ছোটো গল্প
FREE SHIPPING IN INDIA
ছোটো গল্প
রাজ্যের লোক প্রথমে রোগজিনাকে এড়িয়ে চলছিল। তখন রোগজিনা নিজেই তাদের কাছে চলে আসত। দু-এক কথা হতে না হতেই গান ধরত। তারপর যা হয় আর কী! লোকজন নিজেদের ঘরে গিয়ে দোর দিল। দরজা-জানালা খুলত না। নেহাত দরকার না পড়লে বাইরেও বেরোত না। চাষবাস চুলোয় গেল। তাতেও কি রক্ষে আছে! বাইরের পথ ধরে উঁচু গলায় গান গেয়ে বেড়াচ্ছে রোগজিনা। সে-গান একবার কানে ঢুকলেই তো হয়ে গেল।
রঞ্জন দাশগুপ্ত
এক বিরাট রাজ্য। সেখানের রাজার খুব প্রতাপ। হাতিশালে হাতি, ঘোড়াশালে ঘোড়া, আর গাধাশালে প্রচুর গাধা তো আছেই, বিশটা এমন বড়ো বড়ো ঘর আছে যেগুলো সোনা-রুপো, মণিমাণিক্যে ঠাসা। রাজ্যজুড়ে উর্বর চাষের জমি। আছে নানান ফলের গাছ। সেই চাষজমি আর ফলন্ত গাছের ফসল রাজ্যের লোক খেয়ে শেষ করতে পারে না বলে বাইরেও চালান যায়। চারটি নদীতে সারাবছর জল থাকে বলে রাজ্যে জলের অভাব নেই। আবার চারদিক পাহাড় দিয়ে ঘেরা বলে কখনও সে-রাজ্যের লোকের গরম লাগে না। ঠান্ডা, নরম বাতাস বয় বছরজুড়ে।
সবথেকে বড়ো কথা, রাজ্যের সেনাপতি খুব বীর। আর তাঁর সৈন্যরাও তেমনই সাহসী। তাই ভিন রাজ্যের রাজারা এ-রাজ্যের দিকে নজর দেওয়ার কথা ভাবতেও পারে না। বলাই বাহুল্য, এসব কারণে এই দেশের লোকজনের জীবন খুব সুখে কেটে যাওয়ার কথা। কেটে যাচ্ছিলও। কিন্তু চিরটা কাল কি আর কারোর একরকম কাটে?
উপস্থিত রাজ্যের খুব বিপদ। সারাদিন সবার জানালা-কবাট বন্ধ থাকে। চাষিরা বাইরে বেরোয় না বলে ফলন্ত সব গাছ জল না পেয়ে শুকিয়ে যাচ্ছে। হাতি, ঘোড়া, গোরু জাবনা না পেয়ে মরো মরো। ছেলেরা পাঠশালেও যায় না। বাইরে থেকে কেউ যদি হঠাৎ এসে পড়ে, মনে করবে যেন এখানে একটাও লোকের বাস নেই। মৃতদের শহর। আর এই সবই হয়েছে রোগজিনা বলে একটা লোকের জন্য।
রোগজিনার নামটা ওরকম হলেও সে আসলে মস্ত চেহারার একজন মানুষ। এককালে সে দারুণ খাটতে পারত আর তেমনই খেতে পারত। অভাবী মানুষ। সারাদিন এর জমি, তার বাগানে কাজ করত সে। আর লোকে তাকে ডেকেও নিয়ে যেত নানান কাজে। দু-বেলা পেট পুরে খাবার আর টাকা দিত। আসলে এ-রাজ্যে সত্যিকারের দারিদ্র্য বলে কিছু নেই বলে অভাবী মানুষদেরও চমৎকার কেটে যায়। তেমন অসুবিধে হলে তো রাজামশাই আছেনই। একবার গিয়ে বললেই বস্তা বস্তা চাল, আটা, ঘি আর সবজি পাঠিয়ে দেবেন। রোগজ্বালা এখানে তেমন ছিল না। তাই লোকে হেসেখেলে এক-দেড়শো বছর বাঁচত।
