু জনমানবশূন্য এই জঙ্গলে তার আর্তনাদ শুনে ছুটে আসার কেউ নেই। দূরে একটা হরিণ চোখে পড়ল। একটু দাঁড়িয়ে ওকে দেখেই আবার ঘন পাতার আড়ালে মিলিয়ে গেল সে।
আচ্ছা, সে কি এই গভীর জঙ্গলে মরেই যাবে একা একা? কিন্তু ভয় পেলে চলবে না। শরীর থেকে পোকাগুলো ছাড়াতে ছাড়াতে এক এক করে তার মনে পড়তে লাগল প্লেনের ঘটনা।
দিব্যি চলছিল প্লেনটা। ঘণ্টা আধেক চলার পর কফি আর স্ন্যাক্স পরিবেশন করেছিল এয়ার হস্টেসরা। প্লেনের জানালা দিয়ে নিভে আসা দিনের আলোয় অ্যান্ডিস পর্বত দেখছিল জুলিয়ান। ঠিক তখনই পাইলট প্রায় চেঁচিয়ে মাইকে ঘোষণা করেছিল, ভীষণ এক ঝড় আসতে চলেছে সামনে, সবাই যেন কোমরে সিট বেল্ট বেঁধে রাখে শক্ত করে। প্লেনের যাত্রীরা সভয়ে বেল্ট বাঁধতে বাঁধতে ঈশ্বরকে ডাকতে শুরু করল জোরে জোরে। জুলির মা মারিয়া মেয়ের হাতের পাতা চেপে ধরে বললেন, “এই জন্যই কস্মিনকালে আমি প্লেনে উঠতে চাই না। এর চাইতে ট্রেনে চেপে যাওয়া ঢের ভালো। জানি না আমাদের কপালে কী লেখা আছে।”
জুলি বিদ্যুতের ঝলকানির আলোয় বাইরে জানালার দিকে তাকিয়ে দেখেছিল, প্লেন চলেছে উত্তাল ঝড়ো মেঘের মধ্যে দিয়ে টাল খেতে খেতে। ইস্পাত রঙের প্লেনের ডানার ওপর ক্রুদ্ধ বাতাস যেন তাকে বাঁকিয়ে চুরিয়ে উড়িয়ে নিয়ে যেতে চাইছে কোথাও।
মারিয়ার পাশে বসে থাকা মোটা লোকটা নাক ডাকা থামিয়ে ঘুম ভেঙে উঠে একজন ক্রুর দিকে তেড়ে গিয়ে বলে উঠল, “যখন জানতে যে আবহাওয়া ভালো নয়, তখন প্লেন চালাতে বলেছিল কে?”
ক্রু মেয়েটা শান্ত স্বরে বুঝিয়েছিল, “স্যর, আপনি জানেন যে দুর্যোগ চলছে ক’দিন ধরে। যাত্রীদের অসুবিধার কথা ভেবেই বিমান কর্তৃপক্ষ পরিসেবা চালু করেছে। অধৈর্য হবেন না। সিটে গিয়ে বসুন। পাইলট একজন দক্ষ মানুষ, তিনি এই ঝড় থেকে ঠিক বের করে নিয়ে আসবেন প্লেন।”
মেয়েটির কথা শেষ হতে না হতে প্লেনটা ভয়ানকভাবে দুলে উঠল। মনে হল পাইলট যেন প্লেনের ইঞ্জিনের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে। এরপর প্লেনটা সোজা নীচে নামতে থাকল, তার নাকটা মাটির দিক বরাবর সোজা ঘুরে যেতে লাগল ক্রমে। মাথার ওপর লাগেজ-বক্স খুলে সব বাক্স ঝরঝর করে ঝরে পড়তে লাগল। জুলিয়ানে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে, সে ঝুলন্ত অবস্থায় নীচের দিকে ককপিট দেখতে পাচ্ছে। মোটা লোকটা সিটে বসতে না বসতেই তার শরীর সোজা গিয়ে আছড়ে পড়ল ককপিটের দরজায়। সামনের সিটটাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল জুলি।
এইটুকু মনে পড়ছে, আর কিছুই মনে নেই। এইবার জুলিয়ান বুঝল, বিমান দুর্ঘটনার শিকার হয়ে সে এসে পড়েছে জঙ্গলে। কিন্তু কীভাবে তার পতন হল, আর কেমন করেই বা সে বেঁচে রইল, কে বলে দেবে?
ক্রমশ আলো ফুটে উঠছে চারদিকে। ঘড়িতে বাজে সকাল ছয়টা। মনে জোর নিয়ে উঠে দাঁড়াল জুলি। প্রথম কাজ হল মাকে খুঁজে বার করা। নিজে যখন জঙ্গলে এখনও বেঁচে আছে, হয়তো তার মাও কোথাও আছে কাছেপিঠে। জুলি চিৎকার করে উঠল ‘মা’ বলে। জঙ্গলের মধ্যে থেকে কোনও সাড়া এল না। হাঁটতে শুরু করল জুলি।
কণ্ঠহাড় তার ভেঙে গিয়েছে বলে মনে হচ্ছে। একটা হাড়ের টুকরো আর একটার ওপর ঠেলে উঠেছে, কিন্তু চামড়া ভেদ করেনি এই যা রক্ষে। তেমন হলে কপালে অনেক দুর্ভোগ ছিল। বসে থাকা অবস্থায় উঠতে গিয়ে মনে হল যেন ডানহাতের পিছন দিকে বাহুমূলে কিছুটা ক্ষত হয়েছে। তবে হাত দিয়ে স্পর্শ করে বোঝা যাচ্ছে সেখানে রক্তপাত আর হচ্ছে না, কিন্তু অনেকটা ফাঁক হয়ে আছে। যন্ত্রণা নেই, কিন্তু কোনও সংক্রমণ ঘটলে অবস্থা বেগতিক হতে পারে।
লাঠিতে ভর দিয়ে কিছুটা চলার পর তার শরীরে বল এল। হাসি পাচ্ছে শুধু নিজের পা দুটো দেখে। একটাতে জুতো আছে, আর একটায় নেই। এই অবস্থায় তাকে দেখতে নিশ্চয়ই জোকারের মতো লাগছে। লিমা শহরের রাস্তায় এরকমভাবে ঘুরে বেড়ালে লোকে ভিক্ষে দিত নির্ঘাত। জলের একটা আওয়াজ ঠিক কানে এল যেন। অজস্র পাখির ডাক আর বাতাসের মর্মর ধ্বনির মধ্যে এই আওয়াজ ভুল হবার নয়। কান পেতে সেদিকে এগোতে থাকে জুলিয়ান।
একটু এগোতেই একটা পরিত্যক্ত কেক নজরে এল। তাতেই তার খিদে পেয়ে গেল খুব। প্রায় ছুটে গিয়ে জুলিয়ান দেখল, কেকের সঙ্গে কাদা মাখামাখি হয়ে আছে। খিদের চোটে সেটাতেই আঙুল দিয়ে খানিক ভেঙে মুখে পুরে দিতে বিস্বাদ হয়ে গেল জিভ। থু থু করে মুখ থেকে কেক ফেলে দিল জুলি। এই কাদার সঙ্গে কত না জানি জীবাণু মিশে আছে, যার সংক্রমণ ওকে অসুস্থ করে তুলতে পারে। নিজের বোকামিতে নিজেকেই খানিক গালাগাল দিয়ে এগোতে থাকে জুলিয়ান। এখানে জমি অনেক নরম। কাদায় ওর পা প্রায় গেঁথে যাচ্ছে। সাবধানে লাঠি দিয়ে খানিক খুঁচিয়ে জমি কতটা শক্ত পরীক্ষা করে এগোতে হচ্ছে।
আরও খানিক এগোতে চক্ষুস্থির হয়ে গেল। তিনটে দেহ— দুটি পুরুষের, আর একটি মহিলার। তিনটি দেহের নিম্নাংশ বাইরে, বাকি শরীর নরম কাদায় গেঁথে রয়েছে। এখনও প্লেনের সিটটা তাদের শরীরের সঙ্গে আটকে। মহিলা কি জুলির মা মারিয়া? চমকে ওঠে জুলিয়ান।
উত্তেজনা সংবরণ করে কাছে গিয়ে মৃতদেহের ওপর থেকে কাদা সরিয়ে জুলিয়ান নিশ্চিন্ত হয়, না, ইনি তার মা নন, কারণ তার পোশাক ভিন্ন। নিজের নির্বুদ্ধিতায় নিজের ওপর রেগে গেল সে। মা কী করে আরও দুজনের সঙ্গে একই সিটে থাকতে পারে? তিনি তো জুলির পাশেই বসে ছিলেন। কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়ে ঝুঁকে পরীক্ষা করতে থাকে পড়ে থাকা তিনটি মৃতদেহ। এই প্রথম জীবনে সে এত কাছ থেকে কোনও মৃতদেহ দেখছে, তাও একটা নয়, তিন-তিনটে।
জোর করে মুখ ফিরিয়ে এগিয়ে যেতে গিয়ে জুলিয়ান লক্ষ করে, পাশের ঝোপে একদল শকুন বসে মৃতদেহ পাহারা দিচ্ছে। তবে কি জুলি মরে গেলে তার দেহ দিয়ে উদরপূর্তি করবে এই শকুনগুলো? শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা একটা স্রোত বয়ে যাচ্ছে। প্রায় ঝটকা দিয়েই নিজেকে সরিয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে এগিয়ে যায় জুলিয়ান।
আবার শুরু হল বৃষ্টি। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামতেই তাপমাত্রা কমে যেতে লাগল হু হু করে। ঠান্ডায় দাঁতে দাঁত লেগে যাবার উপক্রম। একটা পা গোড়ালিতে ভর দিয়ে কয়েকটা বড়ো বড়ো গাছের পাতা ছিঁড়ে মাথায় ধরে সেই গাছের নীচে আশ্রয় নেয় জুলি। বসে পড়ে মাটিতে, কাদার ওপরেই। হঠাৎ নজর পড়ে নিজের হাঁটুর দিকে। বাম হাঁটুতে একটা ছোট্ট ক্ষত ছিল, এখন বড়ো হয়েছে। কখন যে মাছি ছেঁকে ধরেছে সেই ক্ষতস্থানে, লক্ষই করেনি সে। এই ক্ষতে মাছি বসলে কপালে চরম দুঃখ আছে সে জানে। ক্ষতস্থানে মাছি ডিম পাড়ে, সেই ডিম থেকে সাদা সাদা পোকার আকৃতির ম্যাগট জন্ম নেয়। আর গাদা গাদা ম্যাগট সেই ক্ষতকে আরও বাড়িয়ে তোলে, রক্ত শুষে খায়। সে যে কী ভয়ানক ব্যাপার, জুলির তা জানা আছে। পাঙ্গুয়ানা রিসার্চ সেন্টারে অনেকের শরীরে এমন ক্ষত হত, ম্যাগট ঝরে পড়ত ক্ষতস্থান থেকে। সে এক যন্ত্রণাদায়ক ব্যাপার। বাবাকে দেখেছে কেমন করে পেট্রোল ঢেলে দিয়ে ক্ষত থেকে ম্যাগট বার করতে হয়। সেরকম কিছু হলে আর রক্ষে নেই, এই জঙ্গলে কোথায় আর পেট্রোল পাওয়া যাবে? ক্ষত ক্রমশ হাড় পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। হতাশ হয়ে জুলিয়ান নিজের ক্ষত থেকে মাছি তাড়ায় দুর্বল হাতে।
মাথার ওপর কীসের যান্ত্রিক আওয়াজ? জঙ্গলের মধ্যে দাঁড়িয়ে পড়ে জুলিয়ান। এই আওয়াজটা তার পরিচিত। হেলিকপ্টারের আওয়াজ। কিন্তু ঘন গাছের জাল ভেদ করে হেলিকপ্টারটা দেখা যাচ্ছে না। জুলিয়ান নিশ্চিত যে, ভেঙে পড়া প্লেনের যাত্রীদের উদ্ধারকার্যে বেরিয়ে পড়েছে কোনও দল। আচ্ছা, তারা কি খুঁজে পেয়েছে কাউকে? হয়তো মা এতক্ষণে নিরাপদে উদ্ধার হয়েছেন। নাকি জুলির মতো তিনিও জঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছেন? কিছুই এখন জানবার উপায় নেই। আমাজনের জঙ্গলে কেউ হারিয়ে গেলে তাকে খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব, জুলিয়ান তা জানে। হারিয়ে যাবার এমন বহু ঘটনা সে বাবা ও মায়ের কাছে শুনেছে। কোনোদিন তার সঙ্গেও এমন ঘটে যাবে, কে ভেবেছিল?
উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার মাথার ওপর অদৃশ্য হলেও চক্কর লাগিয়ে যে সেটা ক্রমে দূরে চলে যাচ্ছে, আওয়াজ কমে আসতে বোঝা যাচ্ছে। হয়তো কারও হদিস না পেয়ে তারা ফিরে যাচ্ছে। আচ্ছা, যদি ওরা জুলিয়ানকে খুঁজে পেয়ে উদ্ধার করত, তবে তাকে কোথায় নিয়ে যেত? লিমাতে, নাকি পুকাল্পায়? বাবা নাকি কাকে পাঠাবে বলেছিলেন এয়ারপোর্টে? একেবারে মনে পড়ছে না। বাবা কি জানেন যে তাঁর স্ত্রী ও মেয়ে আমাজনের জঙ্গলে হারিয়ে গিয়েছে? জানতে পেরেছেন নিশ্চয়ই, কারণ হেলিকপ্টার মাথার ওপর ঘুরছে যখন, পেরুতে আর কারও জানতে বাকি নেই বিমান দুর্ঘটনার কথা।
বৃষ্টি থেমে যেতে জঙ্গল ভ্যাপসা হয়ে উঠেছে। আমাজনের দুর্ভেদ্য জঙ্গলের আবরণে বদ্ধ জলীয় বাস্প বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে না পড়তে পারলে এমন ‘স্টিম চেম্বার’ তৈরি হয় জানা থাকলেও জুলিয়ানের অভিজ্ঞতায় এই প্রথম। ঘাম ঝরে পড়ে তার শরীর থেকে। সামনে এগোনোর শক্তি হারিয়ে বসে পড়ে হাঁপাতে থাকে জুলিয়ান।
হান্স উইলহেম কোপকে কম কথার মানুষ। স্ত্রী ও মেয়ের বিমান দুর্ঘটনার কথা জানতে পেরে সোজা চলে এসেছিলেন পুকাল্পা বিমানবন্দরে। সেখানেই এখন দুইদিন ধরে তিনি বসে আছেন অজস্র ভাগ্যহত পরিবারের সঙ্গে। নাওয়াখাওয়া মাথায় উঠেছে তাঁর। কয়েকজন পরিচিত মানুষ এবং বিমান কর্তৃপক্ষ মাঝেমধ্যেই হান্সকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছে যে তাঁর মেয়ে ও স্ত্রী বেঁচে আছেন এবং খুব শিগগির তাঁদের উদ্ধার করে পুকাল্পাতে নিয়ে আসা হবে। তিনি যেন মুখে সামান্য আহার তোলেন।
ডক্টর হান্স একজন জীববিজ্ঞানী, পাঙ্গুয়ানা রিসার্চ সেন্টার তাঁর নিজের হাতে গড়া আমাজনের প্রাণী ও উদ্ভিদদের ওপর গবেষণার জন্য খোলা প্রথম মুক্ত গবেষণাগার। আমাজনের জঙ্গলে তাঁর যাতায়াত দীর্ঘ দুই দশকের ওপর। ১৯৬৮ সালে সরকারি সাহায্যের একটা অর্থমূল্য পাবার পর সেখানে কুটির বানিয়ে বসবাস করছেন এবং গবেষণা করে তথ্য সংগ্রহ করছেন। দেশ-বিদেশজোড়া তাঁর নাম। তাই আমাজনের জঙ্গলে বিমান ভেঙে পড়ে যে তাঁর স্ত্রী ও মেয়ে আর বেঁচে নেই, বেঁচে থাকতে পারেন না তাঁরা, হান্সের চাইতে বেশি আর কে জানেন? তবু আশায় ভর করে বসে আছেন ডক্টর হান্স, যদি ঘটে যায় কোনও অলৌকিক ঘটনা, যদি তাঁরা জীবিত ফিরে আসেন তাঁর কাছে! নিজেকে দোষ দিতেও ছাড়ছেন না ডক্টর হান্স। যদি পুকাল্পাতে এই গবেষণাগার না খুলতেন, তবে কি আজ নিজের পরমাত্মীয়দের এইভাবে হারাতে হত? নিজের মাথা দুই হাত দিয়ে চেপে ধরে বসে থাকেন ডক্টর হান্স। নীরবে চোখের জল গড়িয়ে পড়ে মাটিতে।
জার্মানির কিয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর দিনগুলোর কথা মনে পড়ে ডক্টর হান্সের। মারিয়া তাঁর চাইতে অনেকটাই ছোটো ছিলেন তখন। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর হান্সের ছাত্রী ছিলেন মারিয়া। পাখি নিয়ে অনেক উৎসাহ ছিল তাঁর। হান্স তাঁকে পক্ষীবিশারদ হতে পরামর্শ দেন। হান্স পরিবেশ বিজ্ঞানী হওয়ায় মারিয়ার তালিম উচ্চমানের হয়ে ওঠে। পেরুর আমাজনের জঙ্গলে দুজনে মিলে গবেষণা করবেন স্থির করে জার্মানি ছেড়ে তাঁরা পেরুর রাজধানী লিমাতে আসেন। হান্স অধ্যাপনার কাজে যোগ দেন লিমার স্যান মারকোস ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে। এইখানেই মারিয়ার সঙ্গে তিনি ঘর বাঁধেন।
খুব সুন্দর এগোচ্ছিল মারিয়ার কাজ। প্রায় দেড় হাজার বিভিন্ন পাখির নমুনা এবং তথ্য সংগ্রহ করে এক অসামান্য কাজ করে ফেলেছেন তিনি। পেরুতে নানা প্রজাতির পাখি পাওয়া যায়, বিশ্বের বহু বিজ্ঞানী সে-কথা জানতেন। কিন্তু মারিয়ার নতুন কিছু আবিষ্কৃত পাখির প্রজাতির বিবরণ গবেষণাপত্রে প্রকাশ হওয়ায় হান্সের মতোই তাঁর নামডাক হতে থাকে বিজ্ঞানী মহলে। মারিয়ার এক অসামান্য ক্ষমতা হল তাঁর ছবি আঁকার দক্ষতা। কোনও পাখি দেখে তখনই খাতা-পেন্সিল নিয়ে বসে যান সে-পাখির ছবি এঁকে রাখতে। শুধু কি তাই? হান্স কিছু উদ্ভিদ ও বন্যপ্রাণীর মধ্যে গভীর সম্পর্ক নিয়ে যত তথ্য সংগ্রহ করেছেন পাঙ্গুয়ানায়, সে-সব আরও গুছিয়ে তুলতে একজন দক্ষ সহকারী হয়ে উঠেছেন মারিয়া।
হান্স মিশুকে নন, মারিয়া আবার একেবারেই উলটো। তাই নানা দেশের বিজ্ঞানীরা যখনই আগ্রহ দেখিয়েছেন পেরুর জঙ্গল পরিদর্শনে, মারিয়া তাঁদের যত্ন করে আশ্রয় ও আহার জুগিয়েছেন। তাই পেরুর প্রশাসনিক খাতায় লেখা ‘জারেট ফরেস্ট’ যেন হয়ে উঠেছে এক অতিথিশালা। জারেট ফরেস্টে পাঙ্গুয়ানা রিসার্চ সেন্টার নামকরণ মারিয়াই করেছেন গর্বভরে। বিজ্ঞানীরা এই জঙ্গলকে চেনেন পাঙ্গুয়ানা ফরেস্ট বলেই। মারিয়ার প্রিয় পাখি পেঙ্গুইন বা স্প্যানিশ ভাষায় পাঙ্গুয়ানা, যা নিয়ে তাঁর অপরিসীম কৌতূহল, সেই নামে জারেট ফরেস্টের নাম কার্যত বদলে যেতে দেখে রসিকতা করেছেন ডক্টর হান্স। তিনি বলেছেন, “বরফের দেশের এক পাখিকেও নিয়ে এসে ফেললে আমাজনের ট্রপিক্যাল রেইন ফরেস্টে? প্রকৃতি তোমাকে ছেড়ে কথা বলবে না।”
আনমনা হয়ে যান প্রফেসর হান্স কোপকে। সত্যিই কি প্রকৃতি তাঁদের ওপর প্রতিশোধ নিচ্ছে? আসলে হয়তো সে নিজেকে আড়াল করতে চেয়েছে। হান্স আর মারিয়ার নিরন্তর প্রকৃতির রহস্য উদ্ঘাটন হয়তো ঈশ্বরের পছন্দ নয়। মেয়ে জুলিয়ান হয়েছে একেবারে মায়ের কার্বন কপি যেন। জঙ্গল নিয়ে তার উৎসাহ হচ্ছে দেখার মতো। তবে বাবার চাইতে মায়ের সঙ্গেই তার বেশি সখ্য।
জলের শব্দ আসছে। জুলিয়ান ভাবল, সে নিশ্চয়ই ভুল শুনছে। মাত্র কিছু আগেই তার ঘুম ভেঙেছে। ঘুম নয়, যেন ঘোর লাগা মতো একটা ব্যাপার। পোকা আর মশাদের অত্যাচারে মাঝে-মধ্যেই ঘুমের চটকা ভেঙে যাচ্ছিল। কণ্ঠের দিকে একটু ব্যথাও হচ্ছে। দিনের চাইতে রাতের জঙ্গলে আওয়াজ অনেক কম, তবে চোখ খুলতেই নিকশ কালো অন্ধকার ভেদ করে আলো দেখা যাচ্ছিল। নিশাচরদের চোখের মণি অন্ধকারেও জ্বলে। তবে এই জঙ্গলে বাঘ-সিংহ নেই যে জুলিয়ানকে তারা নৈশভোজের জন্য বেছে নেবে। জাগুয়ার আছে আমাজনের জঙ্গলে, কিন্তু মানুষকে তারা এড়িয়ে চলে, হয়তো ভয় পায়। তাই রাতটা কেটেছে একরকম। রাতের উঁচু আশ্রয় থেকে নেমে আবার চলা শুরু করতে হবে জুলিয়ানকে।
খুব মৃদু ঝরঝর করে জলের একটা আওয়াজ যেন জুলিয়ানের কানে ভেসে আসছে বাতাস বাহিত হয়ে। লাঠিটা ভর করে উঠে দাঁড়ায় সে। পেট খিদেয় চুঁইচুঁই করছে। একটা চকোলেট মুখে পুরে সে জলের আওয়াজের উৎসমুখে হাঁটা লাগায়।
আহ্, কী আনন্দ! ঘন জঙ্গলে একটা পাথুরে উঁচু টিলা থেকে নেমে আসা সরু ঝরনা দেখতে পেল জুলিয়ান। ঝরনার দিকে ছুটে যেতে গিয়ে পা আটকে গেল লতাগুল্মে। কোনোরকমে টাল সামলে পড়ে যাওয়া থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে ঝরনার সামনে এসে প্রথমেই সে আকাশের দিকে তাকিয়ে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানায়। তারপর আঁজলা করে পান করতে থাকে জল। পরিষ্কার ঠান্ডা জল খেতে গিয়ে জলের স্বাদ যেন আজ নতুন করে লাভ করে সে। নিজের শরীরে লেগে থাকা কাদা ধুয়ে ফেলে জুলিয়ান। হাঁটুর ক্ষতস্থান ধুয়ে সাফ করে। ঝরনার জল মাটিতে পড়ে অজস্র লতা আর গাছের গুঁড়ির মাঝ দিয়ে বয়ে চলেছে প্রায় নিজেকে লুকিয়ে। চোখ দুটো ভালো করে ধুয়ে নিতে মনে হল যেন ডান চোখটাতে একটু দৃষ্টি ফিরে এসেছে। কিন্তু খুব দূরের জিনিস ভালো করে দেখা যাচ্ছে না, কারণ তার চশমা জঙ্গলে কোথায় যে হারিয়ে গিয়েছে কে জানে।
লাঠি দিয়ে লতাপাতা আর কাদা সরিয়ে জলের গড়িয়ে চলা স্রোত ধরে সন্তর্পণে হাঁটতে থাকে জুলিয়ান। ক্রমশ জলের ধারা বড়ো আর চওড়া হচ্ছে, তাতে মিশে যাচ্ছে অজানা অদৃশ্য জলের স্রোত। হাতের ঘড়িতে সময় দেখাচ্ছে সকাল সাড়ে ছয়টা। জঙ্গলের মধ্যে থাকায় মনে হচ্ছে ভোর হল সবে। ছায়া আর আলো মিলে অদ্ভুত সব নকশা এঁকে চলেছে মাটিতে।
গাছের পাতা থেকে চুইয়ে জল ঝরে পড়ছে, কিন্তু বৃষ্টি হচ্ছে না। এই অভিজ্ঞতা জীবনে প্রথম। সে বোঝে, বৃষ্টির পর বাতাসে বেশি জলীয় বাষ্প জমা হয়ে থাকায় গাছের ডালপালায় সেই বাষ্প ঘনীভূত হয়ে টুপ টুপ করে মাথায় খসে পড়ছে। মন্দ লাগছে না। জল খাওয়ার পর থেকে জুলির মুড বদলে গেছে। সে গুনগুন করে একটা চেনা সুর গাইতে গাইতে জলের ধারা অনুসরণ করে।
একটু এগোতেই চোখে পড়ল একটা ভাঙা যন্ত্রাংশ, কাদায় মাখামাখি। কী এটা? ঝুঁকে বসে জুলিয়ান। দেখে মনে হচ্ছে প্লেনের ভাঙা কোনও অংশ। হবেও-বা ইঞ্জিনের টুকরো। ইস্পাতের কাদামাখা ধাতুটাতে একটু হাত বুলিয়ে জুলির মনে পড়ে গেল পাইলটের ভয়ার্ত ঘোষণা। কত ওপরে ছিল তখন প্লেন? দশ-বারো হাজার ফুট ওপরে হবে। কিন্তু অত ওপর থেকে পড়ে কেন বেঁচে গেল সে? সত্যিই কি সে বেঁচে আছে, নাকি ভূত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে জঙ্গলে?
