ছোটো গল্প
FREE SHIPPING IN INDIA
ছোটো গল্প
ব্যাটেলোম্যানিয়াতে সৌম্য এখন প্রো-লেভেলে খেলছে। মা অনেকবার ফোন করে খাবারটা খেয়ে নিতে বলেছেন। গেমের এই চূড়ান্ত উত্তেজনার মুহূর্তে আবার খেতে উঠে সময় নষ্ট করা যায় নাকি! সৌম্য তো শেষবার মিথ্যেমিথ্যি বলে দিয়েছে যে খাওয়া হয়ে গিয়েছে। খেলতে খেলতে কখন যে রাত দুটো বেজে গেল, খেয়ালই করল না সৌম্য। খিদে-তেষ্টা সব যেন ভুলেই গিয়েছে সে।
সায়নদীপা পলমল
“প্লিজ মম, আমাকে জোর কোরো না। আমি যাব না।”
“আর ইউ শিওর তুমি রাতে একা থাকতে পারবে?”
“কেন পারব না? আমি কি আর বাচ্চা আছি নাকি?”
“তাও বটে।” কথাটা বলে একগাল হেসে সৌম্যর চুলগুলো ঘেঁটে দিলেন মা। বিরক্ত হল সৌম্য। সে এখন চৌদ্দ বছরের, এখন আর এসব বাচ্চাসুলভ আদর ভালো লাগে নাকি! মায়ের হাতটা সরিয়ে গটগট করে নিজের রুমে চলে গেল সৌম্য। মায়ের একটু খারাপ লাগল কি! কে জানে! অত দেখার সময় কোথায়? সৌম্যর বন্ধুরা এখন তার জন্য অপেক্ষা করছে ‘ব্যাটেলোম্যানিয়া’-র ময়দানে।
“কী গো, যাবে না বলছে?” জিজ্ঞাসা করলেন বাবা।
মা আলতো করে মাথা নেড়ে বললেন, “না।”
বাবা বললেন, “তোমার আশকারাতেই এমন হয়ে যাচ্ছে ও। আরে বাবা, চিনির সঙ্গে কত বন্ধুত্ব ছিল ওর, ও না গেলে চিনির খারাপ লাগবে না?”
“আমি কী করি বলো তো? আর তো একদম ছোট্টটি নেই।” হতাশ গলায় বললেন মা।
“হুম।” বাবা গম্ভীর গলায় বললেন, “বাড়িতে থাকা মানেই তো সারাদিন মোবাইলে বসে গেম খেলা। আসলে ওই জন্যই যেতে চাইছে না। একেবারে নেশা হয়ে গিয়েছে ওর। তুমি ওকে বারণ না করে করে আজ এই অবস্থা।”
“আচ্ছা! তুমি বলতে চাইছ, আমার আশকারাতেই এমনটা হচ্ছে?” কোমরে হাত দিয়ে মা বললেন, “ওকে মোবাইলটা কে কিনে দিয়েছে শুনি?”
“সে আমরা দুজনে বেরিয়ে যাই সারাদিন, মোবাইল একটা না থাকলে চলে?”
“আমি তো একটা ফিচার ফোন কিনে দিতে বলেছিলাম। তুমিই তো অ্যান্ড্রয়েড দিয়ে দিলে।”
“আচ্ছা, আচ্ছা। এখন চলো, দেরি হয়ে যাচ্ছে।” বেরোবার মুহূর্তে কলহ এড়াতে বাবা যেন হঠাৎ করেই যাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
বেরোবার আগে শেষবারের মতো মা জিজ্ঞাসা করলেন সৌম্যকে। উত্তর পালটাল না। মাইক্রোওয়েভে খাবারগুলো গরম করে নিতে বলে মা-বাবা বেরিয়ে গেলেন। তাঁদের মনখারাপি কণ্ঠ সৌম্যকে ছুঁতে পারল না। তার বাবা-মা চাকরি করলেও তার জন্য সময় বের করতে দুজনে কখনও কার্পণ্য করেননি, এখনও করেন না। কিন্তু সৌম্যরই আর ওঁদের ভালো লাগে না। বড্ড ঘ্যানঘ্যান করেন ওঁরা। সবসময় কেমন যেন মাস্টারমশাই আর দিদিমণি ভাব। তাছাড়া আত্মীয়স্বজনের বাড়ি যেতেও আর ভালো লাগে না তার। সবাই বড্ড ব্যাক ডেটেড। তার তুতো ভাইবোনেরা এখনও সেই নব্বইয়ের দশকে পড়ে রয়েছে। দেখা হলে এখনও তারা অন্তাক্ষরি, ডাম্বশ্যারাডস খেলতে চায়, গল্প করতে চায়। জেন আলফারা এসব বোরিং খেলা খেলে নাকি!
