ছোটো গল্প
FREE SHIPPING IN INDIA
ছোটো গল্প
পুবের জঙ্গলের মধ্যে লুকিয়ে আছে নীতীশ, নগেন এবং আরও কয়েকজন। প্রত্যেকের কোমরে লুকানো আছে গুলিভরতি রিভলভার। উত্তেজনায় তারা ফুটছে। এতদিনের পরিকল্পনা কি আজ সফল হবে? জর্জকে কি আজ বাগে পাওয়া যাবে?
প্রদীপ কুমার দাস
প্রাককথন
বিংশ শতাব্দীর তিনের দশকের প্রথমার্ধ। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক যুগ সন্ধিক্ষণ। একদিকে গান্ধিজির অহিংস অসহযোগ আন্দোলন, অন্যদিকে বাংলার দিকে দিকে গজিয়ে ওঠা গুপ্ত সমিতি ‘বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স’-এর চোরাগোপ্তা আক্রমণ— এই দুইয়ের সাঁড়াশি চাপে ব্রিটিশ সামাজ্য নাজেহাল। মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন এবং জালালাবাদের মুক্তিযুদ্ধ স্বাধীনতাকামী মানুষের মনে জাগিয়ে দিয়েছে অদম্য আগুন। দেশমাতাকে স্বাধীন করার জন্য কে আগে প্রাণদান করবে, তার জন্য হুড়োহুড়ি পড়ে গেছে।
বিপ্লবের আঁতুড়ঘর হল মেদিনীপুর জেলা। ১৯৩০ থেকে ১৯৩৩ সালের মধ্যে বিপ্লবীদের হাতে নিহত হয়েছেন বেশ কিছু ব্রিটিশ অফিসার। যার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরপর দুজন জেলাশাসক— জেমস প্যাডি এবং রবার্ট ডগলাস। পরিস্থিতি এমন যে ব্রিটিশরাজ মেদিনীপুরে কাউকে জেলাশাসক হিসেবে পাঠাতে সাহস পাচ্ছে না। অবশেষে একজন প্রাক্তন সৈনিক রাজি হলেন মেদিনীপুরে জেলাশাসকের দায়িত্ব নিতে। তাঁর নাম বার্নার্ড বার্জ। বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সের মেদিনীপুর শাখা সঙ্গে সঙ্গে ঠিক করে নিল এঁকেও পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে হবে। এই সময়েই আমাদের কাহিনি শুরু হচ্ছে।
১
ঝড়ের গতিতে সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে সতীশ। তার বয়স সতেরো। সে মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র। এই সাইকেলটা সতীশের দাদা নীতীশের। নীতীশ মেদিনীপুর কলেজে পড়ত। গত একবছর নীতীশ বাড়িতে ছিল না। তাদের বাবা ক্ষিতীশবাবু তাকে বালেশ্বরে মামার বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। সতীশ শুনেছে, দাদা ‘স্বদেশী করে’। এই শব্দটার সঠিক অর্থ তার জানা না থাকলেও এটা জানে যে স্বদেশীরা ইংরেজদের ভারতবর্ষ থেকে তাড়াতে চায়। আর সেজন্য তারা ইংরেজদের হত্যা করতেও পিছুপা নয়। সতীশদের স্কুলের শিক্ষক নিবারণবাবু তাদের বুঝিয়েছেন যে ইংরেজরা অন্যায়ভাবে আমাদের দেশটা কব্জা করে আছে। তাদের কাছে সৈন্যসামন্ত, পুলিশ, অস্ত্রশস্ত্র সব আছে। তার জোরে তারা ভারতীয়দের মাথায় চেপে বসেছে। তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য, এ দেশকে শোষণ করে নিজেদের সমৃদ্ধ করা। প্রত্যেক ভারতবাসীর উচিত ইংরেজদের প্রতিহত করা। স্যার তাদের গান্ধিজির কথা বলেছেন। গান্ধিজি অহিংস পথে দেশকে স্বাধীন করার জন্য লড়াই করছেন। অন্যদিকে স্বদেশীরা বিশ্বাস করে সশস্ত্র আন্দোলনে। নীতীশ এই আন্দোলনের একজন সৈনিক।
গতকাল গভীর রাতে সতীশের ঘরের জানালায় ঠকঠক আওয়াজ শুনে তার ঘুম ভেঙে গেছিল। একটু অবাক হয়ে ও জানালাটা খুলতেই একটা চাপা গলা শুনতে পেল, “সতে, আমি দাদা। খিড়কির দরজাটা খুলে দে। দেখিস যেন শব্দ না হয়। চাকরবাকররা টের না পায়।”
সতীশ হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল। দাদা তো বালেশ্বরে মামাবাড়ি গিয়েছিল। সেখান থেকে এত রাতে কীভাবে এল? কিন্তু পরক্ষণেই চটক ভেঙে সে দৌড় লাগাল। গোটা বাড়ি ঘুমে আচ্ছন্ন। সে সন্তর্পণে খিড়কির দরজাটা খুলে দিল। নীতীশ বাইরেই অপেক্ষা করছিল। সে চট করে ঢুকে দরজাটা লাগিয়ে দিল। তারপর ভাইয়ের হাত ধরে তার ঘরে চলে এল।
সতীশ হ্যারিকেনের আলোটা একটু উসকে দিল। নীতীশ বিছানায় বসে হাঁপাচ্ছিল। তার পরনের পোশাক ধূলিধূসরিত। মাথায় লম্বা লম্বা চুল। একমুখ দাড়িগোঁফ। সতীশ লক্ষ করল, দাদা অনেক রোগা হয়ে গেছে।
নীতীশ বলল, “এক গ্লাস জল দে।”
সতীশ তাড়াতাড়ি কুঁজো থেকে গ্লাসে জল ঢেলে দিল। নীতীশ ঢকঢক করে জলটা খেয়ে একটা শ্বাস ফেলল। তারপর হাসিমুখে সতীশের হাতটা টেনে ধরে ওর গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “কেমন আছিস রে, সতে?”
