FREE SHIPPING IN INDIA
শুভাঞ্জন ব্যানার্জী (১৭)
“আপনি, আপনি সুদীপ্ত রায় না?”
নিজের নামটা শুনে চমকে পিছনে ফিরে তাকালাম। বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নামছে দ্রুত। সমুদ্রের পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে এই নির্জন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছিলাম। সি-বিচের মূল জায়গাটার মতো এই জায়গাটায় মানুষজন গিজগিজ করছে না। জায়গাটা এখন একেবারেই নির্জন। কিছুক্ষণ আগে পর্যন্তও এক-দুজন লোককে দূরে হাঁটতে দেখা যাচ্ছিল।
সমুদ্রের তাকিয়ে থাকতে থাকতে একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম। তাই কথাটা শুনে বেশ চমকে পিছন ফিরে তাকালাম। আর তাকাতেই ভদ্রলোককে চোখে পড়ল আমার। পড়ন্ত বিকেলের আলোয় ভদ্রলোকের সিল্যুয়েটটাকে বেশ বিষণ্ণই দেখাচ্ছে যেন। ভদ্রলোকের পরনে একটা পুরোনো কোট, নস্যি রঙের প্যান্ট, গায়ের রঙ তামাটে, বয়স ঠিক আন্দাজ করা যায় না। পঞ্চাশের ও-পারেই হবে হয়তো। চোখে একটা সরু ফ্রেমের চশমা। চশমার আড়ালের চোখ দুটো বেশ বুদ্ধিদীপ্ত।
আমি চমকে পিছন ফিরে তাকাতে ভদ্রলোক মৃদু হেসে বললেন, “ঠিকই বলেছি তাহলে?”
আমি একটু অবাক হয়েই বললাম, “আপনি আমাকে চেনেন?”
“চিনি, আবার চিনিও না।” বেশ হেঁয়ালি করেই জবাব দিলেন ভদ্রলোক।
লক্ষ করলাম, কোটের গায়ে মিশে রয়েছে একটা ঝোলা। ভদ্রলোকের পোশাকআশাক একটু অদ্ভুতই বটে। ঝোলাটা থেকে একটা বই বের করলেন তিনি। বইটা দেখে ব্যাপারটা পরিষ্কার হল। এ-বছর বইমেলায় প্রকাশিত আমারই লেখা একটি বই। হ্যাঁ, চাকরির পাশাপাশি শখে একটু-আধটু লেখালিখিও করি। ভদ্রলোকের কথায় মৃদু হাসলাম।
ভদ্রলোক বললেন, “আমার নাম তিমির নাথ। কাছেই থাকি।”
কী উত্তর দেব ভেবে না পেয়ে তাকিয়ে রইলাম ভদ্রলোকের দিকে। তিমিরবাবু বললেন, “ছোটো থেকেই ভূতপ্রেতের ওপর আমার বড়ো আগ্রহ। মৃত্যুর পর কী হয়, এসব জানার আগ্রহ আমার চিরকালের। এখন তো শুনি প্যারানর্মাল অ্যাক্টিভিটির ওপর কাজ করেও অনেকে জীবিকা নির্বাহ করেন। এই ধরনের আর্টিকল, ব্লগ পড়তেও ভালো লাগে। তার পাশাপাশিই ভূতের গল্প-টল্পও পড়ি মাঝে-মধ্যে। একমাত্র শখ এটাই বলতে পারেন। সেখান থেকেই আপনার বইয়ের সন্ধান পাই। এখন তো বেশিরভাগ লেখকের লেখা গল্পেই তেমন কিছু পাই না। তবে আপনার গল্পগুলো বেশ অন্যরকম। ভালো লাগে পড়তে।”
আমি মৃদু হাসলাম। ভদ্রলোক আবার বললেন, “আপনাকে বিরক্ত করছি না তো?”