ব্যাটেলোম্যানিয়াতে সৌম্য এখন প্রো-লেভেলে খেলছে। মা অনেকবার ফোন করে খাবারটা খেয়ে নিতে বলেছেন। গেমের এই চূড়ান্ত উত্তেজনার মুহূর্তে আবার খেতে উঠে সময় নষ্ট করা যায় নাকি! সৌম্য তো শেষবার মিথ্যেমিথ্যি বলে দিয়েছে যে খাওয়া হয়ে গিয়েছে। খেলতে খেলতে কখন যে রাত দুটো বেজে গেল, খেয়ালই করল না সৌম্য। খিদে-তেষ্টা সব যেন ভুলেই গিয়েছে সে। কিন্তু খুব জোরে টয়লেট পেতে উঠতেই হল তাকে। অনেকক্ষণ ধরে চেপে রাখায় পেটটা মনে হচ্ছে ছিঁড়েই যাবে।
টয়লেট থেকে বেরোতে যেতেই হঠাৎ ডাইনিংয়ের কোনার দিকে একটা মৃদু আলো দেখতে পেল সৌম্য। চমকে উঠল সে। চোখ কচলে আবার তাকাল। সেই মৃদু আলোয় দেখতে পেল, তিনটে ছায়ামূর্তি স্পষ্ট হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে, যেন ধোঁয়ার মতো গড়ে উঠছে তারা অন্ধকারের বুক চিরে। প্রথম ছায়াটা একেবারে তার মতো। গায়ে হালকা রঙের একটা টি-শার্ট, চোখে-মুখে তার মতোই চঞ্চলতা আর উচ্ছ্বাস, কিন্তু হাতে কোনও মোবাইল নেই। দ্বিতীয় ছায়াটা আবার ঠিক তার মায়ের মতন। মায়ের মতোই মমতাভরে ছেলের চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। তৃতীয় ছায়াটি বাবার। মা-ছেলের আদর দেখে মজা করছেন তাদের সঙ্গে।
আতঙ্কে সৌম্যর শরীরটা কাঠ হয়ে গেল। তার পা দুটো আটকে গেল মেঝের সঙ্গে। মনে হল সে হয়তো আর মানুষ নেই, বাইরের ঘরের তাকে সাজানো কাঠের পুতুলগুলোর মতো জড় পদার্থে পরিণত হয়েছে সে, আর নীরব দর্শক হয়ে প্রত্যক্ষ করছে তার সামনে থাকা তিন ছায়াময়ের কার্যকলাপ। ওগুলো কী? ভূত? ভূতপ্রেতে যদিও সে বিশ্বাস করে না, তবে এই মুহূর্তে অবিশ্বাস করার মতো মনের জোরটা ঠিক আসছে না। কিন্তু ভূত তো মানুষ মারা গেলে হয়, সে তো দিব্যি বেঁচে আছে। তাহলে তার মতো দেখতে... সৌম্যর শিরদাঁড়া দিয়ে হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল।
ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করে চলছে, কিন্তু সেই শব্দ কানে লাগছে না সৌম্যর। ঝিঁঝিঁপোকারাও আজ রাতে বুঝি ছুটি নিয়েছে। পাড়ার সব কুকুর আজ একযোগে পাহারা দিতে ভুলে গিয়েছে। বাহ্যিক কোনও শব্দই আর কানে আসছে না সৌম্যর। সে কেবল শুনতে পাচ্ছে তিন ছায়াময়ের খিলখিল হাসি, আড্ডা আর গল্পগুজব। এমনকি সৌম্যর আশেপাশে বাতাসের চলাচলও স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে। গুমোট হয়ে রয়েছে চারদিক। ব্যতিক্রম কেবল ওই ছায়াময়দের চারপাশ। বাতাস চোখে দেখা যায় না, কিন্তু সৌম্য অনুভব করতে পারছে, ওদের ঘিরে রয়েছে এক শান্ত স্নিগ্ধ বায়ুমণ্ডল।
“ওহ্ মা, তোমার হাতের এই এঁচোড়-চিংড়ি খেলে দেবতারাও অমৃতের স্বাদ ভুলে যাবে।”
“তাই বুঝি? খুব পাকা পাকা কথা শিখেছিস, না?”