“ভালো। তুমি কেমন আছ, দাদা? এত রাতে কোথা থেকে এলে?”
“সে অনেক কথা। তিনদিন আগে বালেশ্বর থেকে বেরিয়েছি। বেশিরভাগ পথ পায়ে হেঁটেই পেরিয়েছি। দিনের বেলাটা কোনও জঙ্গলে লুকিয়ে থেকে রাতে পথ হেঁটেছি। আজকে সন্ধে থেকে হেঁটে এসে এই কিছুক্ষণ আগে এখানে এসে পৌঁছেছি।”
সতীশ অবাক হয়ে বলল, “তুমি সেই মামাবাড়ি থেকে এতটা পথ পায়ে হেঁটে এসেছ?”
নীতীশ বলল, “তাতে কী হয়েছে? আমার খুব হাঁটার অভ্যেস আছে। তাছাড়া দেশমাতার স্বাধীনতার জন্য আমাদের অনেক পথ হাঁটতে হবে রে, সতে।”
শেষ কথাটা বলার সময় নীতীশের গলা ধরে এল। পরক্ষণেই সে হেসে বলল, “অবশ্য মাঝে-মধ্যেই মনে হচ্ছিল, ইশ্! সাইকেলটা যদি থাকত তাহলে বোঁ করে চলে আসতাম।”
সতীশ উৎফুল্ল হয়ে বলল, “তোমার সাইকেলটা একদম ঠিক আছে, দাদা। জানো, আমি এখন ফুল প্যাডেল সাইকেল চালাতে শিখে গেছি।”
নীতীশ হেসে ভাইয়ের চুলগুলো ঘেঁটে দিল। তারপর বলল, “যা, মা-বাবাকে ডেকে নিয়ে আয়। দেখিস কেউ টের না পায়।”
সতীশ তারপর মা-বাবাকে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে এসেছিল। মা রান্নাঘর থেকে ঝুড়ি চাপা দিয়ে রাখা ভাত-ডাল এনে দিয়েছিল। নীতীশ হাপুসহুপুস করে তা খেয়েছিল।
ঠিক হয়েছে নীতীশ এখন ওর ঘরেই থাকবে। বাইরে বেরোবে না। সে-ঘরে চাকরবাকর কেউ যাবে না। কোনোভাবেই বাইরের লোক যেন জানতে না পারে ও ফিরে এসেছে। কারণ, এ-দেশের অনেক মানুষই ইংরেজ প্রভুদের নেকনজরে পড়ার জন্য চরের কাজ করে।
শুতে যাওয়ার আগে নীতীশ সতীশকে বলেছিল, “তোকে দুটো কাজ করতে হবে রে, সতে।”
“কী কাজ, দাদা?”
“কাল সকালে তুই নগেনদাকে গিয়ে খবর দিবি যে আমি এসেছি। নগেনদা যেন দলের সবাইকে জানিয়ে দেয় আর একটা মিটিং ডাকে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাদের আবার কাজে নেমে পড়তে হবে।”
সতীশ সোৎসাহে বলেছিল, “ঠিক আছে, দাদা। আর কী কাজ?”
“আর…” নীতীশ একটু ইতস্তত করে বলেছিল, “এই দুটো তোকে লুকিয়ে রাখতে হবে। যেন কারও চোখে না পড়ে।” এই বলে সে কোমরের গেঁজ থেকে দুটো রিভলভার বের করে সতীশের হাতে দিয়েছিল।
এই প্রথম সতীশ রিভলভার দেখল। রিভলভারের ইস্পাতের শীতল স্পর্শ ওর সারা শরীরে রোমাঞ্চের ঢেউ খেলিয়ে দিল। ও কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, “এগুলোতে গুলি ভরা আছে?”
নীতীশ হেসে বলেছিল, “না। গুলি ভরা থাকলে তোর হাতে দিতাম না। এখন বল এগুলো কোথায় রাখা যায়?”