মুশকিলটা দেখা দিল যখন রোগজিনার বাই চাপল বাইরের দেশ ঘুরে আসার। সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সে বেড়াতে গিয়েছিল বছর খানেক আগে। কোন কোন জায়গায় সে ঘুরে এসেছিল কে জানে। তবে যখন ফিরে এল, দেখা গেল, তার শরীরটা শুকিয়ে একেবারে কাঠি হয়ে গেছে। অত বড়ো শরীরের লোকটা আগে কাঁচা লংকা দিয়েই দু-ধামা মুড়ি খেয়ে ফেলত। এখন সে এক গ্রাস ভাতও খেতে পারে না। খাটতেও পারে না ভালো করে। একমাথা চকচকে কালো চুল পেকে গেছে। দু-গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। সারাদিন খুকখুক করে কাশছে।
সবথেকে সাংঘাতিক ব্যাপার, সে সারাদিন জুড়ে একটাই গান করে আজকাল। খুব নীচু আর বিষণ্ণ সুরে গুনগুন করে— ‘দেহের কথা কী কব হায়, আজ আছে তার কাল নাই। মাটির দেহ মাটি হবে, গর্ব করে কাজ কী ভাই।’
প্রথম প্রথম সে ফিরে আসাতে রাজ্যের লোক খুব খুশি হয়েছিল। ভিড় করে তারা শুনতে যেত, কোন কোন জায়গায় সে গিয়েছিল। সেখানের রাজা কেমন, লোকজন কেমন ইত্যাদি। কাশতে-কাশতেই সেসব গল্প বলত রোগজিনা। বলত আশ্চর্য এক শ্মশানের কথা, সেখানে সারাদিন নাকি দশটা চিতা জ্বলে। একটা শেষ হতে না হতেই আর একটা মৃতদেহ চলে আসে।
লোকে সেসব শুনে দারুণ অবাক হত। অনেকে তাকে বলত, যেন শরীরের যত্ন নেয়। শুনতে শুনতে আনমনা হয়ে যেত রোগজিনা। করুণ সুরে গান গাইত নিজের মতো। তার পরে দেখা গেল, ওই সর্বনেশে গান যার যার কানে গিয়েছে, তারা সবাই আস্তে আস্তে শুকিয়ে যাচ্ছে। চুল পাকছে তাদের, দাঁত নড়ছে। তারপর একদিন শুকিয়ে মরে যাচ্ছে তারা।
এ তো ভয়ানক বিপদের কথা! এতদিন এ-রাজ্যের লোক রোগজ্বালার কথা কিছু জানত না। এক-দেড়শো বছর বয়স হলে তারা এমনিই মারা যেত একদিন। ডাক্তার-বদ্যি লাগত না। কিন্তু এখন শয়ে শয়ে লোক রোজ অসুস্থ হচ্ছে। তারপর শুকিয়ে মারা যাচ্ছে। এমনকি নেহাত দশ কি বারো বছরের ছেলেদেরও রেহাই নেই। এই তো সেদিনই হাঁপাতে হাঁপাতে মারা গেল দুধওয়ালা যতীনের ফুটফুটে ছেলেটা। কী চমৎকার স্বাস্থ্য ছিল তার, একমুখ হাসি আর একমাথা কালো চুল। সে কী কুক্ষণে রোগজিনার গান শুনেছিল, তারপর বাড়ি ফিরে বিছানায় শুয়ে পড়ল। ব্যস! কয়েক ঘণ্টা পরে শেষ।
রাজ্যের লোক প্রথমে রোগজিনাকে এড়িয়ে চলছিল। তখন রোগজিনা নিজেই তাদের কাছে চলে আসত। দু-এক কথা হতে না হতেই গান ধরত। তারপর যা হয় আর কী! লোকজন নিজেদের ঘরে গিয়ে দোর দিল। দরজা-জানালা খুলত না। নেহাত দরকার না পড়লে বাইরেও বেরোত না। চাষবাস চুলোয় গেল। তাতেও কি রক্ষে আছে! বাইরের পথ ধরে উঁচু গলায় গান গেয়ে বেড়াচ্ছে রোগজিনা। সে-গান একবার কানে ঢুকলেই তো হয়ে গেল। কতক্ষণ আর কানে তুলো গুঁজে রাখবে লোকে? আর একবার যদি কোনোক্রমে সে তুলো খুলে ফেলেছে, এমনকি সে যদি গভীর রাতেও হয়, তাহলেই কম্মো সাবাড়। রোগজিনার চোখে ঘুম নেই। সারাটা দিন সে রাজ্যের পথে-ঘাটে গান গাইতে গাইতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দিন হোক কি রাত।