চমকে উঠল সৌম্য। তার মতো দেখতে ছায়াটা যে হুবহু তারই ভাষা বলছে। মায়ের হাতের ওই পদ তার ভীষণ প্রিয়। মা বোধ হয় বহুদিন রাঁধেনি, নাকি রেঁধেছে! সৌম্য তো খেতে খেতে গেম খেলে, আজকাল কী খায় খেয়ালই থাকে না তার।
“কী রে, আজ ডিনার করে এক রাউন্ড চেস হবে নাকি?”
“হতেই পারে।”
আবারও চমকে উঠল সৌম্য। কতদিন বাবার সঙ্গে দাবা খেলা হয় না তার। বাবা বলতেন, দাবা না খেললে বুদ্ধিতে জং ধরে যাবে। তাই কি আজকাল সৌম্য পড়াশুনাতে পিছিয়ে পড়ছে ক্রমশ! কোনোকিছুই মনে রাখতে পারছে না! গলাটা শুকিয়ে এল তার।
ওরা কথা বলছে তো বলেই যাচ্ছে। আর সৌম্য ক্রমশ পেছনে, সময়ের আরও পেছনে পিছিয়ে যাচ্ছে। সম্পর্কের এই উষ্ণতা, এই পারস্পরিক সংযোগ সেও তো উপভোগ করত একদিন। কিন্তু আজ... ওই ছায়াদের দিকে হাত বাড়াল সৌম্য, কিন্তু ছুঁতে পারল না। সে কেবল দেখল, তার ছায়া তারই জীবনটাকে বাঁচছে, কিন্তু তার থেকে অন্য আঙ্গিকে। সেখানে তার কোনও তাড়া নেই, কোনও চাপ নেই। মা-বাবার মুখে অভিমান নেই, কষ্ট নেই। তাদের মাঝে রয়েছে কেবল শান্তি আর নির্ভরতা। ব্যাটেলোম্যানিয়ার বাইরেও এই মুহূর্তে অন্য যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ল সে, নিজের সঙ্গে নিজের যুদ্ধ।
আচমকা বিছানায় পড়ে থাকা মোবাইলটা ওয়ার্নিং দিল। ব্যাটেলোম্যানিয়ার ময়দানে গেমার তথা যোদ্ধা সৌম্যর বিপদ আসন্ন। সৌম্য ঘরের দিকে তাকাল। বিছানায় পড়ে থাকা মোবাইলটাকে দূর থেকে দেখতে পেল সে। ওয়ার্নিং দিয়ে চুপ করে গিয়েছে। একটা শীতল নিষ্প্রাণ যন্ত্র— না আছে প্রাণ, না জানে কোনও সম্পর্কের উষ্ণতা। কিন্তু সৌম্যর তো ওই দুটোই ছিল। তাহলে সে কেমন করে একটা জড় পদার্থে পরিণত হয়ে গেল! একটা ছায়া যে জীবনটায় বাঁচতে পারছে, সে কেন পারছে না আর! সৌম্যর চোখ দিয়ে আচমকা জল গড়িয়ে এল। ভীষণ রকমের কষ্ট হচ্ছে তার। চোখ ঘুরিয়ে আবার সামনের দিকে তাকাল সে। কিন্তু এ কী, কোথায় যাচ্ছে তিন ছায়াময়! ঘরের সেই কোণের অন্ধকার আবার ফিরে আসছে, আর সেই অন্ধকারে এক এক করে মিলিয়ে যাচ্ছে ওরা। একসঙ্গে