আর একটু হলেই সামনে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাচ্ছিল জুলিয়ান। পাথরে জুতো পরা পা-টাই আটকে গিয়েছিল প্রায়। জঙ্গলের পথ পার হওয়া ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে। কোথাও মাটি কয়েক ফুট ওপরে উঠে গিয়েছে, তো কোথাও ঢালু হয়ে নেমে গিয়েছে বেশ অনেকটা। ঘাসের জঙ্গলের নীচে জল আছে, না কাদা, তা ঠাহর করা দুষ্কর। জলের স্রোত এখনও নদী না হয়ে উঠলেও ফুট চারেক চওড়া হয়ে গিয়েছে। জুলিয়ান স্থির করে, জলের মধ্যে দিয়ে তাকে হাঁটতে হবে। গাছ আর লতাপাতার মাঝে কোনও বিষাক্ত সাপের গায়ে পা পড়ে গেলে আর রক্ষে নেই, সাপের দংশনে নির্ঘাত মৃত্যু। জলের স্রোতের মধ্যে দিয়ে পা ভিজিয়ে হেঁটে চলে জুলিয়ান।
জল ক্রমশ ঘোলা হয়ে উঠছে। চারদিক থেকে জলের ধারা এসে মিশছে উপনদীতে। মাটি ধুয়ে মিশে যাচ্ছে জলে। কিন্তু তার ভীষণ জলতেষ্টা পাচ্ছে। আঁজলা করে জল খায় জুলিয়ান। লিমা শহরে এমন জল মুখে তোলার কথা সে ভাবতেও পারত না। উপায় নেই, ধারে কাছে অন্য কোনও ঝরনার উৎস খুঁজতে গেলে পথ হারাবার প্রবল সম্ভাবনা। যে করেই হোক ওকে বড়ো নদী পর্যন্ত পৌঁছতে হবে নিজেকে বাঁচাতে।
মাথার ওপর আবার হেলিকপ্টারের আওয়াজ। জলের স্রোত চওড়া হওয়ায় এখানে কিছুটা আকাশ দেখা যাচ্ছে। হেলিকপ্টার নজরে আসছে। দুই হাত তুলে চেঁচিয়ে ওঠে জুলিয়ান, ‘আমি এখানে, হেই! তোমরা এদিকে দেখো।’ নিজের গলার আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হয়ে জুলিয়ানের কাছেই ফিরে আসে। হতাশ হয়ে সে দেখে, হেলিকপ্টার মাথার ওপর চক্কর দিয়ে আবার অদৃশ্য হয়ে গেল। মাথার ওপর গাছের ছাতা থাকায় সেটা আর চোখে পড়ছে না। বিরক্ত হয়ে আবার হাঁটা শুরু করে জুলিয়ান।
একটু এগোতেই চমকে উঠে জুলিয়ান দেখে, বিশাল এক মাকড়শা জলের ধারে বসে আছে। লম্বায় প্রায় ফুট দু-এক হবে। শহুরে দেওয়ালের গায়ে যে মাকড়শা দেখতে পাওয়া যায়, এরা তাদের চাইতে বহুগুণ বড়ো। এই মাকড়শারা পৃথিবীর সবচাইতে বড়ো মাকড়শা, যারা পাখি ধরে খায়। ছবিতে একবার জুলিয়ানের মা তাকে দেখিয়েছিলেন, বেশ মনে আছে। চাক্ষুষ দেখা এই প্রথম। ভাগ্যিস মাকড়শাটা নদীর অন্য পাড়ে বসে আছে। হয়তো জুলিকে সে দেখেছে, কাছে পেলে আক্রমণ করতেও পারত আত্মরক্ষার ভয়ে। দ্রুত পা চালিয়ে জায়গাটা পার হয়ে যায় জুলি। পেটে খিদেটা একটু কমে এসেছে। হয়তো জলের সঙ্গে অনেকটা মাটি পেটে চলে যাওয়ায় খিদে আর তেমন পাচ্ছে না।
আরও একটা হেলিকপ্টার মাথার ওপর দিয়ে চলে গেল। এখন আর জুলিয়ান আকাশে হেলিকপ্টারের দিকে তাকিয়ে দেখছে না। কোনও লাভ নেই। সে বুঝে গিয়েছে যে, ঘন জঙ্গলের মাঝে হেলিকপ্টার তাকে খুঁজে পাবে না অত ওপর থেকে। এর চাইতে বেশি নীচে হেলিকপ্টার নেমে এলে গাছের আঘাতে প্রপেলার ভেঙে যেতে পারে। তারা হয়তো প্লেনের ভগ্নাবশেষ খুঁজে বেড়াচ্ছে। একমাত্র স্থলপথে এলেই সে-সব খুঁজে পেতে পারে লোকে, কিন্তু একেবারেই অসম্ভব সেই পথে আসা।
সাংবাদিকদের অত্যাচারে জর্জরিত হচ্ছেন হান্স কোপকে। তিনদিন কেটে গিয়েছে, স্ত্রী আর মেয়েকে হারিয়ে নিজেকে নিঃস্ব বলে মনে হচ্ছে তাঁর। বইয়ের কাজ প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল। প্রুফ দেখতে পাঠানোর জন্য গবেষণালব্ধ পাণ্ডুলিপির ত্রুটি সংশোধন করছিলেন তিনি। এখন তাঁর কাজ মাথায় উঠেছে। হান্সের কাজ শেষ হলে মারিয়া বইয়ের পাণ্ডুলিপিতে একবার চোখ বুলিয়ে নিলেই ছাপতে যাবার কথা ছিল সেটা। অনেকবার তিনি ভেবেছেন, বৃথা বিমানবন্দরে বসে না থেকে পাঙ্গুয়ানা রিসার্চ সেন্টারে ফিরে যাবেন। তাহলে অন্তত অজস্র অনর্থক প্রশ্নের মুখে তাঁকে পড়তে হবে না। তবুও বুকে আশা, যদি উদ্ধারকারী দল ভালো কোনও সংবাদ নিয়ে আসে! বাধ্য হয়েই তাই এখানে থেকে যাওয়া। রেডিওটা খুলে সংবাদে কান রাখেন ডক্টর হান্স।
‘সিরা পর্বতের কাছে ২৪ ডিসেম্বর রাতে একজন জঙ্গল কর্মী আকাশে আগুন ধরে যাওয়া একটা প্লেন দেখতে পান। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে উদ্ধারকারী দল হেলিকপ্টার নিয়ে ওই অঞ্চলে তল্লাশি চালাচ্ছে, কিন্তু এখনও পর্যন্ত কারও সন্ধান পাওয়া তো দূর, প্লেনের ভগ্নাংশও খুঁজে পাওয়া যায়নি।’
রেডিও বন্ধ করে দেন ডক্টর হান্স। কিছুই ভালো লাগছে না তাঁর। বাইরে গিয়ে কিছুটা হেঁটে এলে কি মন শান্ত হবে? উঠে দাঁড়ান তিনি।
“ডক্টর কোপকে, মৃতদের নামের তালিকায় আপনার স্ত্রী এবং মেয়ের নাম আছে কি না দেখেছেন?”
সাংবাদিকের বাড়িয়ে দেওয়া মাইক হাত দিয়ে ঠেলে সরিয়ে চেঁচিয়ে ওঠেন হান্স, “লিমা থেকে লান্সা বিমানে যাঁরা যাত্রা করেছিলেন, তাঁদের কাউকে কি খুঁজে পাওয়া গেছে? অবান্তর প্রশ্ন করে বিরক্ত করছেন কেন? আমার স্ত্রী এবং মেয়ে যে সেই প্লেনেই ছিল, সবার জানা, তাহলে কেন এই প্রশ্ন?”
রেগে প্রায় ছুটে এয়ারপোর্টের বাইরে চলে আসেন ডক্টর হান্স। তিনি স্থির করেন, পাঙ্গুয়ানা রিসার্চ সেন্টারে চলে যাওয়াই তাঁর পক্ষে মঙ্গল। এখানে অপেক্ষা করতে থাকলে অর্বাচীন মানুষদের পাল্লায় পড়ে পাগলা গারদে যাওয়া ছাড়া তাঁর আর কোনও উপায় থাকবে না।
ডক্টর হান্সকে বিমানবন্দরের বাইরে হাঁটতে দেখে একটু দূরে অপেক্ষারত তাঁর সহায়ক স্মিথ দৌড়ে আসেন। হান্স তাঁকে বলেন, “চলো পাঙ্গুয়ানা ফিরে যাই। তারপর যা হয় হবে।”
স্মিথ ডক্টর হান্সকে জানান, “স্যর, সামরিক বিমানবাহিনীর লোকেরা পুয়ের্তো ইনকা অঞ্চলে চিরুনি তল্লাশি শুরু করেছে। চিন্তার কারণ নেই, হয়তো উদ্ধার হয়ে যাবেন সবাই।”
ডক্টর হান্স তির্যক দৃষ্টিতে স্মিথের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি কতদিন হল আমার সঙ্গে কাজ করছ?”
অপ্রস্তুত হয়ে স্মিথ জানান, ডক্টর হান্সের গবেষণাগারে তিনি বিগত দশ বছর ধরে কাজ করে চলেছেন। হাঁটা না থামিয়ে হান্স গর্জে উঠলেন, “তাহলে তোমার এটাও জানা উচিত আকাশে তিন মাইল ওপর থেকে মাটিতে পড়ে গেলে কারও বাঁচার আশা থাকতে পারে না। পেরুর জঙ্গল চিনলে এমন কথা বলতে পারতে না।”
ওপরওয়ালাকে সামলাতে স্মিথ যুক্তি দেন, “অনেক সময় চমৎকার ঘটেও যায়, স্যর!”
আপনমনে চলতে চলতে মাথা নাড়াতে লাগলেন ডক্টর হান্স। তারপর হঠাৎ শান্ত গলায় বললেন, “মনে আছে স্মিথ, বার্কলে থেকে কিছু গবেষক দুই বছর আগে পাঙ্গুয়ানা রিসার্চ সেন্টারে ক’দিনের জন্য এসেছিলেন? তাঁদের মধ্যে সবচাইতে তরুণ গবেষকটি জঙ্গলে হারিয়ে একই জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। নির্ঘাত ও মরে যেত, দৈবাৎ যদি না সে স্থানীয় কিছু শিকারির দেখা পেত। তারাই ওকে ফিরিয়ে নিয়ে আসে সেন্টারে। মারিয়া বা জুলিয়ান যদি বেঁচেও থাকে, কোনও উদ্ধারকারী দলের সঙ্গে তাদের দেখা হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য। তিনদিন কেটে যেতে আমি একরকম নিশ্চিত যে ওদের কোনও দেহাবশেষ পর্যন্ত আমি দেখতে পাব না।”
ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত ডক্টর হান্সকে বিমর্ষ দেখে স্মিথ আর কথা বাড়ান না। তিনি তাঁর পেছন পেছন হাঁটতে থাকেন।
আনমনে ছোট্ট জলের ধারার পাশ দিয়ে চলতে চলতে একটা বাঁকে এসে জুলিয়ানের চমক ভাঙল। এখান থেকে নদী তার আসল রূপ ধারণ করছে ক্রমে। এখন সে প্রস্থে প্রায় বিশ-তিরিশ ফুটের কম হবে না, স্রোত তীব্র হয়ে উঠেছে। মাথার ওপর আকাশ অনেকটা খোলা। সেখানে সাদা মেঘের ভেলা ভেসে চলেছে। একটু দাঁড়িয়ে জিরিয়ে নেয় সে আকশের দিকে তাকিয়ে। হেলিকপ্টার কি আজ তল্লাশিতে বেরোয়নি?
হঠাৎ একটা অদ্ভুত পাখির ডাকের আওয়াজে চমক ভাঙে জুলির। কীসের ডাক? কান খাড়া করে শোনে জুলিয়ান। তারপরই সামনের পিচ্ছিল লম্বা গাছের কাণ্ড বেয়ে ওপরে উঠতে যেতে দেখা যায় একটা হোটজিন পাখিকে। একা নয়, তার পেছন পেছন একগাদা বাচ্চা হোটজিন পাখি। এদের ছবি দেখিয়েছিলেন তার মা। বিচিত্র সুদৃশ্য পাখা মেলে ওরা গাছে উঠে যায় তরতর করে। জুলিয়ানকে মারিয়া বলেছিলেন, হোটজিনদের পাখাতেও নখ থাকে। দূর থেকে নখ না দেখা গেলেও ওদের গাছে চড়ার কায়দা দেখে বোঝা যায় যে, নখ সাহায্য না করলে গাছের পিচ্ছিল শরীর বেয়ে ওপরে ওঠা সম্ভব ছিল না। অবাক হয়ে হোটজিন পাখিদের দেখতে থাকে জুলিয়ান। একটু কাছে এগিয়ে গিয়ে দেখতে গেলে পাখিগুলো কর্কশ আওয়াজ করতে থাকে। জুলিয়ানকে দেখে ওরা নিশ্চয়ই ভয় পেয়েছে। তবে কাছে যাওয়াতে তার চোখে পড়েছে হোটজেন পাখিদের ডানায় লাগানো ধারালো নখের দিকে, এমনকি বাচ্চাগুলোর ডানাতেও এখনই পরিণত হয়ে গিয়েছে নখ।
কী বিচিত্র প্রকৃতির খেলা! এই পাখি অন্যসব পাখিদের চাইতে আলাদা। বেশি দূরে এরা উড়তে পারে না, অনেকটা মুরগির মতো। আহা, মুরগি! ভাবতেই জিভ লালায় ভরে যায় জুলির, খিদেটা পেটে পাক দিয়ে ওঠে। দুই হাতে পেট চেপে ধরে নদী থেকে বেশ খানিকটা জল খেয়ে নিয়ে সে ভাবে, এবার জঙ্গল ছেড়ে জলের রাস্তা ধরতে হবে। সাঁতার কাটলে দ্রুত পার হয়ে হয়তো কোনও জনপদে পৌঁছে যাওয়া যাবে। ক’টা বাজে ঘড়িতে? যাহ্, ঘড়িটা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। হাত থেকে টান মেরে সেটা জলে ফেলে দিতে গিয়ে মনে পড়ে, সোনার জল করা সুদৃশ্য ঘড়িটা তার ঠাকুমা এক জন্মদিনে ওকে উপহার দিয়েছিলেন। ঠাকুমাও এখন আর পৃথিবীতে নেই। ঘড়িটা খুলতে গিয়েও সে না খুলে হোটজেন পাখিদের দেখতে আর একটু এগিয়ে যায়।
বিশ্রী একটা পচা গন্ধে গা গুলিয়ে ওঠে জুলির। জলের দিকে ছুটে আসে সে। মায়ের কাছে সে শুনেছিল, হোটজিন পাখিদের বিচিত্র পাকযন্ত্রের কথা। ওরা পাতা খেয়ে গোরুদের মতো জাবর কাটে। গলার কাছে সেই খাবার পচতে থাকে, বিজ্ঞানের ভাষায় বলে, ফারমেন্টেশন। তারপর ক্রমশ সেই সহজপাচ্য খাবার চলে যায় পাকস্থলীতে। কিন্তু গলার থলিতে লতাপাতারা পচে গিয়ে যে গ্যাস উৎপন্ন হয়, সেই গ্যাস চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। মা জানিয়েছিল, এই গ্যাসে থাকে মিথেন, অ্যামোনিয়া আর সালফার ডাই-অক্সাইড। এই গ্যাসের বিশ্রী গন্ধে শত্রুরা খুব একটা হোটজিন পাখিদের দিকে আকৃষ্ট হয় না।
হোটজিন পাখিদের মাথায় একেবারে মোরগের মতো ঝুঁটি দেখে জুলির খিদেটা আরও চাগিয়ে ওঠে। হয়তো ওদের ধরতে পারলে সে কাঁচাই খেয়ে ফেলত পালক ছাড়িয়ে। এখন তার এমন অবস্থা, হাতের সামনে ব্যাঙ পেলেও খেয়ে ফেলবে আস্ত। বলতে-বলতেই দেখে তার সামনে জলের ওপর লাফ দিচ্ছে কয়েকটা ব্যাঙ। জুতো যে-পায়ে আছে, সেই পা আগে বাড়িয়ে জুলি ব্যাঙদের একটাকে ধরাশায়ী করার চেষ্টা করে। বিফল হয় তার আক্রমণ। ব্যাঙটা লাফ দিয়ে জলে পড়ে সাঁতার কেটে তলিয়ে যায়। জুলিও সাঁতার জানে। ব্যাঙটা চোখের সামনে হাতছাড়া বা পা-ছাড়া হবার সঙ্গে সঙ্গে একটি মাত্র জুতোর পাটি জলে ভেসে যাওয়ায় সেদিকে তাকিয়ে জুলিয়ান ভাবে, এবার জলে নেমে না পড়লে নির্ঘাত তার মৃত্যু হবে।
হাঁটুজল থেকে ক্রমশ কোমর অবধি জল। জুলিয়ান সাঁতরাতে থাকে। কিন্তু শরীরে তার জোর নেই, হাত-পা অবশ হয়ে আসছে। আকাশে হেলিকপ্টারের আওয়াজ, কিন্তু খুব সহজেই এখন সে তাদের উপেক্ষা করতে শুরু করেছে। কোনও লাভ নেই। যদি এই নদী তাকে কোনও মনুষ্য-বসতি পর্যন্ত পৌঁছে না দেয়, তবে অপঘাতে তার মৃত্যু অনিবার্য। এই পরিস্থিতিতে তার বাড়িঘর, বাবা- মা— কারও কথাই আর মনে আসছে না তেমন। শুধু থেকে থেকে খিদে পাচ্ছে প্রবল। মনে হচ্ছে মোরগের ডাক ভেসে আসছে কানে। হয়তো হোটজিন পাখিদের ডাক এখনও কানে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করছে। ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি শুরু হল। আকাশে তাকিয়ে নজরে এল ঘন কালো মেঘ। এবার সাঁতার কেটে সে আবার নদীর পাড়ে এল। জলে ভিজে একসা অবস্থা। নাকে আর পেটেও অনেক জল ঢুকে গেছে। অপেক্ষাকৃত উঁচু একটা জায়গায় অনেক ঝোপঝাড় থাকায় সেখানে বৃষ্টি থেকে নিজেকে বাঁচাতে আশ্রয় নিল জুলিয়ান।
চারদিকে ব্যাঙের ডাক বেড়েছে। সাপের উপদ্রব এই সময়ে সবচাইতে বেশি। তবে এখনও সাপ দেখার সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য, কোনোটাই তার হয়নি। মারিয়া বলতেন, গায়ে একেবারে পড়ে না গেলে সাপ মানুষের ক্ষতি করে না। অজান্তে নিজের ডানহাতের বাহুমূলের পেছনে হাত চলে যায় জুলিয়ানের। ক্ষতস্থানে ব্যথা নেই, কিন্তু সুরসুর করে কী যেন চলাফেরা করছে। সভয়ে জুলিয়ান দেখে তার হাতে উঠে এসেছে একটা সাদা পোকা… না, এটা মাছির লার্ভা!