সতীশ বলল, “কিছু চিন্তা কোরো না, দাদা। আমি এগুলোকে ধানের গোলার পিছনে লুকিয়ে আসছি। কেউ টের পাবে না।”
নীতীশ তারপর ঘুমিয়ে পড়েছিল।
২
পরিত্যক্ত বুড়ো শিবমন্দিরের বারমন্দিরে একটা কেরোসিনের টেমি জ্বলছে। নোংড়া মেঝেতে কয়েকটা ছেঁড়া মাদুর পাতা। মন্দিরের জায়গায় জায়গায় ইট খসে পড়েছে। জায়গাটা সাপখোপের আড্ডা। মানুষ পারতপক্ষে এদিকে আসে না। আর সে কারণেই নীতীশরা তাদের মিটিংয়ের জন্য এই জায়গাটাকে বেছে নিয়েছে।
রাত প্রায় দশটা। একে একে সবাই এসে হাজির হল— নগেন, নিবারণ, প্রাণকৃষ্ণ, সমীরণ— মোট বারোজন। নিকোলাস নিধনের পরে এই প্রথম মিটিং হচ্ছে। এতদিন সবাই দৈনন্দিন কাজে নিয়োজিত থাকলেও ভিতরে ভিতরে ফুটছিল। কখন ডাক আসবে এবং ওরা আবার আসল কাজ, অর্থাৎ দেশমাতৃকাকে স্বাধীন করার কাজে নেমে পড়বে, এই অপেক্ষায় ছিল। এতদিন তাদের নেতা নীতীশ উপস্থিত ছিল না বলে ওরা একটু দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। এখন নীতীশ ফিরে আসায় ওদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনার সঞ্চার হয়েছে।
চৈত্র মাস। গতকাল সন্ধের মুখে কালবৈশাখীর ঝড়বৃষ্টি হয়েছিল বলে আবহাওয়া ততটা গরম নয়। পোড়ো মন্দিরের ভিতরে টিমটিমে আলোয় বারোটা মাথা সামনের দিকে ঝুঁকে আলোচনা করছিল।
নগেন বলল, “নীতীশ, তুমি ফিরে এসেছ, আমরা সবাই যে কী খুশি হয়েছি তা বলার নয়। তোমার খবর বলো।”
নীতীশ বলল, “আমারও তোমাদের সবাইকে কাছে পেয়ে খুব ভালো লাগছে। তোমরা কেমন আছ?”
“ভালো। তুমি এতদিন কি বালেশ্বরেই ছিলে?”
“মাঝে-মধ্যে থাকতাম। বাকি সময় কলকাতা, ঢাকা, বর্ধমান—সব জায়গায় ঘুরে বেরিয়েছি।”
নিবারণ আগ্রহ নিয়ে বলল, “দেশের খবর বলো, নীতীশ। ইংরেজ রাজত্বে খবরের কাগজের উপরেও বিধিনিষেধ। তাদের বিরুদ্ধে কোনও খবরই পাওয়া যায় না।”
“খবর খুব উৎসাহজনক। দিকে দিকে মানুষ জেগে উঠছে। জেলায় জেলায় আমাদের ভাইবোনেরা গুপ্ত সমিতি গড়ে অস্ত্র প্রশিক্ষণ করছে। যে-কোনো সময় তারা ইংরেজদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। স্বাধীনতা আসতে আর দেরি নেই। এই সময়ে আমাদের বসে থাকলে চলবে না। আমাদেরও ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।”
সবাই একসঙ্গে বলে উঠল, “আমরা প্রস্তুত।”
নীতীশ জিজ্ঞেস করল, “এদিকের কী খবর, নগেনদা?”
নগেন মাথা নেড়ে বলল, “খবর ভালো। ক্যাডি আর নিকোলাসকে মারার পর ইংরেজ ভয় পেয়ে গেছে। মেদিনীপুরে আর কাউকে ম্যাজিস্ট্রেট করে পাঠাতে সাহস পাচ্ছিল না। কিন্তু সম্প্রতি জর্জ নামে একজন নতুন ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে এসেছেন। বাংলার গভর্নর নিজে এসেছিলেন জর্জকে নিয়োগ করতে। টাউন হলে একটা সভা করেছেন। সেখানে তিনি আমাদের উদ্দেশে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন।”
নীতীশ হেসে বলল, “বেশ, আমরা সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলাম।”
নিবারণ বলল, “এবারে কাজটা কিন্তু সহজ হবে না। জর্জ নিজেকে নিরাপত্তা বলয়ে মুড়ে রেখেছেন। ওঁর বাংলোর সঙ্গেই অফিস। সেখানে দিনরাত অষ্টপ্রহর সশস্ত্র রক্ষী পাহারা দেয়। জর্জ নিজে একদম বাইরে বেরোন না। কোনও সভা-সমিতিতে যান না।”
নীতীশ একটু ভেবে বলল, “কাজের লোকজন?”
“সেখানেও শক্ত গেরো। শুনেছি জর্জের মেমসাহেব নিজে সব দেখাশোনা করেন। সব কাজের লোকদের তিনি নিজে সাক্ষাৎকার নেন। তাতে সন্তুষ্ট হলে তবেই কাজে নিয়োগ করেন। কিন্তু কাউকেই জর্জের কাছে ঘেঁষতে দেন না।”
“হুম। কিন্তু কিছু তো একটা উপায় বের করতে হবে। তোমরা সবাই খোঁজখবর নিতে শুরু করো। জর্জ কবে কোথায় থাকবেন, সে-সব খবর আমাদের জানতে হবে। আমাদের পুরোনো সোর্সগুলো কাজে লাগাও।”
সবাই সম্মতিতে মাথা নাড়ল।
সমীরণ জিজ্ঞেস করল, “তোমার পরিকল্পনা কী?”