“না, না।” সৌজন্য জানিয়েই বলি আমি।
“আসলে আমার বাড়িটা মূল শহর থেকে একেবারেই বিচ্ছিন্ন জায়গায়। কথা বলার লোক পাই না। তাই একটু বেশি কথা বলে ফেলি আর কি।” বলে হঠাৎ করেই চুপ করে গেলেন ভদ্রলোক। আমিও কী বলব বুঝতে না পেরে একটু অস্বস্তিভরেই তাকিয়ে থাকলাম তাঁর দিকে।
কয়েক সেকেন্ড পর তিমিরবাবু বললেন, “কাছেই আমার বাড়ি। চলুন না, এক কাপ চা খেয়ে আসবেন। একটু কথাও বলা যাবে।”
এই প্রথম আমার খটকা লাগল। লোকটার কোনও বদ মতলব নেই তো? সেজন্যেই কি ভুলিয়ে-ভালিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে নিজের সঙ্গে?
তিমিরবাবু বোধ হয় আমার মনের কথা বুঝে নিয়েই বললেন, “না না, মশাই। আমি লোকটা একটু পাগলাটে, কিন্তু খারাপ মানুষ নই। চিন্তা নেই, আমার সঙ্গে গেলে কোনও বিপদে পড়বেন না।”
আমি তবুও ইতস্তত করছি দেখে ভদ্রলোক বললেন, “আচ্ছা, বিশ্বাস না হলে আপনি যে হোটেলে উঠেছেন, সেখানকার মালিককে জিজ্ঞেস করে দেখবেন।”
বলে ভদ্রলোক এগোনোর জন্য পা বাড়াচ্ছিলেন, আমি কতকটা বাধ্য হয়েই বললাম, “আচ্ছা, চলুন।”
সন্ধের অন্ধকার নেমে এসেছে চারদিকে। তার মধ্যেও ভদ্রলোক ঠোঁটের কোণে ঝুলে থাকা হাসিটা আমার চোখ এড়াল না।
“আপনি এখানে এভাবে একা একা থাকেন? ভালো লাগে?” চায়ের কাপটা হাতে তুলে নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম আমি।
তিমিরবাবু একটু বিষণ্ণ হাসলেন। ঘরে একটা কম পাওয়ারের বাল্ব জ্বলছে। এসে থেকেই দেখছি, একটা ঘরেও টিউবলাইট নেই। ঘরটাও কেমন যেন স্যাঁতস্যাতে। বাল্বের হালকা আলোয় তিমিরবাবুর মুখটা যেন আরও বেশি বিষণ্ণ দেখাচ্ছে। মনে হল ভদ্রলোক যেন বড়ো বেশি ক্লান্ত।
সমুদ্রের ধার থেকে বাড়িটা খুব দূরে নয়। বরং জায়গাটা বড়ো বেশি নির্জন। শহরের কোলাহল কানে আসে না, মানুষও চোখে পড়ে না খুব একটা।
অনেকক্ষণ ধরেই প্রশ্নটা ঘুরছিল আমার মাথায়। শেষমেশ কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করেই বসলাম।
তিমিরবাবুর মুখ দেখে বুঝলাম, এই প্রশ্নটার অপেক্ষাতেই যেন ছিলেন তিনি। বললেন, “কত বছর ধরে এখানে, এভাবে একা একা রয়েছি, জানেন মি. রায়?” বলে হঠাৎ চুপ করে গেলেন। কয়েক সেকেন্ড পর বললেন, “প্রায় সাতাশ বছর। একা একা থাকি। আমি মানুষটা কিন্ত এরকম নই। একা একা থাকতে কার ভালো লাগে, বলুন? কিন্তু থাকতে হয়। এখানে আসলে দুর্ঘটনার ভয়টা কম তো! তবুও ভয় করে। মাঝে মাঝে খুব ভয় করে! মাঝে-মধ্যে কথা বলার জন্য যে প্রাণটা হাঁপিয়ে ওঠে না, তা নয়। কিন্তু, তবুও ভয়টা যেন সবকিছুকেই ছাপিয়ে যায়।”
বলতে বলতে তিমিরবাবুর চোখ-মুখ কেমন যেন বিস্ফারিত হয়ে উঠল। বাল্বটা হঠাৎ দপদপ করতে শুরু করেছে। তার মধ্যে তিমিরবাবুর মুখটা যেন একটা বিভীষিকায় মতো দেখাচ্ছে। বুঝতে পারছি, একটা দমচাপা ভাব আমাকে গ্রাস করছে। ভয় করছে। লোকটাকে ঠিক প্রকৃতিস্থ বলে মনে হচ্ছে না। এখানে এসে কি ভুল করলাম?