ক্ষতস্থানে মাছি ডিম পেড়েছিল, এখন সেখান থেকে লার্ভাগুলো বেরিয়ে আসছে, ঝরে পড়ছে। ভয়ে শক্ত হয়ে গেল জুলিয়ানের শরীর। সে আলতো করে ক্ষতস্থানে হাত বোলাতে আবার লার্ভাগুলো ঢুকে পড়ল ঘায়ের ভিতর। শিরশির করে একটা বিশ্রী অনুভূতি হতে লাগল শরীরে। এই জঙ্গলে কোথায় সে পাবে পেট্রোল বা কেরোসিন? সে-সব না পেলে কোনোমতেই লার্ভা পোকাদের থেকে নিষ্কৃতি নেই। জঙ্গলের সবচাইতে নিঃশব্দ ঘাতক এরা। ধীরে ধীরে হাড় পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। এখন জুলিয়ানের রক্তমাংস ওদের খাবার।
ফ্রকে আটকে থাকা একটা বোতাম খুলে নেয় জুলিয়ান। সেই বোতামটা দিয়ে খুঁচিয়ে কতক লার্ভা বার করে। নিজের চোখে ক্ষতস্থান দেখা যাচ্ছে না একেবারে হাতের পেছন দিকে সেটা থাকায়। আন্দাজে আর কতটা শুশ্রূষা করা সম্ভব? ভুলে থাকাই ভালো ভেবে সে বাড়িতে মায়ের সুস্বাদু নানা রান্নার কথা ভাবতে থাকে। খানিক গাছের পাতা চিবিয়ে খায়। খুব একটা অচেনা নয় সেই গাছ, পাঙ্গুয়ানাতে ল্যাবের চারদিকে অনেক দেখা যায়। আর যাই হোক, এরা বিষাক্ত হবে না ধরে নেওয়া যায়।
আজ খুব সম্ভব পঞ্চম কি ষষ্ঠ দিন জুলিয়ানের জঙ্গল বাসের। দিন আর রাত গোনা সে এখন ছেড়ে দিয়েছে। আপাতত সে ভেসে চলেছে একটা ভেসে যাওয়া বড়ো গাছের গুঁড়ি ভর করে। পিছল গুঁড়িটার ওপর নিজের শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখা মুশকিল। তাই গুঁড়িটার থেকে বেরিয়ে আসা জীর্ণ দুটি কাণ্ড দুই হাতে অবলম্বন করে জুলিয়ান নদী বেয়ে চলেছে। গতকাল অন্ধকার নেমে আসার আগেই সে গুঁড়িটাকে নৌকোর মতো ব্যবহার করে এক পাড়ে উঠে পড়েছিল। রাতের বেলা নদী বেয়ে চলা ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে, ঘুমের ঘোরে ডুবে যাবার সম্ভাবনা আছে।
বিচিত্র অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে জীবন চলেছে জুলিয়ানের। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে, এই নদী যেন অসীম অজানা এক দিকে বয়ে চলেছে, যার কোনও শেষ নেই। নদীর স্রোতে ভয়ানক পিরানহা মাছ দেখতে পেয়েছে সে। পিরানহা নিমেষের মধ্যে যে-কোনো প্রাণীকে ঠুকরে খেয়ে ফেলে ধারালো দাঁত দিয়ে। তবে কোথায় যেন সে পড়েছিল, পিরানহা স্রোতের মধ্যে কাউকে আক্রমণ করে না, স্থির জলে করে।
যত নদী চওড়া হয়েছে, জীবজন্তুর প্রকার বদলে যেতে দেখছে জুলিয়ান। আজ সন্ধে হতে যেই না সে পাড়ের দিকে গিয়ে গাছের গুঁড়িটাকে বালির ওপর আটকে রাখতে গেছে, হঠাৎ সে দেখে সারি সারি শঙ্কর মাছ রুপোলি শরীর বালির ওপর পেতে রেখে আরাম করছে। জলের নীচে এরা শরীরের রঙের কারণে এমনভাবে বালির ওপর মিশে থাকে, সহজে নজরে পড়ে না। লিমার বাজারে এই মাছ কিনতে পাওয়া যায়। এদের লেজ লম্বা, মুখে ধারালো দাঁত আছে। আক্রমণ করতে ওস্তাদ। একবার যদি জুলিয়ানের পা পড়ে ওদের ওপর, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে ওরা দংশন করবে। পা ফুলে ঢোল হয়ে জ্বর আসবে শরীরে। ওদের বিষে মারা যাবার সম্ভাবনা কম হলেও অসুস্থ হয়ে পড়লে অন্য কারণেও জুলিয়ান মরে যেতে পারে। তবে হাতের ক্ষততে যে ম্যাগটরা বাসা বেঁধেছে, তারাই-বা কতদিন ওকে বাঁচতে দেবে কে জানে।
ভয়কে জয় করতে এখন আর অসুবিধা হচ্ছে না জুলিয়ানের। নদীর পাড়ে শুয়ে থাকা কুমির দেখেও সে ভয় পায়নি। যতটা ভয় লাগে ওদের বিশাল শরীর দেখে, ততটা ভয়ংকর তারা নয়, সেই কথা বাবার সঙ্গে নদীতে গিয়ে জুলিয়ান শিখেছিল। এই কুমিররা সাধারণত মাছ বা ছোটো পাখি ধরে খায়, মানুষকে আক্রমণ করে না।
মানুষের কথা ভাবতেই এখন ওর হাসি পেল। কতদিন কোনও মানুষের দেখা সে পায়নি! জঙ্গলের যত প্রাণী এখানে দেখা যাচ্ছে, মনে হয় না তাদের সঙ্গে দু-পেয়ে জন্তু মানুষের বড়ো একটা দেখাসাক্ষাৎ ঘটেছে।
রাতে বিশ্রাম নেবার জন্য একটা বড়ো পাথরের ওপর শরীর এলিয়ে দেয় জুলি।
হাউলার মাঙ্কির ডাকে ঘুম ভাঙল জুলিয়ানের। বিচিত্র এক বাঁদরের প্রজাতি হল হাউলার। ঘেউ ঘেউ করে ডাকে অনেকটা, তাই নাম হয়েছে হাউলার মাঙ্কি। শুধু আমাজনের জঙ্গলে এলেই এদের দেখা মেলে। মাইল দু-এক দূর থেকেও এই বাঁদরদের ডাক শোনা যায়। গাছের ফাঁকে কৌতূহলী মুখে জুলিয়ানকে দেখে ডাক দিচ্ছে এরা। আসলে ওরা নিজেদের সীমানা পাহারা দিচ্ছে। সত্যিই তো! একটা বিচিত্র মানুষ ওদের এলাকায় ঘুরতে দেখে ওরা প্রতিবাদ তো জানাবেই। হেসে ফেলে জুলিয়ান।
কতদিন হয়ে গেল সে জঙ্গলে? মনে করার চেষ্টা করেও কিছুই মনে পড়ল না। হয়তো দশদিন, বা আরও বেশি। শরীর অবসন্ন হয়ে যাচ্ছে আরও। পুষ্টির অভাবেই। কিন্তু যে করেই হোক পাথরের ওপরে গতরাতের আশ্রয় ওকে আবার জলে নামতে হবে। এখন জলই তাকে জীবন ফিরিয়ে দিতে পারে। ক্রমশ জঙ্গল ঘন আর দুর্ভেদ্য হয়ে উঠছে। এক-একবার মনে হয়েছে জলের কুমির আর পিরানহা থেকে বাঁচতে জঙ্গলে ঢুকে পড়ে। কিন্তু সেখানে কোথায় মৃত্যু তার জন্য ফাঁদ পেতে রেখেছে, কে জানে? মন বলছে, একদিন না একদিন লোকালয়ে পৌঁছে দেবেই এই কুলকুল করে বয়ে চলা স্রোতস্বিনী। লাঠিতে ভর দিয়ে আবার গাছের গুঁড়ি সম্বল করে জলে ভেসে চলে জুলিয়ান। ঠান্ডা জলে শরীরের নীচের অংশ অসাড় হয়ে আসে। ঝিমোতে থাকে সে। থেকে-থেকেই কানে যেন মুরগির ডাক ভেসে আসছে। অথচ সে জানে, এ সবই তার ভ্রম।
হঠাৎ ঝাঁকুনি দিয়ে গাছের গুঁড়ি থেমে যেতেই জুলিয়ান চমকে গিয়ে দেখে, গাছের গুঁড়িটা নদীর মাঝে এক বালিয়াড়িতে আটকে গিয়েছে। সাবধানে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে সে বালিয়াড়িতে উঠে পড়ে। রোদের তাপ বেড়েছে। এখন বোধ হয় মধ্যাহ্ন। চোখ মেলে আকাশের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। আপাতত এই বালিয়াড়িতে কিছুটা নিশ্চিন্ত ঘুম দিয়ে নেওয়া যেতে পারে, কারণ পোকামাকড় আর জীবজন্তু এখানে ওকে আক্রমণ করবে না আশা করা যায়। একচিলতে বালিয়াড়িটা রোদে চিকচিক করছে। নদীর দুই পাশে ঘন সবুজ জঙ্গল বড়ো সুন্দর। মাথার ওপর আর হেলিকপ্টারের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে না। হয়তো সবাই উদ্ধার হয়ে গিয়েছে ত্রাণকর্তাদের হাতে। হয়তো জুলির মা অপেক্ষা করে আছেন মেয়ের ফেরার অপেক্ষায়। তারা কেউ জানে না, শুধু জুলিই এই পেরুর জঙ্গলে একা একা লড়ে যাচ্ছে জীবন বাঁচাতে।
জীবন বড়ো মূল্যবান। প্লেন থেকে জঙ্গলে খসে পড়ে নিজেকে বাঁচাতে গিয়ে এই উপলব্ধি জুলিয়ানের হয়েছে। আচ্ছা, জীবনে কী করবে সে? কোন পেশা বেছে নেবে জঙ্গল থেকে উদ্ধার হবার পর? ডাক্তার হবার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু এখন সেই ইচ্ছেটা চাপা পড়ে গিয়েছে। সে ঠিক করে, স্কুলের পাঠ চুকে গেলে জীববিদ্যা নিয়েই পড়াশুনো করবে, ঠিক যেমন করেছেন তার বাবা ও মা। জঙ্গলে একা ঘুরে না বেড়ালে হয়তো নিজের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত তার অন্যরকম হত। হয়তো বিজ্ঞান নিয়ে না পড়ে সে পড়তে যেত ওকালতি
ভাবতে ভাবতে চোখ লেগে গিয়েছিল জুলির। হঠাৎ কানের কাছে কর্কশ ক্যাঁক ক্যাঁক শব্দে ঘুম ভেঙে দুর্বল চোখে জুলি দেখতে পেল, কয়েকটা বাচ্চা কুমির তাকে ঘিরে ধরেছে। লম্বায় তারা বড়োজোর আট-দশ ইঞ্চি হবে। সদ্য জন্মেছে বলে মনে হয়। হঠাৎ তার বোধোদয় হয় যে, বাচ্চা কুমিরদের মা নিশ্চয়ই কাছেই আছে কোথাও। ভাবামাত্র পড়ি কি মরি করে জুলি ঝাঁপিয়ে পড়ে জলে। সাঁতার কাটতে থাকে। তার গাছের গুঁড়ির ভেলা আটকে থাকে বালিয়াড়িতেই। সেটাকে নিয়ে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ার সময় তার হাতে নেই, কারণ জুলি দূরে একটা বিশাল কুমিরকে বালিয়াড়িতে উঠে পড়তে দেখেছিল। নিশ্চয় করে সে বলতে পারে, কুমিরের বাচ্চাদের মা সেটা। কুমিরদের বাবা বাচ্চাদের দেখাশুনোর দায়িত্ব পালন করে না।