“খতম। জর্জকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। জর্জকে হত্যা করলে ইংরেজ আর কোনোদিন মেদিনীপুরে ম্যাজিস্ট্রেট পাঠাতে সাহস পাবে না। আর সেটা করতে হবে এক মাসের মধ্যে। সামনে এপ্রিল মাস। মনে আছে নিশ্চয়ই, এই এপ্রিল মাসেই আমরা আগের দুই ম্যাজিস্ট্রেটকে হত্যা করেছিলাম? এই এপ্রিলেই তৃতীয় হত্যাটা করতে হবে।”
নগেন বলল, “কিন্তু কাজটা করবে কে? আমরা সবাই ব্রিটিশ সরকারের সন্দেহভাজন। আমরা জর্জের ধারেকাছে ঘেঁষতে পারব না।”
নীতীশ চিন্তিত মুখে বলল, “জানি। আমাদের নতুন মুখ লাগবে, যাদের পুলিশ সন্দেহ করবে না।”
নিবারণ বলল, “এত তাড়াতাড়ি নতুন ছেলে খুঁজে, তাকে মোটিভেট করে, ট্রেনিং দিয়ে কি সবকিছু করা সম্ভব হবে?”
“করতে হবে, নিবারণদা। আপনি কলেজে খবর রাখুন। আমাদের অন্তত দুজন ছাত্র দরকার যারা দেশমাতার জন্য প্রাণ পর্যন্ত দিতে রাজি আছে।”
নগেন বলল, “আর অস্ত্র?”
“অস্ত্র আছে। আমি নিয়ে এসেছি। কিন্তু টোটা জোগাড় করতে পারিনি। অনুপম, তুই কলকাতা চলে যা। সেখান থেকে টোটা সংগ্রহ করে নিয়ে আয়। আমি বরং বরানগরের শ্যামলদার নামে একটা চিঠি দিয়ে দেব।”
“ঠিক আছে, দাদা।”
“আর সবাই মনে রেখো, মন্ত্রগুপ্তিই আমাদের সাফল্যের একমাত্র উপায়। কেউ যেন ঘুণাক্ষরেও কিছু টের না পায়।”
৩
নিজের ঘরে খাটের উপরে বসে গীতা পড়ছিল নীতীশ। তার ঊর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত। কাঁধের উপর থেকে পৈতে কোমর পর্যন্ত ঝুলছে। সে মেরুদণ্ড সোজা করে বসে ছিল। নগেন ঘরে এসে ঢুকল।
নীতীশ গীতা বন্ধ করে উঠে দাঁড়াল। বলল, “এসো, নগেনদা। বোসো।”
নগেন একটা কাঠের চেয়ারে বসল। তার মুখ গম্ভীর।
আষাঢ় মাস। বাইরে অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে। নগেন নিজেও ভিজে গেছে। সে ধুতির খুঁট দিয়ে মুখ মুছল।
নীতীশ বলল, “কী খবর বলো।”
নগেন বলল, “কী আর বলব। ছেলেরা হতাশ হয়ে পড়ছে। দু-দু’বার জর্জের উপর অ্যাটেমপ্ট নেওয়া হল। কিন্তু জর্জের কাছে পৌঁছানোই গেল না।”
নীতীশ মাথা নাড়ল।— “হরিসাধন আর প্রসূন পুলিশের চেনা। পুলিশ ওদের দেখেই সতর্ক হয়ে গেছিল। ভাগ্য ভালো ওদের কাছে কোনও অস্ত্র ছিল না। তাহলে এতক্ষণে ওদের আন্দামানে চালান করে দিত।”
“তুমি তো অস্ত্র দিতে চাওনি।”
“হ্যাঁ, নগেনদা। আমি দিইনি। আমি আন্দাজ করেছিলাম, এরকম কিছু ঘটতে পারে। তাই প্রথমেই ওদের সশস্ত্র অবস্থায় না পাঠিয়ে এমনি পাঠিয়েছিলাম। আমি দেখতে চাইছিলাম জর্জের নিরাপত্তা কতটা শক্ত। ভেবে দেখো, ওদের কাছে যদি পুলিশ অস্ত্র পেত, তাহলে এতক্ষণে ধরপাকড় শুরু হয়ে যেত।”
নগেন চুপচাপ শুনছিল। কিছু বলল না।
“তাছাড়া ভেবে দেখো। এখন পুলিশের মধ্যে একটা আত্মতুষ্টির ভাব আসতে পারে। ওরা ভাবতে শুরু করবে যে ওদের নিরাপত্তা বলয় কেউ ভেদ করতে পারবে না। আমাদের সেই সুযোগটা নিতে হবে।”
বেশ কিছুক্ষণ পরে নগেন মুখ খুলল।— “তোমার কথায় যুক্তি আছে। আমি খবর পেয়েছি, এপ্রিলের পর থেকে জর্জ কিছুটা বাইরে বেরোতে শুরু করেছেন। যদিও সবসময় সশস্ত্র দেহরক্ষী থাকে।”
নীতীশ উৎসাহিত হয়ে বলল, “এগজ্যাক্টলি। আমি সেটাই চাইছিলাম। এবার আমাদের সুযোগের অপেক্ষায় থাকতে হবে। জর্জের গতিবিধি সব পর্যালোচনা করে দেখতে হবে, কোথায় জর্জকে একা পাওয়া যায়। আচ্ছা নগেনদা, কখনোই কি জর্জের দেহরক্ষীরা ওঁর থেকে দূরে সরে না?”