তিমিরবাবু বিষণ্ণভাবে বললেন, “আমাকে পাগল ভাবছেন, না? জানি। জানি। সবাই তাই ভাবে। সেজন্যেই তো ইচ্ছে হলেও মানুষের সঙ্গে বেশি কথা বলি না।”
লোকটার চোখের দৃষ্টিতে উন্মাদনার লক্ষণ তো দেখছি না। সুস্থ বলেই মনে হয়।
“আচ্ছা সুদীপ্তবাবু, আপনি তো গল্প লেখেন। ভূতের গল্প। মাঝে মাঝে আপনার এমন কিছু গল্পও পড়েছি, যেখানে ভূত থাকে না, কিন্তু অন্য জগতের বাসিন্দাদের কথা থাকে। আপনার গল্পগুলো বলে, এই জগতের পাশাপাশি আরও একটা সমান্তরাল জগৎ আছে। আপনি নিজে বিশ্বাস করেন এগুলো? নাকি বানিয়ে বানিয়ে লেখেন? বলুন না।”
একটু অস্বস্তিতে পড়লাম। ভদ্রলোকের উৎসুক মুখের দিকে তাকিয়ে বলতে ইচ্ছে করছিল না, গল্প লেখার জন্যই লিখি। বিশ্বাস-অবিশ্বাস দূরের কথা, ওসব নিয়ে অত ভাবিইনি কোনোদিন।
বললাম, “দেখুন, সরাসরি হয়তো বলতে পারব না। নির্দিষ্টভাবে যেমন লিখি, তেমনি যে জীবনেও বিশ্বাস করব, এমনটা তো নয়। তবে আমার মনে হয়, আমাদের জানার বাইরেও অনেক কিছুই আছে। এই যেমন দেখুন না, প্রতিনিয়তই তো কত নতুন নতুন জিনিস আবিষ্কার হচ্ছে…”
“কিছু কিছু জিনিস থাকে, যেসব আবিষ্কার না হওয়াই ভালো, বুঝলেন?” আমার কথার মাঝখানেই একটু কঠিন গলায় বলে উঠলেন তিমিরবাবু, “আমি কয়েকজনকে খুঁজে পেয়েছিলাম, জানেন? ওদের খুঁজে না পেলেই বোধ হয় ভালো হত।”
“মানে?”
“মানে, কয়েকজন মানুষ। ওদের খুঁজে না পেলে বোধ হয় আমার জীবনটা অন্যরকম হত।”
নির্ঘাত লোকটার মাথায় কিছু সমস্যা আছে। তবুও কেন জানি না, মনে হচ্ছিল, কথাগুলোর মধ্যে কিছু অর্থ থাকতেও পারে। ভদ্রলোকের কথাবার্তা যে একটু অদ্ভুত ধরনের, তা বুঝতে পারছিলাম। অস্বীকার করব না, একটু কৌতূহলই হচ্ছিল মনে।
“আমার ছোটোবেলাটা কেটেছিল উত্তরবঙ্গে। বাবা রেঞ্জার অফিসার ছিলেন। ফলে আমার স্কুল, পড়াশুনো, বন্ধুবান্ধবও সব ওখানেই। ওখানেই আমার আলাপ হল বিতানের সঙ্গে। বিতান ছেলেটা মুখচোরা ছিল। প্রথম ঘটনাটা ওর সঙ্গেই ঘটেছিল।”
“কী ঘটনা?”