কোথা থেকে যে শরীরে সাঁতার কাটার শক্তি সে পাচ্ছে জানে না, জলের তলায় বিশাল কুমিরটাকে যেন ঠিক নিজের শরীরে নীচেই সাঁতার কাটতে দেখল জুলিয়ান। মাছেদের মতো সাঁতার কেটে দ্রুত জায়গাটা থেকে পালিয়ে যায় সে। বড়ো বড়ো গাছের ভাঙা কাণ্ড জলে ভাসছে। একটাকে সম্বল করে জড়িয়ে ধরে এবার তার সঙ্গেই গা ভাসায় জুলিয়ান। কেন জানি মনে হয়, মা কুমির তাকে শিকার করার আশা ত্যাগ করে আবার বাচ্চাদের কাছে ফিরে গিয়েছে।
ভেসে আসা গাছের গুঁড়ি আর বড়ো বড়ো ভাঙা ডাল ক্রমশ বেড়েই চলেছে নদীতে। ক্রমশ স্রোত বাড়ছে আর নদী চওড়া হচ্ছে। কায়দা করে নিজেকে ঠোক্কর খাওয়া থাকে বাঁচিয়ে একটা মোটা ডালে দুই পা রেখে আর একটা বড়ো গুঁড়িকে জড়িয়ে ধরে ভেসে চলেছে জুলিয়ান। এর ফলে পরিশ্রম কম হচ্ছে, চোখে ঘুম লেগে পড়ে যাবার ভয় কম হচ্ছে।
অনেকটা ভেসে যেতে যেতে আবার একটা বালিয়াড়ি নজরে পড়ল। এখন বিকেল। আলোর তীব্রতা কমে এসেছে। একটু বিরাম নিয়ে আবার নদীর পাড়ে আশ্রয় খুঁজে নেওয়া যাবে। আগের বালিয়াড়িতে কুমির ছিল মানে এখানেও তেমন কিছু হবে তার কোনও মানে নেই, ভাবে জুলিয়ান। আর সেরকম কিছু হলে সামনের জঙ্গলটা পর্যন্ত জোরে সাঁতার কেটে পালিয়ে যেতে কতই-বা সময় লাগবে? হাত দুটোকে হালের মতো ব্যবহার করে সহজেই সে পৌঁছে যায় বালিয়াড়ি পর্যন্ত। যে কাঠ দুটোকে সে ভেলা করে নিয়েছিল, তাদের সে বিদায় দেয়। এখানে ভেলার অভাব হবে না। বালিয়াড়িতে বসে পড়ে নদীর দুই পাড় ভালো করে লক্ষ করতে থাকে জুলিয়ান। পাখিরা জঙ্গলে গাছের মাথায় চেঁচামেচি করছে। নানারকম ডাক ভেসে আসছে। সবার ঘরে ফেরার সময় হয়ে এল। এখন নিশাচরেরা জঙ্গলে রাজত্ব করবে। পাখিদের বিশ্রামের সময়। শুধু জুলিয়ান তার ঘর বা একটু আশ্রয় খুঁজে বেড়াচ্ছে ঘন জঙ্গলে। বিষণ্ণ মনে সে লিমা শহরে তাদের বাড়ি, স্কুল, বাজার সবকিছুর কথা মনে করে কষ্ট পেতে লাগল।
এ কি! কিছু দূরে পাড়ে একটা নৌকো বাঁধা মনে হচ্ছে! নিশ্চয়ই চোখের ভুল হবে। ফ্রকের কাপড়ে চশমার কাচ মুছবে বলে হাত বাড়াতেই মনে পড়ে গেল, চশমাটা তো সেই কবেই জঙ্গলে হারিয়ে গিয়েছে। কিন্তু নৌকো বলে যেটাকে মনে হচ্ছে, সেটা কি দেখার ভুল? জুলিয়ানের কমজোর দৃষ্টি আরও অস্পষ্ট হয়ে গিয়েছে শারীরিক দুর্বলতায়। সে উঠে দাঁড়ায়। তারপর বালিয়াড়ি থেকে নেমে নদীর পাড়ে যাবার জন্য জলে ঝাঁপ দেয়। একমাত্র বাঁচার আশ্রয় হচ্ছে কোনও নৌকো। সেটা যদি থাকে, তবে জনপদ আর দূরে নয় কোথাও। এ-যাত্রা প্রাণে বেঁচে যাবে জুলিয়ান। প্রাণপণে সে সাঁতার কাটতে থাকে। মনে হয় যেন কত দূর এই পথ।
পুকাল্পা এয়ারপোর্টে কৌতূহলী মানুষ, সংবাদমাধ্যম এবং সামরিক বাহিনীর ভিড় ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। আজ দশদিন হয়ে গেল লান্সা এয়ারলাইন্সের নিখোঁজ ফ্লাইট নম্বর ৫০৫-এর কোনও অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায়নি। যেন আকাশে বেমালুম উধাও হয়ে গেছে আস্ত একটা প্লেন। অন্যান্য ফ্লাইটের যাতায়াত স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছে। অ্যান্ডিস পর্বতমালার আকাশে আর উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার উড়তে দেখা যাচ্ছে না। শেষ হেলিকপ্টারটিও ফিরে এসে বিমান কর্তাদের জানিয়েছে, তারা কোথাও প্লেনের ভাঙা অংশ খুঁজে পায়নি। ভেঙে পড়লে অন্তত আমাজনের জঙ্গলে গাছের ছাতার ওপর কিছু চিহ্ন তো সে রেখে যেত! খবরের কাগজের শিরোনাম থেকে লান্সা ফ্লাইটের উধাও হয়ে যাবার খবরও বেপাত্তা। খুব সম্ভব বিরানব্বই জন মানুষের একজনকেও উদ্ধার করা বা তাদের অস্তিত্ব না পাওয়ায় হতোদ্যম হয়ে পড়েছে সবাই।
ডক্টর হান্স উইলহেম কোপকে এখনও পুকাল্পা শহর ছেড়ে যেতে পারেননি। তবে তিনিও যে খুব বেশি আশা রাখছেন, তাও নয়। নতুন বছর শুরু হয়ে গেল, তিনি যেন জানতেই পারলেন না। গতবছর লিমাতে স্ত্রী ও মেয়ের সঙ্গে কত আনন্দ আর হুল্লোড় করেছেন, সেইসব স্মৃতি ভিড় করে আসছে মনে। পুরোনো এক বন্ধু পিটারের ঘরে তিনি আশ্রয় নিয়েছেন আপাতত। পিটার উইরিচ এক বিশাল খামারের মালিক। বন্ধুকে ভরসা জোগাবার জন্য মিথ্যে বলছেন জেনেও পিটার বলেন, “কাজে ফিরতে হবে, হান্স। তবে আরও দু-চারদিন এখানে থেকে যাবার অনুরোধ করছি আমি। পাঙ্গুয়ানাতে ফিরে গেলেও মন লাগাতে পারবে কি? আমার কেন জানি না মনে হচ্ছে, ফ্লাইট নম্বর ৫০৫ অন্য কোথাও সেই রাতে ঝড়ঝঞ্ঝা এড়াতে ল্যান্ড করেছে।”
“দশদিন কেটে গেলেও তারা এখনও যোগাযোগ করতে পারেনি কী করে তবে? একটা সম্ভাবনা কেউ খতিয়ে দেখছে না, প্লেনটা হাইজ্যাকও তো হতে পারে!” হতাশ গলায় বলেন ডক্টর হান্স।
“হাইজ্যাক হলে হাইজ্যাকাররা এতক্ষণে পেরুর প্রশাসনের সঙ্গে কথাবার্তা বলত নিশ্চয়ই! প্রথম দিন যখন খবরটা রেডিওতে ব্রডকাস্ট হয়, তার পর প্রশাসন আগেই যে কাজটা করে সেটা হল, হাইজ্যাক হবার সম্ভাবনার সন্ধান করা। এটা নিশ্চয়ই তারা করেছে, নইলে এত বিশাল সামরিক বাহিনী আমাজনের জঙ্গলে তল্লাশি চালাত না।”
পিটারকে বাধা দিয়ে হান্স বলেন, “আমাজনের জঙ্গলকে তুমি কতটা চেনো আমি জানি না, আকাশ থেকে পর্যবেক্ষণ করে কাউকে খুঁজে বার করা আর খড়ের গাদায় ছুঁচ খোঁজার মতো। একজন মাত্র শিকারির এক বিবৃতির ওপর ভর করে অ্যান্ডিস পর্বতের কাছে জঙ্গলে বিশাল এক সামরিক বাহিনীর স্থলপথে অভিযান চালানো একেবারেই বালখিল্যতা।”
“এ ছাড়া আর কোনও উপায় পেরুর প্রশাসনের কাছে ছিল কি? মানুষের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে এইভাবেই পদক্ষেপ নিতে হয়।”
বাধ্য হয়েই যেন বন্ধুর কথায় সায় দেন ডক্টর হান্স। তারপর মন ঘোরাতে চেয়ার থেকে উঠে বাইরে চলে গিয়ে বলেন, “তোমার খামারটাতে একটা চক্কর লাগিয়ে ফিরে আসছি।”
বন্ধুর বিপর্যস্ত অবস্থায় শঙ্কা হওয়ায় পিটার একজন সহকারীকে নির্দেশ দেন ডক্টর হান্সের পিছু নিতে।
জলে সাঁতার কাটতে কাটতে তীরের দিকে যেতে গিয়ে জুলিয়ান বুঝতে পারে, সে স্বপ্ন দেখছিল না; সত্যি সত্যি একটা নৌকো বাঁধা আছে নদীর পাড়ে। সে নৌকোর কাছে পৌঁছে উঁকি মেরে দেখে সেখানে কেউ আছে কি না। না, নিঃসঙ্গ নৌকো জুলিয়ানের হাতের ধাক্কায় দুলতে থাকে, কাউকে ধারেকাছে দেখা যায় না। পাড়ের দিকে এবার হাঁটুজল। নৌকোয় ভর দিয়ে নিজেকে সোজা রেখে সে জলকাদার মধ্যে দিয়ে পাড়ের দিকে উঠতে থাকে। নৌকোটা একটা শক্ত দড়ি দিয়ে গাছের সঙ্গে বাঁধা। কয়েকটা বাঁশের তৈরি এলোমেলো সিঁড়ি ওপরে উঠে গিয়েছে। কত ওপরে? অন্তত বিশ ফুটের কাছাকাছি। অতটা হেঁটে যাবার সামর্থ আর জুলির অভুক্ত শরীরে অবশিষ্ট নেই এখন। কিন্তু যে করেই হোক তাকে ওপরে উঠে যেতে হবে, যদি লোকালয় খুঁজে বার করতে হয়।
হামাগুড়ি দিয়ে একটু একটু করে শরীরটাকে টেনে নিয়ে ওপরে উঠতে থাকে জুলি। নদীর জল কালো হয়ে উঠেছে, রাত নামতে আর দেরি নেই বেশি। তবে এখন সাহস অনেকটাই সঞ্চিত হয়েছে। নৌকো আছে মানে মানুষও আছে কোথাও আশেপাশে।
শেষ ধাপটা উঠে মাটিতেই শুয়ে পড়ে জুলি। কিছুক্ষণ দম নিয়ে দেখল, সামনে চারটে খুঁটির অবলম্বনে বানানো তালগাছের পাতায় মোড়া এক ছাউনি। কিন্তু কোথাও মানুষের টিকি পর্যন্ত নেই। টালমাটাল পায়ে কোনোরকমে সেখানে ঢুকে পড়ে জুলিয়ান। ছাউনির মেঝেতে তালগাছের পাতা মোড়া, শক্ত খড়খড়ে। তবে চমৎকার আশ্রয়। মানুষের দেখা না পেলেও আজ রাতে অন্তত জমিয়ে একটা ঘুম দিতে পারবে সে। আশ্চর্য ব্যাপার হল, দীর্ঘ দিন অনাহারে থেকে তার মধ্যে খিদের বোধটাই যেন উধাও হয়ে গিয়েছে। তবে শরীর যে ক্রমশ অকর্মণ্য হয়ে পড়ছে, তা বেশ টের পাচ্ছে।