নগেন কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল, “জর্জ লোকটা খেলাধুলো খুব ভালোবাসেন। নিজে ভালো ফুটবল খেলেন। এখন তো বর্ষাকাল। ফুটবলের সময়। ইংরেজ তরুণরা মাঠে ফুটবল খেলে। জর্জ কখনো-কখনো তাদের সঙ্গে খেলতে নেমে পড়েন। একমাত্র সেই সময় তাঁর দেহরক্ষীরা মাঠের ধারে অপেক্ষা করে।”
নীতীশের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে বলল, “এর থেকেই আমাদের উপায় বের করতে হবে। একটা ছিদ্র যখন পাওয়া গেছে, তখন সেই পথেই কালসাপ ঢোকাতে হবে। তুমি সতর্ক থাকো, নগেনদা।”
“সে থাকব। কিন্তু এবার কাদের পাঠাবে? নতুন ছেলে তো পাওয়া যাচ্ছে না। আর পুরোনোরা সবাই পুলিশের চেনা।”
“তুমি যে সেদিন মেদিনীপুর কলেজের একটি ছেলের কথা বলছিলে, গোপাল না কী নাম?”
“গোপাল রায়, দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। খুব মেধাবী। দেশের কাজ করার জন্য মুখিয়ে আছে। কিন্তু ওকে আরও ঘষামাজা করতে হবে।”
“সেটা করো। একদিন এখানেও নিয়ে এসো। আমি কথা বলব।”
“কিন্তু আর একজন? অন্তত দুজনকে তো পাঠাতেই হবে। যাতে একজন বিফল হলে আর একজন কাজটা করতে পারে। দ্বিতীয় কাউকে তো পাওয়া যাচ্ছে না।”
এতক্ষণে নীতীশের মুখেও চিন্তার ছায়া ঘনিয়ে এল। কথাটা সত্যি। এই মিশনে দ্বিতীয় একজন ছেলে দরকার।
হঠাৎ দরজায় একটা আওয়াজ হল। নীতীশ বলল, “কে?”
“আমি সতীশ, দাদা।”
“ও, সতে? দাঁড়া খুলছি।”
নীতীশ দরজা খুলে দিল। সতীশ ঘরের ভিতর ঢুকলে আবার দরজা বন্ধ করে দিল। নগেন সতীশকে দেখে একটু হাসল। সতীশ কিন্তু হাসল না। তার মুখ গম্ভীর।
নীতীশ বলল, “কী রে, সতে? কিছু বলবি?”
সতীশ কথা না বলে মুখ নীচু করে মেঝেতে পা ঘষতে থাকল।
নগেন বলল, “কী রে সতীশ, কী হয়েছে?”
এবার সতীশ ধীরে ধীরে মুখ তুলল। তারপর বলল, “আমাকে তোমাদের দলে নেবে?”
“মানে?” নীতীশ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
সতীশ বলল, “আমিও তোমাদের মতো দেশের জন্য কাজ করতে চাই। নিবারণ-স্যার আর দাদা, তোমাদের কাছে আমি শুনেছি আমাদের দেশ ভারতবর্ষ কত অভাগা। ইংরেজদের পরাধীনতার শিকলে বাঁধা। সেই শিকল কাটতেই হবে। দেশকে স্বাধীন করতেই হবে।”
নীতীশ প্রথমে কোনও কথা বলতে পারল না। সে নিজে দেশমাতার চরণে আত্মসমর্পণ করে দিয়েছে। কিন্তু তার কিশোর ভাই এই বিপদে জড়িয়ে পড়বে, এটা সে ভাবেনি। কিছুক্ষণ পর সে বলল, “আমি খুব খুশি হয়েছি সতে, যে তুই এতটা ভাবতে শিখেছিস। কিন্তু এখন তোর পড়াশোনা করার সময়। এখনই তোকে এসব কাজে জড়াতে হবে না।”
সতীশ একটু উত্তেজিত হয়ে বলল, “তোমার কথা ঠিক, দাদা। কিন্তু বলো তো আমরা কী পড়াশোনা করব? বিদ্যালয়ে আমাদের দেশ, তার অতীত গৌরব কিছুই পড়ানো হয় না। ইংরেজরা তাদের সুবিধামতো পাঠক্রম ঠিক করে। এই শিক্ষার কী দাম? তাছাড়া তোমারও তো এখন কলেজে পড়ার বয়স। কিন্তু তুমিও তো তা না করে দেশের কাজে আত্মনিবেদন করেছ।”
নীতীশ একটু অসহিষ্ণু হয়ে বলল, “না, সতে। তুই যাই বল, তোর কথা আমি মানতে পারছি না।”
সতীশ না দমে বলে চলল, “আমার অপরাধ নিও না। আমি দরজার আড়াল থেকে তোমাদের কথা শুনছিলাম। আগেও শুনেছি। তোমরা ম্যাজিস্ট্রেট জর্জকে হত্যার পরিকল্পনা করছ। সেজন্য তোমাদের নতুন ছেলে দরকার। কিন্তু তা পাচ্ছ না। আমাকে দায়িত্ব দিয়ে দেখো। আমি ঠিক তোমাদের পরিকল্পনামাফিক কাজ করে দেব। আমি জর্জকে হত্যা করব।”
সতীশের কথা শুনে নীতীশ আর নগেন স্তম্ভিত হয়ে গেল। তারপর নীতীশ একটু রাগত স্বরে বলল, “অনেক হয়েছে, সতে। আমি এ-বিষয়ে আর কোনও কথা শুনতে চাই না। তুই এখন যা।”
সতীশ আহত মুখ নিয়ে ঘরের বাইরে চলে গেল।
নীতীশ তার খাটে বসে পড়ল। তার মনে চিন্তার ঝড়।
নগেন এতক্ষণ কোনও কথা বলেনি। এবার সে বলল, “একটা কথা বলব, নীতীশ?”