এখন আর রাজ্যের লোক কান থেকে তুলো খোলে না কখনও। স্বামী তার স্ত্রীর সঙ্গে, বাচ্চা তার মায়ের সঙ্গে ইশারায় কথা বলে। এতদিন ধরে চলে আসা রাজ্যের কথ্যভাষাটি ভুলতে বসেছে সবাই। দেখভালের অভাবে মারা যাচ্ছে সব পোষা প্রাণী।
তা বলে রাজামশাই কি কিছু করেননি? তাঁর নিজের দুই রানি। ফুলের মতো দুইটি ছেলেমেয়ে। নেহাত রাজপ্রাসাদের চারদিক উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা, আর ভেতরে বিস্তর গাছপালা বলে সে-গান তাঁর বা তাঁর পরিবারের কারোর কানে যায় না। কিন্তু ব্যাপারটা তাঁর কানে গেছে। শোনার পরেই তিনি চারজন সৈন্যকে পাঠিয়েছিলেন রোগজিনাকে বেঁধে নিয়ে আসতে। তারা বর্শা, তরোয়াল আর দড়ি নিয়ে গিয়েও ছিল। কিন্তু কাছাকাছি যাওয়ার পরেই রোগজিনা হাসিহাসি মুখে তাদের দিকে তাকিয়ে জুড়ে দিয়েছে গান। খুব বেশি কাছাকাছি হওয়ায় কানের তুলোও তেমন কাজ করেনি। চারজন সৈন্যই একেবারে কাটা কলাগাছের মতো লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। তারপর থেকে কেউ আর যায়নি। সৈন্যদেরও তো প্রাণের ভয় আছে!
রাজসভায় এখন আর লোক আসে না। মন্ত্রী, সেনাপতি, পাত্র, মিত্র সবাই গা ঢাকা দিয়েছেন। নিরানন্দ রাজসভায় রাজা একা বসে থাকেন। মুখটি শুকনো। হাসি নেই।
সেদিনও সিংহাসনের ওপর তিনি গালে হাত দিয়ে বসে আছেন। মুখ বিষণ্ণ। এমন সময় ছোটো রানি এলেন। তাঁর কোলে রাজকন্যা। একেবারে ছোট্ট আর ফুটফুটে সুন্দর।
রানিকে দেখে নড়েচড়ে বসলেন রাজা। বললেন, “এসো রানি। বোসো এখানে।”
রানি বসলেন পাশের একটা সোনার আসনে। রাজকন্যাকে ছেড়ে দিলেন তকতকে পরিষ্কার ধবধবে শ্বেতপাথরের মেঝের ওপর। সে সেখানে খেলে বেড়াতে লাগল।
রানি রাজার দিকে তাকালেন। বললেন, “মহারাজ, আপনার কি মনে আছে আর একমাস পরেই রাজকুমারীর জন্মদিন?”
রাজা নিজের দুশ্চিন্তাতেই সারাদিন মগ্ন থাকেন। তাঁর মোটেই মনে ছিল না। কিন্তু সে-কথা তো আর ছোটো রানিকে বলা যায় না! তিনি মুখে হাসি ফুটিয়ে বললেন, “হ্যাঁ, হ্যাঁ! খুব মনে আছে। ভেবেছিলাম এবার দারুণ ধুমধাম হবে। সারা রাজ্যের লোকজনকে নেমন্তন্ন করে খাওয়াব। সাতদিন ধরে চলবে উৎসব। কিন্তু তা বোধ হয় আর হওয়ার নয়।”
“কেন?” সুন্দর ভ্রূ-জোড়া একটু ওপরে তুলে জিজ্ঞেস করলেন ছোটো রানি।
জবাবে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাজা বললেন, “রাজ্যের যা অবস্থা, কেউ আর আসতে চাইবে না। আমার এত সাধের রাজ্য, সব ওই একটা লোকের জন্য শেষ হয়ে গেল। রোগজিনার জন্য।”
রানিও আগেই শুনেছেন সব। মুখ গম্ভীর করে তিনি কিছুক্ষণ বসে থাকলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, “আপনি ওই লোকটাকে ধরতে সৈন্য পাঠিয়েছিলেন বলে শুনেছি। ধরলে কী করতেন?”