“বলছি।” বলে চুপ করে শূন্য দৃষ্টিতে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকলেন তিমিরবাবু। বোধ হয় মনে মনে গুছিয়ে নিলেন। তারপর শুরু করলেন।—
স্কুল ছুটির পর আমি আর বিতান মাঝে-মধ্যে সাইকেল নিয়ে ঘুরে বেড়াতাম। সেদিনও তেমনি বেরিয়েছিলাম। স্কুলের বাঁদিক ধরে কিছুটা এগোলে জনবসতি পেরিয়ে একটা জঙ্গুলে রাস্তা পড়ে। বিতান বলছিল সেদিকেই যাবে। আমি আপত্তি করিনি। জায়গাটা আমাদের চেনা। মাঝে-মধ্যেই ওই রাস্তায় সাইকেল নিয়ে ঘুরে আসি দুজনে। সেদিনও তেমনিই যাওয়া হল। রাস্তা থেকে কিছুটা ভেতরের দিকে একটা পাথরের ওপর বসে আমরা কথা বলছিলাম। আমি লক্ষ করছিলাম, কথা বলতে বলতে বার বার দূরে, জঙ্গলের দিকে চোখ চলে যাচ্ছিল বিতানের। আমি বুঝতে পারলাম, কথা বলতে বলতে হঠাৎ করেই ও অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছে। একসময় একটু বিরক্ত হয়েই বললাম, “তোর কী হয়েছে বল তো?”
“ওই যে, ওদিকে, দেখতে পাচ্ছিস?” বিতানের গলার স্বরটা কেমন যেন অচেনা ঠেকল।
বললাম, “কী?”
হঠাৎই যেন বিতানের চেতনা ফিরে এল। একটু অপ্রস্তুত গলায় ও বলল, “না, কিছু না। চ’, বাড়ি ফিরি।”
বিতানকে কেমন যেন অন্যরকম লাগছিল আমার। তাই দ্বিরুক্তি না করে উঠে পড়লাম। সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দিতে যাব, এমন সময় বিতান বলল, “তুই যা, বুঝলি। আমি একটু বসি।”
আমি বলতে গেলাম, ‘আমিও বসছি তাহলে?’ কিন্তু বিতানের দিকে তাকিয়ে থমকে গেলাম। কেমন যেন অপ্রকৃতিস্থ লাগছে ওকে। আমার কথা মুখেই রয়ে গেল। ও কাঁপা গলায় বলল, “বাড়ি যা। বাড়ি যা।”
মনে হচ্ছিল, ওর গলাটা যেন বহুদূর থেকে ভেসে আসছে। হঠাৎ একটা বুনো গন্ধ নাকে এসে লাগল আমার। মাথাটা মুহূর্তের জন্য ঘুরে গেল। বিতানের জন্য কেন জানি মনে একটা চিন্তার স্রোত আছড়ে পড়ছিল। কিন্তু ভেতর থেকে কেউ বলছিল, ‘ফিরে যাও।’
কথা বাড়ালাম না। প্যাডেলে চাপ দিলাম। মাঝে মাঝে পেছন ঘুরে দেখছিলাম, বিতান মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে রয়েছে।
বিতান হারিয়ে গেল। তিন-চারদিন ধরে তাকে খুঁজে পাওয়া গেল না। পুলিশে খবর দিলেন বিতানের বাবা-মা। আমাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হল। যতটুকু জানি, সব বললাম। কিন্তু বিতানকে কোথাও পাওয়া গেল না। এক সপ্তাহ বাদে হঠাৎ করেই ও ফিরে এল। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হল, আগের থেকে একদম বদলে গেল ও। বদলে যাওয়া বলতে যে বিষয়গুলির কথা বলছি, সেগুলো প্রথমে বোঝা যায়নি। এমনকি ওর বাবা-মা, বন্ধুবান্ধব কেউই তেমনভাবে বুঝতে পারেনি। না বোঝারই কথা অবশ্য। বিতানের মধ্যেকার পরিবর্তনগুলো খুবই সুক্ষ্ম। যেমন আগে ও ক্লাসে নিয়মিত হোমওয়ার্ক করে যেত, মন দিয়ে পড়া শুনত। ফিরে আসার পর লক্ষ করলাম, হোমওয়ার্ক বা পড়াশোনা নিজের মতো করে নেয় ঠিকই, কিন্তু ক্লাসের মধ্যে কেমন যেন হয়ে যায়। আমাদের বাংলার স্যার ওকে বেশ পছন্দ করতেন। একদিন ক্লাসে পড়া ধরে ওকে দাঁড় করিয়েছেন। দাঁড়িয়ে একভাবে বাইরে জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকল বিতান। স্যার অবাক হলেও শাস্তি দিলেন না। ওঁর নিখোঁজ হওয়ার ব্যাপারটা জানতেন। ভেবেছিলেন, হয়তো কোনও কারণে বিতান ঠিক নেই। আমি বুঝতে পারছিলাম, বিতান ক্রমশ পালটে যাচ্ছিল। অদ্ভুত অদ্ভুত কাজ করত। বাড়ির ছাদে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকা, কখনো-কখনো কিছু ভয়াবহ কাজ করতেও দেখতাম। স্কুলের বাথরুমে সাবান গোলা জল ছড়িয়ে দেওয়ায় একটি ছেলে পা পিছলে পড়ে যায়। আমি দেখেছিলাম বিতানকে কাজটা করতে। হারিয়ে যাওয়ার পর ওর সঙ্গে কী হয়েছিল, জিজ্ঞেস করলে উত্তর দিত না। জড়ানো গলায় বলত, “মনে নেই। কিচ্ছু মনে নেই।”
আরও একটা ব্যাপার লক্ষ করতাম। আমাকে একটু এড়িয়ে চলত। তবে ওর পরিবর্তনগুলো যে আমি বুঝতে পারছি, তা বোধ হয় টের পেত। দূর থেকে চোখাচোখি হলে মৃদু হাসত।
বিতানের ব্যাপারটার পর বছর খানেক কেটে গেল। স্কুলে পড়া ততদিনে শেষ হয়ে গেছে। বিতানের সঙ্গে দেখা-টেখাও হয় না বিশেষ। ব্যাপারটাও মাথা থেকে মুছে গিয়েছে অনেকটাই। এর মধ্যেই দ্বিতীয় ঘটনাটা ঘটল। আমি ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে ভরতি হয়েছিলাম। আমাদের হোস্টেল থেকে একজন নিখোঁজ হল। বিতানের মতোই। কয়েকদিন বিস্তর ঝামেলা হল। ছেলেটিকে কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না। তারপর আবার বিতানের মতোই সেও ফিরে এল দিন সাতেকের মাথায়। ছেলেটি শান্ত প্রকৃতির ছিল। নিজের ঘরেই সারাক্ষণ বই-খাতা নিয়ে পড়ে থাকত। পড়াশোনায় খুব ভালো ছিল তা বলা যায় না, তবে কারও সঙ্গে খুব একটা মিশত না। ফিরে আসার পর হঠাৎই যেন তার এই ব্যাপারটা বদলে গেল। পড়াশোনা ছেড়ে মাঝে-মধ্যেই বন্ধুদের সঙ্গে বেরিয়ে পড়ত। আপাতদৃষ্টিতে ব্যাপারটা খুব অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম, ও-ও পুরোপুরি বদলে যাবে। বা হয়তো ও সেই ছেলেটা নয়। শুধু কয়েকদিন সেরকম হওয়ার ভান করছে।