“বলো, নগেনদা।”
“কিছু মনে কোরো না। কিন্তু সতীশ যা বলল, তা কিন্তু সত্যি। আমি তো সতীশকে ছোটো থেকে চিনি। ও গড়পড়তা ছেলেদের মতো নয়। ওর সাহস আছে, শক্তি আছে, বুদ্ধি আছে। সবচেয়ে বড়ো কথা, ওর একটা বিশাল হৃদয় আছে। আমাদের দলে কিন্তু এরকম ছেলেই দরকার।”
“কিন্তু নগেনদা, ও আমার ভাই।”
“ঠিক সেজন্যই ও আরও উপযুক্ত। ওর মতো মোটিভেটেড ছেলে আমরা দ্বিতীয়টি খুঁজে পাব না।”
“ওর বয়সটা তোমার খেয়াল নেই, নগেনদা?”
“মানছি ও বয়সে ছোটো। কিন্তু ও হল আনকাট ডায়মন্ড। ওকে ঘষেমেজে নিলে ও বিদ্যুৎ ছড়াবে। আমি বলছি না ওকেই এই মিশনে পাঠাতে। আমরা অন্য ছেলে নিশ্চয়ই খুঁজে পাব। কিন্তু আমরাই যদি বাড়ির ছেলেকে এই মিশনে পাঠাতে ভয় পাই, তাহলে অন্যরা কীভাবে পাঠাবে? তুমি ভেবে দেখো। অন্তত আমরা সতীশকে তৈরি করে রাখতে পারি।”
৪
মেদিনীপুরের টাউন মাঠে আজ লোকে লোকারণ্য। এক প্রদর্শনী ম্যাচে আজ মুখোমুখি হতে চলেছে কলকাতার মহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব এবং মেদিনীপুর টাউন ক্লাব। টাউন ক্লাবের সব খেলোয়াড় ইংরেজ। মাঠের উত্তর আর দক্ষিণদিকে উৎসাহী জনতা জড়ো হয়েছে একটা উত্তেজক খেলা দেখার আশায়। পশ্চিমদিকে রাস্তা আর পূর্বদিকে জঙ্গল। খেলোয়াড়রা মাঠে ওয়ার্ম-আপ করছে। পূর্বদিকে মহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব এবং পশ্চিমদিকে টাউন ক্লাব। খেলা শুরু হতে আর বেশি দেরি নেই। মাঠের মাঝখানে রেফারি আর লাইনসম্যান দুজন দাঁড়িয়ে আছেন। কয়েকজন এ-দেশীয় ছেলেও মাঠের একপাশে খেলোয়াড়ের পোশাকে বল পেটাপেটি করছে। মাঠের চারপাশে খাকি উর্দি পরিহিত পুলিশের দল লাঠি হাতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পশ্চিমদিকে ম্যারাপ বাঁধা হয়েছে। সেখানে চেয়ারে বসে আছেন পুলিশের বড়ো কর্তা, সিভিল সার্জন ইত্যাদি গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। সবাই অপেক্ষা করছে প্রধান অতিথি ম্যাজিস্ট্রেট জর্জের আসার জন্য।
এদিকে পুবের জঙ্গলের মধ্যে লুকিয়ে আছে নীতীশ, নগেন এবং আরও কয়েকজন। প্রত্যেকের কোমরে লুকানো আছে গুলিভরতি রিভলভার। উত্তেজনায় তারা ফুটছে। এতদিনের পরিকল্পনা কি আজ সফল হবে? জর্জকে কি আজ বাগে পাওয়া যাবে?