“কী আর করতাম! তার মুখ-হাত-পা বেঁধে জঙ্গলে ছেড়ে আসতাম। সেখানে লোকজন নেই। কারও কিছু ক্ষতি হত না। কিন্তু তা আর হল কই!”
“কাছে গেলে না-হয় ওর গান কানে যায়, দূর থেকে তির ছুড়ে ওকে মেরে ফেলছে না কেন আপনার লোকজন?” রানি বিরক্ত হয়ে প্রশ্ন করলেন।
উত্তরে রাজা জিভ কেটে বললেন, “লোকটা তো আর সরাসরি কাউকে হত্যা করছে না। গান গাইছে কেবল। শুধু গান গাওয়ার অপরাধে কাউকে মেরে ফেলাটা অধর্ম। রাজাকে বেশি ধর্মপরায়ণ হতে হয়। শুধুমুধু একটা লোককে মেরে ফেলা খুব অপরাধ হবে।”
“তবে থাকুন আপনার ধর্ম নিয়ে।” এই বলে রেগেমেগে রানি বাচ্চা কোলে তুলে নিয়ে রাজসভা থেকে বেরিয়ে গেলেন। সেইদিনটা তিনি রাজার কাছেই এলেন না। এমনকি খাবারও খেলেন না। রাজকুমারীকে একজন দাসীর হাতে তুলে দিয়ে গোঁসাঘরে ঢুকে ভেতর থেকে খিল দিলেন। গোঁসাঘর হল সেই ঘর, যেখানে রাগ হলে রানি বা রাজকুমারীরা ঢুকে গিয়ে খিল দেন। বাইরে থেকে রাজা বা যাঁর ওপরে তাঁদের রাগ হয়েছে, সেই ব্যক্তি গিয়ে খুব ক্ষমা-টমা চাইলে তবে তাঁরা দোর খোলেন। তবে এবার ছোটো রানির এত রাগ হয়েছিল যে, তিনি রাজার কথাও শুনলেন না। দোরও খুললেন না।
রাতের বেলায় একশোটি সোনার প্রদীপ জ্বালিয়ে রাজাকে খেতে দেওয়া হল। মস্ত বড়ো সোনার থালায় পদ্মলুচি, একশো সোনার বাটিতে পায়েস, মিষ্টি, নানান রকমের ব্যঞ্জন। বড়ো রানি নীচে পাশে বসে ঠান্ডার মধ্যেই হাওয়া করতে লাগলেন। যেহেতু নিয়ম। কিন্তু রাজা খেলেন না কিছুই। কিছুটা ফেলে ছড়িয়ে উঠে পড়লেন। তারপর গোলাপজলে আঁচাতে আঁচাতে বড়ো রানিকে বললেন, “না রাজ্যে শান্তি আছে, না ঘরে। ইচ্ছে করে সন্ন্যাসী হয়ে চলে যাই।”
বড়ো রানি খুব বুঝদার। খবরও রাখেন খুব। তিনি চিন্তিত মুখে বললেন, “ঝামেলা তো একটা পাকিয়ে উঠেছে বটেই। কিন্তু আপনি রাজা। আপনার হার মানলে তো চলবে না। কিছু একটা পথ খুঁজে বের করতেই হবে।”
“কী করা যায় বলো তো?”
বড়ো রানি অনেক চিন্তা করে বললেন, “আমি বাপের বাড়ি থাকাকালীন আমার সঙ্গে আমাদের মহামন্ত্রীর ছেলে মহামাল্যও একই পাঠশালে পড়ত। সে দারুণ বুদ্ধিমান। আচ্ছা, তার কাছ থেকে কোনও বুদ্ধি নেওয়া যায় না?”
“কিন্তু তাকে খবর দেব কী করে? দূতেরা কেউ তো বাইরে বেরোতেই চাইছে না!”