নয়— প্রথমে বাবা, তারপর মা, আর সবশেষে সে নিজে। দেখতে দেখতে তার চোখের সামনে থেকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল তারা। সৌম্যর চোখ উদ্ভ্রান্তের মতন তাদের খুঁজতে চাইল আবার। ঠিক তখনই তার মোবাইলটা টিংটিং করে বেজে উঠল। এটা ওয়ার্নিং বেল। শত্রুপক্ষ ঘিরে ফেলেছে তাকে। এক্ষুনি রুখে দাঁড়ানো প্রয়োজন। তবুও সেখান থেকে নড়তে পারল না সে। কয়েক সেকেন্ড পরেই মোবাইলটা জোরে আর্তনাদ করে উঠল, যান্ত্রিক আর্তনাদ। এই আর্তনাদ সৌম্যর ভালো মতন চেনা। এই আর্তনাদ শুনতে সে বরাবর ঘৃণা করে। ব্যাটেলোম্যানিয়াতে শত্রুর হাতে ঘায়েল হলে ওটা বাজে। তার মানে গেমার সৌম্য পরাস্ত হয়েছে।
শব্দটা অগ্রাহ্য করে একটা শান্ত নিশ্বাস ফেলল সৌম্য। তারপর এগিয়ে গেল ডাইনিং টেবিলের দিকে। খাবারগুলো গরম করতে হবে।
শুভাঞ্জন ব্যানার্জী ▪ প্রবাহনীল দাস
লিও তলস্তয় ▪ নলিনাক্ষ ভট্টাচার্য
তাপস মৌলিক ▪ অংশু পাণিগ্রাহী ▪ বাণীব্রত গোস্বামী ▪অরিন্দম ঘোষ ▪ রঞ্জন দাশগুপ্ত ▪ সিদ্ধার্থ দাশগুপ্ত ▪শাশ্বত কর ▪ রাজীব রায় গোস্বামী ▪ সায়নদীপা পলমল ▪ প্রদীপ কুমার দাস
বদ্রীনাথ পাল ▪ তাপস বাগ ▪ বসন্ত পরামানিক ▪ গোবিন্দ মোদক ▪ সুব্রত দাস ▪ অর্ণব ভট্টাচার্য ▪ সুজাতা চ্যাটার্জী ▪ মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় দাস ▪ মধুমিতা ভট্টাচার্য ▪ ড. রমলা মুখার্জী ▪ সনৎকুমার ব্যানার্জী ▪ বিদ্যুৎ মিশ্র ▪ রাজর্ষি মণ্ডল ▪ রূপালী মুখোপাধ্যায় ▪ শক্তিপদ পণ্ডিত ▪ শম্ভু সরকার ▪ সুব্রত চৌধুরী
অদিতি ভট্টাচার্য ▪ দীপঙ্কর চৌধুরী ▪ মৌসুমী রায় ▪ সবিতা রায় বিশ্বাস ▪ সহেলী রায় ▪ কিশোর ঘোষাল
অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায় ▪ অরিন্দম দেবনাথ ▪ কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায় ▪ দীপক দাস ▪ ড. উৎপল অধিকারী ▪ চন্দ্রানী মজুমদার
সায়ন্তনী পলমল ঘোষ ▪ সোমা দে ▪ শংকর লাল সরকার ▪ সন্দীপন সাহা
অলংকরণ
মায়াসখা নন্দী ▪ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ▪ একপর্ণিকা ক্রিয়েটিভস