এর আগে দুটো ফুটবল ম্যাচে জর্জ প্রধান অতিথি হিসেবে এলেও তার কাছে যাওয়া যায়নি। সে সবসময় দেহরক্ষী পরিবৃত হয়ে থেকেছে। কিন্তু আজ পরিস্থিতি অন্য। জর্জের অফিসে কাজ করেন সুনীলের কাকা অমলবাবু। সুনীল কৌশলে তাঁর কাছে খবর পেয়েছে যে আজ জর্জ নিজে টাউন ক্লাবের হয়ে খেলতে নামবেন। আর তাই যদি হয়, তাহলে সে-সুযোগ ফসকালে চলবে না।
অনেক ভেবেচিন্তে নীতীশ এই পরিকল্পনা করেছে। লোকভরতি মাঠের ভিতরে ঢুকে কেউ যে জর্জকে আক্রমণ করতে পারে, সেটা নিশ্চয়ই পুলিশ ভাবতে পারবে না। আর সেই সুযোগটাই নিতে হবে।
নীতীশের মনের মধ্যে চিন্তার ঝড় চলছে। যে ঝুঁকিটা সে নিয়েছে, তাতে কোনও ভুলচুক হলে নিজেকে সে কোনোদিন ক্ষমা করতে পারবে না। মা-বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারবে না।
অনেক কথাবার্তা তর্কবিতর্কের পর ঠিক হয়েছিল যে সতীশকে দলে নেওয়া হবে। নগেন গোপালকেও দলে টেনে এনেছিল। নীতীশ ঠিক করেছিল, দলে নিলেও সতীশকে সে এই মিশনে পাঠাবে না। দরকার হলে সে নিজে যাবে। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল সতীশ সবরকম পরীক্ষায় চমৎকার উতরে গেল। এমনকি অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সে রিভলভার চালানোয় দক্ষ হয়ে উঠল। এদিকে সময় চলে যাচ্ছিল। শোনা যাচ্ছিল, জর্জ বিলেতে ফিরে যাবেন। দলের সবাই নীতীশকে চাপ দিতে থাকল সতীশকে অ্যাকশনে পাঠানোর জন্য।
নগেন বলেছিল, “এটা মোটেই সুইসাইড মিশন হবে না। মাঠের মধ্যে জর্জকে গুলি চালালে লোকজনের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে যাবে। ওরা সেই সুযোগে পালিয়ে আসতে পারবে। আমরা পুবের জঙ্গলে অপেক্ষা করব। আমাদের হাতেও অস্ত্র থাকবে। কেউ ওদের পিছনে ধাওয়া করে এলে আমরাও গুলি চালাব। ওরা এসে পৌঁছলে আমরা সরাসরি ওদের উড়িষ্যায় পাঠিয়ে দেব। সে-ব্যবস্থাও করা হবে।”
দলের অন্যদেরও এই পরিকল্পনায় সায় ছিল। বিশেষত সতীশ নিজে এই মিশনের জন্য খুব উৎসাহী ছিল। সে নিজেও বলেছিল, “গুলি চালিয়েই আমরা দৌড়ে জঙ্গলের দিকে চলে যাব। কেউ আমাদের ধরতে পারবে না।”
ওদিকে গোপালও এই পরিকল্পনায় রাজি ছিল। সকলের মিলিত চাপে নীতীশকে রাজি হতে হয়েছিল।
সেইমতো পরিকল্পনা হয়েছে। টাউন ক্লাবের জুনিয়র ডিভিশনের দুজন খেলোয়াড়কে ভুলিয়ে-ভালিয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তাদের জায়গায় জার্সি গায়ে মাঠে নেমেছে সতীশ আর গোপাল। দুজনেরই জার্সির নীচে গামছা দিয়ে শরীরের সঙ্গে বাঁধা আছে দুটো লোডেড রিভলভার। ওরা এখন অন্যদের সঙ্গে ফুটবলে কিক মারছে। খেলোয়াড়রা সবাই সবাইকে চেনে না। তাই ওদের দেখে কোনও প্রতিক্রিয়া হয়নি।
বিকেল চারটে বাজল। আকাশে যথেষ্ট আলো থাকলেও মেঘ করে আছে। বৃষ্টি নামতে পারে। ঠিক এই সময় দেখা গেল পশ্চিমের ম্যারাপের পাশে একটা গাড়ি এসে থামল। সেটা থেকে নেমে এলেন ম্যাজিস্ট্রেট জর্জ। সঙ্গে দুজন দেহরক্ষী। জর্জের পরনে খেলোয়াড়ের পোশাক। জর্জকে দেখে সবাই উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। জর্জ প্রথমে ম্যারাপের নীচে বিশেষ অতিথিদের সঙ্গে করমর্দন করলেন। তারপর সবাই মাঠে নেমে এলেন খেলোয়ারদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্য।
সতীশ আর গোপাল অনেকক্ষণ ধরে বল পেটাপেটি করছিল। কিন্তু ওদের লক্ষ্য ছিল ম্যারাপের দিকে। ওরা দেখল জর্জ মাঠে নেমে এসেছেন, সঙ্গে অন্যান্য অতিথিরা। সতীশ চাপা স্বরে গোপালকে বলল, “গোপালদা, এই সুযোগ। কিক।”
গোপাল ফুটবলটায় একটা জোরে কিক করল। বলটা উড়ে গিয়ে পড়ল জর্জের ঠিক সামনে। সতীশ বলটা লক্ষ্য করে দৌড় লাগাল। সবাই ভাবল বাচ্চা ছেলেটা বলটা আনতে যাচ্ছে। জর্জ নিজেও থমকে দাঁড়ালেন। তাঁর মুখে হাসি। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সতীশ জর্জের সামনে পৌঁছে গেল। কিন্তু বলটা না তুলে সে জার্সির ভিতরে হাত ঢুকিয়ে বের করে আনল রিভলভার। উত্তেজনায় তার হাত কাঁপছিল। কাঁপা হাতেই সে গুলি চালাল। সবাই হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু গুলিটা জর্জের গায়ে লাগেনি। জর্জ প্রাণভয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে লাগলেন।