বড়ো রানি উদ্ভাসিত মুখে বললেন, “কেন? আমাদের পায়রাগুলো তো আছে।”
সে-আমলে তো মোবাইল ফোন বা ডাকবিভাগ ছিল না। কারোর অন্য কাউকে খবর পাঠাতে হলে পায়রার পায়ে চিঠি বেঁধে দিত। শিক্ষিত পায়রা ঠিক জায়গায় উড়ে উড়ে নামত। চিঠি পৌঁছে যেত।
পালকিগড়ের রাজা একদিন সিংহাসনে বসে আছেন, একটা পায়রা ডানা ঝটপটিয়ে ঠিক তাঁর রাজসভায় গিয়ে পৌঁছল। রাজা খুলে দেখলেন, তাঁর মেয়ের চিঠি। ওপরে লেখা আছে তার ছোটোবেলার বন্ধু, মহামন্ত্রীর ছেলে মহামাল্যর নাম। তিনি সেই চিঠি নিজের মহামন্ত্রীকে দিয়ে বললেন, “আমার মেয়ে কোনও বিপদে আছে মনে হয়। বহুদিন কোনও খবরও পাই না। এই চিঠিটা আপনার ছেলেকে দিয়ে আসুন। জেনে নেবেন, কী লেখা আছে।”
মহামন্ত্রীর ছেলে একটা পুথি নিয়ে বসে ছিলেন। চিঠি পেয়ে পড়তে বসলেন। সবই জানতে পারলেন তিনি। প্রথমেই ভাবলেন, কেন পশুপাখিদের ওপর গানের কোনও প্রভাব পড়ে না। তার পরে ভাবলেন, কেন নিজের গান নিজের কানে শুনেও রোগজিনার শরীর খারাপ হয় না। সব ভেবে-টেবে দারুণ এক বুদ্ধি খেলে গেল তাঁর মাথায়।
কয়েকদিন কেটে গেল। হঠাৎই এক সকালে আগাগোড়া সাদা পোশাকে ঢাকা, মাথায় সাদা পাগড়ি আর সাদা ঘোড়ায় চাপা একজন লোক টগবগ শব্দ তুলে সেই যে রাজা, তাঁর রাজ্যের পথে পথে ঘুরে বেড়াল কিছুক্ষণ। তারপর ঘোড়া নিয়ে উঠতে লাগল রাজ্যের পশ্চিমদিকের পাহাড়ে। সেখানে উঠে একটা সমতল জায়গায় সে ডেরা বাঁধল।
রোগজিনা তাকে ঠিকই খেয়াল করেছিল। কতদিন হয়ে গেল, কেউ তার সঙ্গে কথা বলে না। কাউকে সে সরাসরি গান শোনাতে পারে না। ভেতরটা ফুটন্ত জলের মতো বুজকুড়ি কাটছিল তার। সবচেয়ে বড়ো কথা, এতদিন বেচারি এর গাছের কলা, ওর গাছের আপেল খেয়েই কোনোক্রমে দিন কাটাচ্ছিল। ভাত জোটেনি। কয়েকদিন আগে পর্যন্ত তার খিদে পাচ্ছিল না। কিন্তু গত একমাসের বেশি ভাত খেতে না পাওয়ায় তার পেটটা যেন একেবারে চুঁ-চুঁ করছে। তাই সে একেবারে মনমরা হয়ে রয়েছে। যখন সে দেখল, নতুন লোকটা একেবারে পাহাড়ের গায়ে চড়ে বসেছে, তখন তার খুবই কৌতূহল হল। সন্ধে নামার পর সে নীচু থেকেই দেখতে পেল, ওপরে আগুন জ্বালানো হয়েছে। তার পরেই সুগন্ধি ভাতের গন্ধ এসে ঢুকল তার নাকে। মাংস রান্নার গন্ধ যখন সন্ধের মৃদু বাতাসে তার নাকে এল, তখন সে আর নোলা সামলাতে পারল না। প্রাণপণে উঠতে লাগল পাহাড়ি রাস্তা বেয়ে। কিছুটা কথা বলার জন্য, আর বেশিরভাগটাই খিদের চোটে।
হাঁপাতে হাঁপাতে ওপরে উঠে সে দেখল, একজায়গায় নতুন লোকটা ঘোড়াটাকে একটা গাছের গায়ে বেঁধেছে। তার পাশেই দুটো আগুন জ্বালিয়ে একটাতে সে ভাত চাপিয়েছে, আর একটায় মাংস কষছে। দারুণ আনন্দ হল রোগজিনার। হাসিহাসি মুখে এগিয়ে গিয়ে লোকটাকে বলল, “তুমি কে ভাই? এখানে কেন এসেছ?”