এর মধ্যে হস্টেলে একদিন ভয়াবহ একটা ঘটনা ঘটল। মাঝরাতে কার চিৎকার শুনে আমরা করিডরে বেরিয়ে এসে দেখি, আমাদের পাশের ঘরের শোভন করিডরের ওপর অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাচ্ছে। মাথা ফেটে গলগল করে রক্ত বেরোচ্ছে। প্রথমে ব্যাপারটা বোঝা যায়নি। পরে দেখা গেল, ওর ঘরের দরজার সামনে কেউ যেন একটা পাতলা সুতো বেঁধে দিয়েছে। আমরা জটলা করে দাঁড়িয়ে ছিলাম ওকে ঘিরে। ছেলেটাও ছিল ভিড়ের মধ্যে। আমার দিকেই একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল গোটা সময়টা। হ্যাঁ, আপনার সুবিধার জন্য বলে রাখি, ছেলেটির নাম রনি। আমি ভালোই বুঝতে পারছিলাম, কাজটা কে করেছে। শোভনকে হসপিটালে অ্যাডমিট করা হল সে-রাতেই। ডাক্তার বললেন, চোট সুবিধের নয়। জ্ঞান আসতে দেরি হতে পারে, কিংবা…
ফেরার সময় ঠিক হল, দুজন থেকে যাবে হসপিটালে। ঠিক হল, আমি আর রনিই থাকব। আমার যদিও রনির সঙ্গে থাকার ইচ্ছে ছিল না, তবুও আপত্তি জানাতে পারলাম না। বেশ অস্বস্তি নিয়েই বসে ছিলাম। রনি আমার থেকে একটু দূরে অন্য একটা বেঞ্চে বসে ছিল। রনির দিকে তাকাতে ইচ্ছে না হলেও মাঝে-মাঝেই চোখ চলে যাচ্ছিল। চোখ সরিয়ে নেওয়ার পর বার বার মনে হচ্ছিল, আমার অজ্ঞাতে আমার দিকেই যেন তাকিয়ে আছে ও। রাত তখন দুটো। একটু ঝিমুনিমতো এসেছিল। হঠাৎ একটা হাত কাঁধে রাখল যেন কেউ। চমকে তাকালাম। দেখি, রনি। মুখটা কেমন যেন অদ্ভুত দেখাচ্ছে। মৃদু রহস্যময় একটা হাসি লেগে রয়েছে ঠোঁটের কোণে। গাটা অজান্তেই শিরশির করে উঠল আমার। রনি কেমন একটা অদ্ভুত গলায় ফিসফিস করে বলল, “সবই তো জানো। যেমন ভালো ছেলের মতো চুপ করে আছো, তেমনি থাকো। অবশ্য চাইলেও আটকাতে পারবে না আমাদের।” বলেই আবার আগের মতো স্বাভাবিক গলায় বেশ একটু জোরেই বলল, “যাই, একটু হেঁটে আসি। তুমি বোসো।”
কী বলে গেল রনি? ঠিক শুনলাম? নাকি…
শোভন বাঁচল না।
দিনকতক হস্টেলের পরিবেশ কেমন যেন ভারী হয়ে রইল। আমার পড়াশোনায় মন বসত না। রনির মুখটা চোখের সামনে ভাসত। ভয় লাগত নিজের অজান্তেই। হস্টেল ছেড়ে দিলাম। ইঞ্জিনিয়ারিংও পড়া হল না। বাবাকে বোঝাতে একটু অসুবিধা হয়েছিল। ইংরাজি অনার্স নিয়ে ভরতি হলাম অন্য কলেজে। স্টুডেন্ট খারাপ ছিলাম না। ভালোভাবেই পাশ করে বেরোলাম।
এরপরও বেশ কয়েকবার এরকম ঘটেছে। চাকরি নেওয়ার পর প্রথম যে-স্কুলে জয়েন করলাম, সেখানে একজন নিখোঁজ হয়ে গেল। কিন্তু আর কোনও সুযোগ নিইনি। সে ফিরে আসার আগেই ইস্তফা দিয়ে চলে গিয়েছি আর এক জায়গায়। বুঝতে পারছিলাম, ওরা সংখ্যায় বাড়ছে। কাগজে নিখোঁজ হওয়ার খবরগুলো পড়তাম মাঝে-মধ্যেই। এর মধ্যেই অন্য জগৎ, প্যারালাল ইউনিভার্স ইত্যাদি বিষয়গুলো আমার মাথায় কিলবিল করতে লাগল। পড়াশোনা শুরু করলাম। চাকরির স্থায়িত্ব ছিল না, মাঝে-মাঝেই চাকরি বদলে বদলে পালাতে লাগলাম। কিন্তু ওরা যেন আমার আশেপাশে সংখ্যায় ক্রমশ বেড়ে উঠছিল। বুঝতে