সতীশ দেখল, প্রাথমিক জড়তা কাটিয়ে সবাই হুড়োহুড়ি শুরু করেছে। পালাতে হলে এখনই পালাতে হবে। কিন্তু তাহলে জর্জ বেঁচে যাবেন। তাদের মিশন ব্যর্থ হবে। সে একবার মা-বাবা আর নীতীশদার মুখটা স্মরণ করল। তারপর ‘বন্দেমাতরম’ বলে জর্জের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল। সতীশের ধাক্কায় জর্জ মাটিতে পড়ে গেলেন। সতীশ রিভলভারের বাকি পাঁচটা গুলি জর্জের শরীরে সেঁধিয়ে দিল। ইতোমধ্যে জর্জের দেহরক্ষীরাও তাদের অস্ত্র বের করে এনেছে। তারা সতীশকে লক্ষ্য করে গুলি চালাতে শুরু করল। গুলিতে ঝাঁঝরা হওয়া সতেরো বছরের কিশোরের প্রাণহীন দেহ মৃত জর্জের শরীরের উপরে লুটিয়ে পড়ল।
ওদিকে গোপাল দেখল, সতীশ জর্জকে খতম করেছে। দেহরক্ষীরা তার দিকে অস্ত্র উঠিয়েছে। সে নিজের রিভলভার বের করে ফায়ার করতে শুরু করল। ততক্ষণে অন্যান্য ইংরেজ অতিথিরা নিজেদের অস্ত্র বের করে ফায়ার করতে শুরু করেছেন। গোপাল দেখল, সতীশ আর নেই। সে জঙ্গলের দিকে দৌড়াতে শুরু করল। কিন্তু বেশিদূর যেতে পারল না। তার পিঠে এসে পরপর কয়েকটা বুলেট বিঁধে গেল। সে মাঠের মাঝামাঝি জায়গায় মুখ থুবড়ে পড়ে গেল।
ওদিকে নীতীশরা গাছের উপর থেকে সবকিছুই দেখতে পাচ্ছিল। নীতীশ তাড়াতাড়ি গাছ থেকে নামতে যাচ্ছিল। বলল, “তাড়াতাড়ি! আমাদের ওদের সাহায্য করতে হবে।”
কিন্তু ওর সঙ্গীরা বাধা দিল। নগেন বলল, “পাগলামি কোরো না, নীতীশ। সতীশ আর গোপাল শহিদ হয়েছে। আমরা ওদের আর কোনও সাহায্য করতে পারব না।”
নীতীশের গলা আবেগে রুদ্ধ হয়ে আসছিল। সে অস্ফুটে বলল, “সতে, সতে…”
সকলে মিলে নীতীশকে টেনে নিয়ে চলল জঙ্গলের গভীরে।
বৃষ্টি নামল। মেদিনীপুর টাউন ক্লাবের মাঠের মাটি তিনজন মানুষের রক্তে লাল হয়ে উঠল। একজন অত্যাচারী ইংরেজের, আর দুজন ভারতমাতার বীর সন্তানের।
পরিশিষ্ট
১৯৩৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর মেদিনীপুরের ম্যাজিস্ট্রেট বার্নার্ড বার্জ এক ফুটবল মাঠে অনাথবন্ধু পাঁজা এবং মৃগেন্দ্রনাথ দত্ত নামে দুজন তরুণের হাতে নিহত হন। সেই ঘটনা অবলম্বনে এই গল্পটি রচিত। যদিও গল্পের খাতিরে চরিত্রদের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। গল্পে বর্ণিত ঘটনাবলি এবং কথোপকথন অনেকটাই কল্পিত।
শুভাঞ্জন ব্যানার্জী ▪ প্রবাহনীল দাস
লিও তলস্তয় ▪ নলিনাক্ষ ভট্টাচার্য
তাপস মৌলিক ▪ অংশু পাণিগ্রাহী ▪ বাণীব্রত গোস্বামী ▪অরিন্দম ঘোষ ▪ রঞ্জন দাশগুপ্ত ▪ সিদ্ধার্থ দাশগুপ্ত ▪শাশ্বত কর ▪ রাজীব রায় গোস্বামী ▪ সায়নদীপা পলমল ▪ প্রদীপ কুমার দাস
বদ্রীনাথ পাল ▪ তাপস বাগ ▪ বসন্ত পরামানিক ▪ গোবিন্দ মোদক ▪ সুব্রত দাস ▪ অর্ণব ভট্টাচার্য ▪ সুজাতা চ্যাটার্জী ▪ মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় দাস ▪ মধুমিতা ভট্টাচার্য ▪ ড. রমলা মুখার্জী ▪ সনৎকুমার ব্যানার্জী ▪ বিদ্যুৎ মিশ্র ▪ রাজর্ষি মণ্ডল ▪ রূপালী মুখোপাধ্যায় ▪ শক্তিপদ পণ্ডিত ▪ শম্ভু সরকার ▪ সুব্রত চৌধুরী
অদিতি ভট্টাচার্য ▪ দীপঙ্কর চৌধুরী ▪ মৌসুমী রায় ▪ সবিতা রায় বিশ্বাস ▪ সহেলী রায় ▪ কিশোর ঘোষাল
অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায় ▪ অরিন্দম দেবনাথ ▪ কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায় ▪ দীপক দাস ▪ ড. উৎপল অধিকারী ▪ চন্দ্রানী মজুমদার
সায়ন্তনী পলমল ঘোষ ▪ সোমা দে ▪ শংকর লাল সরকার ▪ সন্দীপন সাহা
অলংকরণ
মায়াসখা নন্দী ▪ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ▪ একপর্ণিকা ক্রিয়েটিভস