লম্বা চওড়া চারধার খোলা কুটিরটাতে একটা নৌকোর ইঞ্জিন পড়ে আছে। দেখে বোঝা যাচ্ছে, সেটা খুলে রাখা হয়েছে বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচাতে। পাশেই পড়ে আছে একটা গ্যাসোলিনের বড়ো ক্যান। মুহূর্তে নিজের হাতের গভীর ক্ষতের কথা মনে পড়ে যায় তার। গ্যাসোলিনের ক্যানের পাশে পড়ে আছে একটা রাবার পাইপ। ক্যানের মুখটা খুলে জুলিয়ান পাইপটা ঢুকিয়ে দেয় গ্যাসোলিনের ক্যানের ভিতরে। পাইপে মুখ লাগিয়ে আস্তে করে হাওয়া টানে সে মুখ দিয়ে। একটু পরেই গ্যাসোলিন তার মুখে ঢুকে যায়। থু থু করে গ্যাসোলিন ফেলে দেয় মুখ থেকে, তারপর নলটা কাঁধের ওপর দিয়ে ঘুরিয়ে নিজের হাতের ক্ষতস্থানে গ্যাসোলিন ফেলে দেয় খানিকটা। ক্ষতস্থানে গ্যাসোলিন ঢুকে পড়তেই লার্ভাগুলো শরীরের আরও ভিতরে ঢুকে কামড়াতে শুরু করে মাংসে। যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গিয়ে গোঙাতে থাকে জুলিয়ান। একটু পরেই গ্যাসোলিনের গুঁতোয় লার্ভা ঝরে পড়তে থাকে জুলিয়ানের ক্ষত দিয়ে। গা শিরশির করে তার। যন্ত্রণা একটু কমে আসে। ভিতরে আরও লার্ভা আছে সন্দেহ নেই, কিন্তু আপাতত ক্ষতের শুশ্রূষা ছেড়ে দিয়ে সে ঘুমানোর জোগাড় করে।
রাত নামে জঙ্গলে। ঠান্ডা বাতাসে ভিজে শরীরে কাঁপতে কাঁপতে জুলিয়ান আবিষ্কার করে, তার আস্তানায় একটা পলিথিনের শিট পড়ে আছে। সে উঠে গিয়ে পলিথিন দিয়ে নিজেকে জড়িয়ে নেয়। তবে মশার কামড়ে তার ঘুম ভেঙে যেতে লাগল বার বার। কাল সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথম কাজ হল জনপদ খুঁজে বার করা। একটা সরু পায়ে চলা পথ এই কুটির থেকে জঙ্গলের দিকে মিলিয়ে গিয়েছে। নিশ্চয়ই এই পথে মানুষের যাতায়াত আছে। কিন্তু যদি সে জনপদ না খুঁজে পায়? যদি জঙ্গলে হারিয়ে যায়? খালি পেটে আর কতদূর সে নিজেকে টেনে নিয়ে যাবে বাঁচার আশায়? তার চাইতে নৌকো নিয়ে নদীপথে পাড়ি দেওয়া ভালো নয়? যদিও নৌকোতে ইঞ্জিন লাগিয়ে সেটাকে চালিয়ে নিয়ে যাওয়া তার পক্ষে অসম্ভব। কিন্তু নদীর যা স্রোত, তাতে নৌকো দিব্যি বয়ে চলবে আপন খেয়ালে। পরমুহূর্তে জুলিয়ানের মনে হয়, খরস্রোতা নদীতে পাথরে বা গাছের গুঁড়িতে ধাক্কা খেয়ে ডুবে যাওয়া কিছু বিচিত্র নয়। এতটা ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতাও তার শরীরে আর অবশিষ্ট নেই। হয়তো না খেতে পেয়েই মরে যাবে সে এই জঙ্গলে। বাবা কিংবা মা জানতেও পারবে না তাদের আদরের জুলি কোথায় হারিয়ে গেছে আমাজনের জঙ্গলে। কারণ, তার লাশ আর কি অবশিষ্ট থাকবে? ভাবতে-ভাবতেই সে ঢলে পড়ে গভীর ঘুমে।
পাখিদের ডাকাডাকিতে ঘুম ভাঙে জুলিয়ানের। সকালের আলো ফুটে গিয়েছে হয়তো কিছু আগেই। জঙ্গলের দিক থেকে নদীর দিকে হাওয়া ছুটে আসছে। এই কুটিরে বেশ লম্বা ঘুম হয়েছে জুলির। কিছুক্ষণ মটকা মেরে পড়ে থেকে একপাশে কাত হয়ে কুটির থেকে জঙ্গলের দিকের সরু পায়ে চলা পথটার দিকে তাকিয়ে থাকে সে। গ্যাসোলিনের গন্ধ আসে নাকে। ক্ষতস্থান থেকে এখনও গ্যাসোলিনের সঙ্গে চুইয়ে বেরিয়ে আসছে লার্ভা। সারা গায়ে ব্যথা। উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা নেই। কিন্তু শরীরে সব শক্তি দিয়ে যে করেই হোক ওই সরু পথে পা বাড়াতেই হবে তাকে। প্রথমে এক হাত, তারপর হাঁটুতে ভর করে নড়বড় করে উঠে দাঁড়ায় জুলিয়ান। বৃষ্টি নামল জোরে। তাই এগোনোর চেষ্টা না করে সে আবার বসে পড়ে মাটিতে। বৃষ্টির তেজ দেখে বোঝা যাচ্ছে সহজে তা থামার নয়।
কাদের কথা যেন শোনা যাচ্ছে? থেকে থেকে ভ্রমে পড়ে যাচ্ছে জুলিয়ান। কখনও সে মুরগির ডাক শোনে, কখনও মানুষের গলার আওয়াজ। কিন্তু কারা যেন কুটিরের দিকেই আসছে কথা বলতে বলতে। বেশ জোরে তাদের পায়ে চলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। হ্যাঁ, এক, দুই, তিন… তিনজন মানুষ! মানুষগুলো জুলিয়ানকে দেখে থমকে যায়। একজন ছুটে পালাতে গিয়ে অপরজনের ধমক খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। সবাই অবাক চোখে জুলিয়ানকে দেখতে থাকে। জুলিয়ান কালো পলিথিনের টুকরোটা গা থেকে ফেলে দিয়ে হাত দুই দিকে প্রসারিত করে বলে, “আমি একজন মানুষ। একজন মেয়ে। আমি জুলিয়ান কোপকে। লান্সা প্লেন থেকে জঙ্গলে পড়ে গিয়েছিলাম। আমি বাঁচতে চাই। আমার খিদে পেয়েছে।”
তিনজন পুরুষের গায়ের রঙ বলে দিচ্ছে ওরা উপজাতির মানুষ। এখনও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজছে, কুটিরের ভিতরে আসতে সাহস করছে না। জুলিয়ান আবার বলে, “আমাকে উদ্ধার করো দয়া করে। আমি সত্যি বলছি, আমি প্লেন থেকে…”
একজন বাকি দুইজনকে ইশারায় কুটিরের ভিতরে আসতে বলে এগিয়ে এসে ভরসা দেয় জুলিয়ানকে— “আমরা আপনাকে অবশ্যই যথাসম্ভব সাহায্য করব, সেনোরিটা। আমি নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন। এখন আপনি আবার শুয়ে পড়ুন। আপনার বিশ্রাম প্রয়োজন। আমদের সঙ্গে কিছু খাবার আছে, চিন্তা নেই। বৃষ্টি কমে এলে নৌকোতে যাব টোর্নাভিস্তা।”
তিনজন জুলিয়ানার শুশ্রূষায় তৎপর হয়ে ওঠে। একজন তার পিঠের থলে থেকে কাঠের পাত্র বার করে আর একটা পাত্রে কিছু অর্ধ-তরল পদার্থ ঢালতে থাকে। আর একজন জুলিয়ানকে কথা বলতে বারণ করে উঠে বসতে সাহায্য করে। ওরা নিজেদের মধ্যে স্থানীয় ভাষায় কথা বলে, যার অর্থ বেশিরভাগটাই জুলিয়ানের অজানা। তবে তিনজনেই ভাঙা ভাঙা স্প্যানিশ ভাষা বলতে পারে এবং বুঝতে তো পারেই। জুলিয়ানকে ওরা তরল খাবারটা খেতে দিয়ে বলে, “চট করে এটা খেয়ে ফেলুন, গায়ে বল আসবে।”
খাদ্যবস্তুটা কী না জেনেই সে চোঁ চোঁ করে গিলতে থাকে। তবে স্বাদে বুঝতে পারে যে এটা হচ্ছে ফেরিনা। ম্যানিওক বা কাসাভার ময়দা ভেজে চিনি আর গুড় মিশিয়ে অনেকটা পরিজের মতো করে রান্না করা হয়। উপজাতির লোকেরা খুব পছন্দ করে। গরিব মানুষের সহজলভ্য খাদ্য। ইচ্ছে করলে জুলিও জঙ্গলে মাটির নীচ থেকে খুঁড়ে কাসাভা বার করে খেতে পারত। কিন্তু বাবার কাছে শোনা, কাসাভা ভালো করে ছাল ছাড়িয়ে না খেতে পারলে বিষাক্ত হতে পারে, যার ফলে পেটের অসুখ করে মৃত্যু হওয়াও অসম্ভব নয়। পাত্রের সবটা খাবার জুলি চেটেপুটে খেয়ে নেয়। এখন তার চোখে ঘুম আসছে আবার।
“আমি কার্লোস, এ হচ্ছে বেলত্রান আর ও হচ্ছে নেস্তর।” এবার আলাপ জুড়ে দেয় সেই লোকটা, যে ওকে খাবার খেতে দিল।
জুলি হেসে মাথা ঝোঁকায় কৃতজ্ঞতায়। এখন তার অনেক ভরসা মনে।
“আপনারা কেউ প্লেন ভেঙে পড়ার খবর জানেন?” জিজ্ঞেস করে জুলিয়ান।
“পেরুতে কার আর জানতে বাকি আছে। না, এখনও প্লেনের কোনও হদিস পাওয়া যায়নি। আপনি ঠিক কোথায় পড়ে গিয়েছিলেন জানলে হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে।”
কার্লোসের কথায় আগ্রহী হয়ে জুলিয়ান আবার প্রশ্ন করে, “কাউকে খুঁজে পাওয়া গিয়েছে?”
“না, সেনোরিটা। আপনাকে এই আমরা খুঁজে পেলাম। আপনার পরনের পোশাকটা ছিঁড়ে গিয়েছে। আমাদের শার্ট আর প্যান্ট আছে থলেতে, ইচ্ছে হলে বদলে নিতে পারেন। বৃষ্টি ধরে গিয়েছে, আমরা একটু নৌকোটা দেখে আসি।”
অস্বস্তি হলেও নিজের ময়লা ছেঁড়া পোশাক বদলে উপজাতি লোকটার দেওয়া পোশাক পরে নেয় জুলি। হাতের ক্ষত থেকে রক্ত ঝরছে। ওরা তিনজন ফিরে আসতেই সে নিজের ক্ষতের কথা জানিয়ে দেয়। গ্যাসোলিন ব্যবহার করে সাবধানে খুঁচিয়ে লার্ভা বার করতে থাকে নেস্তর। এখন ওরা জুলির সঙ্গে ব্যবহারে সহজ হয়ে গিয়েছে আরও। তাই নেস্তর বলে, “আমি তো প্রথমে আপনাকে দেখে ভেবেছিলাম ইয়াকুমামা। তাই ভয়ে পালাচ্ছিলাম আবার জঙ্গলে।”
“সে কে?” হাতের যন্ত্রণা সহ্য করতে করতে জুলিয়ান জিজ্ঞেস করে।
“তিনি হচ্ছেন জলের দেবী। খুব রাগ তাঁর। আপনার মতোই তাঁর চুল সোনালি, গায়ের রঙ সাদা, আমাদের মতো কালো নয়।” কথায় ভুলিয়ে নেস্তর জুলির ক্ষত থেকে পোকা বার করতে থাকে।
“আচ্ছা, যদি দেবী হতাম, তবে তো আপনাদের আশীর্বাদ করতাম, তাই না? আপনারা আমার জীবন বাঁচিয়েছেন!”