পারছিলাম, আমি আর দশটা মানুষের থেকে কিছুটা হয়তো আলাদা। ওদের অস্তিত্ব বুঝতে পারি। ওরাও বোধ হয় পারে। সহকর্মীদের কখনো-কখনো বলেও ফেলতাম। শেষ যে-স্কুলে ইংরাজির শিক্ষক ছিলাম, সেখানে একটি বাচ্চা নিখোঁজ হয়ে যায়। হেডস্যারকে ব্যাপারটা বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম একটু ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে। ভদ্রলোক আমার কথা তো বিশ্বাস করলেনই না, উলটে আমাকে বললেন কিছুদিন বিশ্রাম দিতে।
কথা বলতে বলতে হঠাৎ যেন উত্তেজিত হয়ে উঠলেন তিমিরবাবু। ওঁর চোখ দুটো ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে যেন কোটর থেকে। উঠে দাঁড়ালেন।
“সারাজীবন শুধু পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি। কে জানে কখন ওদের দৃষ্টি পড়ে, আমিও ওদের শিকার হয়ে যাই। তবে মানুষকে সতর্ক করার চেষ্টা এখনও করে যাই, জানেন? আমি পাগল নই। লোকে বোঝে না। বোঝে না, ওরা… ওরা ভীষণ ধূর্ত। এভাবেই চারপাশে মিশে গিয়ে আমাদের শেষ করে দেবে। ওরা ভাইরাসের মতন। আপনাকেও বলছি, আপনার চেনা-পরিচিতের মধ্যে কেউ যদি হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে আবার ফিরে আসে, সাবধানে থাকবেন।”
এবার বুঝতে পারছিলাম, লোকটার মাথায় কিছু সমস্যা আছে। তবুও নরম গলায় বললাম, “তিমিরবাবু, আপনার এই চেনা-পরিচিত লোকেরা কেউই বদলে যায়নি বা আপনি যেমন ভাবছেন তেমন তাদের জায়গায় তাদেরই মতো দেখতে অন্য কেউ চলে আসেনি। আপনি ডাক্তার দেখান, তিমিরবাবু। আপনি মানসিকভাবে অসুস্থ।”
তিমির নাথ আমার দিকে কিছুক্ষণ অপলকভাবে তাকিয়ে থাকলেন।
“এজন্যেই সভ্য জগৎ থেকে দূরে থাকি। জানি, আমার কথা কেউ বিশ্বাস করবে না। সংবাদপত্রে বেনামে চিঠি লিখে পাঠাই। চেষ্টা করি মানুষকে সতর্ক করার। আপনি বুঝতে পারছেন না, ওরা আমাদের মধ্যে ঢুকে পড়ছে, ছড়িয়ে পড়ছে নিঃশব্দে… ওদের না আটকালে ওরা সবাইকে শেষ করে দেবে, তারপর… তারপর হয়তো নিজেরাই থাকবে শুধু।”
আমি উঠে দাঁড়ালাম। সরাসরি তাকালাম ওঁর দিকে।
“খবরের কাগজ-টাগজ পড়েন?”
“পড়তাম। দিন কয়েক ধরে কিছু ভালো লাগছে না। কাগজ পড়ে থাকে ওখানে।”
ঘরের কোণে একটা ছোটো টুল রাখা ছিল। সেদিকেই নির্দেশ করলেন তিমিরবাবু। সেখানে কয়েকদিনের কাগজ ডাঁই করে রাখা আছে। আমি ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম সেদিকে। ওপরেই রাখা ছিল আজকের খবরের কাগজটা। তুলে নিয়ে একটা নির্দিষ্ট পাতা খুলে তিমিরবাবুকে বললাম, “এই খবরটা পড়ে দেখুন।”