লোকটা তার কোনও কথারই জবাব দিল না। হাসল কেবল। আরও কত কথা বলল রোগজিনার। কিন্তু সে উত্তর দিলে তবে তো! খালি হাসে। কোনও জবাব দেয় না। শেষ পর্যন্ত যখন লোকটা ঘোড়ার পাশেই রাখা একটা থলে থেকে দুটি আসন বের করে পাতল, আর দুটি কলাপাতা এনে দুজনের জন্য ভাত বাড়ল, তখন রোগজিনার আর বুঝতে বাকি রইল না আজ তার এখানে নেমন্তন্ন। ওরা দুজন ছাড়া তো আর পাহাড়ের এই জায়গায় আর কেউ নেই! এতদিন পরে ভাত আর ঝাল ঝাল মাংস খেতে পাবে বলে ওর আর তর সইল না। তাড়াতাড়ি একটা বাঁশের পাত্রে রাখা জল দিয়ে হাত ধুতে ধুতে সে এতদিন ভালো করে গাইতে না পারা গানটা তারস্বরে জুড়ে দিল— ‘দেহের কথা কী কব হায়, আজ আছে তার কাল নাই। মাটির দেহ মাটি হবে, গর্ব করে কাজ কী ভাই।’
হায় রে! যেই না জোরে গান করা, সেই গান দূরের কোন পাহাড়ের দেওয়ালে ধাক্কা লেগে ফিরে এল তার কাছেই। তার কানে ঢুকে বেজে উঠল—
‘দেহের কথা কী কব হায়,
আজ আছে তার কাল নাই।
মাটির দেহ মাটি হবে,
গর্ব করে কাজ কী ভাই?
আয় রে বাছা মাটিতে পড়,
আর কোত্থাও আরাম নাই।
যাবিই যখন এইক্ষণে যা,
দেরির কোনও কারণ নাই।’
নিজের মুখের যে-গান শুনে তার এতদিন কিচ্ছু হয়নি, পাহাড়ের গা ঠিকরে ঘুরপথে আসা সে-গান শুনে কেঁপে উঠল রোগজিনার শরীর। তার গলা শুকিয়ে এল, চোখ বিস্ফারিত। তারপর ছটফট করতে-করতেই সে মারা গেল।
আর ওই লোকটার কিন্তু কিছুই হয়নি। হবে কী করে! সে তো শুনতেই পায় না। জেনে-বুঝেই অমন লোকটিকে পাঠিয়েছিলেন পালকিগড়ের মহামন্ত্রীর ছেলে।
তার পরে আর কী! সব জানতে পেরে নাচতে নাচতে ছুটে এল রাজ্যের সব প্রজা। এমনকি রাজাও তাঁর দুই রানিকে নিয়ে বাজি ফাটাতে ফাটাতে রাজপ্রাসাদের বাইরে বেরিয়ে এলেন। পরের মাসে রাজকুমারীর জন্মদিন বিরাট ঘটা করে পালন করা হল। আর পালকিগড়ের মহামন্ত্রীর ছেলে মহামাল্যকে তো রাজা নিজের মন্ত্রীই করে নিলেন।
লেখকের অন্যান্য লেখা
শুভাঞ্জন ব্যানার্জী ▪ প্রবাহনীল দাস
লিও তলস্তয় ▪ নলিনাক্ষ ভট্টাচার্য
তাপস মৌলিক ▪ অংশু পাণিগ্রাহী ▪ বাণীব্রত গোস্বামী ▪অরিন্দম ঘোষ ▪ রঞ্জন দাশগুপ্ত ▪ সিদ্ধার্থ দাশগুপ্ত ▪শাশ্বত কর ▪ রাজীব রায় গোস্বামী ▪ সায়নদীপা পলমল ▪ প্রদীপ কুমার দাস