জুলির কথায় হেসে ওঠে নেস্তর।— “যদি আমরা না এসে পড়তাম, তা হলে খুব বিপদ হত আপনার। বৃষ্টিটা এসে গেল, আর তাইতে আমরা ঠিক করলাম তাঁবুটার কাছে গিয়ে একটু বিশ্রাম নেওয়া যাক। আমরা তো জঙ্গলে কাঠ কেটে গ্রামে পৌঁছে দিই।”
“কোন কাঠ? মেহগনি? আমাদের বাড়িতেও সব আসবাবপত্র ওই কাঠেই তৈরি।”
ওদের কথাবার্তার মধ্যেই দুজন ফিরে আসে জঙ্গলের দিক থেকে, সঙ্গে আরও দুইজন কাঠুরে। কিন্তু সবাই এসে পড়লেও নদীপথে যাত্রা মুলতুবি রাখতে হয়, প্রবল বর্ষণ হতে থাকে বজ্রবিদ্যুৎ-সহ। ওরা পাঁচজন নিজেদের মধ্যে গল্প করতে থাকে। জুলি বৃষ্টির আওয়াজ শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ে তালপাতার বিছানায়।
নদীর নাম রিও সেবোনিয়া। জুলিয়ান নৌকোতে শুয়ে পাড়ি দিচ্ছে জনপদের দিকে। তার সঙ্গী হয়েছে পেরেইরা আর রিভেরা। প্রথম তিন ব্যক্তি জুলিকে নৌকোতে শুইয়ে দিয়ে জঙ্গলে ফেলে রাখা কাজ সম্পন্ন করতে থেকে গিয়েছে। একটা রাত তাদের সবাইকে কুটিরেই কাটাতে হয়েছে অঝোর বৃষ্টির কারণে। এখন নদীতে প্রবল স্রোত। পেরেইরা এবং রিভেরা দক্ষ নৌকো চালক। ওদের কাছে জানা গিয়েছে, একজনও প্লেনের যাত্রীকে এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি। জুলিয়ান ভারক্রান্ত মনে শুধু মায়ের কথাই ভেবে চলে। কিন্তু শরীর হাল ছেড়ে দিয়েছে যেন। কখনও সে আছন্ন হয়ে যাচ্ছে অবসাদে, কখনও নির্লিপ্তভাবে জঙ্গল দেখছে চারপাশে। নেস্তর গতকাল জানিয়েছিল, জুলি যেখানে প্লেন থেকে পড়ে যায়, সেখানে আজ অবধি মানুষের পা পড়েনি। ওদিকে নদী সরু বলে কেউ যায় না। আমাজনের দশ শতাংশ অঞ্চলেও মানুষ পা রাখতে পারেনি, জুলিয়ান জানে।
টোর্নাভিস্তা গ্রামের কাছে এসে নৌকো বাঁধা হল পাড়ে। একটা দড়ির মাচা এনে শুইয়ে দেওয়া হল জুলিয়ানকে। ও যে হাঁটতে পারবে, সেই কথায় কেউ পাত্তা দিল না। একটা বাড়ির সামনে আসতেই জুলিয়ানকে দেখে ছুটে পালাতে লাগল সবাই। জানা গেল, জুলিয়ানের চোখ দুটো ফুলে এতটাই লাল হয়ে গিয়েছে যে ওকে দেখে জঙ্গলের প্রেতাত্মা বলে ভয় পাচ্ছে সবাই। একটা আয়না নিয়ে এসে পেরেইরা জুলিকে নিজের মুখ দেখিয়ে দিল হাসতে হাসতে। জুলির আদৌ হাসি পাচ্ছে না। এখন বাবা আর মায়ের কাছে যাবার জন্য ওর মন ছটফট করছে।
নদীর ধার ছাড়িয়ে স্ট্রেচারে শুইয়ে জুলিয়ানকে আনা হল এক চিকিৎসালয়ে। তার আগমন বার্তা আগেই কী করে যেন রটে গিয়েছিল। নার্স ছুটে এসে প্রথমেই তাকে একটা ইঞ্জেকশন দিল পেটে। কোথা থেকে ছুটে এসে এক ফটোগ্রাফার খচখচ করে জুলিয়ানের ছবি তুলতে শুরু করল। স্নান করিয়ে তাকে স্যুপ খেতে দেওয়া হল। জুলিয়ানের পেট ভার, সে কিছুতেই স্যুপ গলা দিয়ে নামাতে পারল না। স্নান করানোর জন্য এক সহায়িকা এসে তাকে যত্ন করে শরীর পরিষ্কার করতে লাগল। তাকে বলা হল, এখানে ডাক্তার নেই, তাই হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হবে তাকে।
খবর এল, জুলিয়ানের আরোগ্যের জন্য তাকে নিয়ে যাওয়া হবে ইয়ারিনাকোচা ইন্সটিটিউট অফ হেলথে। সেই যাত্রা করতে হবে ছোট্ট একটা প্লেনে। প্লেনে চড়তে হবে জেনে প্রবল আপত্তি জানাতে লাগল জুলিয়ান। প্লেন থেকে পড়ে যাবার ভয় সে সহজে কাটিয়ে উঠতে পারবে না বলেই মনে হল। প্লেনের পাইলট জেরি কব একজন দক্ষ মহিলা পাইলট। তিনি মাহাকাশ যাত্রার জন্য মনোনীত হয়েছেন শুনে নিমরাজি হয় জুলিয়ান।
সারাটা রাস্তা আকাশপথে শুয়ে থাকল জুলিয়ান। কুড়ি মিনিটের যাত্রা যেন অনন্তকালের জন্য বলে মনে হল তার। প্লেন থেকে নামতেই অ্যাম্বুলেন্স ছুটে এল। অসংখ্য সাংবাদিক এবং সামরিক বাহিনীর লোক ততক্ষণে পৌঁছে গিয়েছেন সেখানে। সেদিন সকালেই ফলাও করে সব সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় জুলিয়ানের ছবি-সহ খবর ছেপেছে। একটা সংবাদপত্রে জুলিয়ানের প্রথম মিথ্যে সাক্ষাৎকার পর্যন্ত ছেপে গিয়েছে। জুলিয়ান নাকি নিজেই আমাজনের জঙ্গলে নৌকো বানিয়ে নদীপথ পার হয়ে নিজেকে বাঁচিয়েছে। জুলিয়ানকে কৌতূহলী জনতার হাত থেকে কোনোক্রমে বাঁচিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল।
জুলিয়ানের হাতের ক্ষত প্রায় ফুট খানেক ভিতর অবধি চলে গিয়েছে। মিশনারি ডাক্তাররদের একটি বিশেষ দল তৈরি হল তার চিকিৎসার জন্য। কড়া ঘুমের ওষুধের ইঞ্জেকশন দিয়ে জুলিয়ানকে ঘুম পাড়িয়ে তার সারা শরীরের ক্ষত মেরামতের কাজ শুরু করলেন ডাক্তাররা। জুড়ে দেওয়া হল ভাঙা কলার বোন। হাঁটুর ক্ষত থেকেও কিছু লার্ভা বার করা হল। সারা শরীরে তার কীটপতঙ্গের দংশনজাত ক্ষত সারিয়ে তোলার কাজ শুরু হল।
গভীর ঘুমের মধ্যে জুলিয়ান পরিষ্কার যেন দেখতে পেল কেমন করে সে শূন্যে ভাসতে ভাসতে আমাজনের জঙ্গলে পড়ে যাচ্ছে। সিট-সহ জুলিয়ান বনবন করে ঘুরছে হাওয়ায়। কানের মধ্যে শোঁ শোঁ আওয়াজ। বৃষ্টির ফোঁটা ধারালো ছুরির মতো বসে যাচ্ছে গালে, চোখে, মুখে। যেন কোনও লাট্টুর মাথায় বসে তীব্র বেগে পাক খেয়ে চলেছে জুলিয়ান। আকাশের সামান্য আলোয় আর বিদ্যুতের ঝলকানিতে এক-একবার নীচের সবুজ গালিচার মতো জমি দেখা যাচ্ছে। সে পড়ে গিয়েছে প্লেন থেকে। আকাশে হাওয়ায় ভাসছে। শক্ত মুঠিতে জুলিয়ান চেপে ধরল সিটের হাতল। বনবন ঘোরা তাতে থামল না। হঠাৎ নীচ থেকে সিটটাকে কে যেন জোরে আকশের দিকে ঠেলে দিল। ওপরে উঠে যাচ্ছে সে। আবার হাওয়ার টানে নীচে নেমে আসছে সজোরে। নীচের দৃশ্য দেখে মনে হচ্ছে যেন জুলিয়ান নেমে যাচ্ছে বিশাল এক ব্রকলির ভিতরে। তারপর ঝাঁকুনি খেল শরীর। অন্ধকার হয়ে গেল চারদিক।
“মিস কোপকে, মিস কোপকে, আপনি আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন?” অন্ধকারের মধ্যে থেকে কে যেন বলে উঠল। জুলিয়ানের চোখে অস্পষ্ট একটা ছবি ফুটে উঠছে। সাদা দেওয়াল, কে যেন তার মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে তাকিয়ে রয়েছে। শুধু মাথাটাই ধীরে ধীরে জেগে উঠছে, তার যেন শরীর বলে কিছুই নেই। সাদা অ্যাপ্রন পরা একজন তরুণ, চোখে চশমা, গালে সামান্য দাড়ি।
“আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন, মিস কোপকে? আমি ডক্টর… আপনি নিরাপদ। আমি আপনাকে উঠে বসতে সাহায্য করছি।”
একজন মহিলা নার্স এবং ডাক্তার মিলে জুলিয়ানকে বসিয়ে দিয়ে হাতল ঘুরিয়ে বিছানার মাথার দিক তুলে দেয় ওপরে। এবার জুলি বুঝতে পারে, জঙ্গলে নয়, সে রয়েছে হাসপাতালের আরামদায়ক বিছানায়। হাতে তার স্যালাইনের নল। শরীরে নীচের দিক চাদর দিয়ে ঢাকা। চোখ মেলে সে এবার ডাক্তারকে দেখে হাসে।
“বাঁচালেন আমায়, ধন্যবাদ। এবার আপনি একটু স্যুপ খেতে পারেন। সিস্টার মেরি আপনাকে সাহায্য করবেন।” বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বরে ভরসার আভাস দেন ডক্টর।
“আমি কোথায়? আমার বাবা আর আমার মা?” দুর্বল গলায় এত আস্তে বলে জুলিয়ান যে প্রায় শোনা যায় না।
“সবাইকে দেখতে পাবেন। আপাতত আপনি পুয়ের্তো ইনকায় মিশনারি হাসপাতালে রয়েছেন।” জুলিয়ানকে আশ্বস্ত করে ডাক্তার প্রশ্ন করেন, “জঙ্গলে এগারোটা দিন এই পা নিয়ে হাঁটলেন কী করে? আমরা আপনার পায়ে ক্ষতের চিকিৎসা করছি, তাই এখন প্লাস্টার করা যাবে না। এক্স-রে করে দেখা গিয়েছে যে, আপনার হাঁটুর ভিতরে সামান্য ফ্র্যাকচার হয়েছে, একটা লিগামেন্টও ছিঁড়ে গিয়েছে। লম্বা বিশ্রাম নিলে আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে। তবে এই পা নিয়ে জঙ্গলে হাঁটা… একেবারে অকল্পনীয়! আপনার মনের জোর দেখে আমি অবাক হচ্ছি। তবে যদি না হাঁটতেন, আপনাকে বাঁচানো যেত না। গহিন জঙ্গল থেকে উদ্ধার হতেন কীভাবে?”
“আমার মা?” জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে জুলিয়ান।
ডাক্তার উঠে যান জানালার দিকে। তারপর বলেন, “উদ্ধারকার্য চলছে পুরো দমে। যে লোকটি আপনাকে নৌকোতে তুলে নিয়ে এসেছিল, তার দেখিয়ে দেওয়া পথ ধরে চলছে তল্লাশি। হেলিকপ্টার উড়ছে আকাশে। প্যারাট্রুপার নামানোর চেষ্টা চলছে। সামরিক বাহিনী জঙ্গলে ঢুকে পথ তৈরি করার জন্য পরিশ্রম করছে।”
একটু থেমে আবার ডাক্তার বলেন, “আমি ভাবছি, কেমন করে দুর্ভেদ্য আমাজনের জঙ্গল ভেদ করে আপনি পাড়ি দিয়েছিলেন এতটা পথ, তাও অভুক্ত অবস্থায়!” মাথা নাড়তে থাকেন ডাক্তার।
জুলিয়ান বোঝে, ঘোরের মধ্যে প্লেন থেকে পড়ে যাবার ঘটনা হুবহু তার মনে পড়ে গিয়েছে। সে নিশ্চিত, দৈববল নয়, বাতাসের চাপ এবং প্লেনের সিট তাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে নির্ঘাত মৃত্যুর হাত থেকে। ভেলায় ভাসার মতো সে আছড়ে পড়েছিল উঁচু উঁচু গাছের মাথায়। তারপর নিশ্চয় ডালপালায় ধাক্কা খেতে খেতে সে মাটিতে পড়ে গিয়েছিল। কাঁধ, হাত আর পায়ে চোট সেই কারণে। বামহাত দিয়ে স্পর্শ করে সে টের পায়, ডানহাত ব্যান্ডেজ করা। এখন আর সেখানে ব্যথা নেই।
দরজা ঠেলে ডক্টর হান্স উইলহেম কোপকে ঢুকে পড়েন ঘরে। বাবাকে দেখে চমকে ওঠে জুলিয়ান। এই কয়দিনে যে তাঁর ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে গিয়েছে, তা বলার অপেক্ষা থাকে না।
“কেমন বোধ করছ, জুলি? আমি আগেও এসেছি, তোমাকে ঘুমন্ত দেখে আবার ফিরে গিয়ে বসেছি বাইরে।” বলেন ডক্টর হান্স।
জুলিয়ান সামান্য ঘাড় নেড়ে জানায়, সে ভালো আছে। মায়ের সঙ্গে তার যতটা সখ্য, বাবার সঙ্গে নয়। হান্স স্বল্পভাষী। তাই আবেগের জায়গা নেই বাবা-মেয়ের মধ্যে। জুলিয়ান মায়ের কথা জিজ্ঞেস করলে ডক্টর হান্স বিষণ্ণ হয়ে পড়েন। প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে বলেন, “সবাইকে খোঁজা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু এলোপাথাড়ি হাতড়ে বেড়াচ্ছে ওরা। আর হয়েছে এই সংবাদপত্রের লোকেরা। এক মুহূর্ত স্বস্তি নেই। বাইরে গেলেই নানা প্রশ্ন করে ওরা পাগল করে দিচ্ছে। তোমার সাক্ষাৎকার নিতে হাসপাতালের বাইরে হত্যে দিয়ে পড়ে আছে তারা। ভরসা এটাই, সামরিক বাহিনীর যে কর্তা উদ্ধারকাজের দায়িত্বে আছেন, তাঁর নির্দেশে পুলিশ মোতায়েন করে হাসপাতালের ভিতরে ঢোকা নিষেধ করেছেন। তুমি বিশ্রাম নাও। আমি পরে আবার একবার ঘুরে যাব।”