তিমিরবাবু বেশ একটু অবাক হয়েই আমার হাত থেকে কাগজটা নিয়ে আমার নির্দেশ করা জায়গায় চোখ রাখলেন। বাল্বটা খুব জোরে দপদপ করতে শুরু করেছে। লক্ষ করছিলাম, পড়তে পড়তে তিমির নাথের চোখ দুটো বিস্ফারিত হয়ে উঠছে। আমি জানি, কীসের খবর পড়ছেন তিনি।— ‘গতকাল থেকে নিখোঁজ প্রখ্যাত লেখক সুদীপ্ত রায়। অবসর কাটানোর জন্য তিনি কয়েকদিন আগে বেড়াতে এসেছিলেন…’
বাল্বটা হঠাৎ নিভে গেল।
শুভাঞ্জন ব্যানার্জী ▪ প্রবাহনীল দাস
লিও তলস্তয় ▪ নলিনাক্ষ ভট্টাচার্য
তাপস মৌলিক ▪ অংশু পাণিগ্রাহী ▪ বাণীব্রত গোস্বামী ▪অরিন্দম ঘোষ ▪ রঞ্জন দাশগুপ্ত ▪ সিদ্ধার্থ দাশগুপ্ত ▪শাশ্বত কর ▪ রাজীব রায় গোস্বামী ▪ সায়নদীপা পলমল ▪ প্রদীপ কুমার দাস
বদ্রীনাথ পাল ▪ তাপস বাগ ▪ বসন্ত পরামানিক ▪ গোবিন্দ মোদক ▪ সুব্রত দাস ▪ অর্ণব ভট্টাচার্য ▪ সুজাতা চ্যাটার্জী ▪ মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় দাস ▪ মধুমিতা ভট্টাচার্য ▪ ড. রমলা মুখার্জী ▪ সনৎকুমার ব্যানার্জী ▪ বিদ্যুৎ মিশ্র ▪ রাজর্ষি মণ্ডল ▪ রূপালী মুখোপাধ্যায় ▪ শক্তিপদ পণ্ডিত ▪ শম্ভু সরকার ▪ সুব্রত চৌধুরী
অদিতি ভট্টাচার্য ▪ দীপঙ্কর চৌধুরী ▪ মৌসুমী রায় ▪ সবিতা রায় বিশ্বাস ▪ সহেলী রায় ▪ কিশোর ঘোষাল
অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায় ▪ অরিন্দম দেবনাথ ▪ কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায় ▪ দীপক দাস ▪ ড. উৎপল অধিকারী ▪ চন্দ্রানী মজুমদার
সায়ন্তনী পলমল ঘোষ ▪ সোমা দে ▪ শংকর লাল সরকার ▪ সন্দীপন সাহা
অলংকরণ
মায়াসখা নন্দী ▪ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ▪ একপর্ণিকা ক্রিয়েটিভস
জনা দশেকের একটা মিষ্টিখোরের দল। না, সেই অর্থে ফুড ব্লগার নন তাঁরা। তাঁদের নেশা দিন-পেশা সামলে যত হারিয়ে যাওয়া বা প্রাচীন মিষ্টির রসাস্বাদন করা। রাজ্যের আনাচেকানাচে তাঁদের অবাধ বিচরণ। তেমন খবর এলে প্রতিবেশী রাজ্যেও হানা দেন সেখানকার প্রাচীন মিষ্টির সন্ধানে। যোগ্য কারিগর পেলে অনুরোধ-উপরোধ করে হারিয়ে যাওয়া মিষ্টি আবার তৈরি করিয়ে কিনে আনেন। চিনে জোঁকের মতো লেগে থেকে সংগ্রহ করেন সেসব মিষ্টির পাকপ্রণালী, ইতিহাস ও মিথ। প্রচলিত মিষ্টির ভিয়েন ঘরেও উঁকি দেন তাঁরা।
পেশায় জার্নালিস্ট দীপক দাস এই দলের অন্যতম সদস্য। এই বইয়ে তেমনই প্রাচীন ও হারিয়ে যাওয়া মিষ্টির উৎপত্তির ইতিহাস, মিথ ও পাকপ্রণালীর গল্প বলেছেন তিনি।
আমরা ভারতবাসী কাব্য-মহাকাব্য লিখেছি। লিখেছি পুরাণের নামে কিছু অলীক গল্পকথা। কিন্তু ইতিহাস লিখতে শিখিনি। তার প্রয়োজনীয়তাও বোধ করিনি। তাই ঐশ্বর্যময় গরিমা সত্ত্বেও আমরা আমাদের উত্তরসূরিদের জন্য কিছুই রেখে যাইনি। গিরিব্রজসিংহ এমনই এক অকথিত ঐতিহাসিক উপাখ্যান।