বদ্রীনাথ পাল ▪ তাপস বাগ ▪ বসন্ত পরামানিক ▪ গোবিন্দ মোদক ▪ সুব্রত দাস ▪ অর্ণব ভট্টাচার্য ▪ সুজাতা চ্যাটার্জী ▪ মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় দাস ▪ মধুমিতা ভট্টাচার্য ▪ ড. রমলা মুখার্জী ▪ সনৎকুমার ব্যানার্জী ▪ বিদ্যুৎ মিশ্র ▪ রাজর্ষি মণ্ডল ▪ রূপালী মুখোপাধ্যায় ▪ শক্তিপদ পণ্ডিত ▪ শম্ভু সরকার ▪ সুব্রত চৌধুরী
অদিতি ভট্টাচার্য ▪ দীপঙ্কর চৌধুরী ▪ মৌসুমী রায় ▪ সবিতা রায় বিশ্বাস ▪ সহেলী রায় ▪ কিশোর ঘোষাল
অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায় ▪ অরিন্দম দেবনাথ ▪ কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায় ▪ দীপক দাস ▪ ড. উৎপল অধিকারী ▪ চন্দ্রানী মজুমদার
সায়ন্তনী পলমল ঘোষ ▪ সোমা দে ▪ শংকর লাল সরকার ▪ সন্দীপন সাহা
অলংকরণ
মায়াসখা নন্দী ▪ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ▪ একপর্ণিকা ক্রিয়েটিভস
আমাদের আশেপাশে যেসব মানুষরা ঘুরে বেড়াচ্ছেন তাঁদের সকলের সঙ্গে আমাদের আলাপ-পরিচয় হয় না। অথচ এঁদের মধ্যে অনেকেই অসাধারণ সব গুণের অধিকারী। গুণময় রায় এরকমেরই একজন মানুষ। তিনি একজন বিজ্ঞানী। নিজের পরিচয় দেন ‘ইনভেনটর’ বলে। বিজ্ঞানের সঙ্গে সঙ্গে ইঞ্জিনিয়ারিংয়েও তুখোড়। আবার ভারতীয় পুরাণ, ইতিহাস এবং পুরাতাত্ত্বিক বিষয়েও তাঁর গভীর জ্ঞান।
এ-হেন মানুষটির সঙ্গে কয়েকজন স্কুল-ছাত্রের নিতান্ত আকস্মিকভাবেই আলাপ হয়ে যায়। তাদের কাছে গুণময় রায় খোলসা করেন তাঁর কয়েকটি আবিষ্কারের কথা। একে একে খুলে যায় আশ্চর্য সব জগতের দরজা, যার তুলনা আর কোথাও নেই। কখনও নিজের মনোজগত, কখনো-বা প্রজন্মবাহিত স্মৃতির সরণিতে অক্লেশে ঘুরে বেড়ান ‘গুণময় দ্য গ্রেট’, আর পাঠকেরাও সুযশ মিশ্রের জবানিতে স্বাদ পায় সেই অতুলনীয় অ্যাডভেঞ্চারগুলির। বিচিত্রতর যাত্রাপথে সম্রাট সমুদ্রগুপ্ত থেকে শুরু করে যুদ্ধরত মহাদেব—কতজনের সঙ্গেই না দেখা হয়ে যায় তাদের।
দুই শতাব্দী। গোটা বিশ্ব চরম অস্থির। একের পর এক ঘটে চলেছে ঐতিহাসিক ঘটনা। তারই মাঝে সে নজরদারি করে চলেছে গোটা বিশ্ব। খিদিরপুর থেকে চিনের ক্যান্টন, সুদূর আফ্রিকার সাভো নদীর তট থেকে ইম্ফল, নিউ পাপুয়া গিনির রহস্যময় ভূগর্ভস্থ জগৎ - কোনও স্থানই তার দৃষ্টিপথের বাইরে নয়। মন্ত্রমুগ্ধের মতো পথ চলে তার নির্বাচিত প্রতিনিধিরা। সে নির্দেশ অমোঘ, অলৌকিক। তা অমান্য করার সাধ্য কারও নেই। সে জিচোলা তাতু। রহস্য, রোমাঞ্চ, ভয়, অলৌকিক, যুদ্ধ আর ইতিহাস দিয়ে গেঁথে তোলা হয়েছে রুদ্ধশ্বাস দুই শতাব্দীর আখ্যান।