বিরক্ত মুখে উঠে যান জুলিয়ানের বাবা। এই শহরে কেন, পুকাল্পাতেও কোনও হোটেলে জায়গা নেই মানুষের ভিড়ে। বিরানব্বই জন নিখোঁজ মানুষের পরিবারের অনেকেই উদ্বিগ্ন হয়ে নেমে পড়েছেন উদ্ধারকাজে। তাতে কাজ আরও পণ্ড হচ্ছে। পুয়ের্তো ইনকা একটা ছোট্ট শহর, এখানে খাবারের অভাব দেখা দিয়েছে ইতোমধ্যেই। বরাত জোরে এক পরিচিত মিশনারির বাড়িতে আশ্রয় পেয়েছেন হান্স। এখন মেয়েকে নিয়ে লিমাতে ফিরে গিয়ে প্রথম কাজ হবে জার্মানি ফিরে যাওয়া। ওখানে অধ্যাপনার কাজ পেতে তাঁর মতো বিজ্ঞানীর অসুবিধা হবার কথা নয়। স্ত্রী মারিয়া যে বেঁচে আছেন, বিশ্বাস করতে পারছেন না হান্স। মেয়ে জুলি বেঁচে গিয়েছে ভাগ্যক্রমে, এটাই তাঁর কাছে বড়ো পাওনা। পেরুর জঙ্গলে গবেষণা অনেক হয়েছে, এবার নিজের দেশে ফেরা।
আজ নিজেকে বেশ তরতাজা লাগছে জুলিয়ানের। এখানে সে যা চাইছে, তা-ই তাকে খেতে দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু বিছানা ছেড়ে ওঠা একেবারে বারণ। কতদিন যে হাসপাতালে থাকতে হবে, সে জানে না। সারাদিন নানা বই পড়ে সময় কেটে যাচ্ছে। খবরের কাগজ আসে সকালে। কাগজে জুলিয়ানের রোমাঞ্চকর জঙ্গল ভ্রমণের ঝুড়ি ঝুড়ি মিথ্যে কথা দিয়ে সাজানো কাহিনি ছাপা হওয়া বন্ধ হয়েছে। এখন উদ্ধারকাজের খবর ছাপছে পেরু সরকার। জুলিয়ান জানতে পেরেছে, হেলিকপ্টারে একজন দুঃসাহসী প্যারাট্রুপারকে জঙ্গলে নামানো হয়েছিল। সে-বেচারা হাত-পা ভেঙে হাসপাতালে শুয়ে আছে এখন। সিরা পর্বতের কাছ থেকে মিলিটারি দিয়ে জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করার কাজ চলছে। প্রায় দিন কুড়ি কেটে গিয়েছে। উদ্ধার হয়নি একজনও। কিন্তু জুলিয়ান বিখ্যাত হয়ে গিয়েছে বিশ্বজুড়ে। টেলিভিশনের পর্দায় নাকি তার ছবি বার বার দেখিয়ে সাহসিকতার অসামান্য গল্প শোনানো হচ্ছে। আজ নার্স এসে বলে গিয়েছে, লিমার পাইলটদের ট্রেনিং সেন্টারে জুলিয়ানের সাহসিকতার উল্লেখ করে তাদের উৎসাহিত করা হচ্ছে।
বিভিন্ন জায়গা থেকে জুলিয়ায়নকে লেখা এক বান্ডিল চিঠি পাশের টেবিলে পড়ে রেয়েছে। গত দুই-তিনদিন ধরে চিঠি পড়তে পড়তে সে হাঁপিয়ে উঠেছে। প্রথম প্রথম পড়লে মনে বল আসত। এখন উদাসীন হয়ে যাচ্ছে সে। একই প্রশংসাবাণী শুনে শুনে সে ক্লান্ত। নার্স হাসতে হাসতে জুলিয়ানকে জানান, এখন নাকি খামে ঠিকানা না লিখে শুধু জুলিয়ানের নাম দিলেও সোজা চিঠি চলে আসছে হাসপাতালে। এই ব্যাপারটায় গোটা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং মিশনারিরা খুব মজা পাচ্ছে।
আজ জুলিয়ানকে নার্স এসে জানালেন, জার্মানির স্টার্ন পত্রিকা থেকে দুইজন সাংবাদিক তার অনুমতি চেয়েছেন সাক্ষাৎকারের জন্য। ডক্টর হান্স লিখিতভাবে অনুমতি দিয়েছেন, কিন্তু জুলিয়ানের অনুমতি ছাড়া তাঁদের ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না।
এক মুহূর্ত বিষয়টা নিয়ে ভাবে জুলিয়ান। বাবা যখন অনুমতি দিয়েছেন এবং বাবা-মায়ের স্বভূমি জার্মানি থেকে সাংবাদিকরা আসছেন, সুতরাং সায় না দিলে অন্যায় করা হবে।
সাংবাদিকরা এসেই জার্মান ভাষাতে জুলিকে সম্ভাষণ করেন। সবিনয়ে জুলি জানায়, সে জার্মান ভাষা শুনে বুঝলেও শুধু স্প্যানিশ আর ইংরেজি ছাড়া অভ্যস্ত নয়। জার্মান ভাষায় প্রশ্ন এবং স্প্যানিশ ভাষায় উত্তর চলতে থাকে। নির্লিপ্তভাবে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি করতে থাকে জুলিয়ান। ফিরে যাবার সময় ওঁরা আগের দিনের স্টার্ন পত্রিকার একটা কপি জুলিকে দিয়ে যান।
ওঁরা চলে যাবার পর সে-কাগজের প্রথম পাতাতে দুইজন তরুণের ছবি দেখে চমকে ওঠে জুলি। এরাই সেই দুই আমেরিকান যুবক, যারা প্লেন ছাড়ার আগে জুলির সঙ্গে বাক্যালাপ জুড়ে দিয়েছিল। খবর পড়ে সে বুঝতে পারে, এদের দুজনের দেহ উদ্ধার করা হয়েছে আমাজনের জঙ্গল থেকে। এবার মায়ের জন্য তার চিন্তা হতে থাকে।
খবরের কাগজটা মেঝেতে ছুড়ে ফেলে দিয়ে টানটান হয়ে শুয়ে চোখ বন্ধ করে জুলিয়ান। নিজেকে সে জিজ্ঞেস করে, বড়ো হয়ে সে কী হতে চায়। মনে মনে সে স্থির করে ফেলে, উচ্চশিক্ষা নিতে সে প্রাণীবিজ্ঞানকেই বেছে নেবে বাবা-মায়ের মতো। তাকে পাঙ্গুয়ানাতেই গবেষণা করতে হবে। জঙ্গলকে এই প্রথম নিবিড় করে ভালোবাসতে থাকে জুলিয়ান।
দিনের পর দিন একই দৃশ্য দেখে দেখে জুলিয়ান ক্লান্ত। হাসপাতালের ঘরে শুয়ে কেটে গিয়েছে তিন-তিনটে মাস। আজ ডাক্তার তাকে সাহায্য নিয়ে ঘরের ভিতরেই হাঁটতে নির্দেশ দিয়েছেন। বিছানায় নিজে থেকে উঠে বসা কয়েকদিন হল সম্ভব হচ্ছে। নার্স মিষ্টি হেসে বলে গিয়েছেন, মনের জোর এনে মাটিতে পা রেখে উঠে দাঁড়াতেই হবে আজ। জুলিয়ান জানে, সে তা পারবে।
বিষণ্ণ মুখে ডক্টর হান্স কোপকে ঘরে ঢুকে চেয়ারে বসে পড়েন। এই দৃশ্যটা রোজ পুনরাবৃত্তি হয়, কিন্তু আজ ডক্টর হান্স মেয়েকে সুপ্রভাত পর্যন্ত জানাননি।
“কীরকম জুতো পরে তোমার মা প্লেনে উঠেছিল বলতে পারো, জুলি?” বাবার গলাটা প্রশ্ন করার সময়ে যেন ভেঙে যায়।
জুলি ভয় পায়। তারপর বলে, “সাদা রঙের সোনালি কাজ করা জুতো পরেছিল মা, সেই জুতোটা যেটা মা প্যারিস থেকে কিনে নিয়ে এসেছিল গতবছর। কেন এই প্রশ্ন করছ, বাবা?”
“তোমার মা আর নেই, জুলি। তার মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে জঙ্গল থেকে। গভীর বনের মধ্যে ক্ষতবিক্ষত তার শরীর…” কান্নায় ভেঙে পড়েন ডক্টর হান্স।
জুলিয়ান কোনোদিন জোরে কাঁদেনি। আজ ইচ্ছা করছে আকাশ বাতাস ফাটিয়ে সে চিৎকার করে ওঠে। শুধু অস্ফুটে বলে, “কিন্তু বাবা, সেই শরীর যে মায়ের, তুমি হলফ করে বলতে পারবে কি? আমিও জঙ্গলে একজনের মৃতদেহ দেখে তাকে মা বলে সন্দেহ করেছিলাম। আর মুখ দেখে কি কিছুই চেনা যাচ্ছে না যে তোমার সংশয় রয়ে যাচ্ছে?”
সজল নয়নে ডক্টর হান্স বলেন, “মাথার অংশ প্রায় নেই বললেই চলে। মারিয়ার পায়ের দুটো পাতাতেই মধ্যম আঙুল বুড়ো আঙ্গুলের চাইতে লম্বায় বড়ো ছিল। আমি তার পা দেখে দেহ শনাক্ত করেছি। সব শেষ হয়ে গেল, জুলি। পেরুতে বসবাস করার ইচ্ছে আমি আজ বিসর্জন দিলাম। নিজের দেশে ফিরে যাব। তুমিও চলো। আবার নতুন করে সব গড়ে তুলতে হবে।”
টেবিলে আগের দিনের স্টার্ন পত্রিকা হাতে তুলে নিয়ে বলে ওঠেন ডক্টর হান্স, “তোমার ছবি আর সাক্ষাৎকার সামনের পাতা জুড়ে ছিল কাল। পেরুর খবরের কাগজের লোকেরা খুব ক্ষুব্ধ হয়েছে। তারা প্রদর্শন করে বিক্ষোভ জানিয়েছে লিমার জার্মান দূতাবাসের সামনে। জার্মানির সংবাদমাধ্যম পেরুতে কেন বেশি গুরুত্ব পেল, সেই প্রশ্ন তুলেছে তারা। আজ তোমার মায়ের কফিন সংগ্রহ করতে গিয়ে আমার সঙ্গে রীতিমতো ধস্তাধস্তি হয়েছে ক্যামেরাম্যানদের। পারলে তারা যেন মারিয়ার কফিনটাই তুলে নিয়ে যায় ফরেনসিক করার জন্য।”
“মা এখন কোথায়, বাবা?”
“মর্গে শুয়ে ঘুমোচ্ছে। মাথা ছাড়া ঘুমোনো যায় কি না আমি অবশ্য জানি না। চলো যাই জুলি, দেশে ফিরে যাই ওকে নিয়ে।”
ঘাড় নেড়ে অসম্মতি জানায় জুলিয়ান, “না, বাবা। মা পেরুকে ভালোবাসত। মা এখানেই ভালো থাকবে।”
জুলি উঠে দাঁড়ায় সব ভুলে। ডক্টর হান্স তাকে জড়িয়ে ধরেন যাতে সে পড়ে না যায়। কিন্তু অজান্তেই আজ জুলিয়ানের শরীরে আসুরিক বল এসে গিয়েছে। হান্স নার্সকে ডাকেন। জুলি এক পা এক পা করে বাবার বাহুতে ভর করে এগোয়। তাকে সোজা হতেই হবে। মায়ের ফেলে রাখা কাজ শেষ করতে হবে। বাবার মতো একজন বিজ্ঞানীর পাশে থাকতে হবে মায়ের মতোই।
(সত্য ঘটনা অবলম্বনে লিখিত। ডক্টর জুলিয়ান কোপকে বর্তমানে পাঙ্গুয়ানা রিসার্চ স্টেশনের নির্দেশক। বাবা ও মায়ের পথে শিক্ষায় পা বাড়িয়ে তিনি প্রাণীবিদ্যায় পারদর্শী হয়ে ওঠেন। স্তন্যপায়ী প্রাণীদের ওপর তাঁর বহু মূল্যবান গবেষণা রয়েছে। বিশেষত বাদুড়দের ওপর নানা কাজ করে নতুন নতুন দিক তিনি উদ্ভাসিত করেছেন আমাদের কাছে।)
লেখকের অন্যান্য লেখা
শুভাঞ্জন ব্যানার্জী ▪ প্রবাহনীল দাস
লিও তলস্তয় ▪ নলিনাক্ষ ভট্টাচার্য
তাপস মৌলিক ▪ অংশু পাণিগ্রাহী ▪ বাণীব্রত গোস্বামী ▪অরিন্দম ঘোষ ▪ রঞ্জন দাশগুপ্ত ▪ সিদ্ধার্থ দাশগুপ্ত ▪শাশ্বত কর ▪ রাজীব রায় গোস্বামী ▪ সায়নদীপা পলমল ▪ প্রদীপ কুমার দাস
বদ্রীনাথ পাল ▪ তাপস বাগ ▪ বসন্ত পরামানিক ▪ গোবিন্দ মোদক ▪ সুব্রত দাস ▪ অর্ণব ভট্টাচার্য ▪ সুজাতা চ্যাটার্জী ▪ মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় দাস ▪ মধুমিতা ভট্টাচার্য ▪ ড. রমলা মুখার্জী ▪ সনৎকুমার ব্যানার্জী ▪ বিদ্যুৎ মিশ্র ▪ রাজর্ষি মণ্ডল ▪ রূপালী মুখোপাধ্যায় ▪ শক্তিপদ পণ্ডিত ▪ শম্ভু সরকার ▪ সুব্রত চৌধুরী
অদিতি ভট্টাচার্য ▪ দীপঙ্কর চৌধুরী ▪ মৌসুমী রায় ▪ সবিতা রায় বিশ্বাস ▪ সহেলী রায় ▪ কিশোর ঘোষাল
অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায় ▪ অরিন্দম দেবনাথ ▪ কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায় ▪ দীপক দাস ▪ ড. উৎপল অধিকারী ▪ চন্দ্রানী মজুমদার
সায়ন্তনী পলমল ঘোষ ▪ সোমা দে ▪ শংকর লাল সরকার ▪ সন্দীপন সাহা
অলংকরণ
মায়াসখা নন্দী ▪ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ▪ একপর্ণিকা ক্রিয়েটিভস
কুড়ি জন দিকপাল বিজ্ঞানীর অসাধারণ কর্মকাণ্ড আর জীবনের গল্প। যে বিজ্ঞানীদের হাত ধরে সভ্যতা এগিয়ে গিয়েছে, কুসংস্কার আর অন্ধবিশ্বাসের ঢাকনা খুলে অনাবৃত হয়েছে বিজ্ঞানের সৌন্দর্য, যাঁদের আপসহীন জীবন সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে বিজ্ঞানের জয়ধ্বজা উড়েছে, তাঁদের জীবনের অন্যান্য দিকগুলোও তুলে ধরা হয়েছে এই বইতে।
নদীর স্রোত কি কথা বলে? বাতাস তার জবাব দেয়? ফুল বুঝি গাছের দুঃখের ধন? ঝরে যাওয়া পাতায় কোন ইতিহাস লেখা থাকে? হাজার হাজার মাইল সাঁতার কেটে বন্ধুর সঙ্গে দেখা করে যায় পেঙ্গুইন। নেকড়ে-মা দুধ দিয়ে বড়ো করে মানুষের সন্তান। শান্ত মাটির তলায় কোটি বছরের ঘুম ভেঙে ক্ষেপে ওঠে আগ্নেয় লাভা। তাকে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করে মেঘ-ভাঙা বৃষ্টি। নিরালা বনে পিউপার জাল ছিঁড়ে উড়ে যায় রঙিন প্রজাপতি। লক্ষ বছর আগে একজন দাগ কেটেছিল গুহার অন্ধকার দেয়ালে। দাগ হল ছবি, ছবি হল লেখা। চাপা থাকে আগামী দিনের জন্য। গম্ভীর হিমবাহ নিঃশব্দে নামে লঘু সঞ্চারে।